**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ৬**
সিকদার ভিলার সাজানো বারান্দায় তখন মিষ্টি বিকেল নামছিল। বারান্দার দোলনায় বসে আয়রিন নিজের ফোনের স্ক্রিনের দিকে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। স্ক্রিনে ভেসে থাকা ছবিটা **রুদ্রর**।
রুদ্রর এই শান্ত ও ব্যক্তিত্বময় রূপটাই ছোটবেলা থেকে আয়রিনের ছোট মনটাকে এক অজানা মায়ায় বাঁধতে শুরু করেছিল। ছবিটার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই আয়রিনের ঠোঁটের কোণে খুব মিষ্টি ও লাজুক এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই ফোনের তীব্র কম্পনে আয়রিনের ভাবনায় ছেদ পড়ল। স্ক্রিনে ‘তাসনিম’ নামটা উঠতেই আয়রিন হাসিমুখে রিসিভ করল,
— "হ্যাঁ রে তাসু, বল?"
ওপাশ থেকে তাসনিমের উচ্ছ্বাসে ভরা কণ্ঠ ভেসে এল,
— "আয়রিন! তুই বিশ্বাস করবি না, কাল সারা রাত আমি চোখের পাতা এক করতে পারিনি রে! প্রতিটা মুহূর্তে শুধু নিলয় স্যারের ওই নিবিড় চোখ দুটো আর গম্ভীর গলার আওয়াজটা আমার মাথায় ঘুরছিল। একটা মানুষ কীভাবে এতটা নিখুঁত হতে পারে বল তো? আমি তো উনার প্রেমে একেবারেই হাবুডুবু খাচ্ছি!"
আয়রিন হেসে কপালে হাত দিয়ে বলল,
— "তুই সত্যি আর শুধরাবি না তাসু! উনি আমাদের শিক্ষক, তার ওপর ওরকম গম্ভীর একটা লোক। তুই উনার মধ্যে এত কী জাদু দেখিস, আমি সত্যিই বুঝি না।"
— "প্রেম কি আর বয়স বা মেজাজ দেখে হয় রে গাধা? উনার ওই শান্ত গাম্ভীর্যের ভেতরেই তো আসল আকর্ষণ! দেখিস না স্যার কীভাবে চশমাটা ঠিক করেন? কীভাবে হাঁটেন? উফ, আমার তো মনটাই চুরি হয়ে গেছে!" তাসনিম যেন ভালোবাসার স্বপ্নের ঘোরে কথা বলছিল।
আয়রিন বারান্দার রেলিংয়ে ভর দিয়ে একটা নরম দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
— "তোর ওই বরফশীতল স্যারকে তোর কাছেই রাখ। আমার কাছে তো আমার রুদ্র ভাইয়াই সেরা! উনি অন্তত উনার মতো অহেতুক বরফ জমে থাকেন না!"
তাসনিম মিষ্টি হেসে বলল,
— "ঠিক আছে, তোর রুদ্র ভাইয়াকে নিয়ে তুই থাক, আর আমার নিলয় স্যারকে নিয়ে আমি থাকি! চল, এখন রাখি, কাল কলেজে কথা হবে।"
ফোনটা রেখে আয়রিন আবার বারান্দার দূর সীমানায় চোখ রাখল। তার অনুভূতির আকাশজুড়ে তখন শুধুই রুদ্রকে ঘিরে নতুন নতুন স্বপ্ন বোনা চলছে।
অন্যদিকে, চৌধুরী ভিলার বিশাল পড়ার ঘরটিতে আবছা আলো জ্বলছিল।
নিস্তব্ধ ঘরজুড়ে কফির মৃদু সুবাস। রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছেন **নিলয় চৌধুরী**। উনার দুচোখ বোজা, আর শক্ত হাতের আঙুলের ফাঁকে যত্ন করে ধরা একটি ব্যক্তিগত ডায়েরি।
ডায়েরির একটি নির্দিষ্ট পাতা খোলা, যেখানে আয়রিনের একটা চঞ্চল ও হাসোজ্জ্বল ছবি পরম ভালোবাসায় আগলে রাখা আছে।
নিলয় আস্তে আস্তে চোখ খুললেন। উনার সেই কঠিন, বরফশীতল চোখের ভেতরে এক নিমেষে ফুটে উঠল অতল গভীর এক তৃষ্ণা আর অগাধ ভালোবাসা। চশমাটা খুলে টেবিলের ওপর রেখে নিলয় ছবিটির ওপর নিজের তর্জনীটা স্পর্শ করলেন।
খুব নিচু, গভীর অথচ শান্ত এক মায়াবী স্বরে নিজেকেই যেন বললেন—
— "তোমার চঞ্চল চোখে অন্য কারো জন্য অনুরাগের আলো দেখাটা আমার জন্য কতটা যন্ত্রণাদায়ক, তা তুমি কোনোদিন টের পাবে না সুহাসিনী... তুমি ভাবো আমি খুব শক্ত, খুব কঠিন? কিন্তু এই কঠিন দেয়ালের আড়ালে যে কেবল তোমার জন্য এক পৃথিবী ভালোবাসা লুকিয়ে আছে, তা কি তুমি কখনো বুঝবে?"
নিলয় জানালার কাঁচের দিকে তাকালেন। বাইরের রাতের আঁধারের চেয়েও উনার ভেতরের অনুভূতিটা ছিল বহুগুণ তীব্র ও গভীর।
উনার ঠোঁটের কোণে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত প্রতিজ্ঞার হাসি—
— "তোমাকে অন্য কারো হতে দেওয়ার জন্য তো এত দূরে যাইনি, আর ফিরেও আসিনি। আজ তোমার এই অবুঝ মন অন্য কোথাও পথ হারালেও, দিনশেষে এই মনটার একমাত্র ঠিকানা হতে বাধ্য করবে এই নিলয় চৌধুরীই... খুব শিগগিরই।"
**(চলবে...)**