#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
০৫
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
সকালে ঘুম থেকে উঠে ব্রেকফাস্ট তৈরি করে নিলাম। আজকে শাশুড়ি মা ওঠার আগেই আমি সব করে নিয়েছি। গত দুইদিনে যতটুকু শিখতে পেরেছি, ততটুকুই করার চেষ্টা করেছি। ওনাকে ডাকার জন্য উপরে যাচ্ছিলাম, তখন কাকি শাশুড়ি ডাক দিয়ে বললেন,
“আমাকে একটা চা দিও তো। আর আজকে আব্বা-আম্মা বাড়িতে আসবে। বড় ভাবিকে কী রান্না করতে হবে জিজ্ঞেস করে রান্নাটা কমপ্লিট করে রেখো।”
আমি কাকি শাশুড়ির কথায় “আচ্ছা” বলে চা বানাতে চলে গেলাম। সঙ্গে শাশুড়ি মা আর কাকা শ্বশুরের জন্যও চা বানিয়ে নিলাম। কাকির কাছে সবার চা দিয়ে ওনার জন্য একটা কফি বানিয়ে নিলাম।
কফি হাতে উপরে এসে দেখি, উনি কারও সঙ্গে কলে কথা বলছেন। আমি কফিটা ওনার হাতে দিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। কলের ওপারের মানুষটা কে, আমি জানি না। উনি তাকে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সঙ্গে কথা বলবে কিনা। ওপার থেকে কী জবাব এলো, শুনিনি। উনি শুধু “ওকে, বাই” বলে কল কেটে দিলেন। আমি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করলাম।
“কে কল করেছে? আমার কথা বললেন যে?”
উনি স্বাভাবিক গলায় বললেন—
“কনিকা।”
আমি “ওহ” বলে চলে যাচ্ছিলাম। কিন্তু হঠাৎ কী মনে হলো, আবার ফিরে এসে জিজ্ঞেস করলাম—
“আচ্ছা, আপনি কী কাজ করেন?”
উনি আমার কথা শুনে কেমন অবাক দৃষ্টিতে তাকালেন। যেন প্রশ্নটা একদমই অপ্রত্যাশিত ছিল। আমি সামান্য মাথা নিচু করে আমতা আমতা করে বললাম,
“আসলে…”
আমার কথা শেষ হওয়ার আগেই উনি প্রশ্ন করলেন,
“তুমি জানো না আমি কী কাজ করি?”
আমি ধীরে ধীরে দু’পাশে মাথা নাড়িয়ে বুঝালাম,
“না।”
উনি আবারও অবাক হয়ে বললেন—
“আমার সম্পর্কে কিছু না জেনেই বিয়ে করেছ?”
আমি মৃদু গলায় বললাম—
“আব্বু তো সবকিছু জেনে-বুঝেই দিয়েছে। আর এমনিতেও আপনি তো অনেক ভালো।”
আমার কথায় উনি কিঞ্চিৎ হাসলেন। তারপর আমার মাথায় মৃদু টোকা দিয়ে বললেন,
“আম্মুকে জিজ্ঞেস করো।”
কথাটা বলেই উনি ওয়াশরুমে চলে গেলেন। আমি অবাক হয়ে ওনার যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে মনে হাজার প্রশ্ন ঘুরপাক খেতে লাগল।
“আজব তো! উনি কি নিজের মুখে বলতে পারেন না তিনি কী কাজ করেন? আম্মুকে জিজ্ঞেস করতে হবে কেন?”
আমিও আর কিছু না ভেবে নিচে নেমে আসলাম। কিছুক্ষণ পরে উনি রেডি হয়ে নিচে এলেন। সবাই টেবিলে বসলে আমি ব্রেকফাস্ট পরিবেশন করলাম। তারপর সবাই খাওয়া শেষ করে নিজ নিজ গন্তব্যে চলে গেলেন।
এখন বাড়িতে শুধু আমি, কাকি শাশুড়ি, শাশুড়ি মা আর একজন কাজের মহিলা, মিনু আপা। শাশুড়ি মা কী কী রান্না করতে হবে বুঝিয়ে দিয়ে উপরে চলে গেলেন। মিনু আপাকে বললেন আমাকে সাহায্য করতে।
কাকি শাশুড়ি ড্রয়িংরুমে বসে ফোনে কিছু দেখছিলেন। আমি আর মিনু আপা মিলে রান্না শেষ করলাম। কিচেন গুছানোর সময় হঠাৎ মিনু আপা বললেন,
“ছোডো স্যারের লগে আমনের কেমনে বিয়া হইছে, আফা? স্যার তো ওই মেডামরে ছাড়া আর কাওরে বিয়া করবো না কইছিল।”
মিনু আপার কথা শুনে আমার মাথার ভেতর যেন হঠাৎ বজ্রপাত হলো।
“কী বলছে এসব? ওই ম্যাডাম মানে? কে?”
মুহূর্তের মধ্যেই বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। চোখদুটো জ্বালা করছিল ভীষণ। কান্না করলে হয়তো একটু হালকা লাগত, কিন্তু মিনু আপা সামনে থাকায় কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিলাম।
বুঝলাম, উনি হয়তো ভেবেছেন আমি সব জানি। তাই এত সহজেই কথাটা বলে ফেলেছেন। আমি অন্যদিকে তাকিয়ে নিজেকে স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে বললাম,
“দাদুভাই মোটামুটি জোর করেই নাকি বিয়ে করিয়েছে। আর ওই ম্যাডামটা কে? মানে, ওনার নাম কী?”
মিনু আপা একটু ইতস্তত করে বললেন,
“আসলে আফা, আমার নামডা ঠিক মনে নাই। ‘ক’ দিয়া মনে হয় শুরু হইতো। স্যারের কোচিং সেন্টারের ছাত্রী আছিল মেডাম।”
আমি আরও অবাক হয়ে গেলাম।
“কোচিং সেন্টার মানে? উনি কি করেন আর কোচিং সেন্টারই বা আসবে কোথা থেকে?”
আমি দ্রুত মিনু আপাকে জিজ্ঞেস করলাম,
“তুমি কোচিং সেন্টার কোথায় পেলে? উনি কি কোচিং করান নাকি?”
মিনু আপা বললেন,
“ছোডো স্যার তো ভার্সিটির টিচার। এক বছর আগে কলেজের পোলা-মাইয়াগোরে কোচিংও করাইত। কী জানি সমস্যা হইছিল ওই মেডামরে লইয়া, তাই এখন আর করায় না।”
আমি আর কিছু বলতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল গলাটা যেন কেউ চেপে ধরেছে। বুকের ভেতর অদ্ভুত এক ব্যথা জমে উঠছিল ধীরে ধীরে। মুখ দিয়ে কোনো কথাই বের হচ্ছিল না। আমি আর কিছু না বলে চুপচাপ সোজা রুমে চলে গেলাম।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হলো। দুপুরে একবার মিনু আপা খাওয়ার জন্য ডেকে গিয়েছিল, কিন্তু আমি যাইনি। এখন আবার ডেকে গেল। বলল, দাদা-দাদি নাকি এসেছে, আমাকে নিচে যেতে বলেছে।
সারাদিন অনেক কান্না করায় চোখ-মুখ ফুলে গেছে। ওয়াশরুমে গিয়ে হাত-মুখ ধুয়ে কোনো রকমে নিজেকে স্বাভাবিক করলাম। তারপর ধীরে ধীরে নিচে চলে এলাম।
ড্রয়িংরুমে এসে দেখি দাদা-দাদি, কাকা-কাকি আর শাশুড়ি মা বসে আছেন। আমি গিয়ে দাদা-দাদির উদ্দেশ্যে সালাম দিলাম,
“আসসালামু আলাইকুম। কেমন আছেন?”
দাদা-দাদি দুজনেই সালামের জবাব দিলেন। দাদা পাশে বসতে ইশারা করে বললেন,
“তা কেমন লাগছে আমাদের বাড়ি? সবকিছু ঠিকঠাক তো? দাদুভাই কিছু বলেনি তো?”
আমি দাদার পাশে দাঁড়িয়ে স্বাভাবিক থাকার চেষ্টা করে বললাম—
“জি, কোনো অসুবিধা হচ্ছে না। উনিও কিছু বলেননি।”
দাদি শাশুড়ি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন—
“নাস্তা নিয়ে আসো। সবাই একসাথে আছি, দাদুভাইও চলে এসেছে। যাও।”
আমি দাদি শাশুড়ির কথায় নাস্তার জন্য কিচেনে চলে গেলাম। সবার জন্য চা বানিয়ে কিছু শুকনো খাবার নিয়ে ড্রয়িংরুমে গেলাম। গিয়ে দেখি উনি এসে দাদার সঙ্গে কথা বলছেন।
আমি সবাইকে নাস্তা দিয়ে উনার জন্য কফি আনতে আবার কিচেনে চলে গেলাম। কফি বানিয়ে এনে উনার হাতে দিলাম। তারপর সোফার একপাশে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ দাদি শাশুড়ি সবার মনোযোগ নিজের দিকে আনার জন্য গলা খাঁকারি দিলেন। সবাই উনার দিকে তাকাতেই উনি খুব স্বাভাবিক গলায় বললেন,
“বলছিলাম কী, হাওয়াকে এখন আর পড়াশোনা করাতে হবে না। দেড়-দুই বছর পর বাবু হয়ে গেলে না হয় আবার পড়াশোনা শুরু করবে।”
কথাটা শুনে আমি যেন হঠাৎ জমে গেলাম। বিস্ময়ে অজান্তেই দু’পা পিছিয়ে গেলাম।
“আমি? এই বয়সে, বাবু?”
মাথার ভেতরটা ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। বাবু নেওয়া কি এতটাই জরুরি? আমার নিজের ইচ্ছার কি কোনো মূল্য নেই? আমি কিছু বলার আগেই উনি আড়চোখে একবার আমার দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বললেন,
“দাদি, এখন এসব কথা থাক। হাওয়া এখনও অনেক ছোট। আগে বড় হোক।”
উনার কথা শুনে শাশুড়ি মা আর দাদি শাশুড়ি দুজনেই মুখ গোমড়া করে নিলেন। তখন কাকি শাশুড়ি মাঝখান থেকে বললেন,
“মায়ান, তুমি যখন জন্ম হয়েছ, তখন তোমার আম্মু হাওয়ার থেকেও ছোট ছিল। আর হাওয়ার তো কিছু করতে হবে না, ওর সব দেখাশোনা তো আমরাই করব।”
উনি কাকি শাশুড়ির কথা শুনে চুপ করে গেলেন। আমি আর সেখানে এক মুহূর্তও দাঁড়িয়ে থাকতে পারলাম না। নিঃশব্দে সোজা কিচেনে চলে এলাম। তারপর সেখানে আর কী কথা হয়েছে, তা আমার জানা নেই।
কিচেনের কাজ শেষ করে রুমে গিয়ে শুয়ে পড়লাম। সেদিন রাতে আমার আর খাওয়া হয়নি। উনিও আমাকে ডাকেননি।
এভাবেই কাটতে লাগল আমার জীবন। উনার সঙ্গে বিয়ের তিনদিন পর থেকেই আমাদের দূরত্ব বাড়তে শুরু করল। অথচ পরিবারের সবার চাপে একসময় উনিও বাবু চাইতে শুরু করলেন। আমি আর কী বলতাম? তাদের চাওয়াটাই যেন শেষ কথা ছিল। সেখানে আমার মতামতের কোনো মূল্যই ছিল না। অগত্যা, সবার ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে আমিও বাবু নেওয়ার জন্য রাজি হলাম।
-------চলবে~~ --------