ফন্ট সাইজ:
থিম:
কবুলের আড়ালে চুক্তি

৬ষ্ঠ পর্ব

লেখক: অন্বেষা নীহারিকা

#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি

০৬.

#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚

বাবু নেওয়ার জন্য রাজি হওয়ার পর থেকেই শাশুড়ি মা আর দাদি শাশুড়ি আমার সঙ্গে অনেক ভালো আচরণ করতে শুরু করলেন। শুধু কাকি শাশুড়ি আগের মতোই আছেন। আমাকে নিয়ে উনার তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই।

দেখতে দেখতে পাঁচ মাস কেটে গেল, কিন্তু আমার বাবু হলো না। এর মধ্যে একবার বাবার বাড়িতে গিয়েছিলাম। বাড়িতে শুধু বাবা-মা আর কনিকা আপু ছিল। অন্য কেউ ছিল না। তবে এলাকার কিছু মানুষের মুখে নানা কানাঘুষা শুনতে পেলাম। তারা বলছিল,

“বড় মেয়ে নাকি পালিয়ে বিয়ে করেছে, তাই ছোটটাকে তাড়াহুড়ো করে বিয়ে দিয়ে দিয়েছে।”

কথাগুলো শুনে আমার ভীষণ খারাপ লাগছিল। আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম'

“মানুষ এসব বলে কেন? আমার তো কোনো বোন পালিয়ে বিয়ে করেনি। আর কনিকা আপুরও তো বিয়ে হয়নি!”

মা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

“এসব কথায় কান দিস না। মানুষ আগে-পিছে কত কথাই বলে। সব কথা শুনতে নেই।”

মায়ের কথার পর আর কিছু বলিনি। কিন্তু বুকের ভেতর কেমন একটা চাপা কষ্ট থেকে গেল। আমি বাবার বাড়িতে মোট আটদিন ছিলাম। এই আট দিনের মধ্যে প্রথম আর শেষ দিন কনিকা আপু বাড়িতে ছিল। বাকি ছয়দিন নাকি মেজো খালার বাড়িতে বেড়াতে গিয়েছিল। কথাটা শুনে আমার খুব কষ্ট হয়েছিল। আমি এতদিন পর বাড়িতে এলাম, আর আপু কিনা বেড়াতে চলে গেল! প্রথম দিন আমাকে ড্রাইভার এসে আমাদের বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে গিয়েছিল। এই আটদিনে উনি, মানে মায়ান আমার তেমন কোনো খোঁজখবর নেননি। শুধু শেষ দিন উনি নিজে এসে আমাকে নিয়ে গিয়েছিলেন। বাবার বাড়িতে তেমন কোনো কাজ ছিল না। আর আমার ছোটবেলা থেকেই হালকা-পাতলা ডায়েরি লেখার একটা শখ ছিল। জীবনের স্মরণীয় দিনগুলো আমি কালো কালির অক্ষরে ডায়েরির পাতায় তুলে রাখতাম।

সেই আটদিনে, অবসর সময়গুলোতে আমি প্রিয় মানুষটার সঙ্গে কাটানো ছোট ছোট মুহূর্তগুলো ডায়েরির পাতায় লিখে রাখলাম। কিছু অনুভূতি ছিল, যা কাউকে বলা যায় না। শুধু কাগজই নিঃশব্দে সেগুলো শুনে নেয়।

শ্বশুরবাড়িতে আসার সময় ডায়েরিটা সঙ্গে করে নিয়ে এসেছিলাম। ওই বাড়িতে তো আমি আর থাকব না, তাই ভাবলাম এটা আমার কাছেই থাক। কারও হাতে পড়ে গেলে আবার সমস্যা হবে। আমি আবার হালকা-পাতলা অনেক আকামও করেছি। মানে, বান্ধবীদের সঙ্গে মিলে মানুষের গাছ থেকে আম, জাম, পেয়ারা, লিচু, আরও কত কী যে চুরি করেছি! সেই ঘটনাগুলোও মজা করে ডায়েরিতে লিখে রেখেছিলাম। কেউ পড়ে ফেললে খুব লজ্জা পেতে হবে ভেবেই ডায়েরিটা লুকিয়ে রেখেছি।

শ্বশুরবাড়িতে এসেছি আজ প্রায় বিশ-বাইশ দিন হবে। আজ নয়দিন উনি বাড়িতে নেই। শুধু বাড়ি বললে ভুল হবে, উনি দেশেই নেই। উনার এক বন্ধুকে নিয়ে নাকি আমেরিকায় ডাক্তার দেখাতে গিয়েছেন। কালকে দেশে ফিরে আসবেন। সঙ্গে শ্বশুর মশাইও আসবেন। তাই আজকে বাড়িতে অনেক কাজের চাপ। আমার বিয়ের দশ-বারো দিন পরই উনার আসার কথা ছিল। কিন্তু কোম্পানির কাজের জন্য আসতে পারেননি। প্রায় এগারো মাস পর নাকি আমার শ্বশুর দেশে ফিরছেন। তাই শাশুড়ি মা সবকিছু উনার পছন্দমতো করার চেষ্টা করছেন। আমিও উনাকে হাতেহাতে সাহায্য করছি। কিন্তু কয়েকদিন ধরেই আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে। বারবার মাথা ঘোরায়, মাঝে মাঝে বমিও আসে। তবুও কাউকে কিছু বলতে পারিনি।

শাশুড়ি মা আমাকে ড্রয়িংরুমের ফার্নিচারগুলো মুছতে বলে কিচেনে চলে গেলেন। আমি তখন মাথা ঘোরার জন্য ঠিকমতো দাঁড়াতেই পারছিলাম না। সঙ্গে প্রচণ্ড মাথাব্যথাও করছিল। অনেক কষ্টে ফার্নিচারগুলো মুছে কিচেনে গিয়ে শাশুড়ি মাকে বললাম,

“মা, আমার খুব মাথা ব্যথা করছে। আমি একটু গোসল করে আসি? তাহলে হয়তো ভালো লাগবে।”

আমার কথা শুনে শাশুড়ি মা একটু বিরক্ত হয়ে বললেন,

“কাজ দেখলেই তোমার অসুস্থতা শুরু হয়ে যায়। কী এমন কাজ করাই তোমাকে দিয়ে, যে এত বাহানা খুঁজো? তোমার থেকে যেটা চাইলাম, সেটাও তো দিতে পারলে না! শুরু থেকেই আমার ছেলেটাকে ঝামেলায় জড়ালে!”

শাশুড়ি মায়ের কথাগুলো শুনে বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল।

সন্তান না হলে তো সেখানে আমার কোনো দোষ নেই। আমিও তো চেয়েছি আমার সন্তান আসুক। কিন্তু আল্লাহ যদি না দেন, সেখানে আমার কী করার আছে? "আর উনার ছেলেকেই বা আমি কিসের ঝামেলায় জড়ালাম?" কথাগুলো মনে হতেই চোখ ভরে উঠল পানিতে। কিন্তু কিছু বললাম না। চুপচাপ সব সহ্য করে গেলাম। রান্না শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে রুমে এসে গোসল করে নিলাম।

খুব ক্লান্ত লাগছিল, তাই খাটের ডেক্সের সঙ্গে হেলান দিয়ে কিছুক্ষণ চুপচাপ বসে রইলাম। মনটা কেমন যেন বিষাদময় লাগছে। সবকিছুই ঠিকঠাক, তারপরও যেন সব এলোমেলো মনে হচ্ছে। কোনো কিছুতেই শান্তি পাচ্ছি না। ওনার সঙ্গে কথা বলতে পারলে হয়তো একটু ভালো লাগত। আমার কোনো ফোন নেই। থাকলে আমিই কল দিতাম। উনি শাশুড়ির মোবাইলে কল দিয়েই আমার সঙ্গে চার-পাঁচ মিনিট কথা বলে কল কেটে দেন। আজকে হয়তো কল দেবেন না, যেহেতু কালকেই বাসায় আসবেন।

একটু বিশ্রাম নিয়ে নিচে এসে সবাইকে খাবার দিলাম। আজকে কাকা শ্বশুর দুপুরেই চলে এসেছেন। দাদা-দাদি সবাই ডাইনিং টেবিলে বসে আছেন। এমন সময় দাদাশ্বশুরের ফোনটা বেজে উঠল। উনি রিসিভ করতে করতেই কলটা আবার কেটে গেল। মিনিটখানেকের মধ্যেই কাকা শ্বশুরের মোবাইলে কল এলো। তিনি রিসিভ করতেই ওপাশের মানুষটা ওনাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই একটানা কী যেন বলে গেলেন। কাকা শ্বশুর খুশিতে প্রায় লাফিয়ে দাঁড়িয়ে গেলেন,

“কিহহহ! সত্যি? মানে তুমি সত্যি বলছ তো?”

ওনার মুখের উজ্জ্বলতাই বলে দিচ্ছিল, খবরটা শুনে তিনি ভীষণ খুশি হয়েছেন। উত্তেজনায় ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলেন না, সবকিছু গুলিয়ে ফেলছিলেন। ওপাশ থেকে আবার কিছু বলা হলো। তারপর উনি নিজেকে একটু সামলে নিয়ে বললেন,

“ঠিক আছে, বাবার। তোমরা তাড়াতাড়ি ওকে নিয়ে ফিরে আসো। আর সাবধানে এসো, ওর খেয়াল রেখো।”

আমি কিছুটা ভাবুক হয়ে তাকিয়ে রইলাম। কে কল করেছে? আর কার খেয়াল রাখতে বলছে? আমার ভাবনার ছেদ ঘটল দাদাশ্বশুরের কথায়। তিনি কাকার উদ্দেশে বললেন,

“কি হয়েছে? এত খুশি দেখাচ্ছে কেন?”

কাকা শ্বশুর দাদার প্রশ্ন শুনে আরও খুশি হয়ে মুখে বড় একটা হাসি ফুটিয়ে বললেন,

“আমাদের বংশধর আসছে, বাবা! আমি আর ভাই দাদা হবো, আর তুমি বড়বাবা হবে!”

ওনার কথা শুনে দাদাশ্বশুরও খুশিতে অবাক হয়ে বললেন,

“কিহহ! তোকে কে বলেছে এসব?”

কাকা শ্বশুর উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন,

“এইমাত্র মায়ান কল দিয়ে বলল!”

কাকা শ্বশুরের কথা শুনে আমার মাথার উপর যেন পুরো আকাশটাই ভেঙে পড়ল। নিজের অজান্তেই কয়েক কদম পিছিয়ে গেলাম। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে। বুকের ভেতরটা হুহু করে উঠল। এসব কী শুনছি আমি? উনি বাবা হতে যাচ্ছেন মানে? কিন্তু আমি তো মা হচ্ছি না! আমি মা হলে তো সবার আগে আমিই জানতাম। আমি নিজেই কিছু জানি না, অথচ উনি বিদেশে বসে কীভাবে জেনে গেলেন?

মুহূর্তের মধ্যেই চারপাশটা যেন ঝাপসা হয়ে এলো। মনে হচ্ছিল, কেউ আমার বুকের ভেতরটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। কথা বলতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। শুধু একটাই প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে, তাহলে উনি কার সন্তানের বাবা হতে চলেছেন?

****** চলবে~~ ********

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৬ষ্ঠ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন