ফন্ট সাইজ:
থিম:
তোর আমার প্রেম

১০ম পর্ব

লেখক: Sumaiya Akhter

**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম

**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার

**পর্ব – ১০**

তালুকদার ভিলার ছাদের সেই রুদ্ধশ্বাস মুহূর্তটা কেটে যাওয়ার পর বেশ কিছুটা সময় পেরিয়ে গেছে। কেক কাটা আর রাতের ডিনারের পর্ব শেষ হওয়ার পর অতিথিরা একে একে বিদায় নিতে শুরু করেছে। ছাদের এক কোণে এখন বেশ নিরিবিলি পরিবেশ। হালকা ফুরফুরে বাতাসে রঙিন বাতিগুলো মৃদু দুলছে।

সেখানে একটা সোফায় হাত গুটিয়ে বসে কফিতে চুমুক দিচ্ছিলেন **নিলয় চৌধুরী**। আজ তাসনিমের জন্মদিনে তিনি নেহালের বিশেষ আমন্ত্রণে তালুকদার ভিলায় এসেছেন। নিলয়ের পরনে ছাই রঙের একটা ফরমাল শার্ট, চশমার ফাঁক দিয়ে তাঁর সেই গভীর ও গম্ভীর দৃষ্টি চারদিকেড়ানো।

ঠিক তখনই পেছনের সিঁড়ি দিয়ে হাহা হাসতে হাসতে একটা লোক ছাদটায় প্রবেশ করল। পরনে ক্যাজুয়াল টি-শার্ট, গলায় একটা স্টাইলিশ মাফলার, চোখে দুষ্টু মিটমিটে হাসি। এসেই সে এক লাফে নিলয়ের কাঁধে হাত রেখে বলে উঠল—

— "কিরে নিলু ভাই! তুই এখানে এত গম্ভীরে কফি খাচ্ছিস কেন রে ভাই? মনে হচ্ছে কোনো মোগল সাম্রাজ্যের রাজা সিংহাসনে বসে আছেন! একটু হাসবি তো জীবনে, নাকি হাসলে তোর ওই দামি চোয়ালের হাড় ভেঙে যাওয়ার ভয় আছে?"

লোকটির কথা শুনে নিলয় এক চিলতে বিরক্তি ও হাসির মিশ্রিত দৃষ্টিতে তাঁর দিকে তাকালেন। ইনি আর কেউ নন, নিলয় আর নেহালের ল্যাংটো কালের বন্ধু **ফারহান**! যাকে সবাই দুষ্টুমি করে 'ফারহু' বা 'ফাংকু' বলেও ডাকে। সারাদিন যার মাথায় কেবল ফাজলামো, ভন্ডামি আর নানা রকম ফন্দিফিকির ঘুরে বেড়ায়। এক মুহূর্তের জন্যও যার মুখে সিরিয়াস কোনো ভাব থাকে না।

ঠিক ওই মুহূর্তে কফির কাপ হাতে নিয়ে সেখানে এসে পৌঁছাল **নেহাল**। ফারহানকে দেখে সে খলবল করে হেসে বলে উঠল—

— "আরে ফারহান! তুই এসে গেছিস? আমি তো ভেবেছিলাম জাপানের কোনো মেয়ের প্রেমে পড়ে তুই পথ ভুলে অন্য কোথাও নেমে পড়েছিস!"

ফারহান সাথে সাথে বুকে হাত দিয়ে ড্রামার স্টাইলে অভিনয় করে বলে উঠল—

— "কী বলিস ভাই নেহাল! আমার মতো ইমোশনাল ও সরল প্রাণের একটা ছেলেকে তুই এমন অপবাদ দিলি? গার্লফ্রেন্ড তো দূরে থাক, কোনো মেয়ে আমার দিকে তাকানোর আগেই আমি নিজে থেকেই প্রেমে পড়ে যাই! আল্লাহপাক কেমন রূপ দিয়েই না বানাইছে এই দুনিয়ার মানুষগুলারে..."

ফারহান চোখের ইশারা করে ছাদের অন্য কোণে দাঁড়ানো একদল তরুণীর দিকে তাকিয়ে একটা উড়ন্ত চুমু ছুড়ে মারার ভান করল।

নিলয় কফির কাপটা টেবিলে রেখে ঠান্ডা ও কড়া গলায় বললেন—

— "তোর এই ভন্ডামি আর ফাজলামো জীবনেও গেল না, ফারহান। কোন দিন যে তোর কারণে আমাদের সবার বিপদে পড়তে হয়, সেটাই দেখার বাকি আছে।"

ফারহান বিন্দুমাত্র দমে না গিয়ে একগাল হেসে নিলয়ের ঠিক পাশে সোফায় বসে পড়ে বলল—

— "আরে নিলু ভাই! বিপদে তো ভালো মানুষেরা যায়, আর আমরা তো সমাজ সংস্কারক! তাছাড়া তুই তো সারাদিন গম্ভীর মুখে এমন ভাব করিস যেন দুনিয়ার সব প্রেম-ভালোবাসা তুই একা একাই ইজারা নিয়ে রেখেছিস! একটু রিল্যাক্স হ্যালো... জীবন একটাই, খাবি-দাবি আর ফূর্তি করবি!"

ঠিক সেই সময় ওই পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল **আয়রিন** আর **তাসনিম**। হাতে জুসের ট্রে নিয়ে তারা ক্যাটারিংয়ের টেবিলের দিকে যাচ্ছিল। ফারহানের চোখ হঠাৎ আয়রিনের ওপর পড়তেই সে চোখের পলক ফেলা ভুলে গেল! রেশমি খোলা চুলে আয়রিনের মোহময়ী রূপ দেখে ফারহান সোজা হয়ে বসে ফিসফিস করে নেহালের কানের কাছে বলে উঠল—

— "কিরে নেহাল! তোর এই বোনের ফ্রেন্ডটা কে রে ভাই? এ তো দেখি সরাসরি চাঁদের পরী নেমে এসেছে! এর চোখের দিকে তাকালে তো আমার হার্টবিট মিস হয়ে যাচ্ছে!"

নেহাল তৎক্ষণাৎ চোখ পাকিয়ে ফারহানের পিঠে একটা চড় বসিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলল—

— "খবরদার! চোখ নামিয়ে কথা বল বলছি! ওই দিকে তাকানোর সাহস করিস না, একদম কানের নিচ দিয়ে থাপ্পড় দিয়ে সোজা করে দেব!"

নিলয় দূরে দাঁড়িয়ে থাকা আয়রিনের সেই চঞ্চল অবয়বের দিকে নীরবে তাকিয়ে রইলেন। তাঁর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত প্রচ্ছায়া হাসি ফুটে উঠল—যেখানে একচ্ছত্র অধিকার আর গভীর ভালোবাসার এক অন্যরকম আলো খেলছিল।

ফারহান কান ডলে হেসেই খুন—

— "আরে ভাই, এত গরম দেখাচ্ছিস কেন? আল্লাহর কুদরত দেখা নিষেধ নাকি? আজ এই জন্মদিনে মনে হচ্ছে আমার জীবনেও কুফা ক্যাটাক্লিসম অর্থাৎ কালবৈশাখী ঝড় চলে এসেছে!"

ঠিক সেই মুহূর্তে, আয়রিন এবং তাসনিম যখন নেহাল ও ফারহানের ঠিক পাশ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল, তখন তাদের চোখ গেল কিছুটা দূরে সোফায় বসা **নিলয় চৌধুরী** ও নেহালের দিকে।

আয়রিন তো নিলয় স্যারকে হঠাৎ এভাবে তাসনিমদের বাসায়, তাও আবার নেহাল ভাইয়ার সাথে এত খোশগল্পে বসে থাকতে দেখে একেবারে থমকে গেল! ওর হাত থেকে জুসের ট্রে-টা প্রায় খসে পড়ার উপক্রম হয়েছিল। সে পলকহীন চোখে তাকিয়ে মনে মনে ভাবল—*‘নিলয় স্যার এখানে?! উনি আবার নেহাল ভাইয়ার বন্ধু কবে হলেন? স্যার তো কলেজ ছাড়া বাইরে কাউকে পাত্তাই দেন না!’*

পাশাপাশি তাসনিমের অবস্থাও তথৈবচ। সে চোখ বড় বড় করে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল নিলয় স্যারের দিকে। তার মাথা যেন একদম কাজ করছিল না—যে গম্ভীর মানুষটাকে তারা কলেজে ভয়ে তটস্থ থাকে, আজ সে তার বড় ভাইয়ের ঘনিষ্ট বন্ধু হয়ে আড্ডা দিচ্ছে!

তাসনিম ফিসফিস করে আয়রিনের হাত খামচে ধরে বলে উঠল—

— "আয়রিন... তুই কি ঠিক দেখছিস? ওটা কি আমাদের নিলয় স্যার? উনি... উনি এখানে কী করছেন রে?"

আয়রিন ঢোক গিলে থমকে দাঁড়িয়ে ফিসফিস করে উত্তর দিল—

— "আমিও সেটাই ভাবছি তাসু! আমার তো চোখের ভুল মনে হচ্ছে..."

নিলয় অবশ্য তাদের এই বিস্ময়মাখা চাহনি টের পেলেন। তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে এক পলক আয়রিনের দিকে তাকালেন, আর ঠোঁটের কোণে এক রহস্যময় চতুর হাসি ফুটিয়ে আবার অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। যেন তিনি আগেই জানতেন এই চমকটার কথা!

**(চলবে...)**

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১০ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন