**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ৮**
সময় গড়িয়ে দেখতে দেখতে কেটে গেছে বেশ কয়েকটি মাস। এই কটি দিনে বদলে গেছে না বলা অনেক অনুভূতির সমীকরণ, হৃদয়ের গহীনে জমে থাকা না বলা কথাগুলো যেন এখন রূপ নিতে শুরু করেছে এক নতুন মোড়ে। আজ তাসনিমের জন্মদিন। তালুকদার ভিলাজুড়ে আজ উৎসবের আমেজ, চারপাশ রঙিন আলোয় সাজানো, মৃদু মিউজিক আর সুস্বাদু খাবারের মন্ধে ভারী হয়ে আছে চারপাশ। আজকের এই বিশেষ আয়োজনে নিমন্ত্রণ রক্ষা করতে সিকদার ভিলা থেকেও এসেছে আয়রিন এবং আরিয়ান।
সন্ধ্যা নামতেই জমজমাট হয়ে উঠেছে অনুষ্ঠানস্থল। ড্রয়িংরুম থেকে শুরু করে লন—সব জায়গায় মানুষের ভিড় আর কোলাহল। ঠিক এমন এক মুহূর্তে ড্রয়িংরুমের প্রবেশদ্বারে পা রাখল আয়রিন।
আজ আয়রিনের সাজপোশাক যেন চারপাশের সমস্ত আলো কেড়ে নিয়েছে। ওর পরনে এক অপূর্ব সুন্দর জমকালো শাড়ি, আর তার সাথে মানানসই হালকা গহনা। সবচেয়ে বেশি নজর কাড়ছে ওর পিঠ ছাপিয়ে থাকা ঘন কালো, রেশমি ও খোলা চুলগুলো। মৃদু বাতাসে চুলগুলো যখন ওর মুখ ও গাল ছুঁয়ে উড়ে যাচ্ছিল, তখন এক অপার্থিব মায়াবী সৌন্দর্য তৈরি হয়েছিল ওর অবয়বে।
ঠিক সেই সময় লিভিং রুমের সোফা থেকে একটু দূরে দাঁড়িয়ে অতিথিদের সাথে কথা বলছিলেন নেহাল। হঠাৎ তার চোখ গিয়ে পড়ল দরজায় দাঁড়ানো আয়রিনের ওপর। এক পলক আয়রিনের দিকে তাকিয়ে নেহালের বুকের ভেতরটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। সময়ের কাঁটা যেন সেখানেই থেমে গেল! এত স্নিগ্ধ, এত মোহনীয় রূপ এর আগে কখনো কোনো মেয়ের মধ্যে দেখেনি সে। রেশমি খোলা চুলে আর ওই মায়াবী চাহনিতে আয়রিনকে কোনো রূপকথার রাজকন্যার চেয়ে কম মনে হচ্ছিল না। নেহালের পলকহীন দৃষ্টি আটকে গেল আয়রিনের ওপর; মুহূর্তের মধ্যে হৃদস্পন্দন বেড়ে গেল তার। এক পলকেই সে আয়রিনের প্রেমে পড়ে গেল। মন তখন নিভৃতে বলে উঠল—এমন কাউকে তো দীর্ঘদিন ধরেই সে মনে মনে খুঁজছিল!
অন্যদিকে, আয়রিনদের পাশেই ভেতরে প্রবেশ করল আরিয়ান। বোনকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাতে সেও এসেছে। সাদা পাঞ্জাবিতে আরিয়ানের ব্যক্তিত্ব তখন আরও বেশি আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে। সে যখন চারপাশে চোখ বুলিয়ে তাসনিমকে খুঁজছিল, ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমের অন্য পাশ থেকে মৃদু পায়ে হেঁটে এগিয়ে এল তাসনিম।
আজকের এই বিশেষ দিনে তাসনিম নিজেকে সাজিয়েছে এক অন্যরকম মায়ায়। ওর পরনে চমৎকার এক সবুজ রঙের রেশমি শাড়ি। সবুজ শাড়ির ওই গাঢ় ছটায় ওর গায়ের রং আরও বেশি উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। আর সবচেয়ে বড় কথা, বরাবরের মতো আজ সে চুলগুলো কোনো খোপা বা বেনিতে বাঁধেনি; বরং চুলগুলো পিঠের ওপর খোলা ছেড়ে দিয়েছে। সবুজ শাড়ির আঁচল সামান্য সামলে যখন সে মৃদু হেসে সামনের দিকে এগিয়ে আসছিল, তখন চারপাশের সমস্ত কোলাহল যেন নিমিষেই মিলিয়ে গেল।
হঠাৎ করেই আরিয়ানের দৃষ্টি গিয়ে পড়ল তাসনিমের ওপর।
আরিয়ান যেন পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল! সে আর এক পাও নড়তে পারছে না। সবুজ শাড়িতে তাসনিমকে এত বেশি অপূর্ব আর মায়াবী লাগছে যে, আরিয়ান নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না। হৃদপিন্ডটা হঠাৎ করেই বক্ষপিঞ্জর ভেঙে বেরিয়ে আসতে চাইল। যে মেয়েটাকে এতদিন সে কেবল একটা ডানপিটে আর চঞ্চল কচি বোন হিসেবে দেখে এসেছে, আজকের এই সবুজ শাড়ির স্নিগ্ধ সাজে তাকে দেখে আরিয়ানের ভেতরটা অচেনা এক ভালোলাগায় হাহাকার করে উঠল। মুগ্ধতার আবেশে আরিয়ানের ঠোঁট দুটো ফাঁক হয়ে গেল, চোখের পলক ফেলতে যেন ভুলে গেল সে। মনের অজান্তেই তার বুক চিরে বেরিয়ে এল এক দীর্ঘশ্বাস—এতদিন তবে এই রূপটাই সে দেখতে পায়নি কেন?
চারপাশের রঙিন আলো, সুরের মূর্ছনা আর চারদিকে মানুষের কোলাহল—সব ছাপিয়ে আজ এই জন্মদিনের সন্ধ্যায় নতুন করে দুটি জোড়া হৃদয়ের মায়াবী গল্প লেখা শুরু হলো। নেহালের চোখ আটকে রইল মোহময়ী আয়রিনের রেশমি চুলে, আর আরিয়ানের সমস্ত পৃথিবী থমকে গেল সবুজ শাড়িতে জড়িয়ে থাকা তাসনিমের স্নিগ্ধ হাসিতে।
**(চলবে...)**