#সিন্ধুপুষ্পের_অনুরাগ
#১৯তম_পর্ব
“তুমি কখনো এই শাড়িটা পড়বে না, তেলাপোকা। তোমাকে আসমানী রঙে খুব বাজে লাগে।“
অয়নের মন্তব্যে কি আদৌও প্রাপ্তির কিছু যায় আসে? না আসে না। এই কথাটাও নিশ্চয়ই এই সিনিয়র ভাইয়া মহোদয় জানেন। তবুও কেন আগবাড়িয়ে এমন মন্তব্য। অয়ন শুধু মন্তব্য করছে না, রীতিমত যেন আদেশ করছে। ভুলটা প্রাপ্তির-ই। কোন কুক্ষণে যে এই সিনিয়র ভাইয়ের সামনে আসতে গিয়েছিলো সে? না সে নয়, এই দায়ভার বড় ফুপুর। তার ই আদিখ্যেতা। উনি-ই আদেশ করেছেন,
“বরপক্ষের কোনো অযত্ন যেন না হয়। তোদের বয়সীগুলোকে দেখভাল করার দায়িত্ব তোদের”
দেখভাল? দামড়া, দামড়া ছেলেমেয়েদের কি দেখভাল করবে। বরপক্ষের মোট সত্তর জন এসেছে। তার মধ্যে বিশজনের মতো ছোকরা, ছোকরি। তাদের উৎসাহ আকাশছোঁয়া। গেট ধরার সময় তারা প্রায় কুঁদে কুঁদে ঝগড়া করছিলো। কোনো টাকা দিবে না, বরকে নিয়ে চলে যাবে—কত নখরা! এদিকে প্রাপ্তির ভাই-বোনেরাও খুব দস্যি, তারা বলেই দিলো,
“আমাদের মেয়ে কি সস্তা হে? তোমরা নিয়ে যাও তোমাদের জামাই। আমাদের মেয়ের কিপ্টে জামাইয়ের প্রয়োজন নেই”
এই কথায় নাকউঁচু পাত্রপক্ষের গায়ে যেন পাথর এসে লাগলো। তারাও শিলা আপুকে উদ্দেশ্য করে বললো,
“তোমাদের মতো ঢঙ্গী মেয়েকে নেবে কে? যত না ওজন তার তিনগুণ তো ঢং”
তর্ক যুদ্ধ করতে করতে একটা সময় সত্যি সত্যি যুদ্ধ লেগে যাচ্ছিলো। ভাগ্যিস ওখানে বড় ফুপা ছিলেন। বড় ফুপা একেবারে গোবেচারা, শান্তিপ্রিয় মানুষ। কোনো প্রকার কলহ তার পছন্দ হয় না। সে এক কোনায় বসে তসবিহ পড়তে সাচ্ছন্দবোধ করেন। কখনো কিছুতেই তার কোনো মত থাকে না। তবে বড়ফুপুর সাথে থাকতে থাকতে তিনি কলহ ঠান্ডা করতে পারদর্শী হয়ে গিয়েছেন। তাই তো দুপক্ষের ঝগড়ার মীমাংশাটাও তিনি করলেন। গেট ধরার টাকা নির্ধারিত হলো সাত হাজার। প্রাপ্তির বোনেরা সাত হাজার টাকা পেল বটে কিন্তু সেই সাথে বড়ফুপুর রামধমক জুটলো। উনি চিচি স্বরে শাসালেন,
“তোরা কি ছোটলোক নাকি? রাস্তার গুন্ডাদের মত ওখানে চাঁদাবাজি করছিলি? যদি ওরা সত্যি সত্যি জামাই নিয়ে চলে যেত? বিয়ে হলো পবিত্র কাজ, শয়তানে তাই অনেক লাড়াচাড়া দেয়। কিভাবে বিয়েটা ভাঙ্গবে সেটাই হয় তার প্রধান কাজ। একবার ওরা যদি অখুশি হয়ে বিয়ে ভেঙ্গে দেয় তাহলে ওদের কিছু হবে না, শিলার কপাল পুড়বে। শুধু পোড়া না একেবারে ছাইপোড়া”
সেই থেকে প্রাপ্তিরা হয়েছে বরপক্ষের গোলাম। প্রাপ্তিরও বোনেদের সাথেই এই অসহ্যকর কাজ করতে হচ্ছে। একটু পর পর শুধানো,
“ছবি তুলেছেন? খেয়েছেন? কিছু লাগবে?”
সেজন্যই এই অয়ন নামক সিনিয়র মহোদয়ের সামনেও তাকে ঘুরঘুর করতে হচ্ছে। অয়ন আসার পর থেকেই তার দিকে কেমন একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। গেটের মারপিটের মধ্যেও সে নির্বিকার ছিলো। তার দৃষ্টি ছিলো শুধু প্রাপ্তির উপর। কেমন নিস্তব্ধ, শান্ত, স্থির দৃষ্টি। এরপর যেই একটু ফাঁক পেলো অমনি গম্ভীর স্বরে এমন মন্তব্য করে বসলো। প্রাপ্তি চোখ পাঁকিয়ে বললো,
“আপনার দামী উপদেশ আপনার কাছেই রাখুন। আমার প্রয়োজন নেই”
অয়নের দৃষ্টি বদলালো না। বরং কণ্ঠ গম্ভীর করে বললো,
“কি করবো বল, তেলাপোকা প্রজাপতি হবার চেষ্টা করলে চোখে লাগে কি না। তাই উপদেশটা নিজের কাছে সীমাবদ্ধ রাখতে পারছি না”
“চোখে লাগলে চোখ বুজে রাখেন, আমি কি দিব্যি দিয়েছি আমাকে দেখার? আপনার মতো খারাপ ছেলে আমাকে যত কম দেখবে ততই ভালো”
অয়ন কিছু সময় ঠান্ডা দৃষ্টিতে চেয়ে রইলো। প্রাপ্তি যেতে ধরলেই সে এক অদ্ভুত কাজ করলো। অয়ন প্রাপ্তির চুলের ফুলটা টেনে খুলে ফেলে দিয়ে পায়ে পিষে ফেললো। তার এমন কাজে প্রাপ্তি চোখ বড় বড় করে জিজ্ঞেস করলো,
"এটা কি হল!"
"কি হবে?"
"আমার ফুলটা এভাবে নষ্ট করলেন কেন?"
অয়ন বিকারহীন উত্তর দিল,
"কারণ আমি খারাপ ছেলে। খারাপ ছেলেদের কাজের কোনো কারণ থাকে না। তাদের যা ইচ্ছে তারা তাই করে।"
প্রাপ্তির ইচ্ছে হলো অয়নের শুভ্র গালে একটা কষে থাপ্পড় দিতে। কিন্তু থাপ্পড়টা দিতে পারবে না সে। থাপ্পড় দিলে এখানে একটা গন্ডগোল বাঁধবে। প্রাপ্তির রাগ গলনাঙ্ক পেরিয়ে স্ফুটনাঙ্কে পৌছাচ্ছে। তাই সে একমুহূর্ত সেখানে দাঁড়ালো না। একপ্রকার হনহন করে চলে গেলো। ভাগ্যিস কেউ আশেপাশে ছিলো না। নয়তো একটা দক্ষযজ্ঞ বাঁধতো বটেই।
প্রাপ্তি ভেবেছিলো অয়ন তাকে বিয়ের অনুষ্ঠানে শান্তি দিবে হয়তো। কিন্তু না। অয়ন মোটেই তাকে শান্তি দিলো না। ঝোঁকের মতো তার পিছু নিয়েছে সে। তার দৃষ্টি তাকে সর্বত্র অনুসরণ করছে। ফলে প্রাপ্তি শেষপর্যন্ত নীলুর কাছে গিয়ে বললো,
“নীলু আপু, অয়ন ভাইয়া তোমাকে ডাকছে। ছবি তুলতে”
নীলু অয়নের উপর বড়সড় একটা ক্রাশ খেয়েছে তাতে কোনো সন্দেহ নেই। ক্রাশটা এতোটাই বড় যে সে প্রায় উড়ে উড়েই চলে গেল। মেয়েরা ভদ্র ছেলের থেকে উদ্ভট ছেলেদের প্রতি আকর্ষিত হয়—কথাটা আবার প্রমাণিত হলো। নীলু অয়নের কাছে যেতেই প্রাপ্তি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। অয়ন তার পিছু নিতে পারছে না। তাকে বাধ্য হয়ে নীলুর সাথে ছবি তুলতে হচ্ছে।
শিলার বিয়ে হলো রাত আটটার দিকে। বিয়ের পর খাওয়াদাওয়া। সেখানে শিলা এবং তার জামাই বসলো বরপক্ষের ছোকরাগুলোকে নিয়ে। ওখানে গোল বাঁধলো হাত ধোঁয়া নিয়ে। বরকে তারা হাত ধুঁতে দিবে না। এদিকে প্রাপ্তির ভাই-বোনেরা কাঁধে টাওয়াল, পেয়ারস সাবান নিয়ে ঘিরে ধরে আছে বরকে। এর মধ্যে অয়ন বললো,
“ভাইয়ের হাত তখনই ধুঁতে পারবে যখন ভাইয়ের শালিরা সবাই আমাদের হাত ধুয়ে দিবে। খাতিরদারি শুধু ভাইয়ের হবে কেন? আমাদেরো হোক”
ব্যাস সবাই হো হো করে রাজি হল। অয়ন প্রাপ্তির দিকে তাকিয়ে বললো,
“বেয়ানরা, আসেন হাত ধুঁইয়ে দিন। নাকি আমরা খুব খারাপ ছেলের ক্যাটাগরিতে পড়ি বলে আমাদের হাত ধরা যাবে না?”
প্রাপ্তি সূঁচালো নয়নে তাকালো। অয়নের ইঙ্গিত বুঝতে কষ্ট হলো না। বদের হাড়ি শোধ তুলতে চাইছে তখনের খারাপ ছেলে বলার। কিন্তু সেও কম নয় সুন্দর নীলুকে বললো,
“আপু, তোমাকে ডাকছে”
ফলে অয়নের হাতটা নীলুই আগ্রহভরে ধুঁইয়ে দিলো। অয়ন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে চাইলো বটে, কিন্তু প্রাপ্তি কুচ পরোয়া নেই টাইপ ভাব দেখিয়ে অন্যদের হাত ধুঁতে ব্যস্ত হলো। বরের খালাতো ভাইয়ের নাম আদিল। আদিল ভাই সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। আপাতত সুনামগঞ্জে থাকেন চাকরির খাতিরে। প্রাপ্তির দায়িত্বে তার হাত ধোঁয়ার দায়ভার পড়লো। প্রচন্ড লাজুক মানুষ তিনি। প্রাপ্তি সামনে যেতেই বললো,
“আমি নিজে ধুয়ে নিব, তুমি সাবানটা রাখো”
প্রাপ্তি একপ্রকার হাফ ছেড়ে বাঁচলো। মানুষের হাত ধরে ধরে তা ধোঁয়ানোর মত বিরক্তিকর কাজও যে ইহজীবনে তার করতে হবে সেটা কল্পনাও করে নি। আর ভাই-বোনগুলো হাদিগিল্লা টাইপের। একটু টাকার জন্য এতো বিরক্তিকর কাজ করছে। প্রাপ্তি বারংবার বলেছে এসবে তাকে না টানতে কিন্তু বড়ফুপুর ওই যে ধমক! এখন প্রাপ্তি কিছু বললেই বাসায় আরেক পালানাটক হবে। আদিল ভাই সেই ফাঁকে শুধাল,
“তুমি ইঞ্জিনিয়ারিং স্টুডেন্ট না?”
“হ্যা”
“কোন সাবজেক্ট?”
“কম্পিউটার এন্ড সফওয়্যার ইঞ্জিয়ানিয়ারিং”
“আমার সাবজেক্ট”
প্রাপ্তি হাসলো। কি উত্তর দিবে সে জানে না। কথা বলতেও ভালো লাগছে না। এদিকে অয়ন স্থির দৃষ্টিতে তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। নীলু তার হাত ধুয়ে দিতে চাইলেও সে আগ্রহ প্রকাশ করলো না। বরং মিষ্টি করে বললো,
“তোমার মতো সুন্দরীকে দিয়ে এমন কাজ করালে আমার পাপ হবে। ছিঃ ছিঃ তুমি এতো কষ্ট কর না”
*****
বিয়ে শেষে বরবউ আলাদা করে ফটোসেশন করলো অনেকক্ষণ। তখন বরপক্ষ এবং কনেপক্ষের ছেলেমেয়েগুলো একত্রে বসলো। তাদের মধ্যে তখন হাসি তামাশা, আড্ডা জমলো। শুধু প্রাপ্তি-ই সবার থেকে দূরে একটা চেয়ার টেনে বসে থাকলো। তার ভালো লাগছে না। মাথা ধরেছে। বিরিয়ানি তার ভালো লাগে না। দুপুরে খাওয়াটা ঠিক মত হয় নি। সব মিলিয়ে কেমন বমি বমি পাচ্ছে। সে বাড়ি যেতে চায়। তিন-চারবার বড়ফুপুকে বলেছে কিন্তু তিনি গা করেন নি। কনভেনশন সেন্টার থেকে বাসা অনেক দূর। নয়তো ঠিক চলে যেত। ওদিকে হাহা-হিহি চলছে। একে অপরের প্রেম নিয়ে বিস্তর চর্চা করছে। ফলে সেজোফুপুর ছেলে অয়নকে প্রশ্ন করলো,
“ভাইয়া, সবার কথা শুনলাম, এবার আপনার পালা। আপনার নিশ্চয়ই গার্লফ্রেন্ড আছে! এবার আপনার সেই লাকি গার্ল সম্পর্কে একটু বলুন শুনি”
অয়ন সাথে সাথেই হেসে বললো,
“না ভাই আমার কোনো গার্লফ্রেন্ড নেই”
“যা, মিথ্যে কথা”
“সত্যি। আমি কখনো প্রেমে পড়ি নি। তবে, আমি যদি কখনো কারোর প্রেমে পড়ি, তবে তাকে এতটাই ভালোবাসবো যে কখনো ভালোবাসার কমতি অনুভব করতে দিব না। প্রতিটা মুহূর্তে তাকে অনুভব করাবো সে আমার জীবনের সম্রাজ্ঞী, সে আমার জীবনের একমাত্র ভালোবাসা। আফসোস, আমার জীবনে এখনো সেই প্রেমটা আসে নি। আমি আপাদমস্তক, সব দিক থেকেই ভার্জিন”
কথাটা বলার সময় অয়ন চাইলো প্রাপ্তির দিকে। ঠিক তখনই তাদের চোখাচোখি হল। অয়ন চোখ সরালো না। এমন মনে হলো কথাটা যেন অয়ন তাকেই উদ্দেশ্য করেই বলছে.........
চলবে