ফন্ট সাইজ:
থিম:
কবুলের আড়ালে চুক্তি

৪র্থ পর্ব

লেখক: অন্বেষা নীহারিকা

#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি

০৪

#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚

আমি কিছুক্ষণ নিশ্চুপ বসে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে উঠে ফ্রেশ হয়ে নামাজ পড়ে নিলাম। মনটা ভারী ছিল, বুকটা চাপা কষ্টে ভরা তবুও সিজদায় গিয়ে মনে হলো— এই কষ্টগুলো অন্তত কোথাও বলা যাচ্ছে, কেউ একজন নিশ্চয়ই শুনছে।

শাশুড়ী সবার জন্য নাস্তা রেডি করছেন। আমি উনার জন্য কফি আর শশুরের জন্য চা নিয়ে ড্রয়িং রুমে গেলাম। কাকি শাশুড়ী তার ছেলে-মেয়েকে পড়াতে বসেছেন। ছেলেটা পঞ্চম শ্রেণিতে আর মেয়েটা সপ্তম শ্রেণিতে পড়ে। ওদেরকে পড়তে দেখে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলোএই জায়গায় তো আজ আমার থাকার কথা ছিল। বই নিয়ে বসে থাকা, পরীক্ষার টেনশন করা। আমাকে এতো তাড়াতাড়ি বিয়ে দেওয়া কি সত্যিই খুব দরকার ছিল?

কনিকা আপুকে তো বিয়ে দেওয়া হলো না, অথচ আমাকে দিয়ে দিল। এমন তো না যে আমি বিয়ে দিয়ে দেওয়ার মতো কোনো ভুল করেছি। তারপর মনে পড়ল, ওনার দাদার চাওয়াতেই হয়তো সব হয়েছে।

এইসব ভাবনায় ডুবে আমি একদম স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলাম। আমাকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে কাকি শাশুড়ী বললেন,

“এভাবে হাঁ করে তাকিয়ে আছো কেন? আমার ছেলে-মেয়ের পড়ায় নজর লাগবে।”

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। একটা অদ্ভুত অপমানবোধ গলায় আটকে গেল। কিছু না বলে সেখান থেকে সরে এসে শাশুড়ীর কাছে চলে গেলাম। শাশুড়ী দুপুরের ঝুটাকৃত থালাবাসন গুলো ধুতে বললেন। তারপর নিজে নাস্তা নিয়ে ড্রয়িং রুমে চলে গেলেন। আমি মনে মনে ভাবলাম, আগে নাস্তা করে নেই, তারপর একসাথে সব ধুয়ে ফেলবো। সবার সাথে আমিও গিয়ে সোফায় বসলাম। শাশুড়ী আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,

“প্লেটগুলো ধুয়েছ?”

আমি একটু জড়তা নিয়ে বললাম,

“না মা, নাস্তার গুলোসহ একসাথে ধুয়ে নেব।”

শাশুড়ী বিরক্তি মেশানো কণ্ঠে বললেন,

“আগে এইগুলো ধুয়ে আসো। পরে নাস্তার গুলো ধুইয়ো।”

আমি আর কিছু বললাম না। চুপচাপ উঠে চলে গেলাম। চোখ দুটো জ্বালা করছিল, খুব কান্না পাচ্ছিল। উনি তো সামনে বসেই ছিল, একটা বার যদি বলত “আগে খেয়ে নাও, তারপর ধুবে”। হয়তো এতটা খারাপ লাগত না।

সব বাসন ধুয়ে শেষ করে যখন ড্রয়িং রুমে ফিরলাম, তখন দেখি সবাই নাস্তা শেষ করে যার যার ঘরে চলে গেছে। পুরো ঘরটা ফাঁকা, নিঃশব্দ। শুধু চাচাতো বোনটা বসে টিভি দেখছে। আমি টি-টেবিলের কাছে গিয়ে প্লেটটা হাতে নিলাম। দেখলাম, একটা সমুচা পড়ে আছে। ছলছল চোখে তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে করে সেটা হাতে তুলে নিলাম। মুখে দিতে যাব, ঠিক তখনই কাকাতো বোনটা বলল,

“ভাবি, প্লেটে কোনো নাস্তা থাকলে দিও তো।”

আমি থেমে গেলাম। হাতটা যেন নিজে থেকেই থেমে গেল মাঝপথে। একটা ছোট নিঃশ্বাস ফেলে, নিজে না খেয়েই সমুচাটা ওর হাতে দিয়ে দিলাম। ও খুশি হয়ে খেতে লাগল! আর আমি- শুধু তাকিয়ে রইলাম কিছুক্ষণ। তারপর ধীরে ধীরে উঠে নিজের সব কাজ শেষ উপরে চলে এলাম, খালি পেটে! আর ভেতরটা এক অদ্ভুত শূন্যতা নিয়ে।

রুমে এসে দেখি, উনি খাটের ডেস্কে হেলান দিয়ে বসে মোবাইল টিপছেন। আমি ধীরে ধীরে গিয়ে ওনার পাশে বসলাম। উনি আলতো করে আমাকে নিজের কাছে টেনে নিলেন, বক্ষের কাছে জায়গা করে দিলেন। আমি দুই হাতে উনাকে জড়িয়ে ধরে কিছুক্ষণ চুপচাপ রইলাম। মনে হচ্ছিল, এই নীরবতাটাই যেন আমার সব কথা বলে দিচ্ছে! উনি আমার চুলে বিলি কাটতে কাটতে নরম গলায় জিজ্ঞেস করলেন'

“নাস্তা করেছ?”

এই একটা প্রশ্নেই যেন বুকের ভেতর জমে থাকা সব কষ্ট একসাথে গলা পর্যন্ত উঠে এলো। ভীষণ কান্না পাচ্ছিল! কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। অনেক কষ্টে শুধু মাথাটা মৃদু নেড়ে হ্যাঁ বুঝালাম।

উনি হয়তো আমার ভেতরের ঝড়টা বুঝলেন না বা বুঝেও কিছু বললেন না। শুধু আগের মতোই চুপচাপ আমাকে আগলে রাখলেন। প্রায় পনেরো মিনিট পর, সাহস সঞ্চয় করে ধীরে বললাম,

“আমি কি আর পড়াশোনা করবো না?”

আমার প্রশ্নে ওনি একটুও দেরি না করে বললেন,

“তোমার যদি পড়তে ইচ্ছে করে, তাহলে পড়তে পারো। আমি আশেপাশের কোনো স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেব।”

কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা হলো আবার অদ্ভুত ভারীও লাগল। কেন জানি ওনার কথাটা পুরোপুরি ভালো লাগল না। আমি কিছু না বলে অনেকক্ষণ চুপ করে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে ওনার বুকে মুখ চেপে ধরে বললাম,

“আপনি যদি না চান, তাহলে আমি আর পড়বো না।”

ওনি একটু থেমে বললেন,

“আমি আম্মুকে জিজ্ঞেস করি দেখি কি বলে। পড়াতে বললে ভর্তি করিয়ে দেব।”

আমি তৎক্ষণাৎ মাথা তুলে বললাম,

“জিজ্ঞেস করতে হবে না। আমি আর পড়বো না।”

একটু থেমে আবার বললাম,

“আমি পড়লেও আপনার কাছে থাকবো, আর না পড়লেও আপনার কাছেই থাকবো। তাই আমার আর পড়াশোনা করার দরকার নাই!"

কথাগুলো বলতে বলতে নিজেরই বুকটা কেমন ভার হয়ে উঠছিল। ওনি হালকা অবাক হয়ে বললেন'

“তাই নাকি?”

আমি মৃদু হাসলাম। যদিও সেই হাসির আড়ালে কতটা ভয় লুকানো ছিল, তা হয়তো ওনি বুঝতে পারেননি,

“হুম, আমি সারাজীবন আপনার সাথে এভাবেই থাকতে চাই।”

উনি বললেন,

“সারাজীবন?”

“হুম, সারাজীবন! আমি কোনো দিনও আপনাকে ছেড়ে যাবো না।”

উনি একটু নরম স্বরে জিজ্ঞেস করলেন,

“আমাকে ছেড়ে যাবেনা কেন?”

আমি চোখ বন্ধ করে আরও শক্ত করে উনাকে জড়িয়ে ধরলাম,

“আপনাকে ছেড়ে যাবো কেন?”

উনি ধীরে বললেন,

“ভালোবাসো?”

আমি খুব আস্তে, কিন্তু গভীর এক অনুভূতি নিয়ে বললাম,

“অনেক…!”

কথাটা বলার পর মনে হলো এই “অনেক”-এর ভেতরেই আমার সব ভয়, সব নির্ভরতা, আর ছোট্ট করে বেঁচে থাকার ইচ্ছে লুকিয়ে আছে।

এভাবে সময় কতক্ষণ গড়ালো, তা আর জানা হয়নি। আমি উনার বুকে মাথা রেখেই কখন ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বুঝতেই পারিনি। যখন ঘুম ভাঙল, ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে দশটা। চোখ খুলে দেখি উনি এখনো একইভাবে বসে আছেন। কানে মোবাইল, কারও সাথে গভীর মনোযোগ দিয়ে কথা বলছেন। এক মুহূর্ত তাকিয়ে রইলাম, তারপর আর কিছু না ভেবে চুপচাপ উঠে ওয়াশরুমে চলে গেলাম। ফ্রেশ হয়ে ফিরে এসে ধীরে বললাম,

“খাবার খেতে চলেন, অনেক রাত হয়ে গিয়েছে।”

উনি কলটা কেটে মোবাইলটা বেডসাইড টেবিলে রেখে শান্ত গলায় বললেন,

“তুমি যাও, আমি আসছি।”

আমি আর কিছু বললাম না। নিচে নেমে এলাম। ডাইনিং রুমে এসে দেখি, শাশুড়ি মা টেবিলে খাবার সাজাচ্ছেন। আমি চুপচাপ এগিয়ে গিয়ে হাতে যতটুকু পারি সাহায্য করলাম। একজন একজন করে সবাই এসে টেবিলে বসল। খাওয়া শুরু হলো। আমি সবার পাশে বসে থাকলেও, ভেতরে কেমন যেন শূন্য লাগছিল। কেউ কিছু জিজ্ঞেস করেনি, আমিও কিছু বলিনি! খাওয়া শেষে সবাই যে যার মতো উঠে গেল নিজ নিজ ঘরে, নিজের নিজের জগতে।

শেষে রইলাম শুধু আমি আর শাশুড়ী। আমি ভাবলাম এখন একসাথে খাব কিন্তু শাশুড়ী বললেন "তিনি এখন খাবেন না, রাতে নাকি ভারী কিছু খান না।" তারপর খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতেই বললেন,

“তুমি খেয়ে সব গুছিয়ে রেখো।”

কথাটা বলে উনি নিজের রুমে চলে গেলেন। আমি কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে বসে খাওয়া শুরু করলাম। প্রতিটা লোকমা যেন গলায় আটকে যাচ্ছিল তবুও খেয়ে নিলাম। খাওয়া শেষে সব থালাবাসন ধুয়ে, গুছিয়ে রেখে দিলাম। সব কাজ শেষ করে যখন রুমে ফিরলাম। মনে হচ্ছিল, সারাদিনে আমি কত কিছুই না করেছি! কিন্তু কেউ একটা বারও জিজ্ঞেস করল না

“তুমি ঠিক আছো তো?”

এই ভাবনাটা বুকের ভেতর হালকা ব্যথা হয়ে রয়ে গেল! আমি চুপচাপ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকে পড়লাম! রাত প্রায় একটা বাজে। আমার ঘুম আসছে না। কারণ আমি সন্ধ্যায় অনেকক্ষণ ঘুমিয়েছি।

উনি সোফায় বসে ল্যাপটপে কি যেন করছেন। আমি সারা রুম পায়চারী করছি। খাটে উঠে এক কাত হয়ে শুয়ে পড়লাম। নাহ, কিছুতেই ঘুম আসছে না। তাই আবার উঠে গিয়ে ওনার সামনে দাঁড়ালাম। উনি ল্যাপটপ অফ করে দিলেন। আমাকে টেনে নিয়ে উরুর উপর বসালেন। বস্তু গলিয়ে উদরে ঠান্ডা হাতে স্পর্শ অনুভব করলাম। কিছু বলার ইয়ত্তা নেই। ক্ষণিকের মধ্যে ওষ্ঠদ্বয়ের দূরত্ব ঘো'চালেন। উনার হাতে অবাধ্য স্পর্শ আমার শীর্ণকায়া প্রদাহের জ্বালা ধরিয়ে দিল। উপয়ান্তর না পেয়ে দু'হাতে খামচে ধরলাম ওনার চুল। ওনি সযত্নে কোলে নিয়ে বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজের পরনের টি-শার্টটা খুলে ফ্লোরে ছুড়ে মারলো। খুব ধীরে সুস্থে আমার কন্ধ নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল। নিজের কার্যকলাপে বহুল থেকেই এক হাত বাড়িয়ে রুমের স্বল্প আলো টুকু নিভিয়ে দিল। শুরু হলো এক নীরন্ধ্রময় যন্ত্রণার রাত- নিঃশব্দ, গভীর তবুও অদ্ভুত এক আবেগে মোড়া।

————চলবে~~————

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন