#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
০৭
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
“তাহলে উনি কার সন্তানের বাবা হতে চলেছেন?”
সবাইকে ডাইনিং টেবিলে রেখেই উপরে চলে আসলাম। আমার দিকে কারও তেমন নজর নেই। সবাই নিজেদের আনন্দ আর খুশি নিয়ে ব্যস্ত। আর আমি, আমি যেন মুহূর্তের মধ্যেই সম্পূর্ণ ভেঙে পড়লাম।
উপরে এসে রুমে বসে নিঃশব্দে কান্না করতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতর কেউ ধারালো কিছু দিয়ে বারবার আঘাত করছে। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।
কাকি শাশুড়ি হয়তো অল্প হলেও আমার দিকে নজর দিয়েছিলেন। কিছুক্ষণ পর উনি আমার রুমে এলেন। ওনাকে রুমে ঢুকতে দেখে আমি তাড়াতাড়ি কান্না থামিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। উনি এসে আমার পাশে বসলেন। এই প্রথম আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন,
“কান্না করছিস কেন? সত্যিটা মেনে নিতে শিখ।”
কাকি শাশুড়ির কথা শুনে অনেক কিছু বলতে চাইলাম। কিন্তু পারলাম না। কথাগুলো যেন গলায় কাঁটার মতো আটকে গেছে। কোনোভাবেই বের হতে চাইছে না। অনেক কষ্টে গলা দিয়ে কয়েকটা ভাঙা শব্দ বের করলাম,
“ত-তাহলে উনি সত্যি অন্য কারও সন্তানের বাবা হতে চলেছেন? এসব কীভাবে? বিয়ে কবে হলো?”
কাকি শাশুড়ি একদম সোজাসাপ্টা গলায় বললেন,
“তোমাকে বিয়ে করার প্রায় দেড় বছর আগে মায়ান ওকে ভালোবেসে বিয়ে করেছে। এবার সত্যিটা মেনে নিতে শিখ। আর নিজের মনকে শক্ত কর।”
উনার কথাটা শুনে মনে হলো আমার চারপাশটা হঠাৎ থেমে গেছে। মাথার ভেতর ঝাঁ ঝাঁ শব্দ হচ্ছে। কান্নাও যেন কিছুক্ষণের জন্য থেমে গেল। শুধু নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। আমার আরও অনেক কিছু জানার ছিল। হাজারটা প্রশ্ন বুকের ভেতর জমে ছিল। কিন্তু কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই কাকি শাশুড়ি উঠে দাঁড়ালেন। উনি রুম থেকে বেরিয়ে যাওয়ার আগেই আমি কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলাম,
“উনি কাকে বিয়ে করেছেন? আর পরে আমাকেই বা কেন বিয়ে করলেন?”
কাকি আমার দিকে আর ফিরে তাকালেন না। দরজা দিয়ে বের হতে হতে শুধু বললেন,
“কালকে ওরা আসলে নিজেই দেখে নিস। আর আস্তে আস্তে সব জানতে পারবি। এখন একটু ধৈর্য ধর।”
কথাটা বলেই উনি চলে গেলেন। আর আমি, আমি আবার ভেঙে পড়লাম। বুক চেপে ধরে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কান্না করতে লাগলাম। মনে হচ্ছিল, আমার সমস্ত স্বপ্ন, বিশ্বাস, ভালোবাসা সবকিছু এক মুহূর্তে ধুলো হয়ে গেছে। বাবাকে কথাগুলো জানাতে পারলে ভালো হতো। বাবাই তো শখ করে এই বাড়িতে আমার বিয়ে দিয়েছিলেন। আর উনি, উনি কীভাবে পারলেন আমার সঙ্গে এমনটা করতে? আমি তো কারও কোনো ক্ষতি করিনি। তাহলে কেন এই বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষ সব জেনেও আমাকে ঠকাল? কেন আমার জীবনটা এভাবে মিথ্যার ওপর দাঁড় করিয়ে দিল?
এসব অসংখ্য প্রশ্ন মাথার ভেতর ঘুরপাক খেতে লাগল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন এক গভীর অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছি, যেখান থেকে বের হওয়ার কোনো পথ নেই। কাঁদতে কাঁদতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম, বুঝতেই পারিনি। রাতে আমায় আর কেউ ডাকেওনি। হয়তো আমার কথা কারও মনেই ছিল না। ঘুম ভাঙল সকালে ননদের ডাকে। উনি দরজার বাইরে থেকেই বললেন,
“ভাবি, তোমাকে আম্মু তাড়াতাড়ি নিচে যেতে বলেছে। এক ঘণ্টা পরে আব্বু আর দাদাভাই চলে আসবে। তাড়াতাড়ি এসো।”
কথাটা বলেই ননদ চলে গেল। প্রথমে উনার কথাটা ঠিকমতো মাথায় ঢোকেনি। কিন্তু পরক্ষণেই গত রাতের সব কথা আবার মনে পড়ে গেল। মুহূর্তেই মনটা আবার বিষাদে ভরে উঠল। চোখ বেয়ে নীরব অশ্রু গড়িয়ে পড়তে লাগল। বুকের ভেতরটা আবার মোচড় দিয়ে উঠল। কী করব, কী বলব? কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। কিছুক্ষণ নির্বাক হয়ে বসে রইলাম। তারপর ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। নিজেকে কোনোভাবে সামলে ফ্রেশ হয়ে নিচে চলে গেলাম।
নিচে এসে দেখি কাকি শাশুড়ি আর শাশুড়ি মা কিচেনে ব্রেকফাস্ট তৈরি করছেন। দাদি শাশুড়ি ড্রয়িংরুমের সোফায় বসে আছেন। আমাকে মনমরা হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে দেখে তিনি কটাক্ষের সুরে বললেন,
“এত কষ্ট পাওয়ার নাটক করার তো কোনো দরকার নাই। নিজের তো বাচ্চা হয় না। এখন আমার দাদুভাই বাবা হবে, খুশি না হয়ে উল্টো বদনজর দেওয়ার জন্য মুখিয়ে আছে!”
দাদি শাশুড়ির কথায় আমি কিছু বললাম না। মাথা নিচু করে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। দাদা শ্বশুর দাদিকে থামানোর জন্য মৃদু ধমক দিয়ে বললেন,
“কি শুরু করছ? একটু পরেই ওরা চলে আসবে। এত খুশির সময় এসব বললে নাতবউয়ের মন খারাপ হবে।”
দাদি শাশুড়ি দাদার কথার উত্তরে আরও তেজ দেখিয়ে বললেন
“ভুল কিছু তো বলিনি! ওকে বিয়ে করে আনাই হয়েছে বাবুর জন্য। সেই নাতবউয়েরই যখন বাচ্চা হচ্ছে, তখন কী দরকার ছিল এমন একটা উটকো ঝামেলা দাদুভাইয়ের ঘাড়ে চাপানোর?”
দাদির কথাগুলো শুনে মনে হচ্ছিল বুক চিরে কান্না বেরিয়ে আসবে। কিন্তু আশ্চর্যভাবে কাঁদতেও পারছিলাম না। হঠাৎ কী হয়ে গেল জানি না। চোখ জ্বলছিল, অথচ চোখে জল আসছিল না। কথায় আছে
“অপ্রত্যাশিত ব্যথার সবচেয়ে গভীর বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে নীরবতা।”
হয়তো আমার ক্ষেত্রেও ঠিক সেটাই হচ্ছিল। আমি তো কখনো কল্পনাও করিনি আমার জীবনে এমন কিছু ঘটবে। যাদের আপন ভেবেছিলাম, তারাই এভাবে আমার জীবনটা মিথ্যার ভেতর ঠেলে দেবে এটা ভাবারও শক্তি ছিল না। নিজের কষ্ট আর সবার কটুকথাগুলো নীরবতার আড়ালে চাপা দিয়েই আমি ধীরে ধীরে কিচেনের দিকে চলে গেলাম কাজ করতে।
কিচেনে গিয়ে চা বানিয়ে দাদা-দাদি আর কাকা শ্বশুরকে দিলাম। তারপর কিচেনের ময়লাযুক্ত প্লেটগুলো ধুয়ে নিলাম। আমাকে কিচেনে আসতে দেখে কাকি শাশুড়ি বিশ্রাম নেওয়ার জন্য নিজের রুমে চলে গেলেন। আমি ডাইনিং টেবিলে ব্রেকফাস্ট সাজাচ্ছিলাম, এমন সময় কলিং বেল বেজে উঠল। কলিং বেলের শব্দ কানে আসতেই বুকের ভেতরটা হঠাৎ মোচড় দিয়ে উঠল। কলিজায় কেমন চিনচিনে একটা ব্যথা অনুভব হলো। অজানা এক ভয় আর অস্বস্তি আমাকে গ্রাস করে নিল। দাদি শাশুড়ি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন,
“এমনে দাঁড়াইয়া কী দেখতাছস? যা, গিয়ে দরজাটা খুলে দে।”
দাদি শাশুড়ির কথা মতো আমি গিয়ে দরজা খুলে দিলাম। দরজার সামনে কনিকা আপু আর এক অচেনা মধ্যবয়স্ক লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে আমি কিছুটা অবাক হয়ে গেলাম। কোনো কিছু না ভেবেই, নিজের দুঃখ প্রকাশ করার জন্য আপন মানুষ পেয়ে আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম কনিকা আপুর ওপর। আপুকে দু'হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে চিৎকার করে কান্না শুরু করে দিলাম। কান্নার চাপে ঠিকমতো কথাও বলতে পারছিলাম না,
“আ-আপু… আ-আমি এখানে থাকব না। বাবাকে বলো আমাকে এখান থেকে নিয়ে যেতে। এখানে আমার দম বন্ধ হয়ে আসছে। তু-তুমি নিশ্চয়ই আমার কষ্ট দেখে আমাকে নিতে এসেছ, তাই না?”
আশ্চর্যের বিষয় হলো, আপু আমার কান্না দেখেও কিছু বলল না। একদম নির্বাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। এমনকি হাত বাড়িয়ে আমায় জড়িয়ে পর্যন্ত ধরল না। তবে তখন আমার সেদিকে কোনো খেয়াল ছিল না। আমার হুঁশ ফিরল মধ্যবয়স্ক লোকটার কথায়,
“কি হচ্ছে এখানে? আর এটা কে? কনিকা অসুস্থ, জানে না এভাবে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ছে কেন! এই মায়ানের আম্মু, ওকে ভেতরে নিয়ে যাও। ওর রেস্ট দরকার।”
আমি হতভম্ব হয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে রইলাম। এই লোকটা কে? আর উনি শাশুড়ি মাকে এভাবে আদেশের সুরে সম্বোধন করছেন কেন?
-------চলবে~~~------