#পর্ব_৫
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"কাউকে আমার রুমে ঢোকার অনুমতি দেয়নি আমি"
শুধুমাত্র একটা লাইন।যেটা কল্পনার চিন্তাভাবনায় ব'ম ফাটালো।পুরো শরীর যেন শিউরে উঠল তার।ভারী গাম্ভীর্য এক পুরুষালী কণ্ঠ।কি ওজনই না ছিল কন্ঠটাতে! আশেপাশের বাতাস ভারী করা কণ্ঠ।
সাহিত্যের বলা লাইনটা কি ছিল,কাকে উদ্দেশ্য করে বলেছে কল্পনার সেই দিকে কোনো খেয়ালই নেই।তার তো মনে হচ্ছে তার জীবনে এই প্রথম সে কোনো পুরুষের কন্ঠ শুনেছে।এতদিন আশেপাশে সব ফাটা বাঁশের আওয়াজ শুনছিলো।
কল্পনা আরেক দফা চমকে উঠল,যখন সাহিত্যকে বড় বড় পা ফেলে তার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলো।দুই হাত দিয়ে কামিজের নিচের দিকটা শক্ত করে চেপে ধরেছে কল্পনা।নাক-মুখ দিয়ে যে শ্বাস বের হচ্ছে সেগুলোও যেন থরথর করে কাঁপছে মেয়েটার।
কিন্তু কল্পনার কাঁপতে থাকা চাহনি উপেক্ষা করে সাহিত্য কল্পনাকে পার করে রুমের বাইরে চলে গেল।কল্পনার চলতি আধো শ্বাস-প্রশ্বাসটা পুরো দমে বন্ধ করার উদ্দেশ্যেই যেন পাশের দ্রুত গতিতে বের হয়ে যাওয়া সুদর্শন পুরুষটির ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউম এসে আছড়ে পড়ল কল্পনার নাসিকা গহ্বরে।যেটা কল্পনার আশেপাশের বাতাসগুলোকে মনে হয় আরো কয়েকগুণ ভারী করে দিল।কল্পনার শরীর বরফের মতো জমে গেলও নজর স্থির রাখতে পারছে না সে।এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে লাগল আশেপাশে।
হঠাৎই চোখ পড়ল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা অনুর উপর।
যে কিনা সেই কতক্ষন থেকে কল্পনাকে ডেকেই যাচ্ছে।মুখে 'চ' বর্গীয় শব্দ করে বিরক্তি নিয়ে বলল কল্পনা,
"কি হয়েছে?চিল্লাচ্ছিস কেন?"
আরেক দফা চেচিয়ে উঠল অনু,
"আরে তুমি কি কানা হয়েছো?আ'গুন দেখতে পারছো না?"
অনুর দাপাদাপিতে কল্পনা পুড়তে থাকা ক্যানভাসগুলোর দিকে দেখল।নাসা গহ্বরে বর্তমানে সেই ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউম এর জায়গায় পোড়া পেইন্টের গন্ধ প্রবেশ করছে।মাথার ঘিলুগুলো যখন কাজ করা শুরু করেছে তখন চোখ বড় বড় করে চিৎকার দিয়ে উঠল কল্পনা,
"আআআআ!!অনু তাড়াতাড়ি ওয়াশরুম থেকে পানি আন!!"
অনু দৌড়ে গিয়ে সাহিত্যের রুমের অ্যাটাস্ট বাথরুমে ঢুকলো।ক্যানভাসগুলোর কাছে এসে হাসফাস করতে লাগলো কল্পনা।কি করবে না করবে কিছুই বুঝছে না।এমন সময় অনু এসে ভর্তি এক বালতি পানি চোখ বন্ধ করে ক্যানভাসগুলোর দিকে ছুড়ে মা'রল।সাথে সাথে ছল্লাত করে পানির শব্দ শোনা গেল।তার সাথে পুরো রুম এখন পানিতে থৈ থৈ করছে।
অনু চোখ খুলে আ'গুন নিভেছে সেটা দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে পরমুহূর্তেই কল্পনার পাশে দেখে চমকে উঠে চিৎকার দিয়ে বালতি হাত থেকে ফেলে দিল।কারণ ক্যানভাসগুলোর সাথে কল্পনাও পুরো পানিতে ভিজে জব জব করছে।অনু কল্পনার পাশে দেখে কাপা গলায় বলল,
"স-স-সরি আপু"
বালতিটা যে কয় লিটারের ছিল আল্লাহই জানে।কারণ কল্পনার পুরো গোসল হয়ে গিয়েছে।আর সেই বালতি এই অনুটা তুলেছিলই কেমন করে!
কল্পনা চেচিয়ে উঠলো,
"গাধি একটা!! "
"তুমি যে ওখানে এসে দাঁড়িয়েছো, সেটা আবার আমি জানি?"
আবার চেচিয়ে উঠল কল্পনা,
"আগুন কেমন করে লেগেছে?"
"আমি ভাইয়াকে যখন বলেছি যে তুমি নিজ হাতে তার রুম গুছিয়েছো তখন সবগুলো ছবি জড়ো করে পকেট থেকে লাইটার বের করে আ'গুন ধরিয়ে দিয়েছে"
কপালে ভাঁজ পড়লো কল্পনার।এসেই সাহিত্য এমন উদ্ভট কান্ড করল কেন?কি নিয়ে রে'গে ছিল?ক্যানভাসগুলোতে ব্যাকটেরিয়া জন্মেছিল নাকি?কল্পনার ভাবনায় ছেদ পড়লো যখন তার চোখ রুমের মেঝের দিকে গেল।পুরো মেঝে পানি আর পোড়া ক্যানভাসে যাচ্ছেতাই হয়ে আছে।এগুলো কেউ দেখে ফেললে সর্বনা'শ হয়ে যাবে!
অনুর দিকে ঘুরলো কল্পনা,
"লিমা খালাকে তাড়াতাড়ি রুম পরিষ্কার করতে বল।আর এই খবর যেন বাসার কেউ না জানে,নাহলে তোর খবর আছে"
শেষের কথাটা কল্পনা অনুকে আঙ্গুল দেখিয়েই বলল।
কাচুমাচু চেহারা নিয়ে অনু উপর-নিচ মাথা দুলালো।কল্পনা তার মুখের পানি মুছে সামনের ছোট চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে পেছনে নিয়ে গেল।বড় বড় পা ফেলে এসে করিডোরে দাঁড়ালো সে।দেখা মিলল অ'গ্নিকাণ্ড তৈরির গুরুদেবের।যে কিনা নিচে সোফায় বসে পায়ের উপর পা তুলে টিভি দেখছে।সাহিত্যের পাশে দেখে কটমটিয়ে উঠল কল্পনা।কল্পনা ভেবেছিল ফাহাদ শেখ নাহয় তোফায়েল শেখ কোনো ঘটনা ঘটাবেন।কিন্তু এখানে তো উল্টো সাহিত্য বিপদের ঘন্টি বাজিয়ে বসে আছে।
রা'গের চোটে সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই বড় বড় পা ফেলে নিচে এসে সোজা মহুয়া বেগমের রুমে ঢুকলো কল্পনা।কল্পনার এহেন অবস্থায় মহুয়া বেগম চশমার উপর দিয়ে শান্ত চোখে জানালা দিয়ে বাইরের আবহাওয়া পরখ করে আবার কল্পনার দিকে ঘুরলেন,
"বাইরে তো বৃষ্টি হচ্ছে না।তো তুই এমন ভিজলি কোথায়?"
কল্পনা এসে ধপ করে বিছানায় বসে পড়ল।সেটা দেখে মহুয়া বেগম দুঃখের সুরে বললেন,
"আয়-হায়, বিছানাটা আমার খেলো রে"
কল্পনা কোনো কথা না বলে গাল ফুলিয়ে বসে আছে।সেটা দেখে মহুয়া বেগম আবার জিজ্ঞেস করলেন,
"কি হয়েছে বলবি কি?"
কল্পনার সময় নিয়ে মুখ খুলল,
"সমস্যা কি ওই লোকটার?প্রথম দেখায় কেউ এমন করে?"
কল্পনার রা'গ মাখানো কথায় মহুয়া বেগম ভড়কালেন না। শান্ত সুরে বললেন,
"আমি তো তোকে আগেই বলেছিলাম।তা'ণ্ডবের দিন হবে আজকে।আর সেটার শিকার তুই নিজেই হলি"
মহুয়া বেগম এখনও জানতে পারলে না যে কল্পনা ভিজেছে কিভাবে।তাই আবার জিজ্ঞেস করলেন।সেটার উত্তরে কিছুক্ষণ আগে হয়ে যাওয়া সব ঘটনা খুলে বলল কল্পনা।
নাতির রা'গে নাতনিকে শি'কার হতে দেখে নাতনির উপর একটু মায়াই হলো মহুয়া বেগমের।ভেজা মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে লাগলেন তিনি কল্পনাকে। কিন্তু তাতেও যেন কাজ হলো না।কিন্তু মহুয়া বেগমের পরবর্তী কথাটা শুনে খুব আগ্রহ নিয়েই দাদীর দিকে ঘুরলো কল্পনা।
"সাহিত্য তোর চিঠি পড়েছে"
"কি বললে দাদি!"
"অত খুশি হোস না।শুধু শেষের চিঠিটা পড়েছে"
"ইস!আমি কত আবেগ নিয়ে চিঠিগুলো লিখেছিলাম"
কল্পনার মনম'রা মুখ দেখে বুকের মাঝে মোচড় দিয়ে উঠল মহুয়া বেগমের।অবুঝ মেয়েটা সাহিত্যের রা'গের কারণটা অব্দি জানে না।মাঝে মাঝে তো মন চায় বলে দিক,বুঝদার বয়সের ঘরের পা তো দিয়েছে।কিন্তু ভ'য়ে থাকেন যে নিজেকে আবার উল্টো দো'ষারো'প যেন না করে বসে।
আবার শান্ত স্বরে বললেন মহুয়া বেগম,
"তুই একটু সাহিত্যের থেকে দূরে থাকিস।ওর রা'গ তো জানিস কেমন"
চোখ মার্বেলাকার করল কল্পনা,
"যুদ্ধক্ষেত্রে একাই নামার আমার সাহস নেই দাদী। সাহিত্য ভাইকে সেটা বুঝতে তো হবে, তাই না?.......হাচ্চু!!!"
কথার মাঝেই বড় একটা হাঁচি দিল কল্পনা। ঠান্ডা পানির কণাগুলো শরীরে মিশে গিয়ে তাদের প্রতিক্রিয়া শুরু করে দিয়েছে।মহুয়া বেগম তাড়া দিয়ে বললেন,
"হয়েছে হয়েছে, সাহিত্য কে আমি বুঝাবো। তুই এখন তাড়াতাড়ি কাপড়টা বদলে নে,না হলে জ্বর আসবে"
মহুয়া বেগমের রুম থেকে বের হয়ে আরেক দফা হাঁচি দিল কল্পনা।শরীরের ভেজা ওড়না দিয়েই নাক ডলতে ডলতে নজর গেল সাহিত্যের উপর।যে কিনা টিভি অন করে ফোন দেখছে।টিভির সাথে এ কেমন বেয়াদবি!চিঠির কথা স্মরণে আসতেই নিভু নিভু রা'গটা যেন আবার জ্ব'লে উঠল কল্পনার।তেরে গেল ড্রয়িং রুমের দিকে।টেবিলের উপরে রাখা রিমোট নিয়ে টিভি বন্ধ করল সে।হঠাৎ যান্ত্রিক বাক্সটার আওয়াজ বন্ধ হওয়ায় সাহিত্য মাথা তুলল।দেখা মিলল সেই অপ্রিয় অষ্টাদশীর।
পরনের হালকা গোলাপী থ্রিপিসটা শরীরের সাথে লেপটে আছে।হাটু অব্দি চুলগুলো থেকে এখনো টুপটাপ পানির কণা পড়ছে। হাঁচি দেওয়ার দরুন পুরো মুখমন্ডলে এক লাবণ্যময়ী লাল আভা বিরাজ করছে মেয়েটার। রা'গে ফুসতে থাকায় চেপে রাখা ঠোঁট জোড়ার দুই পাশের গাল দুটো হালকা বাতাস ঢোকানো বেলুনের মতোই লাগছে দেখতে।কিন্তু সেই আদুরে মুখখানা দেখে সামনের এই সুদর্শন পুরুষটির মন এক ছটাকও গললো না।উল্টো বরং চোয়াল দুটো যেন আবার শক্ত হয়ে এলো।সাহিত্য কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখিয়ে আবার ফোনে ডুব দিল।এই বাড়িতে প্রবেশ করার আগ মুহূর্তেই নিজেকে শক্ত করে নিয়েছিল সাহিত্য। এ বাড়িতে ফেরত আসা মানেই এই ব্যক্তির সাথে তার প্রতি মুহূর্তে সাক্ষাৎ হবে।একমাত্র দাদীর কথা চিন্তা করেই এই ভারী সিদ্ধান্তটি নিয়েছে সে।ফল্পরূপ না হয় চোখের সামনে এই ব্যক্তিকে দৈনন্দিন দেখে ঘৃ'ণাটা আরো কয়েকগুণ বাড়ুক।
সাহিত্যের মুখ ফিরিয়ে নেওয়া দেখে আরো এক ধাপ বেশি চকিত হলো কল্পনা।এবার ঝাঁজিয়ে উঠল সে,
"ভেবেছিলাম সালাম দিয়ে ভালো-মন্দ জিজ্ঞেস করবো।কিন্তু সেই সুযোগটা দিলেন কই?এসেই একদম আ'গুন জ্বা'লিয়ে দিলেন।পছন্দ হয়নি বললেই খুলে ফেলতাম।এমন ঠাকুর দাদার মতো আ'গুন ধরানোর কি দরকার ছিল?"
দীর্ঘ ১১ বছর পর খুব কাছের কোনো মানুষের সামনে যেতেই সাধারণত সংকোচ বোধ হয়।প্রথম দুই-তিন দিন তো চোখের আড়ালে থাকলেই মনে হয় জানে পানি থাকে।কল্পনারও সেটাই পরিকল্পনা ছিল।অন্তত এক সপ্তাহ ভদ্র বাচ্চার মতো ঘাপটি মে'রে থাকবে।একদম মাথা খাওয়া যাবে না।তারপর না হয় পরেরটা পরে দেখা যেত। কিন্তু রা'গটা যে কল্পনার মাথায় এখন চড়চড় করে উঠছে।ভদ্রতায় গু'লি মা'রো! যেখানে সামনের পক্ষই ভদ্রতা কায়েম করেনি সেখানে কল্পনার ভদ্রতায় তো এতক্ষণে ছাতা পড়ে গিয়েছে।
কল্পনার কথায় সাহিত্যের কোনো হেলদোল দেখা দিল না।এ বাড়ির প্রতিটি সদস্যের মতোই এই ব্যক্তিরও আচরণে কোনো পরিবর্তন হয়নি।সেটা সাহিত্য ভালো করেই আঁচ করতে পারলো। শুধু পরিবর্তন হয়েছে সাহিত্যের অনুভূতির।
সাহিত্যের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে একটু বিরক্ত নিয়ে আবার অধর জোড়া খুলল কল্পনা।হালকা একটু অভিমান মিশ্রিত হুং'কারের স্বরেই বলল,
"আমার চিঠিগুলোর উত্তর দেননি কেন?"
অপর পক্ষ আবার নিশ্চুপ।
"কি মনে করেছেন?আমার চিঠি উপেক্ষা করা এতো সহজ?প্রতিটা চিঠি আবার পড়িয়ে ছাড়বো। জানতাম এমন কিছুই হবে।তাই প্রতিটা চিঠি দুই কপি করে লিখেছি।বহু বছর আগে যে চিঠি পাঠার শখ করে রেখেছিলেন,আপনার সেই শখ পূরণ করেই ছাড়বো।আপনি তো চিঠি পাঠাননি,তাই আমার পাঠানো চিঠি পড়িয়েই না হয় আপনার শখ পূরণ করলাম।বোন হিসেবে আপনার এতটুকু আবদার তো রাখতেই পারি।আপনার যদি ঘাড় ত্যাড়া হয় তাহলে আমি পুরোটাই ত্যাড়া।সেটা অন্তত মনে হয় স্মরণে আছে আশা করছি"
গড়গড় করে এতগুলো কথা বলেই সিঁড়ির দিকে পা বাড়ালো কল্পনা।
সাহিত্যের অনিচ্ছায়ই যেন কল্পনার কথাগুলো কানে বেজে যাচ্ছে ' আপনার সেই শখ পূরণ করেই ছাড়বো ' কোন শখের কথা কল্পনা বুঝিয়েছে সাহিত্যের স্মরণে আসতে সময় লাগলো না।এত আগের কথা কল্পনার মনে আছে সেটা ভাবতেই ভড়কালো সাহিত্য।আরেক দফা ভড়কালো যখন মনে পড়ল যে কল্পনা বলেছে দুই কপি করে চিঠি লিখেছে।সাহিত্যকে নাকি পড়িয়েই ছাড়বে।পরমুহূর্তেই নড়েচড়ে বসলো সাহিত্য।বললেই হলো নাকি?আগেরবারের মতো এবারও ছুয়েও দেখবেনা।
কল্পনা তার রুমেই ঢুকতে যাচ্ছিল।এমন সময় হেনা শেখের কন্ঠ শুনতে পেল সে।
"পোড়া পোড়া কিসের গন্ধ উঠেছে?"
মায়ের কথা শুনে সেখানেই থমকে দাড়ালো কল্পনা।মাথা ঘুরিয়ে দেখল হেনা শেখ সন্ধিহানভাব মুখে নিয়ে নাক দিয়ে আবহাওয়া শুঁকে বেড়াচ্ছেন।মার্বেলাকার ধারন করেছে কল্পনার চোখ জোড়া।আ'গুন ধরার কথা হেনা শেখ জানতে পারলে খবর আছে। কল্পনার পাশের রুমটাই সাহিত্যের রুম। কেন? সেটা না হয় পরে জানা যাক।আপাতত হেনা শেখের সন্দেহ দূর করতে হবে। তাড়াতাড়ি করে সাহিত্যের রুমে উঁকি দিল কল্পনা। কাজের বুয়া লিমা বেগম ঘর মোছার শেষের পথে।সেটা দেখে কল্পনা এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে আবার নিজের রুমের কাছে চলে এলো।এখন হেনা শেখের নাকের গন্ধ দূর করার পালা।
একটু উঁচু গলায়ই ডাক দিল কল্পনা,
"কি হয়েছে মা?"
হেনা শেখ কল্পনার দিকে এগিয়ে এলেন,
"কিসের যেন পোড়া গন্ধ পাচ্ছি"
নাক উঁচু করে আবহাওয়া শুঁকতে নেওয়ার মতো ভাব নিল কল্পনা,
"হ্যাঁ, আমিও পাচ্ছি তো। মনে হয় কেউ বারবিকিউ করছে"
মেয়ের কথায় ভ্রু কুচকালেন হেনা শেখ,
"এখানে আবার বারবিকিউ কে করবে?"
"আরে!আশেপাশে কত বাসা-বাড়ি আছে। কেউ হয়তো করছে"
"কিন্তু এত পোড়া গন্ধ কেন?"
মায়ের ডিটেকটিভ গিরিতে একটু বিরক্তই হলো কল্পনা,
"আরে মা, পোড়া লেগেছে মনে হয়।সবাই আবার তোমার মতো ভালো রাধতে পারে?"
কল্পনার শেষের পামপট্টি লাগানো উক্তিটা মনে হয় কাজে লাগল।হেনা শেখ আপ্লুত হয়ে বললেন,
"সেটা অবশ্য ঠিক"
মেয়ের শরীরের দিকে নজর যেতেই তিনি ভড়কে গেলেন,
"তোর এই অবস্থা কেন?"
কল্পনা মনে মনে অনুকে হাজারটা পে'দানি দিতে লাগল।যার দরুন ওদিকে নিজের রুমে বসে থাকা অনু পরপর ৩টা হেচকি তুলল।
"দেবু চাচা গাছে পানি দিচ্ছিল। ওই একটু ভুলবশত আমার গায়ে এসে পড়েছে"
মায়ের কথায় সোজা-ঝাপটা আরো একটা মি'থ্যা বলে দিল কল্পনা।পেছনে বেঁধে রাখা হাতে ফিঙ্গার ক্রস করতে একদম ভুলেনি।কিন্তু সবে তো শুরু হলো। ভবিষ্যতে যে কত কাহিনী বানিয়ে বলতে হবে!তার জন্য মনে হয় দুই আঙ্গুল টেপ মে'রে একসাথে বাঁধিয়ে রাখতে হবে কল্পনাকে।মেয়েকে রুমে যেতে বলে সামনে এগোতেই থেমে গেলেন হেনা শেখ। শান্ত স্বরেই বললেন,
"তোর বড় বাবা-বড় মার সাথে দেখা হয়েছে?"
তড়িৎগতিতে কল্পনা ডানে-বামে মাথা নাড়ালো।
"দেখা হলে কথা বলিস।কিন্তু প্রয়োজনের বেশি কথা বলতে যাস না"
কথা শেষে নীচে যাওয়ার উদ্দেশ্যে চলে গেলেন হেনা শেখ। কল্পনার মাঝে মাঝে খুব খা'রাপ লাগে।ভাইদের কারণে জা দুজনেরাও এক মুখ হতে পারে না।আগের খুনশুটি কথাবার্তা যেন বিলীন হয়ে গিয়েছে এ বাড়ি থেকে।চোখ বন্ধ করে ধীরগতিতে নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সান্তনা দিল কল্পনা।সব ঠিক হয়ে যাবে।শুধু একটু ধৈর্য ধরে কাজ চালিয়ে যেতে হবে।নিজেকে ক্ষণিকের সান্ত্বনা দিয়ে রুমে ঢুকে গেল সে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রাতের খাবারের সময় ডাইনিং টেবিলে সবাইকে তলব করেছেন মহুয়া বেগম।তার মুখের ভঙ্গিমা দেখেই বুঝা যাচ্ছে ভারী কোনো কথা বলবেন তিনি। পুরো ডাইনিং এ নীরবতা বিরাজ করছে।লম্বা ডাইনিং টেবিলের এক মাথায় মহুয়া বেগম বসেছেন।আর দুই পাশে সারি করে বসেছে বাড়ির বাকি সদস্যরা।চিকন ফ্রেমের চশমা ঠিক করতে নিয়েই গলা পরিষ্কার করলেন মহুয়া বেগম।অতঃপর সময় নিয়ে কথা শুরু করলেন,
"আমার কাছে যে আর বেশি সময় নেই সেটা তো মনে হয় সবাই জানো।আমার আয়ু ফুরিয়ে আসার কারণ যে আমার নিজেরই ছেলেরা,সেটা আমি অস্বীকার করবো না।কিন্তু কি করবো?মা হই।সন্তানদের উপর তো আর নিরাশ হয়ে থাকতে পারি না।তাই এই শেষ সময়ে এসে একটাই আদেশ করবো মা হিসেবে।অন্তত আমার চোখের সান্তনার জন্য হলেও এই কয়েকদিন একটু অভিনয় করো।ম'রণটা অন্তত একটু সুখের চাই। আমার পেছনে কি করবে করো।অন্তত আমার চোখের সামনে তোমাদের যেন কথা বলতে দেখি।সেটার জন্য যদি বি'ষও হজম করতে হয় তাহলে করো"
মহুয়া বেগমের কথা শেষ হলে আবারো পরিবেশে নীরবতার চাদর পড়ল।কিছু দূরে বসে থাকা কল্পনার দিকে চো'রা চোখে দেখলেন মহুয়া বেগম।কল্পনার নজর তার উপরেই আবদ্ধ।মহুয়া বেগম চোখ দিয়ে ইশারা করে বোঝালেন,কল্পনার শিখিয়ে দেওয়া কথা কেমন হয়েছে।কল্পনাও চোখ দিয়ে বুঝালো 'একদম ফাটাফাটি' ।দাদি তো তার ভালোই অভিনয় করতে পারে।এটা যদি কল্পনা আগে জানত তাহলে আরো কিছু ডায়লগ এর স্ক্রিপ্ট তৈরি করা যেত।
মহুয়া বেগমের ঠান্ডা কথাগুলো সবাই নীরব শ্রোতার মতো শুনে গেল।তিন শেখ আহমেদের কেউই মনে হয় এই দিনের আশা করেননি।নিজেরা খুব অনুতপ্ত অনুভব করছেন।শেষ সময়ে এসে তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখ মুখ ফুটে ক্ষমাটা পর্যন্ত চাইতে পারছেন না মায়ের কাছে।কিন্তু যতদিন আছেন, না হয় একটু সেবা করেই পাপ কমিয়ে নিবেন।কিন্তু ভাইদের মাঝে কি এই নিরব স্রোতের ভাঙ্গন সম্ভব হয়ে উঠবে?
এদিকে রঞ্জক শেখের বড় দুই ভাইয়ের অসহায় মুখ দেখে ভেতর থেকে দীর্ঘ শ্বাস বেরিয়ে এলো।একদিকে মায়ের জন্য ক'ষ্ট আবার অন্যদিকে মায়ের শেষ ইচ্ছায় খুশিও হয়েছেন বটে। তিনিও তো সেটাই চান।
এতগুলো দুঃখী মানুষের মধ্যে কেউ একজন নিম্নাষ্ঠ কামড়ে ধরে হাসি থামাবার আপ্রাণ চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।সবার মাথাই হেট করা,কিন্তু সাহিত্যের মাথাটা একটু বেশিই নিচু করা।তার দাদীটা তো ভালোই অভিনয় করা শিখেছে। কি দুঃখের সহিত বানোয়াট কথাগুলো উজাড় করে বললেন তিনি।আগামী দিনগুলো যে রোমাঞ্চকর হবে তা ভালো করেই আঁচ করতে পারলো সে।হাসি আটকে রাখার দরুন হাসফাস লাগছে সাহিত্যের।আর ধরে রাখতে পারল না।নীরবতা ভেঙ্গে জোরে কাশি দিয়ে উঠে নিজেই হতভঙ্গ হয়ে গেল সাহিত্য। 'কেয়ারলেস ম্যান ' মনে মনে নিজেকে শাসানোর পরও যেন পেটের ভিতর হাসিরা গুড় গুড় করছে।
#চলবে