#মেঘবরণ_প্রেম
পর্ব - ১৯
লেখা - আসফিয়া রহমান
অনুমতি ছাড়া কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ ❌
অনিন্দিতা চমকে উঠল।
— ন-না… আসতে হবে না… আমি… আমি ঠিক আছি…
শুভ্র সঙ্গে সঙ্গে কেটে দিল ওর কথা।
— ঠিক নেই, অনিন্দিতা। মিথ্যে বলার চেষ্টা করো না আমার সাথে। যেখানে আছো ঠিক ওখানেই থাকবে, এক পাও নড়বে না, খবরদার।
ঠাস করে কেটে গেল লাইনটা। কান থেকে ফোনটা ধীরে ধীরে নামিয়ে নিল অনিন্দিতা। ওর মুখ শুকিয়ে গেছে, গলা শুকনো, ঠোঁটজোড়া কাঁপছে ওর।
প্রীতি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলল,
"উহ্… ভাইয়া মনে হচ্ছে আরো রেগেছে।"
ইরা অনিন্দিতার কাঁধে হাত রাখল,
"আরে ধুর! কিচ্ছু বলবে না, ভাইয়াকে চিনি আমি।"
অনিন্দিতা ঠোঁট টিপল, কিছু বলল না।
দশ মিনিটের মাথায় হন্তদন্ত হয়ে ছুটে আসতে দেখা গেল শুভ্রকে। সিঁড়ির গোড়ায় এসে ওদেরকে দেখতে পেয়েই থমকে দাঁড়ালো ছেলেটা। পরপর দুটো সিঁড়ি ভেঙে ছুটে এলো। এসেই হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল অনিন্দিতার পাশে। গালে হাত রেখে অস্থির কন্ঠে শুধালো, "কোথায় লেগেছে দেখি? বেশি ব্যথা পেয়েছো?"
ইরা, প্রীতির সামনে শুভ্রকে এমন অস্থির হতে দেখে অনিন্দিতা লজ্জা পেল। লাল টকটকে গাল নিয়ে ইশারা করলো পায়ের দিকে।
শুভ্র নিচু হয়ে অনিন্দিতার হাঁটুর দিকে তাকাতেই চোয়াল শক্ত হয়ে গেল ওর। সাদা পাজামায় রক্তের দাগ শুকিয়ে খয়েরি হয়ে গেছে। দাগটা দেখামাত্রই শুভ্র নিঃশ্বাস আটকাল। এক মুহূর্তও দেরি না করে হাত বাড়িয়ে তৎক্ষণাৎ পাজামার কাপড়টা ওপরে তুলল।
অনিন্দিতা শিউরে উঠল সঙ্গে সঙ্গে।
"শু-শুভ্র…!" ওর গলা কেঁপে গেল লজ্জায়। ইরা আর প্রীতি আছে এখানে। এভাবে—!
শুভ্র কিছুই শুনল না। ওর চোখের সামনে তখন অনিন্দিতার চামড়া ছড়ে লালচে হয়ে যাওয়া হাঁটু, রক্ত শুকিয়ে কালচে হয়ে ফুলে আছে জায়গাটা।
অনিন্দিতার মুখ লাল থেকে গাঢ় লাল হয়ে উঠেছে। ঠোঁট কাঁপছে, চোখজোড়া নামিয়ে ফেলেছে ও।
ইরা গলা নামিয়ে বলল, "ভাইয়া… ড্রেসিং করানো দরকার…
শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে রইল ক্ষতের দিকে, মুখের পেশী টান টান হয়ে উঠেছে ওর। ভেতরের অস্থিরতা, রাগ, দুশ্চিন্তা— সব যেন উঠে এসেছে গলা বেয়ে। অনিন্দিতার আনত মুখের দিকে তাকিয়ে শুভ্র ঠান্ডা গলায় বলল, "তুমি ঠিক আছো বলছিলে, না? এটা ঠিক থাকা?"
অনিন্দিতা মেঝে দেখে গেল চুপচাপ, জবাব দিল না।
শুভ্র ফোঁস করে একটা নিঃশ্বাস ফেলে ইরা-প্রীতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, "পানি আছে?"
"আছে ভাইয়া।" দ্রুত উত্তর দিল প্রীতি।
শুভ্র ওর হাত থেকে বোতলটা নিয়ে পকেট থেকে রুমাল বের করল। রুমালটা দু’ভাঁজ করে ভিজিয়ে নিয়ে অনিন্দিতার হাঁটুর ওপরে রাখল খুব সাবধানে।
অনিন্দিতা ঠোঁট কামড়ে ধরল, চোখ বন্ধ করে ফিসফিসিয়ে বলল, "শুভ্র… ইরা আর প্রীতি আছে এখানে…"
"থাকুক।"
পরিষ্কার করা শুরু করতেই অনিন্দিতা ব্যথায় চমকে উঠে দু’হাতে শুভ্রর কব্জিটা চেপে ধরল।
"আ-আস্তে… প্লিজ…!"
শুভ্র থামল না, হাতের চাপটা শুধু কমালো একটু। শুকনো রক্তের দাগ খালি পানিতে পরিষ্কার হলো না পুরোপুরি। রুমালটা পকেটে ঢুকিয়ে অনিন্দিতার পায়ের গোড়ালি স্পর্শ করতেই কঁকিয়ে উঠলো মেয়েটা।
"আ-আহ্..."
শুভ্রর ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল সঙ্গে সঙ্গে। এক সেকেন্ডের জন্যও অপেক্ষা না করে অনিন্দিতার পায়ের গোড়ালিটা ও আস্তেধীরে হাতে তুলে নিল।
"অনিন্দিতা… এখানে কীসের ব্যথা?"
অনিন্দিতা নিঃশ্বাস টেনে চোখ বন্ধ করে মাথা নাড়ল,
"শ-শুভ্র… ছাড়ুন প্লিজ… ওখানে… বেশি ব্যথা…"
শুভ্র আর কথা না বাড়িয়ে দু আঙুল দিয়ে গোড়ালির ঠিক ওপরটায় চেপে ধরল। তৎক্ষণাৎ কুঁকড়ে গেল অনিন্দিতা। কেঁপে উঠল ঝটকা খাওয়ার মতো।
"আ-আহ্! শুভ্র... না...!"
শুভ্রর মুখের রঙ বদলে গেল সহসাই। চাপা গলায় ধমকে উঠলো ও, "গোড়ালি মচকে গেছে, এটা বলো নি কেন এতোক্ষণ? স্টুপিড কোথাকার!"
ইরা আর প্রীতি একই সঙ্গে চমকে তাকালো শুভ্রর দিকে। প্রীতি হতভম্ব গলায় বলল, "মচকেছে? আমরা তো… আমরা তো এতক্ষণ বুঝতেই পারিনি!"
"বললে তো বুঝবে! উনি যেভাবে মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছেন তাতে বোঝার সাধ্যি কার?"
তারপর অনিন্দিতার দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় প্রশ্ন করল, "এভাবে কীভাবে পড়ে গেলে তুমি? ইরা, তোরা কোথায় ছিলি?"
ইরা এতক্ষণ হাঁ করে তাকিয়ে ছিল ওদের দুজনার দিকে। চোখের সামনে ঘটা দৃশ্যগুলো যেন বিশ্বাস করতে পারছে না ও। শুভ্রর মুখে নিজের নাম শুনতেই ওর চমক ভাঙলো। ও আমতা আমতা করে বলল, "আমরা তো এখানেই ছিলাম... কিন্তু অনু.. অনু দৌড়াতে গিয়ে..."
ইরা কথাটা শেষ করার আগেই শুভ্র তীক্ষ্ণ কন্ঠে বলে উঠল, "দৌড়াতে গিয়ে? এত তাড়া কিসের তোমার? দৌড়ে দৌড়ে কি এমন রাজকার্য করতে যাচ্ছিলে, শুনি?"
অনিন্দিতা মাথা তুলল না। কী করে বলবে ও কেন দৌড়াচ্ছিল! শুভ্র ততক্ষণে উঠে দাঁড়িয়েছে। উঠে দাঁড়িয়েই ও নিচু হয়ে ঝুঁকে এলো আবার। এক হাত পিঠের নিচে রেখে আরেক হাতে পা-জোড়া সামলে নিয়ে আলগোছে পাঁজাকোলে তুলে নিল অনিন্দিতাকে। আঁতকে উঠল মেয়েটা। চোখ বড় বড় করে তাকালো ইরা-প্রীতিও।
অনিন্দিতা শ্বাস রুদ্ধ করে ফেলল এক মুহূর্তের জন্য, কিছু বুঝে ওঠার আগেই শুভ্রর বুকের সঙ্গে গা ঠেসে এলো ওর। দু'হাত বুকের কাছে তুলে ধরতেই অনিন্দিতার আঙুলগুলো অনিচ্ছায় মুঠো করে ধরল শুভ্রর নীল শার্ট।
"শ-শুভ্র— ন-নামান! ক-কী করছেন এসব, পাগল হ-হয়েছেন নাকি! দেখছে ওরা…" মেয়েটার কণ্ঠ কাঁপলো লজ্জায়, ব্যথায়, অস্থিরতায়।
তবে শুভ্র কানে তুললো না সেসব। স্থির চোখদুটো নিয়ে চোয়াল শক্ত করে তাকিয়ে রইল অনিন্দিতার মুখের দিকে। তাকিয়ে থেকেই সামনের দিকে পা বাড়াতে বাড়াতে পেছনে হাঁ করে দাঁড়িয়ে থাকা অনিন্দিতার দুই বান্ধবীর উদ্দেশ্যে বলল, "অনিন্দিতার ব্যাগটা নিয়ে এসো, প্রীতি!"
------
প্যাসেঞ্জার ডোর খুলে অনিন্দিতাকে সাবধানে সিটে বসিয়ে দিয়ে শুভ্র ঘুরে তাকালো।
"আমরা হসপিটালে যাচ্ছি। তোমরা সাথে যাবে, নাকি বাসায় চলে যাবে?"
প্রীতির হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে শুভ্রর হাতে ধরিয়ে দিল ইরা, “আমরা… আমরা বরং বাসায় চলে যাই। অযথা ভিড় বাড়িয়ে লাভ নেই। তুমি নিয়ে যাও ওকে...”
প্রীতি মাথা নাড়ল নীরব সম্মতিতে। এখানে থাকলে অনিন্দিতা শুধু শুধু লজ্জায় পড়বে বারবার। তার চেয়ে বরং চলে যাওয়াই ভালো।
শুভ্র কোনো কথা বলল না আর। ছোট্ট করে মাথা নেড়ে গাড়ির দরজাটা আলতো করে বন্ধ করতে করতে নিচু হয়ে অনিন্দিতাকে জিজ্ঞেস করল, "ঠিকঠাক বসতে পারছো?"
লজ্জায় লাল হয়ে মৃদু মাথা নাড়ল মেয়েটা। শুভ্র দরজা বন্ধ করে সোজা হয়ে দাঁড়াতেই ভেতর থেকে অনিন্দিতার চাপা গলা শোনা গেল, “হ-হসপিটালে কেন যাবো, শুভ্র? এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে এটা…”
মেয়েটার কণ্ঠে তীব্র অস্বস্তি— ইরাদের সামনে যেভাবে কোলে তুলে এনেছে লোকটা, তাতেই মাথা ঘুরছে ওর; এখন আবার হসপিটাল?
শুভ্র ঝুঁকে জানালার সমান হয়ে দাঁড়াল, দুই হাত জানালার ফ্রেমে রেখে আশ্চর্য শান্ত গলায় বলল, “এমনিতেই ঠিক হয়ে যাবে?”
অনিন্দিতা ঘন ঘন মাথা নাড়ল। শুভ্র কিছু বলল না। ইরাদেরকে বিদায় দিয়ে ঘুরে এসে বসলো ড্রাইভিং সিটে। ওকে বসতে দেখে অনিন্দিতা আবারও বলল, “শুভ্র, সত্যি… যাওয়ার দরকার নেই। প্লিজ! বাসায় গেলেই—”
শুভ্র আচমকাই ঝুঁকে এলো মেয়েটার ওপরে। হকচকিয়ে উঠে পেছনে সরতে চাইল অনিন্দিতা।
"শ-শুভ্র..."
শুভ্র কিছু না বলে আরো একটু ঝুঁকল ওর কানের কাছে। শান্ত গলায় বলল, “কী যেন বলছিলে? এখন বলো—"
শুভ্রর গরম নিঃশ্বাস আছড়ে পড়ল মেয়েটার উন্মুক্ত ঘাড়ে। অনিন্দিতা ঢোক গিলল। চোখের পাতা কেঁপে উঠল লজ্জায় আর ভয়ে। ও কাঁপা গলায় বলল,
"ব-বলছিলাম যে.. হ-হসপিট—
অনিন্দিতার কথা থেমে গেল মাঝপথেই। মেয়েলি বাঁকানো কোমরে বলিষ্ঠ হাতের শক্ত স্পর্শ অনুভব হতেই মাথা পুরোপুরি শূন্য হয়ে গেল ওর। দৃশ্যমান রূপে কেঁপে উঠে তৎক্ষণাৎ চোখজোড়া বন্ধ করে ফেলল মেয়েটা।
শুভ্র মেয়েটার কম্পিত অধরজোড়ার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে কানের কাছে গরম নিঃশ্বাস ফেলে ফিসফিসিয়ে বললো, "আর একটা শব্দ করলে কিন্তু আমি তোমাকে অন্যভাবে থামাতে বাধ্য হবো, অনিন্দিতা। তাই নিজের ভালো চাইলে মুখ বন্ধ রাখবে। নাহলে..."
অনিন্দিতা চোখ বন্ধ রেখেই তড়িঘড়ি করে মুখটা ঘুরিয়ে ফেলল একপাশে। শুভ্র হাত বাড়িয়ে ওর ঘাড়ের পাশ থেকে সিটবেল্টটা টেনে নিয়ে সরে এলো। সিটবেল্ট টানার ছুঁতোয় অবাধ্য আঙুলগুলোর গা–ছোঁয়া স্পর্শ স্পষ্ট অনুভব করল অনিন্দিতা। সেই স্পর্শে আরেকবার কেঁপে উঠলো মেয়েটা।
শুভ্র সিটবেল্টটা লাগিয়ে দিয়ে সরে বসল ভদ্র ছেলের ন্যায়। তারপর চুপচাপ গাড়ি স্টার্ট দিল হসপিটালের উদ্দেশ্যে।
৩৪.
গাড়ি থামল হসপিটালের সামনে এসে। শুভ্র দরজা খুলে নেমে গেল, পরপর ঘুরে এসে প্যাসেঞ্জার ডোর খুলে মেয়েটাকে কোলে তুলতে চাইলেই আঁতকে উঠল ও।
"হসপিটালের ভেতরে অনেক মানুষ শুভ্র! আমি একাই পারবো..."
ছেলেটা চোখ রাঙালো তৎক্ষণাৎ। অনিন্দিতা কথা বাড়ালো না। অস্বস্তিতে গাঁট হয়ে ঠোঁট কামড়ে ঘেঁষে রইলো প্রসস্থ, উষ্ণ বক্ষে।
হাসপাতালের করিডোরে ঢুকতেই অনিন্দিতা গুটিয়ে গেল। একজন নার্স এগিয়ে এলো ওদের দেখতেই। শুভ্র তাকে সবকিছু বুঝিয়ে বলতেই ড্রেসিং রুমে যাবার নির্দেশ দিলেন তিনি।
“বেশ লেগেছে দেখছি। ক্লিন করতে হবে জায়গাটা। একটু ব্যথা লাগবে কিন্তু, মিস।”
অনিন্দিতা ঠোঁট কামড়ে ধরলো। শুভ্র ওর কাঁধের ওপর হাত রেখে আলতো করে চাপ দিয়ে বোঝালো শান্ত থাকতে।
নার্স ক্ষতস্থানে অ্যান্টিসেপ্টিক লাগানো মাত্র অনিন্দিতা কুঁকড়ে উঠলো, “আঃ…”
মুহূর্তের মধ্যে শুভ্র ঝুঁকে পড়ল ওর হাঁটুর কাছে। নার্সের অ্যান্টিসেপ্টিক লাগানোর পাশাপাশি ফুঁ দিয়ে ঠান্ডা করতে চাইল জ্বলুনিটা।
জায়গাটা পরিস্কার করে ব্যান্ডেজ করে দিলেন ভদ্রমহিলা। তারপর মচকে যাওয়া গোড়ালিতে হাত দিতেই অনিন্দিতা কেঁপে উঠল তীব্রভাবে। পায়ের পাতাটা স্বতঃস্ফূর্তভাবে দূরে সরে এলো ব্যথায়।
“ওহহো! এখানটা তো বেশ ফুলে গেছে.." নার্স ভুরু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলেন, "এভাবে মচকালো কী করে?”
শুভ্র গম্ভীর চোখে তাকালো অনিন্দিতার দিকে। মেয়েটা শুভ্রর দিকে এক পলকে তাকিয়ে আমতা আমতা করে বলল, "সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে..."
শুভ্র দাঁতে দাঁত চেপে চিবিয়ে চিবিয়ে বলল, "বলো, সিঁড়ি দিয়ে দৌড়ে দৌড়ে নামতে গিয়ে।"
নার্স কৌতূহলী চোখে দু’জনের দিকে তাকালেন। অনিন্দিতা চোখ নামিয়ে ফেলল তৎক্ষণাৎ, গালদুটো রাঙা হয়ে উঠল লজ্জায় আর ধরা পড়ে যাওয়ার অস্বস্তিতে।
নার্স ব্যান্ডেজ প্রিপেয়ার করতে করতে মুচকি হাসলেন, “ব্যান্ডেজ করতে হবে। একটু ব্যথা লাগবে আবার, ওকে?”
অনিন্দিতা ঠোঁট কামড়ে ক্ষীণ গলায় বলল, “হু…”
শুভ্র হাত ভাঁজ করে দাঁড়িয়ে গম্ভীর মুখে তাকিয়ে আছে অনিন্দিতা দিকে। নার্স ব্যান্ডেজ নিয়ে পায়ের গোড়ালি স্পর্শ করা মাত্রই পা-টা সরিয়ে নিতে চাইলো মেয়েটা।
"এভাবে নড়াচড়া করলে কিন্তু ব্যথা বেশি লাগবে...”
নার্স সাবধানী বার্তা শোনা মাত্রই শুভ্র ওর পাশে বসল। ঝুঁকে এসে হাত বাড়িয়ে অনিন্দিতার হাঁটুর ব্যান্ডেজেরখানিকটা নিচে মৃদু চাপ দিয়ে ধরে নিচু কণ্ঠে বলল, "নড়বে না, নন্দিতা। আমার দিকে দেখো!"
অনিন্দিতা ভীত চোখে তাকিয়ে আছে নার্সের দিকে। শুভ্রর দিকে ফিরেও তাকালো না মেয়েটা। শুভ্র আঙুল বাড়িয়ে ওর থুতনিটা ধরে আলতো করে ঘুরিয়ে নিল নিজের দিকে।
“আই সেইড, লুক অ্যাট মি!”
অনিন্দিতা বাধ্য হয়ে চোখ তুলতেই নার্স এক হাতে পা-টা ধরে ব্যান্ডেজ পেঁচাতে শুরু করলেন গোড়ালিতে।
“আহ্— শুভ্র…!”
মেয়েটা কেঁপে উঠে শ্বাস আটকে ফেলল ব্যথায়, চোখের কোণায় চিকচিক করে উঠল নোনা তরল। শুভ্র একহাতে ওর পা ধরে রেখেই আরেক হাত বাড়িয়ে পাশ থেকে জড়িয়ে ধরল মেয়েটাকে। ফিসফিস করে বলল, "হয়ে গেছে তো, মেঘফুল... আর একটু...!"
নার্স ব্যান্ডেজের বাঁধনটা শক্ত করে টান দিলেন। অনিন্দিতা কুঁকড়ে উঠলো সাথে সাথেই, "আঃ..."
শুভ্র মেয়েটাকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে হাত বোলালো ওর বাহুতে, চুলের ভাঁজে চুমু খেয়ে আস্তে করে বললো, "শেষ, হয়ে গেছে!"
নার্স ব্যান্ডেজের শেষ অংশটা টেনে লাগাতে লাগাতে বললেন, “হয়ে গেছে। তবে পায়ে ভর দেবার চেষ্টা করবেন না, অ্যাটলিস্ট আজ! আর সিঁড়ি-টিড়ি একদম নিষেধ কয়েকদিনের জন্য। রেস্ট করবেন ঠিকঠাক।" উঠে দাঁড়িয়ে চলে যাবার আগে আবার বললেন, "হুইলচেয়ার দেবো কি?"
শুভ্র উঠে দাঁড়াতে দাঁড়াতে বললো, “নো থ্যাংকস! হুইলচেয়ার লাগবে না। আই ক্যান হ্যান্ডেল হার ইজিলি..."
অনিন্দিতা মুখ খুলে কিছু বলতে যাবে তার আগেই
শুভ্র চোখ রাঙিয়ে তাকালো। বেশি বেশি পাকনামি না করার স্পষ্ট হুমকি ওর চোখে।
অনিন্দিতা মুখ বন্ধ করে ফেলল তৎক্ষণাৎ। শুকনো গলায় ঢোক গিলে চোখ নামাল। নার্স বেরিয়ে যেতেই শুভ্র এগিয়ে এসে ওকে কোলে তুলল। ওর হাতদুটো স্বতঃস্ফূর্তভাবে গিয়ে ঠেকল শুভ্রর নীলরঙা শার্টের কলারে।
ছোট্ট পাখির ছানার মতো মেয়েটাকে সযত্নে বুকে আগলে নিয়ে বাইরে বেরিয়ে এলো শুভ্র। হাসপাতালের সাদা আলোতে দু’জনের ছায়া লম্বা হয়ে পড়ল মেঝেতে। লজ্জায়, ব্যথায়, অস্বস্তিতে মানুষটার বলিষ্ঠ হাতের উষ্ণ গ্রিপে চুপচাপ মিশে রইল লাজুক অনিন্দিতা।
To be continued...