#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ
#৯ম_পর্ব
অয়ন কৌতুহলী স্বরে শুধালো,
“কে তুমি?”
“আমি প্রাপ্তি মজুমদার, ফার্স্ট ইয়ার”
প্রাপ্তির উৎকণ্ঠাভরা স্বর শুনতেই অয়ন ঈষৎ চমকালো। তেলাপোকা এখানে কি করে আটকা পড়লো? সকালের পর থেকে মেয়েটাকে একটি বারই দেখেছিলো অয়ন। যখন খাবার ডিসট্রিবিউট করা হচ্ছিলো তখন মেয়েটিকে আবরারের সাথে দেখেছিলো অয়ন। আবরার এবং সে কেস স্ট্যাডি সেশনের পার্টনার। শুধু তাই নয়, তারা জিতেছেও। অবাককর ব্যাপার নয়। আবরার, অয়নের মত নয়। অয়নের ঠিক উলটো স্বভাব তার। বন্ধুবান্ধব নেই, পড়াশোনায় অতিরিক্তই মনোযোগী। সুতরাং তার পক্ষে কেস স্ট্যাডির প্রতিযোগিতায় জেতা কঠিন ব্যপার নয়। কিন্তু কথা সেটা মোটেই নয়। কথা হচ্ছে মেয়েটা এখানে কি করছে? অয়ন সন্দিহান স্বরে বললো,
“তুমি এখানে কি করছো?”
প্রাপ্তি কণ্ঠটা এবার যেন চিনতে পারলো। একটু থেমে বললো,
“বাথরুমে তো আর নাচতে আসে নি। বাথরুম করতেই এসেছি। কিন্তু কারা যেন আমাকে আটকে দিয়েছে”
প্রাপ্তির গলা শুকিয়ে আসছে। গরমে ঘামছে সে। প্রায় আধা ঘন্টার মত সে এখানে আটকে আছে। প্রতিযোগিতা শেষে ওয়াশরুমের জন্য এখানে আসা। অডিটরিয়ামের ওয়াশরুমটা খালি ছিলো না। তাই একাডেমিক ভবনে আসা। একমাত্র দোতালার লেডিস ওয়াশরুমটাই খোলা ছিলো। তাই প্রাপ্তি সেটাই ব্যবহার করে। সেখানে আরোও কিছু মেয়েও ছিলো। মেয়েগুলোকে প্রাপ্তির চিনতে খুব কষ্ট হলো না। ভার্সিটির প্রথম দিন তারাই তাকে র্যাগ দেবার চেষ্টা করেছিলো। তাদের মধ্যে বিন্তিও ছিলো। বিন্তি কিছু নিয়ে কথা বলছিলো। প্রাপ্তিকে দেখেই তারা চুপ হয়ে গেলো। সেই সাথে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে ছিলো। তাদের দৃষ্টি অপ্রস্তুত করলো যদিও, কিন্তু প্রাপ্তি বেশি গা করলো না। বাথরুম করে দরজা খুলতে যাবে তখনই খেয়াল করলো বাহির থেকে দরজাটা আটকানো। তখন থেকে গলা ফাঁটিয়েই যাচ্ছে। কিন্তু কেউ দরজা খুলে নি। রাইসাকে যে ফোন করবে তার উপায় নেই। তার ফোন, ব্যাগ সব রাইসার কাছে। যদিও তাকে বলে এসেছে, কিন্তু বোকা মেয়েটা আদৌও খোঁজ করবে কি না সন্দেহ। প্রাপ্তি নিশ্চিত এই কাজটা ওই বদ সিনিয়রগুলোর। মানুষের খেয়ে কাজের কত অভাব সেটা এই মেয়েগুলোকে না দেখলে কখনো বিশ্বাস করত না প্রাপ্তি। খুব অধৈর্য্য গলায় বললো,
“দরজাটা কি খুলবেন আপনি?”
অয়ন ভালো করে ছিটকিনিটা দেখলো। ছিটকিনি ভাঙ্গা। হ্যান্ডেলটাই নেই। এই দরজাটা খুলতে গেলে ছিটকিনি ভাঙতে হবে। অয়ন দরজাটা দেখে বাঁকা হাসলো। হিনহিনে স্বরে বললো,
“দরজা আমি খুলে দিতেই পারি, কিন্তু একটা শর্ত আছে”
প্রাপ্তি চুপ করে গেলো। অয়নের মুখে শর্তের কথাটা শুনতেই বুঝতে বাকি রইলো না এই বদ সিনিয়র ভাই ঠিক কি শর্ত রাখবে। নিশ্চিত সকালের কাজের শোধ নিবে। অয়নকে চিনতে তার বাকি নেই। রীতিমত দাম্ভিক, অহংকারী, আলালের ঘরের দুলাল স্বভাবের পুরুষ। তার কাজই খালি মানুষকে যন্ত্রণা দেওয়া। প্রথমে মামার লালবানু, তারপর প্রাপ্তির চুল এখন শর্ত। অয়ন উত্তর না পেয়ে দরজাতে টোকা দিলো। বললো,
“তেলাপোকা কি মরে টরে গেলে নাকি? এখন মর না প্লিজ, আমি যাবার পর মর। তোমার মামার কোনো গ্যারেন্টি নেই। আমার নামে খুনের মামলা করে দিতে পারে। আমি বাবা, এসব ঝামেলাতে নেই। ভালো ছেলে আমি”
“এতো কথা বলার এনার্জি পান কোথায়?”
“আমি কি তোমার মত অপুষ্ট? ভাত খাই দুইবেলা, এক বেলা পরোটা”
“মরে যান তো প্লিজ”
“অকৃতজ্ঞ মেয়ে, আমি মরে গেলে দুদিন এই বাথরুমেই আটকা থাকবা। ক্লাস রবিবার। এখন বলো, শর্তে রাজি? রাজি হলেই আমি দরজা খুলবো। নয়তো মর। আমার কি?”
প্রাপ্তি চুপ করে রইলো। সে কখনোই এই বদ সিনিয়র ভাইয়ের সামনে মাথানত করবে না। মরে গেলেও না। অনেক কষ্টে পয়েন্ট সমান করেছে সে। মোটেই জিততে দিবে না এই অহংকারী ছেলেটাকে। প্রাপ্তির সাড়া না পেয়ে অয়ন আফসোসের সুরে বললো,
“সুযোগ দিয়েছিলাম, তুমি নিলে না। কি করার। সন্ধ্যে হচ্ছে। আমি যাই। গুড নাইট, তেলাপোকা”
কথাটার শোনার পর ই পায়ের শব্দ শোনা গেলো। সিনিয়রটা সত্যি চলে গেলো? কতটা অকৃতজ্ঞ! সকালে প্রাপ্তি সাহায্য করলো অথচ একটা ধন্যবাদ তো দিলোই না, এখন সাহায্যও করলো না। প্রাপ্তির এমন স্বার্থপর মানুষের মুখ দ্বিতীয়বার দেখার ইচ্ছে নেই। একদম নীরবতা, কোনো শব্দ নেই মানুষের। প্রাপ্তি দীর্ঘশ্বাস ফেললো। সত্যি সত্যি দুদিন বাথরুমেই আটকে থাকতে হবে? ছোটবেলায় একবার ছুটির ঘন্টা সিনেমাটা দেখেছিলো প্রাপ্তি। সিনেমাটা মস্তিষ্কের প্রতিটা কোষে একেবারে ছেপে গিয়েছে। সেই থেকে কোনো জায়গায় আটকে যাওয়া ব্যাপারটাকে খুব ভয় পায় প্রাপ্তি। অজান্তেই ঘামতে লাগলো। ভয় করছে। বাথরুমের লাইটটা ঠিক মত ঝলছে না। এই অন্ধকারে, জনশূণ্য বিল্ডিং এ কি করে থাকবে প্রাপ্তি! মামী এই নিয়ে নিশ্চিত একটা গন্ডগোল পাকাবেন। মামী শুধু ছুতো খুঁজেন। কখন প্রাপ্তিকে দু কথা শুনালো যায়। অনেকগুলো চিন্তা একসাথে হানা দিলো প্রাপ্তির মস্তিষ্কে। প্রাপ্তি নিজেকে নিজে সান্ত্বনা দিলো,
“রিল্যাক্স, রিলাক্স। কিচ্ছু হয় নি। কিচ্ছু না। থিংক, থিংক”
প্রাপ্তি মনে মনে ঠিক করলো, সেই ধাক্কা দিবে। একটা সময় ছিটকিনি খুলেও যেতে পারে। ঠিক তখনই ধরাম করে একটা শব্দ হলো। আর দরজাটা খুলে গেলো। প্রাপ্তির মনে চেপে থাকা ভয়টা কেটে গেলো মূহুর্তেই। দরজাটা খুলতেই দেখলো অয়ন বুকে হাত বেঁধে দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটে দুষ্টু হাসি। প্রাপ্তির হতভম্ব মুখটা তাকে আনন্দ দিচ্ছে। প্রাপ্তি বাথরুম থেকে বের হতেই বললো,
“জনদরদী মানুষ আমি, কোমল হৃদয়। তাই তোমার উপর দয়া হলো”
“আমি কি আপনার দয়া চেয়েছি?”
“মাঝে মাঝে একটু সওয়াব কামাতে ইচ্ছে হয়। জান্নাতে হুরপরী পাওয়ার চান্স বেড়ে যায়। তুমি বুঝবা না, অনেক হাই থটের ব্যাপার স্যাপার। যাক, মনে রেখো এই অয়ন ভাই-ই তোমাকে আজ বিপদ থেকে রক্ষা করেছে। আমাকে এখন থেকে স্যার বলবা, ঠিক আছে খুকি?”
প্রাপ্তি চোখ মুখ খিঁচিয়ে তাকিয়ে রইলো অয়নের দিকে। অয়ন তার ক্ষিপ্ত দৃষ্টিতে পাত্তা দিলো না। পকেটে হাত ঢুকিয়ে হাটতে শুরু করল। তারপর আবার একটু থেমে বললো,
“কি হলো? এখানেই থাকার চিন্তাভাবনা আছে নাকি? শুনেছি এই বাথরুমে ভূত আছে। থাকতে হলে থাকো। আমার কি?”
প্রাপ্তি গাল ফুলিয়া দীর্ঘশ্বাস ফেললো। নিজের রাগ সামলালো। অন্য কেউ হলে ধন্যবাদ অবশ্যই দিত। কিন্তু অয়নকে ধন্যবাদ কখনোই দিবে না সে। এই ছেলের ভরসা নেই। কখন কোথায় শোধ তুলে বসবে, কে জানে!
*****
রাইসা চিন্তা চিন্তায় পাগলপ্রায়। প্রাপ্তিকে সে খুঁজে পাচ্ছে না। মেয়েটা ওয়াশরুমের কথা বলে একঘন্টা ধরে গায়েব। ফোন, পার্স সব কিছুই তার কাছে। কোন একাডেমিকে গিয়েছে সেটাও বলে যায় নি। ভার্সিটিতে মোট চারটা একাডেমিক বিল্ডিং। এখন কোথায় খুঁজবে? অডিটোরিয়ামের বাহিরে পায়চারি করছিলো সে চিন্তায়। এতো পায়চারি করেছে যে নিশ্চিত ওজন কমে যাবে তার। তখনই দেখলো প্রাপ্তি এবং অয়ন পাশাপাশি হেটে আসছে। রাইসার মুখ হা হয়ে গেলো। সে কি অষ্টম কোনো আশ্চর্য দেখছে? ট্রাম্প আর শি চিনফিং হাত মিলালো নাকি? বিশ্বযুদ্ধ বন্ধ?
রাইসা প্রাপ্তিকে দেখতেই এগিয়ে এলো। একবার অয়নের দিকে তাকিয়ে প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে উৎকণ্ঠিত স্বরে শুধালো,
“কোথায় ছিলি? আমি অস্থির হয়ে গেছিলাম”
“দেরি কি সাধে হয়েছে? কয়েকটা ফাজিল দরজা আটকে দিয়েছিলো”
বলেই আড়চোখে একবার অয়নের দিকে তাকালো প্রাপ্তি। অয়ন সেই দৃষ্টি অনুধাবন করেই বলে উঠলো,
“এই আমার দিকে তাকাচ্ছো কেন? আমি আটকেছি নাকি”
প্রাপ্তি উত্তর দিলো না। রাইসার থেকে নিজের জিনিসপত্র নিয়ে বললো,
“আমি আসছি। আযান দিচ্ছে”
অয়ন তখন একটা রিক্সা ডাক দিলো। প্রাপ্তির উদ্দেশ্যে বললো,
“উঠে পড়ো”
প্রাপ্তি সূঁচালো নয়নে চাইলে সে হেসে বললো,
“রিক্সা ডেকে দিয়েছি, চালিয়ে নিয়ে যাব না আবার ভাড়াও দিব না। সিনিয়র হিসেবে একটু হেল্প করলাম আর কি! উঠবে না? হেটে যাবে মেইন গেট পর্যন্ত? আমার রাগ অহেতুক নিজের পা আর রিক্সাওয়ালা মামার পেটের উপর দিও না”
অন্যসময় হলে প্রাপ্তি রিক্সায় উঠতো না। হয়তো হেটেই যেত। কিন্তু এখন বাসায় যাওয়া প্রয়োজন। তাই কথা না বলেই রিক্সায় উঠে পড়লো। রিক্সা চললো নিজ গন্তব্যে। অয়ন রাইসার উদ্দেশ্যে বলল,
“তোমার তো সেই ট্যালেন্ট, একেবারে ভিঞ্চির ফিমেইল ভার্শন। তেলাপোকাকে মোনালিসা বানিয়ে দিয়েছো”
“বুঝলাম না ভাইয়া?”
দ্বিধান্বিত স্বরে শুধালো রাইসা। অয়ন হেসে বললো,
“কিছু না”
বলেই পকেটে হাত ঢুকিয়ে শিস বাজাতে বাজাতে পকেট গেটের উদ্দেশ্যে পা বাড়ালো। রাইসার তখন মনে পড়লো সে তো বলতেই ভুলে গেছে আবরার ভাই প্রাপ্তিকে খুঁজছিলো।
******
মিরাজ বিছানায় বসে বই পড়ছিলো। “দূরে কোথাও”। বইটা মনোযোগ দিয়ে পড়ছে সে। আগামী দুদিন বই পড়েই দিন কাটাবে সে। যদিও চেয়েছিলো মম এবং প্রাপ্তিকে নিয়ে একটু ঘুরতে যাবে কিন্তু মা ব্যাপারটাকে ভালো চোখে দেখবেন না। সন্ধ্যায় প্রাপ্তিকে মুখ ফসকে বলে ফেলেছিলো,
“তোমাকে তো খুব সুন্দর লাগছে প্রাপ্তি। শাড়ি স্যুটস ইউ”
অমনি নিহার বেগম কড়াচোখে তাকালেন। মাকে বলার দরকার তার একজন প্রেমিকা আছে। অহেতুক প্রাপ্তির সাথে যেন তাকে জড়ানো না হয়। কিন্তু বলতে কেমন অস্বস্তি হচ্ছে। মা ঠিক কেমন প্রতিক্রিয়া দেখাবেন তার কোনো নিশ্চয়তা নেই। মিরাজ তাই শান্তই আছে। দরজায় কড়া নাড়লো তখন প্রাপ্তি,
“আসবো মিরাজ ভাই”
মিরাজ উঠে বসলো। বইটা পাশে রেখে দিলো। নরম স্বরে বললো,
“হ্যা, আসো। অনুষ্ঠান কেমন হলো? ল্যাপটপটা কাজ করেছে তো?”
প্রাপ্তি ল্যাপটপটা রাখলো মিরাজের টেবিলে। হেসে বললো,
“হ্যা, চালিয়ে নিয়েছে। আসলে ব্যাটারির অবস্থা বোধ হয় ভালো না। বন্ধ হয়ে যাচ্ছিলো শুধু”
“তোমার একটা ল্যাপটপ মাস্ট লাগবে প্রাপ্তি। আমার এই ল্যাপটপটা খুব সাহায্য করবে বলে মনে হয় না”
প্রাপ্তি চিন্তায় পরে গেলো। ল্যাপটপ কেনার কথা মাকে জানাবে? হোস্টেলের ব্যাপারটাই তো সমাধান হলো না। এখন আবার ল্যাপটপ! ম্লান স্বরে শুধালো,
“কেমন দাম হবে?”
“সেকেন্ড হ্যান্ড কিনলে ত্রিশ বা পয়ত্রিশ। আর নতুন হলে পঞ্চাশ”
প্রাপ্তির মুখ ছোট হয়ে গেলো। মিরাজ কিছু একটা আঁচ করতে পারলো যেন। ফলে বললো,
“আরে আমারটা তো আছেই। আপাতত ঠেলেঠুলে চালাও। দরকার হলে আমি ব্যাটারি চেঞ্জ করে দিব”
“আপনার খরচা হবে”
“ছোট বোনদের জন্য খরচ করা মন্দ না। আর তোমার ভাই চাকরি করে”
প্রাপ্তি ম্লান হাসলো। উঠে বললো,
“আসছি”
বলেই বেরিয়ে গেলো ঘর থেকে। কারোর থেকে সাহায্য নিতে খুব ইতস্ততবোধ হয় প্রাপ্তির। কিন্তু নিজের পরিবারের মানুষদের বলেও লাভ নেই। বাবা শুনলে হয়তো বলবেন,
“পড়ার কি দরকার? চলে আসো”
মিরাজের ঘর থেকে বের হতেই নিগার বেগমের সাথে দেখা হলো প্রাপ্তির। নিগার বেগম এমন বিচিত্র দৃষ্টিতে তাকাচ্ছেন। এই দৃষ্টিটা মোটেই ভালো লাগলো না প্রাপ্তি। অস্বস্তিবোধ হলো যেন।
****
রবিবার ক্লাসে পৌছাতেই বিচিত্র দৃষ্টির সম্মুখীন হলো প্রাপ্তির। সবাই তাকে আড়চোখে দেখছে। আবার চোখে চোখ পড়তেই চোখ সরিয়ে নিচ্ছে। প্রাপ্তি নিজের প্রথম বেঞ্চে বসলো। তার পাশে বসে আছে রাইসা। প্রাপ্তি বসতেই সে স্বর খাঁদে নিয়ে বললো,
“একটা কথা বলি? রাগ করবে না তো?”
“কি?”
“তুমি আর অয়ন ভাই কি প্রেম করছো?”………
চলবে