উপন্যাস: তোর আমার প্রেম
লেখিকা: সুমাইয়া আক্তার
পর্ব – ১৩
তালুকদার ভিলার ড্রয়িংরুমে বিয়ের পাকা কথা হয়ে যাওয়ার পর থেকেই যেন খুশির জোয়ার বইছে দুই পরিবারে। আগামী মাসেই ধুমধাম করে তাসনিম ও আরিয়ানের বাগদানের তারিখ চূড়ান্ত হয়েছে। আজ সিকদার ভিলাতেও তার প্রস্তুতি চলছে জোরেশোরে।
সন্ধ্যাবেলা ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে ল্যাপটপে অফিসের কিছু ফাইল দেখছিলেন আরিয়ান। ঠিক তখনই পকেট থেকে ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে তার গম্ভীর মুখে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল—কলার আইডিতে ভেসে উঠেছে ‘তাসনিম’।
আরিয়ান কল রিসিভ করতেই অপর পাশ থেকে এক সেকেন্ডের নীরবতা, তারপর ফিসফিস করে তাসনিমের মিষ্টি অথচ একটু অভিযোগের সুরে ভেসে এল—
— "আচ্ছা আরিয়ান ভাইয়া... আপনি এত ডেয়ারিং কবে থেকে হলেন বলুন তো? আমাকে একটা কথাও না বলে সোজা আব্বুর কাছে বিয়ের প্রস্তাব পাঠিয়ে দিলেন! আমার তখন কী অবস্থা হয়েছিল জানেন?"
আরিয়ান ল্যাপটপের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে একটু সোজা হয়ে বসল। ঠোঁটের কোণে বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে শান্ত ও গভীর গলায় সে বলল—
— "তোকে জানানোর বোকামি করলে কি তুই আমাকে রাজি হতে দিতিস, মিস তাসনিম? তা ছাড়া, যে জিনিসটা আমার জীবনের সেরা প্রাপ্তি হতে চলেছে, সেটার জন্য এত দীর্ঘসূত্রিতা করার কোনো মানেই হয় না।"
ওপাশ থেকে তাসনিম যেন আরও একটু লজ্জা পেয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে খাতার পাতা উল্টানোর ভান করে বলল—
— "উফ! আপনার মুখে এসব কথা একদম মানায় না! সব সময় খালি ভাব দেখান, তাই না?"
— "ভাব দেখাই না তো, সত্যিটাই বলি।" আরিয়ান একটু থেমে আরও নরম গলায় বলল, "আচ্ছা, কাল বিকেলে একটু সময় বের করতে পারবি? তোকে একটা সারপ্রাইজ দেওয়ার আছে।"
তাসনিমের চোখ দুটো কৌতূহলে উজ্জ্বল হয়ে উঠল—
— "সারপ্রাইজ? কীসের সারপ্রাইজ?"
— "আগে থেকেই বলে দিলে তো আর সারপ্রাইজ থাকল না, গাধী! জাস্ট কাল বিকেল চারটায় রেডি থাকিস, আমি পিক করতে আসব।"
কথাটা বলেই আরিয়ান আর তাসনিমকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে কলটা কেটে দিল। তাসনিম ফোনটার দিকে তাকিয়ে মনে মনে বিড়বিড় করে উঠলেও বুকের ভেতরটা এক অজানা সুখে হু হু করে উঠল।
পরদিন বিকেল চারটা বাজতেই আরিয়ানের গাড়ি এসে থামল তালুকদার ভিলার সামনে। তাসনিম হালকা নীল রঙের একটা সালোয়ার-কামিজ পরে প্রস্তুত হয়েই ছিল। গাড়িতে উঠতেই আরিয়ান একবার আড়চোখে তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে গাড়ি স্টার্ট করল।
শহরের কোলাহল পেরিয়ে গাড়িটা এসে থামল একটি অত্যন্ত সুন্দর, নিরিবিলি ও ছিমছাম ক্যাফেতে—যেটার চারপাশ কাঁচের দেয়াল দিয়ে ঘেরা এবং ভেতরে গাছপালার ছিমছাম ছোঁয়া। ক্যাফের একটি কর্নার টেবিল আগে থেকেই বুক করা ছিল।
দুজনে কফির কাপ সামনে নিয়ে বসার পর বেশ কিছুক্ষণ কেউ কোনো কথা বলল না। নীরবতা ভেঙে আরিয়ান নিজের পকেট থেকে ছোট একটা ভেলভেট বক্স বের করে তাসনিমের ঠিক সামনে টেবিলের ওপর রাখল।
তাসনিম অবাক হয়ে বক্সটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল—
— "এটা কী...?"
— "খুলে দেখলেই বুঝতে পারবি।" আরিয়ান শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল।
তাসনিম কাঁপা কাঁপা হাতে বক্সটার ঢাকনা খুলল। ভেতরে মিটমিট করে জ্বলজ্বল করছে ছোট্ট একটা হিরের পাথর বসানো সুন্দর একটি আংটি! তাসনিমের চোখের পলক আটকে গেল।
আরিয়ান টেবিলের ওপর হাত রেখে একটু সামনে ঝুঁকে খুব গম্ভীর ও স্নিগ্ধ গলায় বলল—
— "কলেজের সেই দিনগুলোতে যখন তুই আমাকে বকবক করে বিরক্ত করতিস, তখন বুঝতে পারিনি যে এই ডিস্টার্বটাই একদিন আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অভ্যাসে পরিণত হবে। আমার এই অগোছালো জীবনে তোর ওই সবুজ শাড়ির স্নিগ্ধতা আর ছটফটে হাসিটা আজ বড্ড বেশি দরকার, তাসনিম। উইল ইউ বি মাইন... ফরএভার?"
তাসনিমের চোখ গলে এক ফোঁটা আনন্দাশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। সে আর এক মুহূর্তও অপেক্ষা না করে মাথা নিচু করে ভেজা গলায় বলে উঠল—
— "আমি তো সারাজীবনের জন্যই আপনার অপেক্ষায় ছিলাম, ভাইয়া..."
আরিয়ান মৃদু হেসে নিজ হাতে আংটিটা তাসনিমের আঙুলে পরিয়ে দিল। আর ঠিক সেই মুহূর্তে ক্যাফের কাঁচের ওপার থেকে বিকেলের সোনালি রোদ এসে পড়ল দুজনের ওপর, যা সাক্ষী হয়ে রইল এক পবিত্র ও চিরস্থায়ী ভালোবাসার।
(চলবে...)