ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৮ম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৮

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

"বেশি কিছু না।আপাতত এটা পড়লেই হবে"

কল্পনার কথায় দাদী-নাতি দুজনেই ভ্রু জোড়া কুচকালো।কুচকানো ভ্রু নিয়েই মহুয়া বেগম কল্পনার দিকে ও সাহিত্য কল্পনার হাতের চিঠির দিকে দেখল।

দাদীর কুচকানো ভ্রু দেখে কল্পনা দুই চোখ টিপে তাকে শান্ত থাকতে বলল।চিঠিটা দেখে যেন সাহিত্যের রা'গটা সিঁড়ি বাদ দিয়ে লিফটের মাধ্যমে উপরে উঠতে লাগল বর্তমানে।

'আই ফা'কিং সোয়্যার,তোর গলা টিপে মা'রবো আমি'

মনে মনে বাক্যটা উচ্চারণ করলেও বাইরে কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না সাহিত্য।চোখ তুলে দাদীর পাশে দেখতে লাগল সে।

"কি হলো?নে"

মহুয়া বেগম শান্ত কিন্তু দৃঢ় কন্ঠে বলে উঠলেন।

কল্পনার পরবর্তী ধাপটা মনে হয় এখনই বলে দেওয়া উচিত।কে জানে,পরে যদি আবার না মানে?হালকা গলা পরিষ্কার করে শুধালো কল্পনা,

"শুধু এটা নয়,আমার দেওয়া ১৫ টা চিঠির মধ্যে শুধু শেষেরটা পড়েছেন আপনি।তাই এখন বাকি ১৪টা চিঠিই পড়তে হবে।প্রতিদিন একটা করে দিব.....প্লিজ একটু পড়িয়েন।অনেক আবেগ নিয়ে লিখেছিলাম"

শেষের কথাটুকুতে যেন কল্পনার গলার জোর হারিয়ে গেল।কিন্তু সাহিত্য এখনো ঠায় মহুয়া বেগমের দিকে দেখে আছে।সাহিত্যের এমন অনুভূতিহীন চাহনির কারণ বুঝতে অক্ষম হলেন না মহুয়া বেগম।মানুষের ভেতরে যখন একই সঙ্গে একাধিক অনুভূতি কাজ করে তখন বাইরে কোনটারই প্রকাশ না ঘটে পানশে রূপ ধারণ করে। যেটা সাহিত্যের চোখে স্পষ্ট।কিন্তু সাহিত্য কি সেটা নিজে বুঝছে?হয়তো না।

মহুয়া বেগম সাহিত্যের চাহনি সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে শান্ত স্বরে হুকুমের ধাচে শুধালেন,

"আমি যেন না দেখি কল্পনা চিঠির ব্যাপারে আমার কাছে কোনো নালিশ নিয়ে এসেছে"

ছোট থেকে দাদীকে ভালোবাসা আর সম্মান মনে হয় একটু বেশিই দেওয়া হয়ে গিয়েছে সাহিত্যের। যার দরুণ আজকে দাদীর কথার উপরে জোর খাটাতে পারছে না সে।না হলে যে তার দাদী আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়বেন।কল্পনার দিকে না দেখেই ছো মে'রে চিঠিটা নিয়ে হনহনিয়ে রুম থেকে বেরিয়ে গেল সাহিত্য।কল্পনার মুখে যু'দ্ধ জয়ের হাসি ফুটছে।নাতনির কর্মকাণ্ডে মহুয়া বেগম আবার ভ্রু

কুচকালেন,

"ওই চিঠিগুলো এখন পড়িয়ে কি করবি?"

মুখের যু'দ্ধজয়ের হাসি কমিয়ে দাদীর দিকে ঘুরলো কল্পনা,

"শোনো।শি'কার ধরতে হলে একবারে ধরা যায় না। আগে আদর করতে হয়,খাওয়াতে হয় তারপর না তোমার কথা শুনবে"

পরমুহূর্তেই এক স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লো কল্পনা,

"বিশ্বাস করো দাদী,ঐদিন সাহিত্য ভাই যখন আমাকে চিঠি পাঠানোর কথা বলেছিলেন তার চোখে মুখে কত আনন্দ ছিল,জানো! আমার কেন জানি মনে হচ্ছে চিঠিগুলো খুলে পড়লে তার অযৌক্তিক রা'গটা একটু হলেও কমবে"

মহুয়া বেগম মৃদু ঠোঁট বাকালেন।কল্পনা যেন না জেনেই নিজের প্রতি সাহিত্যের রা'গটা ভাঙ্গানোর চেষ্টা করছে।এতে যদি কাজ হয় তাহলে মহুয়া বেগমের কোনো আপত্তি নেই।কোমল কন্ঠে শুধালেন

তিনি,

"সাহিত্যের অনেক স্মৃতি তোর মনে আছে,তাই না?"

কোমল দৃষ্টিতে দাদীর পাশে দেখতে লাগল

কল্পনা,

"সাহিত্য ভাইয়ের সব স্মৃতিই আমার মনে আছে দাদী। সাহিত্য ভাইয়ের সাথে কাটানো স্মৃতি কি আমি এত সহজে ভুলতে পারি?প্রত্যেক ক্ষণে ক্ষণে স্মরণ করি তাদের।এই ১১টা বছর প্রায় সময় যখনই তার রুমে গিয়ে থাকতাম তখন আপনাআপনি সব চোখের সামনে ভেসে উঠতো।তাহলে ভুলবো টা কখন?"

নাতনির এমন আবেগ মাখা কথায় মৃদু হেসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন মহুয়া বেগম।হয়তোবা চোখের জল ঢাকতেই দাদীর শুভ্রা রাঙ্গা শাড়ির কোলে মুখ গুজে দিল কল্পনা।কল্পনার লুকানো নোনাজলের ব্যাপারে বুঝতে পেরেই নাতনির মাথায় আলতো করে হাত বোলাতে লাগলেন মহুয়া বেগম।আল্লাহ মাবুদ যেন বাচ্চাগুলোকে বড়দের শা'স্তি না দেন সেই প্রার্থনাই করলেন তিনি মনে মনে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

মহুয়া বেগমের রুম থেকে বেরিয়ে বড় বড় পা ফেলে সিঁড়ির দিকে এগোতে লাগলো সাহিত্য।ডাইনিং টেবিলে রাখা কফিটা এখনো ঠান্ডা হয়নি। হালকা ধোঁয়া উঠছে সেটা থেকে।সাহিত্য পাশ কেটে যাওয়ায় সেই ধোয়ার গতিটা একটু বেঁকেই গেল বটে।কিন্তু সে ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে সাহিত্য নিজ উদ্যমে তার রুমে চলে এলো।

সবেগে রুমের দরজাটা লাগিয়ে স্টাডি টেবিলে থাবা দিয়েই চিঠিটা রাখলো সাহিত্য।পরপর দুটি বাজখাই শব্দের পর রুমে যেন ভাটা পড়েছে।শুধু সাহিত্যের বড় বড় শ্বাস ফেলার শব্দই বাতাসে ভাসছে।নিজেকে সংযত করতে বিছানায় বসে পড়ল সে।শরীরের মাংসপিণ্ডগুলোও যেন থরথরিয়ে কাপছে তার।রা'গটা যেমন তরতর করে উঠছে তেমন মনের কোনো এক কোণে ভ'য়টাও যেন উঁকি দিচ্ছে।কিসের ভ'য় করছে সাহিত্য? ওই বাচ্চা মেয়েটার স্মৃতিগুলোকে?নাকি বর্তমানের অষ্টাদশীকে?কেনই বা ভ'য় করছে?নিজের রা'গ দমাতে না পারায়? নাকি অন্য অনুভূতি?উত্তর পেলোনা সাহিত্য।হাল ছেড়ে দিল সে।শরীরের সম্পূর্ণ ভার বিছানাটাকে চুষে নিতে দিল।মগজটা প্রতিবারের মতো এবারও ফাঁকা হয়ে গেল এই ব্যাপারে চিন্তা করতে গিয়ে।

ফোনের রিংটোনে আশেপাশের ভ্রমের পর্দাটা ছিড়ে গেল সাহিত্যের।পকেট থেকে ফোনটা বের করে কানে চেপে ধরলো,

"হুম,বল"

এই সময় কার কল দেওয়ার কথা ছিল জানা আছে সাহিত্যের।ফোনের ওপাশ থেকে ভিকি মুখে হাসি নিয়ে শুধালো,

"কীইইই?অফিসের কাজ করতে দুই মাসেই হাওয়া বেরিয়ে গিয়েছে?"

"ভাই অফিসের কাজও আমাকে এতটা প্যারা দেয় না যতটা ওই ফা'কিং জিনিসটা আমাকে দেয়"

চোখ বন্ধ করেই তপ্ত স্বরেই কথাটা বলল সাহিত্য।

ভিকির হাসিটা যেন মিলিয়ে গেল না,

"কি,তোর নাইটমেয়ার?এখন তো সামনেই ঘুরঘুর করছে।তারপরেও স্বপ্নে আসে?"

"দেশে ফেরার পর থেকে ঘুমাতেই পারলাম কই যে স্বপ্নে দেখবো?তাই তো মনে হয় সামনে এসে উঠে পড়ে লেগেছে একদম"

সাহিত্যের গম্ভীর গলার কথায় ভিকি যেন একটু মজাই পেল।হেসে উঠলো সে,

"এখন আবার কি করেছে?"

ভাব ভঙ্গিমা না বদলেই সাহিত্য শুধালো,

"যে চিঠিগুলো পাঠিয়েছিল ওগুলা নাকি আবার পড়তে হবে।সেটা আবার দাদীকে দিয়ে বলিয়েছে"

সাহিত্যের কথায় এবার ভিকি হো হো করেই হেসে উঠলো,

"মানতেই হবে।মেয়ের সাহস আছে।আর কেনই বা থাকবে না?অহিয়াম শেখ সাহিত্যের নাইটমেয়ার হওয়ার উপাধি পেয়েছে সে"

সাহিত্যের বর্তমানে রা'গ ওঠার এনার্জিটুকুও নেই। কেমন গা ঝাড়া ভাব নিয়ে বিছানায় শুয়ে আছে।অতঃপর ভিকির উদ্দেশ্যে গম্ভীর কন্ঠে বলল,

"উপাধি মাই ফুট।জানে মে'রে ফেলবো ওটাকে।পারব না ওর বা'লের চিঠি পড়তে"

এবার যেন ভিকির হাসিটা কমে এলো।ধীর স্থির ভাবেই শুধালো সে,

"চিঠিগুলো পড়তে কি সমস্যা?তখন পড়িসনি,এখন পড়ে নে।তোর নাইটমেয়ারও মাথাটা কম চাবাবে আর তোর দাদীও ঠিক থাকবে"

ভিকির কথা শুনে আনমনে কি যেন চিন্তা করল সাহিত্য।অতঃপর কোনো কথা না বলেই কল কে'টে দিল সে।

লিসা এতক্ষন সোফায় বসে বসে ভিকির হাহা-হিহি দেখছিল।কানাডায় এখন রাত ২দুটো বাজছে,অথচ লিসা আর ভিকি এখনো অফিসের কিছু কাজে অফিসেই আটকা পড়ে আছে।সাহিত্য দেশে ফেরার কারণে যেন ভিকি আর লিসাকে একটু বেশিই নজর রাখতে হচ্ছে অফিসের কাজগুলোতে।কিন্তু ক্ষণিক আগে ঘুমের মধ্যে টুপতে থাকা ভিকির মুখে এই মুহুর্তে হাসি দেখে খুব আগ্রহ নিয়েই ভিকিকে জিজ্ঞেস করল লিসা,

"কি হয়েছে স্যার?অহি স্যারের কি কোনো প্রবলেম হয়েছে?"

ভিকি নাক-মুখ কুঁচকালো,

"তোরে আর কতবার করে বলবো লিসা?অহি গিয়েছে,তার সাথে ওর পি.এ. হওয়ার তোর পদবিও গিয়েছে।ওরে অহি বলে ডাকবি"

এবার লিসাও নাক-মুখ কুচকালো,

"বললেই আর হলো নাকি?উনি আমার স্যার হয় স্যারই ডাকবো আমি"

পেপার ওয়েটটা হাতে তুলে ভিকি লিসার দিকে ছুঁড়ে মা'রার ভান করলো,

"আর একবার যদি ওকে স্যার ডেকেছিস তাহলে তোর এই প্রেজেন্ট স্যার তোর পি.এ. এর চাকরি খেয়ে ফেলবে"

সাহিত্য ও ভিকি লিসাকে বরাবরই ছোট বোনের মতো আদর করে।সেই দিক দিয়ে সাহিত্য ভিকিকে আগেই বলে দিয়েছিল,'তোর নতুন পি.এ. যেন শুধু তোকে স্যার ডাকে।আমাকে স্যার স্যার করে ডাকলে বড় ভাইয়ের মতো গালে দুটো চড় বসাতে পারবো না'

ভিকির হঠাৎ পেপার ওয়েট উঠায় হালকা ভড়কে উঠল লিসা।ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে শুধালো,

"আচ্ছা, ঠিক আছে ঠিক আছে,বলব না......কিন্তু আমার প্রশ্নের উত্তরটা তো দিলেন না।ওদিকে কোনো প্রবলেম হয়েছে নাকি?"

পেপার ওয়েটটা টেবিলের রেখে আবার হেসে উঠলো ভিকি,

"তোর পোস্ট বস তার নাইটমেয়ারকে ডিল করছে।যে ব্যক্তি পুরো কানাডা কাঁপিয়ে বেড়াতো,সে তার নাইটমেয়ারের সামনে কাবু হয়ে গিয়েছে একদম"

ভিকির কথা লিসার মাথায় কিছুই ঢুকলো না।অতঃপর ভ্রু জোড়া কুচকিয়ে বসে থাকলো সে।

ভিকির কল কেটে দিয়ে উঠে বসলো সাহিত্য।রা'গটা মাত্রাতিরিক্ত হওয়ায় একটু বেশিই হাসফাস লাগছে তার। মাথাটা একটু কন্ট্রোলে আনা দরকার এই মুহূর্তে।

স্টাডি টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা সি'গা'রে'ট আর লাইটার নিয়ে বেলকনির দিকে এগিয়ে গেল সাহিত্য।দুপুরের তপ্ত রোদে আ'গুন শিখা জ্বা'লিয়ে সি'গা'রে'টের এক প্রান্ত পু'ড়ালো। চোখের মনি ঘোরাতেই দূরে থাকা স্টাডি টেবিলের উপরে চিঠিটার দিকে আড় চোখ গেল সাহিত্যের।ক্ষণিকের দৃষ্টি রেখে সেপাশ থেকে চোখ ঘুরিয়ে নিয়ে নি'কো'টি'নের ধোয়ার কুণ্ডলী ছাড়লো সে।ক্যানভাসে হাত দেওয়ার কথা যেন মুহূর্তেই বিলীন হয়ে গেল তার নাইটমেয়ারের চিন্তায়।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সহজ সরল জীবনকে মানুষ মাত্রই কঠিন বানিয়ে রাখে।যার জলজ্যান্ত উদাহরণ হচ্ছে ভার্সিটির লেকচারারগুলো।এটা কল্পনার ধারণা। যেই টপিক প্রয়োজন নেই সেই টপিকের উপর বে'হুদা লেকচার দিয়ে সময় নষ্ট করার কোনো মানে হয়?সেটার প্রতিবাদ করতেই কল্পনা এগিয়ে গিয়েছিল "স্যার এটার থেকে এই টপিকটা বেশি প্রয়োজনীয়" ব্যাস! বের করে দিল প্রীতি আর কল্পনাকে। পরীক্ষায় যদি সেই টপিক থাকতো তাহলে অবশ্যই কল্পনা চুপ থাকতো। কিন্তু গত পরীক্ষার আগে যতগুলো টপিক পড়িয়েছে প্রায়গুলো থেকেই প্রশ্ন দেয়নি এই হাঁ'দারা'ম স্যারটা।বইয়ের অন্য টপিক ঢুকিয়ে দিয়েছিল।ওনাকে কিছু বলতে গেলেই এক কথা "তোমরা কিছু পড়ো না, আর আমাকে কেন দো'ষ দিচ্ছো?" মাঝে মাঝে তো কল্পনার ইচ্ছে করে টাক বেলটাতে ব্রিম করে একটা ঘু'ষি মা'রতে।

"তোকে মুখটা খুলতে বলেছিল কে?নিজে তো বের হলি সাথে আমাকেও টানলি"

কল্পনার স্ট্র দিয়ে জুস খাওয়াতে বিরতি পড়ল প্রীতির তেতে ওঠা কথায়।স্যার কল্পনাকে বের হতে বলায় কল্পনা প্রীতির হাত ধরে উঠে দাঁড়ায়।স্যার জিজ্ঞেস করলে কল্পনা বলে প্রীতিই তাকে বলতে বলেছিল।যার দরুন দুজনেই এখন ভবঘুরের মতো ক্যাম্পাস ঘুরছে।প্রীতির তেতে ওঠা কোথায় কল্পনা চোখ উল্টিয়ে গা ঝাড়া ভাব নিয়ে বলল,

"আমি ক্যাম্পাসের হাওয়া খাবো আর তুই ওখানে মরবি,এটা হতে পারে?"

কল্পনার পিরিত মাখা কথায় প্রীতি আমতা আমতা করতে লাগলো।বুঝে উঠল না যে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে ভালো করেছো না খা'রা'প করেছে।প্রীতির এলোমেলো আচরণের থেকে নজর সরিয়ে ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়ে আবার স্ট্র মুখে দিল কল্পনা।কিন্তু এবারও যেন ক্ষণিকের জন্যই ছিল সেটা।ব্যাগের মধ্যে বাজতে থাকা ফোনটা বের করার জন্য আবার মুখ থেকে স্ট্রটা সরালো।ফোন বের করতেই চোখে পড়ল একটা আননোন নাম্বার।সহসা কলটা রিসিভ করে সালাম দিল কল্পনা।হয়তো ওপাশ থেকে কারো কন্ঠ শোনা গেল।যার দরুন পত্রযুগল থমকে গেল তার। প্রীতিও তার বেগ কমিয়ে পেছনে কল্পনার দিকে দেখল।তির তির করে কাঁপছে কল্পনার ঠোঁট জোড়া। চোখে-মুখে যেন রা'গ ও ভ'য়ের মিশ্রণ দেখা দিচ্ছে মেয়েটার।প্রীতি কাছে আসতেই ক্ষীণ আওয়াজ শুনতে পেল সে।ওপাশের ব্যক্তি কল্পনার নাম ধরে ডেকেই যাচ্ছে।মূর্তির মতো ক্ষণিক মুহূর্ত থেকে তড়িঘড়ি করে কলটা কে'টে দিল কল্পনা।কিন্তু তবুও যেন মেয়েটা এখনো নিজেকে শান্ত করতে পারছে না।বন্ধ ফোনের স্ক্রিনের পাশে দেখে আছে সে।প্রীতি কাঁধে হাত রাখতেই হুশ ফিরল তার।

শান্ত স্বরে বলল প্রীতি,

"ওই ছাগলটা?"

প্রীতির কথায় উপর-নিচ মাথা ঝাকালো কল্পনা।এক বিরক্তির নিঃশ্বাস ফেলে শুধালো প্রীতি,

"এতদিনেও কাল সা'পের মতো পিছনে কেন ঘুরছে? যখন ন'ষ্টামো করেছিল তখন হুশ ছিল না?এখন আলগা পিরিত দেখাচ্ছে কেন?"

আবার কল্পনার ফোনটা বেজে উঠলো।একই নাম্বার।কল্পনা ফোনটা সাইলেন্ট করে রেখে দিল।প্রীতি তেতে উঠল,

"আমাকে দে ফোনটা।ওর বি'ষ আমি বের করছি"

"বাদ দে তো।আর তো কোনো ক্লাস নেই। চল বাসায় চলে যাই"

প্রীতির ডান হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা ঠেকিয়ে কথাটা বলল কল্পনা।প্রীতি আর কোনো কথা বলল না।ওসব কু'লক্ষ'ণের কথা যত মুখে আনবে তত ম'ন্দ।

ভার্সিটির গেট পার হতেই সটান দাড়িয়ে পড়লো কল্পনা,যেন ভুত দেখেছে সে।ফোনে কল করা ব্যক্তিটাকে হঠাৎ এমন সামনে দেখবে আশা করেনি সে কখনো।কল্পনার দৃষ্টি অনুসরণ করে প্রীতি সামনে দেখল।এক ছেলে রাস্তার ওপাশে দাঁড়িয়ে তাদেরকেই দেখছে।প্রীতি কল্পনার দিকে দেখল,

"এটা রাতুল?"

নজর প্রীতির দিকে ঘুরালো কল্পনা।শান্ত স্বরে বলল,

"হ্যাঁ"

অমনি যেন প্রীতির রা'গটা চরকিতে করে মাথায় উঠে গেল।ততক্ষণে ছেলেটা রাস্তা পার হয়ে তাদের দিকেই আসতে শুরু করেছে।ক্ষ্যা'পা চাহনি নিয়ে প্রীতি আগাতে গেলেই কল্পনা তাকে থামিয়ে দেয়,

"তুই এখানে দাঁড়া,আমি আসছি"

"ওই ছাগলটার সাথে তুই এখন কথা বলবি?"

"শেষবারের মতো ওয়ার্নিং দিব তাকে"

মৃদুস্বরে বলেই কল্পনা রাতুলের দিকে এগিয়ে গেল।

কল্পনাকে কাছে আসতে দেখে মুখে বড়সড় এক হাসি নিয়ে শুধালো রাতুল,

"কতক্ষণ থেকে কল দিচ্ছি।রিসিভ করছো না কেন?"

কল্পনা কাট কাট গলায় বলল,

"আমি মনে হয় আপনাকে বলেছিলাম আমার সাথে আর কন্টাক্ট করার চেষ্টা করবেন না"

হাসিটা যেন মিলিয়ে গেল রাতুলের,

"কেন অমন করে বলছো?অতটুকু ভুলের শা'স্তি এখনো কেন দিচ্ছো আমাকে?"

"আপনার কাছে ওটা সামান্য হবে,কিন্তু আমার কাছে না।আপনি যদি বেশি বাড়াবাড়ি করেন তাহলে আমি কিন্তু পুলিশ কে'স করতে বাধ্য হবো"

ভড়কালো রাতুল,

"এতটুকু ঝগড়ায় তুমি পুলিশকে টানছো কেন?আমি তো সরি বলেছি।আমাকে মাফ করে দেওয়ার মতো ভালোবাসাটাও কি তোমার মাঝে নেই?"

"আমি আপনাকে আর কতবার বলবো,আমি আপনাকে ভালোবাসি না,বাসতামও না।সেটা শুধুই আমার ক্ষনিকের মোহ ছিল"

পরক্ষণেই রাতুলের ভাব ভঙ্গিমা বদলে চোয়াল দুটো শক্ত হয়ে গেল,

"এই।ঠিক করে বলতো,কোন নতুন দা'ম'ড়া তোর জীবনে ঢুকেছে?আমাকে হাত দিতে দিচ্ছিলি না ওকে হাত দিতে দিচ্ছিস?খুব দরদ উৎলাচ্ছে তার জন্য?"

রাতুলের নোং'রা'মো কোথায় হালকা চকিত হলো কল্পনা।অতঃপর এবার গলার মধ্যে রা'গ মিশ্রিত হলো তার,

"ভদ্রভাবে কথা বলেন।আমি কোনো পুতুল না যে আপনার কথায় চলবো।আর বেশি অভদ্রতা করলে মনে হয় না আপনার অজানা আছে আমি কি করতে পারি।যেটার জন্য ক্ষমা চাইতে এসেছেন আবার ওই কাজেরই ফল ভাগ্যে জুটাতে চাইছেন?"

কল্পনার কথাটা যেন রাতুলের আত্ম সম্মানে লাগলো।গলা উচিঁয়ে কিছু বলতে যাচ্ছিল সে।কিন্তু তার আগেই প্রীতি কল্পনার সামনে এসে দাঁড়ালো,

"খবরদার, একটা কথা যদি মুখ থেকে বেরিয়েছে, মানুষ জড়ো করে দেবো একদম"

কিছুক্ষণ শক্ত নজরে প্রীতির দিকে দেখে থাকলো রাতুল।তারপরে কল্পনার দিকে দেখলো।রা'গের তোপে ফুসছে কল্পনা।পরিস্থিতি হাতের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছে বুঝতে পেরেই রাতুল আর কোনো কথা না বলেই পেছনে ঘুরে হনহনিয়ে চলে গেল।

প্রীতি ফুসতে নিয়েই কল্পনার দিকে ঘুরলো,

"শোন!যদি কোনদিন শুনেছিস ওই কাল সা'পটার মা'র্ডার হয়েছে,তাহলে বুঝেনিস সেটা আমিই করেছি"

প্রীতির এহেন কথায় কল্পনা হো হো করে হেসে উঠল। প্রীতি তার দিকে দেখে হেসে হালকা ঠোঁট বাকালো।এই মেয়েটা নিজের কষ্ট মুহুর্তেই এক মুখোশের নিচে ঢেকে রাখতে পারে।যেমন এই যে, কেমন প্রীতির সামনে দাঁড়িয়ে হাসছে।কিন্তু আসলে যে শুকনো ফুলের মতো অবস্থা হয়ে আছে তার মনটার।প্রীতি কল্পনার কাধ চেপে ধরল,

"চল।এই খুশিতে আমি আজ ভেলপুরির ট্রিট দিবো"

কল্পনা ভ্রু জোড়া কুচকালো,

"কোন খুশিতে?"

"আমার ফার্স্ট মা'র্ডার কে'সের"

আবার হাসিতে ফেটে পড়লো কল্পনা,সাথে প্রীতিও হাসতে লাগলো।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আলিশানি কেবিনটায় সাদা পরিস্কার চার দেয়াল। সেটার সাথে সামঞ্জস্য রেখেই মনে হয় রুমের প্রত্যেকটি কোণা কালো আসবাবপত্র দিয়ে সাজানো। একপাশে লেদার ত্রি সিট সোফা,আর তার সামনে একটি টি-টেবিল।অ্যাটাস্ট বাথরুমটার ঠিক সোজা বিপরীত সামনে দেয়ালের কাছে গা ঘেষিয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা বড় কালো ফুলদানি।ফুলদানিটা কালো হলেও তাতে রাখা ফুলগুলো সাদা।তার পাশে দেয়াল ঘেষে রুমের মাঝ বরাবর এক টেবিল।যে টেবিলের উপরে রাখা অ্যাপেল ল্যাপটপটার কি-বোর্ডে হাত চালিয়ে যাচ্ছে সাহিত্য।কাজের ব্যস্ততার মাঝেও সুগার ফ্রি হট ব্ল্যাক কফিটাতে বারে বারে চুমুক দিতে ভুলছে না সে।ফোনের আওয়াজ শুনতেই হাতজোড়া থমকে গেল তার।ল্যাপটপ ও কফি ছাড়াও এবার ফোনের দিকে নজর পড়ল।অয়নের নাম্বার দেখে কল রিসিভ করে কানে ধরল সে,

"হ্যালো?"

"সাহিত্যওওওওওও!!"

অয়নের চিৎ'কার শোনার সাথে সাথেই ফোনটা ধীরে সুস্থে কান থেকে ক্ষণিক দূরে সরিয়ে ধরল সাহিত্য।অয়নের চিৎ'কার বন্ধ হয়ে গেলে ফোনটা আবার কানে লাগিয়ে শান্ত স্বরেই শুধালো সাহিত্য,

"কী হয়েছে?"

"আমার বাইকের তেল শেষ?"

"তো আমাকে ফোন করে চিল্লালে কি তোর বাইকে তেল ফিরে আসবে?"

সাহিত্যের ঠান্ডা গলায় বলা কথাটা শুনে অয়ন একটু ভড়কে গেল,

"অফিসে টাইমলি না পৌঁছালে তো পেদাবি ধরে। আবার বলছিস চিল্লাচ্ছি কেন?"

"তো বাসে করে আয় না"

"কিহ!তুই তোর বন্ধুকে বাসে উঠতে বলছিস?"

"তো কি এখন পালকি পাঠাবো তোর জন্য?"

কথাটা সাহিত্য বিরক্তি নিয়েই বলল।

ক্ষণিক সময় চুপ থেকে আবার তেতে উঠল অয়ন,

"কানাডায় কি কোনো মেনার্স শিখিসনি?একটা গাড়ি আছে তোর।অবশ্যই সেটাতে করে আমাকে লিফট দিতে আসবি"

এতক্ষণ পরে বড় ব্ল্যাক লেদার চেয়ারটায় গা এলিয়ে দিল সাহিত্য,

"আমার গাড়ির তেল শেষ"

বড় আকারের এক টিমপুনি কাটল অয়ন।অতঃপর শুধালো,

"আমার অজুহাত আমাকেই শুনাস না।তাড়াতাড়ি নিতে আয়"

আলসামি শরীরে আড়মোড়া ভাঙতে নিয়েই শুধালো সাহিত্য,

"কোথায় তুই?"

"ঢাবির সামনে"

ভ্রু কুচকালো সাহিত্য,

"তুই ঢাবির সামনে কি করিস?"

উত্তর না দিয়ে ভাবলেশহীনভাবে হাসতে লাগলো অয়ন।হাসি শুনে সাহিত্য এবার গম্ভীর কাট কাট গলায় শুধালো,

"শা'লা তুই অফিস টাইমে গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করতে গিয়েছিস?"

সাহিত্যের কথায় উত্তর দিল না অয়ন।ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে শুধালো,

"আয় তো তাড়াতাড়ি,গ'রমে গা জ্ব'লে যাচ্ছে!"

কথাটা বলে আর এক মুহূর্ত অপেক্ষা করল না অয়ন।সাথে সাথে কল কে'টে দিল।

অয়ন এর কথায় নাক-মুখ কুচকালো সাহিত্য।অতঃপর মগের অবশিষ্ট কফিটা একবারে খেয়ে বাইরে বেড়িয়ে গেল।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

ঢাবির সামনের ব্যস্ত রাস্তায় যেন রয়েল গ্রীন অ্যাস্টোন মার্টিনটার জন্য বেশ বড় জায়গা ফাঁকা হয়ে গেল।হঠাৎ এমন গাড়ি দেখে সবাই একটু ভড়কে গিয়েই দূরে সরে গিয়েছে।গাড়ির পাশে দেখার সাথে সাথে গ্লাস বন্ধ করা গাড়ির ভেতরে ড্রাইভিং সিটে বসা ব্যক্তিকেও অনেকে দেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু এদিকে সেই রাজকীয় গাড়ির ভেতরে ড্রাইভিং সিটে বসা ব্যক্তির তেমন কোনো হেলদোলই নেই বাইরের হালকা কয়েক চোখ জোড়ার ব্যাপারে।

ব্ল্যাক লেদার কাভারে ঢাকা আইফোনটা হাতে নিয়ে অয়নের নাম্বার বের করল সাহিত্য।কি যেন মনে করে চোখ জোড়া বাইরে ঘুরাতে লাগলো।যদি অয়নের দেখা মেলে সে উদ্দেশ্যেই হয়তো।হঠাৎ চোখ জোড়া এক জায়গায় থমকে গেল সাহিত্যের।সামনের ভারী গ্লাস উপেক্ষা করে এক ব্যক্তির দিকেই যেন চোখগুলো আবদ্ধ হয়ে থাকলো তার।

ল্যাভেন্ডার কালারের কুর্তি সেট পরে দূরে দাঁড়িয়ে আছে কল্পনা।হাটু অব্দি সিল্কি চুলগুলো কুর্তিটা ছাড়িয়ে গিয়েছে।গ'রমের কারণেই হয়তো,একটা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে উপরের কিছু চুল আটকানো তার।কিন্তু সামনের কার্টেইন ব্যাঙ কাটের ছোট চুলগুলো সেই পাঞ্চ ক্লিপটাতেও আটকা পড়েনি।কল্পনার আদলখানাতে বড় অধিকার নিয়েই তারা চিপের কাছে নেতিয়ে আছে।যেই রোদের গ'রমের কারণে চুলগুলো আটকানোর একটু চেষ্টা চালিয়েছে,সেই তপ্ত রোদেই যেন জ্বলজ্বল করছে দুধে আলতা ফর্সা মেয়েটা।তারপরেও কেন জানি চেহারার ভঙ্গিমার কাছে সেই সৌন্দর্য ফিকে হয়ে আছে।কল্পনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এক ছেলের সাথে কথা বলছে সে।এতদূর থেকে বোঝা যাচ্ছেনা কথার শব্দ।কিন্তু দেখে মনে হচ্ছে কোনো ব্যাপারে কথা কা'টা'কা'টি হচ্ছে। কল্পনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটা ক্ষণে ক্ষণে তাদের মাঝে দূরত্ব কমিয়ে আনছে।

গাড়ির এসি অন থাকা সত্ত্বেও সাহিত্যের মাথাটা গ'রম হয়ে উঠলো। হাতে থাকা ফোনটা যেন স্বাভাবিকের তুলনায় একটু বেশিই জোরে চেপে ধরেছে সে।চাপ দাড়িওয়ালা তীক্ষ্ণ চোয়ালটা শক্ত হয়ে যেন আরো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।হঠাৎই পাশের গ্লাসে কারো নক করার শব্দে তড়িৎ গতিতে সেদিকে ঘুরালো সাহিত্য।মাথা ঘুরাতেই দেখল অয়ন নক করেই যাচ্ছে।সাহিত্য গ্লাস নামাতেই বলে উঠল অয়ন,

"কতক্ষণ থেকে ওই পাশের গ্লাসে নক করছি,কান কই থাকে?"

শান্ত স্বরে শুধালো সাহিত্য,

"গেট খুলছি,ভেতরে এসে বস"

প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলতে নিয়েই আরেক দফা কল্পনার দিকে নজর গেল সাহিত্যের।ছেলেটা মনে হয় রা'গের মাথায় দাঁত চিবিয়ে কিছু বলছে কল্পনাকে। অয়নের দরজা লাগানোর শব্দে অয়নের দিকে ঘুরলো সাহিত্য।সাহিত্যের ভড়কানো চেহারা দেখে অয়ন শুধালো,

"কিছু হয়েছে কি?এমন রা'গের মাথায় আছিস কেন?"

অয়নের কথায় সাহিত্য যেন একটু বিভ্রান্ত হলো। রা'গ? সাহিত্য কি রে'গে আছে? কিন্তু কি কারনে?সকাল থেকে তো রা'গ ওঠার মতো তেমন কিছুই হয়নি।

চোখ জোড়া আড় চোখে যেন আবার সামনে দেখতে চাইছে।কিন্তু সে সুযোগ দিল না সাহিত্য।ওদিকে ঘোরার আগেই আবার অয়নের দিকে দেখল। সাহিত্যের এমন এলোমেলো আচরণ দেখে এবার অয়নও একটু বিভ্রান্ত হলো। গলা পরিষ্কার করে নজর লুকিয়ে বলল,

"আচ্ছা ঠিক আছে ভাই।অফিস টাইমে গার্লফ্রেন্ডের সাথে দেখা করব না আর"

এবার সাহিত্য তার পূর্ণ মনোযোগ অয়নের দিকে আনল। মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে শুধালো,

"ধুর।আমি কি কিছু বলেছি?"

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা অষ্টাদশীর দিকে না দেখেই গাড়ি ঘুরালো সাহিত্য।অয়ন একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলো।ক্ষণিক বাদে শুধালো অয়ন,

"নতুন প্রজেক্ট এর সব পেপারস রেডি হয়েছে।আজ মিটিং রাখতে চাচ্ছি"

কথাটা বলে অয়ন সাহিত্যের উত্তরের অপেক্ষা করছিল। কিন্তু গাড়িতে পূর্ণ নীরবতা।

"সাহিত্য?"

"হা?"

সাহিত্যের যেন হুশ ফিরল।এতক্ষণ আনমনে কি চিন্তা করছিল কে জানে?অয়ন আবার শুধালো,

"নতুন প্রজেক্ট এর কথা বলছিলাম।আজ মিটিং রাখতে চাচ্ছি"

"ইয়া ইয়া,সিওর"

সামনে দৃষ্টি রেখেই উত্তর দিল সাহিত্য।দেশে ফেরার পর থেকে এই প্রথম সাহিত্যের মাঝে এমন অন্যমনস্কা ভাব দেখছে অয়ন।কিন্তু সে বিষয়ে মাথা ঘামালো না বেশি।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কেবিনে ঢুকে সোফায় বসেই জগ থেকে পানি ঢেলে ঢক-ঢক করে এক গ্লাস পানি খেলো সাহিত্য।বুকের মাঝটা যেন তার অতিরিক্ত জোরে কাঁপছে।আজ কি অফিসে কাজের চাপ একটু বেশি হয়ে গিয়েছে? হতে পারে।একটু রেস্ট নিলেই হয়তো ঠিক হয়ে যাবে।রেস্ট নেওয়ার উদ্দেশ্যেই সোফার দুই পাশে হাত উঠিয়ে মাথা পেছনে এলিয়ে দিয়ে চোখ জোড়া বন্ধ করলো সাহিত্য।রুমে এসি চলার দরুন বাইরের চৈত্র মাসের ভ্যাপসা গ'রম শরীরে লাগছে না সাহিত্যের। কিন্তু এমনই কোনো এক চৈত্র মাসে রোদের মাঝে স্কুল থেকে বাড়ি ফিরছিল সাহিত্য।

পড়নের সাদা শার্টটা ঘামে ভিজে ভেতরের গেঞ্জির সাথে লেপটে আছে। আর নিচে কালো সু জুতা আর কালো প্যান্টের গ'রম তো ক্ষণে ক্ষণে বেড়েই চলেছে।এজন্যই সাহিত্য সচরাচর স্কুলে যায় না।প্রায় সময় বাড়িতেই থাকে সারাদিন।পেইন্টিং করার পাশাপাশি একাডেমিক বইগুলোও একটু খুলে দেখে নেয় মাঝে মাঝে।একজন ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট হিসেবে প্রতিটা পরীক্ষার রেজাল্ট ভালো হওয়ায় দৈনন্দিন স্কুলে না দেখে শিক্ষকরাও তেমন কিছু বলেন না।

বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই গা জ্বা'লানো রোদটা থেকে একটু হাফ ছেড়ে বাঁচলো সাহিত্য।ক্লান্ত শরীরটা নিয়ে সোজা নিজের রুমের দিকে চলে এলো।দরজা লাগাতেই দরজার পাশের দেয়ালে চোখ গেল তার। একটা বাচ্চা মেয়ে দেয়ালের সাথে পিঠ ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে অনবরত নাক টেনেই যাচ্ছে।মাথাটা নিচু করে রাখায় মাথার দুই পাশে উপরের দিকে করা ঝুঁটি দুটোর চুলগুলো দিয়ে মুখটা অনেকটাই ঢেকে আছে তার।বয়স আর কতই বা হবে?পাঁচ কি ছয় বছর।পড়নের স্কুল ড্রেসটাও খুলেনি বাচ্চা মেয়েটা।

তাকে দেখে সাহিত্যের চোখগুলো মার্বেলাকার ধারণ করল। বন্ধ দরজার সামনে কাধের ব্যাগটা ফেলে দিয়ে হাঁটু গেড়ে বসলো বাচ্চা মেয়েটির সামনে।পরম আদরে নরম তুলতুলে গাল দুটো দুই হাতের তালুর মাঝে আবদ্ধ করল সাহিত্য।ওমনি একখানা আবেগ মাখা মুখের দৃষ্টিপট ঘটলো সাহিত্যের সামনে।গ'রমের কারণে নাকি কেঁদে কেঁদে,কে জানে? পুরো মুখটা লাল হয়ে আছে কল্পনার।চেহারায় আ'ত'ঙ্ক নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়েই শুধালো সাহিত্য,

"কি হয়েছে কল্পনা?"

কোনো উত্তর দিল না কল্পনা। শুধু নিচের ঠোঁট উল্টিয়ে নাক টেনেই যাচ্ছে সে।এবার যেন চোয়াল জোড়া শক্ত হয়ে এলো সাহিত্যের।গ'রমে লাল হওয়া ফর্সা মুখখানা আরো একটু লাল হয়ে উঠল তার।ভারি গলায় শুধালো,

"কেউ কিছু বলেছে?"

পরমুহূর্তেই কল্পনা ডানে-বামে মাথা নাড়ালো।।যদি কেউ কিছু বলেও থাকতো,না জানি কি হালত করত সাহিত্য সেই ব্যক্তির?সাহিত্যের মুখখানা আবার স্বাভাবিক হয়ে এলো।ভ্রু জোড়া নেতিয়ে কোমল কন্ঠে বলল,

"তো কি হয়েছে আমার জানপাখিটার?এমন কাঁদছিস কেন?"

সময় নিয়ে উত্তর দিল কল্পনা। ভাঙ্গা গলায়

বলল,

"তুমি ওই আপুর সাথে আর কথা বলবা না?"

ভ্রু জোড়া কুচকালো সাহিত্য,

"কি? কোন আপু?"

আবার কাঁদো কাঁদো গলায় বলে উঠলো কল্পনা,

"কিছুক্ষণ আগে যার সাথে কথা বলছিলে"

সাহিত্য একটু আনমনে চিন্তা করতেই মনে পড়ল তার।সামনে এস.এস.সি. পরীক্ষা থাকায় এখন পড়াশোনার মাত্রাটা কিছুটা বাড়িয়েছে সাহিত্য।যেহেতু সচরাচর স্কুলে যাওয়া হয়না তাই ক্লাসের নোটসগুলো তার ক্লাসের এক মেয়ের থেকে নিয়েছে আজ।সাহিত্য নির্দ্বিধায় ক্লাসের সবচেয়ে সুদর্শন ও আকর্ষণীয় ছেলে।যার দরুন নোটস নেওয়ার সময় মেয়েটি সাহিত্যের গায়ে একটু ঢালাঢালিরই চেষ্টা করছিল। কিন্তু সাহিত্য সেদিকে তোয়াক্কা না করে নোটস নিয়ে তাড়াতাড়ি চলে আসে।সেই ঢলাঢলি সাহিত্য না দেখলেও রাস্তার অপর পাশে দাঁড়ানো বাচ্চা মেয়েটি ঠিকই দেখেছে।ছোট মনটা এমন বি'ষি'য়ে গিয়েছিল যে সাহিত্যকে ডাকতেও ভুলে গিয়েছিল।সেই কথা স্মরণে আসতেই মাথা নিচু করে নিচের ঠোঁট কামড়ে ধরে নিঃশব্দে হেসে উঠল সাহিত্য।হেনা শেখ বার বার করে বলেছিলেন কল্পনাকে সকালের সিফটে দিতে।কিন্তু প্রতিদিন সকালে স্কুল যাওয়ার আগে সাহিত্যের রুমে এসে কাঁদতে নিয়েই সাহিত্যের গলায় ঝুলে পড়ত কল্পনা। যার দরুন সাহিত্যের অনুরোধে বাধ্য হয়েই কল্পনাকে ডে সিফটে দেওয়া হয়েছে।কিন্তু এখন তো সাহিত্যেরই খা'রা'প অবস্থা হচ্ছে।তার লাল মুখী জানপাখিটা কিনা কি দেখে মুখ ফুলিয়ে বসে আছে।

হাসি কমিয়ে মাথা উঠিয়ে নিচের ঠোঁট ফুলিয়ে রাখা কল্পনাকে একবার পরখ করল সাহিত্য।এই বাচ্চা মেয়েটার এমন ছোটখাটো ভারী অভিমানগুলোর যেন শেষ নেই।সাহিত্যের চুপ করে থাকা দেখে কল্পনা আবার অভিমানের সুরে ভাঙ্গা গলায় বলল,

"শুধু ওই আপু না,আর কোনো আপুর সাথেই কথা বলবে না তুমি!"

এক হাত কল্পনার গালে রেখেই আরেক হাত দিয়ে কল্পনার কপালের কাছের লেপটানো ভেজা ছোট চুলগুলো ঠিক করে দিল সাহিত্য।মুখে ক্ষীণ হাসি রেখেই শুধালো সাহিত্য,

"কেন কথা বলল না?"

এবার যেন কান্নাটা আর ধরে রাখতে সক্ষম হলো না বাচ্চা মেয়েটা।ফুপিয়ে কেঁদে উঠে চোখ বন্ধ করে বলতে লাগলো,

"কারণ তুমি শুধু আমার!তুমি শুধু আমার সাথে খেলবে।আমি তোমাকে অন্য কারো সাথে খেলতে দিব না"

নিজের আদরের ছোট্ট পাখিটার মুখে নিজেকে নিয়ে এমন কথা শুনে মনে হয় হৃদয়ের হালকা র'ক্ত ক্ষ'র'ণই হলো কিশোর ছেলেটির। সামনে কাঁদতে থাকা ললনাময়ী মুখটার দিকে পরম আবেশে দেখতে লাগলো সাহিত্য।কি যেন মনে করে কান্নারত মুখোমণ্ডলটাতে অজস্র টুকরো চুমু দিয়ে তাকে নিজের বুকে টেনে নিল।কল্পনার কান্না থামলেও কান্নার তোপে ছোট শরীরখানা মৃদু কেঁপে কেঁপে উঠছে।

"আচ্ছা ঠিক আছে,আর কারো সাথে কথা বলবো না। বাসা থেকেই বের হবো না আমি।এবার তো চুপ কর, জানপাখিটা আমার"

কল্পনা তার মুখটা আরো গভীর ভাবে গুজে দিল সাহিত্যের ঘামে ভেজা বুকে।ছোট্ট শরীরখানা এখনো মৃদু কেঁপেই যাচ্ছে।হালকা ঠোঁট বাকিয়ে আনমনে চিন্তা করলো সাহিত্য,

'এখনই এত অধিকার খাটাচ্ছে,না জানি যখন বড় হবে তখন কি করবে?'

তড়িৎ গতিতে চোখ খুললো সাহিত্য।বড় বড় শ্বাস নিতে গিয়ে হাসফাস লাগছে তার।এসির ঠান্ডায় কেবিনে থাকা সব জড়বস্তু হিমশীতল হলেও ঘামে ভিজে জপ জপ করছে কেবিনে উপস্থিত থাকা একমাত্র মানুষটি।সাহিত্য কি স্বপ্ন দেখছিল? না। সে তো সজাগই ছিল এই কয়েক মুহূর্ত।তার মানে সাহিত্য কি সেগুলো স্মরণ করছিল?আগে তো কখনো এমন হয়নি।কেনই বা সে ওই বে'হু'দা স্মৃতিগুলো স্মরণ করতে যাবে?তার মস্তিষ্কে সে কি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলছে?একদম না।তাহলে সেগুলো কেন স্মরণে আসছে!

এতগুলো প্রশ্নের যেন কোনো উত্তরই পেল না সাহিত্য।যার দরুন সাহিত্যের রা'গের মাত্রাটা যেন আবার চড়চড় করে বেড়ে উঠলো।হন্ততন্ত পায়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল সে।

❄️মস্তিষ্ককে নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলেও হৃদয়কে যে নিয়ন্ত্রনে রাখা যায় না,সে কথা এই অবুঝ সাহিত্যকে এখনো কেউ হয়তো বুঝায়নি❄️

কেবিন থেকে বের হয়ে রবির পাশ কে'টে যেতে নিয়েই রবিকে উদ্দেশ্য করে বলল সাহিত্য,

"অয়নকে মিটিং ক্যানসেল করতে বলিস।আমি বাসায় যাচ্ছি"

সাহিত্যের ঠান্ডা গলায় তার যাওয়ার পানে তাকালো রবি,

"সাহিত্য কিছু হয়েছে?"

"না"

সাহিত্য তার যাওয়ার গতি না কমিয়েই ঠান্ডা গলায় ছোট করে উত্তর দিল।এসি রুমে থাকা সত্ত্বেও ঘামে ভেজা সাহিত্যের ধূসর রঙ্গা শার্টটা দেখে হালকা ভড়কালো রবি।কপালে ভাজ ফেলে কিছুক্ষণ সেদিকেই চোখ রেখে অয়নের কেবিনের দিকে এগোলো মিটিং ক্যানসেল করার কথা বলার জন্য।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৮ম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন