ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৩য় পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৩

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কোনো কোম্পানির অফিসে বহু সংখ্যক স্টাফ থাকাটা খুবই স্বাভাবিক।আর দিনের অধিক সময় এই বহু সংখ্যক স্টাফদের প্রায় একসাথেই থাকা হয়। সাধারণভাবেই তাদের মধ্যে বন্ধুত্বের সম্পর্কটাও বেড়ে ওঠে।শুধু স্টাফ কেন?অফিসের বসের সাথেও ভালো সম্পর্ক গড়ে ওঠে।কিন্তু এই বন্ধুত্বের বা'ন্দোরামি বেশি হয়ে এলেই যেন অফিসের কাজের আগে সেই ছোটখাটো খু'নসু'টিই প্রাধান্য হয়ে যায়।কিন্তু এসব ব্যাপারে তো আর অফিসের বস প্রাধান্য দিবেন না।তাই নিজের দ্বিতীয় রূপটাও বের হয়ে আসে।আর সাহিত্যের ক্ষেত্রে একটু বেশি ক'ড়াক'ড়ি হওয়ায় তার রা'গটাও যেন একটু বেশিই বের হয়ে আসে।

অফিসে মানুষজন ভর্তি।কিন্তু নিস্তব্ধতা যেন কোনায় কোনায় বিরাজ করছে।শুধু এক কোণ থেকে এক গর্জন ভেসে আসছে।আর সে কারণেই সবাই মাথা হেট করে দাঁড়িয়ে আছে।কারণ অফিসের বস মিস্টার অহিয়াম শেখ সাহিত্য রে'গে আছেন।এখন যদি একটা পিন পতনেরও শব্দ হয় তাহলে সবার জীবন বের করে দিবে সে।সাহিত্যের গর্জনে অফিসের ঝুলন্ত লাইটগুলোও হালকা দুলছে।মুখের গর্জনটা মনে হয় পাশের বিল্ডিং অব্দি যাচ্ছে।অফিসের কর্মকর্তাদের ধারণা যে কোনো সময় ভূ'মিক'ম্প শুরু হয়ে অফিস বিল্ডিংটা ধ্ব'সে পড়বে। সপ্তাহের যে কোনো একদিন সবার মনেই এই ধারণা সৃষ্টি হয়।কিন্তু সাহিত্যের সেদিকে কোনো মাথা ব্যা'থা নেই।স্টাফদের এক পা এদিক ওদিক হলেই সে গর্জে ওঠে।যেমন এই মুহূর্তে তার র'ক্ত ট'গব'গ করছে।যার রেখা চোখগুলোতে ফুটে উঠেছে।লাল বর্ণ ধারণ করেছে মাটিয়া-সবুজাভাব রঙ্গা অক্ষিজোড়া।হাতের কাগজগুলো আরেকবার উল্টেপাল্টে দেখে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল সেগুলো।আবার গর্জে উঠল সাহিত্য,

"ননসেন্স!!কয়েকদিন পর আমি চলে যাব আর তোমাদের কাজের এই অবস্থা?কি একটু শুনেছ এটা মেইন ব্রাঞ্চ থেকে সাইড ব্রাঞ্চ হয়ে যাবে আর তাতেই এতো হেলাফেলা?আমি থাকতেই এই অবস্থা,তো ভিকি কেমন করে সামলাবে?"

সাহিত্যের শুদ্ধ বাংলা ভাষা অফিসের বাঙালি কয়েকজন স্টাফ বুঝলেও কানাডিয়ান স্টাফদের কানে সেগুলো ট্রান্সলেট হচ্ছে না।কিন্তু তারা ঠিকই বুঝছে যে তাদেরকেই বকা হচ্ছে।এতদিনে সাহিত্যের ব্যবহারে তারা অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে।সাহিত্যের একটু বেশি রা'গ উঠলেই তাদের শুদ্ধ বাংলায় বকা শুনতে হয়।এতে মনে হয় প্রায় কানাডিয়ান স্টাফ কিছুটা করে বাংলা শিখেও গিয়েছে।

লিফটের দরজাটা পুরোপুরি খোলার সুযোগ না দিয়েই ভেতর থেকে দৌড়ে বের হলো ভিকি। মনে হয় সে অপেক্ষায়ই ছিল দরজাটা খোলার।ভিকিকে দেখে অফিসের প্রত্যেকটা স্টাফ লুকিয়ে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।কারণ এই অফিসে একমাত্র ভিকিই আছে যে সাহিত্যের রা'গ কিছুটা হলেও কমাতে পারে।

ভিকি দৌড়ে এসে মাসুম স্টাফদের পাশে দেখে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো।স্কুলের পিটি টিচারের মতো সাহিত্য তাদের বকেই যাচ্ছে।কাপা কাপা গলায় সাহিত্যকে ডাকল ভিকি,

"অহি।এই অহি"

সাহিত্য ভিকির পাশে ঘুরে হুং'কার দিয়ে উঠলো,

"হোয়াট!!!"

সেটাতে হালকা কেঁপে উঠল ভিকি।অতঃপর মিনমিনিয়ে শুধালো,

"চল কেবিনে গিয়ে কথা বলি।এদের উপর অযথা চিল্লাপাল্লা করে কোনো লাভ নেই"

স্টাফদের রা'গ এখন সাহিত্য ভিকির উপর ঝাড়তে শুরু করল,

"তোর কারনেই এরা এত কেয়ারলেস হয়ে গিয়েছে। লায় দিয়ে দিয়ে মাথায় তুলেছিস এদের তুই"

ভিকি এসবে অভ্যস্ত।তাই সাহিত্যের কথা গায়ে না মাখিয়ে সাহিত্যকে টানতে টানতে কেবিনে নিয়ে গেল। পেছনে ইশারা করে অফিসের সবাইকে নিজ নিজ কাজে আবার ব্যস্ত হয়ে যেতে বলল।

সাহিত্য রুমে ঢুকেও স্টাফদের ঝেড়েই যাচ্ছে।ভিকি দুই হাত জোড় করে ধীর আওয়াজে শুধালো,

"ভাই একটু চুপ যা,প্লিজ।তোর এই রা'গের কারণে মানুষ চাকরি ছেড়ে পালাবে"

আবার গর্জে উঠলো সাহিত্য,

"তাতে আমার কি!কাজ ঠিকমতো না করতে পারলে ওই স্টাফের আমার কোনো দরকার নেই।আর ভুলিস না ভিকি।আমার এই সচেতনতার কারণেই কোম্পানি আজ এত উপরে।তোর মতো ম্যাও ম্যাও হলে পানিতে চলে যেত"

ভিকি ধপাস করে লেদার সোফাটায় বসে পড়লো,

"হ্যাঁ ভাই,জানি।এই কোম্পানির নাম ওঠাতে তোর রা'গের যে কত ভূমিকা সেটা আমার জানা আছে। কিন্তু ভাই এত রা'গ স্বাস্থ্যের জন্য ভালো নয়।একটু তো কন্ট্রোল কর"

সাহিত্য রা'গে ফুসতে নিয়েই গিয়ে টেবিলের ওপারে থাকা তার বড় আকারের চেয়ারে বসল।ড্রয়ার থেকে সি'গারে'টের প্যাকেট বের করে একটা সি'গারে'ট মুখে ধরল।অমনি ভিকি তেতে উঠল,

"তুই আবার সি'গারে'ট খাচ্ছিস?"

মুখ থেকে সি'গারে'টটা বের করে সাহিত্য কটমটিয়ে উঠলো,

"শা'লা দুই মাস থেকে একটা সি'গারেটও হাতে নেই নি। টেনশন মাথায় উঠছে।চুপ যা। কবে যে প্যাকেটটা এনে রেখেছিলাম কে জানে?আদৌ কি জ্যা'ন্ত আছে এগুলো?"

সিগারেটের প্যাকেটটা উল্টিয়ে-পাল্টিয়ে যখন দেখলো সেগুলো ঠিক আছে,তখন প্যাকেটটা টেবিলের ছুড়ে মে'রে লাইটার দিয়ে মুখের সি'গারেটটা জ্বালালো সাহিত্য।ভিকি ওদিকে বড় একটা নিঃশ্বাস ফেলে সোফায় শরীর এলিয়ে দিয়েছে।পরিপাটি করে পরা গলার টাইটাও এখন ফাঁসির মত মনে হচ্ছে তার কাছে। টাইটার নটটা হালকা একটু ঢিলা করতে নিয়েই বলল,

"অহি এত টেনশন নিস না তো"

সাহিত্যও ওদিকে চেয়ারে হেলান দিয়ে ঘন ঘন সি'গারেটের ধোঁয়া উড়িয়ে যাচ্ছে।একাকীত্ব জীবনে যখনই একটু মানসিকভাবে বেশি অস্থির হয়ে ওঠে তখনই একটু আধটু সি'গারেটের ধোঁয়ার মাধ্যমে টেনশন টা হালকা উড়িয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে সে।ভিকির কথায় নিকোটিনের হালকা ধোঁয়া উড়িয়ে শান্ত স্বরে বলল,

"কেন টেনশন করবো না?এত বছর এখানে থেকে এখন হুট করে এমন চলে যাচ্ছি।টেনশন তো হবেই"

"আমি তো আছি,তাই না?আর তোর কোম্পানি কি কচি কোম্পানি নাকি?এখন পর্যন্ত কেউ টু শব্দ করতে পারেনি,আর আগামীতেও পারবে না"

সময় নিয়ে আবার বলল ভিকি,

"দেশের ব্রাঞ্চটা খুলে মাথায় বেশি চা'প নেওয়া দরকার ছিল না মনে হয়"

ভিকির কথায় সাহিত্য শব্দহীন হেসে উঠে ভিকির দিকে ঘুরলো,

"দেশে ফিরে যেন কেউ আমার ওপর আঙ্গুল তুলতে না পারে তার জন্যই এত পরিশ্রম"

ভিকির পাশে চোখ রেখেই আবার নিকোটিনের ধোয়া উড়ালো সাহিত্য।দুপুরের হালকা বাতাসে সেই ধোঁয়া খোলা জানালা দিয়ে উড়িয়ে বাহিরের ব্যস্ত শহরের ধোঁয়ার সাথে মিশে গেল।যে শহরের হয়তো অধিকাংশ মানুষই অহিয়াম শেখ সাহিত্যকে চিনে। চিনবেই বা না কেন?গত পাঁচ বছরের মধ্যে কানাডার নামি-দামি বিজনেসম্যানদের মধ্যে একজন হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সে।মাত্র ২৮ বছর বয়সী এই বিদেশী যুবক কানাডার বিজনেসম্যানদের টক্কর দিয়ে যাচ্ছে।পথটা এত সহজ ছিল না।হয়তোবা নিজের মেধা আর চতুরতার কারণেই সেটা সম্ভব হয়েছে।আর তার সাথে নিজের রা'গ ও বহু বছরের জেদ তো মাথার মুকুট স্বরূপ।

সি'গারেটটা অ্যাশ কেসে দাবিয়ে সাহিত্য আগের কন্ঠের ন্যায় শুধালো,

"তুই একা এখানে সামলাতে পারবি তো?"

মেকি হাসলো ভিকি,

"এত বছর তোর পেছনে এই ভিক্রম চৌধুরীই সামলিয়েছে"

"তারপরেও"

"তুই এত টেনশন নিস না।আর এটা যেহেতু এখন সাইড ব্রাঞ্চ সেহেতু অত চাপ থাকবে না।তুই বরং দেশে ফিরে যেটা মেইন ব্রাঞ্চ বানিয়েছিস সেটাতে বেশি ফোকাস দে।গত দেড় বছরে রবি আর অয়ন যেটা সামলিয়েছে ওটা সাইড ব্রাঞ্চ হিসেবে ঠিক ছিল। কিন্তু তোকে এখন একটু ডাবল পরিশ্রম করতে হবে"

ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি ফুটল সাহিত্যের,

"ডাবল পরিশ্রম তো সেই কবে থেকেই করে আসছি"

কি যেন মনে পড়তেই ভ্রু জোড়া কুচকে বলল ভিকি,

"আঙ্কেলকে কি তুই দেশের ব্রাঞ্চটার খবর এখনো জানাসনি?"

"না"

সাহিত্যের ঠান্ডা উত্তরে ভিকি ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়ালো,

"কি!পাগল নাকি তুই?দেড় বছরেরও উপর হয়ে যাচ্ছে, আর তুই এখনো জানাস নি?"

"তোর কি মনে হয়?আব্বুকে বললে আব্বু খুব খুশি হবে?এমনিতেই তো আব্বু আমার বিজনেস করা পছন্দ করে না।আর তার উপর যদি দেশে ব্রাঞ্চ খোলার কথাটা বলতাম তাহলে কখনোই রাজি হতো না"

"তো এখন কিভাবে বলবি?"

"এখন আমার দেশের ব্রাঞ্চটা যথেষ্ট পাকাপোক্ত হয়েছে।আব্বুকে এখন বললে উনি মুখ ফিরিয়ে নিতে পারবে না।নাহলে দেশে ফেরার পরপরই আমার বিজনেস করা ক্লোজ হয়ে যেত।আর তখন না হয় তুই প্রমোশন পেয়ে সি.ই.ও. এর মজা নিতি"

শেষের কথাটা মুখে হাসি নিয়েই শুধালো সাহিত্য।

আবার সোফায় বসে পড়ল ভিকি।ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে বলল,

"সি.ও.ও. এর ঝামেলাই সহ্য করতে পারিনা আবার সি.ই.ও. ।তুই টেনে না আনলে এতো বড় বিজনেস না করে পানের বিজনেস ধরতাম।মাঝে মাঝে কিছু খেতে তো পাড়তাম"

দুজনেই হেসে উঠল।ভারী শ্বাস ফেলে শুধালো

ভিকি,

"তোর ভাগ্যটা খুব ভালো রে অহি।রবি,অয়ন আর আমার মতো তিনটা বিশ্বস্ত বন্ধু পেয়েছিস"

সাহিত্য মুখের হাসি বাড়িয়ে দিল,

"তোরা কি শুধু আমার বন্ধু?ভাই তোরা আমার।কলেজে তোদেরকে না পেলে যে আমি কি করতাম? দেখতি কানাডায় এখন কোনো টাওয়ারের সাথে লটকে আছি"

দুই বন্ধু আবার একযোগে হেসে উঠল।হাসি থামিয়ে ভিকি বলল,

"এশাদের বাসায় যাবি না?"

"হ্যাঁ,আইরিন খালার সাথে না দেখা করে গেলে তো হবে না। ওখান থেকেই এয়ারপোর্টে যাবো"

"আচ্ছা ঠিক আছে।পরশু ওখান থেকেই তোকে পিক করব"

রুমের দরজায় নক করে এক মেয়ে দরজা হালকা খুলে ভেতরে মাথা ঢুকিয়ে দিল,

"স্যার আসবো?"

সাহিত্য মাথা দিয়ে ইশারা করতেই লিসা ভেতরে ঢুকলো।ভেতরে ঢুকে সোফায় ভিকিকে দেখে একটু ভড়কে গেল সে।লিসার সাথে ভিকির শেষ কথা হয়েছিল সাহিত্যের জন্মদিনের পার্টির পরের দিনে।বেচারিকে ভিকি ফোনের মধ্যেই খুব বকেছিল সাহিত্যকে রেড ও'য়া'ইন গিফট করার জন্য।এখানে লিসার কি দোষ?এত বছর থেকে সাহিত্যের পার্সোনাল এসিস্ট্যান্ট হয়েও সাহিত্যের পছন্দ-অপছন্দ সম্পর্কে তেমন কোনো ধারনা নেই তার।কোনো বছর কিছু দেওয়া হয় না দেখে এই বছর একটু দিয়েছিল।যখন মাথায় কিছুই আসছিল না তখনই কোনো উপায় না পেয়ে বাধ্য হয়েই কানাডিয়ানরা সাধারণত যেটা গিফট করে সেটাই দিয়েছিল সে সাহিত্যকে।সেদিন বিকেলে বকা খাওয়ার পর থেকেই সে ভিকির সামনে আসেনি।তাই আজ ভিকিকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে গেল মেয়েটা।

ভিকিকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সাহিত্যের টেবিলে একটা ফাইল রেখে টেবিলের সামনের একটা চেয়ারে বসে পড়ল।সাহিত্যের পাশে দেখে নির্দ্বিধায় যান্ত্রিকভাবে বলতে লাগল সে,

"আপনার রা'গ যদি কমে থাকে তাহলে মিটিং রুমে চলেন। সবাই আপনার জন্য অপেক্ষা করছে"

ভিকি বড় বড় পা ফেলে লিসার পাশের চেয়ারে এসে বসলো,

"অহি যখন চিল্লাচ্ছিল,কই ছিলি তুই?"

লিসা ভিকিকে আড় চোখে দেখে মাথা অন্যপাশে ঘুরালো।বিড়বিড় করে আওড়াতে লাগল সে,

"ক্যাফেটেরিয়াতে"

ভিকি তার এক কান লিসার দিকে এগিয়ে দিল,

"কিইইইই? তুই ক্যাফেটেরিয়াতে কি করছিলি?"

লিসা মাথা ওই অবস্থায় রেখেই আবার বিড়বিড় করে বলল,

"বার্গার চাবাচ্ছিলাম"

হালকা পাতলা হুং'কা'র দিয়ে উঠলো ভিকি,

"তোকে কি আমি বার্গার চাবানোর জন্য অহির পি.এ. বানিয়েছি?"

লিসা এবার ভিকির দিকে ঘুরে কিছু না বলে ড্যাব ড্যাব করে দেখতে লাগল।লিসা বয়সে সাহিত্য আর ভিকির থেকে অনেক ছোট।মেয়েটার জীবনের প্রথম চাকরি এটা। ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হিসেবে অফিসের কাজ সব ঠিকঠাক মতোই করে।কিন্তু সাহিত্যের রা'গ উঠলে সে চড়ুই পাখির মতোই ফুরুত করে উড়ে যায়।লিসার মতে সে অফিসের কঠিন থেকে কঠিন সব কাজ সামলাতে পারবে।কিন্তু তার বসের রা'গ সামলানো তার পক্ষে সম্ভব না।ভিকি ও সাহিত্য তাকে ছোট বোনের মতো যেমন আদর করে তেমন শাসনও করে।বাবা বাঙালি ও মা কানাডিয়ান হওয়ায় বাংলায় বেশ পারদর্শী।কিন্তু চেহারায় ও মুখের ভাষায় কানাডিয়ান ভাব রয়েছে।

সাহিত্য হাতে তুড়ি বাজিয়ে দুজনের দৃষ্টি আকর্ষণ করল,

"বাদ দে তো ভিকি। কি জন্য বাচ্চাটার উপর জিম্মি করছিস?"

লিসার দিকে ঘুরলো সাহিত্য,

"কিসের মিটিং?"

কোনরকম ভিকির দেখানো সুক্ষ্ম চোখ উপেক্ষা করে সাহিত্যের দিকে ঘুরল লিসা,

"আপনার ফেয়ারওয়েল মিটিং।যে টপিকগুলোতে মিটিং হবে সব এই ফাইলে রেডি করা আছে"

টেবিলের ফাইলটা সাহিত্যের দিকে এগিয়ে দিল লিসা।

"তুমি ফাইলটা নিয়ে মিটিং রুমে যাও,আমি আর ভিকি আসছি"

সাহিত্যের কথাটা বলারই অপেক্ষায় ছিল মনে হয় লিসা।সাহিত্যের কথা শেষ হওয়ার পর মুহুর্তেই ফাইলটা হাতে নিয়ে ভো দৌড় লাগাল।

সেপাশে দেখে মেকি হেসে সাহিত্যের দিকে ঘুরল ভিকি,

"চল এখন।আর প্লিজ ভাই মাথাটা একটু ঠান্ডা রাখিস"

ভিকির কথায় সাহিত্য চেয়ারে হেলান দিয়ে শব্দ করে হেসে উঠলো।সেপাশে চোখ রেখেই ভারী নিঃশ্বাস ফেলে গলার টাইটা ঠিক করল ভিকি।ভিকিও বোঝে না,এই ছেলের মাথায় কখন কি ঘুরে।কখনো মাসুম বাচ্চা,কখনো হিটলারের দাদা।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আজ কানাডার আবহাওয়া ততটা গরম নয়।মিষ্টি রোদের সাথে হালকা শিরশিরানি উষ্ণ হওয়া।কিন্তু ভিকির কপালের ফোটায় ফোটায় ঘাম আর হাসফাস করা দেখে মনে হচ্ছে ৪০ ডিগ্রি তাপমাত্রায় অবস্থান করছে সে।এই ঘাম আর হাসফাস তার শরীরের কোনো পরিশ্রমে হচ্ছে না বরং চোখের পরিশ্রমে হচ্ছে।একটা বড় জিপ গাড়ির পেছনে বেশ কয়েক খানা ব্যাগ আর ল্যাগেজ দেখে ভিকির এই অবস্থা।

পিছনে ঘুরে জোর পায়ে হাটা দিয়েই এক বাসায় ঢুকল ভিকি।বাসায় ঢুকে দেখল যার ব্যাগ-বাটাল নিয়ে সে হাসফাস করছে সে তার হবু শাশুড়ি আর হবু বউয়ের সাথে বসে হাসাহাসি করছে।ভিকি তেরে সাহিত্যের সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।চোখমুখ অন্ধকার করে বলে উঠলো,

" তুই না বললি তুই কাপড়-চোপড় আর অফিসের জিনিস একদম নিবি না?"

সাহিত্য তার খালা ও বোনের পাশ থেকে ঘুরে ভিকির পাশে দেখল,

"হ্যাঁ,এই যে"

পাশে থাকা ছোট ব্যাগপ্যাকটা দেখিয়ে দিল সাহিত্য।

অমনি ভিকি তেতে উঠল,

"তো বাইরে জিপে ওগুলো কি আমার শ্বশুর বাড়ির ডালা?"

ভিকি আইরিন বেগমের দিকে ঘুরে শান্ত স্বরে শুধালো,

"সরি শাশুড়ি মা।কিন্তু আপনার ভাগিনা বলে একটা করে আরেকটা।আমাকে বলল সে নাকি প্রয়োজনীয় জিনিস ছাড়া কিছু নেবে না। অথচ ব্যাচেলার সংসার গুছিয়েছে"

সাহিত্যের দিকে ঘুরে আবার তেতে উঠল,

"এই!কি রে? কি আছে ওগুলোতে?"

সাহিত্য উঠে দাড় হয়ে তার ব্লাক লেদার জ্যাকেটের নিচে পরা অফোয়াইট গেঞ্জিটা টেনে ঠিক করল,

"আমার জীবন আছে ওগুলোতে"

"অহি তুই না বললি তোর ফ্ল্যাটের সব কিছু বিক্রি করে দিয়ে যাবি।তো এতকিছু কেন এক্সট্রা থাকলো?"

"আমার পেইন্টিং করার ব্রাশেরও একটা চুলও ছাড়তে আমি রাজি নই"

"এতগুলো জিনিস না নিয়ে আমার শ্বশুর বাড়িতে রাখলেও তো পারিস"

"ভিকি আমি তো বললামই। আমি যেখানে আমার রং তুলিও সেখানে।আর আমার কালেক্ট করা এতগুলো ব্র্যান্ডেড পেইন্ট আমি ফেলে দিয়ে যাব?মাথা খারাপ তোর?"

চোখ উল্টালো ভিকি,

"তোর এগুলো এয়ারপোর্টে আটকে দিলে কিন্তু আমি কিছু করবো না"

সাহিত্য গলায় জোর দিয়ে বললো,

"তোর কিছু করারও লাগবে না।এক্সট্রা কত টাকা লাগে আই উইল পে বাই মাই কার্ড"

সাহিত্যের কথার মুখ ভেংচি কেটে ভিকি আইরিন বেগম ও তার মেয়ে এশার দিকে ঘুরলো।মা-মেয়ে দুই বন্ধুর কান্ড দেখে মুখ টিপে হেসেই যাচ্ছে।এশাকে উদ্দেশ্য করে বলল ভিকি,

"তোমার ভাই আর আমার হবু সম্বন্ধী হয় দেখে সহ্য করছি একে"

এশা গলা পরিষ্কার করে শুধালো,

"তুমি তো ভালো করেই জানো পেইন্টিং থেকে সাহিত্য ভাইয়াকে কেউ আলাদা করতে পারবে না।তো অযথা কেন তার সাথে লাগতে যাচ্ছো?"

"কেউ বিশ্বাস করবে?তোমার এই আর্টিস্ট ভাই কানাডার নামি-দামি কম বয়সী বিজনেসম্যানদের মধ্যে একজন?"

"আমার ভাইয়ের নামে যত সুনাম করবো তত কম। অল স্কয়ার আমার ভাই"

এশার কথা শুনে ডানে-বামে মাথা নাড়ালো ভিকি,

"কাকে আমি কার কথা বলতে গিয়েছি?"

আইরিন বেগম সাহিত্যের দিকে এগিয়ে এলেন।গালে হাত বুলিয়ে দিতে নিয়েই শুধালেন,

"সবকিছু ঠিকঠাক মতো নিয়েছিস?"

খালার হাতের উপর হাত রেখে সাহিত্য ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে ছোট করে উত্তর দিল,

"হুম"

অতঃপর এশার দিকে ঘাড় কাত করে তাকালো,

"এই এশা।এখানে আমার যে পেইন্টিংগুলো আছে সেগুলো ডেইলি ক্লিন করাবি"

এশা হুকুম মানার আদেশে বলল,

"জ্বী মিস্টার লওরেন হারিস"

ভিকি হালকা হাসতে নিয়েই বলল,

"তোমার ভাই লওরেন হারিস এর থেকেও ভালো আর্ট করে।শুধু ভাগ্যে আর্টিস্ট হওয়াটাই জুটলো না"

শেষের কথাটা বলতে নিয়েই ভিকির হাসিটা চলে গেল।

কারণ বুঝতে পেরেই সাহিত্য কথার বিষয় পাল্টে ফেলল।হাতের কব্জিতে পড়া গোল ডায়ালের black rado jubile ঘড়ির দিকে নজর দিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল,

"খালু কি ওয়াশরুমে পড়ে গিয়েছে নাকি?"

হুমায়ূন সাহেব দ্রুত গতিতে সিঁড়ি দিয়ে নামতে নিয়েই বললেন,

"না না,পড়িনি"

এসে সাহিত্যকে নিজের বুকে জড়িয়ে ধরলেন তিনি।স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললেন,

"সেই কত ছোটতে এসেছিলি।আর দেখ কত তাড়াতাড়ি চলে যাচ্ছিস"

সাহিত্যের থেকে দূরত্ব বাড়িয়ে বললেন,

"আমি জানি আমার এগুলো কথা তুই শুনবি না।কিন্তু তোর ১১ বছরের গার্জিয়ান হিসেবে আমাকে এগুলো বলতেই হবে"

একটু থেমে হুমায়ূন সাহেব কোমল কন্ঠে

বললেন,

"দেশে ফিরে তোর আব্বু একটু কথা শোনাবে তোর বিজনেস নিয়ে।একটু সহ্য করে নিস।একদম কটমট করবি না।যেহেতু এখানে একটা নাম উঠিয়েছিস তাই ভাইজানও তেমন কিছু একটা বলবেন না।শুধু তার পছন্দের ইঞ্জিনিয়ার হওয়া বাদ দিয়ে তার অপছন্দের বিজনেসম্যান হয়েছিস সেটা নিয়ে একটু কথা শোনাতে পারে।এ কয়টা বছর তোর গার্জিয়ান হওয়ার মানটা একটু রাখিস"

হুমায়ূন সাহেবের দীর্ঘ কথায় সাহিত্য উত্তর না দিয়ে হালকা হেসে উঠলো।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

শ্বশুরের সাথে কিছু ভালো-মন্দ আলাপ করে ভিকি ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলো।পেছনে ঘুরে সবাইকে বিদায় দিয়ে ভিকির দিকে ঘুরল সাহিত্য,

"আমার অবর্তমানে অফিসের কাজ ফেলে শ্বশুরবাড়িতে ঘুরঘুর করিস না"

ড্রাইভিং এ ফোকাস রেখেই বলল ভিকি,

"যাচ্ছিস,যা। যাওয়ার সময় এমন ওয়ার্নিং কেন দিয়ে যাচ্ছিস?"

হাতের অ্যাপেল ট্যাবটা ওপেন করতে নিয়েই মেকি হেসে বলল সাহিত্য,

"বন্ধুর পাশাপাশি সম্বন্ধীও হই তো,তাই একটু ওয়ার্নিং না দিলে ভালো লাগে না"

ভিকি আর সাহিত্যের সম্বন্ধীর সম্পর্কের সময় প্রায় ছয় বছরের উপর হয়ে যাচ্ছে।এশা ও ভিকির প্রথমে প্রেমের সাক্ষাৎ তারপর পরিবারের সাক্ষাৎ।এনগেজমেন্টের পর এখন এশার গ্রাজুয়েশনের অপেক্ষায়।তারপর বিয়ে।

সাহিত্য হাতের অ্যাপেল ট্যাবটা মনোযোগ দিয়ে স্ক্রল করছে। সেদিকে এক নজর দেখে বলতে লাগলো ভিকি,

"দেশে ফিরে মানুষদের সাথে একটু কম কটমটাইস। ভার্সিটিতে তো কত মেয়েকে মুখের উপর ঝাড়ি দিয়ে ভাগিয়েছিস তার হিসেব নেই।এমন করতে থাকলে আমার বাচ্চারা তোকে সিঙ্গেল মামু ডাকবে"

সাহিত্যের কোনো হেলদোল দেখা গেল না।শুধু ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।সূক্ষ্ম বিরতি দিয়ে ভিকি আবার বলল,

"দেশে যখন ফিরছিসই তো তোর ওই নাইটমেয়ারটাকে জিজ্ঞেস করিস তো,প্রায় রাতে এমন জ্বালায় কেন?শুধু সেই কাজে ক্ষান্ত না হয়ে তিন মাস ধরে চিঠিও পাঠিয়েছে।গত দুই মাস থেকে তো দেখছি চুপ হয়ে আছে।হাপিয়ে গিয়েছে মনে হয়।তুই কি আদৌ চিঠিগুলো পড়েছিস?"

সাহিত্যের মুখের ভঙ্গিমা সম্পূর্ণ বদলে গেল।চাপ দাড়িওয়ালা গালের রগগুলো হালকা ফুলে উঠেছে তার।আবারো ভিকির কথায় কোনো উত্তর দিল না সে।আড় চোখে সাহিত্যের পাশে দেখে আবার বলল ভিকি,

"অযথা ওই বাচ্চা মেয়েটাকে কেন দো'ষারোপ করছিস? সে তো মনে হয় জানেও না কি হয়েছিল"

ভিকি ভালো করেই জানে এই বিষয়ে কথা উঠলেই সাহিত্য চুপ হয়ে যায়।নিজের মনকে যে সে কি বোঝায় ভিকি সেটা জানে না। নিজের কথা ঘুরিয়ে নিল

ভিকি,

"shaadi . com এ ঢুকেছিস নাকি?এত মনোযোগ দিয়ে আই প্যাডে কি দেখছিস?"

সাহিত্য হাতের ট্যাবটা ভিকির কোলে ছুড়ে মা'রলো।অতঃপর শান্ত ও গম্ভীর কণ্ঠে শুধালো,

" vantage V12 ।১১মাস আগে যেটা অর্ডার করেছিলাম,আগামীকাল ডেলিভারি দেওয়ার ডেট দিয়েছে"

ভিকি ট্যাবের দিকে নজর দিল।ট্যাবের স্ক্রিনে একটা গাঢ় সবুজ রঙ্গা অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি দেখা যাচ্ছে।চোখ মার্বেলাকার করে তড়িৎ গতিতে সাহিত্যের দিকে ঘুরলো ভিকি,

"ওররে সালা!যখন গাড়ি কেনার কথা বলিস তখন এজন্যই আমার মাথায় ঢুকছিল না যে কোন কোম্পানির গাড়ি রেডি করতে এতো সময় নেয়! তুই বাংলাদেশের রাস্তায় অ্যাস্টন মার্টিন চালাবি?"

"হ্যাঁ,তো?মাই মানি,মাই কার,মাই রুলস"

সাহিত্যের ঠান্ডা গলায় ভিকি চুপসে গেল।ভালো করেই বুঝলো সাহিত্য মজা করছে না।অতঃপর মেকি হাসলো ভিকি।কারণ দেশের মানুষেরা শুনেই অবাক হবে যে বাংলাদেশে অ্যাস্টন মার্টিন গাড়ি চালানোর মতো মানুষ এন্ট্রি নিচ্ছে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

এয়ারপোর্টের বাইরে নিজের বাবা ও ছোট বোন সামিয়াকে দেখে টানা ২২ঘন্টার জার্নির ক্লান্তিমাখা ছাপ আপনাআপনিই সরে গিয়ে মুখে বড় এক হাসি ফুটল সাহিত্যের। সামিয়া দৌড়ে এসে ভাইকে আষ্টেপিষ্টে ধরল।তোফায়েল শেখ ধীর পায়ে এসে ছেলের সামনে দাঁড়ালেন।লম্বায়-চওড়ায় ছেলে তাকে পার করে ৬ফিটের কাছাকাছি গিয়েছে।এত বছর পর ছেলেকে দেখে আর সামলাতে পারলেন না নিজেকে।বুকে জড়িয়ে ধরলেন।

গাড়িতে সব লাগেজ উঠিয়ে গাড়ি স্টার্ট দিলেন তোফায়েল শেখ।কানাডায় সবাই কেমন আছে টুকটাক কথাবার্তা বলতে নিয়েই তোফায়েল শেখ হালকা কেশে উঠে বললেন,

"আজ সকালে বাসার সামনে একটা গাড়ি ডেলিভারি দিয়ে গিয়েছে"

"হ্যাঁ,ওটা আমার গাড়ি"

ছেলের ঠান্ডা কথায় ভ্রু কুচকে তার দিকে মাথা ঘুরালেন তোফায়েল শেখ,

"অলরেডি একটা গাড়ি থাকা সত্ত্বেও আরো একটা গাড়ি কেনার মানেটা কি?"

"এটা আমি তোমাকে গিফট করেছি আব্বু।আর ওটা আমি আমার পার্সোনাল ইউজের জন্য কিনেছি"

ছেলের আবারো ঠান্ডা কথায় তোফায়েল শেখ দমে গেলেন।ছেলেটা তার কতটা শান্ত হয়ে গিয়েছে।প্রয়োজনের বেশি কোনো কথাই বলছে না।নাকি সেই ১১ বছর আগের রা'গ এখনো আছে?

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩য় পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন