#কবুলের_আড়ালে_চুক্তি
১০
#𝐀𝐧𝐯𝐞𝐬𝐡𝐚_𝐍𝐢𝐡𝐚𝐫𝐢𝐤𝐚
তারপর ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করলেন,
“কনিকাকে মেনে নেওয়ার পর মাঝে মাঝেই ও আমাদের বাড়িতে এসে থাকত। তোমার মনে আছে কিনা জানি না। মাঝখানে টানা তিন মাস কনিকা তোমাদের বাড়িতে ছিল না। সবাই জানত, ও নাকি তোমার খালার বাড়িতে বেড়াতে গেছে। কিন্তু সত্যিটা হলো সেই সময়টাতে কনিকা আমাদের বাড়িতেই ছিল।”
আমি নিঃশব্দে উনার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মনে হচ্ছিল, প্রতিটা কথার সাথে সাথে আমার চেনা পৃথিবীটা একটু একটু করে বদলে যাচ্ছে। উনি নিচু স্বরে আবার বলতে লাগলেন,
“সেই সময়ই একদিন কনিকা হঠাৎ খুব অসুস্থ হয়ে পড়ে। আমি ওকে ডক্টরের কাছে নিয়ে যাই। অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর ডক্টর আমাদের জানালেন…”
উনি থেমে গেলেন। চোখ দুটো কেমন নিস্তেজ হয়ে এলো। তারপর ভারী গলায় বললেন,
“কনিকা কোনোদিন মা হতে পারবে না।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। উনার চোখে তখন অদ্ভুত এক শূন্যতা। মনে হচ্ছিল, সেই দিনের অসহায়ত্বটা এখনো উনাকে তাড়া করে বেড়ায়। উনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“আমার এতে কোনো সমস্যা ছিল না। সত্যি বলছি, আমি শুধু কনিকাকেই চেয়েছিলাম। ও মা হতে পারুক আর না-ই পারুক! আমার কিছু যায় আসত না। কিন্তু দাদু'ভাই আর আম্মু সেটা মেনে নিতে পারেনি। তাদের একটাই কথা- এই বংশের প্রদীপ লাগবে। আমি বলেছিলাম, আমরা একটা বাবু অ্যাডপ্ট করে নেব। কিন্তু তারা সরাসরি না করে দেয়। তারপর দাদা-দাদি আর আম্মু আমার ওপর দ্বিতীয় বিয়ের জন্য প্রচণ্ড চাপ দেওয়া শুরু করে। আমি রাজি হইনি। কখনোই না। কিন্তু একসময়, কনিকাও তাদের সঙ্গে সুর মেলাতে শুরু করল।”
শেষ কথাটা বলতে গিয়ে উনার কণ্ঠ কেঁপে উঠল সামান্য। মনে হচ্ছিল, সেই স্মৃতিগুলো এখনও উনাকে ভেতর থেকে ভেঙে দেয়। উনি কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বললেন,
“তারপরও আমি হাল ছাড়িনি। কনিকাকে নিয়ে অনেক ডক্টরের কাছে গিয়েছি। এক শহর থেকে আরেক শহর। এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতাল। কিন্তু সব ডক্টর একই কথাই বললেন। কনিকা মা হতে পারবে না!"
চারপাশটা তখন আরও ভারী লাগছিল। যেন ঘরের বাতাসেও জমে আছে দীর্ঘশ্বাস আর অপূর্ণতার গন্ধ। উনি ধীরে ধীরে আবার বলতে শুরু করলেন,
“একদিন তোমার আব্বু দাদু'ভাইকে কল দিয়ে জানালেন, তোমার বিয়ে নাকি এক বড়লোক পরিবারের মধ্যবয়স্ক লোকের সঙ্গে ঠিক করেছেন।
শর্ত ছিল, তোমাকে বিয়ে করার বিনিময়ে তারা তোমার আব্বুকে পাঁচ লক্ষ টাকা দেবে। তোমার আব্বুর তখন অনেক ঋণ ছিল। তোমার বড় দুলাভাই ব্যবসার জন্য টাকাও চেয়েছিল। হয়তো সেই কারণেই প্রস্তাবটা তোমার আব্বুর পছন্দ হয়ে যায়। তাই উনি রাজি হয়ে যান।
কথাগুলো শুনে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ হু হু করে উঠল। তাহলে, আমার জীবনটা কি শুধু কিছু টাকার বিনিময়ে বিক্রি হয়ে যাচ্ছিল? আমি কি কারও মেয়ে ছিলাম না? কারও দায়িত্ব ছিলাম না? শুধু একটা বোঝা, যাকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সবাই এত সহজে সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছিল? উনি পুনরায় বলতে শুরু করলেন,
“কনিকা যখন এসব কথা জানতে পারল, তখন ও সবকিছু দাদু'ভাইকে গিয়ে বলে। তারপর দাদু'ভাই আর আম্মু মিলে ঠিক করল, তোমার আব্বুকে সেই পাঁচ লক্ষ টাকা তারাই দেবে সাথে আরও দুই লক্ষ বাড়িয়ে দিবে। শুধু যাতে তোমার বিয়ে আমার সঙ্গে হয়।
আমি নিঃশব্দে শুনছিলাম। প্রতিটা শব্দ যেন বুকের ভেতর ধীরে ধীরে ছুরি হয়ে বিঁধছিল। উনি কিছুক্ষণ থেমে আবার বললেন,
“কিন্তু আমি তখনও রাজি হচ্ছিলাম না। কারণ আমি সবসময় ভেবেছিলাম, তুমি কনিকার আপন বোন। তোমাকে বিয়ে করলে সম্পর্কটা হারাম হবে। এই বিষয়টা নিয়েই আমি দাদু'ভাইয়ের সঙ্গে কথা বলি। আর তখনই আমি সত্যিটা জানতে পারি।”
উনার কণ্ঠটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে এলো। আমি অজান্তেই নিঃশ্বাস আটকে শুনতে লাগলাম। উনি নিচু স্বরে বললেন,
“তুমি কনিকার মায়ের পেটের বোন না!
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। মনে হচ্ছিল, পৃথিবীটা আবারও আমার পায়ের নিচ থেকে সরে যাচ্ছে। উনি বলতে লাগলেন,
“তোমার আব্বু-আম্মু ভালোবেসে বিয়ে করেছিলেন। কিন্তু বিয়ের কিছুদিন পরই তোমার আব্বু তোমার আম্মুকে বাবার বাড়িতে রেখে চলে যায়। তারপর আর কখনো ফিরে আসেনি।”
আমি নিঃশব্দে তাকিয়ে রইলাম। চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে আসছিল। উনি ধীরে ধীরে বললেন,
“তোমার জন্মের দিনই তোমার আম্মু মারা যান। সেদিন তোমার পাশে দাঁড়ানোর মতো কেউ ছিল না। তোমার আম্মুর দেখাশোনা করারও কেউ ছিল না। কনিকার আম্মু আর তোমার আম্মু ছিল কাকাতো বোন। তোমার আম্মু মারা যাওয়ার পর তোমাকে মানুষ করার মতোও কেউ ছিল না। তাই কনিকার আম্মুই তোমাকে নিজের কাছে নিয়ে আসে, নিজের মেয়ের মতো করে বড় করে।”
শেষ কথাগুলো বলতে গিয়ে উনার কণ্ঠে অদ্ভুত এক মায়া মিশে গেল। আর আমি, আমি যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গিয়েছিলাম। এতদিন যাদের “আব্বু-আম্মু” বলে জেনেছি, যাকে নিজের আপন বোন ভেবেছি, যে সম্পর্কগুলোকে আঁকড়ে ধরে বেঁচে ছিলাম! সেগুলোর ভিতটাই তাহলে মিথ্যে ছিল? আমার পুরো অস্তিত্বটাই যেন মুহূর্তের মধ্যে কেঁপে উঠল। উনি নিচু গলায় আবার বললেন,
“এসব জানার পর, বুকের ভেতর তোমার জন্য কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট হচ্ছিল।”
আমি চোখ তুলে উনার দিকে তাকালাম। প্রথমবারের মতো মনে হলো উনার চোখেও হয়তো কোথাও না কোথাও একটা অদৃশ্য যন্ত্রণা আছে। কিন্তু সেই যন্ত্রণা কি আমার ভাঙা জীবনের সমান? হয়তো না। কারণ উনি সত্যিটা জেনেছিলেন আর আমি? আমি তো এতদিন নিজের জীবনটাই ভুল মানুষদের বিশ্বাস করে বেঁচে ছিলাম। সত্যিগুলো জানার পর আমার যেন কথ্যশক্তিই হারিয়ে গেল। কণ্ঠনালী দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছিল না। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন আমার গলাটা শক্ত করে চেপে ধরেছে। নিঃশ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছিল। চোখ দিয়ে আপনা-আপনি জল গড়িয়ে পড়ছিল। আমি বহু কষ্টে নিজেকে সামলে, ভাঙা গলায় বললাম,
“তারপর…?”
উনি আবারও একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেই দীর্ঘশ্বাসে ক্লান্তি ছিল, চাপা যন্ত্রণা ছিল। আর ছিল এমন কিছু সত্যের ভার, যা আমার জীবনটাকে পুরো বদলে দিয়েছিল। উনি ধীরে ধীরে বলতে শুরু করলেন,
“তোমার আব্বু প্রথমে কিছুতেই রাজি হয়নি। পরে তোমার আম্মু, আপুরা অনেক বুঝিয়েছে। বিশেষ করে কনিকা নিজে থেকে চেয়েছিল বলেই উনি শেষ পর্যন্ত রাজি হন।”
আমি চুপচাপ শুনছিলাম। প্রতিটা কথা যেন আমার বুকের ভেতর নিঃশব্দে রক্ত ঝরাচ্ছিল। উনি আবার বললেন,
“পরে, বাধ্য হয়ে আমিও রাজি হলাম। তারপর আমাদের বিয়ে হলো। আমি প্রথমে বাবু নিতে চাইনি। ভেবেছিলাম, তুমি আরেকটু বড় হও, তারপর সবকিছু ভাবব। কিন্তু কনিকা, দাদা আর আম্মুর চাপের কারণে শেষ পর্যন্ত রাজি হতে হয়েছে।”
আমি নিঃশব্দে মাথা নিচু করে বসে রইলাম। এতক্ষণে বুঝতে পারছিলাম! আমার জীবনটা যেন শুরু থেকেই অন্যদের সিদ্ধান্তে লেখা একটা গল্প ছিল। যেখানে আমার ইচ্ছা, অনিচ্ছা, অনুভূতি কোনোটারই কোনো মূল্য ছিল না। উনি আবার বলতে শুরু করলেন,
“এর মধ্যে তুমি যখন বাবার বাড়িতে ছিলে, তখন কনিকা আমাদের বাড়িতেই ছিল। আমি আমেরিকার একজন ডক্টরের সঙ্গে যোগাযোগ করি। উনি বলেন, কনিকাকে নিয়ে যেতে। তারপর আমি ওকে নিয়ে চিকিৎসা করাই। দ্বিতীয়বার ডক্টর দেখানোর পর জানতে পারলাম…”!
উনার গলায় হঠাৎ অদ্ভুত এক তৃপ্তি মিশে গেল। চোখেমুখেও ফুটে উঠল বহু প্রতীক্ষিত সুখের ছাপ। উনি ধীরে ধীরে বললেন,
“আলহামদুলিল্লাহ! এখন কনিকা মা হতে পারবে।”
কথাটা শুনে আমার বুকের ভেতরটা হঠাৎ শূন্য হয়ে গেল। হ্যাঁ, উনি সত্যিই নিজের বহু প্রতীক্ষিত জিনিসটা পেয়ে গেছেন। শুধু মাঝখানে আমার জীবনটা নিয়ে একটু খেলা হয়েছে আর কী। আমি ধীরে ধীরে চোখ তুলে উনার দিকে তাকালাম। তারপর অদ্ভুত শান্ত স্বরে বললাম,
“এখন তো আপনাদের বাবু হবে। এখন আর আমার কোনো প্রয়োজন নেই। তাহলে আমাকে মুক্তি দিয়ে দিন।”
আমার কথা শুনে উনি যেন হঠাৎ রেগে গেলেন। চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। তারপর ভারী, বাজখাঁই গলায় বললেন,
“কিসের মুক্তি? তোমাদের দু’জনকে রাখার সামর্থ্য আমার আছে। তাই দু’জনই থাকবে।”
আমি আর সহ্য করতে পারলাম না। মনে হচ্ছিল, বুকের ভেতর জমে থাকা অপমান, কষ্ট, ভাঙাচোরা অনুভূতিগুলো একসাথে বিস্ফোরিত হয়ে যাচ্ছে। এটা কেমন কথা? আমাকে তো এই বাড়িতে আনা হয়েছিল শুধু একটা সন্তানের আশায়। এখন যখন সেই সন্তান উনার ভালোবাসার মানুষই দিতে পারবে তাহলে আমাকে রেখে দেওয়ার মানেটা কী? আর আমি নিজেও তো আর থাকতে পারব না। আমি কাঁপা অথচ দৃঢ় কণ্ঠে বললাম,
‘আপনার সামর্থ্য থাকতে পারে দু'জন স্ত্রী রাখার, কিন্তু আমার সামর্থ্য নেই নিজের স্বামীকে অন্য কারও বিছানায় দেখার।"
---------চলবে~~~---------