#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ
#১১তম_পর্ব
“আমি আসলে প্রাপ্তির প্রেমে পড়েছি। তাই তো গতকালকে কনফেশন পেজে পোস্টটা লিখেছি”
কথাটা শেষ করতে পারলো না অয়ন। চোখ বিস্ফারিত হলো যখন দেখলো বিন্তির পেছনে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছে রাইসা এবং প্রাপ্তি। প্রাপ্তির দৃষ্টি স্থির। সে কি শুনেছে। তার চাহনী তো বলছে সে শুনেছে। অয়নের সম্পূর্ণ মনোযোগ প্রাপ্তির দিকে। ফলে তাদের চোখাচোখিও হলো। প্রাপ্তির চোখ এখন ছোট হয়ে এসেছে। চশমার ভেতরেও তার রাগী চক্ষুর অগ্নিদৃষ্টিতে ভস্ম করার প্রবণতা বেশ টের পেলো অয়ন। অয়নের কথাখানা বিন্তিকে আহত করেছে। সে ফ্যাঁচফ্যাঁচ করে কাঁদছে। নাক টানছে। চোখ জলে টুইটুম্বুর। অন্যসময় হলে অয়ন হয়তো বলতো,
“চল বিন্তি, তোমাকে আমি এককাপ কপি খাইয়ে আনি। কফি খেলে দেখবে ব্রেইনটা সতেজ লাগবে। অথবা মকলেসের তরমুজের শরবতও খেতে পারো। আসলে তোমার মত সুন্দরী রমনীর অশ্রু এই পৃথিবীকে ঋণী করে তুলছে। আমার মত একটা ছেলের জন্য তোমার মত একটি মেয়ে কাঁদবে, এ ভারী অন্যায়। তোমাকে কাঁদতে দেখে মন খারাপ হচ্ছে”
কিন্তু আজ তেমন কিছুই বললো না। সে প্রাপ্তির কঠিন মুখটা দেখছে। অয়ন দ্রুত সরে পড়ার কথা ভাবলো। কিন্তু তার পূর্বেই প্রাপ্তি খপ করে তার হাতটি ধরে ফেললো। কঠিন স্বরে শুধালো,
“গতকালের ফালতু রচনা আপনার কারসাজি?”
বিন্তি তাকিয়ে আছে অয়নের দিকে। প্রাপ্তির কঠিন দৃষ্টিও তার দিকে নিবদ্ধ। অয়নের অবস্থা বেগতিক। একদিকে বাঘ অন্যদিকে কুমির। বিন্তির সামনে কথা বলা নিতান্ত বিপজ্জনক ব্যপার। ফলে সে দেরি না করে প্রাপ্তির হাত মুঠোবন্দি করলো। গাঢ় স্বরে বললো,
“তোমার সাথে আমার কথা আছে”
বলেই প্রাপ্তিকে দিয়ে দ্রুত কেটে পড়লো বিন্তির চোখের সামনে থেকে। বিন্তি আর কথা বলার সুযোগ পেলো না। সে বিমর্ষ চোখে তাকিয়ে রইলো অয়নের যাবার পানে। বুকের ভেতরটা হুট করেই হু হু করে উঠলো। অজান্তেই আবার টলমল করে উঠল দৃষ্টি।
প্রেম পুকুরের কাছে এসে দাঁড়ালো প্রাপ্তি এবং অয়ন। প্রেম পুকুরকে কেন প্রেম পুকুর বলা হয় তার নির্দিষ্ট কোনো কারণ নেই। তবে ধরা হয়, এখানে ভার্সিটির ছেলে-মেয়েরা সাধারণত প্রেম করতে আসে তাই নাম প্রেম পুকুর। অয়ন এবং প্রাপ্তি মোটেই প্রেম করতে আসে নি। কারণ তাদের সাথে রাইসাও আছে। প্রাপ্তির মেজাজ অত্যন্ত খারাপ, তার কোনো ভরসা নেই, অয়নকে সে রাগের মাথায় ধাক্কা দিয়ে পুকুরেও ফেলে দিতে পারে। তাই রাইসা তার পেছনে এসেছে, প্রাপ্তির মাথার তাপমাত্রা গলনাঙ্ক ছাড়িয়ে গেলে সে সামলে নিবে সেই ভরসায়। প্রাপ্তি অয়নের হাত থেকে নিজের হাত ছাড়িয়ে নিলো। কঠিন স্বরে বললো,
“নতুন এই কি ফাজলামি শুরু করেছেন আপনি? এসবের অর্থ কি? আর আগে বলুন ওই পোস্টটা আপনি কেন লিখেছেন? ভালোয় ভালোয় বলুন নয়তো আমার থেকে খারাপ কেউ হবে না।”
অয়ন বা হাত দিয়ে চোখ, কপালের চামড়া টেনে দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর ধীর স্বরে বললো,
“আমি কোনো পোস্ট করি নি”
“আপনা-আপনি পোস্ট হয়েছে? দেখুন আমার এসব প্রেম-পিরিতে একদম আগ্রহ নেই, অন্তত আপনার সাথে তো একদম না। মরে গেলেও আপনি আপনার সাথে জড়াতে চাই না। তাই এখন-ই পোস্ট ডিলেট করেন। আর আরেকটা পোস্ট করে লিখুন “ইট ওয়াজ এ প্রাংক””
অয়ন হতভম্ব চোখে তাকালো। পোস্ট সে করেই নি, তাহলে ডিলেট করবে কি করে!
“আমার মাথায় কি শয়তান নাচে? আমি তোমাকে নিয়ে কেন পোস্ট করবো? আমার প্রাণের ভয় আছে। আর মোতালেব স্যারের বংশের সাথে জড়ানোর ইচ্ছে আমারো নেই। তার থেকেও বড় কথা, ক্রাশ পেজে ফাতরামি করার আমার স্বভাবে নেই। এখন কি মাথায় খোঁদাই করবো?”
“তাহলে বিন্তি আপুর সামনে যে বললেন?”
অয়ন নিজের মাথায় করাঘাত করলো। অধৈর্য্য গলায় বললো,
“আমি তোমাকে কিভাবে বুঝাই, বিন্তির সামনে আমি মিথ্যে বলছি। এটা না বললে ও জোঁকের মত আমার পেছনেই লেগে থাকতো। প্লিজ বিশ্বাস কর”
“আমি আপনাকে ততটাই বিশ্বাস করি যতটা মানুষ হাসিনাকে বিশ্বাস করে"
অয়নের ইচ্ছে হলো নুহাশের চুলগুলো ছিড়ে ফেলতে। ওই বদের হাড়ির জন্য সে ফেঁসে গেছে। অয়ন ক্লান্ত স্বরে বললো,
“আমি কি করলে তুমি বিশ্বাস করবে?”
“আপনি আমার সামনে পোস্ট ডিলেট করেন”
“আরে, আমি তো পোস্ট করি নি, নুহাশ করেছে। ও ফাজলামি করে এটা করেছে। আমি প্রমিস করছি, হলে যেয়েই আমি ওর আইডি থেকে ডিলেট করিয়ে দিব। তবে এখন না, দুদিন পরে ঠিক করিয়ে দিব”
প্রাপ্তি আরোও ক্ষিপ্র স্বরে বললো,
“আপনার কি ধারণা আমার ব্রেইনসেল গুলো ঘুরতে গেছে? যে চামচা ভাইয়া বাথরুমে যাবার আগেও আপনাকে বলে যায় সেই চামচা ভাইয়া পোস্ট করবে আর আপনি জানবেন না, মশকরা করেন? এটা তো এমন হলো দলের পোলাপাইন চাঁদা উঠায় আর দলের চেয়ারপারসন জানে না। আপনি এই মুহূর্তে ওই পোস্ট ডিলেট করবেন”
অয়ন অসহায় দীর্ঘশ্বাস ফেললো। মাথার চুল টানতে ইচ্ছে হলো। এই মেয়ে তো কিছুই বিশ্বাস করে না। সেও কম নয়। এই মেয়েকে বোঝানোর কষ্ট সে আর করবে না। তাই অয়ন ভারী স্বরে বলল,
“যাও আমিই পোস্ট করছি, খুশি?”
প্রাপ্তি হা হয়ে গেলো। অয়ন বুকের উপর হাত বেঁধে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাপ্তি অধৈর্য্য স্বরে বললো,
“তো ডিলেট করেন”
“করবো না”
“মানে?”
“মানে, আমার ইচ্ছে”
“ফাজলামি করছেন?”
“না তো, আমি সত্যি তোমার প্রেমে পড়েছি। আমার ব্রেইনসেলগুলো আ/ত্মহ/ত্যা করেছে। তাই আমিও তোমার প্রেমে খাবি খাচ্ছি”
প্রাপ্তি রাগী স্বরে বললো,
“ফাজলামি করেন আপনি? আমাকে বিন্তি আপু মনে হয়, বলবেন প্রেমে পড়েছি আর আমি খুশিতে লাফাতে লাফাতে আপনাকে অমর একুশে পদক দিব?”
প্রাপ্তির ক্ষিপ্র স্বরকে উপেক্ষা করে অয়ন হাসিমুখে বললো,
“রাগলে তোমাকে দারুন লাগে। ইশ! এভাবে তাকিও না, তোমার রাগী চোখের মায়ায় আমার মাথার তার ছিঁড়ে যাবে”
প্রাপ্তি আর রাইসার মুখ হা হয়ে গেলো। এই লোক কি বলছে! অয়ন আর দাঁড়ালো না, গুনগুন করে গাইতে লাগলো,
“শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
শুকনো নদীতে ডিঙি ভাসিয়েছি মোহনার কাছে এসে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে
দু'মুঠো আদর ভিক্ষে চেয়েছি দরিদ্র এই দেশে
শুধু তোমাকেই ভালোবেসে”
তারপর পকেটে হাত ঢুকিয়ে চলে গেলো হলের দিকে। প্রাপ্তি এবার কিছু খুঁজতে লাগলো মাটিতে। রাইসা তাকে শুধালো,
“কি খুঁজছো?”
“ইট”
“কেনো?”
“তোমার অয়ন ভাইয়ের মাথাটা ফাঁটিয়ে দু ভাগ করবো”
রাইসা তাড়াতাড়ি প্রাপ্তিকে পেছন থেকে ধরলো। উদ্বিগ্ন স্বরে বললো,
“মাথা ঠান্ডা কর। মাথা ঠান্ডা কর। আইন নিজের হাতে নিও না”
“ছাড় আমাকে, আজ উনার একদিন কি আমার যে কদিন লাগে। উনার প্রেমের ভূতের যদি হেস্তনেস্ত না করি, আমার নাম প্রাপ্তি মজুমদার না”
রাইসা দীর্ঘশ্বাস ফেললো, কে বিশ্বাস করবে এই দুজন প্রেম করছে? রাইসাকে কেউ কোটি টাকা দিলেও সে বিশ্বাস করবে না। অবশ্য এদের জন্য কেউ তাকে কোটি টাকা দিবেও না।
*****
হনহন করে কম্পিউটার ল্যাবের দিকে যাচ্ছে প্রাপ্তি। স্ট্রাকচার প্রোগ্রামিং ল্যাঙ্গুয়েজ সেশনাল শুরু হবে আড়াইটায়। সব কোডিং মাথা থেকে মুছে গেছে। ধ্যাত! ডিপার্টমেন্টের করিডোরে হাটার সময় বেশ ক’জন কৌতুহল ভরে তাকে দেখছিলো। সব ওই ইতর অয়ন ভাইয়ের জন্য। আরেকবার সামনে এলে সত্যি ওর মাথা ভেঙ্গে ফেলবে প্রাপ্তি। ল্যাবের সামনেই দেখা হলো আবরারের সাথে। আবরার তখন একজন স্যারের রুম থেকে বের হচ্ছিলো। প্রাপ্তিকে দেখেই ডাকলো তার ভারী স্বরে,
“প্রাপ্তি?”
প্রাপ্তি দাঁড়ালো। নিজেকে স্বাভাবিক করে হাসিমুখে বললো,
“আসসালামু আলাইকুম ভাইয়া, ভালো আছেন?”
“ওয়ালাইকুমুস সালাম, আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। ল্যাব আছে নাকি?”
“জি”
“ওহ”
“কিছু বলবেন ভাইয়া?”
“নাহ তেমন কিছু না। আসলে সেদিন কম্পিটিশনের পর তোমাকে আর পেলাম না। প্রাইজ নেবার সময়ও তুমি ছিলে না। তোমার ফ্রেন্ডকে জিজ্ঞেস করেছিলাম। বাট সে বললো, তোমাকে পাচ্ছে না।”
“আমি একটু সমস্যায় আটকে গিয়েছিলাম”
“ওহ আচ্ছা। বাই দ্যা ওয়ে, থ্যাংকিউ আমার সাথে পেয়ারাপ করার জন্য। তুমি সত্যি অনেক ব্রিলিয়ান্ট”
“ওয়েলকাম। আর আপনাকেও থ্যাংকিউ”
আবরার মৃদু হাসলো। তারপর বললো,
“কোনো হেল্প লাগলে বলো কিন্তু। ডোন্ট হেজিটেট”
“জি অবশ্যই। আসি ভাইয়া?”
“যাও, যাও”
বলেই আবরার সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে গেলো। প্রাপ্তি ল্যাবে যাওয়ার জন্য পা বাড়ালো। সব সিনিয়র যে বাদর কথাটা ঠিক নয়। কিছু কিছু সিনিয়র আবরারের মতও হয়। অমায়িক, ভদ্র, শান্ত। অয়ন আর আবরার দুই মেরুর মানুষ। একজনকে সম্মান করতে ইচ্ছে হয় তো অন্যজনের মাথা ফাঁটাতে ইচ্ছে হয়। প্রাপ্তি মাথা ঝাড়া দিলো। সে আর অয়নকে নিয়ে ভাবতে চায় না। মনে মনে একটাই প্রার্থনা করলো,
“এই অয়ন ভাই যেন কখনো আমার সামনে আর না আসে”
******
বাসায় পৌছেই এক হুলস্থুল পরিস্থিতির শিকার হল প্রাপ্তি। ঘরময় একটা উত্তেজনা। মমর গলার চেইন পাওয়া যাচ্ছে না। সবখানে খোঁজা হয়েছে কিন্তু কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। চেইনটা ছোট এবং চিকন। তাই মম যে গলায় চেইন পড়ে সেটাই প্রাপ্তির জানা ছিলো না। সে অবাক স্বরে শুধালো,
“তুই খুলে কোথাও রেখেছিলি?”
“মনে করতে পারছি না আপু”
এই মেয়েটা বড্ড দায়সারা। নিগার বেগমের মুখ শক্ত হয়ে আছে। সোনার চেইন, তাও একুশ ক্যারেটের। এই চেইন এই দুর্মূল্যের বাজারে আবার এমন চেইন বানানো কি সম্ভব? তিনি নিজের মেয়েকে কড়া স্বরে বললেন,
“খেয়াল যখন রাখতে পারো না, তাহলে পরা কেন? একটা ছয় আনার চেইন হারিয়ে গেছে অথচ উনি কিছুই জানেন না। অসহ্য”
প্রাপ্তিও মামীর সাথে একমত। সত্যিই মম অনেক দায়িত্বহীন। এর মধ্যেই নিগার বেগম বলে উঠলেন,
“সারা ঘরের কোথাও তো পেলাম না, প্রাপ্তি তোমার লাগেজটা একটু খুলো। ওখানে দেখা হয় নি”………
চলবে