ফন্ট সাইজ:
থিম:
সিন্ধুপুষ্পের অনুরাগ

১৮তম পর্ব

লেখক: মুশফিকা রহমান মৈথি

#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ

#১৮তম_পর্ব

ম্যাসেজটা পাঠিনোর পর অয়ন দেখলো প্রায় সাথে সাথেই লেখাটির পাশে নীল রঙ্গের ডাবল টিক ফুটে উঠেছে। অয়নের ঠোঁটের কোনে উঁকি দিলো ছোট এক চিলতে হাসি। গা এলিয়ে দিলো সিটে। চোখ উজ্জ্বল ঝলমলে ব্যস্ত শহরের রাস্তায়। মেঘ করে এসেছে। গুড়গুড় শব্দ করছে অভিমানী মেঘেরা। বৃষ্টি নামার ফন্দি করছে তারা। অয়ন পিচঢালা পথের দিকে নিশ্চল চোখে তাকিয়ে আছে। আজ তেলাপোকা তার একটা দূর্বলতা জেনে গেছে। কিন্তু অয়ন তাকে সেই দূর্বলতার সুযোগ নিতে দিবে না। সে বুঝতে দেওয়া যাবে না তখনের ঘটনাটি অয়নের জন্য কতটা ভয়ংকর ছিল। অয়ন অন্ধকার ভয় পায়। প্রচন্ড ভয় পায়। কিন্তু তার এই ভয়ের কারণটা সে জানে না। শুধু জানে অন্ধকার হলেই তার হাতপা ঠান্ডা হয়ে যায়। তার গলা শুকিয়ে আসে, মনে হয় সে আলোহীন কোনো গহ্বরে সে আটকা পড়েছে। একটা সময় এই আঁধার তাকে রুপকথার দৈত্যর মত গিলে খাবে। অয়ন বহুবার এই ভয়ের চিকিৎসা করতে চেয়েছে। কিন্তু তাকে চিকিৎসাটা করতে দেওয়া হয় নি। বলা হয়েছে, ঠিক হয়ে যাবে। এখনো ঠিক হয় নি। বয়স তার তেইশ পার হয়ে চব্বিশে পড়েছে। অথচ এখনো সেই ভয়টা কাটিয়ে উঠতে পারে নি অয়ন। সময়ের সাথে সাথে ভয়টা অয়নের সঙ্গী হয়ে গেছে। কিন্তু অয়ন কাউকে সেই ভয়ের সুযোগ নিতে দিতে রাজি নয়। অয়নের একটা গুণ আছে। রুক্ষ, প্রতিকূল মুহূর্তেও সে খুব স্বাভাবিক অভিনয় করতে পারে। নিজেকে গুছিয়ে নিতে পারে। তখনও বিদ্যুৎ আসার পর সে নিজেকে গুছিয়ে নিয়েছে। প্রাপ্তি ছাড়া কোনো প্রাণী টেরও পায় নি অয়নের ভেতরকার অস্থির, অস্বাভাবিক, দুমড়ানো, ভঙুর অবস্থা। অয়নের চিন্তার মেঘে চির ধরালো ফোনের শব্দ। স্ক্রিনের দিকে তাকাতে “Nuhash Abal” নামটা ভেসে উঠলো। অয়ন ফোন ধরেই হালকা স্বরে বললো,

“ক্লাইন্টের কাজ হইছে?”

“যাক অবশেষে তোমাকে খুঁজে পাওয়া গেলো”

গম্ভীর, ভারী স্বর কানে যেতেই অয়নের ভ্রু কুঞ্চিত হলো সামান্য। তার মুখের মাংসপেশী স্থির। কণ্ঠে কোনো বিস্ময় প্রকাশ না করে স্বাভাবিক স্বরে শুধালো,

“নুহাশের মোবাইল তোর কাছে কেন আবরার?”

“কারণ তুমি আমার ফোন ধরছো না। বাবার ফোনও ধরছো না। তাই বাধ্য হয়েই তোমার এই বন্ধুদের শরনাপন্ন হতে হল। কোথায় তুমি?”

আবরারের কণ্ঠ খুব গম্ভীর শোনাচ্ছে। সে সচরাচর রাগ জাহির করা মানুষ নয়। তবে গম্ভীর মানুষ। রাগী অবস্থায় চূড়ান্ত পর্যায়ের গম্ভীরতা তাকে ঘিরে ধরে। অয়ন গা করলো না। খুব দায়সারা স্বরে উত্তর দিল,

“সেটা জেনে কি করবে? আমি মঙ্গলগ্রহেও হতে পারি, তাতে নিশ্চয় তোমার বা মিঃ আরিফুল শিকদারের কোনো অসুবিধা নেই”

আবরার যেন দীর্ঘশ্বাস ফেললো, স্বর ঈষৎ নরম করে বললো,

“মামনী গতকাল সেন্সলেস হয়ে গিয়েছিলো। প্রেসার ল আর প্রচুর চিন্তা করছে। প্রচুর স্ট্রেসড।”

আবরারের কথাটা শুনে অয়ন আগের মতোই নির্লিপ্ত স্বরে বললো,

“এসব আমাকে বলছিস কেন? আমি কি ডাক্তার নাকি? প্রেসার লো হলে তাকে ডিম খাওয়া, সেলাইন খাওয়া। স্ট্রেসড হলে তাকে ঘুরতে নিয়ে যা। আমাকে বিরক্ত করা হচ্ছে কেন?”

“আমার নিশ্চয়ই ভেঙ্গে বলার প্রয়োজন নেই কেন সে এতোটা স্ট্রেসড। তুমি বাড়ি আসছো না। ফোন ধরছো না। তুমি জানো সে তোমাকে নিয়ে কতটা চিন্তা করে”

“তাই নাকি? সে আমাকে নিয়ে চিন্তিত? এই চিন্তার কারণ কি শুনি?”

“তুমি বাড়ি আসছো না। ফোন ধরছো না। তোমার কোনো আপডেট পাওয়া যায় না। ভার্সিটিতে অন্তত আমি তোমার মুখ দেখতে পারি। কিন্তু ভ্যাকেশন তোমার টিকিও খুঁজে পাওয়া যায় না। প্লিজ ভাইয়া, টক টু হার”

অয়ন হালকা হেসে তাচ্ছিল্যভরে বললো,

“তাহলে তাকে ফোন করতে বল। সে কেন ফোন করছে না?”

আবরার চুপ করে রইলো। অয়ন সেই নিস্তব্ধতার মধ্যে নিজের উত্তর পেয়ে গেল যেন। নির্লিপ্ত স্বরে বলল,

“আমি আমার দাদুবাড়িতে আছি। তোর মামনীকে জানিয়ে দিস”

“তুমি ওই বাড়ি আবার গিয়েছো?”

“সেটাই কি স্বাভাবিক নয়?”

“এখন শিকদার বাড়ি-ই তোমার নিজের বাড়ি, ওইটা না”

অয়ন মলিন হাসলো। তারপর মৃদু স্বরে বললো,

“এই পৃথিবীতে আমার নিজের বলে কোনো বাড়ি নেই। আমি ফোন রাখছি”

বলেই ফোনটা কেটে দিলো অয়ন। তার কথা বলতে ইচ্ছে হচ্ছে না। সে অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো রাস্তার দিকে। মাঝে মাঝে উদ্দেশ্যহীনভাবে নিজেকে হারিয়ে ফেলতে ইচ্ছে হয়। যখন কেউ তাকে খুঁজে পাবে না। এই পৃথিবীটা বড্ড বিরক্তিকর। বড্ড বেশি-ই বিরক্তিকর।

****

প্রাপ্তি তার নোটখাতা খুলে বসেছে। কিছু কোডিং বার বার লিখছে। পায়েল মশা মারছে। খুব ধৈর্য্য সহকারে দারুণভাবে সে মশা মারে। তার মশা মারার বিশেষ পদ্ধতি রয়েছে। প্রথমে ফ্যান, দরজা জানালা বন্ধ করে স্প্রে করবে সারা ঘরে। দশ বারো মিনিট ওভাবেই থাকবে বদ্ধ করে, নাক চেঁপে। তারপর যেই মশা ঢুলে পড়বে মেঝেতে সে পা দিয়ে টিপে টিপে মশা মারবে। ব্যাট থাকলে সুবিধা বেশি হয়। কিন্তু এই বাসায় ব্যাট নেই। প্রাপ্তি অবশ্য এসবে নির্বিকার। তাকে হিমালয়ে বই সমেত রেখে দিলেও মনে হয় না সে খুব একটা ভ্রুক্ষেপ দেখাবে। এটাই তার স্বভাব। তাই তো সে নির্বিকার ভাবে মেঝেতে বসে একটা টুলের উপর খাতা আর কোলের উপর বই রেখে পড়ছে। ঘরভর্তি হৈ-হুল্লোড়। অথচ তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে পড়ছে। হলুদের অনুষ্ঠান এখনো শেষ হয় নি। ছাদে গান ছেড়ে নাচছে সবাই। অথচ এতো শোরগোলের মধ্যেও প্রাপ্তি পড়ছে। এর মধ্যে পাঁপিয়া একপ্রকার ছুটে এলো। কাঁপা হাতে প্রাপ্তির মোবাইল এগিয়ে বললো,

“আপা, তোর মোবাইল”

পাঁপিয়ার মুখ কেমন লাল হয়ে আছে। ফর্সা গাল আর নাক বিশেষ করে। তাকে কেমন ভয়ার্ত দেখালো। প্রাপ্তি চোখ তুলে বললো,

“কি হয়েছে?”

পাঁপিয়া কিছু বলতে পারলো না। সে ঠোঁট চেপে দাঁড়িয়ে আছে। প্রাপ্তি মোবাইলের লক খুলতেই দেখল হোয়াটস এপ অন করা। সেখানে একটি অচেনা নম্বর থেকে একটি ম্যাসেজ। ম্যাসেজটা দেখেই প্রাপ্তির মুখ শক্ত হয়ে গেলো। মুখ রাগে বিকৃত হলো। সাথে সাথেই সে পালটা উত্তর দিলো,

“আমার নাম্বার পেলেন কোথায়?”

কিন্তু কোন উত্তর এলো না। প্রাপ্তি আবার চাইলো পাঁপিয়ার দিকে। সে কাঁচুমাচু মুখে বললো,

“আমি ইচ্ছে করে খুলি নি। চাপ পড়েছে। ম্যাসেজটা তোমার প্রেমিক পাঠিয়েছে জানতাম না।”

পাঁপিয়ার কথা শুনে মশা মারা থামিয়ে দিলো পায়েল। শকুনের মতো তেড়ে এসে বসলো প্রাপ্তির সামনে। বিস্মিত স্বরে বলল,

“তুই প্রেম করছিস?”………

চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন