#পর্ব_৯
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ভার্সিটির সামনে প্রীতির সাথে ভেলপুরি খাওয়ার সময় মনটা একটু ভালো হয়ে গিয়েছিল কল্পনার।কিন্তু বাসায় ফিরে ফোনের দিকে চোখ পড়তেই মনটা আবার খা'রা'প হয়ে গেল।রাতুল সেই আননোন নাম্বার থেকে আরো কয়েকবার কল দিয়েছে।যদিও বা সেই নাম্বারটা এই মুহূর্তে ব্লক লিস্টে।কিন্তু সেটা করে শুধু ক্ষণিকের সান্তনা।অন্য নাম্বার থেকে যে কল দিবে না সেটারও তো কোনো নিশ্চয়তা নেই।
মাঝে মাঝে কল্পনার নিজের উপর প্রচন্ড রা'গ উঠে। তার নিজের বোকামোর কারণেই আজ এই অবস্থা।সেধে গিয়ে জালে পা দিয়েছিল।লম্বা একটা সাওয়ার নিয়ে যতটুকু পারলো রাতুলের কথা মাথা থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টা করল।এখন ওসব ফালতু ব্যাপারে চিন্তা করলে চলবে না।বাড়ির পরিস্থিতি এখন সম্পূর্ণ তার হাতে।এখন পর্যন্ত যত প্ল্যান কল্পনা তৈরি করেছিল সম্পূর্ণ কার্যকর না হলেও কিছু ভালো লক্ষণ দেখা দিয়েছে।বাবা ও বড় বাবা কথা না বললেও মা ও বড় মা আনমনেই মাঝে মাঝে কথা বলে থাকেন। যখনই কল্পনা তাদের এক জায়গায় দেখেছে, অমনি ছোট চাচীকে সেখান থেকে গায়েব করে দিয়েছে।ছোট জা মাঝে থাকলে বড় দুই জা এর মাঝে কখনোই কথা হবে না।দুই জা এর মধ্যে কখনো কল্পনা কথা কা'টা'কা'টি হতে দেখেনি।কিন্তু সাহিত্য কানাডা যাওয়ার আগে যে একটা ভালো খুনশুটি সম্পর্ক ছিল সেটা এখনো কল্পনার চোখে পড়ে না।কল্পনার বাবা বিজনেসের এক প্রজেক্ট এর জন্য সপ্তাহখানেক হলো রাজশাহী গিয়েছেন।ফিরতে আরো এক সপ্তাহ লেগে যেতে পারে।সাহিত্যের বাবা প্রায় সময় অফিস নিয়ে ব্যস্ত থাকায় সন্ধ্যার আগমুহূর্তে বাড়ি ফিরেন। আশেপাশে স্বামীরা না থাকায় দুই জা সরাসরি কথা না বলেও কথা বলে থাকেন।আপাতত কল্পনা সেটাতেই খুশি।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে চুল মুছতে নিয়েই আনমনে ভাবছিল কল্পনা।এখন পর্যন্ত ঠিকমতো এগোলেও ভবিষ্যতে কি হবে সেটা নিয়ে তার অনেক চিন্তা হচ্ছে। যুগ পুরনো ভাঙ্গন তো আর এত সহজেই জোড়া লেগে যাবে না।একাই এতগুলো করতে সে একটু হিমশিমই খাচ্ছে বটে।তার উপর মুহিত সাহেব নিজে যে ভ'য়ে থাকেন তাতে কল্পনার মনেও ভ'য় ঢুকিয়ে দেন মাঝে মাঝে।প্রথম যখন এই প্ল্যান বানিয়েছিল তখন খুব নেচেছিল কল্পনা।কিন্তু এখন তো মাথা ভো ভো করছে তার।তখন তো আর জানা ছিল না যে তার সাহিত্য ভাই এমন মুখ ফিরিয়ে নেবে।
চিঠিটা দেওয়ার বেশ কয়েকদিনই হয়ে যাচ্ছে।কিন্তু কল্পনা বুঝতে পারছে না যে সাহিত্য চিঠিটা পড়েছে নাকি ছিড়ে ফেলেছে।ওনার তো আবার গ্যারান্টি নেই।দেখা গেল কল্পনার উপর রা'গ ঝাড়তে না পেরে বেচারা চিঠির বেহাল দশা করে রেখেছে।
ফোনের রিংটোনে ভাবনায় ছেদ পড়ল কল্পনার।আজ সকাল থেকে যতবারই ফোন আসছে ততবারই মন খারাপ হচ্ছে তার।কিন্তু এবারের কলে বিছানায় অবহেলায় পড়ে থাকা ফোনটার উজ্জ্বল স্ক্রিনে থাকা নামটা দেখে সম্পূর্ণ বিপরীত অনুভূতি উদয় হলো মনে।হাসিমুখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে ভিডিও কলটা রিসিভ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো কল্পনা।ফোন রিসিভ হওয়ার সাথে সাথেই ফোনের ওপাশে থাকা ব্যক্তির উজ্জ্বল ডাগর ডাগর চোখগুলোর দেখা মিলল।
"মণি!!!"
হাসি মাখা মুখে উচ্চ স্বরেই শোনা গেল ডাকটা।অমনি কল্পনাও হাসিমুখে আদরে গলায় বলল,
"আমার বাবাটা কেমন আছে?"
কল্পনার বাক্যটা শেষ হতে না হতেই কেউ একজন বাচ্চা ছেলেটির হাত থেকে ফোনটা নিয়ে নিল।দেখা মিলল চির পরিচিত বড় বোনের মুখখানা।তেতে উঠল কল্পনা,
"ফোন কেন নিয়ে নিলে?ইফতিকে দাও ফোনটা"
কল্পনার কথা শুনে সুবার মুখে বিরক্তির ছাপ দেখা দিল,
"খালাটা যেমন,ভাগনেটাও হয়েছে তেমন। সকাল থেকে মাথাটা খেয়ে নিচ্ছে আমার।মণির সাথে কথা বলবো, মণির সাথে কথা বলব।এত করে বলছি যে তোর মণি ভার্সিটিতে, কথাই শোনে না।আমার কাছ থেকে ফোন ডাকাতি মে'রে এনে তোকে কল দিয়েছে"
ধিমি আওয়াজ শোনা গেল,
"তুমি পচা আম্মু।ফোন আমাকে দাও।আমি মণির সাথে কথা বলবো"
পাঁচ বছর বয়সী ইফতির রা'গমাখা কথা শুনে কল্পনা হেসে উঠল।সুবা অভিমানী ছেলের হাতে ফোন দিতে নিয়েই বলল,
"পচা আম্মু,তাই না?চকলেট কার কাছ থেকে পাও দেখা যাবে"
ইফতি আর মায়ের কথায় পাত্তা দিল না।খালাকে দেওয়া আদরের ডাকনাম 'মণি' বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলেছে।ওইটুকু পেটে যত কথা জমা রেখেছিল সব ভুরভুর করে মুখ দিয়ে বের করছে।
দৈনন্দিন এর ব্যস্তমাখা জীবনে খুব কম কথাই হয় সুইজারল্যান্ড এর সদস্যদের সাথে।হেনা শেখের সাথে কথা হলেও কল্পনা ভার্সিটিতে ওঠার পর থেকে খালা ভাগিনার আগের মতো আর আবদার মাখা কথা জমে না।তাইতো দীর্ঘ সময় পর যখনই কথা হয় গল্পের রাজ্য নিয়ে বসে ইফতি।
ছেলের কথার ইতি টেনে সুবা ফোন হাতে নিল। কল্পনার কি অবস্থা,কেমন আছে এগুলো জিজ্ঞেস না করে সরাসরি শুধালো,
"বাড়ির কি অবস্থা?"
কারণ সুবা জানে বাড়ির কি অবস্থা হওয়ার কথা।তাই নিশ্চিত হতেই জিজ্ঞেস করছে।কল্পনা ঠোঁট টিপে হেসে শুধালো,
"যেমন,তেমনই"
সুবা মুখে 'চ' বর্গিয় শব্দ করে বলল,
"ফাজলামো করিস না তো।বাবা-বড় বাবা স্বাভাবিক আছে?"
মুখের হাসি ধরে রেখেই কল্পনা বলল,
"আপু তুমি অত টেনশন নিচ্ছো কেন? কিছুই হয়নি, আর হবেও না"
"শেষ যুদ্ধটা কেমন হয়েছিল জানিস না তো,তাই বুঝছিস না"
বোনের কথায় নাক-মুখ শিটকালো কল্পনা।ঐদিন যে জীবনের সবচেয়ে বড় পা'প করেছিল সে।কুম্ভকর্ণের মতো ঘুমাচ্ছিল ঐদিন।
সুবা আবার শুধালো,
"দাদীর কি অবস্থা?"
এবার বিছানায় উঠে বসলো কল্পনা,
"তিন ছেলেকে দেখে তো বড়ই খুশিতে আছে"
"তোর ভাইয়া বাবাকে বলেছিল সুইজারল্যান্ডে নিয়ে আসার কথা।কিন্তু মুহিত আঙ্কেল নাকি বলেছেন দেশেই ভালো ট্রিটমেন্ট দিচ্ছে।তাই আর জোরাজোরি করল না"
সুবার কথায় তার পাশে চোখ পিটপিট করে দেখতে লাগলো কল্পনা।বোনকেও যে ডাহা মি'থ্যা কথাটা বলেছে সে।সত্যটা জানতে পারলে না জানি সুইজারল্যান্ড থেকেই ফোনের মাধ্যমে কয়েকটা চাপাঘাত বসায় কিনা? মহুয়া বেগমের ক্যা'ন্সা'রের কথা শুনে তো সুবা আর তার হাজবেন্ড সেইদিনই আসার জন্য তৈরি হয়েছিল।মুহিত সাহেব ও মহুয়া বেগমের দ্বারায় কোনো মতে থামিয়েছে তাদেরকে। তারপরেও দাদীকে সরাসরি না দেখা পর্যন্ত যেন সুবা শান্তির নিশ্বাস ফেলতে পারছে না।বোনের জন্য খুব মায়া হলো কল্পনার। কিন্তু সে করবেটা কি? আর যে কোনো উপায় ছিল না কল্পনার কাছে।কল্পনার চুপ করে থাকা দেখে সুবা শুধালো,
"কিরে? কি হয়েছে?"
"আপু আমার না শরীরটা একটু টায়ার্ড লাগছে।পরে কল দেই?"
বোনের সাথে আর বেশিক্ষণ কথা বললে সব সত্য হুরহুর করে বের করে দিবে কল্পনা।যা সে একদমই চায় না।বোনের সাথে কথায় ইতি টেনে আবার বিছানায় শরীরের ভার ছেড়ে দিল কল্পনা।সুবার কথা মাথা থেকে বের হতেই পরমুহূর্তে সাহিত্যের কথা মনে পড়ল।সাহিত্য যে চিঠিটা পড়েছে কি পড়েনি সেটা এখন কেমন করে বুঝবে কল্পনা?এই মেয়ের মাথায় শয়তানি বুদ্ধি আসতে আবার সময় লাগে?মাথায় এক তাজা বুদ্ধি আসতেই ঠোটের কোণে দুষ্টু হাসি ফুটে উঠলো।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সাহিত্য গত এক মাস থেকেই বেশিরভাগ সময়ই বাসায় থাকে।আর যেদিন করে অফিস যায় সেদিন বিকাল বা সন্ধ্যা ছাড়া আসে না।আজ সাহিত্য অফিসে গিয়েছে। তাই এই দুপুর ৩টার দিকে সাহিত্যের বাসায় থাকার একদম সম্ভাবনা নেই।
নিজের রুম থেকে বের হয়ে পা টিপে টিপে সাহিত্যের রুমের সামনে এসে দাঁড়ালো কল্পনা।আজ সাহিত্যের অফিসে থাকার সুযোগেরই সদ্ব্যবহার করবে সে।কাজের বুয়ার দ্বারা বাড়ি দৈনন্দিন পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখার জন্যই সাধারণত কেউ কারো রুমে তালা লাগায় না।শুধু হ্যাঁসবোলের উপরে হ্যান্ডলকটাই দেওয়া থাকে।অবশ্য কেউ কারো রুমে অনুমতি ছাড়া তেমন ঢোকে না।এক বড় যৌথ পরিবারের কাছে যেন খুবই সাধারণ বিষয় এটি।কিন্তু ছোটবেলার মতোই কেউ একজন আজ সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করার জন্য দুই হাতের তালু ঘষছে।
সাহিত্য তো কল্পনার সাথে কথাই বলতে চায় না।তো তাকে জিজ্ঞেস করে বেকার সময় নষ্ট করে লাভটা কি? তাই সাহিত্যের রুমে এখন তল্লাশি চালাতে হবে। যদি চিঠি পায় তাহলে দেখেই বোঝা যাবে কি অবস্থা, চিঠি খুলেছে কি খুলেনি।কল্পনা তার ডান কাধের কাছের ভেজা চুলগুলো হাত দিয়ে হালকা ঝটকা মে'রে নিজেকে বাহবা দিতে লাগলো,
"বাহ কল্পনা, বাহ!তোর ব্রেন তো সাহিত্য ভাইয়ের জ-লাইনের থেকেও শার্প"
নিজেকে বাহবা দিয়ে হাসিখুশি মুখে নিভু নিভু চোখে সামনে এগিয়ে গেল কল্পনা।মুখের হাসিটা বাড়িয়ে পুরো উদ্যমে পুরো দরজা খুলে হাত মেলে দাঁড়ালো।কিন্তু পরবর্তী দৃশ্যের জন্য একদমই প্রস্তুত ছিল না মেয়েটা। নিভু নিভু চোখগুলো ভালোমতো খুলতেই মার্বেলাকার ধারণ করল সেগুলো।হাসিটাও চড়ুই পাখির মতো ফুরুত করে উড়ে গিয়েছে সেই কখন।
সাহিত্যের রুমের এটাস্ট বাথরুমটার দরজার সামনে সাহিত্য দাঁড়িয়ে আছে। কাকতালীয়ভাবে দুটো দরজা দুজনে একই সাথে খুলেছে।ব্যাপার সেটা না।এমনকি সাহিত্য থাকলেও তেমন কোনো ব্যাপার ছিল না।কিন্তু বিপত্তিটা তো ঘটেছে অন্যখানেই।সাহিত্যের পরনে শুধু একটা সফেদ টাওয়াল ছাড়া আর কিছুই নেই।বোঝাই যাচ্ছে এই মাত্রই গোসল সেড়ে বের হয়েছে সে।যার দরুন উন্মুক্ত প্রশস্ত লোমহীন বক্ষপটসহ সারা শরীরে পানির বিন্দু বিন্দু কণা জমে আছে।সামনের ভ্রু অব্দি চুলগুলো থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে তার।হাতের বাইসেপ্সগুলো যেন পানির কণার নিচ থেকে উঁকি-ঝুকি দিচ্ছে।প্রশস্ত বক্ষপটটার নিচে কমপক্ষে ছয়টা প্যাক তো হবেই।হাতগুলোর কথা আর নাই ভাবুক কল্পনা!ইনস্টাগ্রামের রিলসে পোস্ট করার জন্য যথউপযুক্ত সেগুলো।জীবনে মনে হয় এই প্রথম এত সুন্দর ভেইনি হ্যান্ডস সরাসরি দেখছে সে।
এই শ্বেত বর্ণের মানুষটিকে কোনো গ্রিক গর্ডের থেকে কম লাগছে না।তীক্ষ্ণ চোয়ালের নিচে হালকা উদয়মান আপেলস অ্যাডামযুক্ত টানটান কণ্ঠনালীটার নিচে ঢেউ খেলোনা বক্ষপট একদম চোখ ধাঁধানোর মতো। চাপ দাড়িযুক্ত চেহারাটা কি আকর্ষণীয় না লাগছে!ফর্সা ত্বকে বেশিক্ষণ পানির ছটা পড়ার কারণেই মনে হয় হালকা গোলাপি আভা ধারণ করেছে শরীরের কিছু অংশ।পুরুষালী গাম্ভীর্যটা যেন উপচে পড়ছে সাহিত্যের।এই পুরুষালী সত্তার গাম্ভীর্যের মর্যাদা অক্ষুন্ন রেখে সুদর্শন হওয়া যদি অপরাধ হতো তাহলে নির্দ্বিধায় সাহিত্য ভাইয়ের আজীবন কারাদণ্ড হতো।দা মোস্ট ওয়ান্টেড ক্রিমিনাল ফর বিয়িং দা মোস্ট হ্যান্ডসাম ম্যান!কল্পনা যেন সেই চিন্তাই করছে আর চোখের ইঞ্চি ফিতা দিয়ে বে'হা'য়ার মতো সাহিত্যের উন্মুক্ত দেহখানা মাপছে।
এবার একটু উপরেও দেখল কল্পনা।ফলস্বরূপ যেন বড় আকারেই ভড়কালো মেয়েটা।অগ্নিকাণ্ড ধারণকারী চোখগুলো তাকেই দেখছে।দেখছে বললে ভুল হবে,চিবিয়ে খাচ্ছে।সাহিত্যের চিপের কাছের রগ গুলো মাত্রা অতিরিক্ত ফুলে উঠেছে।চোয়ালটাও প্রচন্ড রকমের শক্ত হয়ে আছে।
নিজের কর্মের গতিবিধি বুঝতে পেরে আহাম্মক বনে গেল কল্পনা।কোনমতে সরি শব্দ টা উচ্চারণ করে পেছনে ঘুরলো দৌড় লাগাবে।অমনি বাম হাতের কব্জিতে একটা হ্যাচকা টান পরল।চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করে নিল কল্পনা। নিজের জীবনের অন্তিম প্রহর গুনতে লাগলো সে।পরের কয়েক সেকেন্ডে কি হলো ঠাহোর করতে পারল না সে।কিন্তু একই সাথে বাজখাই শব্দ করে দরজাটা লেগে গেল আর কল্পনার দেহখানার দেয়ালে ঠেকলো। হাতের কব্জিতে ব্যথা অনুভব করতে হালকা আর্তনাদ করে চোখ খুলল কল্পনা।বুঝতে আর বাকি রইল না যে সাহিত্য তার এক হাত পেছনে মুড়িয়ে নিয়ে দরজার পাশে দেয়ালের সাথে ঠেকিয়ে রেখেছে।আর সাহিত্যের আরেক হাত দরজায় ঠেকানো।সাহিত্য এত লম্বা দূরত্ব খুঁচিয়ে এত তাড়াতাড়ি কল্পনার কাছে এলোই বা কি করে?
এতক্ষণ থেকে শুধু চোখ দিয়ে পরখ করলেও এখন যেন কল্পনার ছয়টা ইন্দ্রিয়ই সাহিত্যের দখলে।কল্পনার হাত ধরে রাখা পুরুষালী হাতটা হিমশীতল ঠান্ডা।কিন্তু তারপরেও যেন কল্পনার পিঠের কাছে এক উষ্ণ ওহোম লাগছে।ভারি ভারি উষ্ণ শ্বাস ছিটে আসছে কল্পনার ঘাড় গলায়।সাহিত্যের চুলের পানিতে কল্পনায় ঘীয়ে রঙ্গা থ্রিপিসের ওড়নার কাঁধের কাছের অংশটা অনেকটাই ভিজে গিয়েছে এতক্ষণে।কিন্তু সেদিকে কল্পনার খেয়াল কই? সে তো ভালোমতো শ্বাসটাও নিতে পারছে না।তীব্র ভ্যানিলা মিক্সড লেভেন্ডারের সুঘ্রানটা আছড়ে পড়ছে তার শ্বাস-প্রশ্বাসের বাতাসে।কল্পনা ঠাহোর করতে পারল না যে সাহিত্য শাওয়ার জেলও ল্যাভেন্ডার ফ্লেভারের ব্যবহার করে কিনা?হতেও পারে।কল্পনার আশেপাশের বাতাসগুলোকে যেভাবে দখল করে রেখেছে সেই সুঘ্রানটা,তাতে তো সেটাই মনে হচ্ছে।
অষ্টাদশীর ঠোঁট জোড়া তো সেই কখন থেকেই কাঁপছে।আর এখন যেন ভ্যানিলা মিক্স ল্যাভেন্ডার সুঘ্রানটা বক্ষ বহিনে ঢোকার পর শরীরও মৃদু কাপতে শুরু করল।চোখ জোড়া শিথিল রাখতে পারছে না সে।এইটুকুন শরীরটা যেন শিটিয়ে এসেছে তার।
পিছনে মোড়ানো হাতে আরো একটু মোচড় খেতেই আবার হালকা আর্তনাদ করে উঠল কল্পনা।কাপা গলায় বলে উঠলো,
"কি করছেন সাহিত্য ভাই?লাগছে তো"
পেছনে পূর্ণ নীরবতা।শুধু ভারী শ্বাস-প্রশ্বাস দিকবে দিক ছুটছে।বোঝাই যাচ্ছে রা'গের তোপে ফুঁসছে সাহিত্য।কল্পনার আরেকটু গা ঘেষে দাঁড়িয়ে সাহিত্য তার অধর জোড়া কল্পনার কানের কাছে এগিয়ে দিল।অতঃপর তপ্ত স্বরে দাঁত চিবিয়ে বলতে লাগলো,
"কিছু বলছি না দেখে মনে করিস না যে যা খুশি তাই করবি।হাত-পা টেনে ছিড়ে ফেলবো একদম"
সাহিত্যের হাতের বাধনটা আরো দৃঢ় হলো।তার সাথে কল্পনার চাপা আর্তনাদও আবার শোনা গেল।
"ডোন্ট প্রভোক মি।আই কান্ট কন্ট্রোল মাই অ্যাঙ্গার দ্যাট ডাজেন্ট মিন আই কান্ট কন্ট্রোল ইউ"
তপ্ত স্বরে ভারী কথাগুলো বলে একটানে কল্পনাকে দেয়াল থেকে টেনে তুলে রুমের দরজা খুলে ধাক্কা মে'রে বের করে দিল।পর মুহূর্তেই আবার বাজখাই শব্দ করে দরজাটা লাগানোর শব্দ শুনলো কল্পনা পেছন থেকে।সেই শব্দে ভড়কে গিয়ে চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করে নিল সে।মাথা নিচু রেখেই সাহিত্যের দরজার পাশে এক চোখ খুলে আড় চোখে দেখতে লাগল কল্পনা।অতঃপর কাপা শরীরটা নিয়ে দেয়াল ধরে ধরে নিজের রুমে ঢুকলো।বিছানা পর্যন্ত যেতেই পারল না। বন্ধ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়লে সে।
হৃদপিণ্ডটা যেন মাত্রা অতিরিক্ত ধুকপুক করছে তার। ডান হাত দিয়ে বুকের বাম পাশটা খামচে ধরল।পুরো শরীরের মৃদু কম্পন শুরু হয়ে গিয়েছে।আগে তো কখনো কল্পনার সাথে এমন হয়নি।এমন কি উড়ন্ত তেলাপোকা দেখেও না।হাত-পা গুলো যেন রক্তশূন্যতায় ভুগছে তার।সাহিত্যের লেভেন্ডার সুঘ্রাণটা এখনো হালকা নাকে ভাসছে কল্পনার।ভাসবেই বা না কেন?সাহিত্য যে একদম কল্পনার গা ঘেঁষে দাঁড়িয়েছিল। কল্পনার এইটুকুন ছোট শরীরটা ঢাকা পড়ে গিয়েছিল সাহিত্যের প্রশস্ত বক্ষপটের আড়ালে।
১১ বছরে এই প্রথম কোনো পুরুষ কল্পনার এতো কাছে দাঁড়িয়েছিল।তাও আবার সেই ১১বছর আগেরই সেই ব্যক্তি,সাহিত্য ভাই।কিন্তু ১১ বছর আগের কল্পনা আর এখনকার কল্পনা যে সম্পূর্ণ আলাদা।অষ্টাদশীর মনের এক কোণা থেকে নবসুপ্ত নারী সত্তা যেন মাথাচাড়া দিয়ে বের হতে চাচ্ছে।
মেঝেতে হাত-পা ছড়িয়ে দিয়ে চিৎ হয়ে শুয়ে পড়লো কল্পনা।আনমনে কি যেন ভেবে দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে এপাশ-ওপাশ জোরে জোরে মাথা ঝাকাতে লাগলো।সাথে বিড়বিড় করে বলতে লাগল
নিজেকে,
"ছি ছি কল্পনা!তুই এটা ভাবতেও পারিস কেমন করে? এইচ.এস.সি. এর পরে যে ভুলটা করেছিলি সেটা আবার করতে যাচ্ছিস?কতবার আর বোঝাবো তোকে,চাচাতো ভাই হয় তোর!তার ওপর বাড়ির এই পরিস্থিতিতে তো এটা দুঃস্বপ্নেও ভাবা সম্ভব নয়।আর সাহিত্য ভাই এটা জানতে পারলে ছি ছি করবে তোর উপর!!"
বড় বড় দুটো শ্বাস নিল কল্পনা।অতঃপর হাত দুটো একটু নিচু করে চোখ দুটো উন্মুক্ত করল।যেগুলোতে একরাশ আশা ও ক্লান্তির ছাপ।চিন্তায় ডুবে গেল সে।সে তো আর অবুঝ বাচ্চা নেই এখন।বোঝার মতো যথেষ্ট বয়স হয়েছে।হতে পারে পুরুষ মানুষের কাছে আসায় নারী দেহের কোনো প্রতিক্রিয়া।কিন্তু রাতুলের কাছে তো কখনো এমন মনে হয়নি।ওই বে'য়া'দবটা কাছে আসতে চাইলে আরো উগরে বমি বেরিয়ে আসতো কল্পনার।রাতুলের ব্যাপারটাতে কল্পনার নিজেরই উপর যেন রা'গ উঠে।এক ভুল শুধরাতে গিয়ে যেন আরেক ভুল করে বসেছিল।
নিজের মনের কথার ইতি ঘটলো বাম হাতের টনটন ব্য'থায়।হাতটা মুখের সামনে আনতেই চোখগুলো মার্বেলাকার ধারণ করল কল্পনার।কব্জির অংশটায় পাঁচ আঙুলের দাগ বসে কালচে বেগুনি হয়ে আছে। এতক্ষণ পর ব্য'থা অনুভব হতেই হাত চেপে ধরে গলা ফাটিয়ে চিৎ'কার দিয়ে উঠে মেঝেতে গড়াগড়ি খেতে লাগলো সে।মন মত মোচড়টা দিয়েছে সাহিত্য ভাই। একদম কাপড় থেকে পানি নিংড়ানো মোচড়।
নিজেকে সান্ত্বনা দিয়ে কিছুক্ষণ পর উঠে বসল কল্পনা।কয়েক মুহূর্ত আগে সাহিত্য দাঁত চেপে চেপে যেসব কথা বলেছে সব স্মরণে আসলো তার।হাতের ব্য'থা ও সাহিত্যের ওই পৈ'শা'চিক রূপ দেখে যে কেউ এখন দুধ পান করা শিশুর মতোই কেঁদে উঠত।কিন্তু তার ব্যতিক্রম ঘটিয়ে কল্পনা ফিক করে হেসে উঠল। কে বলবে যে এই মেয়েটা কিছুক্ষণ আগেই গলা ফাটিয়ে চিৎকার দিচ্ছিল?মুখ ভেংচিয়ে
শুধালো সে,
"ডোন্ট প্রভোক মি।আই কান্ট কন্ট্রোল মাই অ্যাঙ্গার দ্যাট ডাজেন্ট মিন আই কান্ট কন্ট্রোল ইউ।ইসসস,উপন্যাসের নায়েকদের মতো কেমন রেড ফ্লাগ হওয়ার ভান করছিল।ছোট থেকে আপনার পিছে পিছে ঘুরেই বড় হয়েছি আমি।ওসব ছোটোখাটো ফু মা'রা কথায় আমি ভ'য় পাবো না।আপনি মনে হয় ভুলে গিয়েছেন,আমি কত জিদ্দি।সমস্যা নেই।কয়েকদিনের মধ্যেই আবার মনে পড়ে যাবে"
কিন্তু কল্পনা এটাই বুঝছে না যে সাহিত্য ভাইকে উস্কানোর মতো তো আজ তেমন কিছুই করেনি সে। এত রা'গ দেখানোর কি ছিল?কল্পনার ভাবনায় ছেদ পড়লো যখন হেনা শেখ হুড়মুড়িয়ে দরজা খুলে রুমে ঢুকলেন।ভাগ্যিস কল্পনা গড়াগড়ি করতে করতে একটু রুমের মাঝ বরাবর এসে গিয়েছিল।না হলে তো ভালো করেই মাথাটা ফাটতো তার।
হেনা শেখ রুমে ঢুকেই মেঝেতে বসে থাকা মেয়ের পাশে দেখে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে শুধালেন,
"কি হয়েছে?এমন চিল্লালি কেন?"
মায়ের কথা শুনে কল্পনা একটু ভড়কেই গেল।কি বলবে এখন?যে সাহিত্য ভাই তাকে ভেজা কাপড়ের মতো মোচড়াচ্ছিল?না না,পৃথিবীতে কাল এসে গেলেও এটা বলা যাবে না।কি বলবে চিন্তা করতে করতেই দরজার দিকে নজর গেল।ফট করে বলে উঠল কল্পনা,
"দরজার সাথে হাত চাপা লেগেছিল"
মেয়ের কথা শুনে চোখ জোড়া কপালে উঠে গেল হেনা শেখের।ভয়ার্থ কন্ঠে শুধালেন,
"কীহ!!কোন হাত?"
কল্পনার বাম হাতের দিকে নজর গেল হেনা শেখের। তীক্ষ্ণ চোখে দূর থেকে হাতটা দেখতে লাগলেন তিনি।জীবনের এতোগুলো বছরে অনেক আঘাতের চেহারা দেখার অভিজ্ঞতা আছে হেনা শেখের।মায়ের বোঝার আগেই ফট করে হাতটা ওড়নার পেছনে লুকালো কল্পনা।ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে শুধালো,
"কিছু হয়নি কিছু হয়নি।ঠিক হয়ে যাবে"
"আরে,কিছু হয়নি মানে?কালো হয়ে গিয়েছে তো। কেমন করে চলাফেরা করিস তুই?একটা দরজা লাগাতে গিয়ে এতোটা আঘাত কেউ পায়?দেখা তো হাতটা।বরফ লাগিয়ে দিতে হবে তো"
হেনা শেখ হাত ধরতে এলেই কল্পনা ধরফরিয়ে উঠে দাড়ালো,
"আরে বললাম তো কিছু হয়নি........আমার অনেক ক্ষুধা পেয়েছে।ভাত খেতে দাও তো"
কল্পনা কথা ঘুরিয়ে নিল।সেটা দেখে হেনা শেখ হতাশার নিঃশ্বাস ফেললেন।এই মেয়েটাকে আর বড় করতে পারলেন না তিনি।এত বয়স হওয়ার পরেও তিরিং বিরিং করে পুরো বাড়ি ঘুরবে।আর অকাজ-কুকাজ করে বেড়াবে।কল্পনার দিকে দেখে শান্ত স্বরে শুধালেন হেনা শেখ,
"ওটার জন্যই ডাকতে এসেছিলাম।নিচে এসে খেয়ে নিয়ে হাতে বরফ লাগিয়ে নিস"
মায়ের কথায় উপর-নিচ মাথা ঝাকালো কল্পনা। অতঃপর মায়ের পিছু পিছুই রুম থেকে বেরিয়ে এলো। সাহিত্যের রুমের দরজা পার করে যেতে নিয়ে দরজার দিকে চোখ গেল হেনা শেখের।কল্পনার দিকে ঘুরে ধিমী আওয়াজে শুধালেন,
"সাহিত্য কি বাড়ি ফিরেছে?"
কল্পনা ঘাড় কাত করে উত্তর দিল,
"মনে হয়"
কল্পনার ভাবখানা এমন যেন সে জানেই না।এদিকে সে আসেইনি।সামনে এগিয়ে থেমে গেলেন হেনা শেখ।কি যেন মনে করে সাহিত্যের দরজার কাছে গিয়ে আলতো হাতে টোকা দিয়ে শুধালেন,
"সাহিত্য।নিচে এসে দুপুরের খাবার খেয়ে নে"
কল্পনার চোখ যেন আকাশ ছুঁইছে।সে কি স্বপ্ন দেখছে নাকি বাস্তব?নক করে হেনা শেখ ঠায় দাঁড়িয়ে রইলেন। হয়তো ওপাশের উত্তরের আশায়।ক্ষনিক নীরবতার পর কল্পনার চোখগুলোকে সপ্ত আসমানে ফিক্কা মে'রে ওপাশ থেকে সাহিত্য ভারী কন্ঠে
বলল,
"হ্যাঁ আসছি"
এটা সম্ভবই হতে পারে না!! নিশ্চয়ই সাহিত্য ভাইয়ের মোচড়ানিতে কল্পনা পরকালে চলে এসেছে। কিন্তু হাতের ব্য'থা তো স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে সে ইহকালেই আছে। আজ মনে হয় কল্পনার সবচেয়ে খুশির দিন। ডানা ঝাপটা দিয়ে উড়তে ইচ্ছে করছে তার।
সাহিত্যের উত্তর পেয়ে হেনা শেখ গটগটিয়ে নিচে চলে গেলেন।তার পিছু পিছু কল্পনাও এসে ডাইনিং টেবিলে বসলো।কল্পনার প্লেটে ভাত তোলা অবস্থাতেই সাহিত্যের আগমন ঘটলো।তার পাশে এক নজর দেখে মাথা নিচু করে ফেলল কল্পনা।এখন আর প্রশস্ত বক্ষপটটা উন্মুক্ত নেই।কালো টি-শার্ট দিয়ে আবৃত। লজ্জায় মেয়েটা পুরো কুকড়িয়ে আছে।তখন কেমন হাবার মতো দেখেছিল সাহিত্যের দিকে।সেটা ভাবতেই এখন নিজেরই নিজেকে চ'ড় মা'রতে মন চাচ্ছে।মাথাটা ভালো করে তুলে তরকারিটাও নিতে পারছে না সে।
সাহিত্য এসে কল্পনার বিপরীত পাশে বসল।কিন্তু মুখোমুখি নয়,দূরত্বটা তাদের মাঝে ঢের বেশি।সাহিত্য বসতেই হেনা শেখ প্লেট সামনে দিয়ে ভাত তুলতে লাগলেন।সাহিত্য তাকে এক নজর পরখ করল।হেনা শেখ তা সম্পূর্ণ উপেক্ষা করে কোনো কথা না বললেই সাহিত্যের প্লেটে ভাত তরকারি দিচ্ছেন।যেন সাহিত্যের কোনটা কতটুকু প্রয়োজন তিনি ভালো করেই জানেন।ছোট থেকে নিজের ছেলের মতো করে দেখলে যা হয়। সাহিত্য ঠোঁট বাকিয়ে মৃদু হেসে খাওয়ার মনোযোগ দিল।সেই দৃশ্য দেখে কল্পনার অন্তরে যেন হিমেল হাওয়া বয়ে গেল।এভাবে যেন সবকিছু ধীরে ধীরে ঠিক হয়ে আসে।
চুলের খোপা বাধতে নিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে এলেন লতিফা শেখ। ডাইনিং রুমের সদস্যদের দেখে হেনা শেখকে উদ্দেশ্য করে এগিয়ে এলেন তিনি,
"ভাবী আপনি গিয়ে একটু রেস্ট নেন তো এখন। সারাদিন কাজ করছেন,আমি এখানে আছি"
ছোট জা এর কথায় দ্বিমত করলেন না হেনা শেখ। নিজের রুমের দিকে এগোলেন তিনি।বাড়ির গিন্নিদের কাজ যেন শেষই হতে চায় না।তার ওপর শুক্রবার ও শনিবার বাদে দুই বেলার খাবার একেকজন একেক সময় খায়।সকাল ও দুপুরে যেন এক দন্ডের জন্যও ডাইনিং টেবিলটা ভরাট থাকে না।বাড়ির বাচ্চাদের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সময়সূচী আর বড়দের অফিসের সময়সূচীর ঘড়ির কাটা যেন একেক সময় একেক জায়গা থেকে শুরু হয়।যার দরুণ শুধু রাতের খাবারটা একসাথে খাওয়া হয় সবার।
কল্পনার প্লেটে তরকারি দিতে গিয়ে লতিফা শেখ এক প্রকার চিৎকার দিয়েই উঠলেন,
"কিরে কল্পনা,তোর হাতে কি হয়েছে?"
লতিফা শেখের চিৎকারে কল্পনা মৃদু কেঁপে উঠল। স্নায়ুর তাড়নায় সাহিত্যের চোখ জোড়া কল্পনার হাতের দিকে গেল।অমনি মুখের ভাত গলা দিয়ে নামতে গিয়ে আটকে গেল তার।কল্পনার কব্জির কাছে লম্বায় এক আঙ্গুল সমান জায়গা জুড়ে কালচে বেগুনি হয়ে আছে।আস্তো পাঁচ আঙুলের ছাপ দৃশ্যমান। ফর্সা হাতটাতে কি বেমানানটাই না দেখাচ্ছে দাগটা।
লতিফা শেখের চিৎকারে কল্পনা তড়িঘড়ি করে বাম হাতটা টেবিলের নিচে লুকালো।লতিফা শেখের দিকে দেখে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলতে লাগলো,
"তে-তেমন কিছু না।রুমের দরজা লাগাতে গিয়ে লেগেছে"
কল্পনার কথায় সাহিত্যের ভ্রু জোড়া শিথিল হয়ে এলো।কি নির্দ্বিধায় মি'থ্যাটা বলে দিল মেয়েটা।ওপাশ থেকে নজর সরিয়ে আবার খাবারে মনোযোগ দিল সাহিত্য। কিন্তু খাবার যেন আর আগের মতো খেতে পারছে না।গলায় কাটার মতো বিধতে লাগলো সেগুলো।অফিসে ওঠা রা'গটা তখন কল্পনার উপর ঝেড়েছিল সাহিত্য। রা'গটা যেন কোনো এক দিক দিয়ে কল্পনার কারণেই উঠেছিল।যার দরুণ তখন কল্পনাকে দেখা মাত্রই রা'গটা জ্বালামুখীর মতো ফে'টে পড়ে। কল্পনার হাতটা কি সাহিত্য এতই জোরে ধরেছিল,যে একদম কালচে হয়ে গিয়েছে?কেমন যেন হাসফাস লাগছে সাহিত্যের।রা'গের মাত্রাটা আবার বেড়ে গেল বোধহয়।সটান দাঁড়িয়ে পড়ল সে।
সাহিত্যকে হঠাৎ দাঁড়াতে দেখে কল্পনা ও লতিফা শেখ দুজনেই তার দিকে ঘুরলো।লতিফা শেখ শুধালেন,
"কিরে সাহিত্য?খাওয়া শেষ না করেই দাঁড়িয়ে পড়লি যে?"
"ক্ষুধা নেই আর"
বরফ ঠান্ডা গলায় কথাটা বলে হাত না ধুয়েই বড় বড় পা ফেলে উপরে চলে গেল সাহিত্য।তার যাওয়ার পানে কল্পনা ও লতিফা শেখ দুজনেই দেখে আছে। কল্পনা চোখ-মুখ অন্ধকার করে খাওয়ায় মনোযোগ দিল আবার।কল্পনার মা যখন খাবার দিচ্ছিলেন তখন ভদ্র বাচ্চার মতো বসে খাচ্ছিল।আর এখন কল্পনার কথা উঠতেই যেন ভাত বি'ষ হয়ে গেল সাহিত্যের কাছে?মাঝে মাঝে তো কল্পনার সাহিত্যকে চিনতেই পারেনা। আদৌ কি এটা তার সেই সাহিত্য ভাই?
"কে জানে? কি যে হলো ছেলেটার?"
কথাটা বলে চোখ ঘুরিয়ে লতিফা শেখ কল্পনার পাশে দেখলেন।ভ্রু কুঁচকে শুধালেন,
"হ্যাঁ রে কল্পনা?তুই কি মানুষ হবি না?"
এমন পরিস্থিতিতে হঠাৎ এহেন কথা কল্পনার মাথায় ঢুকলো না প্রথমে।তাই ভ্রু জোড়া কুঁচকে লতিকা শেখের দিকে ঘুরলো সে,
"মানে?"
"দরজা লাগাতে গিয়ে আস্তো একটা হাতের কব্জিতে কারো আঘাত লাগে?তুই কি চৌকাটে হাত রেখে দরজা লাগিয়েছিলি নাকি?"
কল্পনা লতিফা শেখের দিকে ড্যাব ড্যাব করে দেখে থেকে উপর-নিচ মাথা ঝাঁকালো।
"গর্ধব একটা"
সাহিত্যের প্লেট হাতে নিয়ে রান্নাঘরে যেতে নিয়েই ভাতিজির মাথায় হালকা টালা দিলেন লতিফা শেখ।
টেবিলের নিচে থাকা হাতটাকে পরখ করতে লাগলো কল্পনা।একসময় যে সবচেয়ে বেশি আগলে রাখতো সে ই আজ বিপরীত পক্ষ হয়ে গিয়েছে।কিসের এত ক্ষোভ ঝাড়ছে সাহিত্য কল্পনার উপর?কি এমন অপরাধ করেছিল সে?ডান চোখের কঠোর থেকে এক মুক্তর দানা গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো কল্পনার।টেবিলের নিচে লুকানো হাতটার পাশে চোখ রেখেই বিড়বিড় করে আওড়ালো কল্পনা,
"আপনাকে যে অনেক মিস করছি সাহিত্য ভাই"
#চলবে
যদি মনে করেন নায়কের বিবরণ বেশি হয়ে গিয়েছে😒 তাহলে তাদের বলি,,আসলেই বেশি হয়ে গিয়েছে 😁 কিন্তু লিখার পর আর বাদ দিতে ইচ্ছা করছিল না।🥴আর দিয়েছি তো কি হয়েছে?😑 হইল একটু বেশি হ্যান্ডসাম 🙂