#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ
#১০ম_পর্ব
“তুমি আর অয়ন ভাই কি প্রেম করছো?”
রাইসার কথা শুনতেই আকাশ থেকে পড়লো যেন প্রাপ্তি। হতভম্ব হয়ে গেলো মুখ। প্রেম আর সে? প্রেম শব্দটার বাস্তবিক কোনো প্রমাণ বই খাতায় নেই। এটা একটি মহাজাগতিক চিন্তাধারা যার অস্তিত্ব নেই। প্রেম অনেকটা ভুতের মত। ভুতের যেমন কোনো অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেন নি। তেমন প্রেমেরও কোনো অস্তিত্ব বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করতে পারেন নি। সবই মস্তিষ্কের হরমোনাল গোলযোগ। কিন্তু প্রাপ্তির মস্তিষ্কে কোনো গন্ডগোল নেই। সুতরাং তার জীবনে প্রেমে পড়ার কোন সম্ভাবনাও নেই। প্রাপ্তির ধারণা তার মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ কম হয়, একারণেই সে খুব একটা অনুভূতিপ্রবণ নয়। তাই প্রেম করার প্রশ্নই উঠে না। আর অয়ন নামক পুরুষের সাথে প্রেম করার তো মানেই নেই। এই তো প্রোগ্রামের আগেও সে তাকে বিভিন্ন মেয়েদের সাথে দেখেছে। হেসে হেসে ছবি তুলছে। মেয়েরা তাকে মাছির মত ঘিরে থাকে। সেও সবার মধ্যমনি সেজে বসে থাকে। সেই সাথে অহংকারী, দেমাগী, বদের হাড়ি—এমন পুরুষের সাথে সে কখনোই প্রেম করবে না। ফলে একপ্রকার চেঁচিয়েই বললো,
“আমাকে কি পাগল কুকুর কামড়েছে”
রাইসা মুখ ভোঁতা করে বললো,
“আমি গেস করেছিলাম, এমন কিছু না। কিন্তু”
“কিন্তু কি?”
রাইসা সাথে সাথেই ফোনটা বের করে ধরলো প্রাপ্তির সামনে। ফেসবুক নামক সোশ্যাল মিডিয়া প্লাটফর্মের একটি ছবি বের করে দেখালো রাইসা। সম্ভবত পোস্ট করা হয়েছে। “Anonymous Member” পোস্টটি করেছে। ছবিটি তার ক্যাপশন দেওয়া,
To: Prapti (CSE 24)
From: Senior Vai
“এই যে তন্দ্রাহরণী
হ্যা, তন্দ্রাহরণী; কারণ আমার উদাসীন, ছন্নছাড়া, তন্দ্রালু জীবনে তুমি ভূমিকম্পের মতো এসেছো। বেপরোয়া আমি অগোছালো তুমিতে কি করে বুদ হলাম সেই উত্তরটা খুঁজে পাচ্ছি না। হয়তো একটা জীবন এই উত্তর খুঁজতেই কেটে যাবে। তাই বৃথা চেষ্টা করবো না। কখন, কিভাবে জানি না। তবে তোমার ব্যক্তিত্বটাই এতোটা জোরালো যে আমাকে নতিস্বীকার করতেই হলো। যে কেউ দেখলে মনে করবে আমাদের মধ্যে শুধু বৈরিতা বিদ্যমান। কারণ সবার মতে আমি তোমাকে অপছন্দ করি। অথচ শঙ্খতারার আঁচলতলে একমুঠো সিন্ধুপুষ্প নাকি অগোছালো ঘন কেশের আড়ালে লুকায়িত এক চিলতে হাসি! কে বেশি সুন্দর! যদি জিজ্ঞেস করো তবে বলবো, সেই হাসির জন্য হাজারো সিন্ধুপুষ্পের মায়াও তুচ্ছ। বুঝলে? আমি জানি তোমার মাথায় কিছুই ঢুকে নি। কিচ্ছু বুঝো নি, লাগবে না বোঝা। তবে ধন্যবাদ গতকালের জন্য। সেমিনারে তোমার সাথে কাটানো সময়টুকু সারাদিন মনে থাকবে। এভাবেই তোমার পাশে দাঁড়াতে চাই। সুযোগ দিবে তন্দ্রাহরণী?
ইতি
তোমার শত্রু সিনিয়র ভাই”
ক্যাপশন পড়তেই প্রাপ্তির মুখ হা হয়ে গেলো। ছবিতে প্রাপ্তির চুল উড়ে তার মুখের উপর আসছিলো। তার ঠোঁটে হালকা হাসি। ছবিটা সেমিনারের। উপস্থাপনার সময় তোলা। রাইসা বললো,
“ক্রাশ এন্ড কনফেশন গ্রুপে এটা পোস্ট করার পর থেকেই হাঙ্গামা হয়ে গেছে। নিচের কমেন্ট গুলো পড়”
প্রাপ্তি ফোনটা হাতে নিলো। সত্যি সত্যি অদ্ভুত সব কমেন্ট,
"প্রেম-ভালোবাসা সব ধোঁকা। সত্যের পথে ফিরে আসো”
“আগামী ফাগুনে কি তবে দ্বিগুণ হতে যাচ্ছে?”
“এমন রচনা এককালে আমরাও লিখেছি”
“আমাদের ডিপার্টমেন্টের মেয়ে তো দেখছি”
“সবার কপালে শুধু সিন্ধুপুষ্প কপালেই জুটে, আমাদের কপালে তো ঝাউফুলও জুটে না”
এই কমেন্টগুলোর নিচে একটি কমেন্ট ছিলো,
“মেয়েটিকে চেনা চেনা লাগছে”
“আরে এই মেয়ে মোতালেব স্যারের ভাগ্নী না?”
ব্যাস ওখান থেকেই সবাই চিনে গেলো, এই নারী প্রাপ্তি। অনেকে তো সেই কমেন্টের রিপ্লাই এ লিখলো,
“কাক ময়ুর সাজলো কিভাবে? এটা কি মেকাপের কামাল নাকি সিনিয়র ভাইয়ের প্রেমের জাদু? কিন্তু কথা হচ্ছে সিনিয়র ভাইটি কে? সামহাও অয়ন ভাই না তো?”
এই কমেন্টের নিচে শুধু অয়নকে ট্যাগ করা। কেউ কেউ তাদের সেমিনারের কাপল ছবিও পোস্টের নিচে পোস্ট করেছে। এই কমেন্টের পর থেকে দ্বন্দ্ব লেগে গেছে কমেন্ট সেকশনে। একদলের কথা,
“অয়ন ভাই কখনোই এই মেয়ের প্রেমে পড়তেই পারেন না। যদি এটা সত্য হয় তাহলে সত্যি বিশ্বাস করে নিবো, প্রেম এবং প্রেমিক দুইই অন্ধ”
আর আরেকদল মজা লুটছে। এরমধ্যে একটা কমেন্ট যে সর্বোচ্চ লাইক পেয়েছে তা হলো,
“ব্যাপার না অয়ন ভাই, সব শঙ্খতারা আর সিন্ধুপুষ্প উড়ে যাবে মোতালেব স্যারের মুখ দেখলে। আপনাকে শুভকামনা দিব নাকি সমবেদনা, উকিল শ্বশুর হিসেবে মোতালেব স্যার এবং যৌতুক হিসেবে লালবানু পেতে যাচ্ছেন”
প্রাপ্তির আর ধৈর্য্য কুলালো না সব কমেন্ট পড়ার। প্রাপ্তির ফেসবুক একাউন্ট আসে। পাপিয়া খুলে দিয়েছে। কিন্তু সে ব্যবহার করে না তেমন। শুধু ব্যাচের একটা চ্যাট গ্রুপ আছে, সেখানে সিআর নানানবিধ আপডেট দেয় সেটাই দেখে। রাইসার সাথেও বেশিরভাগ ফোনেই কথা বলে সে। ম্যাসেজে টুকটুক করে তার ধৈর্য্যে কুলায় না, এতো সময়ও নেই। সেখানে তাকে দিয়ে এই ফেসবুক পাড়ায় এতোকিছু হয়ে গেছে চিন্তাও করতে পারছে না। প্রাপ্তি রাইসাকে জিজ্ঞেস করলো,
“এটা কে পোস্ট করেছে?”
“জানি না। তবে এই পোস্টের পর থেকেই সবাই বলাবলি করছে অয়ন ভাই করেছে। অয়ন ভাই কমেন্ট করলে হয়তো সব থেমে যেতো। কিন্তু উনি কোনো কমেন্ট করেন নি”
প্রাপ্তি রাগে গজগজ করতে করতে বললো,
“আমি নিশ্চিত, অয়ন ভাইটাই এই কাজটা করেছে”
“কিন্তু উনি এমন কাজ কেন করবেন?”
প্রাপ্তি দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“আমাকে জ্বালানোর জন্য। কালকের শোধ তুলছে”
কথাটা শেষ হলো না। ক্লাসে স্যার চলে এলেন। প্রাপ্তি এই প্রথম ক্লাসে খুব মনোযোগ দিতে পারলো না। মনে হতে লাগলো সবাই যেন তাকে দেখছে। অদ্ভুত দৃষ্টি। দৃষ্টিতে কৌতুহল। অনেকটা চিড়িয়াখানায় যেমন জন্তুকে দেখে। নাহ! একটা বিহিত তাকে করতেই হবে। সে সরাসরি অয়নকে প্রশ্ন করবে এই কাজ তার কি না। দেখাই যাক সে কি উত্তর দেয়।
****
অয়ন ক্লাসে আসলো আজ তাড়াতাড়ি। ক্লাস তখন মাছের বাজার। অয়ন ঢুকতেই সবাই তাকালো তার পানে। সকলের দৃষ্টিকে উপেক্ষা করে একটা চেয়ার টেনে গা এলিয়ে বসলো সে। ব্যাগের মধ্যে শুধু ল্যাপটপ আছে। আর একটা খাতা। সেই খাতাটা এই বছরের জন্য কিনেছে। তবে আদৌও কোনো কাজে লাগবে কি না জানা নেই। অয়ন চোখ বুজেই ছিলো অমনি একজন বলে উঠলো,
“তুমি তো খেলে দিয়েছো মামা! একেবারে শত্রুর ভাগ্নীকে সিন্ধুপুষ্প? বাইদ্যা ওয়ে সিন্ধুপুষ্প কি?”
অয়ন দ্বিধান্বিত চোখে তাকিয়ে আছে। সে বুঝতে পারলো না ঠিক। তখন-ই একটি মেয়ে ক্ষিপ্র স্বরে শুধালো,
“অয়ন, তুই কি সত্যি সত্যি ওই ফার্স্ট ইয়ারের মেয়েটার প্রেমে পড়েছিস? এই কনফেশন তুই লিখেছিস? তুই কি পাগল হয়ে গেছিস?”
অয়ন এখনো কিছু বুঝতে পারছে না। রাতে তার ঘুম হয় নি ভালো। নুহাশ বেয়াদবটার সাথে ঘুমানো আর একটা জলহস্তির সাথে ঘুমানো একই কথা। বিরক্ত স্বরে বললো,
“এত ভনিতা না করে বল না কি হয়েছে?”
মেয়েটা ফেসবুক খুলে “ক্রাশ এন্ড কনফেশন” পেজের পোস্ট খুলে দেখিয়ে দিল। অয়ন পোস্টটা দেখে চোখ বড় বড় করে চেয়ে রইলো। এই লেখাটা তার ডাইরির লেখা। কিন্তু কনফেশনটা সে লিখে নি। অনেকক্ষণ পোস্টটার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত পিষে বললো,
“নুহাশের বাচ্চা”
*****
“দোস্ত বিশ্বাস কর আমি কিছু করি নি”
নুহাশ প্রাণ হাতে নিয়ে ছুটছে। তার পেছনে ধাওয়া করেছে অয়ন। নুহাশ কিছু করে নি সে বিশ্বাস করতেই পারছে না। কারণ প্রাপ্তির এই ছবিটা শুধু পলাশের কাছেই ছিলো। ছবিটা ক্রপ করা। পুরো ছবিটায় অয়নও পাশে দাঁড়ানো ছিলো। অয়ন ছবিটা দেখা মাত্রই বলেছে ডিলেট করে দে। নুহাশ ই একমাত্র মানুষ যার মাথা থেকে এমন শয়তানি বুদ্ধি বের হতে পারে। কিন্তু নুহাশ চেঁচিয়ে বলছে,
“দোস্ত আমার হবু বউয়ের কসম, কনফেশনটা আমি লিখি নি”
অয়ন শুনলো না। সে আজকে নুহাশকে বেদম মারবে। একেবারে ওর বিয়ে করার সাধ ভুলিয়ে দিবে। দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ ব্রেক কষতে হলো অয়নের। তার সামনে হুট করেই এসে দাঁড়ালো বিন্তি। মেয়েটা তার এক বছরের জুনিয়র। মেয়েটাকে দেখেই থেমে গেলো অয়ন। আর নুহাশ এক ছুটে হলের ভেতর ঢুকে গেলো। বিন্তি আমতা আমতা করে বললো,
“ভাইয়া একটু সময় হবে?”
অয়ন কিছুক্ষণ হলের গেটের দিকে তাকিয়ে বিন্তির দিকে চাইলো। মেয়েটি ঘামছে। হাতের মাঝে দলামচা হচ্ছে তার ওড়নার ত্রিকোন। অয়ন মৃদু স্বরে বললো,
“বলো”
“ভাইয়া, কালকের কনফেশন পোস্টটা কি আপনি লিখেছেন?”
অয়ন কিছুক্ষণ বিন্তির দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর মিষ্টি করে হেসে বললো,
“কি যায় আসে?”
“আসে কারণ আপনাকে আমার কিছু বলার আছে”
অয়নের চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। ভ্রু কুঞ্চিত হলো। শুভ্র কপালে পড়লো কিছু ভাঁজ। বিন্তি কি বলবে যেন আন্দাজ করতে পারলো। আচ্ছা মানুষ এতো সহজে কি করে প্রেমে পড়ে? প্রেম কি এতোই সহজ? শুধু মিষ্টি করে কথা বললেই বুঝি প্রেম হয়ে যায়? হৃদয় কাঁপলো না, ঘোর লাগলো না, কোথাও ব্যথা হলো না। শুধু ভালো লাগাকেই প্রেম বলা যায়? এই ভালো লাগাটুকু কতদিন স্থায়ী হবে? চোখের নেশা কতদিন ঠিকবে? অয়নের সাথে মনে হয় প্রেম মানে একটা সাধনা। সেই সাধনাটা করতে হয় যত্ন করে। অনেকটা গাছের মত। গাছ যেমন একদিনেই বড় হয় না, প্রেমও তেমন একদিনে গভীর হয় না। আবার বিশাল বৃক্ষের শেকর যেমন মাটির গভীরে নিজের বিস্তার ঘটায়, প্রেমের বিস্তারও শরীরের প্রতিটি শিরায় হয়, প্রতিটি স্পন্দনে। তখন সে প্রেম জীবন থেকে উপড়ে ফেলার উপায়ও থাকে না। মানুষ ধ্বংস হয়ে যায় তবে প্রেম নয়। যদি প্রেমের অনুভূতিটা এমন নাই হবে, তবে কিসের প্রেম। অয়নের বিশ্বাস এমন প্রেম কেউ করতে পারে না, পারবে না। তাদের ইনফ্যাচুয়েশন কিছুদিন পরই গায়েব হয়ে যাবে। যেমনটা তার বাবা-মার হয়েছে। তারা ঠুংকো মোহে বিয়ে করলো। তারপর তাদের প্রেম একদিন উবে গেছে। মাঝে থেকে গেছে ঘৃণা, কোন্দল, ঝগড়া। মা নিজের সুখ খুঁজে নিলো, বাবা তার সুখ খুঁজে নিলো। মাঝে একটা সাত বছরের শিশু বরণ করে নিলো একাকীত্ব। অয়ন মৃদু হেসে বলল,
“বিন্তি, কিছু বলো না। অহেতুক একটা মেয়েকে কাঁদতে দেখতে আমার ভালো লাগবে না। তাই কিছু বলো না”
“কিন্তু আপনি তো সিঙ্গেল তাই নয় কি?”
অয়ন চুপ করে রইলো। বিন্তি তখন ভাঙ্গা স্বরে বললো,
“আমি কি দেখতে খারাপ অয়ন ভাই?”
“না তো”
“আমার সাথে প্রেম করা যায় না কেন?”
“অবশ্যই যায়, বরং যে তোমাকে ভালোবাসবে সে অনেক ভাগ্যবান হবে”
“তাহলে আপনি কেন আমার প্রেম নিবেদন শুনতেও চাইছে না?”
অয়ন বুঝলো এই মেয়েকে বোঝানো খুব কষ্টকর। তাই সে বললো,
“আমি আমার প্রেমটা একজনের জন্যই তুলে রাখছি। আমার হৃদয়ের সবটুকু ভালোবাসা শুধু তার জন্য”
“কে সে?”
“নাম বলতেই হবে?”
“হ্যা, হবে। নয়তো আমি ভাববো আপনি আমাকে অহেতুক কাটানোর জন্য মিথ্যে বলছেন”
“তাতে কি যায় আসে?”
“আমার আসে। আপনার রিজেকশনে আমার খুব অপমানিতবোধ হচ্ছে, নিজেকে খুব ছোট মনে হচ্ছে। ইচ্ছে করছে মরে যেতে। তাই আপনাকে বলতেই হবে আপনি কাকে ভালোবাসেন?”
অয়ন কিছু একটা ভেবে বললো,
“আমি আসলে প্রাপ্তির প্রেমে পড়েছি। তাই তো গতকালকে কনফেশন পেজে পোস্টটা লিখেছি”
কথাটা শেষ করতে পারলো না অয়ন। চোখ বিস্ফারিত হলো যখন দেখলো বিন্তির পেছনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাইসা এবং প্রাপ্তি……………
চলবে