ফন্ট সাইজ:
থিম:
সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ

১৩তম পর্ব

লেখক: মুশফিকা রহমান মৈথি

#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ

#১৩তম_পর্ব

“মেয়ে, তুমি চাইলে আমি তোমার সব সমস্যার সমাধান করতে পারি”

প্রাপ্তির দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হলো। বাহাতের উপর কপাল ঠ্যাকনা দিলো। কিছুসময় অপলক দৃষ্টিতে চেয়ে বললো,

“আপনি নিজের জীবনের সমস্যা সমাধান করছেন এটাই অনেক! আপনার ওই মোলায়েম কাঁধে আমার সমস্যাগুলো না নিলেও চলবে"

প্রাপ্তির তাচ্ছিল্যমিশ্রিত কথা শুনে অয়ন ফিঁচেল হাসলো। ফর্সা কপাল ঢেকে আছে মসৃণ চুলের ছায়ায়। অয়ন নিজের দু হাত দিয়ে চুলগুলো ঠেলে পেছনে ফেললো। তারপর হাতাটা গুটাতে গুটাতে মোলায়েম স্বরে বললো,

"আমাকে হেয় করছো মেয়ে! কর! কর! আমি রাগ করবো না। শখের নারীর কাছে পুরুষদের একটু ভেড়া সাজতে হয়, সেখানে তুমি তো আমার ভালোবাসা। তোমার তাচ্ছিল্যের মধ্যেও ভালোবাসা ভালোবাসা ঘ্রাণ আছে। তবে আমার কথাটা আমলে নিলে তোমার লাভ-ই হবে। এ সুযোগ কিন্তু সীমিত সময়ের জন্য। আমার আবার কালেভাদ্রে মানুষের উপকার করতে ইচ্ছে করে। ভেবেছিলাম তোমার অর্থনৈতিক সমস্যার সমাধান করি। যাক গে তোমার ইচ্ছে! ফ্রি সাহায্য, নিলে নাও নয়তো মুড়ি খাও"

প্রাপ্তি দাঁত কিড়মিড় করে বললো,

“আপনার নাটকটা থামাবেন কবে শুনি? জাস্ট গা জ্বলে”

“ইহা নাটক নয় ভালোবাসা, এ আমার শুদ্ধ প্রেম?”

“তা এই প্রেমের উৎপত্তি কি করে হলো? আমার গা ময়লা, আমার পায়ে চাকা উঠলে চাকা ময়লা হবে, আমি তেলাপোকা—কত কি না শুনলাম। তা সেই তেলাপোকা থেকে এখন ভালোবাসা হয়ে গেছি?”

“আরে আম খাও না, গুটি গুনছো কেন? শুনো নি কখনো, প্রেম অন্ধ হয়!আমার কেসে প্রেম ও প্রেমিক দুই-ই অন্ধ। আর জীবে প্রেম মহৎ ধর্ম"

প্রাপ্তি চোখ ঘুরালো। গাল ফুলিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো। তারপর শান্ত স্বরে বললো,

“আপনার ভালোবাসা-বাসির ঢং শেষ করে ফুটুন। আপনার থেকে সাহায্য নেবার আমার বিন্দুমাত্র ইচ্ছে নেই”

“ছিঃ ছিঃ এভাবে বলে কেউ? আমি তো ভাবলাম তুমি আমার হার্ডডিস্ক আর আমি তোমার মেমোরি”

“একেবারে ফরম্যাট দিয়ে দিব এমন মেমোরিকে”

“নিষ্ঠুর রমনী। রাগে অন্ধ হচ্ছো কেন? আমি এতোটাও খারাপ নই। শুনলাম লেডিস হোস্টেলে সিট খুঁজছিলে, হলেও ধন্না দিয়ে এলে। মামাবাড়ি-রসেরহাড়িতে কি মন বসছে না?”

এবার একটু চমকালো প্রাপ্তি। ভ্রু কুচকে গেলো। কপালের ভাঁজ বক্র হলো। কঠিন স্বরে বললো,

“আপনি কি করে জানলেন? আমাকে ফলো করছেন?”

“ছিঃ ছিঃ তুমি তো আমার মনে থাকো, অহেতুক ফলো করতে যাব কেন?”

“মনের মধ্যে থেকে খামচে বেরিয়ে আছাড় মারবো কিন্তু, ঝেড়ে কাশুন কি চান?”

প্রাপ্তির মুখখানা রাগে লাল হয়ে গেছে। মোটা কাঁচের পেছনের রাগী চোখগুলো তার দৃষ্টি দিয়েই ভস্ম করে দিচ্ছে যেন অয়নকে। অয়ন হাতদুটো জড়ো করে তাকিয়ে রইলো প্রাপ্তির দিকে। ঠোঁটে এখনো হাসি লেপ্টে আছে। প্রাপ্তি এবার বইগুছিয়ে দিলো। সে আর বসবে না। এই পাগলের সামনে বসলে তার পরীক্ষা দেওয়া হবে না। সে খাতা বন্ধ করলো। কলম বন্ধ করে উঠে যেতে নিলে অয়ন হাত টেনে ধরলো, গাঢ় স্বরে বললো,

“আমাকে পড়াবে?”

প্রাপ্তি হতবাক স্বরে শুধালো,

“কি?”

“আমার ফার্স্ট ইয়ারের দুটো কোর্সে ব্যাকলগ আছে। ক্লাসের মধ্যে তোমার নোট নাকি খুব বিখ্যাত। নো ওয়ারিস, আমি ফ্রিতে হেল্প নিব না। তোমার সময় আর নোটসের জন্য আমি মাসে ছয় হাজার টাকা দিব”

প্রাপ্তি কিছুসময় তাকিয়ে রইলো অয়নের দিকে। দৃষ্টিতে বিস্ময় ছিলো, সেই সাথে ছিল সন্দেহ। অয়ন হেসে বললো,

“ভেবে দেখো! এই সুযোগ সবসময় পাবে না। তোমার সময় নষ্ট হবে না, অর্থনৈতিক মন্দাও কেটে যাবে”

প্রাপ্তি উত্তর দিলো না। বিনা সংকোচে হাতটা ছাড়ালো। হয়ত অয়নের জায়গায় অন্যকেউ হলে নিঃসংকোচে হ্যা বলে দিত। কিন্তু অয়নকে দু আনা বিশ্বাস করে না সে। এই প্রস্তাবের পেছনে কোন কুমতলব লুকিয়ে আছে কে জানে? প্রাপ্তি চলে যেতে তৎপর হলে অয়ন বললো,

“আমি কিন্তু ফাঁকিজুকি দিচ্ছি না। ভালোবাসার সাথে ছলনা করি না আমি”

প্রাপ্তি কিছু না বলেই হাটা দিলো। অয়ন চেয়ে রইলো তার যাবার পানে। ঠোঁটের কোনায় হাসি। গুনগুন করে উঠলো,

“আমি বাউন্ডুলে ঘুড়ি

যে আমাকে বাসবে ভালো

তার আকাশে উড়ি”

****

প্রাপ্তি অনেক বন্ধুদের সাথেই কথা বলেছে। কিন্তু টিউশন যোগাড় করতে ঝামেলাই হল। একেই শহর নতুন। এমন কোন জায়গায় হুট করেই টিউশন পাওয়া গেলো না যেখানে দ্রুত যাতায়াত করা যায়। সে অন্যের বাড়িতে থাকে। প্রোগ্রামের সময়টাতেই দেরিতে যাবার কারণে তাকে অনেক কথা শুনতে হয়েছে মামীর কাছে। সেখানে রাত বিরাতে পড়াতে গেলে অহেতুক প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে। ধারে-কাছে একটা টিউশন যোগাড় হলো একটা। কিন্তু বাচ্চাটা খুব ছোট। ক্লাস থ্রিতে পড়ে। শুধু দুষ্টু আখ্যা দিলে হয়তো হত। কিন্তু ও দুষ্টু না, হাড়মাংস জ্বালিয়ে দেওয়া রকমের দুষ্টু। প্রাপ্তির ছোট বাচ্চাকাচ্চা পছন্দ নয়। দুষ্টু বাচ্চাকাচ্চা তো একেবারেই না। আর ওর ছাত্র মহাপাজী। প্রাপ্তিকে দেখে বলে,

“ম্যাডাম পড়ে কি হবে, একদিন তো মরেই যাব। শুধু শুধু এতো চাপ নেওয়া”

আর বাচ্চার মা আরেকধাপ উপরে। তিনি পড়ানোর সময় ঠিক প্রাপ্তির পাশে বসে থেকে সময় গুণেন। প্রথম এক সপ্তাহ পড়ানোর পরই প্রাপ্তি হাত তুলে দিল। অসম্ভব। ছেলে একদিনও পড়ে না। পড়া ধরতে গেলেই বলে,

“কিছুই বুঝি নি”

অথচ আগের দিন পড়া বুঝানোর সময় এমনভাবে মাথা নাড়ায় যেন একেবারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের আত্মা তার ভেতর চলে এসেছে। এই বাচ্চাকে পড়ানোর পর এক ঘন্টা প্রাপ্তির মাথা ফাঁকা হয়ে থাকে। এর থেকে তো অয়নকে পড়ানোই ভালো। যদিও দুজন একই ধাঁচের। কিন্তু অন্তত অয়নকে পড়ানোর সাথে সাথে প্রাপ্তির নিজের পড়াটাও হয়ে যাবে। উপর থেকে টাকাও বেশি। পরিশ্রমটা অন্তত পুষিয়ে যাবে। কিন্তু পরমূহুর্তেই চিন্তা বাতিল করলো সে। অয়ন থেকে যত দূরে থাকবে ততই তার মঙ্গল।

***

মিরাজ বিল্ডিং এর নিচে দাঁড়িয়ে আছে। হাতের ফাঁকে জ্বলছে সিগারেট। সিগারেট খাওয়ার খুব একটা অভ্যাস নেই তার। কিন্তু আজকাল মেজাজ অত্যধিক খারাপ। মায়ের উপর ক্ষিপ্ত সে। দুদিন যাবৎ কথা বলে না। মমর চেইনটা অবশেষে পাওয়া গেছে। ড্রয়িংরুমের সোফার ফাঁকে পড়েছিলো। অথচ এই চেইন নিয়ে প্রাপ্তিকে অপমানের চূড়ান্ত করা হয়েছে। মমকে নিগার বেগম মানা করেছিলো বটেই। কিন্তু মম শুনে নি। সে মিরাজকে জানিয়ে দিয়েছে। ফলে মিরাজ নিরাগ বেগমের উপর বেশ রাগারাগি করেছিলো,

“বয়স হবার সাথে সাথে কান্ডজ্ঞান কি লোপ পাচ্ছে তোমার? তুমি এমন কথা বলতে কি করে পারলে?”

“তুমি আমার উপর চোটপাট দেখাচ্ছো কেন? এখন তুমি আমাকে শিখাবে কি করে কথা বলতে হয়?”

মিরাজ দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো,

“শিখার কোনো বয়স হয় না মা। আর ভুল করাটা দোষের না, ভুল করে সেটাকে ফ্লেক্স করা দোষের। আমার ভুল হয়েছে আমি তোমার সাথে কথা বলেছি”

এরপর থেকে মিরাজ মায়ের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিয়েছে। সে প্রাপ্তির সামনে আসতেও লজ্জা পাচ্ছে। প্রাপ্তি হয়তো নিগার বেগমের ক্ষোভটা মনে পুষে রাখবে না। কিন্তু তার ভীষণ অস্বস্তি লাগছে। এরমধ্যেই প্রাপ্তির রিকশা থামলো গেটে। ভাড়া মিটিয়ে ভেতরে যাবে তখন মিরাজের দিকে চোখ গেলো তার। মিরাজ হাতের সিগারেটটা ফেলে পায়ে পিষে আরেকটা সিগারেট ধরালো। প্রাপ্তি তখন নির্লিপ্ত স্বরে বললো,

“সিগারেট বেশি খেলে ক্যান্সার হয়। শিক্ষিত মানুষরা জেনেও এমন বদগুণগুলো কেন আয়ত্ত করে বুঝি না”

মিরাজ থতমত খেলো। আঙ্গুল থেকে সিগারেট পড়ে গেলো। পেছনে ফিরে তাকাতেই প্রাপ্তিকে দেখলো,

“ও তুমি”

বলেই একটু স্বাভাবিক হলো। প্রাপ্তি শুধালো,

“বাসায় যাবেন না?”

“তুমি যাও, আমি আসছি”

“আরেকটা নিকোটিনের বস্তা খাবেন?”

মিরাজ হাসলো। সে সিগারেট আর ধরালো না। প্রাপ্তির সাথে কথা বলতে এখন অস্বস্তি লাগছে না। তাই বললো,

“চল তাহলে, একসাথেই উঠি। আজ আসতে এতো দেরি?”

“টিউশন ছিলো”

“তুমি টিউশন করাচ্ছো?”

“এক সপ্তাহ ধরে করাচ্ছিলাম। কিন্তু আজ ছেড়ে দিয়েছি। অনেক পরিশ্রম যায়। বেশি কথা বলতে হয়। মাথা হ্যাং হয়ে যায়”

“টিউশন করানোর কথাটা তো বললে না”

মিরাজের প্রশ্নে প্রাপ্তি মৃদু হেসে বললো,

“ভুলে গিয়েছিলাম”

“তোমার টিউশন করানোর কি প্রয়োজন? কিছু প্রয়োজন হলে আমরা তো…”

“মিরাজ ভাই, আমার মানুষের উপর নির্ভরশীল হতে ভালো লাগে না। সত্যি বলতে আমার আপনাদের বাসায় আর থাকার ইচ্ছে নেই। এক ঘটনা দ্বিতীয়বার হবে না তার ভরসা নেই”

মিরাজ থেমে গেলো। সে আর কথা বাড়ানোর সুযোগ পেলো না। বাসায় একসাথে ঢুকলো প্রাপ্তি এবং মিরাজ। নিগার বেগম তীক্ষ্ণ চোখে তাদের দেখলেন। কিছু বললেন না। তবে মনে মনে যেন কিছু একটা ভেবেনিলেন।

*****

সিটি পরীক্ষাটা খুব একটা মনমত হল না প্রাপ্তির। টিউশনটা ছাড়ার পর আর নতুন কোনো টিউশনি পাচ্ছে না সে। এদিকে একটা দারুন বাসা দেখেছে প্রাপ্তি। তিনটে রুম, দুটো বাথরুম একটা রান্নাঘর। ভাড়া নয় হাজার। ভার্সিটি থেকে একটু দূরে। কিন্তু একার পক্ষে বাসাটা ভাড়া নেওয়া অসম্ভব। আরেকজনকে পেলে ভালো হত। রাইসাকে বলতেই সে বললো,

“খরচা অনেক হবে, এর থেকে গণরুম ই ভালো। একটাই তো বছর। আমার দু-তিনটা টিউশন থাকলে সাহস করতে পারতাম”

ঠিক-ই তো, রাইসার পরিবার খুব সচ্চল নয়। ফলে অন্য কোথাও বাসা ভাড়া করে থাকাটা তার পক্ষে কষ্টকর। হলে তার খরচ খুব বেশি হয় না। তাই অসুবিধা হলেও সে মানিয়ে নেয়। এরমধ্যেই এক ছেলে এসে তাদের বেঞ্চে দুটো সিঙ্গারা রেখে বললো,

“নে আমার ফোনের ট্রিট”

রাইসা অবাক স্বরে শুধালো,

“ফোনের আবার ট্রিট? কি ফোন কিনলি যে একেবারে সিঙ্গারা খাওয়াচ্ছিস”

“আই ফোন মামা”

“বলিস কি? সত্যি? ফার্স্ট হ্যান্ড?”

ছেলেটা হাসি মুখে সগর্বে বললো,

“নারে! সেকেন্ডহ্যান্ড। কিন্তু নিজের টাকায়”

“বাহ বা! টিউশন করে একমাসে জমিয়েছিস?”

“আমি চাকরি করি মামা, বুঝতে হবে”

সাথে সাথেই রাইসা এবং প্রাপ্তি একে অপরের দিকে চাইলো। তাদের চোখ চোখ করে উঠলো। প্রায় সাথে সাথেই জিজ্ঞেস করে উঠলো,

“কোথায় চাকরি করিস?”

“অয়ন ভাইয়ের ফার্মে”

অয়ন ভাইয়ের ফার্ম? রাইসা এবং প্রাপ্তির উভয়ের মুখশ্রী বাঁকালো। প্রাপ্তি তাচ্ছিল্য করে বললো,

“অয়ন ভাই কি গরু-ছাগল পালা শুরু করেছেন?”

রাইসা ফিক করে হেসে দিলো। ছেলেটা বিরক্ত নিয়ে বললো,

“আরে ধ্যাত। এগুলো না। অয়ন ভাই ফ্রিল্যান্সিং করেন। তার একটা ছোট অফশোরিং ফার্ম আছে, তাও লাইসেন্স সহ। আমি ওখানেই কাজ করি। ফ্রিল্যান্সিং এ দ্রুত কাজ পাওয়া অনেক ঝামেলার। অয়ন ভাইয়ের কাছে অনেক কাজ আছে। উনার আন্ডারে মোট তের জন আমরা। যে যত কাজ করবে তার ষাট পার্সেন্ট পায়, আর অয়ন ভাই চল্লিশ পার্সেন্ট। যদিও অনেক খাটুনির। কিন্তু ভালোই পয়সা পেয়েছি। তোরা চাইলে আমি অয়ন ভাইয়ের সাথে কথা বলবো?”…………

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন