**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ৫**
সকালের সোনালী রোদ এসে পড়েছে চৌধুরী ভিলার সুবিশাল ও মার্জিত ড্রয়িংরুমে। শহরের অন্যতম স্বনামধন্য ও ঐতিহ্যবাহী পরিবার হলো এই চৌধুরী পরিবার।
পরিবারের প্রধান **জাহাঙ্গীর চৌধুরী**—অত্যন্ত নীতিবান, গম্ভীর ও সফল একজন ব্যবসায়ী। বিজনেস জগতের সবাই উনাকে এক নামে এক বাক্যে সম্মান করে। উনার সহধর্মিণী **মাহনুর চৌধুরী**—সংসার আর সন্তানদের পরম মমতায় আগলে রাখা এক মার্জিত নারী।
চৌধুরী পরিবারের বড় ছেলে **নিলয় চৌধুরী**। বাবার মতোই শান্ত, অসম্ভব গম্ভীর আর এক প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারী। ছোটবেলা থেকেই সে অত্যন্ত মেধাবী ও আত্মমর্যাদাশীল। আর পরিবারের সবচেয়ে ছোট সন্তান নিলয়ের একমাত্র বোন **নাবিলা চৌধুরী**। এবার ইন্টারমিডিয়েট দ্বিতীয় বর্ষে পড়ে। নিলয়ের একদম বিপরীত—ভীষণ চঞ্চল, মুখরা আর পুরো চৌধুরী ভিলার সবার চোখের মণি।
ডাইনিং টেবিলে সবাই একসাথে প্রাতরাশ করতে বসেছে।
জাহাঙ্গীর চৌধুরী চশমাটা নাকের ওপর একটু তুলে নিলয়ের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বললেন,
— "নিলয়, বিজনেসের গুরুত্বপূর্ণ প্রজেক্টগুলো তো তুমি ভালোভাবেই সামলাচ্ছ। কিন্তু হঠাৎ করে কলেজে পার্ট-টাইম টিচিং নেওয়ার সিদ্ধান্তটা কেন নিলে? বিজনেসে পুরো সময় দিলে কি ভালো হতো না?"
নিলয় কফির কাপে এক চুমুক দিয়ে অত্যন্ত শান্ত ও নিচু স্বরে বলল,
— "ড্যাড, বিজনেসের কাজে কোনো প্রভাব পড়ছে না। আর কলেজে যোগ দেওয়ার পেছনে আমার নিজস্ব কিছু কারণ আছে... সেখানকার একটা নির্দিষ্ট দায়িত্ব শেষ করতেই আমার যাওয়া।"
মাহনুর বেগম ছেলের দিকে তাকিয়ে লাজুক ও মমতাময় হেসে বললেন,
— "ছেলের ওপর আমার ভরসা আছে, জাহাঙ্গীর। ও যা করে চিন্তাভাবনা করেই করে। তবে নিলয়, বয়স তো কম হলো না... এবার কিন্তু তোকে নিয়ে একটা ভালো ঘরের মেয়ে দেখে সংসারি করার ইচ্ছা আমার।"
কথাটা শুনে নিলয়ের ঠোঁটের কোণে খুব সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তার কঠোর গাম্ভীর্যের আড়ালে যে চঞ্চল চেহারাটা ভেসে উঠল, তা তো আর পরিবারের কাউকে এখন বলা যাচ্ছে না!
ঠিক তখনই প্লেট থেকে টোস্ট বিস্কুট কামড়ে ধরে নাবিলা বাবাকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,
— "ড্যাড, তুমি ভাইয়াকে যাই বলো না কেন, আমার মনে হয় ভাইয়ার কলেজের স্টুডেন্টরা উনাকে দেখলেই ভয়ে আধমরা হয়ে যায়! ক্লাসেও কি তুমি এমন গম্ভীর গোমড়ামুখো হয়ে থাকো, ভাইয়া?"
নিলয় বোনের দিকে নিজের সুতীক্ষ্ণ চোখ দুটো তুলে এক পলক তাকাল।
— "নাবিলা, নিজের পড়ার টেবিলে মনোযোগ দাও। বড়দের কথায় ফালতু মন্তব্য করা বন্ধ করো।"
নাবিলা জিভ বের করে বাবার পেছনে লুকানোর ভান করল।
নিলয় হাত ঘড়ির দিকে তাকিয়ে উঠে দাঁড়াল। স্যুটটা গায়ে জড়িয়ে শান্ত কণ্ঠে বলল,
— "আমি আসছি, ড্যাড। কলেজে ক্লাস আছে।"
চৌধুরী ভিলা থেকে বেরিয়ে গাড়িতে ওঠার সময় নিলয়ের মনে উঁকি দিল সিকদার বাড়ির সেই চঞ্চল মেয়েটির মুখ—আয়রিন সিকদার।
নিলয় জানে, তার জীবনে এই গম্ভীর আভিজাত্যের পাশাপাশি এখন কেবল একজন চঞ্চল সুহাসিনীরই প্রয়োজন, যে একদিন এসে এই শান্ত চৌধুরী ভিলার পুরো রূপটাই বদলে দেবে...।
**(চলবে...)**