ফন্ট সাইজ:
থিম:
হুটহাট পরিনীতা

৫ম পর্ব

লেখক: নওরিন কবির তিশা

#হুটহাট_পরিনীতা—— #পর্ব_৫

লেখনী—— #নওরিন_কবির_তিশা

প্রভাতী রোদ্দুর ধরিত্রীকে জাগ্রত করতে তৎপর; আর আমরা তৎপর নানু বাড়ি যাওয়ার তোড়জোড়ে। কাল রাতেই নানু ভাইয়া কল করেছিলেন, ‘তাহার নাতি জামাইকে দেখিতে চান!’বললাম আমাদের বাড়ি এসে দেখে যান। শুধু এতোটুকুই বলেছিলাম তাতেই আমার মা যে গাট্টা মারলো আমায়! আমি নাকি বুঝেশুনে কথা বলতে পারি না! মাথার বা পাশটা এখনো যন্ত্রণা করছে, বুঝতে হবে মাদার ইন্ডিয়া আর গাট্টা বলে কথা! এ সমস্ত ভাবতে ভাবতেই, আমি ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের চেষ্টায় মগ্ন।

হালকা গোলাপি রঙের একটা সুতি জর্জেট কুর্তি পরেছি আজ, গলায় সরু একটা চেইনের সাথে ছোট্ট লকেট। চুলগুলো ভালো করে আঁচড়ে একপাশে ছেড়ে দিয়েছি, আর ঠোঁটে ছুঁইয়ে নিয়েছি সামান্য একটু গোলাপি লিপস্টিক। চোখে হালকা কাজল দিতেই আয়নায় প্রতিবিম্বিত মেয়েটাকে বড্ড অচেনা, অথচ ভীষণ স্নিগ্ধ ঠেকল। এ্যাহ! ঢংগীদের মত নিজের প্রশংসা নিজেই করছি। ছিঃ তরী ছিঃ এ কেমন অধঃপতন তোর!

হঠাৎ,আয়নার এক কোণ দিয়ে বিছানার দিকে নজর যেতেই আমার সাজের সব উৎসাহে যেন এক চিলতে ভাটা পড়ল। সেখানে বসে আছেন মিস্টার ডক্টর। ওনার পরনে একটা ব্ল্যাক ক্যাজুয়াল শার্ট। চোখে সেই চিরচেনা চশমা। গম্ভীর মুখাবয়ে উনি একমনে ফোনের স্ক্রিনে আঙুল চালাচ্ছেন, কোনো একটা পেশাগত কাজ করছেন হয়তো।

কিন্তু খটকাটা অন্য জায়গায়। কাল রাতের সেই খাবারের টেবিল থেকে শুরু করে আজ সকাল পর্যন্ত, লোকটা আমার সাথে প্রয়োজনের অতিরিক্ত একটা শব্দও খরচ করেননি। ওনার এই সন্তর্পণে আমায় এড়িয়ে যাওয়ার কৌশলটা আমার সতেরো বছরের চঞ্চল মনে এক অদ্ভুত দোলাচলের সৃষ্টি করেছে। আম্মু আর কাকিমণির কালকের কথাগুলো হুট করে মাথায় এসে ধাক্কা দিল,,

‘অবহেলা আর উপেক্ষা পেলে কিন্তু একটা সময় পর স্বামীর মন উঠে যায়!’

বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু মুচড়ে উঠল। তবে কি কাল রাতে ওনাকে ওমন করে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিলাম বলে উনি রাগ করেছেন? ওনার মন উঠে গেল না তো? আল্লাহ বিয়ের এক সপ্তাহও হয়নি! এত জলদি এমন হলে! কান্না আসছে খুব তবুও নিজেকে সামলে,কৌতূহল আর কিঞ্চিৎ ভীতি মেশানো মনটা নিয়ে আমি সাজগোজের পাট চুকিয়ে ওনার দিকে ফিরলাম। গুটিগুটি পায়ে বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়িয়ে, ওনার মনোযোগ আকর্ষণের জন্য একটু গলা খাঁকারি দিয়ে বড্ড কুণ্ঠিত স্বরে বললাম,

‘এই যে, শুনছেন? আমি... আমার সাজা শেষ।’

অন্তিক ফোন থেকে চোখ না তুলেই অত্যন্ত গম্ভীর, ভরাট কণ্ঠে শুধু একটি শব্দে জবাব দিলেন,

‘হুম।’

ব্যস, ওইটুকুই! কোনো মিষ্টি সম্বোধন নেই, ড্রেসটা কেমন হয়েছে সেই নিয়ে কোনো চতুর মন্তব্য নেই! ওনার এই হিমশীতল নীরবতা আমার ঘাড়ত্যাড়া স্বভাবটাকে এবার বড্ড ব্যথিত করল। আমি ওনার আরও এক কদম কাছে গিয়ে, একটু অভিমানী গলায় সরাসরি শুধালাম,

‘আপনার কি কাল রাত থেকে আমার ওপর কোনো কারণে রাগ হয়েছে?’

এবার অন্তিক ফোনটা লক করে বিছানায় রাখলেন। চশমাটা নাকের ডগায় সামান্য নামিয়ে ওনার সেই অতি তীক্ষ্ণ, সম্মোহনী চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ওনার মুখাবয়বে কোনো রাগের চিহ্ন নেই, বড্ড স্বাভাবিক মুভমেন্ট ওনার। তবে আমার কাছে কেন জানি এসব টা কৃত্রিম কৃত্রিম লাগছে! হঠাৎ উনি বললেন,

‘রাগ? রাগ করতে যাব কেন বলুন? আপনি তো কোনো অন্যায় করেননি। আর একজন প্রফেশনাল ডক্টর হিসেবে ইমোশন কন্ট্রোল করাটা আমাদের রুটিন ওয়ার্ক, সো এখানে রাগের কোনো লজিকই নেই।’

ওনার এই নিরেট যুক্তি আর কৌশলে কাল রাতের প্রসঙ্গ এড়িয়ে যাওয়ার ধরন দেখে আমার কান্না পেয়ে গেল। কোনো অনুযোগ নেই, কোনো ফ্লার্টেশন নেই, যেন আমি ওনার কেবলই একজন সাধারণ সহযাত্রী! আমি ওনার চশমার আড়ালের চোখের দিকে চেয়ে একটু ক্ষোভ মিশিয়ে বললাম,

‘আপনি কিন্তু কাল রাতের পর থেকে আমার সাথে ঠিক করে কথাই বলছেন না। আপনি ইচ্ছে করেই আমাকে ইগনোর করছেন, মিস্টার ডক্টর!’

অন্তিক এবার বিছানা ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ওনার সেই দীর্ঘ ও পৌরুষদীপ্ত অবয়বটা আমার সামনে পুরুষালী পারফিউমে আমার মাতাল হাওয়ার জোগাড়, হঠাৎ উনি বললেন,,

‘ আমি কাছে গেলে প্রবলেম! দূরে থাকলে প্রবলেম! আসলে আপনি চান টা কি?’

‘আপনাকে!’

বলদের মতো কথার মুখ ফস্কে বেরিয়ে গেলো রেহ! তৎক্ষণাৎ জিভ কেটে,সংশোধনের প্রয়াসের ওনার দিকে চাইলাম। মূলত উনার মনোভাব বুঝার চেষ্টা করছি, কিন্তু এবারও বরাবরের ন্যায় ব্যর্থ হলাম আমি! কিছু একটা বলতে যাব ঠিক তখনই দরজার ওপাশ থেকে মেহজাবিনের উচ্চৈঃস্বরের ডাক ভেসে এলো,,

‘আপু! দুলাভাই! জলদি এসো, গাড়ি চলে এসেছে কিন্তু!’

আমার কথাটা মাঝ পথেই আটকে গেলো। চটজলদি সামলালাম নিজেকে। অন্তিকও ওনার ফোনের সাথে চাবিটা তুলে নিয়ে আমার দিকে চেয়ে স্বাভাবিক গলায় বললেন,

‘চলুন, সবাই অপেক্ষা করছে।’

আমিও চুপিসারে হাতের ভ্যানিটি ব্যাগটা শক্ত করে চেপে ধরে ওনার পিছু পিছু ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।

★

পারিবারিক অবস্থা যথেষ্ট সম্ভ্রান্ত হলেও,আমাদের নিজস্ব গাড়ি নেই। অবশ্য প্রয়োজন পড়ে না তার। আব্বু-চাচ্চু সাধারণত অফিসে বাইকেই যাতায়াত করে। আর আম্মু কাকিমণি যখন বাইরে যায় তখন পার্শ্ববর্তী গাড়ি ভাড়ায় নেওয়া হয়। কিন্তু আজকে যেহেতু জামাই সঙ্গে যাচ্ছেন তাই আয়োজনে একটু তো ভিন্নতা আনতেই হবে। পার্শ্ববর্তী একজনের মাইক্রো ভাড়া করেছি আমরা। আমরা আর চাচ্চুদের পরিবার মিলিয়ে সদস্য সংখ্যা জন দশেক হলেও গাড়ির সিট সংখ্যা ১৬।

আব্বু আর চাচ্চু ও ড্রাইভিং সিটের পাশে। আম্মু কাকিমনি আর ফুপিরা মাঝের সারিতে আর আমি আমার কাজিনদের সঙ্গে শেষ সারিতে। দুঃখিত আমি না আমরা মানে আমার সাথে মিস্টার ডক্টরও আছেন তো! গোমড়ামুখো একটা! আমি যেখানে তানহা আর মেহজাবিনের সাথে গল্পে মশগুল উনি সেখানে একদম যান্ত্রিক মানবের ন্যায় মোবাইল ফোনে বুঁদ হয়ে আছেন।

বিরক্তিরা সীমা ছাড়াচ্ছে ক্ষণে ক্ষণে। ঝগড়ুটে ভাষাগুলো গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসছে। ইচ্ছা করছে আর পাঁচটা ঝগড়ুটে দম্পতির মতো এখানেই উনার সাথে ঝগড়া শুরু করে দেই। মানে সদ্য বিয়ে হইছে বাপ! একটু তো বউয়ের দিকে তাকা! কিন্তু না, উনি তো পণ করে এসেছেন, ফোন থেকে দৃষ্টি সরাবেনই না। যেন আমার দিকে তাকালেই চোখ খুলে নিচে পড়বে ওনার! অসভ্য,আনরোম্যান্টিক,খাইস্টা বেডা! বুঝিনা, এনার মতো একটা রসকসহীন লোকের সঙ্গে আমার মধ্যে একটা মিষ্টি মেয়ের বিয়ে হলো!

ইয়া আল্লাহ! ও মাবুদ, এই লোকের ভিতর একটু রোম্যান্টিকতা দাও আল্লাহ! আনমনে উনার দিকে চেয়ে এসবই ভাবছি, হাবাজাবা! হুট করে পাশ থেকে মেহজাবিনের ধাক্কায় ধ্যান টুটলো। বিরক্তিতে ঠোঁটমুখ কুঁচকে বললাম,,

‘কি হইছে রে?’

মেহজাবিন কপালে হাত দিয়ে বলল,,’সেই কখন থেকে ডাকছি তোমাকে! আর তুমি হাঁ করে ভাইয়ার দিকে তাকিয়ে আছো। মানেএএএ!

মেহজাবিনের এমন কথায় উনি এক ঝলক আর দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকালেন। পরক্ষণেই ফের দৃষ্টি নিবদ্ধ করলেন মোবাইলের স্ক্রিনে। আমি বাঁকা দৃষ্টিতে দেখলাম সবটাই। পরক্ষণে মেহজাবিনের মাথায় বড়সড়ও একটা গাট্টা মেরে বললাম,

’শালী! মাথায় বুদ্ধিসুদ্ধি নাই তোর?’

মেহজাবিন বয়সে খুব বেশি বড় নয়। পরিপক্কতার বালাই নেই কোনো ওর। ক্লাস ফোরে উঠেছে ‌সবে। নির্ঘাত ওর অপরিপক্ক মস্তিষ্ক বোঝেনি আমার কথাটা! আমি দৃষ্টি ঘুরিয়ে বললাম,,

‘গরু! দেখছিলি না, তোর ভাইয়া ফোনে কি দেখছে আমি এখান থেকে দেখার চেষ্টা করতেছিলাম।’

আমার কথায় মেহজাবিন মুখটা এমন করল যেন ও চূড়ান্ত বিচক্ষণ ব্যক্তি। ওষ্ঠাধর কিঞ্চিৎ বাঁকিয়ে ও বলল,,

‘এটা দেখার জন্য উঁকিঝুঁকি মারা লাগে? ওয়েট আমিই দেখে আসছি!’

দেখে আসবে মানে? উনি তো আমার এক সিট পাশে। এমন ভাবে বলছে, যেন আমি হুমড়ি খেয়ে দেখছিলাম! মেহজাবিন ঘাড় ঘুরিয়ে ওনার ফোনটা পর্যবেক্ষণ করেই আমার পাশে বসে বলল,,

‘ভাইয়া ফোনে কার সাথে কথা বলছে!’

প্রথমে ব্যাপারটা তত গুরুত্ব না দিলেও;পরক্ষণে আমার মস্তিষ্কে খেলে গেল, উনি কি কোনো মেয়ের সাথে কথা বলছেন? কি পরিমাণ বলদ আমি,ভাবা যায়? এমনও হতে পারে উনি হয়তো কোন অফিসিয়াল কাজের কথা বলছেন। কিন্তু না! আমার নাদান মস্তিষ্ক তা মানতে নারাজ! আমি মেহজাবিনকে ঠেলেঠুলে পাশে সরিয়ে ওর জায়গা দখল করে ডক্টর সাহেবের ফোনে উঁকি মারলাম। টেক্সট না দেখে সরাসরি অ্যাকাউন্ট নাম দেখলাম,‘ইকরা জান্নাত!'ব্যাস আমাকে ঠেকায় কে?

ইতিমধ্যে মেজাজ সপ্তমে চড়েছে আমার। এক ঝটকায় ওনার হাত থেকে ফোনটা কেড়ে নিলাম। আকস্মিক এমন কাণ্ডে বিস্ফোরিত নেত্রে চাইলেন উনি আমার দিকে। কিঞ্চিত গম্ভীর স্বরে বললেন,,

‘এটা কি হলো?’

‘আপনি কার সাথে কথা বলছিলেন?'

‘শ্যি ইজ মাই কলিগ তরী!’

‘বাট শ্যি ইজ আ গার্ল অলসো!’

‘মানে?’

আমি ওনার গা ঘেঁষে বসলাম। আশেপাশের সকলের মনোযোগ অন্যদিকে দেখে নিশ্চিন্ত হয়ে উনার দিকে ফিরলাম। কিঞ্চিৎ রাগত স্বরে কণ্ঠস্বর খাদে নামিয়ে বললাম,,

--- মানে বুঝেন না? বউকে পাশে বসিয়ে, অন্য মেয়ের সাথে চ্যাট করছেন? দিস ইজ নট ফেয়ার মিস্টার অন্তিক শাহরিয়ার! সে যতই হোক আপনার কাজের কথা। তা বলে, আমাকে পাশে রেখে কেন বলবেন? আপনার উচিত ফুললি আমার উপর কনসেনট্রেট করা। এত সুন্দর মিষ্টি একটা বউ রেখে ফোনে কথা বলে,অসহ্য!

শেষ কথাটুকু বড্ড আস্তে বলেছি। উনি শুনতে পেয়েছেন কিনা জানিনা। হুট করে ওনার কণ্ঠস্বর কানে এলো,,

--- ব্যাস? কথা শেষ হয়েছে আপনার?

--- মানে?

উনি ফোনটা এক প্রকার লুফে নিলেন আমার হাত থেকে। আমি বেকুবের মত চেয়ে থাকলাম শুধু। পরক্ষণেই মেহজাবিনকে আমার স্থলে দিয়ে জানালার পাশে বসলাম। একবারও দেখাবো না, এই খচ্চর পুরুষের দিকে!

----------------------------

গাড়ির চাকা নানুবাড়ির কাঁচা রাস্তায় এসে থামতে থামতে মধ্যাহ্নের প্রখর রৌদ্রশিখা কিঞ্চিত মৃতপ্রায় হয়ে এসেছে। এই যান্ত্রিক যুগেও এমন নিটোল গ্রামীণ ছবি সচরাচর চোখে পড়ে না। রাস্তার ঠিক পাশেই একটা পুরোনো ইটের দেয়াল, আর তার ওপাশেই মাটির তৈরি বিশাল এক বেষ্টনী আকৃতির বাড়ি। মাটির ঘরের সেই চেনা সোঁদা গন্ধ আর উঠোনের উত্তর কোণে লতিয়ে থাকা বিশাল পুকুর-যাকে অনায়াসে ছোটখাটো একটা দিঘী বলে চালিয়ে দেওয়া যায়।

পুকুরের শান্ত জলে দু-একটা পাতিহাঁস আপনমনে সাঁতার কাটছে। পাশে একটা টিনের দোচালা ঘর, আর তার ঠিক গা ঘেঁষে মাটির তৈরি একখানা রান্নাঘর। ওই যে নানু বাড়ির একটা ভাইব আছে না! শুনলেই যেরকম একটা গ্রামীণ বাড়ি চোখের সামনে ভেসে উঠে নানু বাড়ি হয়ে। আমার নানু বাড়িটা ঠিক সে রকম। কথাটা কেমন অদ্ভুত লাগলো না? ‘নানু বাড়ির ভাইব’কিন্তু ছোট্ট এই কথাটিই এক কথায় আমার নানু বাড়িকে বর্ণনা করে আমার কাছে।

গাড়ি থেকে নামতেই উঠোন পেরিয়ে প্রায় ছুটে এলেন নানু ভাইয়া আর নানুআপু। ওনাদের পেছনে আমার মামা আর মামনি মানে মামি আরকি আমি মামনি বলি। কিন্তু সবাইকে টেক্কা দিয়ে মেঠো পথ ধরে উন্মাদের মতো ছুটে এলো দুই ক্ষুদে মানব আমার মামাতো দুই ভাই— ওয়াহিদ আর নাহিদ। একজনের বয়স পাঁচ, অন্যজনের তিন।

ওদের এই ছুটে আসা দেখে আমি গাড়ির সিট থেকে আনা চিপস, চকলেট আর বিস্কুটের প্যাকেটভর্তি মস্ত বড় ব্যাগটা মেহজাবিনের হাত থেকে ছিনিয়ে নিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে দিলাম। ওয়াহিদ ব্যাগটা আঁকড়ে ধরেই একগাল হেসে বলল,

‘তরী আপু! তুমি এসেছ! আমাদের জন্য এত খাবার এনেছ?’

তিন বছরের পুঁচকে নাহিদ তখনো আমার ফ্রকের কোণা ধরে গোল গোল চোখে নতুন ভাইয়াকে পর্যবেক্ষণ করছে। আমি ওর গালটা টিপে দিয়ে বললাম,

‘হ্যাঁ রে পাজি! তোদের জন্যই তো আনা। নে, এবার আমার নানু আপুর কাছে যা।’

মামা এগিয়ে এসে অন্তিকের সাথে কোলাকুলি করলেন। নানু ভাইয়া এগিয়ে এলেন। না,লাঠি ভর করে নয় একদম! আমার নানু ভাইয়া যথেষ্ট জোয়ানতাজা। এখনো ৪০ বছরের সুঠাম পুরুষের ন্যায় এখনো মেরুদণ্ড সোজা তার। তিনি এগিয়ে এসে দাঁড়িয়ে মিস্টার ডক্টরকে আপাদমস্তক নিরক্ষন করে একগাল হেসে বললেন,

‘তা বাবাজি, আমার নাতনিটা তো বড্ড চঞ্চল আর ঘাড়ত্যাড়া। হসপিটালের রোগী সামলানোর চেয়ে এই মেয়েকে সামলানো কিন্তু ঢের কঠিন! কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো আপনার?’

অন্তিক ওনার স্বভাবসুলভ বিনীত ভঙ্গিতে চশমাটা একটু ঠিক করে নিলেন। তারপর আমার দিকে এক ঝলক তাকিয়ে, ঠোঁটের কোণে চিরাচরিত হাসিটা ঝুলিয়ে রেখে বললেন,

‘জ্বী না, নানু ভাইয়া। হসপিটালের রোগীদের তো প্রেসক্রিপশন দিলে শোনে, আর আপনার নাতনি তো নিজেই একটা আস্ত প্রেসক্রিপশন! তবে ডক্টর হিসেবে এই মিষ্টি উপদ্রবটা আমি বেশ উপভোগই করছি।’

ওনার এই মার্জিত অথচ রসাত্মক জবাবে উঠোনের সবাই— মামা, মামি, এমনকি আমার আম্মু-আব্বুও বেশ শব্দ করে হেসে উঠলেন। শুধু আমি রাগে আর অপমানে মুখটা অন্যদিকে ঘুরিয়ে নিলাম। মনে মনে ভাবলাম, ‘অসভ্য লোক একটা! গাড়িতে অন্য মেয়ের সাথে চ্যাট করে আমার মুড অফ করে দিল, আর এখন এখানে এসে কেমন সাধু সাজছে! দাঁড়াও, এর মজা আমি পরে দেখাচ্ছি!’

মামনি ব্যস্ত হয়ে বললেন,

‘আহা, তোমরা রোদের মধ্যে উঠোনে দাঁড়িয়ে কেন? ভেতরে চলো। মাটির ঘরে এমনিতেই বেশ ঠান্ডা, জামাইয়ের আরাম হবে।’

নানু আপু আমার হাত ধরে টানতে টানতে মাটির বারান্দার দিকে নিয়ে গেলেন। ঘরের ভেতরটা সত্যিই অদ্ভুত শীতল। শহরের এয়ার কন্ডিশনারও এই মাটির ঘরের চিরন্তন শান্তির কাছে হার মানবে।

বিশাল কাঠের চৌকিতে মাদুর পেতে আমাদের বসার ব্যবস্থা করা হলো। মামি ততক্ষণে কাঁসার থালায় করে ডাব আর বাটি ভর্তি করে পুকুরের তাজা মাছের চপ নিয়ে হাজির হলেন। অন্তিক বেশ আয়েশ করে মামার পাশে বসে গল্প জুড়লেন, যেন কত বছরের চেনা এই পরিবেশ আর আমি ঘরের এক কোণে বসে খুঁতখুঁতে চোখে ওনার প্রতিটি মুভমেন্ট লক্ষ্য করতে লাগলাম। রাগটা এখনো কমেনি, বরং ওনার এমন ডোন্ট কেয়ারিং ভাবে তা আরও একটু তীব্র রূপ নিল।

------------

--- ও নানুউউউ..!

এই যে আমার বড্ড বদ অভ্যাসের একটা! নানু বাড়ি আসলেই নানুর আঁচল ধরে ঘুরঘুর করবো,গলা জড়িয়ে ধরবো,আদুরেপনা করব। তবে এতে একদম বিরক্ত না হয়ে আমার নানু ভীষণ উপভোগ করে এটা। আমি উচ্চতায় বেশ অনেকটাই ছোট খাটো। ৫ ফিট দুই তিন ইঞ্চি হবো। তবে নানুর উচ্চতারই। নাতো নানু থেকে লম্বা না তো খাটো। নানু রান্নাঘরের মাটির চুলায় পায়েস রান্না করেছিলেন, আমি পেছন থেকে গিয়ে জড়িয়ে ধরেছি। বরাবরের ন্যায় দুষ্টুমি করে মাথা থেকে শাড়ির আঁচলটা সরিয়ে সাদা চুল গুলো গননে ব্যর্থ প্রচেষ্টা চালাচ্ছি।

হাঁড়িতে পায়েস দেখে মেজাজ গরম হলো আমার। এমনিতেই মিষ্টি খাই না আমি,বড্ড অপছন্দের। আর নানু কিনা তাই রান্না করছে! মুখ ফুলিয়ে বললাম,,

--- নানু? তুমি এই ছাতা রান্না করছো আবার!

নানু পিছন থেকে আমার হাতটা টেনে কোল ঘেঁষে বসালেন। স্বভাবসুলভ মৃদু হেসে বললেন,,

--- এটা তো তোর জন্য না।

--- তোমার বাড়িতে বেড়াতে আসছি আমি,তোমার একমাত্র নাতনি। তুমি আমাকে ছাড়া কার জন্য রান্না করছো? তোমার ওয়াহিদ-নাহিদের জন্য? দেখো সারা বছর ছেলের কাছে থাকো। ছেলের ছেলেদের খাওয়াও এখন আমার জন্য রান্না করো!

--- সারা বছর কই থাকি? তোর মামা মামি দুজনেই তো খুলনাতে চলে যায়। বাড়িতে পড়ে থাকি শুধু আমি আর তোর নানা।

এটা সত্যি চাকরি সূত্রে মামা মামনি দুজনেই খুলনাতেই থাকেন। মামাতো ভাইদেরও পার্শ্ববর্তী একটা শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করিয়েছে। সাধারণত বছরের বিশেষ দিনে কিংবা ছুটি পেলে তবেই নানুদের এখানে আসেন তারা। তবুও অভিমানী আমি বললাম,,

--- তাতে কি হয়েছে? আমি তো তাও আসতে পারি না! তুমি আমার জন্য কিছু না করে, ওদের জন্য করছো?

--- এই জন্য বলি,আমার পাগলিটার কোনোদিন বুদ্ধিসাধ্যি হবে না। ওদের জন্য রান্না করতে যাব কেন? আমার নাতি জামাই এসেছে না? তার জন্য রান্না করছিলাম।

--- ওহ। সে যাইহোক, তুমি আমার সর রেখেছো তো?

দুধের ওপরের পুরু প্রলেপকে গ্রাম্য ভাষায় সর বলা হয়। জিনিসটা আমার ভীষণ ভীষণ পছন্দের! আর আমার নানুদের গোয়াল ভর্তি গরু হওয়ায়, আমি যখনই আসি তার অন্তত দুদিন আগে থেকে আমার নানুর দুধ জ্বাল দিতে শুরু করে। এক্কেবারে গাঢ় লাল সর মজুদ রাখে আমার জন্য। এবারও তার ব্যতিক্রম ঘটেনি নিশ্চয়ই! আমার নানু পার্শ্ববর্তী মাটির হাঁড়ির ওপর থেকে ঢাকনি সরিয়ে সর বের করে দিলেন। আমি সহাস্যে তা গ্রহণ করে নানুর গলা জড়িয়ে, মুখে চুমু দিয়ে বললাম,,

---- তুমি ওয়ার্ল্ডের বেস্ট নানু!

নানু মৃদু হেসে বললেন,,--- তাড়াতাড়ি ও পাশে বসে খেয়ে নাও। না হলে ওরা চলে আসলে তুমি আর খেতে পারবে না।

ওরা বলতে নানু বাচ্চাদের বুঝিয়েছেন। এ বলে যে ওদের কিছু দিবে না,তেমনটা নয়। আসলে আমি অতি আহ্লাদী তো তাই আমার জন্য সবকিছু একটু আলাদাভাবে বিশেষ করে বরাদ্দ থাকে। আমি মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে চুলার পার্শ্ববর্তী টুলে বসে নানুর সঙ্গে গল্প করতে করতে খেতে লাগলাম।

--------------

দুপুর গড়িয়ে এখন প্রায় বিকেল। দুপুরের ভাত ঘুমে মগ্ন সারা বাড়ি‌। আমিও বিশাল এক ঘুম দিয়েছি। এখন প্রস্তুতি নিচ্ছি নানুদের পার্শ্ববর্তী বিলে যাওয়ার। আমার বাল্য সখিরা এসেছে। বিয়ে হয়নি ওদের কারোর। এজন্য আমার বরকে দেখার বহুৎ সখ ওদের; এদিকে আমার মিস্টার তো লাপাত্তা। মামাদের সঙ্গে কোথায় গিয়েছেন শুনলাম। ব্যাপার না আমি ওদের ভুজুম-ভাজুম বুঝিয়ে বিলের দিকে এগোলাম।

বিলে এসে পৌঁছাতেই আমার চোখ ছানাবড়া। বিলের ধারে প্রকাণ্ড এক বটগাছের নিচে আগে থেকেই উপস্থিত আমার মামা, চাচ্চু আর স্বয়ং মিস্টার ডক্টর! আব্বুর আবার এসব কাদা-জলের বিল-বাঁওড়ে বিন্দুমাত্র ইন্টারেস্ট নেই, উনি নিশ্চয়ই নানু ভাইয়ের খাটে আরামের ভাতঘুমে মগ্ন।

আমাকে দলবলসহ আসতে দেখে মামা চড়া সুরে ডেকে উঠলেন,

‘এই যে তরী মা, এদিকে এসো!’

আমি গুটিগুটি পায়ে ওনাদের কাছে গিয়ে দাঁড়ালাম। অনন্যা আর জবাকে দেখে চাচ্চু হেসে বললেন,

‘তোমরা তাহলে দলবল নিয়ে হাজির?’

মামা অন্তিকের কাঁধে হাত রেখে আমার দিকে চেয়ে বললেন,

‘আমরা তাহলে একটু বাজারের দিকে যাই রে তরী। তুই জামাইকে নিয়ে একটু বিলের চারপাশটা ঘুরে দেখা। তোর এই বান্ধবীদের দল তো পুরো এলাকা মাথায় করে রাখে, ওরাই পথ দেখিয়ে নিয়ে যাবে।’

বলেই মামা আর চাচ্চু আমাদের রেখে বাড়ির দিকে পা বাড়ালেন। অন্তিক সেখানে একা দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার পরনের কালো শার্টের হাতা দুটো কনুই পর্যন্ত গোটানো, চোখে চশমা। এই গ্রামীণ বিকেলের পটভূমিতে ওনাকে বড্ড বেশি বেমানান অথচ অদ্ভুত রকমের ‘ড্যাশিং’ লাগছিল।

অনন্যা আর জবা ততক্ষণে বিলের হাঁটুজলে নেমে পড়েছে শাপলা তোলার জন্য। ওরা দূর থেকেই চিল্লিয়ে বলল,

‘কীরে তরী, দুলাভাইকে শুধু দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখবি, নাকি আমাদের সাথে এসে শাপলা তুলবি?’

ওদের কথায় মিস্টার ডক্টর সাহেব আমার দিকে এক ঝলক তাকালেন।বান্ধবীদের সামনে নিজের ঘাড়ত্যাড়ামো বজায় রাখতে আমি ওনার দিকে চেয়ে মুখটা বাঁকা করে বললাম,

‘আমিও আসছি রে!’

কোনো দিকে খেয়াল না করেই, পায়জামা একহাতে সামান্য ওপরে তুলে আমি বিলের কাদার ঢালু পথটা দিয়ে নামতে গেলাম। কিন্তু বিধি বাম! বিলের পাড়ের মাটি যে জোয়ারের জলে থকথকে কাদা হয়ে আছে, তা আমার এই নাদান মগজে খেলেনি। পা রাখতেই সড়াৎ করে পিছলে গেল আমার সাধের বলদা জুতা!

‘মা গোওও!’ বলে এক বিকট চিৎকার দিয়ে আমি যখন নিশ্চিত পগারপার হতে চলেছি, ঠিক তখনই হুট করে একটা শক্ত, উষ্ণ হাত এসে খামচে ধরল আমার কবজি!মুহূর্তের জন্য আমার মনে হলো— বাহ্! টিপিক্যাল উপন্যাসের পাতা ছিঁড়ে নায়ক বুঝি তার নায়িকাকে পতন থেকে বাঁচিয়ে নিল! কী সুন্দর ফিল্মি স্টাইলের রোমান্স!

কিন্তু হাহাকার! বাস্তব জীবন তো আর হুমায়ূন আহমেদের উপন্যাসের পাতা নয় যে নায়ক অলৌকিক শক্তিতে নায়িকাকে শূন্যে ধরে রাখবে! আমার ৫ ফিট তিন ইঞ্চির ছোটখাটো শরীরের আকস্মিক টানে, আর কাদার তীব্র পিচ্ছিলতায় মিস্টার ডক্টর নিজেই আর নিজের ব্যালেন্স আর ধরে রাখতে পারলেন না। ওনার শক্তপোক্ত গ্রিপটা আমার হাতে থাকা অবস্থাতেই, উনিও আমার সাথে হুমড়ি খেয়ে সটান এসে পড়লেন বিলের হাঁটু পানির কাদার ভেতর!

‘ঝপাং!’ শব্দে বিশাল এক ঢেউ তুলে আমরা দুজনে একসাথে বিলের শাপলা বনের মাঝে আছাড় খেলাম।চারপাশে অনন্যা আর জবাদের সম্মিলিত চিৎকারের শব্দ ছাপিয়ে বিলের পানি আর কাদা ছিটকে উঠল আমাদের ওপর। তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোর কাটার মতো চোখ মেলে তাকাতেই দেখলাম— অবস্থা জন্ডিস!

আমি বিলের পানির মধ্যে উপুড় হয়ে আছি, আর অন্তিক আমার ঠিক ওপরে, ওনার দুই কনুই পানির নিচের কাদায় ডেবে গেছে। ওনার সেই নামী ব্র্যান্ডের ব্ল্যাক শার্ট এখন বিলের শ্যাওলা আর কাদায় মাখামাখি। সবচেয়ে বড় ট্র্যাজেডি হলো, ওনার চোখের সেই অতি প্রিয় চশমা জোড়া নাকের ডগা থেকে খসে বিলের পানিতে টুপ করে তলিয়ে গেছে! ওনার অবাধ্য বাবরি চুলগুলো একদম ভিজে ওনার কপালে লেপ্টে আছে, আর ওখান থেকে টপটপ করে বিলের পানি এসে পড়ছে আমার গালে।

বিলে ফোটা লাল শাপলাগুলোর মাঝে আমাদের এই আকস্মিক জলডুবিতে সেই একটা অনুভুতি হচ্ছে। সিনেমা টাইপ!দূর থেকে বান্ধবীদের খিলখিল হাসির শব্দ ভেসে আসছে। অন্তিক চশমা ছাড়া ওনার তীব্র সম্মোহনী, ধোঁয়াটে চোখ দুটো দিয়ে আমার দিকে তাকালেন। ওনার চোখ দুটো এই মুহূর্তে বড্ড অদ্ভুত দেখাচ্ছে, রাগ নাকি মুগ্ধতা বোঝা বড় দায়।

চলবে.....

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৫ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন