ফন্ট সাইজ:
থিম:
কবুলের আড়ালে চুক্তি

৩য় পর্ব

লেখক: অন্বেষা নীহারিকা

#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি

০৩.

#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚

বহু কষ্টে কাঁপতে থাকা শরীরটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালাম। ধীরে ধীরে, টলতে টলতে ওয়াশরুমে গিয়ে ওযু করে এলাম। নামাজ পড়লাম। কয়েকবার ওনাকে ডাক দিলাম। কোনো সাড়া না পেয়ে আবার নিঃশব্দে শুয়ে পড়লাম।

সকাল সাতটা বাজে, ঘুম থেকে উঠলাম। মাথার ওপর ঠান্ডা কিছু অনুভব করলাম। ধীরে সুস্থে চোখ মেলে চারপাশে তাকিয়ে দেখলাম, পুরো রুমটা খালি। একটা হাত মাথায় নিলাম, কেউ আমার মাথায় জলপট্টি দিয়ে রেখেছে। বুঝতে বাকি রইল না আমার জ্বর এসেছে, আর কেউ একজন নিঃশব্দে আমার খেয়ালও রেখেছে।

কিছুক্ষণ পর ওনি (মায়ান) ওয়াশরুম থেকে বের হলেন। কোমরে শুধু একটা তোয়ালে প্যাঁচানো। বুঝা যাচ্ছে গোসল করে বেরিয়েছেন। ফর্সা শরীরে বিন্দু বিন্দু পানির ফোঁটা ঝিলমিল করছে। চুলগুলো কপাল ছুঁই ছুঁই, সেখান থেকে টপটপ করে পানি ঝরছে। ওনাকে দেখে হঠাৎ করেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধক করে উঠল। এত সুদর্শন হওয়ার কি দরকার ছিল! আমার কিশোরী মনটা অজান্তেই কেমন এলোমেলো হয়ে যাচ্ছে। আমাকে ওনার দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে ওনি আমার পাশে এসে বসলেন। খুব আলতো করে কপালের কাপড়টা উল্টে দিতে দিতে মুচকি হেসে বললেন,

“এক রাতেই জ্বর এসে গেল, বাকি রাতগুলোতে কী হবে?”

আমি ওনার কথার টান বুঝতে না পেরে বললাম,

“জ্বর আসতে কি এক রাত সময় লাগে নাকি?”

ওনি একটু ঝুঁকে এলেন, কণ্ঠটা নরম, কিন্তু কথার ভেতর দুষ্টুমি,

“তা তো ঠিক, এক রাতও পুরো লাগেনি তোমার জ্বর বাঁধতে। জাস্ট তিন ঘণ্টা লেগেছে। এম আই রাইট?”

এতক্ষণে বুঝলাম ওনি কী বোঝাতে চাইছেন। লজ্জায় যেন শরীরটা জ্বলে উঠল। মনে হলো মাটির নিচে ঢুকে যাই। উপায় না পেয়ে দুই হাত দিয়ে নিজের চোখ-মুখ ঢেকে ফেললাম। আমার এই অবস্থা দেখে ওনি হালকা হেসে উঠলেন। তারপর আলতো করে আমার হাত সরিয়ে বললেন,

“তুমি আমাকে এভাবে কেন দেখছো? ও বুঝেছি, রাতে অন্ধকারে ঠিক মতো দেখতে পাওনি, তাই এখন দেখছ! তুমি চাইলে আমি টাওয়ালটাও সরিয়ে…”

ওনাকে আর কিছু বলতে না দিয়ে আমি তাড়াতাড়ি দুই হাতে ওনার মুখ চেপে ধরলাম। বুকের ভেতরটা কেমন দমবন্ধ হয়ে আসছিল লজ্জা, অস্বস্তি, আবার অদ্ভুত এক অনুভূতি সব মিলিয়ে। ঠিক তখনই দরজায় টুক করে নক পড়ল। আমি তাড়াতাড়ি ওনাকে ছেড়ে দিয়ে উঠে বসলাম। জলপট্টির ঠান্ডা স্পর্শে জ্বরটা একটু কমেছে, কিন্তু শরীরটা এখনো মেজমেজ করছে। মনে হচ্ছে গোসল করলে হয়তো একটু ভালো লাগবে। ওনি দ্রুত একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার পরে দরজা খুললেন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে ওনার বোনের মেয়ে প্রিয়া। প্রিয়া বলল,

“মামা, নানু বলছে মামিকে নিচে যেতে।”

ওনি শান্ত গলায় বললেন,

“আসছে, তুমি যাও।”

আমি চুপচাপ বসে রইলাম। মনে হচ্ছিল, এই অচেনা জায়গাটায়ও কেউ একজন নিঃশব্দে আমার খেয়াল রাখছে। আর সেই অনুভূতিটা অদ্ভুতভাবে মনে গেঁথে যাচ্ছে। প্রিয়া চলে গেল। আমি আমার ব্যাগ থেকে একটা কালো থ্রিপিস বের করলাম। ওয়াশরুমে যাবো, এমন সময় ওনি বললেন,

“আম্মু তোমাকে তাড়াতাড়ি নিচে যেতে বলেছে।”

আমি একটু ক্লান্ত গলায় বললাম,

“শরীরটা কেমন যেন ভার ভার লাগছে, গোসল করে তারপর যাই।”

ওনি আর কিছু বললেন না। আমি ধীরে ধীরে ওয়াশরুমে গিয়ে গোসল করে বের হলাম। জ্বরের পর ঠান্ডা পানিতে শরীরটা একটু হালকা লাগছে। বাইরে এসে দেখি ওনি প্যান্ট-শার্ট পরে গলায় টাই বাঁধছেন, পুরোপুরি তৈরি। আমি ভেজা চুলগুলো খোঁপা করে নিলাম, তারপর নিচে যাওয়ার জন্য নিজেকেও গুছিয়ে নিলাম। ওনি আমার কাছে এসে থামলেন। খুব আলতো করে বললেন,

“আসছি, সাবধানে থেকো।”

কথাটা বলেই আমার ললাটে নরম করে হাত ছুঁইয়ে বেরিয়ে গেলেন। সেই স্পর্শটা যেন কিছুক্ষণ পর্যন্ত থেকে গেল, অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়ে। আমি কিছুক্ষণ চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম, তারপর নিজেকে সামলে রুমটা গুছিয়ে নিচে শাশুড়ির কাছে চলে গেলাম।

নিচে এসে দেখি শাশুড়ি প্রায় সব কাজ সেরে ফেলেছেন। ঘরটা শান্ত মনে হচ্ছে সবাই নাস্তা করে নিজেদের কাজে বেরিয়ে গেছে। শাশুড়ি আমাকে দেখে বললেন,

“তুমি নাস্তা করে নাও। আমি টেবিলে রেখে এসেছি।”

আমি কিছু না বলে চুপচাপ নাস্তা করতে চলে এলাম। শাশুড়িকে জিজ্ঞেস করলাম না তিনি খেয়েছেন কিনা। যেমনটা নিজের বাড়িতে মায়ের সাথে করতাম, এখানেও তেমনি করলাম। আসলে আমি এখনো বুঝে উঠতে পারছি না, তাকে কী বলে ডাকবো। তাই কিছু না বলে, চুপচাপ নিজের মতোই থাকলাম। যেন এই নতুন জায়গাটার সাথে নিজেকে আস্তে আস্তে মানিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছি।

আমার নাস্তা শেষ হওয়ার কিছুক্ষণ পর পাশের ফ্ল্যাটের দুজন আন্টি নতুন বউ দেখতে এলেন। সাথে আমার শাশুড়ীও বসে আছেন। আমি তাদের সামনে জড়সড় হয়ে বসে আছি মাথা নিচু, বুকের ভেতর কেমন যেন অচেনা কাঁপুনি। একজন আন্টি শাশুড়ীকে বললেন,

“দেনমোহর কী নিলেন ভাবি? মাইয়া তো কালা, দেনমোহর মনে হয় ভালোই পাইছেন।”

আমি চুপচাপ মাথা নিচু করে বসে রইলাম। ভেতরটা রাগে জ্বলে উঠছিল, ইচ্ছে করছিল দু-চারটা কথা শুনিয়ে দিই। কিন্তু নতুন বউ বলে চুপ করে থাকলাম, নিজেকে গুটিয়ে নিলাম। শাশুড়ী বললেন,

“দেনমোহর তো আমার ছেলের পছন্দ মতো হয়েছে। তবে সেটা এখন নেবে না। আর এইটুকু মেয়েকে তো বাধ্য হয়েই বিয়ে করেছে আমার ছেলে। ওর দাদা জোর করেছে বিয়ের জন্য। ওনার নাকি এই মেয়েকেই পছন্দ হয়েছে।”

শাশুড়ীর কথা শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। কান্না চলে আসছিল। একে তো আমি ছোট, আমি নিজেই বিয়ে করতে চাইনি। তার ওপর, উনাকেও নাকি জোর করা হয়েছে! তাহলে গত রাতের সবকিছু? ওটা কি জোর ছিল না? না হলে এত সহজে, এত স্বাভাবিকভাবে, কেন উনি আমাকে আপন করে নিলেন? মাথার ভেতর হাজারটা প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল। পাশের আরেকজন মহিলা বললেন,

“মাইয়া তো বেশি ছোট। পোলার মন টিকবো না এই মাইয়ার কাছে। পোলা নিজের চাহিদা মতো না পাইলে তো অন্য দিকে মুখ দিবো।”

এই কথাটা শুনে আমার গা ঘিনঘিন করে উঠল। মনে হলো কেউ যেন আমার অস্তিত্বটাকেই অপমান করছে। রাগে চোখ জ্বালা করতে লাগল, কিন্তু সেই রাগের চেয়েও বেশি কষ্ট হচ্ছিল। মনের ভেতর একটা ভয় ঢুকে গেল, তাহলে কি সত্যিই…? আমি তো উনাকে স্বামী হিসেবে মেনে নিয়েছি। নিজের অজান্তেই নিজের সবটুকু উনার হাতে সমর্পণ করে দিয়েছি। তাহলে আমি কোথায় দাঁড়িয়ে আছি? চুপচাপ বসে থাকলাম। বাইরে থেকে নিঃশব্দ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে যেন ভেঙে পড়ছি। কেউ দেখল না, কেউ বুঝল না।

আন্টিরা চলে গেলে শাশুড়ী নিজের রুমে চলে যায়। আমি একা একা কি করব বুঝতে পারছি না। বাড়িতে কেউ নেই। দাদা-দাদিকে নাকি ওনার মেয়ের বাসায় নিয়ে গেছে, কালকে বিকালে চলে আসবে। ননদও সকালে চলে গেছে তার শাশুড়ীর কল পেয়ে। এখন বাড়িতে শুধু আমি আর শাশুড়ী আছি। শশুরও কোম্পানির কোনো কাজে বিদেশ গিয়েছে, আসতে আরও ১০/১২ দিন লাগবে। আমি কিছুক্ষণ ড্রয়িং রুমে একা একা হাঁটাহাঁটি করলাম। চারপাশটা কেমন নির্জন লাগছিল। যেন এই বড় বাড়িটা হঠাৎ করেই আমার জন্য অচেনা হয়ে গেছে। শেষে আর ভালো লাগলো না, চুপচাপ রুমে এসে বসে পড়লাম।

সারাদিন এভাবেই একঘেয়েমিতে কেটে গেল। সময় যেন এগোতেই চাইছিল না। এখন সন্ধ্যা পাঁচটা বাজে। উনি (মায়ান) কিছুক্ষণ আগে বাসায় এসেছে। উনি কি কাজ করে আমি জানি না, আর জানার ইচ্ছেও হচ্ছে না। আমার মাথার ভেতর শুধু শাশুড়ীর বলা কথাগুলোই ঘুরছে, একটা একটা শব্দ যেন বুকের ভেতর বিঁধে আছে। উনি ওয়াশরুম থেকে বের হতেই আমি নিঃশব্দে একটা টি-শার্ট আর ট্রাউজার এগিয়ে দিলাম। উনি কিছু না বলেই সেটা পরে নিল। আমি গিয়ে খাটের এক কোণায় বসে পড়লাম। কিছুক্ষণ পর উনিও এসে আমার পাশে বসল।

আমার ভেতরে অনেক কথা জমে ছিল। আমি ভেবেছিলাম, ওনাকে জিজ্ঞেস করবো, দেনমোহর হিসেবে বাবার কাছে কি চেয়েছেন। কেন এই বিয়ে? আমি আসলে উনার কাছে কি? কিন্তু আমি কিছু বলার আগেই উনি আমাকে কোনো সুযোগ দিলেন না। উনি নিজের মতো করে আমার উপর অধিকার ফলাতে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। আমি কিছুক্ষণ মোচড়ামুচড়ি করলাম, নিজেকে সরাতে চাইলাম, কিন্তু যখন বুঝলাম উনার কাছ থেকে নিস্তার পাওয়া আমার পক্ষে সম্ভব না, তখন ধীরে ধীরে চুপ হয়ে গেলাম। শরীরটা স্থির হয়ে গেল, কিন্তু ভেতরটা কেমন অসহায় লাগছিল। উনি নিজের কাজ শেষ করে আজানের পাঁচ মিনিট আগে আমায় ছেড়ে দিল। তারপর যেন কিছুই হয়নি, এমন স্বাভাবিক ভঙ্গিতে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেলেন।

আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে উঠে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নিলাম। মনটা ভারী ছিল, বুকটা চাপা কষ্টে ভরা তবুও সিজদায় গিয়ে মনে হলো- এই কষ্টগুলো অন্তত কোথাও বলা যাচ্ছে, কেউ একজন নিশ্চয়ই শুনছে।

———চলবে~~———

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন