**উপন্যাস:** তোর আমার প্রেম
**লেখিকা:** সুমাইয়া আক্তার
**পর্ব – ১১**
তালুকদার ভিলার জন্মদিনের সেই জমকালো রাতটি পেরিয়ে কেটে গেছে আরও কয়েকটা দিন।
আজ সিকদার ভিলার ড্রয়িংরুমের পরিবেশটা বেশ থমথমে, অথচ একটা চাপা উত্তেজনায় ভরপুর। সোফায় গম্ভীর মুখে বসে আছেন **বেলাল সিকদার** ও **নয়না সিকদার**—আরিয়ানের বাবা ও মা। একপাশে ল্যাপটপ কোলে নিয়ে উদাস ভঙ্গিতে বসে আছে নিধি, আর ঠিক তার পাশেই মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে আয়রিন।
সবার মাঝখানে সোফায় সোজা হয়ে বসে আছেন **আরিয়ান**। তাঁর চোখেমুখে আজ এক অদ্ভুত জেদ, আত্মবিশ্বাস আর নতুন এক গন্তব্যে পৌঁছানোর দৃঢ়তা।
হঠাৎ আরিয়ান গলা পরিষ্কার করে গম্ভীর কিন্তু স্পষ্ট কণ্ঠে বলে উঠল—
— "বাবা, আম্মু... আপনাদের সবাইকে আজ এখানে খুব গুরুত্বপূর্ণ একটা কথা বলার জন্য ডেকেছি। অনেক দিন তো হলো নিজের মতো করে জীবন কাটালাম, আর কত লুকোচুরি খেলব নিজের মনের সাথে?"
আরিয়ানের এমন আচমকা গম্ভীর ঘোষণায় ঘরের সবাই চমকে গেল। বাবা বেলাল সিকদার চশমাটা একটু নামিয়ে ভ্রূ কুঁচকে ছেলের দিকে তাকিয়ে বললেন—
— "কী ব্যাপার বল তো আরিয়ান? হঠাৎ এত ভনিতা করে গম্ভীর কথা কেন? কোনো সমস্যা নাকি অফিসে?"
আরিয়ান মৃদু হাসল। সে সোজা বাবার চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল—
— "না বাবা, অফিসে কোনো সমস্যা নেই। সমস্যাটা আমার মনের ভেতর এতদিন জট পাকিয়েছিল, আজ সেটার একটা হেস্তনেস্ত করতে চাই। আমি সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছি... আমি বিয়ে করতে চাই।"
ছেলের মুখে বিয়ের কথা শুনে বেলাল সিকদার আর নয়না সিকদারের চোখ তো কপালে ওঠার জোগাড়! কত বছর ধরে তারা আরিয়ানকে বোঝালেন, পাত্রী দেখালেন, কিন্তু সে এক বাক্যে সব না করে দিত। আজ হঠাৎ নিজে থেকেই সে বিয়ের কথা বলছে!
আরিয়ানের আম্মু নয়না সিকদার আনন্দে কেঁদে ফেলার উপক্রম হয়ে এগিয়ে এসে বললেন—
— "সত্যি বলছিস বাবা? তোর মুখে বিয়ের কথা শুনব—এমন দিনও আমাদের কপালে ছিল? বল, কোন মেয়ের প্রেমে পাগল হলিস তুই? কোন সে ভাগ্যবতী?"
ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে দাঁড়িয়ে থাকা আয়রিনের বুকটা কেমন যেন কেঁপে উঠল। তাঁর মনের কোণে একটা অবুঝ সুড়সুড়ি দিয়ে উঠল, কেন জানি তাঁর মনে হলো আরিয়ান হয়তো...
আর ঠিক তখনি নিধি লাফিয়ে উঠে হাততালি দিয়ে বলে উঠল—
— "আমি জানি! আমি শিওর জানি ভাইয়া কার কথা বলছে! বলো না ভাইয়া, সেই লাকি মানুষটা কি আমাদের তাসু আপু?"
নিধির মুখে 'তাসু আপু' নামটা শুনতেই আয়রিন বড় বড় চোখে ভাইয়ের দিকে তাকাল। আরিয়ানের মুখটা তখন এক চিলতে লাজুক হাসিতে রাঙা হয়ে উঠেছে। সে আর কিছু লুকিয়ে না রেখে সোজা বলে উঠল—
— "হ্যাঁ নিধি, তুই ঠিক ধরেছিস। আমি **তাসনিম**কেই বিয়ে করতে চাই। ওকেই আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতে চাই আমি।"
এই কথা শোনার পর পুরো ড্রয়িংরুমে যেন খুশির জোয়ার বয়ে গেল!
বাবা বেলাল সিকদার আর মা নয়না সিকদার ছেলেকে এমন পরিণত ও নিশ্চিত মনে কথা বলতে দেখে খুশিতে গদগদ হয়ে উঠলেন। নয়না সিকদার ছেলের মাথায় হাত বুলিয়ে আশীর্বাদ করে বললেন—
— "আল্লাহর লাখো শুকরিয়া! আমাদের ছেলেটার মনেও অবশেষে প্রেমের বান ডেকেছে! মেয়ে তো তুই দারুণ পছন্দ করেছিস বাবা।"
আয়রিন আনন্দে ডগমগ হয়ে এক লাফে ভাইয়ের সামনে গিয়ে জড়িয়ে ধরে বলে উঠল—
— "সত্যি বলছিস ভাইয়া?! তাসু! ওহ গড! আমার বেস্ট ফ্রেন্ড তোর পছন্দ হয়েছে? তুই জানিস না আজ আমার কত আনন্দ হচ্ছে! তাসুর চেয়ে ভালো মেয়ে তুই পেতিই না!"
নিধিও আনন্দে নাচতে শুরু করে দিল—
— "ইয়েহু! আমাদের ঘরে এবার একটা সুন্দরী ভাবির এন্ট্রি হবে! আহা রে তাসু আপু, তোর কপাল কত ভালো!"
বেলাল সিকদার মুচকি হেসে ছেলেকে জড়িয়ে ধরে বললেন—
— "পছন্দ তো তুই দারুণ করেছিস বাবা! কিন্তু তুই কি ভুলে গেছিস, তাসনিমের পরিবার আমাদের কাছে কতটা আপন? বিশেষ করে ওর বাবা **হুমায়ুন তালুকদার** সাহেব... আমাদের ব্যবসার পার্টনার তো বটেই, আমার জীবনের অন্যতম সেরা বন্ধু! বলতে গেলে ঘরের মানুষ তিনি। তাদের সাথে তো আমাদের সম্পর্ক আত্মার!"
আরিয়ান আত্মবিশ্বাসী হাসিতে মাথা দুলিয়ে বলল—
— "আমি জানি বাবা। হুমায়ুন আঙ্কেল আর আন্টি আমাদের কত কাছের। আর সেই কারণেই আমি চাই, এই সম্পর্কে কোনো রাখঢাক না রেখে আপনারা দুজনে মিলে কালকেই তালুকদার ভিলায় বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে চলে যান।"
আয়রিনের চোখ দুটো আনন্দে চকচক করে উঠল। সে মনে মনে ভাবল—তাসনিম আর আরিয়ান ভাইয়া... ভাবতেই বুকটা কেমন যেন আনন্দের এক স্রোতে ভেসে যাচ্ছে। দুই পরিবারে খুব শীঘ্রই যে এক মায়াবী সম্পর্কের সুতো বাঁধতে চলেছে, তার ঘ্রাণ আজ সিকদার ভিলার প্রতিটি কোণায় কোণায় ছড়িয়ে পড়ল।
**(চলবে...)**