ফন্ট সাইজ:
থিম:
সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ

১৪তম পর্ব

লেখক: মুশফিকা রহমান মৈথি

#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ

#১৪তম_পর্ব

বন্ধুর প্রস্তাবটি মন্দ নয়। প্রাপ্তি এবং রাইসা উভয়েরই এখন অর্থের বড় সংকট। দুজনের পরিবারের আর্থিক অবস্থা আলাদা হলেও দুজনের সমস্যা সেই অর্থেই। প্রাপ্তির বাবার অঢেল আছে তবুও তিনি প্রাপ্তিকে টাকা পাঠাবেন না, কারণ এখানে তার জেদ হেরে যাবে। নিজের জেদ অক্ষত রাখবেন জামশেদ মজুমদার। ফলে তার কন্যাকে কোনো প্রকার সহায়তা তিনি করবেন না। কিন্তু মামার বাড়িতে থাকাটাও যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছে। নিগার বেগম পারছেন না শুধু ঘাড় ধাক্কা দিতে। অপরদিকে প্রতিনিয়ত হলে থাকাটা রাইসার কাছে যুদ্ধের মত লাগছে। তার আশেপাশের মেয়েগুলো তাকে অপছন্দ করে। তাদের হেয়, কটাক্ষগুলো খুব ভালো করেই রাইসা বুঝতে পারে। হলের বাথরুমের একটি নিয়ম আছে। নতুন বছরের মেয়েদের অন্য ফ্লোরের বাথরুম ব্যবহার করতে হয়। এই বাথরুম নিয়ে একেক দিন একেক কান্ড ঘটে। গত পরশু এক সিনিয়র আপু তাকে ডেকে নিজের রুমে যেয়ে শাসিয়েছে, আদব-কায়দা সংক্রান্ত বিষয়ে। ভাবখানা এমন যেন আবদ-কায়দার বইগুলো শুধু তারাই পড়েছে। অথচ আদব শব্দের উদ্ভাবক তারাই। রাইসার ভালো লাগে না। এক আপু তো সুন্দর তার এসাইনমেন্টের কাজ গছিয়ে দিল। রাইসা কিছু বলতে গেলে তিনি চোখ-মুখ খিচিয়ে শুধালো,

“করবি না?”

রাইসা “না” করতে পারলো না। এগুলো তাও নেওয়া যায়। কিন্তু তাদের গণরুমের কেউ যদি কোনো ভুল করে, ঘুরেফিরে কিভাবে যেন রাইসার ঘাড়েই দোষটা পড়ে। রাইসার স্বভাব প্রাপ্তির একেবারেই বিপরীত। সে মুখের উপর ফট করে কিছু বলতে পারে না। খারাপ লাগলেও সে তা প্রকাশ করতে পারে না। সে ভীতু, শিরদাঁড়া সোজা করে দু-কথা বলতেও তার ভয় করে। তাই হলে থাকতে তার ভালো লাগে না। কিন্তু তার হাতে টাকা নেই। বাসায় বলতে লজ্জা লাগে। রাইসার বাবা সরকারি চাকরি করেন। নীতিবান মানুষ বিধায় উপরি কোনো ইনকাম তার নেই। রাইসারা দু ভাই-বোন। তার ছোট ভাই এখন ক্লাস নাইনে পড়ে। তার পড়াশোনার খরচ, রাইসার পড়াশোনার খরচ। বাবা অনেক কষ্ট হয়ে যায়। তাই মুখ ফুটে চাইতে পারে না। রাইসা প্রাপ্তির দিকে চাইলো। ছেলেটা আবার শুধালো,

“তোরা বললে, আমি কথা বলতে পারি”

“প্রয়োজন নেই। অন্য কেউ হলে আমি করতাম। কিন্তু ওই লোকের সাথে আমি কোনো কাজ করবো না”

প্রাপ্তি বিনা সংকোচে বললো। অয়ন মানুষটা ভীম বাটপার। তার চোখে স্বচ্ছতা নেই। স্বচ্ছতাহীন চোখের মানুষদের প্রাপ্তি বিশ্বাস করতে পারে না। কেন পারে না? সে জানে না। তবে সে এসব লোকদের এড়িয়ে চলে। প্রাপ্তি না করলেও রাইসার উৎসাহে কমতি হল না। সে বললো,

“আমার কথাটা বলিস তো”

প্রাপ্তি একটু চমকালো যেন,

“তুমি ওই বদমাইশ লুচ্চা ব্যাটার আন্ডারে কাজ করবে?”

রাইসা একবার একটু সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়লো। হাত কচলে বিভ্রান্ত স্বরে বললো,

“অয়ন ভাই আমার সাথে লুচ্চামি করবে না”

“কি ভাবে শিওর হলে? আমি ওই ব্যাটাকে এক বিন্দু ভরসা করি না”

রাইসা মুখ ফুটে কিছু বলতে পারলো না। কিছু বললে প্রাপ্তি তার রুদ্র অবতার নিবে। কিন্তু কথাটা প্রায় গলার কাছেই চলে এসেছিলো,

“অয়ন ভাই তো তোমাকে পছন্দ করে। তাই আমার সাথে লুচ্চামি করবে না”

*****

প্রাপ্তির মোটেই ইচ্ছে নেই বাসায় যাওয়ার। কিন্তু বাসায় যেতেই হচ্ছে। কারণ মিড টার্মের একটি ছুটি পড়েছে। এক সপ্তাহের ছুটি। সুতরাং সাত দিন অর্থাৎ একশত আটষট্টি ঘন্টা নিগার বেগমের মুখ দেখতে হবে তাকে। এর থেকে দাদী আর চাচীর মুখ দেখা শ্রেয়। নিগার বেগমও হয়তো সেটাই চায়। তাই ঘুরেফিরে শুধাচ্ছেন,

“বাসায় যাচ্ছো?”

প্রাপ্তি এই প্রশ্নের মর্মার্থ জানে। তাই সে একটা টিকিট কিনেই ফেলেছে। মাকেও জানিয়েছে সে আসছে। হয়তো বাড়ি গেলে এই বাসা সমস্যার কোনো সমাধান বের হতে পারে। জামশেদ সাহেবের মুখোমুখি হবার ইচ্ছেও তার আছে। বর্তমানে যতগুলো সিটি হয়েছে প্রাপ্তির নম্বর সর্বোচ্চ। স্যারদের নজরেও পড়ছে একটু একটু করে। এতে এক চাঁপা উল্লাস হচ্ছে। যদিও এটাতে কিছুই প্রকাশ পায় না। তবে এমনটাই তো সে চেয়েছিলো। সে তার বাবার চূর্ণবিচূর্ণ দম্ভ দেখতে চায়।

সন্ধ্যে ছয়টায় বাস। বৃহস্পতিবার ক্লাস শেষ করেই বাসায় গেলো প্রাপ্তি। গোসল সেরে ব্যাগ নিয়ে রেডি হয়ে গেলো ব্যাগ নিয়ে। মম মন খারাপ করে বললো,

“যাওয়ার দরকার কি ছিলো। থেকেই যেতে। এক সপ্তাহের ব্যাপার-ই তো”

প্রাপ্তি তাচ্ছিল্যভরে হাসলো। প্রাপ্তি বের হবে ঠিক তখন মিরাজ বললো,

“চল, আমি তোমার সাথে যাই”

“তার কোনো প্রয়োজন নেই ভাইয়া। আমি একাই যেতে পারবো”

নিগার বেগম সরু চোখে তাকিয়ে আছেন। ছেলের এই বাড়াবাড়ি তার সহ্য হয় না। পনেরো মিনিটের পথ এখান থেকে কাউন্টার। প্রাপ্তি একাই যেতে পারবে। কিন্তু ছেলের বাড়াবাড়ি। মিরাজ শান্ত কণ্ঠে গাম্ভীর্য ছড়িয়ে বললো,

“আমি জানি, তবুও দায়িত্ব আছে আমার। চল। বেশি বকো না”

প্রাপ্তি কথা বাড়ালো না। মিরাজ তার সাথে বাস কাউন্টার পর্যন্ত গেলো। বাসে তুলে দিয়ে সতর্ক স্বরে বললো,

“বাড়ি যেয়ে জানাবে। আর তোমার জিপিএস লোকেশন অন করে রাখবে। ঠিক আছে?”

প্রাপ্তি মাথা নাড়িয়ে হ্যা বললো। মিরাজ সুপারভাইজারকে কিছু বললো যে। তারপর প্রাপ্তিকে বললো,

“কোনো সমস্যা হলে সুপারভাইজার সাহেবকে জানিও। এই রাতে ট্রাভেল না করলেই হতো না? কালকে যেতে”

“মামী পারলে আমাকে নিজে বাস চালিয়ে পৌছে দিতেন”

প্রাপ্তির কথা শুনে মিরাজ গম্ভীর স্বরে বললো,

“মা এতোটাও অবুঝ নয়”

“জানি”

“সাবধানে যেও”

মিরাজ চলে যেতেই প্রাপ্তি জানালা দিয়ে বাহিরে তাকালো। নিঝুম কালো মেঘলা আঁকাশ। ঠান্ডা বাতাস মুখ ছুঁয়ে যাচ্ছে। বৃষ্টি হবে হয়তো। জানালার কাছের সিটটা প্রাপ্তির। তার পাশের মানুষটি এখনো এসে পৌছায় নি। কে হবে, কে জানে। প্রাপ্তি অবশ্য তার ব্যাগে মরিচের গুড়া নিয়ে এসেছে। সাথে একটা ছোট্ট এন্টিকাটারও আছে। একটু এদিক থেকে ওদিক হলেই একেবারে সাইসুঁই করে দিবে সে। নো মার্সি। বাস একটু দুলে উঠলো। বোধ হয় এখনই ছেড়ে দিবে। পাশের মানব এখনো পৌছায় নি। কি দায়িত্বজ্ঞানহীন! এর মধ্যেই ধুপধাপ করে একজন বাসে উঠলো। প্রাপ্তির সিটের কাছে এসে দাঁড়ালো। উপরে ব্যাগ রাখলো। একপর পাশের সিটটা একটু নড়লো। পাশে কেউ বসেছে। নাকে একটা কড়া গন্ধ বাড়ি খেলো। প্রাপ্তি পাশে তাকালো মানুষটিকে দেখার জন্য। অমনি চোখ বিস্ফারিত হলো। পাশের মানুষটির কানে সাদা হেডফোন। তাদের চোখাচোখি হতেই তার ঠোঁটে বাঁকা হাসি ছড়িয়ে গেলো। গাঢ় স্বরে বললো,

“ঘুরে ফিরে আমরা সেই এক সুতোয় বাঁধা পড়ছি ললনা!”……

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৪তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন