#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
০৯
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
বুকের ভেতরটা মোচড় দিয়ে উঠল,
“আর আপুরই বা এতে কী লাভ হলো? নিজের ছোট বোনের জীবন এভাবে শেষ করে মানুষ কীভাবে শান্তিতে থাকে?”
উনি আমাকে ধরে নিজের সামনাসামনি করলেন। কণ্ঠটা দৃঢ়, অথচ ভেতরে চাপা এক অস্থিরতা স্পষ্ট।
“দাদু'ভাই আর তোমার আপু। আমি যাই করেছি, কিছুটা নিজেদের স্বার্থের জন্যই করেছি। কিন্তু বিশ্বাস করো, আমরা কেউই তোমার খারাপ চাইনি। আমি যা করেছি, তোমার ভালোর জন্যই করেছি। আর তুমি আমার হালাল স্ত্রী। আমি তোমাকে কোনো অপবিত্র স্পর্শ করিনি!”
উনার কথা শুনে আমি যেন একদম নিথর হয়ে গেলাম। বুকের ভেতরটা হঠাৎ করেই মোচড় দিয়ে উঠল। একজন শিক্ষিত মানুষ হয়ে উনি কীভাবে এমন কথা বলতে পারেন! তাও আবার উনি একজন মুসলিম, একজন ভার্সিটির শিক্ষক! তিনি কি জানেন না, একসঙ্গে দুই বোনকে বিয়ে করা ইসলামী শরিয়তে সম্পূর্ণ হারাম? একই মায়ের দুই কন্যাকে একজন পুরুষ একই সময়ে স্ত্রী হিসেবে রাখতে পারে না। এ কথা তো কুরআনেই স্পষ্টভাবে বলা আছে। বড় বোনের অনুমতি থাকলেও সেই নিষেধাজ্ঞা কখনো বদলায় না। তাহলে, উনি কীভাবে এত নিশ্চিন্তে আমাকে “হালাল স্ত্রী” বলছেন? আমি কষ্ট, রাগ আর অবিশ্বাসে কাঁপা গলায় বললাম,
“আপনি একজন শিক্ষক হয়ে এটুকুও জানেন না? একজন স্ত্রী থাকা অবস্থায় তার বোনকে বিয়ে করা যায় না। এটা স্থায়ী নিষেধ। বড় বোনের অনুমতিতেও এই হারাম কখনো হালাল হয় না!”
আমার কথা শুনে উনি হঠাৎ মৃদু হাসলেন। সেই হাসিটা দেখে আমি আরও অবাক হয়ে গেলাম। মনে হচ্ছিল, আমি যেন এমন কিছু বলেছি যা উনার কাছে অবাস্তব বা অদ্ভুত ঠেকছে। উনি ধীরে ধীরে দু’হাতে আমার কাঁধ চেপে ধরে শান্ত স্বরে বললেন,
“তোমাকে কে বলেছে, তুমি কনিকার আপন বোন? যেখানে কনিকা তোমার মায়ের পেটের বোনই না, সেখানে তুমি আমার হারাম স্ত্রী হবে কেন?”
উনার কথা শুনে আমি যেন আকাশ থেকে পড়লাম। মুহূর্তের মধ্যে চারপাশটা ঝাপসা হয়ে গেল। মাথার ভেতর কেমন ভোঁ ভোঁ শব্দ হতে লাগল। মনে হচ্ছিল, মাটিটাই যেন পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে।
এ কী বলছেন উনি? উনার কি মাথা খারাপ হয়ে গেছে? নাকি আমাকে শান্ত করার জন্য এসব বানিয়ে বলছেন? আমি তড়াক করে উনার হাত সরিয়ে দিলাম। চোখভরা অবিশ্বাস আর জমে থাকা কষ্ট নিয়ে কাঁপা গলায় বললাম,
“যতই আপনি এখন আমাকে বুঝানোর চেষ্টা করেন না কেন, আমি কিছুই মানবো না! আর যদি ধরেও নেই আপনার কথাই সত্যি। তাহলে কনিকা আপুকে এত ভালোবাসার পরও আপনি আমাকে বিয়ে করলেন কেন?”
শেষ কথাটা বলতে গিয়েই গলাটা ভেঙে এলো। কারণ প্রশ্নটা শুধু একটা বিয়ের ছিল না! প্রশ্নটা ছিল আমার ভেঙে যাওয়া বিশ্বাসের, আমার অজান্তে হারিয়ে ফেলা জীবনের, আর এমন এক সম্পর্কের, যার প্রতিটা স্মৃতি এখন আমার কাছে ধোঁয়াশা, প্রতিটা স্পর্শ যন্ত্রণায় মোড়া। আমি বুঝতে পারছিলাম না, আমি আসলে তার জীবনে কী ছিলাম? একজন স্ত্রী? নাকি শুধুই কারও সিদ্ধান্তের বলি?
উনি আমার প্রশ্নের কোনো জবাব দিলেন না। শুধু নিঃশব্দে আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন। অতিরিক্ত কান্না করার ফলে মাথাটা প্রচণ্ড ব্যথা করছিল। মনে হচ্ছিল, ভেতর থেকে কেউ মাথার রগগুলো টেনে ছিঁড়ে ফেলছে। আমি দু’হাতে মাথাটা চেপে ধরে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালাম। আমাকে দাঁড়াতে দেখে উনি উদ্বিগ্ন গলায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কোথাও যাচ্ছো?”
আমি উনার দিকে ফিরে তাকালাম না। দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে কাঁপা গলায় বললাম,
“আপুর কাছে, আমার জানতে হবে, আপু আমার সঙ্গে কেন এমন করেছে?”
আমার কথা শুনে উনিও তাড়াতাড়ি উঠে দাঁড়ালেন। কয়েক পা এগিয়ে এসে আমার হাত ধরে থামিয়ে দিলেন।
“পাগলামো করো না। কনিকা এখন অসুস্থ। ওকে প্রেসার দিয়ে আরও অসুস্থ করে দিও না।”
আমি ধীরে ধীরে চোখ তুলে উনার দিকে তাকালাম। কী অদ্ভুত! উনি আপুর অসুস্থতা নিয়ে চিন্তা করছেন। অথচ আমার সঙ্গে এত বড় অন্যায় করার পরও উনার চোখেমুখে অনুতাপের লেশমাত্র নেই।
কয়েক দিন আগেও তো উনি আমার সঙ্গে কত সুন্দর করে ভালোবাসার অভিনয় করেছেন। কত যত্ন করে পাশে বসিয়েছেন, বুকের মধ্যে জড়িয়ে ঘুমিয়েছেন। তখন কি একবারও উনার বুক কাঁপেনি? একবারও কি মনে হয়নি "এই মেয়েটাকে ঠকানো হচ্ছে?" তাহলে কি সত্যিই পুরুষ মানুষ নারীসঙ্গ পেলে গভীর থেকে গভীর ভালোবাসাও ভুলে যেতে পারে?
আমি আর নিজেকে সামলাতে পারলাম না। বুকের ভেতরে জমে থাকা সব কষ্ট যেন একসাথে বেরিয়ে আসতে চাইছিল। আমার এখনই সব জানতে হবে। এখনই। এই মুহূর্তে। আর এই হারাম সম্পর্ক থেকে আমাকে মুক্তি পেতেই হবে। আমি উনার দিকে তাকিয়ে কাঁপা, ভাঙা গলায় বললাম,
“আপনার ভালোবাসার মানুষের যেহেতু কষ্ট হবে, তাহলে আপনিই সবটা বলুন। কেন সবাই মিলে আমার সঙ্গে এমন করল? বলুন! আমাকে এই হারাম সম্পর্ক থেকে মুক্তি পেতে হবে, তাড়াতাড়ি বলুন!”
আমার কথা শেষ হতেই উনি হঠাৎ দু’হাতে আমাকে শক্ত করে ধরে ফেললেন। যেন আমি এখনই কোথাও হারিয়ে যাব। তারপর নিচু, ভারী গলায় বললেন,
“তুমি আগে একটু শান্ত হও। সব বলছি, আর কতবার বলব, তুমি কোনো হারাম সম্পর্কে নেই। আর না তোমার কোনো মুক্তি আছে।”
উনি থামলেন। তারপর আমার চোখের দিকে গভীরভাবে তাকিয়ে ধীরে ধীরে বললেন,
“তোমাকে সারাজীবন আমার নামেই থাকতে হবে।”
কথাটা শুনে বুকের ভেতরটা হঠাৎ করে মোচড় দিয়ে উঠল। এ যেন ভালোবাসার স্বীকারোক্তি ছিল না বরং এক অদ্ভুত বন্দিত্বের ঘোষণা। আমি শুধু নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসা চোখে উনার দিকে তাকিয়ে রইলাম। কারণ এই মানুষটাকে আমি যতটা বুঝেছি, ভেবেছিলাম, উনি তার থেকেও হাজার গুণ বেশি রহস্যময়।
আমি ধীরে ধীরে নিজেকে একটু স্থির করার চেষ্টা করলাম। কান্নাগুলো তখনও থামেনি পুরোপুরি, শুধু শব্দগুলো স্তব্ধ হয়ে গেছে। বুকের ভেতরটা ভারী হয়ে আছে, তবুও উনার কথা শোনার জন্য আবার ফ্লোরে বসে পড়লাম। উনিও আমার পাশে এসে বসলেন। চারপাশে অদ্ভুত এক নীরবতা। মনে হচ্ছিল, এই নীরবতার মাঝেই হয়তো আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সত্যগুলো লুকিয়ে আছে। উনি কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
★ফ্ল্যাশব্যাক.........
“আজ থেকে প্রায় দুই বছর আগে আমি কনিকাদের কলেজে কোচিং করাতাম। কনিকা তখন নবম শ্রেণিতে পড়ত। বার্ষিক পরীক্ষা কাছে চলে আসায় তোমার আব্বু কনিকাকে আমার কাছে পড়তে দিয়েছিলেন। আমিও ওকে খুব যত্ন করেই পড়াতাম। কনিকা পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করল। তাই দশম শ্রেণিতে ওঠার পরও তোমার আব্বু ওকে আমার কাছেই পড়তে বললেন। আমিও রাজি হয়ে গেলাম। মাঝে মাঝে ছুটির পর আমি ওকে বাড়ি পৌঁছে দিতাম। এভাবেই আসা-যাওয়ার মাঝখানে কখন যে আমাদের সম্পর্ক তৈরি হয়ে গেল, বুঝতেই পারিনি।”
উনি থামলেন একটু। আমি নিঃশ্বাস আটকে শুনছিলাম। উনার প্রতিটা কথার সাথে সাথে আমার বুকের ভেতরে কেমন চাপা ব্যথা জমে উঠছিল। মনে হচ্ছিল, আমি যেন নিজের অজান্তেই এমন এক গল্প শুনছি, যেখানে আমার কোনো অস্তিত্বই ছিল না। উনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“কনিকা এসএসসি পরীক্ষা দেওয়ার পর তোমার আব্বু ওকে বিয়ে দিতে চাইলেন। সেই কথাটা কনিকা আমাকে জানায়। আমি তখন কিছু না ভেবেই, সরাসরি কাজী অফিসে গিয়ে ওকে বিয়ে করে ফেলি। আমি চেয়েছিলাম কনিকাকে আমাদের বাড়িতে নিয়ে আসতে। তাই প্রথমে তোমার আব্বুর সঙ্গে দেখা করি। উনি প্রথমে কিছুতেই মেনে নিতে চাননি। কিন্তু কনিকার কান্না দেখে হয়তো উনার মন গলে যায়।
শেষ পর্যন্ত উনি একটা শর্তে রাজি হন। কনিকা এইচএসসি পরীক্ষা শেষ না হওয়া পর্যন্ত তোমাদের বাড়িতেই থাকবে। আমিও সেটা মেনে নিই। তারপর আমার বাড়িতে সবাইকে জানাই। আশ্চর্যের বিষয়, কেউ তেমন আপত্তি করেনি। বরং সবাই খুব সহজেই মেনে নিয়েছিল। তাদের নাকি কনিকাকে অনেক পছন্দ হয়েছিল!"
এতটুকু বলেই উনি থেমে গেলেন। আমি আরও বেশি অস্থির হয়ে উঠলাম। সবকিছু শুনে মনে হচ্ছিল- হ্যাঁ, এটা একটা স্বাভাবিক ভালোবাসার গল্প হতে পারত! কিন্তু তাহলে আমার জীবনে এই অন্ধকার নামল কেন? আমার সঙ্গে এই প্রতারণা কেন হলো? আমি কাঁপা গলায় উনার দিকে তাকিয়ে বললাম,
“তারপর কী হয়েছিল? আর আমার সঙ্গেই বা এত কিছু কেন হলো?”
আমার প্রশ্ন শুনে উনি দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসে যেন বহুদিনের জমে থাকা ক্লান্তি, অপরাধবোধ আর না বলা অসংখ্য সত্য একসাথে মিশে ছিল।তারপর ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করলেন…
--------চলবে~~~---------
গল্পটা কেমন হয়েছে জানাবেন প্লিজ🙏আর পেইজটা ফলো করে পাশে থাকবেন।