#পর্ব_৬
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্যের কাশি টেবিলের সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।সেটা বুঝতে পেরে সাহিত্য কাশি থামিয়ে গলা পরিষ্কার করে ছোট করে সরি বলল।এদিকে কল্পনা সাহিত্যের দিকে দেখে বিড়বিড় করে অদৃশ্য কয়েকটা গালি দিল।এমনিতে তো বিকালের রা'গটা এখনো মাথা থেকে নামেনি কল্পনার।তার উপর এখন সাহিত্য তার প্ল্যান এর মধ্যে কাশি ঝেড়ে দিচ্ছে।মন তো চাচ্ছে সামনের প্লেটটা হাতে নিয়ে ছুড়ে সাহিত্যের মাথায় ঢিল মা'রুক। এখনই যদি কেউ বুঝতে পারতো তাহলে কি হয়ে যেত!
নাতির কাণ্ড বুঝতে পেরেই মহুয়া বেগম তাড়াতাড়ি পরবর্তী ধাপে চলে গেলেন,
"আশা করছি আজ আমার তিন বৌমাই খাবার পরিবেশন করবে"
শাশুড়ির মধুমাখা আদেশে বাড়ির তিন গিন্নিই উঠে দাঁড়ালেন।তার সাথে সবাই টুকটাক শব্দ করে টেবিলের প্লেট চামচ ঠিক করতে লাগলো।
খাবার পরিবেশনের সময় গিন্নিদের মাঝে যেন তেল বিহীন গাড়ির ব্রেক পড়তে লাগলো মাঝে মাঝে।হেনা শেখ ও আমেনা শেখ ততটা স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না।তাই কিছুক্ষণ আগে দেয়া কল্পনার ওয়ার্নিং পাশে রেখে লতিফা শেখ তাদের মাঝে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলেন।যেটার ফলও ভালো করে পেলেন লতিফা শেখ।ভাতিজীকে সবজি দিতে এলেই কল্পনা হালকা আওয়াজে ভড়কে উঠে বলল,
"তোমার সবজি তুমি খাও"
কথা বাড়ালেন না লতিফা শেখ।ভাতিজির সাথে এই মুহূর্তে লাগার কোনো ইচ্ছা নেই তার।
টেবিলটা লম্বায় যতটা বড় তার থেকে কিছুটা চওড়ায় কম বড় হলেও দুপাশের ব্যক্তিদের মধ্যে যথেষ্ট দূরত্ব আছে।যার দরুন ফাহাদ শেখ বর্তমানে টেবিলের একপাশ থেকে অপর পাশে রাখা জগটা নিতে পারছেন না।জগ যেই ব্যক্তির হাতের নাগালে আছে তাকে বললেই তো এগিয়ে দেয়,স্বাভাবিক কথা।কিন্তু বিপত্তি তো ঘটেছে এখানেই।জগখানা যার সবচেয়ে বেশি হাতের নাগালে আছে সেখানে বসে আছেন তোফায়েল শেখ।আর তোফায়েল শেখের একপাশে সাহিত্য অপর পাশে সামিয়া।কিন্তু এদিকে যে ফাহাদ শেখের জিহ্বার ঝালের মাত্রাটা তির তির করে বাড়ছে।জিহ্বার স্নায়ু তারনার কারণে পাশে বসে থাকা যে কাউকে বলবেন সেটা যেন মাথায়ই নেই ফাহাদ শেখের।তিন গিন্নিও এতক্ষণে পরিবেশনের পর্ব চুকিয়ে খেতে বসেছেন ।হঠাৎ খাবার মাঝে লতিফা শেখের নজরে সেই দৃশ্য ধরা পড়ল।সাহায্যের জন্য উঠতে গেলেই পাশে বসে থাকা কল্পনা চোখ রাঙিয়ে তার হাত চেপে ধরল।ভাতিজিকে আর উষ্কানো যাবে না।নাহলে দিনকাল খা'রা'প যাবে আগামীতে।তাই কোনো উপায় না পেয়ে আবার খাবারে মনোযোগ দিলেন লতিফা শেখ।
ফাহাদ শেখের মোচড়া-মুচড়ি এবার মহুয়া বেগমের নজরেও পড়ল।সময় নষ্ট না করেই তিনি গর্জে উঠলেন,
"মুখ নেই তোর? ভাইয়ের কাছে জগটা এগিয়ে চেয়ে নিতে পারছিস না?"
টেবিলে উপস্থিত সবাই কেঁপে উঠলো মহুয়া বেগমের হুংকারে।স্বামীর কষ্ট এতক্ষণে হেনা শেখের নজরেও পড়ল।কিন্তু তিনি তো আর নড়তে পারবেন না।হেড অফিস তো হুং'কার দিয়েই দিয়েছেন।বর্তমানে সবার চোখ ফাহাদ শেখ ও তোফায়েল শেখের মাঝে নিবদ্ধ,শুধু সাহিত্য বাদে।খুব মনোযোগ দিয়ে খাবার চিবিয়ে যাচ্ছে সে।এদের এসব নাটকে তার কোনো রুচি নেই।
মৃদু স্বর শোনা গেল,
"ভাইজান... জগটা এগিয়ে দিন"
তোফায়েল শেখ সময় নিয়ে অর্ধ ভরাট জগটা ছোট ভাইয়ের দিকে এগিয়ে ধরলেন। উপস্থিত সবার কাছে যে এই দৃশ্যটা কত মূল্যবান সেটা শেখ বাড়ির সদস্যরা ছাড়া কেউই বুঝবে না।আবার পরিবেশ নীরবতায় চলে গেল।কল্পনা মহুয়া বেগমের দিকে দেখে ঠোঁট প্রসারিত করল।প্রথম ধাপ কোনো ঝামেলা ছাড়াই সম্পন্ন হয়েছে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শেখ ভিলায় সাহিত্যদের আসার দুই সপ্তাহ পার হতে চলল।এই দুই সপ্তাহে ধরণীতে আবহাওয়ার অনেক পরিবর্তন হয়েছে।শুধু পরিবর্তন হয়নি শেখ ভিলার আবহাওয়া।সবই ঠিকঠাক চলে।গল্পগুজবও ভালো চলে।কিন্তু বিপত্তি তখনই ঘটে যখন বাড়ির দুই বড় কর্তা ও তাদের অর্ধাঙ্গীনীরা মুখোমুখি হন।মহুয়া বেগম সামনে এলে তবুও দু-একটা কথার দানা মুখ থেকে বের হয় তাদের।কিন্তু সাহিত্য যে মহুয়া বেগমকেও তোয়াক্কা করে না। ভাবখানা তার এমন যেন ফাহাদ শেখ ও কল্পনার অস্তিত্বই এ বাড়িতে নেই। ফাহাদ শেখের অবশ্য এদিক থেকে সুবিধাই হয়েছে। কিন্তু কল্পনার? সে যে মহা বিপদে আছে।এত চেষ্টা করেও সাহিত্যকে এক ইঞ্চিও নড়াতে পারেনি সে।
একদিন তো সাহিত্যের রুমের দরজায় নক করতে করতে জ্ঞান হারাচ্ছিল কল্পনা।কোনো সাড়াশব্দ না পেয়ে একটু ভয়ই ঢুকলো মেয়েটার মনে।অগত্যা অনুমতি না নিয়েই হুড়মুড়িয়ে রুমে ঢুকলো সে।কি না কি হয়েছে ভেবে বিছানার দিকে নজর পড়তেই সব আতঙ্ক কল্পনার উপর খিলখিলিয়ে হেসে বিদায় নিল।মহারাজা বিছানায় হেলান দিয়ে বসে ল্যাপটপে কাজ করছেন।তেতে উঠে সাহিত্যের কাছে গিয়ে দাঁড়ালো কল্পনা,
"সমস্যা কি আপনার? কতক্ষণ থেকে নক করছি। শুনেন নি?"
সাহিত্যের হাত কি-বোর্ডে চলমান। ঠান্ডা কন্ঠে বলে উঠলো,
"গেট আউট"
কল্পনা তো পুরো হতভম্ব।ঠোঁট দুটোও কিঞ্চিত আলাদা হয়ে গেল তার।কথা নেই বার্তা নেই সোজা গেট আউট?সাহিত্যের কথার ধার ধারলো না কল্পনা। নড়েচড়ে উঠলো সে।কাট কাট গলায় বলল,
"আপনার সাথে কিছু ইম্পর্টেন্ট কথা আছে আমার"
"গেট আউট"
এবারও ঠান্ডা গলা ছিল।কিন্তু গলার জোরটা একটু বেশি ছিল।আরে সমস্যা কি এই ব্যাটার!একটু কথা বললে কোন এমন নিয়ম ভেঙ্গে যাবে?
"যাব না আমি।কথা বলে তারপরেই যাব"
প্রতিমুহূর্তে কল্পনার সাহসটা যেন বেড়েই যাচ্ছে।
এতক্ষণ পর সাহিত্য ল্যাপটপ থেকে চোখ সরিয়ে আড় চোখে কল্পনাকে দেখল।স্থির শরীরটা নড়িয়া উঠে দাঁড়ালো সে।সময় নষ্ট না করেই কল্পনার এক হাতে হ্যাচকা টান দিয়ে রুমের বাইরে একপ্রকার ছুড়েই মা'রল। টাল সামলাতে না পেরে করিডোরের রেলিং এর সাথে ধাক্কা খেলো কল্পনা।পিছন থেকে রা'গ মিশ্রিত গম্ভীর গলা শোনা গেল,
"ডোন্ট গেট ইন মাই রুম উইথআউট মাই পারমিশন"
কথাটা বলার পরপরই বাজখাই শব্দ করে রুমের দরজাটা লাগিয়ে দিল সাহিত্য।রেলিং ধরে রেখেই পেছনে ঘাড় ঘুরালো কল্পনা।ইস! কি কাট কাট গলায় ইংরেজি লাইনটা মধুর মতো কন্ঠ দিয়ে বের হলো। শুনেই তো প্রশংসা করতে ইচ্ছা করছে।কিন্তু সেই কন্ঠের অধিকারী তো কল্পনার সাথে কথাই বলতে নারাজ।এই মুহূর্তে যে কারোরই মন খা'রা'প হওয়ার কথা।কিন্তু কল্পনার তা হলো না।উল্টো আরো রুমের দরজার পাশে দেখে সাহিত্যের মুখ ভেংচাতে লাগল।কল্পনাকে দমানো এত সহজ নাকি?এই লোককে ভদ্রতা দেখিয়ে লাভ নেই।কল্পনা তার সীমানারও বাইরে ভদ্রতা দেখিয়েছে।যে রুমে কল্পনা এতদিন প্রায় সময়ই আসতো,গভীর ঘুমে কিছু রাতও কাটিয়েছে সে যেই রুমে,আজ নাকি সেখানেই তাকে ঢুকতে দেওয়া হচ্ছে না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সেদিন মনেপ্রাণে এত পণ করার পরেও যেন কোনো কাজ হচ্ছে না। সাহিত্য তো কথাই বলছে না। তো কল্পনার প্ল্যান কাজ করবে কেমন করে? নিজের রুম থেকে বের হতে নিয়েই সাহিত্যের রুমে দরজায় চোখ গেল কল্পনার।সাহিত্য বাড়িতে নেই। অফিসে গিয়েছে।বেশিরভাগ দিনের বেলা অফিসেই থাকে সাহিত্য।দেশে সাহিত্যের কোম্পানির ব্রাঞ্চ এর কথা শুনেছে কল্পনা।দেশে ফেরার পর থেকে সেটাকেই ঘষামাজা করতেই মনে হয় এত ব্যস্ততা তার।সাহিত্যের পাশের রুমে ট্রান্সফার হয়ে লাভটাই কি হলো? ভেবেছিল একসাথে বসে প্ল্যান করবে।কিন্তু সেটার ধারের কাছেও নেই সাহিত্য।
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নিয়েই সামিয়া এসে কল্পনার হাত জড়িয়ে ধরল।মুখে হাসি ধরে রাখা মেয়েটার পাশে দেখে কল্পনাও মৃদু হেসে উঠল।সামিয়াও তার তিন বাবা-মা-ভাইয়ের মতো শুরু করেছিল।কল্পনার এক ঝাড়িতে সোজা হয়ে গিয়েছে বাচ্চা মেয়েটা। অনুর দ্বারায় সামিয়াকে প্রায় প্রায় দেওয়া কল্পনার হাতের সুস্বাদু রান্নার দিব্যি দিয়েছিল কল্পনা সামিয়াকে। বেচারী সামিয়া আর কিই বা করবে?কল্পনার বানানো হরেক রকমের খাবার অনু তাকে খাইয়ে খাইয়ে লোভ ধরিয়ে দিয়েছে।সেগুলো কি আর এত সহজে হাতছাড়া করা যায়?কিন্তু বাড়ির গুরুজনদের সামনে ঘাপটি মে'রে থাকে মেয়েটা।সবাইকে মনে করায় যে সে কল্পনাকে চিনেই না।
ডাইনিং টেবিলে রঞ্জক শেখ ও লতিফা শেখকে দেখে সামিয়া হালকা দূরে সরে যেতে নিলে কল্পনা খপ করে তার হাতটা ধরে মুখে হাসি নিয়ে বলল,
"চাচু-চাচী মা কিছু বলবে না"
বোনের হাত ধরেই নিচে নামলো কল্পনা।রঞ্জক শেখ ও লতিফা শেখ চা খাচ্ছিলেন ও টুকটাক কথা বলছিলেন।কল্পনা ও সামিয়া এসে তাদের মুখোমুখি চেয়ারে বসল।পরোটা প্লেটে নিতে নিতেই কল্পনা দুজনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"দিনকাল কেমন যাচ্ছে তোমাদের?"
সামনের দুজন কল্পনার দিকে ঘুরতেই তাদের প্যাঁচার মতো মুখ দুটো কল্পনার নজরে পড়ল।ভ্রু জোড়া কুচকে শুধালো কল্পনা,
"কি ব্যাপার?এমন প্যাঁচার মতো মুখ বানিয়ে রেখেছ কেন?"
"প্রশ্নটা যে তুই ঠাট্টা করে করেছিস সেটা বোঝাই যাচ্ছে"
লতিফা শেখের দুঃখীময় কথায় কল্পনা ঠোঁট টিপে হেঁসে উঠলো।
"এই মেয়ে একদম হাসবি না।এদিকে আমাদের শুকনো মেঝেতে পা পিছলে উল্টে পড়ার অবস্থা হচ্ছে, আর তুই হাসছিস?"
লতিফা শেখের কথায় কল্পনা গলা পরিষ্কার করে নড়েচড়ে বসলো,
"কেন কি হলো আবার?"
কল্পনার ভাবভঙ্গি এমন যেন সে কিছুই বুঝছে না।
হালকা রাগের মাথায় আবার শুধালেন লতিফা শেখ, "বাড়ির অবস্থা দেখছিস না?এরা চারজন যা শুরু করেছে না,তাতে আমাদের দুই পাহাড়ের মাঝে পি'ষে ভর্তা হওয়ার অবস্থা হচ্ছে"
"সেটা তাদের সমস্যা।তোমরা কেন ভর্তা হওয়ার জন্য পাহাড়ের মাঝে ঢুকতে যাচ্ছো?"
মুখ ভর্তি পরোটা নিয়েই কথাটা বলল কল্পনা।
কল্পনার এমন গা ঝাড়া কথা শুনে লতিফা শেখ আরো বেশি ভড়কে গেলেন,
"আমাদের কি সমস্যা?বিনা বেতনে যে ডাক পিয়নের চাকরিটা করছি দুজনে আমরা সেটার কি হবে?"
খাওয়া থামিয়ে কল্পনা লতিফা শেখের দিকে দেখে কপালে ভাজ ফেলল,
"মানে?"
চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে এবার রঞ্জক শেখ মুখ খুললেন,
"মানেটা হলো যে, বড় ভাইজান আর তোর বাবার ডাক পিয়ন আমি,আর দুইভাবির ডাক পিয়ন অন্তর আম্মু।তারা নিজেরা তো কথা বলছে না আবার জরুরী কিছু হলে আমাদের দ্বারায় বার্তা প্রেরণ করছে"
কল্পনার গা ঝাড়া ভাবখানা বদলানো না,
"কয়েকদিন একটু সহ্য করে নাও।তারপর সব ঠিক হয়ে যাবে।বাড়িতে শান্তি আসার আগে একটু সাসপেন্স-থ্রিলার থাকবে এটাই তো স্বাভাবিক।ভদ্র বাচ্চাদের মতো পপকর্ন নিয়ে এনজয় করো।তোমরা যদি সেখানে অংশগ্রহণ করতে পারো তাহলে তো আরো মজা"
এই মেয়েটার গা ঝাড়া কথাবার্তা বলা কখনোই বদলাবে না।কিন্তু লতিফা শেখ ও রঞ্জক শেখের সাথে যেন খোলামেলা কথাটা বেশি বলা হয়।শুধু কল্পনারই নয়,বাড়ির বাচ্চাদের সাথে এই দুই গুরুজন ব্যক্তি বন্ধুর মতোই কথা বলেন।
খাওয়া শেষ করে পাশের টোটব্যাগটা নিয়ে উঠে দাঁড়ালো কল্পনা,
"আজকে মুহিত আঙ্কেলের আসার ডেট আছে।আসবে কি?"
রঞ্জক শেখ ছোট করে উত্তর দিলেন,
"হুম"
চাচুর মলিন মুখখানা দেখে কল্পনা চেয়ারের পেছন থেকে গিয়ে তার গলা জড়িয়ে ধরল,
"ওহো চাচু,বললাম তো টেনশন নিও না।তোমার দুই ভাইয়ের কিছু হবে না।তারা মাথার চুল ছেড়াছেড়ি করে আবার গলা ধরে বসে থাকবে।এখন আমি যাই, দুপুরের পরপরই চলে আসবো"
শেষের কথাটা কল্পনা বাইরে বেড়োতে নিয়েই বলে গেল।কিন্তু রঞ্জক শেখের মুখের মলিন ভাবখানা গেল না।তার ভাইদেরকে তিনি ভালো করেই চিনেন।অনেক কঠিন মনের মানুষ তারা।রঞ্জক শেখের মতো এতো নরম মনের অধিকারী তারা নন।১১ বছর আগে তার দুই ভাই যেও একটু কথা বলতো,সেটাও যেন সূক্ষ্ম এক বিষয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গিয়েছে।মাথায় এত ভারী ভারী চিন্তা নিয়েই কলেজের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন তিনি।লতিফা শেখ স্বামীর দুঃখের কথা সব বোঝেন।কিন্তু সান্ত্বনা দেওয়ার যে শব্দ ফুরিয়ে গিয়েছে তার কাছে। এত বড় একটা পরিবারে যে কার নজর লেগেছে ভেবে পাননা তিনি।বাড়ির সবার মনের দিক দেখেই যেন নিজের সুপ্ত মন খারাপ এক কোণে ফেলে রেখেছেন তিনি।কিন্তু সেই সুপ্ত খারাপ লাগা যেন প্রায় সময়ই ভারী নিশ্বাস আকারে বেরিয়ে আসে।হঠাৎ আমেনা শেখকে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে আসতে দেখে মুখশ্রী বদলে ফেললেন তিনি।
আমেনা শেখ আঁচল ঠিক করতে নিয়ে এসেই সামিয়াকে তাড়া দিতে লাগলেন,
"সাড়ে আটটা সে কখন বেজে গিয়েছে!নয়টার দিকে যে ক্লাস আছে মাথায় আছে তোর?তাড়াতাড়ি খা।তোর টিফিন রেডি করে দিচ্ছি,সেটা আবার না নিয়েই দৌড় মারিস না"
মেয়েকে স্কুলে যাওয়ার জন্য তাড়া দিতে নিয়েই আমেনা শেখ টিফিন রেডি করার উদ্দেশ্যে রান্নাঘরের দিকে গেলেন।
সেপাশ থেকে নজর ঘুরিয়ে লতিফা শেখ সামিয়ার দিকে দেখলেন।ফিসফিস করে শুধালেন তিনি,
"তোর মাকে আবার আমাদের এখনকার কথাবার্তাগুলো বলে দিস না"
পরোটা মুখে নিয়ে ফিট করে হেসে উঠল সামিয়া।অতঃপর লতিফা শেখের উত্তরে ডানে-বামে মাথা নাড়ালো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ক্লাসরুমে ঢুকেই অতি পরিচিত এক কালো ছায়া পড়া মুখের দিকে চোখ গেল প্রীতির। চোখ উল্টিয়ে কল্পনার পাশে গিয়ে বসলো সে।কল্পনার সাদা মুখে এই কালো ছায়া গত দু সপ্তাহ থেকে দেখা যাচ্ছে।অবশ্য প্রীতির কারণটাও অজানা নেই।প্রীতির মাঝে মাঝে তো ইচ্ছে করে এই সাহিত্য ভাইয়ের নাক বরাবর একটা ঘু'ষি বসিয়ে দিতে।তার ফুলের মতো বেস্ট ফ্রেন্ডটা কেমন মুড়ঝে গিয়েছে।
টেবিলের উপরে রাখা কল্পনার ফোনটা নিয়ে প্রীতি কল্পনার দিকে এগিয়ে দিল।হালকা রা'গী গলায় ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠেই শুধালো সে,
"সাহিত্য ভাইয়ার নাম্বারটা দে তো"
টেবিলের উপরে ব্যাগে ঠেকিয়ে রাখা মাথাটা প্রীতির দিকে ঘুরালো কল্পনা।প্রাণহীন কন্ঠে বলল,
"কি করবি?"
মুখে "চ" বর্গীয় আওয়াজ বের করে বিরক্ত নিয়ে বলল প্রীতি,
"আগে দে তো"
অন্তর কাছ থেকে নেওয়া সাহিত্যের নাম্বারটা ফোনে বের করে প্রীতির দিকে এগিয়ে দিল কল্পনা।আবার প্রাণহীন কন্ঠে শুধালো,
"কি একটু শুনেছিস আমার কানাডা ফেরত চাচাতো ভাইটা হ্যান্ডসাম,আর এখনই প্রেম করতে চাচ্ছিস?আমাকেও তো একটু চান্স নিতে দে"
কল্পনার ভাবলেশহীন কথায় প্রীতির গম্ভীর মুখটা বিকৃত হয়ে গেল।ফোন থেকে নজর ঘুরিয়ে কল্পনার পাশে এমন করে দেখলো যেন কল্পনা তাকে কোনো ন'র্দমা'র কী'টের সাথে প্রেম করার কথা বলেছে।প্রীতির সেই চোখ মুখ দেখে আবারো ভাবলেশহীন কণ্ঠে শুধাল কল্পনা,
"তো কেন সাহিত্য ভাইয়ের নাম্বার চাইছিস?"
চোখ-মুখ আবার গম্ভীর করে ফোনের দিকে নজর দিল প্রীতি,
"ঝালাই দেব তোর সাহিত্য ভাইকে আজ"
টেবিল থেকে মাথা উঠিয়ে তড়িৎ গতিতে প্রীতির হাত থেকে কল্পনা তার ফোনটা নিয়ে নিল,
"ওই!! অন্তত আমার সাহিত্য ভাইকে ঝাড়া থেকে বিরত থাক তুই।এজন্যই এখন পর্যন্ত একটা ছেলে ভাগ্যে জোটেনি তোর"
কন্ঠ স্বাভাবিক করে আবার শুধালো কল্পনা,
"আর এমন করে বলছিস মনে হচ্ছে উনি আমার পিছনে পিছনে ঘোরে....সেটা হলে তো আমার ভাগ্যই খুলে যেত"
শেষের কথাটা নজর ঘুরিয়ে মিনমিনিয়েই বলল কল্পনা।
"অমন ব'দ'মাই'শ লোক পেছনে না ঘুরাই ভালো"
প্রীতির কথায় কল্পনা চোখ-মুখ কুচকালো।সেদিকে তোয়াক্কা না করে প্রীতি আবার কল্পনার ফোনের উদ্দেশ্যে হাত বাড়িয়ে দিল,
"এমন চোখ মুখ উল্টাস না।মাথা গ'রম আছে এমনিতে। ভালোয় ভালোয় ফোনটা দে"
ফোন ধরে রাখা হাতটা পেছনে আরো পিছিয়ে নিলো কল্পনা,
"তোর মাথা আবার ঠান্ডা থাকে কখন?খালি মানুষকে পেদাতে পারলেই বাঁচিস তুই।একদম আমার সাহিত্য ভাইকে কিছু বলতে যাবি না"
কল্পনার হাত থেকে ফোন নেওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করা বন্ধ করে দিল প্রীতি,
"ঠিক আছে, চুপ থাকলাম।কিন্তু গ'জ'ব পড়বে তোর সাহিত্য ভাইয়ের উপর।অফিসের মিটিং করতে গিয়ে উ'ষ্টা খেয়ে পড়ে যাবে"
মুখ ভেংচালো কল্পনা,
"শকুনের দোয়ায় গরু ম'রে না"
নাকমুখ কোঁচকে নিল প্রীতি।আর সেটা দেখে কল্পনা এবার সশব্দে হেসে উঠলো।
এই দুই বান্ধবী সাহসিকতার দিক দিয়ে এক হলেও প্রীতি আর কল্পনার এই জিনিসটা ছাড়া আর কোনো কিছুতেই যেন মিল নেই।কল্পনার মতো অত চঞ্চলতা প্রীতির মাঝে নেই।মেয়েটা নেহাতই গাম্ভীর্যপূর্ণ স্বভাবের।আর সেই মেয়েকেই চঞ্চল মুখী কল্পনা চে'তিয়ে ভারী মজা পায়।এতক্ষণ পর কল্পনার মুখে হাসি দেখে একটু স্বস্তি পেল প্রীতি।কল্পনাকে সবাই মুখ ভর্তি হাসি আর চঞ্চল স্বভাবের মেয়ে হিসেবেই চিনে।কিন্তু প্রীতি যে এই মেয়েটার চঞ্চল দিকটা ছাড়াও দায়িত্ববান এক মেয়েরও প্রতিচ্ছবি দেখতে পায়। একমাত্র প্রীতিই আছে যার কাছে কল্পনা তার সুখের কথা ছাড়াও দুঃখের কথাগুলোও উজাড় করে বলতে পারে।কল্পনার ক'ষ্টগুলোকে যেন নিজের মধ্যে দাবিয়ে নেয় প্রীতি।এমন বন্ধুত্ব যেন এ জগতে বহুই বিরল প্রকৃতির।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বিকেলের আরামদায়ক পরিবেশে ড্রয়িং রুমে বসে ফাহাদ শেখ ও রঞ্জক শেখ টিভিতে খবর দেখছেন। এমন সময় ড্রয়িং রুমে আগমন ঘটে তোফায়েল শেখের।চার কোনার মতো ইউ আকৃতির সোফার মাঝে ফাহাদ শেখ ও একপাশের রঞ্জক শেখ বসেছেন।আর আরেক পাশে এসে বসলেন তোফায়েল শেখ।বড় ভাইকে দেখে একটু নড়েচড়ে বসলেন ফাহাদ শেখ।কিছুক্ষণ আগে রঞ্জক শেখের সাথে যে টুকটাক গল্প চলছিল সেটাও যেন বন্ধ হয়ে গেল।আগামী কিছু মুহূর্ত টিভির আওয়াজ ছাড়া কিছুই শোনা গেল না ড্রয়িং রুমের পরিবেশে।নীরবতা ভেঙ্গে তোফায়েল শেখই শুধালেন,
"রঞ্জক,খবরের কাগজটা দিতে বলতো"
ফাহাদ শেখের ঠিক সামনে টেবিলের উপরে রাখা খবরের কাগজটা দেখলেন রঞ্জক শেখ।পরপরই ফাহাদ শেখের দিকে দেখলেন।ফাহাদ শেখ টান টান হয়ে বসে আছেন।রঞ্জক শেখ কিছু সময় অপেক্ষা করলেন। নাহ্,ফাহাদ শেখের কোনো পরিবর্তন নেই।কোনো উপায় না দেখে রঞ্জক শেখই শান্ত স্বরে বললেন,
"মেঝো ভাইজান, বড় ভাইজানকে একটু খবরের কাগজটা দেন তো"
গম্ভীর চোখমুখ টিভির পাশে রেখেই খবরের কাগজটা তোফায়েল শেখের দিকে এগিয়ে ধরলেন ফাহাদ শেখ। তোফায়েল শেখও গম্ভীর মুখে খবরের কাগজটা টান দিয়ে নিয়ে চোখে চশমা লাগিয়ে কাগজের ভাঁজ খুললেন।অতঃপর খবরের কাগজে চোখ রেখেই শুধালেন তোফায়েল শেখ,
"তো রঞ্জক,তোমার কলেজের চাকরি কেমন চলছে?"
তোফায়েল শেখের প্রশ্নে হালকা মাথা দুলিয়ে উত্তর দিলেন রঞ্জক শেখ,
"আলহামদুলিল্লাহ ভাইজান,ভালো"
ক্ষণিক নীরবতার পর আড় চোখে ফাহাদ শেখকে দেখে মুখ বরাবর খবরের কাগজ তুলে শুধালেন তোফায়েল শেখ,
"আর মানুষের বিজনেস?"
তোফায়েল শেখ প্রশ্নটা কাকে করেছেন উপস্থিত তিনজনই জানেন।রঞ্জক শেখ ফাহাদ শেখের দিকে দেখলেন।অতঃপর মিনমিনিয়ে বললেন,
"ভাইজান কেমন চলছে বিজনেস?"
কাটকাট গলায় উত্তর দিলেন ফাহাদ শেখ,
"আগে যেমন চলতো তেমনি"
ফাহাদ শেখ উত্তরটা রঞ্জক শেখের দিকে দেখে দিলেও,কাকে উদ্দেশ্য করেছেন সেটা আবারো তিনজনই বুঝতে পারলেন।
খবরের কাগজ মুখ বরাবর রেখেই তোফায়েল শেখ শুধালেন,
"টেনেটুনে?"
তোফায়েল শেখের মুখে এমন কথা শুনে ভড়কে গেলেন ফাহাদ শেখ। রঞ্জক শেখ তো ওপাশে মার্বেলাকার চোখ বের করে বসে আছেন।ভড়কানো চেহারা স্বাভাবিক করে থমথমে গলায় বললেন ফাহাদ শেখ,
"হ্যাঁ,মানুষের চোখের পাওয়ারের মতো।রঞ্জক, তুই কি কখনো কাউকে এত কাছ থেকে খবরের কাগজ পড়তে দেখেছিলি?"
রঞ্জক শেখের নড়াচড়া একদম সূক্ষ্ম হয়ে গেল।দুই ভাইয়ের মাঝে আবার পি'ষতে চলেছেন তিনি।
ফট করে খবরের কাগজ মুখের সামনে থেকে সরিয়ে দাঁত কিড়মিড়িয়ে উঠলেন তোফায়েল শেখ। অতঃপর বউয়ের উদ্দেশ্যে হুং'কার ছাড়লেন,
"আমেনা!!এক কাপ চা দাও তো!"
তোফায়েল শেখের দিকে একনজর দেখে আবার টিভির দিকে ঘুরলেন ফাহাদ শেখ।অতঃপর তিনিও বউয়ের উদ্দেশ্যে হুং'কার দিয়ে উঠলেন,
"হেনা!!আজকে কি ভাগ্যে চা জুটবে?"
আমেনা শেখ ও হেনা শেখ স্বামীদের ডাকে পরপর কিছু সময় ব্যবধানের মাঝে রান্নাঘরে ঢুকলেন।ভাসুরদের হুং'কারে লতিফা শেখও দৌড়ে বেড়িয়ে এসেছেন রুম থেকে।রঞ্জক শেখ এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্ত্রীর দিকে ঘুরলে,
"আমাকেও একটু চা দিও তো"
লতিফা শেখ মাথা দুলিয়ে রান্নাঘরের উদ্দেশ্যে চলে গেলেন।
তোফায়েল শেখ খবরের কাগজ ঝেড়ে আবারও মুখে বরাবর ধরলেন,
"খবরের কাগজগুলোতেও এখন ভালো কিছু নেই। শুধু হরেক রকম ব্যবসা দিয়েই ভর্তি"
"তো খবরের কাগজ পড়তে বলেছে কে?"
তোফায়েল শেখের কথায় ফাহাদ শেখের প্রতিক্রিয়া শুনে রঞ্জক শেখ শুকনো ঢোক গিললেন।তার দুই ভাই ইন্ডিরেক্টলি ঝগড়া করছেন।খবরের কাগজ ধরে রাখা তোফায়েল শেখের হাতগুলো দৃঢ় হলো।তারপরেও ফাহাদ শেখের কথা গায়ে না মাখিয়ে স্বাভাবিক কণ্ঠেই বললেন তিনি,
"বুঝলে রঞ্জক,ওসব ব্যবসায়ীদের থেকে দূরে থাকিও। লাভের থেকে ক্ষতিই বেশি হবে তোমার"
তোফায়েল শেখের লবণ ছিটানো যেন কাজে লেগে গেল।ফাহাদ শেখ হালকা-পাতলা ফুসতে শুরু করেছেন ইতোমধ্যেই।তিনি কিছু বলার আগেই রঞ্জক শেখ বলে উঠলেন,
"না ভাইজান।সব বিজনেসম্যান অমন হয় না।মেঝো ভাইজানকে দেখলেই সেটা বোঝা যায়"
ফাহাদ শেখের গরম মেজাজটা যেন একটু ঠান্ডা হলো ছোট ভাইয়ের কথায়।কিন্তু সেটা যেন ক্ষণিকের করে দিলেন তার পাশে বসে থাকা বড় ভাই।তোফায়েল আবার বলে উঠলেন,
"ওসব চোখের ভুল"
এবার আর নিজেকে দমিয়ে রাখার সাধ্য হলো না ফাহাদ শেখের।তোফায়েল শেখের দিকে দেখে ঝাঁজিয়ে উঠলেন তিনি,
"নিজের চোখ ভালো নেই দেখে মানুষকে ভড়কাচ্ছেন কেন?"
খবরের কাগজ টেবিলের উপর শব্দ করে রেখে তোফায়েল শেখও ঝাজিয়ে উঠলেন,
"কথায় কথায় চোখের উপর যাও কেন?"
"আরে....ভাইজান.....থামেন তো....মেঝো ভাইজান ওটা বুঝাননি"
রঞ্জক শেখের ভাঙ্গা ভাঙ্গা গলায় কোনো কাজ হলো কিনা কে জানে? কিন্তু ফাহাদ শেখ টিভি আর তোফায়েল শেখ খবরের কাগজে মনোযোগ দিলেন। দুজনেই রা'গের চোটে ফুসছে এখনো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রান্নাঘরে প্রবেশ করে লতিফা শেখ একটু চকিত হলেন। তার বড় দুই জা দুই চুলায় চায়ের পানি বসিয়েছেন।এক ভারী নিঃশ্বাস ফেলে তিনি এগিয়ে গেলেন।এখন কি তাকেও আরো একটি পাতিল বসাতে হবে?
"ভাবি,দেন আমি চা বানাচ্ছি"
লতিফা শেখের কথায় আমেনা শেখ ও হেনা শেখ দুজনেই তার দিকে ঘুরলেন।তার সাথে একে অপরকে আড় চোখে দেখতে ভুললেন না তারা।
হেনা শেখ লতিফা শেখকে উদ্দেশ্য করে গম্ভীর গলায় বললেন,
"কাকে বলছিস?"
মেঝে জায়ের কথায় হালকা ভড়কালেন লতিফা শেখ।অতি কষ্টে মুখে হাসি নিয়ে শুধালেন,
"দুজনকেই বলছি"
"লাগবে না!"
একই সাথে দুজনে উত্তর দিয়ে আবার চা বানায় মনোযোগ দিলেন তারা।লতিফা শেখ হাল ছেড়ে দিয়ে আরো একটি চায়ের পাতিল চুলায় বসালেন।
একই উপকরণে তৈরি করা চা তিন জায়গায় বানালে যা হয় আরকি।রান্নাঘরে জগাখিচুড়ি শুরু হয়ে গিয়েছে।আর বেশি পরিশ্রম হচ্ছে লতিফা শেখের। কারণ আমেনা শেখের হাতে কিছু থাকলে সেটা যদি হেনা শেখের প্রয়োজন হয় তাহলে মাঝখানে লতিফা শেখ ডেলিভারি ওম্যান।তেমন উল্টোটা আমেনা শেখের ক্ষেত্রেও।দুই বড় জায়ের উপর কিছু বলতেও পারছেন না,আবার সহ্যও করতে পারছেন না।দাঁতে দাঁত পি'ষে শুধু এপাশ ওপাশ দৌড়াদৌড়ি করছেন লতিফা শেখ।
অবশেষে অনেক ধৈর্যের পর তিন পাতিল থেকে তিন কাপ চা বেরোলো।লতিফা শেখ ফটাফট কাপ তিনটা একটা ট্রেতে তুলে হাতে নিলেন,
"আমি দিয়ে আসছি"
বলেই তিনি রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে পড়লেন।কারণ তিনি চান না এই চা কে দিবে সেটা নিয়ে তর্ক হয়ে চা ঠান্ডা হয়ে যাক।তখন আরেক দফা তিন পাতিল চুলায় চা বসবে।লতিফা শেখ রান্নাঘর থেকে বের হতেই কল্পনা তার সামনে উড়ে এসে জুড়ে বসল,
"কই যাচ্ছো চাচী মা?"
লতিফা শেখ মুখ দিয়ে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে বললেন,
"এখন মাথা খাস না তো।যা এখান থেকে"
"বাবাদেরকে চা দিতে যাচ্ছো? দাও আমি দিচ্ছি"
লতিফা শেখের উত্তর না শুনেই কল্পনা ফট করে ট্রেটা হাতে নিল।
"এই মেয়ে।দাড়া দাড়া"
লতিফা শেখের তড়িঘড়ি ডাকে পেছনে ঘুরলো কল্পনা। লতিফা শেখ কল্পনার কাধ চেপে ধরলেন,
"কাপগুলো যেন ঠিক জায়গায় যায়"
বলে কোন কাপ কার কাছে যাবে সেটা দেখিয়ে দিলেন তিনি।কল্পনা 'ঠিকাছে' বলে নাচতে নাচতে ড্রয়িং রুমে গেল।
ড্রয়িং রুমের পরিবেশে কালো মেঘের ছায়া বিরাজ করছে।তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখ ক্ষণে ক্ষণে আড় চোখে একে অপরকে দেখছেন আর ফুসছেন। আর ওদিকে এক কোনায় রঞ্জক শেখ কাচুমাচু হয়ে বসে আছেন।রুমের পরিবেশ দেখে কল্পনার দাঁত বের করে উঁচু গলায় বলল,
"আমি চা নিয়ে এসেছি"
কল্পনাকে চা আনতে দেখে তোফায়েল শেখ একটু মুখ গম্ভীরই করলেন। কিন্তু কিছু বললেন না।কল্পনা তিন ভাইয়ের সামনে টেবিলে তিনটা কাপ রেখে রঞ্জক শেখের পাশে গিয়ে দাঁড়ালো।পরবর্তী কিছু সময়ের জন্য কোনো কথা হলো না।শুধু চা পানের তীক্ষ্ণ আওয়াজ আর টিভিতে লাগানো বিটিভি চ্যানেলে সবজির দামের বর্ণনা শুনতে পাওয়া গেল।
সবারই চা খাওয়া যখন একদম শেষের দিকে তখন কল্পনা রঞ্জক শেখের কাঁধে টোকা দিল। রঞ্জক শেখ তার পাশে দেখে একবার ভ্রু নাচালেন।কল্পনা চোখ দিয়ে বাকি দুই ভাইকে ইশারা করল।তাদের পাশে ঘুরে কিছু না বুঝে আবার কল্পনার দিকে দেখে ভ্রু জোড়া কুচকালের রঞ্জক শেখ।কল্পনা হাত দিয়ে চা পান করার ইশারা করে আবার তাদের দিকে ইশারা করল। রঞ্জক শেখ ভ্রু জোড়া উপরে তুললেন।বুঝেছেন তিনি। চা কেমন হয়েছে কল্পনা সেটা জিজ্ঞেস করতে বলছে। এমন প্রশ্নের কোনো মানে বুঝলেন না রঞ্জক শেখ। কিন্তু কল্পনার জোরাজোরিতে বাধ্য হয়েই বললেন,
"ভাইজান চা কেমন হয়েছে?"
"আমার বউয়ের বানানো চা আবার খারাপ হয়?"
কাকতালীয়ভাবে তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখ দুজনেই একই কথা বলে উঠলেন।যেটা কেউই আশা করেননি।কল্পনা তার বাম হাতের নেলের দিকে নজর রেখেই বলল,
"ভাইয়ের বউয়ের হাতের চা আবার ভালো কেন লাগবে না?"
"মানে?"
"মানে?"
"এ্যা?"
বয়সের দিক দিয়ে সিরিয়ালি তিন ভাই কথাগুলো বলে উঠলেন।রঞ্জক শেখ তো সেই 'এ্যা' বলতে নিয়েই ফ্যালফ্যাল করে কল্পনার দিকে ঘুরলেন।এই মেয়েটা কি হাড়িতে ভে'জাল না মিশিয়ে চুপ থাকতে পারে না? কিছু সময় আগে থামা ঝড় মনে হয় আবার শুরু হতে যাচ্ছে।পরবর্তীতে এই মেয়েটা মুখ দিয়ে যে কি বের করবে আল্লাহ মাবুদই জানেন। কল্পনা তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখের দিকে দেখে একটা শব্দহীন প্রাণ উজ্জ্বল হাসি দিল,
"না মানে তিনজনকেই চা বানাতে দেখলাম তো,তাই বললাম"
ফাহাদ শেখ ও তোফায়েল শেখ আর কোনো প্রতিক্রিয়া করলেন না।কারণ তাদের হুং'কারেই তো বাড়ির তিন গিন্নি হুড়মুড়িয়ে রান্নাঘরে ঢুকেছিলেন।ভাইদের স্বাভাবিক থাকা দেখে রঞ্জক শেখ লুকিয়ে স্বস্থির নিঃশ্বাস ফেললেন।
এমন সময় ব্র্যান্ডেড ব্ল্যাক ডার্বি সু জুতার খটখট আওয়াজ তুলে বাড়িতে প্রবেশ করল সাহিত্য। কচুপাতা রঙ্গের শার্ট পরা এক হাতে কালো ব্লেজারটা ভাঁজ করে নেয়া।চোখে-মুখে তার ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট। হঠাৎ দেশে ফিরে কোম্পানিটা এখান থেকে টেক কেয়ার করতে একটু অসুবিধাই হচ্ছে তার। দিনরাত এক করে দিয়েছে ছেলেটা।কিন্তু আশা করছে এক-দুই মাস পর স্বাভাবিক হয়ে যাবে।
সাহিত্যের যাওয়ার দিকে ড্যাব ড্যাব করে দেখে আছে কল্পনা।এই সুঠাম দেহি ছয় ফিট ওয়ালাটা দেখতে এতো মা'রা'ত্মক কেন?তার ওপর পরনের নামি-দামি ব্র্যান্ডেড আবরণগুলো যেন সাহিত্যের আভিজাত্যকে আরো কয়েক ধাপ বাড়িয়ে দিয়েছে।চেহারায় হাজার ক্লান্তির ছাপ থাকার পরেও যেন কোনো এক কোণা থেকে পুরুষালী সৌন্দর্যটা ফুটে উঠছে তার।কল্পনা একটা হতাশার নিঃশ্বাস ছাড়লো সেপাশ থেকে নজর ঘোরাতে নিয়ে।এরকম একটা প'টা'কা চাচাতো ভাই থাকতেও ভাগ্য যেন তার সাথে নেই।সাহিত্যকে তার থেকে ৯ বছরের বড় হতে হবে?একটু ছোট হলে কি এমন পা'প করে ফেলতো?নিজের ভাগ্যকে কড়া করে ধিক্কার জানালো কল্পনা।
ছেলের চেহারায় ক্লান্তির ছাপ দেখে আমেনা শেখ এগিয়ে এলেন,
"কফি বানিয়ে দেব?"
ক্লান্ত চেহারায় মলিন হাসি নিয়ে উপর-নিচ মাথা ঝাকালো সাহিত্য।ছেলের অবস্থা দেখে মায়া হলো আমেনা শেখের,
"এত পরিশ্রম করলে তো অসুস্থ হয়ে যাবি"
ছেলের কপালের ঘাম শাড়ির আঁচলে নিতে নিয়েই কথাটা বললেন তিনি।
"আমার কথা না শুনলে যা হয় আরকি।বলেছিলাম ইঞ্জিনিয়ারিং পড়ো।না শুনে এখন ভুক্তভোগী হচ্ছে"
তোফায়েল শেখের কথায় সবার নজর তার দিকে গেল।অতঃপর সাহিত্য শান্ত স্বরে বলল,
"তুমি মনে হয় ইঞ্জিনিয়ারিং করে খুব বসে বসে খাচ্ছো?অফিস দৌড়াতেই তো দিন যায় তোমার।ওই বিকালে যা একটু ফাঁকা থাকো"
তোফায়েল শেখের মুখের উপর সাহিত্য ঠকাস করে কথা বলায় উপস্থিত সবাই তম্বা খেয়ে গেল।ফাহাদ শেখের খুড়খুড়িয়ে হাসি পাচ্ছে।কারণ হয়তো এতক্ষণ থেকে যার সাথে ঝ'গড়া করছিলেন কেউ একজন তার মুখের ওপর বলেছে,নয়তো বিজনেস শুরু করার সময় তিনি যেটা বলতে পারেননি সাহিত্য আজ সেটা বলে দিয়েছে।কিন্তু পরিস্থিতি দেখে হাসিটা বের হতে দিলেন না,গিলে খেলেন।
তোফায়েল শেখ যেন ছেলের কথা শুনে সপ্ত আসমান থেকে পড়লেন।রা'গে ফুসতে-ফুসতে সাহিত্যকে বললেন,
"কি একটু বিজনেস সামলাচ্ছো দেখে এমন কথা? তোমাদের বিজনেসম্যানদের এত বেশি দাপট কি জন্য?"
"প্রথমত,আমাকে আশেপাশের যেনতেন বিজনেসম্যানের সাথে তুলনা করবে না।দ্বিতীয়ত, আমার বিজনেস থেকে যত দূরে থাকবে তোমার জন্য তত ভালো হবে"
ঠান্ডা গলায় কথাগুলো বলে গড়গড় করে সিড়ির দিকে হাঁটা দিল সাহিত্য।
ফাহাদ শেখ আবার রে'গে গেলেন।বাবা ছেলে দুজনেই যে তাকে নির্দেশ করছে সেটা ভালো করেই বুঝলেন তিনি।
সাহিত্য যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল তোফায়েল শেখ হা হয়ে এখনো সেখানেই দেখে আছেন।ছেলের কথায় কেমন প্রতিক্রিয়া করবেন বুঝতে পারছেন না তিনি।দেশে ফিরে তাকে যখন সাহিত্য অফিসে নিয়ে গিয়েছিল তিনি ভেবেছিলেন ছেলেটা মনে হয় এবার একটু বাবার বাধ্য ছেলে হবে।কিন্তু কিসের কি?ওটা তো শুধু তেল মাখানো ছিল।আজকের কথাবার্তা দেখে তো সেটাই মনে হচ্ছে এখন।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
রুমে ঢুকেই সাহিত্য আগে এসিটা অন করে দিল। ব্লেজারটা হ্যাঙ্গারে রাখতে গিয়ে রুমের এক কোণে পরিপাটি করে গোছানোর রং-তুলি ও ক্যানভাসগুলোর দিকে চোখ পড়ল তার।দেশে ফেরার পর থেকে একবারও সেগুলো ছুঁয়ে দেখতে পারেনি।এত ব্যস্ততার মাঝে ঘুমই ভাগ্যে জোটা বিরল আবার পেইন্টিং কখন করবে?তার উপর কল্পনা দিনরাত উঠতে-বসতে মাথাটা চিবিয়ে খাচ্ছে।একমাত্র কল্পনা যখন ভার্সিটিতে আর সাহিত্য যখন অফিসে তখন একটু রেহাই পাওয়া যায়।মেয়েটার জেদটা একটুও কমেনি। উল্টো আরো চালাক হয়েছে বেশি। অতি সুন্দরী এই মেয়েকে দেখে যতই শান্ত ও বোকা মনে হয়,তার থেকে শত গুনে বেশি চঞ্চল ও চতুর।
"একদম আগের মতোই আছিস তুই"
ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি নিয়ে আনমনে কথাটা বলল সাহিত্য।হঠাৎ সামনের বড় আয়নার পাশে দেখে ভড়কে গেল সে।আয়নায় দেখা মিলল তার চেহারার কোমলতার ছাপ। মুখে একরাশ মধুমাখা হাসি।যেন কোনো আপনজনের কথা ভাবায় এক প্রশান্তির ছায়া তার উপর বিরাজ করছে।পরমুহূর্তেই ভঙ্গিমা পাল্টে গেল তার।চোয়াল শক্ত হয়ে চোখ জোড়া তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।এত বছরের ঘৃ'ণা এত সহজেই চলে যেতে পারে না। কখনোই না!কিন্তু এত দ্বিধায় কেন ভুগছে সাহিত্য?সে তো কল্পনাকে ঘৃ'ণা করে,তাই না? তাহলে কল্পনাকে দেখলেই বারবার সেই ছোট্ট মেয়েটার চেহারা কেন ভেসে উঠে তার চোখের সামনে?যাকে সে এক সময় অনেক কাছে রেখেছিল।যার এক ডাকে সাহিত্য মোমের মতো গলে যেত।
চোখ বন্ধ করে বড় বড় নিঃশ্বাস ফেলে নিজেকে সংযত করার চেষ্টা করল সাহিত্য।কিন্তু পারল না।ছোট বাচ্চা মেয়েটি খিলখিলিয়ে প্রাণ উজ্জ্বলভাবে হেসে যাচ্ছে তার সামনে।এই দৃশ্য যেন চেয়েও মস্তিষ্ক থেকে সরাতে পারছে না সে।চোখ জোড়া খুলে পাশে থাকা চেয়ারটাতে সজোরে লাথি মা'রলো সাহিত্য।অতঃপর আয়নায় সরাসরি নিজের অক্ষি জোড়ায় দেখে দাঁতের পাটি চেপে বিড়বিড় করে শুধালো সে,
"বের হয়ে যা আমার জীবন থেকে।তোর কোনো দরকার নেই আমার"
#চলবে