ফন্ট সাইজ:
থিম:
কবুলের আড়ালে চুক্তি

৮ম পর্ব

লেখক: অন্বেষা নীহারিকা

#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি

০৮

#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚

“আর উনি শাশুড়ি মাকে এভাবে আদেশের সুরে সম্বোধন করছেন কেন?”

আমার আকাশ-পাতাল ভাবনার মাঝেই শাশুড়ি মা এসে কনিকা আপুকে নিয়ে ড্রয়িংরুমে বসালেন। আমি ধীরে ধীরে গিয়ে আপুর পাশে দাঁড়ালাম। আপু কেমন যেন অপরাধীর মতো মাথা নিচু করে বসে আছে। চোখ তুলে কারও দিকেই তাকাচ্ছে না। দাদি শাশুড়ি এগিয়ে এসে আপুর মাথায় স্নেহের হাত বুলিয়ে দিলেন। শাশুড়ি মা দুই গ্লাস জুস এনে একটা আপুর হাতে আর আরেকটা মধ্যবয়স্ক লোকটার হাতে দিলেন। মধ্যবয়স্ক লোকটা দাদি শাশুড়ির দিকে তাকিয়ে বললে,

“আম্মা, বউমাকে মায়ানের রুমে দিয়ে আসেন। ওর এখন রেস্ট নেওয়া প্রয়োজন।”

আমি অবাক হয়ে শাশুড়ি মায়ের দিকে তাকালাম। প্রথমে ভেবেছিলাম উনি হয়তো আমার কথাই বলছেন। কিন্তু উনার সঙ্গে তো আমার কখনো ঠিকভাবে কথাই হয়নি, এমনকি উনি আমাকে ভালোভাবে দেখেছেন বলেও মনে পড়ে না। তাহলে উনি আমায় চিনলেন কীভাবে?

আমার সমস্ত চিন্তা মুহূর্তে এলোমেলো হয়ে গেল, যখন দেখলাম দাদি শাশুড়ি কনিকা আপুকে নিয়ে উপরে চলে যাচ্ছেন। আমি শাশুড়ি মাকে কিছু বলতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু তিনি আমায় থামিয়ে দিয়ে বললেন,

“এখন কোনো কথা বলো না। মায়ান বাড়িতে আসুক, সব ক্লিয়ার হবে। কিচেনে আসো, কাজ আছে। আমি তোমার শ্বশুরের কিছু লাগবে কিনা দেখি।”

আমি যেন বেঁচে থাকার তাগিদে জোর করে শ্বাস নিচ্ছিলাম। বুকের ভেতরটা অদ্ভুত ভারী হয়ে আসছিল। সবকিছু কেমন এলোমেলো, অসহ্য লাগছিল। আর উনি, উনি এখনো আসছেন না কেন? সবকিছুর ঊর্ধ্বে একটা সত্য ধীরে ধীরে আমার সামনে পরিষ্কার হতে শুরু করছিল

আপুই তাহলে! না, আর ভাবতে পারছিলাম না। এটা কীভাবে সম্ভব? আর বাবা-মা, আপু’রা তারা কীভাবে পারল আমার সঙ্গে এমনটা করতে? আমি কী দোষ করেছিলাম?

কিচেনে এসে মুখে আঁচল চেপে ধরে কান্না শুরু করে দিলাম, যাতে কেউ আমার কান্নার শব্দ শুনতে না পায়। রান্না শেষ করে সবকিছু গুছিয়ে নিলাম। চোখের কোণ বেয়ে নীরব অশ্রুকণা গড়িয়ে পড়ছে, তবুও সেগুলো থামানোর চেষ্টা করলাম না। আজ আর শক্ত থাকার ভান করার শক্তিও নেই। সব কাজ শেষ করে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলাম। এখন কী করবো, কোথায় যাবো, কিছুই মাথায় আসছিল না। উনি (মায়ান) এখনো বাসায় ফেরেননি। মনে হচ্ছিল, যদি একবার আসতেন, তাহলে হয়তো বুকের ভেতরের জমে থাকা কথাগুলো একটু হালকা করা যেত। কিন্তু বাস্তবতা যেন আরও ভারী।

আমার নিজের রুম এখন কনিকা আপুর দখলে। আপু প্রেগন্যান্ট, অনেক ক্লান্ত। দীর্ঘ পথের যাত্রা তাকে আরও ভেঙে দিয়েছে। একবার ভাবলাম, আপুর কাছে গিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করি, হয়তো কিছু সত্য সামনে আসবে। কিন্তু কী মনে করে যেন পা আর এগোল না। ভেতরটা কেমন অদ্ভুতভাবে আটকে গেল।

কোনো দিকেই যাওয়ার জায়গা না পেয়ে শেষমেশ কিচেনেই দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে বসে রইলাম। চারপাশের নীরবতা তখন আমার বুকের ভেতরের শূন্যতাকে আরও বড় করে দিচ্ছিল। সেখানে বসে থাকতে থাকতে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি, নিজেই বুঝিনি।

হঠাৎ আজানের মধুর ধ্বনিতে ঘুম ভেঙে গেল। চোখ খুলে দেখি চারপাশ অদ্ভুত নিস্তব্ধ, যেন জীবন থেমে গেছে। সেই নীরবতা বুকের ভেতরটাকে আরও ভারী করে তুলল। হেলান থেকে উঠে দাঁড়াতেই মাথাটা ঝিমঝিম করে উঠল। দুনিয়াটা যেন একটু ঘুরে গেল। ঠিকমতো দাঁড়াতে পারছিলাম না। কোনোভাবে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে দু’হাতে মাথাটা শক্ত করে চেপে ধরলাম, যেন নিজেকেই ধরে রাখতে হবে। কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে শরীরটা স্থির হলো। কিচেন থেকে বের হয়ে ড্রয়িংরুমে এসে দেখি পুরো বাড়িটা ফাঁকা। ঘড়ির কাঁটা টিকটিক করে জানাচ্ছে— ৪:৩৮। আসরের আজান তখনো বাতাসে ভেসে আসছে।

আমি ফ্রেশ হওয়ার জন্য সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলাম। নিজের রুমের দিকে এগোতেই ভিড়ানো দরজায় হাত রাখলাম। হঠাৎই মনে পড়লো, এ রুমে এখন কনিকা আপু আছে। আর সেই মুহূর্তেই বুকের ভেতরটা আবার অজানা এক ব্যথায় চুপসে গেল। আপু হয়তো ঘুমিয়ে আছে ভেবে আমি ধীরে ধীরে রুমে ঢুকলাম ফ্রেশ হওয়ার জন্য।

কিন্তু পা রাখতেই যেন পুরো পৃথিবী এক মুহূর্তে থেমে গেল। দুনিয়াটা হঠাৎ দুলে উঠল আমার চোখের সামনে। আমি টলতে টলতে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে দেয়ালে ধাক্কা খেলাম। বুকের ভেতরটা এমনভাবে ভেঙে গেল, যেন নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। দু’হাতে মুখ চেপে ধরে নিঃশব্দে কেঁদে উঠলাম, শব্দ করে কাঁদার সাহসও যেন হারিয়ে ফেলেছি।

আপু উনার (মায়ান) শার্টের বা'টন খু'লে রাখা উ'ন্মুক্ত বু'কে মুখ গুঁ'জে শুয়ে আছে। আর উনি, উনি আপুকে দু’হাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে খাটের একপাশে হেলান দিয়ে চোখ বন্ধ করে আছেন, একটা স্বাভাবিক, শান্ত ঘুমের ভঙ্গি। কিন্তু সেই দৃশ্যটা আমার কাছে শান্তি নয়, যেন বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে ফেলার মতো এক যন্ত্রণা। আমি বুঝতে পারছিলাম না এখন কী করা উচিত। মাথা কাজ করছিল না, শুধু একটা কথাই বারবার ভেতরটা নাড়িয়ে দিচ্ছিল।

“এটা কী দেখলাম আমি?”

চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে করছিল। বুক ফেটে কান্না বের হয়ে আসতে চাইছিল। কিন্তু আমি জানতাম, একটা শব্দ হলেই উনি জেগে যাবেন। তাই নিজের কান্নাটাকেও গিলে ফেলতে হলো। থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে আমি দরজার দিকে পা বাড়ালাম। কিন্তু বের হওয়ার সময় দরজাটা হালকা ধাক্কা খেল। একটা ছোট্ট শব্দ হয়ে রুমে ছড়িয়ে পড়ল। পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি উনি চোখ খুলে ফেলেছেন। সরাসরি আমার দিকেই তাকিয়ে আছেন। এক মুহূর্ত, শুধু এক মুহূর্তেই আমার ভেতরের সব শক্তি শেষ হয়ে গেল। আমি আর দাঁড়ালাম না।

দৌড়ে সোজা স্টোর রুমে ঢুকে দরজাটা ধাক্কা দিয়ে বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু শান্তি এল না বরং বুকের ভেতরের ভাঙনটা আরও বেড়ে গেল। প্রবেশ করতেই আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। শরীরটা কাঁপছিল এতটাই, যেন যেকোনো মুহূর্তে ভেঙে পড়ে যাব। বুকের ভেতর জমে থাকা হাজারটা প্রশ্ন, অভিমান আর অপমান একসাথে গলা চেপে ধরছিল।

উনি আমার সামনে এসে দাঁড়াতেই আমি ঝাঁপিয়ে পড়লাম উনার ওপর। দু’হাতে উনার শার্ট শক্ত করে খামচে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বললাম,

“কেন? কেন এমন করলেন আমার সাথে? আমি কী দোষ করেছিলাম? আমি তো আপনাকে চিনতামও না। হঠাৎ কোথা থেকে এসে আমার পুরো জীবনটা এভাবে এলোমেলো করে দিলেন, কেন? বলুন!”

উনি নিশ্চুপ। একদম পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইলেন। সেই নীরবতা যেন আমাকে আরও ভেঙে দিচ্ছিল। আমি আবারও ওনাকে ঝাঁকিয়ে উঠলাম,

“কি হলো? কথা বলছেন না কেন? কেন ঠকালেন আমায়? কেন আপনার এই অপবিত্র স্পর্শে আমায় কলুষিত করলেন? জবাব দিন!”

আমার কণ্ঠ ভেঙে যাচ্ছিল। চোখের পানি গড়িয়ে গড়িয়ে পড়ছিল, কিন্তু তবুও থামছিল না। মনে হচ্ছিল বুকের ভেতরটা ছিঁড়ে যাচ্ছে। উনি হঠাৎ দু’হাতে আমাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলেন, যেন আমি ভেঙে না পড়ি। শান্ত গলায় বললেন,

“দেখো, আমি ইচ্ছে করে কিছুই করিনি। তোমার আপু আর দাদুভাইয়ের জোরা'জুরিতেই এমনটা করতে হয়েছে। প্লিজ, তুমি শান্ত হও। আমার কথাটা একবার শোনো।”

আমি ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলাম। কিন্তু শরীরটা আর সাপোর্ট দিল না। ভারসাম্য হারিয়ে ধপ করে ফ্লোরে বসে পড়লাম। মনে হচ্ছিল, শুধু শরীর না। আমার পুরো পৃথিবীটাই ভেঙে মাটিতে পড়ে গেছে। উনিও ধীরে ধীরে এসে আমার পাশে বসলেন। আমি চোখভরা অবিশ্বাস নিয়ে ওনার দিকে তাকালাম। ঠোঁট কাঁপছিল, গলা ভারী হয়ে আসছিল,

“জোরা'জুরিতে মানে? আপু নিজের স্বামীকে বিয়ে করার জন্য জোরাজুরি করেছে। এটা আপনি আমাকে বিশ্বাস করতে বলছেন?”

কিছুক্ষণ থেমে কাঁপা হাসি হাসলাম। সেই হাসির মধ্যে যন্ত্রণা ছাড়া আর কিছুই ছিল না।

“তারা না হয় জোর করেছে, কিন্তু আপনি? আপনি তো জানতেন আমি আপনার জন্য হারাম আর আপনি আমার জন্য। তাহলে কেন দিনের পর দিন এভাবে আমার কাছে এসেছেন? কেন আমাকে এই মিথ্যা সম্পর্কের মাঝে বেঁধে রাখলেন?”

চোখের পানি মুছে আবার বললাম,

“কি পেয়েছেন এমন করে? আমার জীবনটা নষ্ট করে। আমার বিশ্বাস ভেঙে, কি পেয়েছেন?"

বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল,

“আর আপুরই বা এতে কী লাভ হলো? নিজের ছোট বোনের জীবন এভাবে শেষ করে মানুষ কীভাবে শান্তিতে থাকে?”

--------চলবে~~--------

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন