ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোর আমার প্রেম

৩য় পর্ব

লেখক: Sumaiya Akhter

**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম

**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার

**পর্ব – ৩**

কলেজের লাইব্রেরি কক্ষটা ছিল একদম শান্ত ও নীরব। কেবল জানালার বাইরে দিয়ে আসা হালকা হাওয়া আর বইয়ের পাতা উল্টানোর মৃদু শব্দ পাচ্ছিল আয়রিন।

আয়রিন একটা বড় কাঠের টেবিলের কোণে বসে অলস ভঙ্গিতে খাতার পাতা উল্টাচ্ছিল। হঠাৎই দরজার সামনে কারো গম্ভীর ও সুদৃঢ় পায়ের শব্দ হলো। আয়রিন মুখ তুলে তাকাতেই বুকের ভেতরটা যেন একমুহূর্তের জন্য থমকে গেল!

ভেতরে ঢুকছেন **নিলয় চৌধুরী**।

পরনে কালচে ছাই রঙের নিখুঁত শার্ট, চোখে চশমা। উনার প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরনের সুজাত রাজকীয়তা আর অসম্ভব গাম্ভীর্য। কিন্তু নিলয়ের তীক্ষ্ণ চোখ দুটো যখনই লাইব্রেরির কোণে বসে থাকা চঞ্চল আয়রিনের ওপর পড়ল, সেই কঠিন চোখে নিমেষেই এক অদ্ভুত মায়াবী আলো ফুটে উঠল।

নিলয় শান্ত পায়ে হেঁটে আয়রিনের টেবিলের কাছে থাকা একটা বইয়ের শেলফের সামনে এসে দাঁড়াল। হাতে একটা বই নিয়ে পাতা উল্টানোর ভান করলেও, উনার সমস্ত ধ্যান-জ্ঞান আর নজর ছিল আয়রিনের দিকে।

আয়রিন গালে হাত দিয়ে কখনো কলমের পেছনের অংশ কামড়াচ্ছিল, কখনো বা আনমনে চুলে আঙুল পেঁচাচ্ছিল। নিলয় আড়াল থেকে এই অবুঝ রূপটা দেখছিল আর মনে মনে এক গভীর অনুভূতির সাগরে ডুব দিচ্ছিল—

*— "আমার এই বরফশীতল ও নীরব জীবনে তোমার এই চঞ্চলতাটুকু যে কতটা আলো ছড়িয়ে দেয়, তা যদি তুমি জানতে সুহাসিনী...। পৃথিবীর সবার জন্য আমি রাগী ও গম্ভীর শিক্ষক হলেও, আমার এই শক্ত মনটা যে কেবল তোমার এক চিলতে হাসির কাছেই হার মানে।"*

ঠিক তখনই পা টিপে টিপে আয়রিনের পাশে এসে বসল **তাসনিম**।

নিলয়কে দেখেই তাসনিমের দুচোখে একরাশ স্বপ্নিল মুগ্ধতা ছড়িয়ে পড়ল! সে আয়রিনের হাতটা কষে চেপে ধরে লাজুক চোখে ফিসফিস করে বলল,

— "আয়রিন! একটু আড়চোখে দেখ না... নিলয় স্যার লাইব্রেরিতে এসেছেন! মাই গড, মানুষটাকে এত দূর থেকেও কত আকর্ষণীয় লাগছে বল তো?"

আয়রিন হালকা মুখ বেঁকিয়ে একবার নিলয়ের দিকে তাকাল। নিলয় তখন খুব ধীরেসুস্থে চশমাটা নাকের ওপর ঠিক করে একটা ডায়েরিতে কিছু নোট করছিল।

আয়রিন বিড়বিড় করে জবাব দিল,

— "তুই এই গম্ভীর স্যারের মধ্যে এত কী দেখিস বল তো? সারাদিন মুখে একটা গোমড়া ভাব ঝুলিয়ে রাখেন! মনে হয় হাসতেই ভুলে গেছেন।"

তাসনিম গালে হাত দিয়ে একদম বিভোর হয়ে বলল,

— "গম্ভীর বলেই তো উনার ব্যক্তিত্ব এত আলাদা রে গাধা! উনার ওই ডিপ গলার গলার আওয়াজ শুনলেই আমার বুকের ভেতর কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যায়। সত্যি বলছি আয়রিন, আমি না নিলয় স্যারের ওপর একদম মারাত্মক ক্রাশ খেয়েছি!"

তাসনিমের এই অবুঝ কথাগুলো আড়াল থেকে নিলয়ের কানে পৌঁছালেও, সে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না। কিন্তু মুখাবয়বে সেই চিরাচরিত বরফশীতল ভাব বজায় রেখে সে বইটা বন্ধ করল।

টেবিলের পাশ দিয়ে ধীর পায়ে হেঁটে যাওয়ার সময় নিলয় আয়রিনের দিকে একবার চোখ তুলে তাকাল—সেই শান্ত অথচ গভীর চাহনিতে কেমন যেন এক অজানা অধিকারবোধ লুকানো ছিল, যা তাসনিম না বুঝলেও আয়রিনের বুকের ভেতরে অচেনা এক শিহরণ জাগিয়ে তুলল।

বিকেল বেলা—

**সিকদার ভিলা**

কলেজ থেকে ফিরে আয়রিন গা ধুয়ে বারান্দায় এসে দাঁড়িয়েছিল। হঠাৎই নিচে একটা পরিচিত কালো গাড়ি এসে থামতেই আয়রিনের মুখে মিষ্টি একটা হাসি ফুটে উঠল। গাড়ি থেকে নামল **রুদ্র মির্জা**।

কালো শার্টে রুদ্রকে বরাবরের মতোই অত্যন্ত রুচিশীল দেখাচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই রুদ্রর এই শান্ত গাম্ভীর্য, উনার যত্ন নেওয়ার ভঙ্গি আয়রিনের খুব পছন্দ। আয়রিনের ছোট চঞ্চল মনটা মনে মনে বিশ্বাস করে—উনার জীবনের আসল রাজপুত্র হয়তো এই রুদ্র ভাইয়াই!

রুদ্র ঘরে ঢুকতেই আয়রিন ট্রেতে করে ধোঁয়া ওঠা এক কাপ কফি আর কিছু স্ন্যাক্স নিয়ে লাজুক মুখে এসে দাঁড়াল।

— "রুদ্র ভাইয়া, তোমার জন্য কফি।"

রুদ্র কফির কাপটা হাতে নিয়ে ভীষণ মিষ্টি একটা হাসি দিল।

— "থ্যাংক ইউ, আয়রিন। কেমন চলছে তোমার পড়াশোনা?"

রুদ্রর মুখে নিজের নাম শুনেই আয়রিনের চঞ্চল মনটা আনন্দে একদম নাচতে শুরু করল। সে সোফায় বসে উৎফুল্ল গলায় বলল,

— "খুব ভালো রুদ্র ভাইয়া! তবে আমাদের কলেজে একজন নতুন স্যার এসেছেন, বাব্বা এত গম্ভীর! তোমার মতো সুইট একদমই না!"

রুদ্র হালকা হেসে অত্যন্ত আদুরে ভঙ্গিতে আয়রিনের মাথায় একটা টোকা দিল।

— "শিক্ষকরা একটু গম্ভীর না হলে কি আর তোমাদের মতো দুষ্টু স্টুডেন্টদের সামলাতে পারবেন? মন দিয়ে পড়াশোনা করো।"

রুদ্রর এই সহজ ভালোবাসা ও যত্নটুকু আয়রিনের ভেতরের ভালোলাগাকে আরও কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিল। সে মুগ্ধ দৃষ্টিতে রুদ্রর দিকে তাকিয়ে রইল।

অন্যদিকে চৌধুরী ভিলার নিস্তব্ধ ঘরে বসে নিলয় চৌধুরী নিজের পড়ার টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা ডায়েরি বের করল। ডায়েরির পাতায় যত্ন করে রাখা আছে আয়রিনের একটি ছোটবেলার চঞ্চল ছবি।

নিলয় চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রাখল। ছবিটার দিকে তাকিয়ে উনার গভীর ও গম্ভীর চোখ দুটো নরম আবেগে ভিজে এল। বেশ নিচু স্বরে মনে মনে বলল—

*— "তোমার এই চঞ্চল মন হয়তো এখন অন্য কোথাও হারিয়ে আছে সুহাসিনী... কিন্তু তোমার এই পথচলার প্রতিটি পদক্ষেপে অদৃশ্য এক ছায়া হয়ে আমি পাহারায় আছি। একদিন এই গম্ভীর মানুষটার গম্ভীর ভালোবাসাই তোমার অনুভূতির একমাত্র পরিণতি হবে।"*

**(চলবে...)**

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন