ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

৩০তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[৩০]

রাত অনেক হয়েছে। ঘরজুড়ে মৃদু নৈশবাতির আলো। নীরব চারপাশ। বিছানার একপাশে দেয়াল সংলগ্ন ঘুমিয়ে বাচ্চাটি। সবেমাত্র ঘুমিয়েছে। আফসানা ধীরে ধীরে আলতো করে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো। পাতলা কাঁথা ভালোমতো জড়িয়ে দিলো নরম তুলতুলে শরীরে। ঠোঁটে ছড়িয়ে পড়লো স্নেহের হাসি। অতঃপর নিঃশব্দে ঘুরে শুয়ে পড়লো স্বামীর দিকে। সোজা হয়ে শুয়ে আছে শাহেদ। দৃষ্টি নিবদ্ধ সিলিংয়ে। ভাবনায় বিভোর। স্বামীর বাহু উন্মুক্ত করে বুকের ভেতর গুটিসুটি হয়ে শুলো আফসানা। ভাবনায় ছেদ পড়লো শাহেদের।

" ঘুমিয়েছে? "

" হু।‌ "

" এখনই ভালো রাত জাগতে শিখেছে। "

" তোমার ছেলে না? "

" রাত জাগলে আমার ছেলে, শান্তশিষ্ট থাকলে তোমার? ভারী অবিচার তো।‌ "

ম্লান হাসলো আফসানা। মুখে হাসি। অন্তরে অচিন ব্যথা।‌ নীরবতা নেমে এলো ঘরে। শাহেদ লক্ষ্য করলো স্ত্রীর পাংশুটে মুখশ্রী।

" বোনের জন্য চিন্তা হচ্ছে? "

" আমার না কেমন ভয় ভয় করছে। "

" ভয়? কেন? "

" সবটা আদৌও ঠিক হয়ে গেছে? "

" মিডিয়া, পুলিশ তো তাই বলছে। "

" মনটা কু গাইছে গো। মনে হচ্ছে বড় ঝড়টা এখনো বাকি।‌ অনেক কিছু লণ্ডভণ্ড হতে চলেছে। "

" অহেতুক দুশ্চিন্তা করছো তুমি। রিল্যাক্স।‌ ইস্তেগফার পড়তে থাকো। দেখবে এসব কু চিন্তা পালিয়ে যাবে।‌ মন নরম হবে। "

" অহেতুক ভাবছি না আমি।‌ সবকিছু যেভাবে হলো.. বিপদ এখনো বাকি। অশনিসংকেত টের পাচ্ছি যেন।‌ "

শাহেদ যত্ন সহকারে স্ত্রীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিলো।

" শান্ত হও। "

কপালে চুমু এঁকে দিলো শাহেদ। স্বামী সোহাগে আজ অশান্ত মন শান্ত হতে ব্যর্থ। বারবার ভয় হচ্ছে। নতুন কোন ম'রণ আঁধার ধেয়ে আসছে আবার?

" মনেপ্রাণে চাচ্ছি আমার বনু ভালো থাকুক। আকাঙ্ক্ষিত সবটুকু সুখ ওর হয়ে উঠুক। "

" হবে ইনশাআল্লাহ্! তানসীভকে যতটুকু জেনেছি সে অপরাধ জগতের একজন হলেও মনটা এখনো পুরোপুরি ম'রে যায়নি। কিছুটা মনুষ্যত্ব, অনুভূতি আজো বেঁচে আছে। "

" আমার বোন ওর কাছে ভালো থাকবে? "

" ভালো রাখার মালিক আল্লাহ্! টাকা-পয়সা, রূপ, গুণ এগুলো হলো ক্ষণস্থায়ী। আজ আছে কাল নেই। কিন্তু মনের মিল, ভালোবাসা, যত্ন, সম্মান। এগুলো চিরস্থায়ী। সম্পর্কের মূল ভিত্তি। "

অমত করতে পারলো না আফসানা। শাহেদ ঠিক বলেছে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্বামীর বাহুবন্ধনে নিজেকে ছেড়ে দিলো সে। ক্লান্তশ্রান্ত মনটার এবার একটুখানি স্বস্তি প্রয়োজন।

•

রৌদ্রোজ্জ্বল এক সকাল। চারতলা ভবনের সামনে এসে থামলো বাইক।‌ পরিহিত পোশাক সামলে সাবধানে নেমে এলো লাজুক। তানসীভ বসে বাইকে। স্বামীর সন্নিকটে এসে দাঁড়ালো রমণী।

" বিকেলের মধ্যেই চলে আসবেন তো? "

টিস্যু দিয়ে সযত্নে স্ত্রীর কপালে লেপ্টে থাকা ঘাম বিন্দু মুছে দিলো তানসীভ। ক্ষীণ কণ্ঠে সম্মতি জানালো,

" হু। "

" পাক্কা? "

হিজাবের ওপর দিয়ে পুরুষালি হাত স্থাপিত হলো গালে। ভড়কে গেল রমণী। ভীত চোখে আশেপাশে তাকালো। তন্মধ্যে থমকে গেল হৃদয়ের স্পন্দন।‌ কপালে গভীর, ক্ষুদ্র এক আদর। ফিসফিসিয়ে জেনে নিলো,

" ডিড ইয়্যু গেট দ্য অ্যান্সার? "

লজ্জারুণ মোহ ছড়িয়ে পড়লো চেহারায়। আস্তে করে ইতিবাচক মাথা নাড়লো লাজুক। ঠোঁট ছড়িয়ে সামান্য হাস্যরেখা ফুটে উঠলো মানবের।

" যাও।‌ "

" সাবধানে যাবেন। সময়মতো নামাজ পড়ে নেবেন কিন্তু। খালি ফাঁকিবাজি করেন। "

তানসীভ আলতো করে মাথা নাড়লো।

" আল্লাহ্ হাফিজ।‌ "

হাত নেড়ে বিদায় জানালো লাজুক। চোখে হাসলো তানসীভ। রমণী বিল্ডিংয়ের গেটে প্রবেশ করে থেমে গেল হঠাৎ। পিছু ঘুরে তাকালো। ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দহীন জানালো,

' অপেক্ষায় থাকবো। '

মধ্যকার দূরত্ব স্বল্প। তবুও নিঃশব্দ অনুভূতি বুঝতে সক্ষম হলো তানসীভ। চোখের পলকে আশ্বস্ত করলো। মুচকি হেসে দৃষ্টি সীমার বাইরে চলে গেল সঙ্গিনী। বাইক চলতে শুরু করলো। রওনা হলো নিজ গন্তব্যে।

-

ফ্ল্যাটের কলিংবেল চাপলো লাজুক। অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে। হাতে টুকিটাকি নাস্তা সামগ্রীর ব্যাগ। ফুফু শাশুড়ি লতা বেগমের বাড়িতে আজ প্রথমবারের মতো আগমন। ইতিপূর্বে দুই দফা আমন্ত্রিত হয়েছিল। তবে কাজের বাহানায় আসেনি তানসীভ।‌ আসতে দেয়নি ওকে। অবশেষে আজ তৃতীয় দফায় আমন্ত্রণ গ্রহণ করলো মানুষটা। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে গেল। একগাল হেসে জড়িয়ে ধরলো তন্বী। উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলে উঠলো,

" ভাবী! অবশেষে এলে! "

লাজুক মুচকি হেসে এক হাতে ওর পিঠ চাপড়ে দিলো।

" আসসালামু আ'লাইকুম।‌ কেমন আছো তন্বী? "

আলিঙ্গন ভেঙে জিভ কাটলো তন্বী,

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম। ভালো আছি ভাবী।‌ তুমি একা কেন? ভাইয়া কোথায়? সাথে আসেনি? "

ভেতর থেকে লতা বেগমের কণ্ঠ ভেসে এলো,

" দরজায় আড্ডা জমেছে? "

পুনরায় জিভ কাটলো তন্বী। খুশিতে আত্মহারা হয়ে আজ শুধু ভুল হচ্ছে।

" এসো এসো। ভেতরে এসো।‌ "

লাজুক ফ্ল্যাটের ভেতরে প্রবেশ করলো।‌ দরজা আটকে দিলো তন্বী।

" তোমার ভাইয়া পৌঁছে দিয়ে গেলেন। ইনশাআল্লাহ্ সন্ধ্যার মধ্যে চলে আসবেন। "

" কি! আবারো সন্ধ্যা? আদৌও আসবে তো? "

লাজুক কিছু বলবার পূর্বে দৃষ্টি পড়লো ইফরাতের দিকে। রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে সে।‌ হাতে হাতে ফুফুকে হেল্প করছিল এতক্ষণ। এসেছে আধঘন্টার মতো হবে।

" আসসালামু আ'লাইকুম ভাবী। "

" ওয়া আ'লাইকুমুস সালাম।‌ একা যে? "

" একা হবে না? অমন খারুস বর হলে পথেঘাটে একাই চলতে ফিরতে হবে। "

তন্বীর কণ্ঠে ক্ষোভ। লাজুক মুচকি হেসে বললো,

" ভাইয়াকে চেনো না তুমি? চেনো তো। উনি যখন বলেছেন, ইনশাআল্লাহ্ চলে আসবেন। হু? "

" ভালোই পতিভক্ত হয়েছো। কিছু বলাই যায় না।‌ "

তুহিন নিজ রুম থেকে বের হতে হতে চলতি পথে বললো,

" স্বামীভক্ত হবে না তো কার ভক্ত হবে? তোর? "

" জ্বি না। তোমার ফেবারিট স্টার কাবিলার। "

বাংলা সিনেমার খল চরিত্র কাবিলা। তুহিনের বেজায় অপছন্দ তার অভিনীত চরিত্র।‌ হঠাৎ সে-ই লোকটার নাম নেয়ায় তুহিন ক্ষেপে উঠলো।

" ফালতু কথা বলবি না শাকচুন্নী। এখানে কাবিলা এলো কোথা থেকে? "

" যেভাবে তুমি এলে।‌ হেঁটে হেঁটে। "

" তবে রে। "

গাট্টা মা'রতে অগ্রসর হলো তুহিন। তন্বী চটজলদি বড় ভাবীর পেছনে লুকালো। ইফরাত এবার রেফারির ভূমিকায় অবতীর্ণ হলো।

" ব্যাস ব্যাস। থামো দু'জনে। ফুফু কিন্তু বকবে।‌ "

ঠিকই তো। মায়ের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছিল যেন। দুই ভাই-বোন এবার চুপ হয়ে গেল। লাজুক একদৃষ্টিতে তাকিয়ে। ওদের ভাইবোনের খুনসুটি দেখছে। আচ্ছা ওনাদের দুই ভাইয়ের শৈশব, কৈশোর কেমন ছিল? এমনই খুনসুটিময়? নাকি অদৃশ্য শীতলতায় পূর্ণ!

-

প্রায় এক যুগ পূর্বে মা'রা গিয়েছেন লতা বেগমের স্বামী। এরপর দুই সন্তান নিয়ে তিন রুমের এই ছিমছাম ফ্ল্যাটে থাকেন তিনি। চারতলা বাড়িটা তৈরি করেছিলেন ওনার স্বামী এবং বড় ভাসুর যৌথভাবে। দুই ফ্লোরের ভাড়া পান উনি। সে দিয়ে আলহামদুলিল্লাহ্ ভালোই দিনকাল চলছে। তুহিন টিউশনি করায় দু'টো ছেলেমেয়ের। সেখানেও ভালো অ্যামাউন্ট পাওয়া যায়। ভাইজান বিত্তশালী। তবুও আত্মসম্মান বজায় রাখতে কখনো ভাইয়ের কাছে হাত পাতেননি লতা বেগম। নিজে যেভাবে পেরেছেন, সন্তানদের লালনপালন করেছেন। বাড়িটা ঘুরে দেখতে দেখতে এসব তথ্য জানতে পারলো লাজুক। ইফরাত জানালো। ফুফুর অবস্থা জেনে বেশ খারাপ লাগলো রমণীর। মনুষ্য জীবন কত বৈচিত্রময়! কার জীবনে কখন সুখদুঃখ হাতছানি দেবে, সৃষ্টিকর্তা ব্যতীত কারোর জানা নেই। দীর্ঘশ্বাস ফেললো সে।

" অ্যাই ভাবী'স! "

ড্রয়িংরুম হতে ডাকছে তন্বী। লাজুক, ইফরাত মুচকি হেসে সেদিকে অগ্রসর হলো।

-

দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে। ড্রয়িংরুমে তরুণ প্রজন্মের হৈচৈ। সোফায় বসা তিন নারী। তুহিন বসে রয়েছে সোফা ঘেঁষে মেঝেতে। নুডলসের সাথে আড্ডা জমেছে তাদের। লাজুক স্বভাবতই শান্ত। মাঝেমধ্যে উত্তর দিচ্ছে। বাটির শেষ নুডুলসটুকু খেয়ে তুহিন অসহায় চোখে তাকালো বোনের দিকে।

" ওই.. নিরীহ ছেলেটাকে এভাবে জ্বালাস না। "

" কি হয়েছে? "

" আল্লাহ্ পাপ দেবেন। একটু দে না। "

" কি দেবো? "

" নুডলস্ দে একটু। তোর বাটিতে বেশি পড়েছে। "

" ফর ইয়্যর কাইন্ড ইনফর্মেশন, না আমার বাটিতে বেশি নুডলস্। না তুমি নিরীহ। বুঝেছো? "

" ভাট বকিস না তো। স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোর বাটিতে কতগুলো নুডুলস। লোভাতুর ভঙ্গিতে ডাকছে আমায়। "

" নুডলস্ আবার কবে থেকে ডাকছে তোমাকে? অ্যাই! তুমি ঠিক আছো তো? নাকি তেনাদের আছড় পড়েছে? "

" এই তেনা/ত্যানা আবার কেডা? "

ইফরাত ফিক করে হেসে উঠলো। বললো,

" বুঝলে না ভায়া? ভাবো ভাবো। "

মিটিমিটি হাসছে লাজুক। দুই ভাবীর হাসিমুখ দেখে চিন্তায় পড়ে গেল তুহিন।‌ আকস্মিক বিষয়টা উপলব্ধি হলো। হতভম্ব দৃষ্টিতে তাকালো বোনের দিকে!

" শাকচুন্নী রে.. তোকে তো আমি.. "

তুহিন ধাওয়া দেয়ার পূর্বেই হাসতে হাসতে সোফা ছেড়ে দৌড় দিলো তন্বী। তুহিন পিছু নিতে উদ্যত হলো তখনই বেজে উঠলো কলিংবেল। দৌড়াতে দৌড়াতে তন্বী দরজায় পৌঁছালো।‌ হাঁপাতে হাঁপাতে খুললো দরজা। মুহুর্তের মধ্যেই স্থবিরতা নেমে এলো চোখ জোড়ায়। অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে তন্বী! খুনসুটির ছায়া ইতিমধ্যে পালিয়েছে শত মাইল দূর। দরজায় পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দুই ভাই। তানসীভ, রায়হান। রায়হানের হাতে দই, মিষ্টির প্যাকেট। তানসীভের হাতেও ভাইবোনদের পছন্দের সামগ্রী। দু'জনে কেমন অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে। সিঁড়ি বেয়ে উঠতে গিয়ে হঠাৎ দেখা। বাধ্য হয়ে একসাথে এলো। তানসীভ চিরাচরিত গম্ভীর অভিব্যক্তি বজায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে। তন্বীকে পাশ কাটিয়ে প্রবেশ করলো ভেতরে। রায়হান দরজায় দাঁড়িয়ে। দীর্ঘশ্বাস ফেলে তন্বীর দিকে তাকিয়ে ম্লান হাসলো।

ইফরাত, লাজুক এতক্ষণ বিহ্বল হয়ে ছিল! তানসীভ ভেতরে প্রবেশ করায় ঘোর কাটলো তাদের।‌ সেন্টার টেবিলের ওপর জিনিসপত্রের প্যাকেট রাখলো তানসীভ। লাজুকের অন্তর পুলকিত। মানুষটা তবে কথা রাখলেন! চোখে চোখ পড়লো তাদের। গাম্ভীর্য বজায় রেখে সোফায় বসলো তানসীভ। রায়হান স্ত্রীর হাতে দই, মিষ্টির প্যাকেট দিলো। সোফায় বসতে উদ্যত হলো তখনই সেই ফাঁকা স্থান দখল করলো তন্বী। ভ্যাবাচ্যাকা খেল রায়হান। লাজুক ছোট ছোট চোখ করে তাকিয়ে। ঘটনা বোঝার চেষ্টা করে চলেছে।‌ রায়হান এদিক ওদিক হতাশ দৃষ্টিতে তাকালো। সোফার সব সিট দখল হয়ে আছে। একটা মাত্র সিট ব্যতীত। অত বেশি ভাবতে ইচ্ছে হলো না আজ। বসলো সে। পাশাপাশি, সজ্ঞানে বসা দুই ভাই। কিছুটা আড়ষ্টতার সহিত বসা তানসীভ। রায়হান স্বাভাবিক। হাসিমুখে ভাইবোনদের খোঁজখবর নিচ্ছে। লাজুকের চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা আনন্দ অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। ইফরাত ব্যতিক্রম নয়। দু'জনেই আবেগী, আশাবাদী। হয়তো ভাইয়ে ভাইয়ে জমানো দীর্ঘদিনের দূরত্ব, ভুল বোঝাবুঝির দেয়াল একদিন পুরোপুরি মিটে যাবে। সব অন্ধকার কেটে গুলবাহার মঞ্জিলে আবার উঠবে নতুন ভোরের সূর্য। সকলের অগোচরে রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে আবেগতাড়িত লতা বেগম।‌ চোখে অশ্রু, ঠোঁটে খুশির ছোঁয়া।

•

সোনালী রোদ্দুরে সজ্জিত এক সকাল। ওয়াশ রুমে পানির শব্দ। কাবার্ডের সামনে দাঁড়িয়ে লাজুক। স্বামীর জন্য পোশাক বাছাই করছে। আজ কোন রঙের শার্ট, প্যান্ট পড়বে তা নির্ধারণ করে চলেছে। সহসা তার নামে ডেকে উঠলো মানুষটা,

" নূর! "

" জ্বি? "

" তোয়ালে। "

ওয়াশ রুমের দরজায় তাকালো রমণী। স্বল্প ফাঁকা দরজা। অসহায় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে মানুষটা। দরজার ফাঁক গলিয়ে শুধু মুখখানা বের করে রাখা।‌

" আবার ভুলে গেছেন? "

উপর নিচ মাথা নাড়লো তানসীভ। ভেজা আদুরে মুখখানা দেখে কেমন আদর আদর পেল লাজুকের। মাথা ঝাড়া দিয়ে কাবার্ড বন্ধ করলো সে। শার্ট, প্যান্ট বিছানার একপাশে রেখে তোয়ালে হাতে নিলো। এগিয়ে গেল ওয়াশ রুমের কাছে।

" নিন। গোসল করতে গিয়ে এত তোয়ালে ভুলোমনা হলে চলে? "

রমণী তোয়ালে বাড়িয়ে দেয়া। মোটেও লক্ষ্য করেনি মানুষটার ঠোঁটের কোণে ফুটে ওঠা ভ'য়ঙ্কর হাসি। সুবর্ণ সুযোগ মোটেও হাতছাড়া করলো না মির্জা সাহেব। তোয়ালে নেয়ার বাহানায় চট করে চেপে ধরলো লাজুকের নরম কব্জি। রমণী কোনোরকম প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পূর্বে মৃদু এক হ্যাঁচকা টান। সঙ্গিনীকে একপ্রকার উড়িয়েই নিয়ে গেল ভেতরে। অতর্কিত আক্রমণে দিশেহারা রমণী। শাওয়ারের নিচে চোখ পিটপিট করে চলেছে। মূহুর্তের মধ্যেই ভিজে গেল সারা শরীর। পরিহিত গোলাকার চুড়িদার পোশাক ভিজে দেহে লেপ্টে রয়েছে। দৃশ্যমান নারী অঙ্গের আকর্ষণীয় বাঁক। তানসীভের ভেজা চিবুক গড়িয়ে পড়ছে পানি। চোখের চাহনিতে নে'শাক্ত ভাব। স্বামীর বাহুবন্ধনে সেঁটে গেল রমণী। নিজেকে লুকানোর গাঢ় প্রয়াস।

" এটা কি করলেন? ভিজে গেলাম তো। "

" ড্রেঞ্চড লাইক দিস, ইউ লুক পিউরলি মাইন। "

মা'তাল করা শব্দমালা। নে'শাতুর কণ্ঠ। রমণীর পুরো দেহে শিহরণ বয়ে গেল। আরক্তিম মুখমণ্ডল। পা বাড়িয়ে পিছু হটতে চাইলো। এক কদম পেছাতেই পিঠ ঠেকে গেল ঠাণ্ডা, ভেজা দেয়ালে। এক ধাপ এগিয়ে নিকটবর্তী হলো তানসীভ। পালানোর সুযোগ নেই আর। দু'হাত বাড়িয়ে রাখলো সঙ্গিনীর দু পাশের দেয়ালে। পুরোপুরি বাহুবন্ধনে আবদ্ধ হলো লাজুক। দু'টো শরীরের দূরত্ব নামমাত্র।

" আর ইয়্যু ব্লাশিং? আমিই তো। "

আলতো হাসি ঠোঁটের কোণে। মোহাবিষ্ট দৃষ্টি নিবদ্ধ অর্ধাঙ্গিনীর ভেজা মুখে। লজ্জায় চোখ বন্ধ হলো রমণীর। দেয়ালের শীতলতা। আপন মানুষটির উষ্ণতা। দুইয়ের সংমিশ্রনে দুলছে বুকের ভেতর। দু'জনের ঘন ঘন নিঃশ্বাসের শব্দ মিশে গেল শাওয়ারের টুপটাপ ধ্বনিতে। মায়াবী জালে জড়িয়ে গেল উভয়ে। লাজুকের দুই পাশে তখনো স্থাপিত হাত দু'টো। সরিয়ে নিলো না তানসীভ। ধীরস্থির ভঙ্গিতে ঝুঁকে গেল অর্ধাঙ্গিনীর দিকে। একই ছন্দে ওঠানামা বুকের। রমণীর চোখ বন্ধ। তবুও অনুভব করে চলেছে উষ্ণ নিশ্বাস। ঠোঁটের খুব কাছে উত্তাপ ছুঁয়ে চলেছে। অবশ করা শিহরণে রমণীর নখ গেঁথে গেল স্বামীর উন্মুক্ত কাঁধে। গৌরবর্ণ ত্বক গড়িয়ে পানি পড়ছে। জাগিয়ে তুলছে অন্তঃস্থ মা'দকতা।

" তাকাও নূর। "

কণ্ঠস্বর কেমন জড়ানো। গভীর। চোখের পাতা সামান্য আলগা করলো লাজুক। ভেজা চোখের অবাধ্য চাহনি কাঁপিয়ে তুললো পৌরুষ অন্তঃস্থল। আর সইলো না অন্তর। দেয়াল হতে এক হাত নেমে স্থাপিত হলো স্ত্রীর কোমরে। আলতো টানে দেয়াল হতে সরে গেল। মিশে গেল তার চওড়া বুকে। অতর্কিত ঘনিষ্ঠতায় মৃদু আর্তনাদ ভেসে এলো। ভেজা, রূক্ষ বৃদ্ধাঙ্গুল চেপে ধরলো কম্পিত ঠোঁটে।

" শশ্! "

ফিসফিসানি কণ্ঠস্বর। বলশূন্য হয়ে পড়ছে শরীর। বোধহীন লাগছে। নিজেকে সামলানো দুষ্কর। আলতো করে ঠোঁটে বৃদ্ধাঙ্গুল বুলিয়ে দিলো মানুষটা। ভেজা চুল গুঁজে দিলো কানের পেছনে। সিক্ত চিবুক ধীরে ধীরে ঘঁষে দিলো সঙ্গিনীর গালে। অদ্ভুতুড়ে শিহরণী আবেশে গুঙ্গিয়ে উঠলো রমণী। মুখ নামিয়ে আনলো তানসীভ। ভেজা গলায় গুঁজে দিলো। ছোট ছোট আদরগুলো ধীরে ধীরে প্রগাঢ় হলো। স্পর্শের প্রখরতায় নিজেকে হারিয়ে ফেললো লাজুক। কপোত কপোতী ধীরে ধীরে ডুবে গেল অতল সমুদ্রে।‌

•

বিছানায় বসে রয়েছে লাজুক। মাথায় জড়ানো বড় তোয়ালে। পড়নে শুকনো পোশাক। ফর্সা নাকের ডগা লাল টুকটুকে।

" হাচ্ছো! উঃ.. হাচ্ছো! "

টানা দু তিনটে হাঁচি। বিছানার পাশেই রাখা টিস্যু বক্স। ঝটাপট কয়েকটা টিস্যু টেনে নিলো লাজুক। ঠাণ্ডা পানিতে অতক্ষণ ভেজার ফলাফল এখন হাতেনাতে মিলছে। টিস্যুতে নাক মুছে লাজুক কটমট চোখে তাকালো স্বামীর দিকে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে সে। ভেজা চুল মুছে ফেলেছে। এলোমেলো হাত বুলিয়ে চলেছে চুলে। চোখেমুখে অনুশোচনার বালাই নেই।‌ বেশ ফুরফুরে মেজাজে।

" সব আপনার জন্য হয়েছে। হাচ্ছো! "

আরেকবার হাঁচি। দোষারোপ আরম্ভ করলো রমণী। নাকের ভেতর শিরশির করে চলেছে। এখন যদি ধুম জ্বর আসে, তবে বুঝবে মজা। লালচে নাকের ডগা। আদুরে রাগিণী রূপ। মনে মনে বেশ উপভোগ করে চলেছে তানসীভ। ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমি ধরে রেখে সে ধীরপায়ে এগিয়ে এলো বিছানায়। বসলো লাজুকের ঠিক পাশে।

" কি করেছি? "

সে কি নিষ্পাপ অভিব্যক্তি! লাজুক হা হয়ে তাকিয়ে!

" তোয়ালে চাইলাম। তুমিই তো শিডিউস করে ঢুকে গেলে।"

" কিহ্! আমি ঢুকে গিয়েছি? ম্ মানে আমি ভেতরে গিয়েছি? আপনিই তো উড়িয়ে নিয়ে গেলেন আমাকে। "

" বেবি? "

থতমত খেল লাজুক,

" হা? "

" বেবি তুমি? এত ইজিলি উড়িয়ে নিয়ে গেলাম? "

" আপনি কি ইনিয়েবিনিয়ে মটু বলতে চাচ্ছেন আমাকে? মটু তো আপনি।‌ আস্ত এক হাতির শরীর। আপনার সামনে আমি তো ক্ষুদ্র এক পিপীলিকা। "

ফিচেল হাসলো তানসীভ,

" হাতির ভরে বেঁচে আছো এখনো? নট ব্যাড। "

দ্বৈত অর্থপূর্ণ কথাটা ঠিক উপলব্ধি করতে পারলো লাজুক। আড়ষ্ট হয়ে গেল জিহ্বা। বাকি কথাটুকু গিলে নিলো লজ্জায়। হাঁচির কারণে যতটা লাল হয়েছিল, লজ্জায় তারচেয়েও বেশি লাল হয়ে উঠলো গাল। মুখ নামিয়ে হাতের টিস্যুটা আঙুল দিয়ে মোচড়াতে লাগলো রমণী। তানসীভ ক্ষীণ হেসে লাজুকের আরেকটু কাছে ভীড়লো। কানের কাছে ফিসফিসিয়ে বললো,

" চুপ হয়ে গেলে যে? বলো। "

লাজুক কোনো উত্তর দিতে ব্যর্থ। স্বামীর এই চতুরতায় নিরূপায় সে। মুখ ঘুরিয়ে নিলো। তোয়ালে দিয়ে জোরে জোরে মাথা মুছতে লাগলো। যেন মাথা মোছার আড়ালে লজ্জা লুকানোর তীব্র প্রয়াস। নাছোড়বান্দা তানসীভ মিটিমিটি হাসছে সঙ্গিনীর কাণ্ডে। টুপ করে এক চুমু বসিয়ে দিলো গালে। লাজুক হতবাক! পকেটে হাত গুঁজে শিস বাজিয়ে ঘর থেকে প্রস্থান করলো মশাই।‌ লাজুক অবিশ্বাস্য চোখে তাকিয়ে! কালে কালে আর কত রূপ দেখাবে এই বান্দা! সব রূপ দেখে আদৌও জিন্দা থাকবে সে?

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩০তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন