ফন্ট সাইজ:
থিম:
হুটহাট পরিনীতা

৪র্থ পর্ব

লেখক: নওরিন কবির তিশা

#হুটহাট_পরিনীতা—— #পর্ব_৪

লেখনী—— #নওরিন_কবির_তিশা

আমাদের আমার বাবার বাড়িতে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সূর্যটা কিঞ্চিৎ পশ্চিমে হেলে পড়েছিল। বলাবাহুল্য, আমরা একটু দেরিতেই রওনা হয়েছিলাম। তবে বাড়ি ফেরার পর থেকেই আমার সমস্ত জগত স্থবির হয়েছে একখানা নতুন উপন্যাসের পাতায়। সফর ক্লান্তি,চতুর্পাশ্বের কোলাহল-কোনো কিছুই আমাকে সেই উপন্যাসের কাল্পনিক জগত থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি।

বিছানায় উপুড় হয়ে শুয়ে একমনে পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা উল্টে চলেছি। সময়ের ধ্যানজ্ঞান ছিলো না কিছুই। উপন্যাসের নায়ক-নায়িকার মান-অভিমানের টানাপোড়েনে আমি তখন এতটাই বিভোর যে বহির্জগতের কোনো কোলাহলই আমার কানে পৌঁছাচ্ছিল না। ঘড়ির কাঁটা এখন রাত আটাতে ঠেকেছে। বইটার এখনো প্রায় পঞ্চাশ পৃষ্ঠার মতো বাকি‌। আমার তীব্র ইচ্ছা করছে বাকি সবটুকু এক নিঃশ্বাসে শেষ করতে, কিন্তু বিধি বাম!

ড্রইংরুম থেকে আম্মুর অনবরত উচ্চৈঃস্বরের ডাকাডাকিতে অবশেষে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বইটা বন্ধ করতে হলো। এই এক জ্বালা, নিজের বাড়িতে এলেও একটু শান্তিতে কল্পনাকে উপভোগ করার জো নেই! চাচ্চুর বড় মেয়ে, আমার ছোটবোন মেহজাবিন রুমে এসে আমার হাত ধরে টানতে টানতে বলল,

‘কী আপু! এতো কি পড়ো? কাকিআম্মু ডাকে তোমায়।চলো জলদি!’

আমি অলস ভঙ্গিতে বিছানা থেকে নেমে পরনের ড্রেসটা একটু ঠিক করে মেহজাবিনের সাথে গল্প করতে করতে ড্রইংরুমের দিকে এগোলাম। ড্রইংরুমে এসেই দেখি রুমের ঠিক মাঝখানের সোফাটায় সবাই গোল হয়ে বসে গল্পের আসর জমিয়েছে। একদিকে আমার আব্বু আর চাচ্চু, আর ওনাদের ঠিক মাঝখানের একক সোফাটায় বসে আছেন মিস্টার ডক্টর।

ওনার পরনে এখন একটা হালকা রঙের ক্যাজুয়াল শার্ট, প্যান্ট আর চোখে সেই চশমা। আব্বু আর চাচ্চুর গম্ভীর সব রাজনৈতিক কিংবা সামাজিক কথার মাঝখানে উনি অত্যন্ত বিচক্ষণতার সাথে মাথা নেড়ে মৃদু মৃদু হাসছেন আর টুকটাক কথা বলছেন। দেখে বোঝার উপায় নেই যে এই বাড়িতে ওনার এটা প্রথম আসা!লোকটা কত্তো সামাজিক,আর ওনার বউ হয়ে আমি কিনা চূড়ান্ত পর্যায়ের অসামাজিক! ছিঃ, ছিঃ নিজেই ধিক্কার জানালাম নিজেকে।

ওদিকে কাকিমনি আর আম্মু ডাইনিং টেবিলের দিকে খাবার সার্ভ করার তোড়জোড় করছেন। পুরো ঘর জুড়ে একটা উৎসবমুখর, চেনা চেনা আনন্দঘন পরিবেশ। সত্যি বলতে এমন পরিবেশ পার্সোনালি আমার বিস্তর পছন্দ।

আমাকে ড্রইংরুমে ঢুকতে দেখেই আম্মু রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাত নাড়িয়ে বললেন,

‘এই যে আমাদের মহাশয়া এলেন! তা এতক্ষণ কী করা হচ্ছিল শুনি? একটু হাতে হাতে বাটিগুলো টেবিল পর্যন্ত এগিয়ে দিতে পারিস না? বরের সামনে একটু লক্ষ্মী মেয়ে সেজে দেখা অন্তত!’

আমি আম্মুর কথায় একদম কান না দিয়ে ওনাদের দিকে চেয়ে ঠোঁট উল্টে চড়া সুরে বললাম,

‘একদম পারবো না! আমি মাত্র নিজের বাড়িতে এলাম, আর তোমরা এসেই আমাকে দিয়ে খাটানো শুরু করে দিলে? আমি এখন কিচ্ছু করব না!’

বলেই আমি গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে গিয়ে সোফায় আব্বু আর চাচ্চুর মাঝখানের সামান্য খালি জায়গাটুকুতে একদম জোর জবরদস্তিতে দখল করলাম। আব্বুর গা ঘেঁষে বসে ওনার কাঁধে মাথা রাখতেই আমার দীর্ঘদিনের চেনা শান্তিটা যেন ফিরে এলো। আব্বু আমার আদুরেপনায় হেসে উঠলেন এবং ওনার বড় হাতটা দিয়ে পরম মমতায় আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে লাগলেন। চাচ্চু আমার গালটা হালকা টেনে দিয়ে বললেন,

‘আমাদের তরী মা কি কখনো বড় হবে? শ্বশুরবাড়ি গিয়েও বুঝি এমন ঘাড়ত্যাড়ামো করেছিস?’

আমি আব্বুর বাহুর নিচে আরও একটু সেঁধিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আমি মোটেও ঘাড়ত্যাড়ামো করি না। তোমরা সবাই মিলে আমার নামে বানিয়ে বানিয়ে অপবাদ দিচ্ছো!’

এমন সময় আমার চাচ্চুর ছোট মেয়ে, চার বছর বয়সী পুঁচকে তানহা গুটিগুটি পায়ে, ফ্রকের কোণা ধরে আমার সামনে এসে দাঁড়াল। বড় বড় দুটো গোল চোখ দিয়ে আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে, কোনো কথা না বলে টুপ করে এসে আমার কোলে চড়ে বসল। তানহার সেই নরম তুলতুলে শরীরটাকে জড়িয়ে আমি কপালে একটা চুমু খেয়ে ওকে আরও শক্ত করে জাপটে ধরলাম।

ডাইনিং টেবিল থেকে চামচ হাতে এগিয়ে এসে আম্মু আমার এই কান্ড দেখে কপালে করাঘাত করার ভঙ্গি করলেন। অত্যন্ত গম্ভীর গলায় বললেন,

‘আহা রে আদর! বলি তরী, এখন তোর বিয়ে হয়ে গেছে। এখন তো একটু বড় হ, একটু গাম্ভীর্য আন নিজের মধ্যে! এখনো বাচ্চাদের মতো বাপের কোলে, চাচার কোলে গিয়ে বসে আছিস, কোলে আবার আরেকটা বাচ্চা! জামাই দেখলে কী ভাববে?’

আম্মুর এই ‘বিয়ে হয়ে গেছে’ আর ‘জামাই’ শব্দ দুটো শোনামাত্রই আমার ভেতরের সুপ্ত তেরিয়া ভাবটা হুট করে জেগে উঠল। আমি কোল থেকে তানহাকে একটু সোজা করে বসিয়ে, আম্মুর দিকে চেয়ে মুখ ফুলিয়ে বেশ অভিমানী গলায় বলে উঠলাম,

‘বিয়ে দিয়েছো কেন তোমরা? আমি কি এখন বিয়ে করতে চেয়েছিলাম নাকি? আমাকে না জানিয়ে হুট করে ধরে একটা অচেনা মানুষের সাথে বিয়ে দিয়ে দিলে, আর এখন বলছো বড় হতে! আমি বড় হব না, একদমই না!’

কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বিন্দুমাত্র না ভেবেই বলে ফেললাম। কিন্তু বলা শেষ হতেই হুট করে আমার খেয়াল হলো— সর্বনাশ! আমি কার সামনে দাঁড়িয়ে এসব বলছি! চট করে আমার নজর গেল সোফায় বসে থাকা অন্তিকের দিকে। চেয়েই আমার জিভ কামড়ে ধরতে ইচ্ছা করল। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় আমার পুরো মুখমণ্ডল মুহূর্তেই রক্তিম হয়ে উঠল।

মিস্টার ডক্টর তখনো সোফায় বসে আছেন, কিন্তু ওনার চশমার আড়ালের অতি তীক্ষ্ণ চোখ দুটো এখন সম্পূর্ণভাবে আমার ওপর নিবদ্ধ। ওনার চাপদাড়ির আড়ালে লুকায়িত কিঞ্চিৎ তামাটে ঠোঁটজোড়ায় এক চিলতে অত্যন্ত দুষ্টুমিভরা, রসাত্মক হাসি খেলা করছে। ওনার সেই চাউনি যেন পরোক্ষভাবে আমাকে বলছিল, ‘কী যেন বলছিলেন ম্যাডাম? বিয়ে করতে চাননি? তাহলে কাল রাতে ওমন বিড়ালছানার মতো আমার বুকে কে সেঁধিয়ে ছিল?’

ওনার এই নীরব অথচ মারাত্মক অর্থপূর্ণ চাহনির সামনে আমি লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গেলাম। বরের সামনে এভাবে বিয়ের বিপক্ষে কথা বলাটা যে কতটা কেলেঙ্কারিজনক, তা আমার এই সতেরো বছরের মাথায় এবার বেশ ভালোমতোই ঢুকলো! ধরণী দ্বিধা হও, আমি ভেতরে যাই!

ঠিক তখনই পরিস্থিতি সামাল দিতে, আমার ফুফাতো বোন রোজা ড্রইংরুমের দরজার ওপাশ থেকে প্রায় দৌড়ে ঘরের ভেতর এসে ঢুকল। ও আমার সামনে এসে দুই হাত কোমরে দিয়ে বেশ নাটকীয় ভঙ্গিতে বলল,

‘তরী আপু, তুমি এতক্ষণ রুমে একা একা কী করছিলে বলো তো? আমি সারা বাড়ি খুঁজে তোমাকে কোথাও পাচ্ছিলাম না!’

আমি অন্তিকের ওই সম্মোহনী দৃষ্টির সীমানা থেকে বাঁচতে ঝট করে রোজার দিকে তাকালাম। একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে, অলস ভঙ্গিতে চুলগুলো কানের পেছনে গুঁজে বললাম,

‘কী আবার করব? রুমে বসে শান্তিতে একটা মারাত্মক উপন্যাসের বই পড়ছিলাম। মাত্র পঞ্চাশটা পৃষ্ঠা বাকি আছে, আম্মু ডেকে না আনলে এতক্ষণে শেষই হয়ে যেত!’

আমার মুখে ‘উপন্যাস’ শব্দটা শোনামাত্রই আম্মু ডাইনিং টেবিল থেকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠলেন,

‘হ্যাঁ! তোর তো আর দুনিয়ায় কোনো কাজ নেই! তুই সারাদিন শুধু ওই সব আজগুবি উপন্যাসের বই নিয়েই পড়ে থাকিস। শ্বশুরবাড়ি গেলি, সেখানেও নাকি বই পড়েছে! এখন নিজের বাসায় আসলি, এখানে এসেও একটু আমাদের সাথে বসবি, দুটো সুখ-দুঃখের কথা বলবি, জামাইকে নিয়ে কোথাও একটু ঘুরতে যাবি— তা না, উনি আছেন ওনার ওই বই নিয়ে! এই মেয়ের মাথায় উপন্যাসের ভূত চেপে বসেছে!’

আম্মুর এই অনবদ্য বক্তৃতায় ড্রইংরুমের সবাই-আব্বু, চাচ্চু, এমনকি মেহজাবিন আর রোজাও বেশ শব্দ করে হেসে উঠল। আর আমার মিস্টার ডক্টর? উনি ওনার চশমাটা নাকের ডগায় একটু নামিয়ে, আমার দিকে চেয়ে চোখের কোণ দিয়ে এমন একটা অদ্ভুত ইশারা করলেন, দেখে যে মনে হলো তাতে-এই লোকটা মনে মনে আমার আম্মুর সমস্ত কথার সাথে একমত প্রকাশ করছেন!

আমি লজ্জায়, রাগে আর অভিমানে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে তানহার নরম গালে কামড় দেওয়ার ভান করলাম। মনে মনে ভাবলাম ‘ধুর! বাপের বাড়ি এসেও শান্তি নেই। সবাই মিলে আমার পেছনে লেগেছে। আর ওই চশমা পরা মানুষটা তো আরও এক কাঠি ওপরে! উনি শুধু সুযোগ খোঁজেন কীভাবে আমাকে এভাবে দেখে ভড়কে দেওয়া যায়!’

এমন খুনসুটির মাঝেই উপস্থিত হলো আমার পার্শ্ববর্তী এক কাজিন। আপু বয়সে আমার দু’বছরের বড়। দেখতে ভীষণ মিষ্টি আমার ভাষ্যে ইন্ডিয়ান নায়িকা ‘কোয়েল মল্লিকের’ মতন কিছুটা মুখের গড়ন ওর। হুবহু নয়,তবে বেশ খানিকটা একরকম! আপুর সাথে আমার সম্পর্ক একদম অন্যরকম। যাকে বলে, বোন নামক বান্ধবী ও আমার। আপুকে দেখে আমি হুড়মুড়িয়ে ছুটে গেলাম। আর যেতে গিয়েই বিপত্তি!

সোফার কভারে বাঁধলো পা’টা,একটুর জন্য আছাড়টা খাইনি। তবে শেষ রক্ষাও হলো না,আপুকে নিয়ে সামনের কাউচটাতে পড়েছি একদম!অবস্থা জন্ডিস! ওর হাতে মেবি কিছু ছিলো। পাশে পরেই ঝনঝনিয়ে শব্দ তুলল। আমি চোখমুখ খিঁচে বললাম,,

‘ কি রে,কি আনছিলি?’

আপু কিঞ্চিৎ রাগী কণ্ঠে বলল,,

‘ কচু!’

আমি তৎক্ষণাৎ ওর উপর থেকে কোনমতে নিজেকে তুলে বললাম,,

‘ ধুর,রাগ করিস ক্যান? আজ একটা জামাই যায় বলে তোর উপর পড়েছি। জামাই থাকলে তো তার উপর পড়তাম!’

আমার কথাগুলো বলতে দেরি! তৎক্ষণাৎ টের পেলাম,উপস্থিত সকলের বিস্ফোরিত দৃষ্টি আমাতে নিবদ্ধ হয়েছে। বুঝলাম ভুল বাড়িতে বেল বাজিয়েছি! বর তো আমার সামনেই! আর আমি কিনা এসব! মানে! স্বভাব বদলালোনা! আপু আমার কানে কানে কটাক্ষ করে বললো,,

‘বরং তোর সামনেই! আর দেখ কিভাবে চেয়ে আছে! উফস বনু,আজ তোর খবর আছে!’

আমি লজ্জা পেলাম কিনা জানি না,তবে ওনার দিকে তাকানোর সাহস করলাম না। প্রসঙ্গ পাল্টে বললাম,,

‘ বাদ দে আপু।জানিস? আজ একটা উপন্যাস পড়তেছিলাম। ভাইইইই নায়কটা কি জোসসসস। পুরা চুম্মা,চুম্মা টাইপ। কি অস্থির,আল্লাহ!’

আপু এবার আমাকে খুঁচিয়ে ইশারা করতেই, আমার চক্ষু চড়ক গাছ! উনি আমার ঠিক পিছনে এসে দাঁড়িয়েছেন। কিছু কি শুনে ফেললেন তবে?হয় কপাল! লজ্জায় মাটিতে গেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে! মাবুদ, কি বলে ফেললাম! লজ্জা! আর এই বেডারো বলিহারি! এখনি আমার পেছনে এসে দাঁড়াতে হতো!

আমি কিছু বলার আগেই উনি আম্মুর উদ্দেশে বললেন,,

’ আম্মু,আমার মাথাটা ধরেছে। একটু উপরে যাচ্ছি।’

ব্যাস! আমার মাদার ইন্ডিয়া জামাইকে নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়লেন। পারে তো, কোলে করে জামাইকে রুমে দিয়ে আসে। উনি আমার আব্বুদের কাছে থেকেও বিদায় নিয়ে প্রস্থান করলেন। তবে,উনি যেতেই আমার আম্মাজান আমায় উদ্দেশ্য করে একগাদা নির্দেশনা ছুঁড়ে বললেন,,

‘ তরী রুমে যা। আর দেখ,জামাইয়ের কি কি‌ লাগবে? কোনোকিছুর যেন একটুও গাফিলতি না হয়!’

আমি আর কি করবো? বাধ্য মেয়ের মতো গেলাম নিজ কামরায়। স্বামী সেবা করতে!

★

‘এইযে শুনছেন?’

বড্ড আজব তো! ওনার পিছু পিছুই কক্ষে এসেছি আমি। কিন্তু উনি লাপাত্তা! কোত্থাও কোনো চিহ্ন নেই। উবে গেলেন নাকি? ভাবনার মাঝেই কিঞ্চিৎ ধুকধুকানিকে সঙ্গী করে আমি এগিয়ে গেলাম জানলার দিকে।কিন্তু অদ্ভূত! এখানেও কোনো হদিস নেই ওনার! বড্ড বেশি অবাক হলাম আমি। পিছু ফিরে যেইনা কক্ষ ত্যাগের প্রস্তুতি নিতে যাব সঙ্গে সঙ্গে নিজের বাঁ হাতে কারো আলতো টান অনুভব করলাম। চিৎকারের সময়টুকু পেলাম না তার মধ্যেই নিজের অস্তিত্ব বিছানায় আর আমার উপর কোনো বিশাল দেহকে উপলব্ধি করে তাজ্জব বনে গেলাম।

বক্ষদেশের অল্পস্বল্প ধুকধুকানি এখন উন্মাদ অশ্বের গতি লাভ করেছে। ওনার মৃদু শ্বাস স্পষ্ট অনুভূত হচ্ছে আমার সমগ্র মুখমণ্ডলজুড়ে। লাজুকতা একে একে বেষ্টন করছে আমায়,গ্রাস করছে আমার সমগ্র অস্তিত্ব।

​রুমের আবছা আলোয় ওনার চশমা জোড়া টেবিলের ওপর রাখা। চশমা ছাড়া অন্তিকের চোখ দুটো যে এতখানি সম্মোহনী আর গভীর হতে পারে, তা এই প্রথম এত কাছ থেকে আবিষ্কার করলাম। ওনার এলোমেলো বাবরি চুলগুলো আমার কপালে আর গালে আলতো করে ছোঁয়া দিচ্ছে। আমি আড়ষ্ট হয়ে চোখ দুটো বন্ধ করে নিতে যাব, তখনই ওনার সেই চেনা ভরাট, গম্ভীর কণ্ঠস্বরে ঘরের নিস্তব্ধতা ভাঙল,

​‘কী যেন বলছিলেন ম্যাডাম? উপন্যাসের নায়ক নাকি পুরাই... কী যেন একটা শব্দ বললেন?’

​ওনার মুখে নিজের বলা সেই চরম লজ্জাজনক শব্দটার ইঙ্গিত শুনে আমার কান-মাথা মুহূর্তেই ঝাঁ ঝাঁ করে উঠল। ইশ! লোকটা তবে সব শুনেছেন! আমি চোখ দুটো শক্ত করে বন্ধ করে, আমতা আমতা করে বললাম,

​‘ম-মানে... আমি তো ওটা আপুর সাথে মজা করছিলাম। আপনি এভাবে হুট করে চোরের মতো এসে...’

​‘আবার চোর?’—— অন্তিক আমার কথার মাঝেই মৃদু হাসলেন। ওনার ঠোঁটের উষ্ণ ছোঁয়া আমার গালের খুব কাছাকাছি এসে থমকে গেল। উনি আমার অবাধ্য একগুচ্ছ চুল কানের পেছনে গুঁজে দিতে দিতে বললেন,

‘নিজের ঘরে, নিজের স্ত্রীর কাছে আসার জন্য চোর হতে হয় নাকি? আর তাছাড়া, আপনার মুখ থেকেই তো শুনলাম— জামাই থাকলে নাকি আজ তার ওপরই গিয়ে পড়তেন! তা, জামাই তো এখন একদম আপনার সামনেই, বরং বলা ভালো আপনার ওপরেই আছে। এখন বলুন, পড়ার ইচ্ছাটা কি পূরণ হয়েছে, নাকি আরও কিছু বাকি আছে?’

​ওনার এই চরম লেভেলের ফ্লার্টেটিং কাউন্টারে আমার হার্টবিট যেন এক হাজার স্পিডে ছুটতে লাগল। লজ্জায় আর আড়ষ্টতায় আমি কোনোমতে দুই হাত দিয়ে ওনার শক্ত চওড়া বুকটাতে কিঞ্চিৎ ধাক্কা দেওয়ার চেষ্টা করলাম। কিন্তু মিস্টার ডক্টরের ওজনে আমার সেই চেষ্টা একদম ব্যর্থ হলো। আমি মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে, ওনার এই রোমান্টিক জালে জল ঢালার জন্য চট করে বলে উঠলাম,

​‘ধুর! কী যা তা বলছেন! ছাড়ুন আমাকে! আর আপনার না এতক্ষণ ড্রইংরুমে সবার সামনে মাথা ব্যথা করছিল? আম্মুকে তো ওমন নাটক করে বলে এলেন যে মাথা ধরেছে, উপরে যাচ্ছি! তা এই কি আপনার মাথা ব্যথার নমুনা?’

​আমার এই কথায় অন্তিক এতটুকুও দমে গেলেন না। বরং উনি তৎক্ষণাৎ নিজের এক হাত কপালে চেপে ধরে, মুখটা একদম কাঁচুমাচু করে ভীষণ নাটকীয় ভঙ্গিমায় বলে উঠলেন,

​‘উফ! হ্যাঁ, একদম ঠিক কথা মনে করিয়েছেন! মাথাটা যে কী ভীষণ ব্যথা করছে! মনে হচ্ছে এই মুহূর্তে আমার কপালে একটা নরম হাতের সেবা খুব দরকার। ডাক্তার হিসেবে সেলফ ডায়াগনোসিস করে বুঝলাম, এই রোগের একমাত্র ওষুধ আমার স্ত্রীর একটুখানি আদর আর ভালোবাসা!’

​ওনার এই অনবদ্য অ্যাক্টিং আর চরম চালাকি দেখে আমি আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারলাম না। এক চিলতে হাসি আমার ঠোঁট গলে বেরিয়ে এলো। আমি ওনার বুকে হালকা একটা কিল বসিয়ে, মুখটা ফুলিয়ে কৃত্রিম রাগে বললাম,

‘মিথ্যুক! একদম এক নম্বরের মিথ্যুক আপনি! ড্রইংরুমে সবার সামনে থেকে পালিয়ে আসার জন্য ওমন মিথ্যে কথা বললেন? আপনার কোনো মাথা ব্যথাই করেনি, আমি জানি!’

​অন্তিক এবার বেশ শব্দ করেই হেসে উঠলেন। সেই ভরাট, ডিপ ভয়েসের হাসির শব্দে আমার ঘরের চেনা দেয়ালগুলোও যেন এক অদ্ভুত মায়ায় আচ্ছন্ন হয়ে গেল। উনি হাসতে হাসতেই ওনার দুই হাত আমার গালের দু’পাশে রাখলেন। ওনার বুড়ো আঙুল দিয়ে আমার ঠোঁটের কোণের সেই হাসির রেখাটা আলতো করে ছুঁয়ে দিয়ে বললেন,

​‘মিথ্যে না বললে কি শ্বাশুমায়ের হাত থেকে বেঁচে আপনার কাছে আসা যেত, বলুন? আপনার আম্মু যেভাবে জামাই আদরের তোড়জোড় করছিলেন, আর আপনি যেভাবে বাবার কোলে, চাচ্চুর কোলে বসে বাবার বাড়ি আসার আনন্দ উপভোগ করছিলেন— তাতে আমি তো পুরো একলা হয়ে যাচ্ছিলাম! নিজের বিবাহিতা স্ত্রীকে একটু নিজের মতো করে পাওয়ার জন্য এইটুকু ডক্টরস ট্রিকস খাটানো কি খুব বেশি অন্যায়, ম্যাডাম?’

​ওনার এই সহজ, সরল অথচ তীব্র অধিকারবোধে মাখানো কথাগুলো আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন এক লহমায় ওলটপালট করে দিল। সতেরো বছরের এই জীবনে উপন্যাসের পাতায় পাতায় কত শত রোমান্টিক সংলাপ পড়েছি, কিন্তু রক্তমাংসের একটা মানুষের মুখ থেকে এতখানি মায়া আর আকুলতা ঝরে পড়তে পারে, তা তার চঞ্চল মনটা কখনো কল্পনাও করতে পারি নি।

​আমি আর ওনার চোখের দিকে তাকাতে পারলাম না। এক অদ্ভুত, মধুর লজ্জায় আমার চোখের পাতাগুলো ভারি হয়ে এলো। আমি নিচু স্বরে, একদম মিনমিন করে বললাম,

‘তাও... এভাবে কেউ মিথ্যে বলে? আম্মু এখন কত চিন্তা করছে বলুন তো...’

​‘আম্মু একদম চিন্তা করছেন না। উনি ভাবছেন ওনার জামাই এখন ওনার লক্ষ্মী মেয়ের সেবা পেয়ে দিব্যি শান্তিতে ঘুমাচ্ছে,’

অন্তিক আরও একটু ঝুঁকে এলেন। ওনার চিবুকের সেই হালকা চাপদাড়ির স্পর্শ আমার গলার নরম চামড়ায় লাগতেই সারা শরীরে এক তীব্র শিহরণ খেলে গেল। পিঠ বেয়ে নেমে গেল সেই চিরচেনা শীতল স্রোত। উনি ফিসফিস করে ওনার ঠোঁট দুটো আমার কানের লতির খুব কাছে নিয়ে বললেন,

‘তা, ডক্টর সাহেবের মাথা ব্যথার পার্ফেক্ট ট্রিটমেন্টটা কি এবার শুরু করা যাবে, আমার পরিণীতা?’

​লজ্জার শেষ সীমায় পৌঁছে আমি আর কোনো কথা খুঁজে পেলাম না। নিজের সমস্ত ঘাড়ত্যাড়ামো আর চঞ্চলতা বিসর্জন দিয়ে, আমি ওনার শার্টের কলারটা দুই হাতে শক্ত করে খামচে ধরলাম। ওনার চওড়া বুকের ওমে মুখটা লুকিয়ে একদম বিড়ালছানার মতো গুটিসুটি মেরে ওনার বাহুডোরে নিজেকে সঁপে দিলাম। জানলার বাইরে তখন রাতের হাওয়া মৃদু গুঞ্জনে বইছে, আর ঘরের ভেতর উপন্যাসের পাতা ছিঁড়ে বাস্তবের এক টুকরো রূপকথা যেন আমাদের দুজনকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে নিচ্ছে।

উনি যত কাছে আসছেন ততই যেন এক অজানা শিহরণে হৃদয় দুলে উঠছে আমার। আল্লাহ! এ কেমন অনুভূতি? একি দহন? নাকি ভালোবাসা?নাকি অন্যকিছু? হঠাৎ কিছু মনে পড়ায় আমি তৎক্ষণাৎ দূরে সরিয়ে দিলাম ওনাকে। ঝটপট তড়িৎ বেগে উঠে বসলাম। আমার এমন কান্ডে নির্ঘাত তাজ্জব বনে গিয়েছেন লোকটা! হঠাৎ উনি কিছু বলতে যাবেন তার আগেই আমি থতমত কন্ঠে বললাম,,

‘দ-দ-দরজা খোলা।’

আমার এমন কান্ডে উনি চুপিসারে বসে রইলেন; পরক্ষণেই বড্ড গম্ভীরভাবে বললেন,,

‘রুমের লাইট অফ করে অনেকক্ষণ আগেই জিরো লাইট অন করেছি। আর এমনিতেও স্বামী-স্ত্রীর ঘরে অসময়ে কেউ হানা দেয় না। যেখানে সবাই জানেই যে আমরা এখন একান্তই সময় কাটাচ্ছি।’

কথাগুলো বড্ড ভারী ধরনের। মগজে ঢুকলো না আমার। আমি তৎক্ষণাৎ নিজের ওড়না সামলে বললাম,,

‘আপনাকেই বলেছে! এক্ষুণি কাকিমনি খেতে ডাকবে আমাদের।’

উনি প্রত্যুত্তর না করে রুমের আলো জ্বেলে দিলেন। আমি সঙ্গে সঙ্গে বিছানা ছেড়ে উঠে ছুট্টে পালালাম। কিন্তু অদ্ভুতভাবে পিছন থেকে এবার আর ডাকলেন না উনি।

★

রাত দশটা পেরিয়ে ডাইনিং টেবিলের পাট চুকেছে সবে। আম্মু আর কাকিমণি রান্নাঘরের কাজ গুছিয়ে নিয়ে আমাকে ইশারায় ডাকলেন ওনাদের শোয়ার ঘরে। আমি গুটিগুটি পায়ে গিয়ে বিছানার এক কোণে বসতেই কাকিমণি দরজাটা আলতো করে টেনে দিলেন। ওনাদের মুখের গম্ভীর ভাব দেখে আমার বুকের ভেতরটা কেমন যেন ঢিপঢিপ করতে লাগল। ভাবলাম, আবার কোনো ভুল করে বসলাম নাকি!

​আম্মু আমার পাশে এসে বসলেন। আমার হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

​‘তরী, মা আমার। তুই তো বড্ড চঞ্চল, বয়সটাও তোর একদম অল্প। সতেরো বছর এমন কোনো বড় বয়স না। হুট করেই তোর ওপর এত বড় একটা সংসারের দায়িত্ব চলে এলো। আমরা তোকে ছোট থেকে অনেক আদরে রেখেছি, কিন্তু এখন তুই একজনের পরিণীতা, কারো ঘরের ঘরণী।’

​কাকিমণিও ওপাশ থেকে এগিয়ে এসে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বেশ নরম গলায় বললেন,

‘হ্যাঁ রে তরী। বিয়ে জিনিসটা কিন্তু শুধু পুতুল খেলা বা উপন্যাসের ওই রিলস দেখার মতো রোম্যান্টিক গল্প না। এটা একটা সারাজীবনের বোঝাপড়া। অন্তিক ছেলেটা যেমন গম্ভীর, তেমনই কিন্তু ভীষণ দায়িত্ববান আর কেয়ারিং। প্রথম দিন থেকেই দেখছি ও তোকে কতটা চোখে চোখে রাখছে।’

​আমি মাথা নিচু করে ওনাদের কথা শুনছিলাম। আম্মু আমার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে বললেন,

​‘সংসারে টুকটাক মান-অভিমান, ঝগড়া হবেই। কিন্তু মনে রাখিস মা, একটা পুরুষ মানুষ যখন সারাদিন বাইরের খাটুনি খেটে ঘরে ফেরে, তখন সে তার স্ত্রীর কাছে একটু শান্তি খোঁজে, একটু আশ্রয় চায়। সংসার টিকিয়ে রাখতে হলে মেয়েদের একটু ধৈর্যশীল আর নরম হতে হয়। স্বামী যদি কখনো কাছে ডাকে, তবে নিজের কোনো বড় রকমের অসুস্থতা বা অপারগতা না থাকলে কখনো তাকে ফেরাতে নেই, অবহেলা করতে নেই। অবহেলা আর উপেক্ষা পেলে কিন্তু একটা সময় পর স্বামীর মন উঠে যায়, তখন আর ঘরে মন টেকে না।’

​কাকিমণি আম্মুর কথার পিঠে যোগ করে বললেন,

‘একদম ঠিক কথা। পুরুষ মানুষের মন কাঁচের মতো, একবার যদি সেখান থেকে স্ত্রীর প্রতি টান বা শ্রদ্ধা উঠে যায়, তবে সেই সংসার শুধু নামেই টিকে থাকে, ভেতরে কোনো প্রাণ থাকে না। তোর এই ঘাড়ত্যাড়ামো আর চঞ্চলতাগুলো এখন আস্তে আস্তে একটু সামলাতে হবে। অন্তিককে বুঝতে চেষ্টা করবি। ও যেমন তোকে সম্মান দেয়, তুইও ওনার ভালোলাগা-মন্দলাগার দিকে খেয়াল রাখিস।’

​আম্মু আর কাকিমণির এই সহজ, বাস্তব আর গভীর উপদেশগুলো আমার সতেরো বছরের ছোট্ট মগজে যেন এক নতুন পৃথিবীর দুয়ার খুলে দিল। উপন্যাসের পাতায় তো শুধু ভালোবাসার রঙিন দিকটাই পড়ে এসেছি, কিন্তু একটা সংসার টিকিয়ে রাখার পেছনে যে এতটা ত্যাগ আর পারস্পরিক শ্রদ্ধার প্রয়োজন হয়, তা এই প্রথম উপলব্ধি করলাম।

​আমি আম্মুর বুকে মাথা রেখে ফিসফিস করে বললাম,

‘আমি চেষ্টা করব আম্মু। ওনার মন যাতে কখনো খারাপ না হয়, আমি খেয়াল রাখবো।’

​আম্মু হেসে আমার কপালে একটা চুমু খেলেন। কাকিমণি বললেন,

‘অনেক রাত হলো, এবার তোর ঘরে যা। জামাই হয়তো তোর জন্য অপেক্ষা করছে।’

​ওখান থেকে বিদায় নিয়ে নিজের ঘরের দিকে পা বাড়ালাম, আম্মুদের এমন কথায় লজ্জায় লাল নীল বর্ণ ধারণ করেছি শিওর কিন্তু আকস্মিক বুকের ভেতরের চঞ্চল তরীটা যেন এক নিমেষেই অনেকটা পরিপক্ব আর শান্ত হয়ে উঠেছে।

চলবে......

{প্রিয় পাঠক,

আমার প্রকাশিত মলাট বই ❝সালামে ইস্ক❞ সংগ্রহে আছে তো?

সংগ্রহে না থাকলে স্বরবিন্দু প্রকাশন, রকমারি অথবা আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপে অর্ডার করতে পারেন। }

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৪র্থ পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন