#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ
#১২তম_পর্ব
“সারা ঘরের কোথাও তো পেলাম না, প্রাপ্তি তোমার লাগেজটা একটু খুলো। ওখানে দেখা হয় নি”
প্রাপ্তি মামীর দিকে চাইলো। তার দৃষ্টিতে বিস্ময়। সে সঠিক শুনলো? মামী তার ব্যাগ দেখতে চাইছেন? প্রাপ্তি এই বাড়িতে থাকা শুরু পর থেকেই নিগার বেগমের বিষয়টি অপছন্দ। শুধু মুখ ফুটে বলতে পারছেন না, “অন্য ব্যবস্থা কর”। তবে তিনি বিন্দুমাত্র তার অনীহা, অনাগ্রহ, বিতৃষ্ণা লুকাবার চেষ্টা করেন নি। প্রতিটা সময় বুঝিয়েছেন তিনি অপছন্দ করছেন প্রাপ্তিকে। কিন্তু তা বলে চোর আখ্যা? লাগেজ দেখতে চাইবার মানে কি চোর আখ্যা দেওয়া নয়? অবশ্যই। ঘরের কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না, প্রাপ্তি হয়তো চেইনটা চুরি করে লাগেজে লুকিয়ে রেখেছে। প্রাপ্তির দৃষ্টি সংকুচিত হলো। তাচ্ছিল্য করে শুধালো,
“আপনার ধারনা চেইনটা হেটে হেটে আমার লাগেজে ঘাপটি মেরে আছে? নাকি লোভের তাড়নায় আমি লুকিয়ে রেখেছি?”
অন্য মানুষ হলে হয়তো ভদ্রতা করে বলতেন,
“তুমি ভুল ভাবছো, আমি তো শুধু দেখতে চাইছি। ভুল করে চলে যেতে পারে তো!”
কিন্তু নিগার বেগম ভদ্রতার ধার ধারলেন না। অনেকটা কাঠকাঠ স্বরেই বললেন,
“আমি তোমাকে চোর ভাবছি না। আমি ঘর তন্নতন্ন করে খুঁজেছি, সবার জিনিসে দেখেছি। যেখানে পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই সেখানেও দেখছি। সোনার চেইনের ব্যাপার। আর একবার দেখতে তো ক্ষতি নেই। মনের শান্তি!”
প্রাপ্তির মনে হল এযাবৎকালে এতো বিশ্রিভাবে কেউ তাকে অপমান করে নি। নিগার বেগমের থেকে এমন ব্যবহারই কাম্য ছিলো। তবুও কিছুতেই যেন ধাতস্থ হতে পারছে না সে। বারে বারে একটা তীক্ষ্ণ ক্ষোভে হাহাকার করে উঠছে ভেতরটা। সে একজনের বাসায় থাকছে। আশ্রিতা। কারোর অনুগ্রহ গ্রহণ করলে সর্বদা মাথানত করে থাকার নিয়ম। কিন্তু প্রাপ্তি কেন মাথানত করে রইবে? সে কেন এমন ছোটলোকি আচারণ সহ্য করবে? শুধুমাত্র তিন বেলা খাওয়া আর মাথার উপর একটা ছাদের জন্য। কি হাস্যকর কথা! বাপের বাড়ির তো কম নেই তার। শুধু বাপের সাথে দ্বন্দ্ব বিধায় আজ চোর অপবাদটা সরাসরি না হলেও ঘুরিয়ে দিয়েছেন। প্রাপ্তি থমথমে মুখে ঘরে গেলো। নিজের লাগেজ নিয়ে আসলো। লাগেজ খুলে প্রতিটা কাপড় বের করলো। নিজের আন্ডারগার্মেন্টসগুলো ঝাড়া দিয়ে দেখালো। কোথাও চেইন নেই। মম লজ্জায় মাথানত করে রইলো। মায়ের এমন আচরণ তাকে লজ্জিত করছে। কিন্তু কিছুই বলতে পারছে না। নিগার বেগমের মুখশ্রীতে বিন্দুমাত্র অনুতাপ দেখা গেলো না। তিনি লজ্জিত নন। যখন কিছুই পাওয়া গেলো না, খুব সহজ কণ্ঠে বললেন,
“লাগেজগুলো গুছিয়ে রেখে দেও”
প্রাপ্তি এবার কঠিন স্বরে শুধালো,
“আমার লাগেজে চেইনটা পাওয়া গেলো না বলে কি আপনার মনের শান্তিতে ব্যঘাত ঘটলো মামী? চেইনটা আমার ব্যাগে পাওয়া গেলে বোধ হয় খুশি হতেন”
নিগার বেগমের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। ঝাঁঝালো স্বরে বললেন,
“এতো বড় হয়েছো অথচ ভদ্রতা শেখায় নি তোমার মা”
“ভদ্রতা বিষয়টা আপেক্ষিক মামী। আপনার মুখে শব্দটা বেমানান লাগছে”
নিগার বেগম কঠিন চোখে তাকালেন প্রাপ্তির দিকে। প্রাপ্তি নির্বিকার। তার মুখোভাব বদলালো না। নিজের লাগেজগুলো গুছিয়ে ঘরে রাখলো। এখানে এক মুহূর্ত থাকাটা অসহনীয় লাগছে। মামা আসলে আজকে কথা বলবে। হলে সিটের জন্য আবেদন করবে আগামীকাল-ই। কিন্তু তার আগে মায়ের সাথে কথা বলতে হবে।
নিগার বেগম সোফায় বসলেন। মুখ থমথমে। মম কিছু বলতে এলেই ধমক দিলেন,
“চোখের সামনে থেকে যাও নয়তো থাপড়ে তোমার চোয়াল ভেঙ্গে দিব”
মম কিছু বলতে পারলো না। খানিকটা বিরক্ত হয়েই চলে গেলো। নিগার বেগম থমথমে মুখে বসে রইলেন। প্রাপ্তি মেয়েটাকে অসহ্য লাগছে। প্রাপ্তির স্পর্ধা দিন কি দিন বাড়ছে। একটা সামান্য বিষয়ে এতোগুলো কথা শুনালো। তাচ্ছিল্যের রেশ ছিলো প্রতিটি কথায়। নিগার বেগমের স্বামীর উপর খাচ্ছে সে। এতোটা স্পর্ধা কি মানায় তাকে। নিগার বেগমের সংসারে থেকে তার উপর রোয়াব ঝাড়া! এতো নবাবের পুত্রী যখন, তাহলে অন্যথা যাচ্ছে না কেন? তার সংসারে সাপের মত ফনা মেরে কেন বসে আছে? সে কি এখন-ই নিজেকে এই বাড়ির কর্তী মনে করছে? মনের মধ্যে কু ডাকছে তার। মেয়েটির স্পর্ধার কারণ চিন্তা করতেই কিছু চিন্তা ঘুরপাক করতে লাগলো মাথায় যা তার কাছে দুঃস্বপ্ন।
*****
দুইবার বাজার পর তিনবারের বেলায় মুনিরা ফোন ধরলেন। সহাস্যে শুধালেন,
“কেমন আছিস মা?”
“মা, আমাকে এ মাসে ছয়হাজারের মতো টাকা পাঠাতে পারবে? তোমার ভাইয়ের বাড়ি আমি থাকবো না”
প্রাপ্তির এমন কথায় থমকে গেলেন মুনিরা। প্রাপ্তি খুবই যৌক্তিক মনোভাবের মেয়ে। সে হুট করেই কোনো সিদ্ধান্ত নেয় না। তার প্রতিবাদগুলো কোলাহলপূর্ণ কিংবা অযৌক্তিক হয় না। মামিকে সে অপছন্দ করে, কিন্তু আবেগের তাড়নায় সে বাড়ি ছাড়ার কথা বলার কথা নয়। মুনিরা শান্ত স্বরে বললেন,
“কিছু হয়েছে?”
“না হলে কি বলতাম?”
“কি হয়েছে?”
প্রাপ্তি এবার চুপ করে রইলো। তার কি কথাগুলো বলা উচিত মাকে? নিজের বাড়ির অবস্থা অজানা নয় প্রাপ্তির। মাকে প্রতিনিয়ত সেখানে যুদ্ধ করতে হয়। এ অবস্থায় নিজের ভাবির হীনমানসিকতার কথা বলাটা কতটুকু উচিত হবে? এমনেই মুনিরা হীনমন্যতায় ভুগেন। তার ধারণা তার মেয়েদের জীবন এমন দূর্বিসহ কারণ তিনি সহ্য করেছেন। সহ্য না করলে হয়তো ভিন্ন হতে পারতো। প্রাপ্তি বললো,
“তোমার না জানলেও হবে। আহামরি কিছু না”
মুনিরা হাসলেন। তার যন্ত্রমানবী মেয়েটা এখন কথা লুকাতে শিখেছে। হয়তো মাকে কষ্ট দিতে চায় না বলেই। মুনিরা বেদনাতুর স্বরে বলল,
“আমি এখানে চেষ্টা করছি। দেখি কতদূর পারি”
“তুমি বেশি চিন্তা কর না। তবে আমি এই বাড়িতে বেশিদিন থাকতে পারবো না”
প্রাপ্তি এবার কথা ঘুরানোর চেষ্টা করলো। সামনে একটা বন্ধ পেতে যাচ্ছে তিনদিনের। সেই বন্ধে সে বাড়িতে যাবে। মুনিরা গদগদ স্বরে বললেন,
“আয়, তোকে ছাড়া খুব একা একা লাগে”
“তোমার স্বামীকে জানিয়ে দিও। তার পরিবার ফাতরামি করলে আমি ছেড়ে কথা বলবো না কিন্তু”
মুনিরা হাসলেন। মেয়ে বদলে গেছে। একমাসে অনেক আত্মবিশ্বাসী হয়ে গিয়েছে। ভালো লাগছে। অন্তত প্রাপ্তির জীবনটা তার থেকে ভিন্ন হোক। এটাই চাওয়া।
****
হোস্টেলে সিট নেই। গণরুমে গাদাগাদি অবস্থা। এই অবস্থাতে থাকা খুবই দুষ্কর। ভার্সিটির বাহিরে লেডিস হোস্টেল আছে অবশ্য। কিন্তু ছোটরুমের ভাড়া তিন হাজার। মমর সাথে যে ঘরে থাকে তেমন একটি ঘরে তিনটা সিট। বাথরুম একটা। তিনজনকে শেয়ার করতে হবে। খাওয়ার ব্যবস্থা নেই। সেটা যার যার উপর। প্রাপ্তি খুব বিপাকেই পড়লো। মায়ের উপর চাপ দিতে ইচ্ছে হচ্ছে না। কিন্তু তাকেও ব্যবস্থা তো করতেই হবে। লাইব্রেরির একটা টেবিলে বসে আছে সে। সামনে বই খোলা। আজ সিটি রয়েছে অথচ এসব চিন্তায় পড়া হচ্ছে না। ক্লাসের একটা ছেলের কাছে টিউশনির ব্যপারটা বলেছে। কিন্তু সে দায়সারাভাবে বলেছে,
“জানাবো”
এরমধ্যেই তার সামনের চেয়ারটা টেনে বসলো অয়ন। ধরাম করে একটা বই রাখলো টেবিলের উপর। প্রাপ্তির ধ্যান ভাঙ্গলো। চোখ কুঁচকে তাকালো। অয়ন তার দৃষ্টিকে গ্রাহ্য করলো না। হেসে বললো,
“কেমন আছো ভালোবাসা?”
প্রাপ্তির মেজাজ তেঁতে গেলো। যন্ত্রণা কি কম তার জীবনে? এই মহাযন্ত্রণাটা না এলেই নয়। প্রাপ্তি নিজের রাগ সংবরণ করে বললো,
“আপনার সমস্যা কি বলুন তো! দেখুন মন মেজাজ দুই খারাপ! কিছু করে বসলে বলতে পারবেন না। ভালোয় ভালোয় বলছি, দূরে গিয়ে হেদিয়ে মরুন"
অয়ন নির্লজ্জ কণ্ঠে উত্তর দিলো,
"হেদিয়ে তো আমি মরছি-ই কিন্তু সেটা শুধু তোমার প্রেমে"
পরমুহূর্তে অয়ন নিজেই মুখ বাঁকালো। এতো ক্রিঞ্জ লাগলো কথাটা নিজের কাছে। প্রাপ্তির চোখ মুখ কঠিন করে বললো,
“আমার মেজাজ খুব খারাপ অয়ন ভাই। এতোটাই খারাপ যে আমি কারোর ফাঁটা ফাটিয়ে দিতে পারি। তাই নিজের মাথা রক্ষা করতে হলে, আমার সামনে থেকে চলে যান”
এবার হাসি মুছলো অয়ন। মুখে হাত দিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলো সে প্রাপ্তির দিকে। তারপর গাঢ় স্বরে বললো,
“মেয়ে, তুমি চাইলে আমি তোমার সব সমস্যার সমাধান করতে পারি”………
চলবে