**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ৭**
সকালের মায়াবী রোদে সিকদার ভিলার পরিবেশটা আজ বেশ চঞ্চল ও আনন্দমুখর।
ড্রয়িংরুমে সোফায় বসে ল্যাপটপে মেইল চেক করছিল আরিয়ান। ঠিক তখনই নিধি তার কলেজ ড্রেস পরে দৌড়ে এসে আরিয়ানের পাশে ধপাস করে বসে পড়ল। আরিয়ানের হাতের কফির কাপটা একটুর জন্য পড়ে যাচ্ছিল!
আরিয়ান ভ্রূ কুঁচকে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বলল,
— "তুই কি মানুষ নিধি, নাকি বনমানুষের বাচ্চা? এভাবে লাফিয়ে এসে কেউ বসে? আমার গরম কফিটা তো তোর মুখে পড়ত!"
নিধি একদম কায়দা করে আরিয়ানের গলা জড়িয়ে ধরে আদুরে গলায় বলল,
— "পড়লে পড়ত! আমার মিষ্টি ভাইয়া থাকতে আমার কিচ্ছু হবে না। আচ্ছা ভাইয়া, শুনো না... আজকে না আমাদের কলেজে পকেট মানি শর্ট পড়ে গেছে। একটু সাহায্য করো না প্লিজ?"
আরিয়ান ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে নিধির দিকে চোখ ছোট ছোট করে তাকাল।
— "পকেট মানি শর্ট? গত পরশুই তো তোকে দুই হাজার টাকা দিলাম! ওগুলো কোথায় গেল?"
ঠিক এই সময়ে চুল বাঁধতে বাঁধতে ঘর থেকে বের হলো আয়রিন। নিধির কথা শুনে সে চট করে এসে নিধির কানটা চেপে ধরে বলল,
— "কোথায় গেছে জানিস আরিয়ান ভাইয়া? ও ওর বন্ধুদের নিয়ে রেস্টুরেন্টে গিয়ে ফালতু ট্রিট দিয়ে সব শেষ করেছে! একদম এক টাকাও দেবে না ভাইয়া ওকে!"
— "আহ্! ছাড় আমার কান, রাক্ষসী আপু!" নিধি চিৎকার করে উঠল। তারপর আরিয়ানের পেছনে লুকিয়ে মুখ ফুলিয়ে বলল,
— "ভাইয়া দেখো! ও সবসময় আমাকে হিংসে করে। তুমি আমাকে টাকা না দিলে আমি কিন্তু আম্মুকে গিয়ে বলব তুমি কাল রাতে অনেক রাত পর্যন্ত কার সাথে যেন হেসে হেসে ফোনে কথা বলছিলে!"
আরিয়ান সাথে সাথে থমকে গেল! চট করে নিধির মুখটা চেপে ধরে অপরাধীর মতো এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
— "চুপ! একদম চুপ! তুই সত্যি একটা ব্ল্যাকমেইলারের হাড্ডি!"
আরিয়ান ওয়ালেট বের করে দ্রুত দুটো এক হাজার টাকার নোট নিধির হাতে গুঁজে দিয়ে বলল,
— "নে! এখন মুখ বন্ধ রাখবি আর জলদি কলেজে যাবি।"
নিধি টাকাটা হাতে পেয়ে জয়ের হাসিতে জিব বের করে আয়রিনকে দেখাল। আয়রিন রাগ দেখিয়ে আরিয়ানের বাহুতে একটা চিমটি কেটে বলল,
— "ভাইয়া! তুমি ওকেই বেশি ভালোবাসো, তাই না? আমাকে একদম ভালোবাসো না!"
আরিয়ান হেসে ফেলে দুই বোনকে একসাথে জড়িয়ে ধরে দুজনের কপালে দুটো চুমু দিল।
— "তোরা দুজনই আমার কলিজার টুকরো। তোদের এই দুষ্টুমিগুলো না থাকলে তো বাড়িটাই শ্মশান হয়ে যেত রে গাধী দুটো! চল, এবার তোদের দুজনকে কলেজে নামিয়ে দিয়ে আসি।"
তিন ভাই-বোনের এই মিষ্টি খুনসুটি আর হাসির আওয়াজে সিকদার ভিলার সকালটা যেন এক অন্যরকম ভালোবাসায় ভরে উঠল।
অন্যদিকে, **তালুকদার ভিলা** (তাসনিমদের বাড়ি)—
বাড়িতে সকাল থেকেই এক উৎসবমুখর আয়োজন চলছে। রান্নাঘর থেকে সুস্বাদু খাবারের সুবাস ভেসে আসছে। তাসনিমের আম্মু **হুমায়রা তালুকদার** একের পর এক ডিশ ডাইনিং টেবিলে সাজাচ্ছেন।
তাসনিম হালকা গোলাপি রঙের কামিজ পরে ডাইনিং টেবিলে এসে দাঁড়িয়ে একটা মিষ্টি তুলে মুখে দিতেই হুমায়রা বেগম হাতটা নামিয়ে দিয়ে বললেন,
— "অ্যাই তাসু! ছুঁবি না একদম! তোর বড় ভাই নেহাল আসছে আজ জাপান থেকে, জানিস তো? ছয় বছর পর ছেলেটা বাড়ি ফিরছে। সব খাবার ওর টেবিলে বসার পর সার্ভ করা হবে।"
তাসনিম গাল ফুলিয়ে বলল,
— "উফ আম্মু! নেহাল ভাইয়া আসছে তো কী হয়েছে? আমি কি ওর বোন নই? আমাকে একটা মিষ্টিও খেতে দেবে না?"
ঠিক তখনই দরজায় সুটকেসের চাকার শব্দ আর এক গমগমে পুরুষালী আওয়াজ ভেসে এল,
— "আমার ছোট বোনটাকে কে মিষ্টি খেতে দিচ্ছে না, দেখি তো?"
সবাই চমকে দরজার দিকে তাকাল। লম্বাচওড়া, সুদর্শন এবং মার্জিত চেহারার **নেহাল তালুকদার** ট্রলি ব্যাগ হাতে হাসিমুখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে! পরনে ক্যাজুয়াল জ্যাকেট আর চোখে সানগ্লাস।
— "নেহাল ভাইয়া!"
তাসনিম আনন্দে চিৎকার করে দৌড়ে গিয়ে ভাইকে জড়িয়ে ধরল। নেহাল বোনকে কোলে তুলে ঘুরিয়ে হেসে বলল,
— "আমার চঞ্চল বোনটা এত বড় হয়ে গেল কবে? এখন তো পুরো লেডি ডক্টর বা অফিসার টাইপ লুক চলে এসেছে তোর!"
হুমায়রা তালুকদার চোখ ভরা আনন্দের জল নিয়ে এগিয়ে এসে ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন। নেহাল মায়ের কপালে চুমু দিয়ে বলল,
— "আম্মু, তোমার হাতের রান্নার সুবাসে পুরো জাপান থেকে আসার সময় মনটা ছটফট করছিল! খুব মিস করেছি তোমাদের।"
পুরো তালুকদার ভিলায় নেহালের ফেরাকে কেন্দ্র করে খুশির বন্যা বয়ে গেল। নেহাল সোফায় বসে বোনকে হাত দিয়ে টেনে পাশের সোফায় বসিয়ে বলল,
— "তা বল তো ছোট বোন, তোর পড়াশোনা কেমন চলছে? আর তোর সেই বেস্ট ফ্রেন্ড আয়রিন কেমন আছে? কলেজে কোনো নতুন হিরো-টিরো এলো নাকি?"
'হিরো' শব্দটা শুনতেই তাসনিমের মনে চট করে ভেসে উঠল স্যার **নিলয় চৌধুরীর** সেই তীক্ষ্ণ সুদর্শন অবয়ব আর গম্ভীর কণ্ঠস্বর! তাসনিমের মুখে নিমেষেই এক রাশ লাজুক রক্তিম আভা ছড়িয়ে পড়ল। সে চোখ নামিয়ে মৃদু হেসে বলল,
— "পড়াশোনা খুব ভালো চলছে ভাইয়া... আর কলেজে? একজন খুব স্পেশাল মানুষ এসেছেন..."
নেহাল বোনের মুখের এই লাজুক ভাব দেখে ভ্রূ নাচিয়ে হেসে উঠল,
— "ওহো! তার মানে আমার পিচ্চি বোনটার মনেও কোনো রাজপুত্রের আগমন ঘটেছে! কে সে, শুনি?"
তাসনিম লাজুক মুখে মাথা নিচু করে রইল। ভাইয়ের এই দেশে ফেরা আর নিজের বুকের গহীনে লুকিয়ে থাকা নিলয় স্যারের প্রতি ভালোলাগা—সব মিলিয়ে তাসনিমের মনটা এক অদ্ভুত ভালোলাগায় আচ্ছন্ন হয়ে রইল।
ঘণ্টাখানেক পর—
**কলেজের লাইব্রেরি**
বাড়ির আনন্দঘন পরিবেশ পার করে কলেজে এসে তাসনিম আয়রিনের সাথে দেখা করল। তবে তাসনিমের মন তখনও ডানা মেলছিল নিলয় স্যারের আশপাশে।
লাইব্রেরির ছায়াবৃত নিরিবিলি কোণটিতে বসে ছিল আয়রিন। তার সামনে সাজানো মোটারকমের কয়েকটি টেক্সট বই, তবে মনোযোগ সেখানে একদমই নেই। আয়রিন বইয়ের মার্জিনে ছোট ছোট ফুল আঁকছিল আর মনে মনে ভাবছিল রুদ্রর সেই মিষ্টি গম্ভীর মুখটার কথা।
হঠাৎ টেবিলের ওপর একটা সুদৃঢ় ছায়া পড়তেই আয়রিনের হাত থমকে গেল। মুখ তুলে তাকাতেই বুকের ভেতরটা যেন মুহূর্তের জন্য ধক করে উঠল!
সোজা সামনে দাঁড়িয়ে আছেন **নিলয় চৌধুরী**।
আজ উনার পরনে গাঢ় জলপাই রঙের শার্ট, নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা। চোখে চশমা আর চোখেমুখে সেই চিরচেনা রাশভারী আভিজাত্য। নিলয় কোনো কথা না বলে আয়রিনের উল্টো পাশের চেয়ারটা টেনে নিঃশব্দে বসলেন।
আয়রিন চট করে সোজা হয়ে বসল। কপালে সামান্য ঘাম জমে উঠল ওর।
— "গ... গুড মর্নিং, স্যার।"
নিলয় চশমাটা একটু ঠিক করে অত্যন্ত নিচু, শান্ত কিন্তু গভীর ও থমথমে গলায় বললেন,
— "ক্লাসে মনোযোগ যতটা কম থাকে, লাইব্রেরিতে এসেও দেখছি মনোযোগের পরিমাণ ঠিক ততটাই শূন্য, মিস সিকদার।"
আয়রিন আমতা আমতা করে খাতাটা ঢেকে ফেলার চেষ্টা করে বলল,
— "না স্যার... মানে, আমি পড়ছিলাম।"
নিলয় আয়রিনের টেবিলের ওপর হাত দুটো রেখে একটু সামনের দিকে ঝুঁকলেন। উনার গভীর সুতীক্ষ্ণ চোখ দুটো আয়রিনের চোখের ওপর স্থির হলো। নিলয়ের এই আচমকা কাছে আসায় আয়রিনের হৃদস্পন্দন যেন এক লাফ দিয়ে দ্বিগুণ হয়ে গেল!
নিলয় বরফশীতল কিন্তু অদ্ভুত এক মিষ্টি ও গম্ভীর টোনে বললেন,
— "যে পড়া খাতায় নয়, অন্য কারো ভাবনায় আঁকা থাকে... তা দিয়ে পরীক্ষা পার হওয়া যায় না, সুহাসিনী।"
'সুহাসিনী' নামটা নিলয়ের মুখে শুনেই আয়রিন চকিত ও বড় বড় চোখে উনার দিকে তাকাল! আজ পর্যন্ত কেউ তাকে এই নামে ডাকেনি, আর নিলয় স্যার কীভাবে উনাকে এই নামে ডাকলেন?
আয়রিন বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে কিছু বলার আগেই নিলয় নিজের ভাবলেশহীন শান্ত মুখাবয়বে ফিরে গেলেন। ফাইলটা হাতে নিয়ে চেয়ার ছেড়ে দাঁড়ালেন। যাওয়ার আগে আয়রিনের দিকে এক নজর তাকিয়ে নিচু কণ্ঠে বললেন,
— "পড়াশোনায় মন দাও। চিন্তার মায়াজগতটাকে একটু বাস্তবে ফিরিয়ে আনা শিখো।"
নিলয় ধীর পায়ে হেঁটে লাইব্রেরি থেকে বেরিয়ে গেলেন। আয়রিন কেবল বুকের ভেতর হাত রেখে ধুকপুক শব্দটা সামলানোর চেষ্টা করল। উনার শেষ কথাটার গভীরতা আর সেই নামটা ডাকবার ভঙ্গি কেন যেন আয়রিনের মাথায় বার বার ঘোরের মতো ঘুরপাক খেতে লাগল।
লাইব্রেরি থেকে বের হতেই করিডোরে তাসনিমের সাথে দেখা। তাসনিম আয়রিনের হাত ধরে টেনে একপাশে নিয়ে গেল। উছলে পড়া লাজুক হেসে ফিসফিস করে বলল,
— "আয়রিন! আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি রে! আর নেহাল ভাইয়াও আজ জাপান থেকে ফিরেছে, মনটা খুব হালকা লাগছে।"
আয়রিন অবাক হয়ে বলল,
— "কিসের সিদ্ধান্ত?"
— "আমি নিলয় স্যারকে আজ নিজের মনের কথাটা বলে দেব! আর লুকিয়ে রাখতে পারছি না রে। স্যার যত গম্ভীরই হোক, আমি আজ উনাকে বলবই যে আমি উনাকে কত ভালোবাসি!" তাসনিম ব্যাকুল চোখে বলল।
আয়রিনের বুকটা অজানা এক আশঙ্কায় ছাঁৎ করে উঠল। সে তাসনিমের হাত চেপে ধরে বলল,
— "তুই কি পাগল হয়েছিস তাসু? উনি আমাদের শিক্ষক! আর উনার যা মেজাজ, তোকে ডিরেক্ট ক্লাস থেকে বের করে দেবেন না তো?"
— "দিলে দিক! কিন্তু আমার ভেতরের এই ভালোলাগাটা তো উনি জানুন!" তাসনিম একপ্রকার একগুয়েমি করেই নিলয়ের কেবিনের দিকে পা বাড়াল।
আয়রিন দূর থেকে চিন্তিত ও শঙ্কিত চোখে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে রইল।
নিলয়ের কেবিনের বন্ধ দরজায় নক করে তাসনিম ভেতরে ঢুকল। নিলয় তখন নিজের টেবিলে বসে কিছু গুরুত্বপূর্ণ পেপার সাইন করছিলেন। চশমার ওপর দিয়ে তাসনিমের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শান্ত কিন্তু কঠোর গলায় বললেন,
— "ইয়েস? কোনো দরকার?"
তাসনিম বুক ভরে একটা বড় শ্বাস নিয়ে কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
— "স্যার... আমি আপনাকে একটা কথা বলতে চাই। আমি প্রথম দিন থেকেই... আপনাকে খুব পছন্দ করি স্যার! আপনাকে ছাড়া আমি অন্য কিছু ভাবতে পারি না..."
নিলয় তাসনিমের কথা শেষ হতে দিলেন না। তিনি হাতের দামি কলমটা ধীরে করে ডেস্কে রাখলেন। উনার মুখমণ্ডলে কোনো রাগ প্রকাশ পেল না, কিন্তু পুরো কেবিনে এক ধরনের বরফশীতল ও শ্বাসরুদ্ধকর নীরবতা নেমে এলো।
নিলয় ধীর, সুদৃঢ় ও বরফশীতল কণ্ঠে বললেন,
— "মিস তাসনিম। শিক্ষক আর ছাত্রীর ভেতরের আত্মমর্যাদা ও সীমারেখাটা বোধহয় আপনার জানা নেই। আপনার এই আবেগটা অত্যন্ত সাময়িক এবং অবান্তর। আশা করি এই ধরনের ভিত্তিহীন কথা বলে নিজের এবং আমার অমূল্য সময় নষ্ট করবেন না। ইউ মে গো নাউ।"
নিলয়ের ওই শান্ত কিন্তু সুতীক্ষ্ণ বরফশীতল প্রত্যাখ্যানে তাসনিমের মুখের সব রঙ নিমেষে উবে গেল। তার হৃদয়টা যেন এক নিমেষে চুরমার হয়ে গেল! সে একমুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে থেকে চোখভরা পানি চেপে দ্রুত কেবিন থেকে বেরিয়ে দৌড়ে চলে গেল।
নিলয় রিভলভিং চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। উনার সুতীক্ষ্ণ দৃষ্টি জানালার ওপারে করিডোরে দাঁড়িয়ে থাকা আয়রিনের চঞ্চল অবয়বটার ওপর গিয়ে স্থির হলো।
নিজের বুকের ভেতর হাত রেখে, একচ্ছত্র ও অধিকারবোধের অনুভূতির সাথে মনে মনে বললেন—
— "যে হৃদয়ের পুরোটা জুড়ে কেবল তোমার একচ্ছত্র অধিকার সুহাসিনী, সেখানে অন্য কোনো অনুরাগের ছোঁয়া লাগার সুযোগ নেই... কোনোদিন ছিলও না। এই সুহাসিনী শুধু এই নিলয় চৌধুরীরই ছিল, আর থাকবে।"
**(চলবে...)**