ফন্ট সাইজ:
থিম:
হৃদতরঙ্গের নিঃশব্দী সুর

৩১তম পর্ব

লেখক: তাহিরাহ্ই রাজ

#হৃদতরঙ্গের_নিঃশব্দী_সুর

#তাহিরাহ্_ইরাজ

[৩১]

ঘরের এক কোণে ঝুলানো কাঠের দেয়াল ঘড়ি। হালকা শব্দ হলো। রাত আটটা। অভিজাত স্টাডি রুমের আবহাওয়া থমথমে। ১৬ ডিগ্রিতে চলছে এসি। বরফের মতো ঠাণ্ডা বাতাস। এই শীতলতার মধ্যেও জহুরুল সাহেবের কপাল বেয়ে গড়িয়ে নামছে ঘাম। সামনে রাখা ল্যাপটপের স্ক্রিনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ইন্টেলিজেন্স উইং থেকে পাঠানো অফিশিয়াল নোটিশ।

' অল কর্পোরেট অ্যান্ড পার্সোনাল অ্যাকাউন্টস্ ফ্রোজেন আন্ডার অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং অ্যাক্ট। '

হতবিহ্বল হয়ে আছেন উনি! ক্রমাগত বোধশক্তি হারিয়ে ফেলছেন। হিসাব কোনোভাবেই মিলছে না। আন্ডারগ্রাউন্ডের পুরো নেটওয়ার্ক আচমকা স্তব্ধ! কোনোরকম সোর্স কাজ করছে না। কি করে সম্ভব এ? সহসা নিঃশব্দে খুলে গেল ঘরের ভারী দরজা। ভেতরে প্রবেশ করলো মানুষটা। লৌহদৃঢ় তার অঙ্গভঙ্গি! পড়নে কুচকুচে কালো শার্ট। হাতা দু'টো নিখুঁতভাবে কনুই পর্যন্ত গুটানো। চোখের তারায় অনুপস্থিত রাগ। জমায়েত বুক কাঁপানো হিমশীতল শূন্যতা। মনুষ্য মেরুদণ্ডে ভয়ের কম্পন সৃষ্টি করতে যথেষ্ট। ধীরজ, সুনিয়ন্ত্রিত পায়ে এগিয়ে এলো তানসীভ। পদচারণায় আত্মবিশ্বাস। জহুরুল সাহেবের বিপরীত দিকের চেয়ারে বসলো সে। কোনোরকম দ্বিধা, সংকোচ বিহীন টেবিলের ওপর এক পায়ের ওপর তুলে দিলো অন্য পা। শান্ত, উদ্ধত এই অঙ্গভঙ্গিতে নিমিষেই ভারী হলো ঘরের আবহাওয়া। চোয়াল শক্ত হলো জহুরুল সাহেবের,

" এসব কি হচ্ছে তানসীভ? সেন্ট্রাল ব্যাংক আমার শিপিং লাইন্সের সব অ্যাকাউন্ট সিজ করছে কেন? আন্ডারগ্রাউন্ডের ফান্ড ট্রান্সফারগুলো আটকে গেছে! একের পর এক এসব কি হচ্ছে? তুমি কি বসে বসে হাওয়া খাচ্ছো? ডু সামথিং। ফাস্ট। "

" অ্যাকাউন্টস্ আনলক হবে না। "

" মানে কি? ছেলেখেলা পেয়েছে ওরা? হুটহাট আমার অ্যাকাউন্ট সিজ করার মানে কি? "

" হুটহাট নয়। আপনার ফেক আইডেনটিগুলোর রিয়েল কে-ওয়াই-সি রেকর্ড, রেজিস্ট্রেশন লগ, অডিট ট্রেইল এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যান্টি-মানি লন্ডারিং সেলে। "

" হোয়াট ডু ইউ মিন? "

জহুরুল সাহেব চিৎকার করে টেবিল চাপড়ে দাঁড়িয়ে গেলেন। রাগে ফুলে উঠলো চোখের শিরা।

" নিজের বাপের পিঠে ছু'রি মা'রছো? এই সাম্রাজ্য, এই ক্ষমতা কাদের জন্য বানিয়েছি আমি? তোমাদের জন্য! "

তানসীভ এক চুলও নড়লো না। না পরিবর্তিত হলো বসার ভঙ্গি। কণ্ঠস্বর আরো নিচু, ধারালো হয়ে গেল।

" বাপের পিঠে ছু'রি? নিজেকে কোনোদিন বাবা ভেবেছেন আপনি? "

পকেট হতে বের করে টেবিলের ওপর দু'টো জিনিস ছুঁড়ে ফেললো তানসীভ। সিলভার রঙের মেটাল ড্রাইভ। সিআইডির লোগো সম্বলিত দু'টো ফাইলের কপি। ভ্রু কুঁচকে ফাইল দু'টোর দিকে তাকালেন জহুরুল সাহেব। প্রথম ফাইলের ওপর বড় বড় অক্ষরে লেখা,

' ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অফ কার্ডিওলজি: ইনসুলিন টক্সিসিটি ফরেনসিক রিপোর্ট '

নিমিষেই সংকুচিত হলো চোখের মণি। হাতের তালু বেয়ে নেমে গেল এক চিলতে ঠাণ্ডা স্রোত। এত বছরের লুকায়িত কঙ্কাল আজ যেন জীবন্ত দাঁড়িয়ে! ভ'য়ঙ্কর দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি উনি। এক ঝটকায় চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো তানসীভ। অবয়ব জুড়ে অনুপস্থিত হুলস্থুল। কেবল বি'ষাক্ত স্থিরতা। টেবিলের ওপর খানিকটা ঝুঁকে জহুরুল সাহেবের চোখের দিকে তাকালো মানুষটা। কণ্ঠস্বর অস্বাভাবিক রকমের শান্ত। ঘরের বাতাস আরো ভারী।

" মনে পড়ে মিস্টার মির্জা? নাইনটিন নাইনটি সিক্স। "

জহুরুল সাহেবের কপাল বেয়ে নামলো ঘামের ধারা। অজান্তেই চেয়ারের হাতল শক্ত করে চেপে ধরলেন। তানসীভ এক ইঞ্চিও নড়লো না। শান্ত, ধারালো গলায় বলতে লাগলো,

" বড় মা তখন নিজের ঘরে যন্ত্রনায় ছটফট করছিল। আর আপনি? সিন্ডিকেট পার্টনারশিপ সাইন করতে বিজি। বড়মার ইনসুলিনের ডোজ আপনার পার্সোনাল ফার্মাসিস্টকে দিয়ে অল্টার করা হয়েছিলো। কখনো কেউ জানবে না, এমনটাই ভেবেছিলেন? "

জহুরুল সাহেবের গলা শুকিয়ে কাঠ। মুখ দিয়ে কোনো স্পষ্ট শব্দ বের হলো না। কেবল ভাঙা গলায় অস্ফুট স্বরে বলতে সক্ষম হলেন,

" ত্-তুমি.. "

" আপনার পুরনো হার্ডড্রাইভ থেকে রিকাভার্ড চ্যাট হিস্ট্রি, ইমেলের ফরেনসিক কপি এই ড্রাইভে। সিআইডির সাইবার টিম ডিজিটাল সিগনেচার ভেরিফাই করেছে। "

পেনড্রাইভ টোকা দিয়ে এগিয়ে দিলো মানুষটা। অন্তঃস্থ ভয় আড়াল করতে চেঁচাতে চাইলেন জহুরুল সাহেব। কিন্তু গলা দিয়ে যথেষ্ট আওয়াজ বের হলো না না। পর্যাপ্ত বাতাসের অভাবে কাঁপছে বুকের ভেতর। শুকনো ঠোঁট দু'টো কেঁপে উঠলো কোনোরকমে। ভাঙা, খসখসে শব্দ বের হলো,

" ওটা.. ওটা হার্ট অ্যাটাক ছিল। মেডিকেল রিপোর্টেও তাই লেখা ছিল। "

কম্পিত হাত দু'টো টেবিলের নিচে আড়াল করার চেষ্টা করলেন তিনি। ছেলের থেকে অসহায়ত্ব লুকাতে চাইলেন। এক ধাপ অগ্রসর হলো তানসীভ। সরাসরি তাকালো চোখের দিকে। তানসীভের চোখের তারায় বিদ্যমান শূন্যতা, ধীরে ধীরে রূপ নিলো জ্বলন্ত কয়লায়। টেবিলের ওপর দুই হাত ভর দিয়ে জহুরুল সাহেবের দিকে খানিকটা ঝুঁকে এলো সে,

" ক্ষমতার জোরে সত্য ধামাচাপা? পুরনো অভ্যাস। এবার আসি দ্বিতীয় ফাইলে। আমার মা। আপনার দ্বিতীয় স্ত্রী। আপনার গোপন সত্য জেনে ফেলেছিল। সেদিন রাতে খুব ঝগড়া হলো আপনার সঙ্গে। এর ঠিক এক মাস পর থেকে মা অসুস্থ। শয্যাশায়ী। ধীরে ধীরে পক্ষাঘাতগ্রস্ত। "

তানসীভ একটু থামলো। চোখ জোড়ায় প্রজ্বলিত হলো আগুনের আভা। যেন জ্ব'লন্ত অঙ্গার। জহুরুল সাহেবের মুখের ওপর চাবুক মা'রার মতো করে বললো,

" স্লো পয়জনিং, রাইট? ভেবেছিলেন কেউ কোনোদিন ধরতেই পারবে না। কিন্তু আপনার সেই পুরনো প্রেসক্রিপশন, মায়ের মেডিকেল হিস্ট্রি এখন ফরেনসিক ল্যাবে। ডক্টর'স্ টিম কেমিক্যালের প্রুফ পেয়েছে। "

টেবিলের ওপর থেকে ভর সরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়ালো মানুষটা। দীর্ঘ, ঋজু অবয়বের সামনে জহুরুল সাহেব যেন আজ বড্ড অসহায়, নগণ্য। তানসীভের অভিব্যক্তিতে উল্লাস অনুপস্থিত। নেই কোনো প্রতিশোধের তুচ্ছ উত্তেজনা। ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠলো এক চিলতে শীতল, বি'ভীষিকাময় হাসি। জহুরুল সাহেবের চোখের দিকে স্থির, পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে মানুষটা। শেষ পেরেক ঠুকে দিলো এবার,

" গেম ওভার। "

শব্দ দু'টো জহুরুল সাহেবের কানে যেন বু'লেটের মতো আঘাত করলো। এক নিমেষে পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল তার। এত বছরে অহংকার, ক্ষমতা, অপরাধের যে সুবিশাল দুর্গ তৈরি করেছিলেন.. তা আজ যেন এক লহমায় ভেঙে পড়লো তাসের ঘরের মতো। দেহমনের সমস্ত শক্তি হারিয়ে ধপাস করে চেয়ারে আছড়ে পড়লেন জহুরুল সাহেব। তানসীভের অভিব্যক্তি শিলাখণ্ডের মতো শক্ত। চোখের চাহনিতে প্রখর, তীক্ষ্ণ বুদ্ধিমত্তা। আবেগের বশে নয়, বরং বছরের পর বছর ধরে প্রতিটা গুঁটি মেপে আজ এই ফাঁ'দ পেতেছে সে। মুখভঙ্গির প্রতিটি রেখায় স্পষ্ট। শার্টের গুটানো হাতা হালকা একটু টেনে ঠিক করলো মানুষটি। যেন খুব সাধারণ একটা কাজ। চোখ জোড়া শিকারি চিলের মতো ঠাণ্ডা। ফোকাসড্। কোনো রকম চিৎকার বা আস্ফালন নেই। একদম নিচু, ভারী গলায় চারটি শব্দ উচ্চারণ করলো সে,

' পুলিশ অন দ্য ওয়ে। '

নাটকীয় ভয় দেখানোর চেষ্টা নয়। বরং অমোঘ বাস্তবতার ঘোষণা। মির্জা তানসীভ শাহ্-র হিমশীতল শান্ত ভাব, লৌহদৃঢ় ব্যক্তিত্ব। চূর্ণ বিচূর্ণ করলো আজ জন্মদাতা পিতার পাপের সুবিশাল সাম্রাজ্য।

•

স্টাডি রুমের বাইরে থমথমে নীরবতা। পাথরের ন্যায় স্তব্ধ রায়হান! এক লহমায় দুমড়ে মুচড়ে গিয়েছে পুরো অস্তিত্ব।‌ করিডোরের দেয়ালে ঠেকে গেল পিঠ। আস্তে আস্তে মেঝেতে বসে পড়লো সে। চোখ দু'টো শূন্য। কপাল বেয়ে ঝরছে ঘাম। হাত-পা কাঁপছে প্রবল আবেগে। যন্ত্রনায়। ভেতরকার হাহাকার চেপে রাখতে ব্যর্থ সে। অবস্থা ভয়াবহ করুণ। মুখ দিয়ে কোনোরূপ গোঙানির শব্দও বের হচ্ছে না। শুধু চোখ গড়িয়ে পড়ছে অশ্রু কণা। স্বামীর এই অবস্থা দেখে ভয়ে কেঁপে উঠলো ইফরাত। রায়হানের পাশে হাঁটু গেড়ে বসলো। কাঁপা কাঁপা হাতে স্বামীর চিবুক ওপরে তোলার চেষ্টা করলো। ব্যর্থ হলো।

" রায়হান! এমন করো না। শান্ত হও একটু। দয়া করে.. "

ইফরাত দু হাতে শক্ত করে চেপে ধরলো রায়হানের একটা হাত। স্বামীকে সামলানোর আপ্রাণ চেষ্টা করে চলেছে সে। গলা বুজে আসছে কান্নায়। ভেজা চোখের পাতা। শুকনো, ভাঙা গলায় বললো রায়হান,

" শান্ত? কিভাবে? উনি আমার মা ছিলেন।‌ জন্মদাত্রী মা। ওই লোকটা আমার মা'কে.. মা'কে মে'রে ফেলেছে! বি'ষ দিয়ে? কখনো ঘুণাক্ষরেও টের পাইনি আমি! আজীবন ওই পাপী লোকটার টাকায়.. বিলাসিতা করে গেলাম? সে তো একটা খু'নি।‌ খু'নি। "

দু হাতে মাথা চেপে ধরলো রায়হান। বুকের ভেতরকার আর্তনাদ দপদপ করে বেরিয়ে আসতে চাইছে। ইফরাত ব্যস্ত হাতে স্বামীর মাথায়, গালে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো,

" এমন করো না। তুমি নিজেকে কেন দোষারোপ করছো? তুমি.. তুমি তো কিছু জানতে না। "

ঝাঁপসা চোখ তুলে তাকালো রায়হান। করিডোরে শেষ প্রান্তে ছোট ভাইয়ের পাথরপ্রতিম অবয়ব হেঁটে চলেছে। বেরিয়ে যাচ্ছে এই মৃ'ত্যুপুরী হতে। বিড়বিড় করে উঠলো সে,

" কেন কিছু জানলাম না? কেন আমার ছোট ভাই একাই.. জাহান্নামের আগুনে পুড়লো? কেন? "

স্বামীকে কোনোরকম ধরে বেঁধে নিজেদের রুমে পৌঁছালো ইফরাত। বন্ধ হলো ঘরের দরজা। এতক্ষণের চেপে রাখা বাঁধভাঙা কান্না, হাহাকার একত্রে ছিটকে বেরিয়ে এলো। ধপ করে বিছানার পাশে মেঝেতে বসে পড়লো রায়হান। খাটের চাদর দু হাতে মুঠো করে ধরলো। অতঃপর ডুকরে কেঁদে উঠলো। পঁয়ত্রিশ বছর বয়সী এক শক্তপোক্ত পুরুষ আজ অসহায়ের ন্যায় কেঁদে চলেছে। এরচেয়ে করুণ দৃশ্য ইফরাত দেখেনি কখনো। দ্রুত পায়ে ছুটে গেল সে। স্বামীর সামনে হাঁটু গেড়ে বসলো। মানুষটার তীব্র যন্ত্রণা সহ্য করতে অক্ষম। রায়হানের দুই গালে হাত রেখে মুখটা নিজের দিকে ফেরানোর চেষ্টা করলো। নিজেও কেঁদে চলেছে ইফরাত। আকুল হয়ে ডেকে উঠলো,

" রায়হান! কেঁদো না। প্লিজ কেঁদো না। তাকাও আমার দিকে। নিজেকে এভাবে শেষ করে দিয়ো না। "

কাঁপছে পৌরুষ শরীর। খাটের পায়ায় ঠেকিয়ে রাখা মাথা। ইফরাত বোঝানোর চেষ্টা করে চলেছে,

" তুমি কিছু জানতে না। ওই লোকটার কুকর্ম জানতে না। দোহাই আল্লাহ্'র। নিজেকে এভাবে দোষী ভেবো না। "

" না না। আমিই দোষী। আমিই খারাপ। মায়ের.. কু'লাঙ্গার ছেলে। মায়ের অযোগ্য ছেলে আমি। তানসীভ ই ভালো। ও-ই ভালো। আমি খারাপ। "

এলোমেলো, জড়ানো কণ্ঠস্বর। কেঁদে চলেছে রায়হান। ইফরাত বলার ভাষা খুঁজে পেল না। স্বামীর মাথা শক্ত করে বুকের মাঝে চেপে ধরলো। আলতো করে হাত বুলিয়ে দিতে লাগলো। অনুধাবন করতে পারলো, পৃথিবীর যেকোনো সান্ত্বনাই রায়হানের ভেতরকার বিশাল শূন্যতা, অপরাধবোধ ঢাকতে অক্ষম। ঘরজুড়ে ভেসে বেড়াচ্ছে ভেঙে চুরমার এক পুরুষের নিঃশব্দ কান্না। বিষাদের সুর বাতাসে ছড়িয়ে।

•

নিশুতি রাত। অশরীরী নিস্তব্ধতায় ডুবে চারপাশ। অর্ধ উন্মুক্ত বারান্দায় আধো অন্ধকারে দাঁড়িয়ে তানসীভ। আঙ্গুলের ফাঁকে জ্বলছে সিগারেট। সিগারেটের বি'শ্রী ধোঁয়া অনবরত কুণ্ডলী পাকিয়ে উঠছে। বি'ষাক্ত ধোঁয়ার সে আস্তরণ আচ্ছন্ন করে ফেলছে বাতাস। এত বছরের লালিত প্রতিশো'ধস্পৃহা আজ সফল। জন্মদাতা পিতা এখন গরাদখানায়। তবে মানুষটির চেহারায় অনুপস্থিত বিজয় উল্লাস। চোয়াল শক্ত।‌ দৃষ্টি নিবদ্ধ নিকষ অন্ধকারে। নিঃশব্দ অভিব্যক্তির আড়ালে ঠিক কি লুকিয়ে? তীব্র কষ্ট নাকি চরম শূন্যতা? অনুধাবন করা মুশকিল। এ যেন এক জীবন্ত শিলাখণ্ড।

বারান্দায় আগমন হলো লাজুকের। স্বামীর অন্তরে চলমান ঝড় দূর থেকেই টের পাচ্ছে সে। শব্দহীন, ধীরপায়ে এগিয়ে এলো রমণী। স্বামীর একদম পাশে দাঁড়ালো। কোনোরূপ সান্ত্বনার বুলি আওড়ালো না সে। মন বললো, এই স্তব্ধতা ভাঙার ক্ষমতা কোনো সাধারণ শব্দের নেই। ধীরস্থির ভঙ্গিতে মানুষটির বাম হাতের ওপর নিজ কোমল হাতের তালু রাখলো লাজুক। বরফ শীতল চামড়ায় ঠেকলো সঙ্গিনীর হাতের ওম। নীরব অঙ্গভঙ্গি, আলতো স্পর্শ। বুঝিয়ে দিলো, সে আছে পাশে। পৃথিবীর দৃষ্টিতে ভঙ্গুর মানুষটার পাশে অবিচল দাঁড়িয়ে সে। সিগারেটের শেষ অংশটুকু বাইরে ছুঁড়ে ফেললো তানসীভ। আরো কয়েক মিনিট নীরবতা। কেবল দু'জনের নিঃশ্বাসের মৃদু শব্দ। অবশেষে জমাটবাঁধা নিস্তব্ধতা ভাঙলো লাজুক। পাথুরে, অটল মানুষটির দিকে তাকালো। শান্ত-দৃঢ় স্বরে বললো,

" আমাকে কি একটুখানি ভরসা করা সম্ভব? দীর্ঘদিনের লুকায়িত বি'ষাক্ত সত্য জানার মতো বিশ্বস্ত হতে পেরেছি?"

তৎক্ষণাৎ উত্তর দিলো না তানসীভ। নিশ্চল দাঁড়িয়ে রইলো। মনের গভীরে জমায়িত দীর্ঘদিনের দুঃস্মৃতির অবাধ্য ঢেউ সামলাতে ব্যস্ত। কিছু মুহূর্ত থমকে রইলো বাতাস। লাজুক ব্যাকুল হয়ে দাঁড়িয়ে। অবশেষে ঘুরে দাঁড়ালো তানসীভ। চোখের তারায় ভাসমান হিমশীতল শূন্যতা ভেদ করে এবার বেরিয়ে এলো এক রুদ্ধশ্বাস অন্ধকার ইতিহাস।

--

সময়কাল তখন ১৯৯৬. অক্টোবর মাস। জহুরুল সাহেবের স্ত্রী মিসেস গুলবাহার খানম। মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান তিনি। পারিবারিক ভাবে বিবাহ হয় জহুরুল সাহেবের সঙ্গে। বিয়ের পর ওনার সবটুকু ধ্যানজ্ঞান হয়ে ওঠে স্বামী, সন্তান। বেশ সুখেশান্তিতে কাটছে সংসার জীবন। ছেলে রায়হানের বয়স তখন চার বছর। বিগত ছয় মাস ধরে স্বামীর অনৈতিক কার্যকলাপ সম্পর্কে আভাস পেয়েছেন তিনি। ফলস্বরূপ নিত্যদিন সংসারে অশান্তি। রাতেই শুধুমাত্র স্বামীর দেখা মিলে। এছাড়া বাকি সময় অর্থ উপার্জনে ব্যস্ত সে। টাকা উপার্জনের ভ'য়ঙ্কর নে'শা জন্মেছে মনে। যেকোনো মূল্যে উচ্চ মধ্যবিত্ত থেকে উচ্চবিত্ত হওয়া চাই। প্রভাবশালী ধনী হতে যেকোনো কিছু করতে প্রস্তুত জহুরুল সাহেব। গুলবাহার খানম নৈতিকতা, অনৈতিকতা যথাসম্ভব মেনে চলার চেষ্টা করতেন। তাই তো স্বামীর অন্যায়গুলো প্রশয় দিতে পারলেন না। রাতের পর রাত ঝগড়া, বাকবিতন্ডা। একপর্যায়ে আইনের দ্বারস্থ হওয়ার হুমকি দিলেন। প্রথমবারের মতো ভড়কে গেলেন জহুরুল সাহেব। স্ত্রীর এক মামা পুলিশের লোক। সে-ই অবধি খবর পৌঁছালে ঘোর বিপদ। অনেক ভাবনাচিন্তা করে অবশেষে প্রিয় স্ত্রীকে বলিদান দেয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন তিনি। অন্যথায় আজকের একমাত্র কাঁটা ভবিষ্যতে কাঁটার বিছানা হয়ে উঠবে যে।

ডায়াবেটিসের রোগী ছিলেন গুলবাহার খানম। সে-ই রোগকে হাতিয়ার হিসেবে নিলেন জহুরুল সাহেব। করলেন ভ'য়ঙ্কর এক পরিকল্পনা। অত্যন্ত গোপনে ডেকে পাঠালেন ওনার বিশ্বস্ত বন্ধু ফার্মাসিস্টকে। সাধারণ ইনসুলিনের ডোজের মধ্যে আনা হলো সুক্ষ্ম বদল। বাইরে থেকে ধরা অসম্ভব। পরিবর্তিত ইনসুলিন যথাসময়ে গুলবাহার খানমের শরীরে পুশ করা হলো। মুহূর্তেই তা বি'ষে রূপ নিলো। তীব্র যন্ত্রণায় ছটফট করে উঠলেন তিনি। জহুরুল সাহেব তখন অফিসপাড়ায় সিন্ডিকেট পার্টনারশিপ সাইন করতে ব্যস্ত। নিজ ঘরে একাকী কোনোরূপ সাহায্য পেলেন না গুলবাহার খানম। কিছুক্ষণ আগেও স্বাভাবিক ছিলেন তিনি। বুকের ভেতর এখন অস্বস্তি। হাত বাড়িয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন বেড সাইড টেবিল। শ্বাস নিতে প্রচুর কষ্ট হচ্ছে। কপালে চিকচিক করছে ঘাম। দুর্বল গলায় ডেকে উঠলেন তিনি,

" কেউ আ ছো? "

কোনো উত্তর নেই। গৃহকর্মী দু'জন যে যার মতো কাজে ব্যস্ত। বড় বাড়িটা আজ কেমন জনমানবশূন্য। যন্ত্রনা কাতর কণ্ঠে অস্ফুট স্বরে আরেকবার ডাকলেন তিনি। এবারো কেউ এলো না। ধীরে ধীরে যন্ত্রনা বৃদ্ধি পাচ্ছে। বুকের ভেতর কেউ যেন খাবলে ধরেছে। একমাত্র ছেলের কথা ভেবে মাতৃমন হাউমাউ করে কেঁদে উঠলো। চোখের সামনে ভেসে উঠলো ছোট্ট ছেলের মুখখানা। আজ সকালে স্কুলে যাওয়ার আগে কতশত আবদার করছিল ছেলেটা। বাড়ি ফিরে মায়ের সঙ্গে খেলবে বলেছিল। ছেলের কপালে চুমু এঁকে বলেছিলেন তিনি,

" আমার সোনা বাবা। আজ গুড বয় হয়ে ফিরবে। ঠিক আছে? "

" তিক আচে। "

ছেলের মায়াবী সেই হাসি বুকের মাঝে ছু'রি বিদ্ধ হচ্ছে যেন।

" রা য় হা ন! "

ফিসফিসিয়ে ছেলেকে ডেকে উঠলেন তিনি। চোখ বেয়ে পড়লো কষ্টদায়ক অশ্রু। ঠাস করে লুটিয়ে পড়লেন মেঝেতে। তিনি ম'রতে চান না। এত তাড়াতাড়ি ম'রতে চান না। ও আল্লাহ্! আল্লাহ্! চার বছরের বাচ্চা ছেলেটাকে একা ফেলে উনি চলে যেতে পারবেন না। ও আল্লাহ্ গো! মাফ করো। আমাকে বাঁচাও আল্লাহ্! কম্পিত হাতে মেঝে আঁকড়ে ধরতে চাইলেন তিনি। হাতের নখ ছটফটে নকশা এঁকে চলেছে মেঝেতে। যেন সাহায্যের হাতছানি। আরেকটু এগোলেই বোধহয় কারো সাহায্য মিলবে। কিন্তু আফশোস! সে-ই দূরত্ব আর পেরোনো হলো না। ঘরজুড়ে শুধু ওনার কষ্টভরা নিশ্বাসের শব্দ। সময় শেষ। আর হলো না। আকুতিমিনতি জানালো মন,

' আমাকে মাফ করে দিয়ো সোনা। '

এলোমেলো স্বরে ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দহীন কালেমা বিড়বিড় করতে লাগলেন। বি'ষযন্ত্রনা, অকথ্য কষ্ট। চরম অসহায়ত্বে ছটফট করতে করতে একসময় মৃ'ত্যুর কোলে ঢলে পড়লেন গুলবাহার খানম।

খবর পাওয়া মাত্রই ঝড়ের বেগে বাড়িতে ছুটে এলেন জহুরুল সাহেব। শুরু হলো অবিশ্বাস্য অভিনয়! সে কি ভয়াবহ আর্তনাদ ওনার! এক স্বামী, পিতার আর্তনাদে কাঁপলো যেন আকাশ, বাতাস। উপস্থিত সকলে উৎকণ্ঠায় পড়ে গেল। শোকে দুঃখে লোকটা পা'গল না হয়ে যায়। একজন আদর্শ স্বামী, শোকাতুর পিতার ভগ্নদশা দেখে কারো মনে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ রইলো না। ফ্যামিলি ডক্টর, মেডিক্যাল রিপোর্ট জানালো হার্ট অ্যাটাকে মৃ'ত্যু। ক্ষমতার জোরে চাপা পড়লো প্রকৃত ঘটনা।

গুলবাহার খানমের মৃ'ত্যুতে সবচেয়ে বড় আঘাত পেল রায়হান। মাতৃ বিয়োগের তীব্র শোকে ছটফটে বাচ্চাটা কেমন শান্ত হয়ে গেল। মায়ের কবরের পাশে বসে তার অবুঝ কান্না। উপস্থিত মানুষগুলোর হৃদয় কেঁদে উঠলো। লতা বেগম ওকে সামলাতে ব্যর্থ। মা কোথায়? কোথায় চলে গিয়েছে মা? মা তো তাকে স্কুলে পাঠিয়েছিল আদর করে। কপালে চুমু দিয়ে ভদ্র বাচ্চা হয়ে থাকতে বলেছিল। সে তো কোনো দুষ্টুমি করেনি। কারো সাথে পঁচা করেনি। তাহলে মা কোথায়? দুঃখ পেয়ে কোথায় লুকিয়েছে? সামনে আসছে না কেন? ছোট্ট দুই হাতে ভেজা মাটি ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছে অবুঝ রায়হান। চোখ দু'টো কান্নায় ফুলে গিয়েছে। বারবার চারপাশে তাকাচ্ছে সে। হয়তো ভাবছে মা বুঝি কোথাও লুকিয়ে আছে। সরল গলায় ডেকে উঠলো বাচ্চাটা,

" মা! ও মা! তুমি কোতায়? "

কেউ উত্তর দিলো না। সে আবার ডাকলো। আরো জোরে,

" মা! তুমি কোতায়? আতো না। "

কিছুটা দূরত্বে কবরস্থানের বাইরে দাঁড়িয়ে ফুফু লতা বেগম। বুকের ভেতর হুহু করে চলেছে। বাচ্চা ছেলেটা কিচ্ছু বুঝতে পারছে না। সে তো কোনো দুষ্টুমি করেনি। গুড বয় হয়ে ছিল। তাহলে মা কোথায় গিয়েছে? কেন ফিরছে না? কবরের মাটি দু'হাতে আলতো চাপড়ে কেঁদে চলেছে রায়হান।

" মা! বাতায় চলো। আমি দুষ্তু করবো না। মা! তুমি কোতায়? "

শিশু বাচ্চার সে কি কান্না! দিন যায়, রাত যায়। অপেক্ষা আর ফুরোয়নি। রাতে ঘুম ভেঙে উঠেই সে কাঁদতে শুরু করতো।

" মা! মা! "

কখনো আধোঘুমে হাত বাড়িয়ে মায়ের বালিশ খুঁজতো। কখনো দরজার দিকে তাকিয়ে বসে থাকতো ঘণ্টার পর ঘণ্টা। হঠাৎ একদিন গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়লো চার বছরের রায়হান। তীব্র জ্বরে গা পুড়ে যাচ্ছে। মুখে কোনো খাবার রোচে না। রাত বাড়লে মায়ের খোঁজে কেঁদে ওঠে। ডাক্তার ওষুধ দিলেন। আত্মীয়রা সান্ত্বনা দিলেন। কিন্তু সবাই জানেন, এই অবুঝ শিশুর শারীরিক অসুখের চেয়েও বড় অসুখ তার ভাঙা মন। তার জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় 'মা' এক মুহূর্তেই হারিয়ে গেছে। সেদিন থেকেই জন্মদাতা পিতার নি'ষ্ঠুরতার প্রথম ব'লি হলো রায়হানের নিষ্পাপ সত্ত্বা। আশপাশের মানুষজন জহুরুল সাহেবকে পরামর্শ দিতে লাগলেন। দ্বিতীয় বিয়ে করার। রায়হানের একজন মায়ের বড় প্রয়োজন।

--

১৯৯৭ সাল। এপ্রিল মাস। গুলবাহার খানমের মৃ'ত্যুর ছয় মাস পাড় হতে না হতেই দ্বিতীয়বারের মতো বিয়ের পিঁড়িতে বসলেন জহুরুল সাহেব। নববধূ মিনারা বেগম। নিম্নবিত্ত পরিবারের সন্তান। সুখের আশায় বিপত্নীক, এক সন্তানের বাবার কাছে বিয়ে দিলো পরিবার। রায়হান তখন চার বছরের। পরের মাসে পঞ্চম জন্মদিন। মায়ের অভাব, মাতৃস্নেহের গভীরতা পুরোপুরি ঠাহর হয়নি এখনো। তন্মধ্যে বাবার দ্বিতীয় বিয়ে। নিমিষেই চেনা পৃথিবী ওলোটপালোট হয়ে গেল। বাড়িতে আগমন হলো এক নতুন সদস্যের। তার সৎ মা। মিনারা বেগম শুরু থেকেই আন্তরিক ছিলেন। সৎ ছেলেকে নিজের সন্তানের মতো আদর যত্ন করতে লাগলেন। এই সংসার হয়ে উঠলো ওনার একমাত্র পৃথিবী। স্বামী, সন্তান নিয়ে দিন এগোতে লাগলো। তবে হঠাৎ এই পরিবর্তন রায়হানের নরম মনে গভীর, অদৃশ্য নিরাপত্তাহীনতার জন্ম দিলো। যে চাদরে মায়ের সুবাস ছড়িয়ে, সেখানে আজ ঘুমাচ্ছে অন্য কেউ। মায়ের কাবার্ড, মায়ের শোবার ঘর, এমনকি বাবার পাশে বসার জায়গাটাও এক নিমেষে অন্য একজনের দখলে। অবুঝ মন যৌক্তিক হিসাব মেলাতে ব্যর্থ হলো। অবচেতন মনে এই ধারণা তীব্র হয়ে জেঁকে বসলো যে, এই মহিলা জোর করে তার মায়ের স্থান কেড়ে নিয়েছে।

--

১৯৯৮ সাল। আগস্ট মাস। জন্ম নিলো তানসীভ। জহুরুল সাহেবের সকল মনোযোগ ধীরে ধীরে ছোট ছেলের দিকে আবর্তিত হতে লাগলো। ছয় বছরের রায়হান দরজার এক কোণে দাঁড়িয়ে সবটা দেখতো। মন বলতো, এ বাড়িতে সে অনাকাঙ্ক্ষিত উপজাত। মন গহীনে পুষে রাখা নিরাপত্তাহীনতা ধীরে ধীরে গোপন ক্ষোভে পরিণত হলো। বড়দের প্রতি জন্ম নিলো মনস্তাত্ত্বিক ক্ষোভ। তীব্র অভিমান। অজান্তেই বি'শ্রী অনুভূতিগুলো ঝাড়তে শুরু করলো ছোট্ট, নিষ্পাপ তানসীভের ওপর।

তানসীভের বয়স তখন চার/পাঁচ। বড়দের জটিলতা বুঝতে অক্ষম। সম্পর্ক, হিংসা, অভিমান এসব শব্দের অর্থও জানে না সে। তার কাছে রায়হান একমাত্র বড় ভাইয়া। যাকে সে নায়ক মনে করে। ভাইয়া যেমন করে হাঁটে, সেও তেমন হাঁটার চেষ্টা করে। ভাইয়া যেমন করে কথা বলে, সেও তেমন কথা বলার চেষ্টা করে। ভাইয়ার মতো শার্ট পরতে চায়। ভাইয়ার মতো কলম ধরতে চায়। এমনকি ভাইয়া যে রঙের গাড়ি পছন্দ করে, সেও সেই রঙের খেলনা গাড়িই খুঁজে বেড়ায়। তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে ভালো মানুষ মা আর ভাইয়া। তার বড় ভাইয়া। যার সঙ্গে সে খেলতে ইচ্ছুক। যাকে সে অনুকরণ করতে ইচ্ছুক।

সেদিন বিকেলটা ছিল অন্য দিনের মতোই সাধারণ। ড্রয়িংরুমের বড় সোফায় বসে রায়হান হোমওয়ার্ক করছে। পাশে ছড়িয়ে রয়েছে রঙ পেন্সিল, খাতা। একটা ছোট্ট খেলনা গাড়ি। নিজের ঘর থেকে গুটিগুটি পায়ে বেরিয়ে এলো ছোট্ট তানসীভ। বুকের সঙ্গে জড়িয়ে রেখেছে তার সবচেয়ে প্রিয়, প্লাস্টিকের লাল বল। বলটা নিয়ে সে খুব একটা কাউকে খেলতে দেয় না। আজ নিজে থেকেই নিয়ে এসেছে। কারণ.. আজ সে ভাইয়ার সঙ্গে খেলবে। মুখে লাজুক হাসি। চোখে টলটলে উচ্ছ্বাস। ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো তানসীভ। বলটা বাড়িয়ে দিলো ভাইয়ার দিকে।

" ভাইয়া! ভাইয়া কেলবে? "

রায়হান মুখ তুলে তাকালো। তানসীভের মুখে একরাশ আশার আলো। সে আবারো সাহস সঞ্চয় করে বললো,

" চলো না.. লোফালুফি কেলি। আমি বল ধততে পারি.. দেকবে? "

কথাটা বলেই সে নিজের ছোট্ট দুই হাত দিয়ে বলটা একটু ওপরে ছুঁড়ে আবার ধরার চেষ্টা করলো। ধরতে না পেরে সরল মনে হেসে উঠলো। ভাবলো, ভাইয়াও হয়তো হাসবে। হয়তো বলবে,

' আয়, খেলি। '

কিন্তু রায়হানের ঠোঁটে অনুপস্থিত হাসি। বরং দৃশ্যমান বিরক্তি, ক্ষোভ। এক ঝটকায় বল ছিনিয়ে নিয়ে অনেক দূরে ছুঁড়ে মা'রলো রায়হান। বল গড়াতে গড়াতে সিঁড়ির শেষ ধাপে ধাক্কা খেয়ে থেমে গেল। রায়হান দাঁতে দাঁত চেপে বললো,

" দূর হও আমার সামনে থেকে। "

তানসীভ চমকে উঠলো! ভয়ে ফ্যাকাসে মুখ।

" সারাক্ষণ শুধু ঘ্যানঘ্যান করো। একদম আমার কাছে আসবে না। যাও.. তোমার মায়ের কাছে গিয়ে খেলো। "

চলবে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন