#পর্ব_১২
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
নামটা শোনা মাত্রই যেন থমকে গেল সাহিত্য।অন্ত আবার শুধালো,
"ওর ব্যাপারে এখন একটু কথা বলবো আমি।চুপ করে বসে না থেকে প্লিজ একটু ম্যাচিউর ভাবে চিন্তা করিও"
"অন্ত প্লিজ,আমি ওই ব্যাপারে কোনো কথা বলতে চাই না"
"আমি তোমাকে রিকোয়েস্ট করছি না"
অন্তর কথায় সাহিত্য ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,
"বাববাহ! তুই তো আসলেই বড় হয়ে গিয়েছিস"
মাথা দুলিয়ে নিজেকে বাহবা দিল অন্ত।তারপর আবার আগের কথায় ফিরলো,
"প্লিজ ভাইয়া।উই নিড টু টক অন দিস টপিক"
ভারী এক শ্বাস ফেলল সাহিত্য,
"ঠিক আছে।বল,শুনছি আমি"
অন্তও একটা বড় শ্বাস ফেলে সময় নিয়ে বলল,
"সেদিন যেগুলো হয়েছিল ওখানে কল্পনার কোনো দো'ষ ছিল না"
সাহিত্য মেকি হাসলো,
"ওহ,তাই নাকি?তাহলে আব্বু কি আমাকে শখে শখে কানাডায় পাঠিয়েছিল?"
জোর দিয়ে বলল অন্ত,
"কল্পনা নয়,মেঝো বাবা যেটা করেছিল সেটার জন্য বড় বাবা ওটা করেছিল"
সাহিত্য অন্তর দিকে ঘুরে বসলো,
"আচ্ছা আমাকে একটা কথা ক্লিয়ার কর।মেঝো চাচু ওটা কেন করেছিল? তার ছোট মেয়ের জন্য,ঠিক কিনা? তাহলে কি হলো?ঘুরেফিরে তো ওইখানেই আসছে "
অন্ত মুখে 'চ' বর্গীয় শব্দ করল,
"তুমি মেঝো চাচুর রা'গের দো'ষ কল্পনাকে কেন দিচ্ছো? তুমি সব বিষয়ে এত ম্যাচিউর বিহেভ করো অথচ এই এতটুকু একটা বিষয়ে তোমার এত ইম'ম্যাচিউর হওয়ার তো আমি কোনো কারণ দেখছি না।তুমি কি আমাকে কোনো স্পেসিফিক রিজন দেখাতে পারবা কল্পনার উপর রা'গ করে থাকার?এনিথিং উইল ডু"
শেষের কথাটুকু অন্ত সামনে নজর রেখে জোর দিয়েই বলল।অন্তর কথার কোনো উত্তর না দিয়ে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে লাগলো সাহিত্য।হয়তোবা উত্তর খোঁজার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।কিন্তু কিছুই খুঁজে পাচ্ছে না।
হালকা হেসে শুধালো অন্ত,
"খুঁজে লাভ নেই।পাবে না।আমি বলি তুমি কেন কোনো রিজন খুঁজে পাচ্ছো না?কারণ কল্পনার কোনো দো'ষ কখনো তুমি দো'ষ হিসেবে দেখোইনি।সবসময় নিজের ছোট বোনের থেকেও বেশি আদর দিয়েছো তাকে।এমনকি কল্পনা তোমার কাছে যা পেয়েছে সামিয়া তার এক অংশও পায়নি"
আর যেন সহ্য করতে পারছে না সাহিত্য।গলা নিচু করে কোনো রকম বলে উঠল,
"অন্ত স্টপ ইট।চেঞ্জ দা টপিক,প্লিজ।আমি আর পারবো না এই ব্যাপারে কথা বলতে"
সাহিত্যের কথায় অন্ত দমলো না।কারণ সে জানে যে আজ এই কথা এখানে থেমে গেলে আর কখনো সাহিত্য এ ব্যাপারে অন্তর সাথে কথা বলতে চাইবে না।আর অন্তু চায় না যে তার চাচাদের মধ্যে যা হয়েছে একই জিনিস তার ভাই-বোনদের মাঝেও হোক।অন্তর ধারণা এখনো সময় আছে।কোনো উপায় না দেখে অন্ত কড়া সত্য কথাটাই বলতে লাগল,
"তুমি কল্পনাকে কেন অপছন্দ করো সেটার একটা এবং হতে পারে একমাত্র কারণটাই তোমাকে এখন বলব আমি।আম্মু আমাকে বলতে নিষেধ করেছিল তার পরেও....."
অন্তকে কথাটা শেষ করতে দিল না সাহিত্য।তার আগেই মুখে 'চ' বর্গীয় শব্দ করল।অতঃপর উঁচু গলায় বলতে লাগলো,
"দেয়ার ইজ নো সাচ থিংস অন্ত।অন্য কোনো কারণে না।সেই মেয়েকে আমি ওর নিজের দো'ষেই অপছন্দ করি।আমার পুরো লাইফ চেঞ্জ হয়ে গিয়েছে ওই মেয়েটার জন্য।আমি পড়ালেখার পাশাপাশি আমার আর্টিস্টের ক্যারিয়ার গড়ে তুলতে চেয়েছিলাম।আই জাস্ট ওয়ান্টেড টু ফিল পিস ইন মাই লাইফ।এভরিথিং ওয়াজ ফাইন,এভরিথিং!ইভেন আব্বু আর আম্মুও রাজি ছিল...."
থেমে গেল সাহিত্য।সময় নিয়ে আবার বলতে শুরু করল।কিন্তু এবার যেন গলা কাঁপছে সাহিত্যের।যেন ভেতরে আ'গুনে পোড়া কয়লার ছাই বের
করছে সে,
"কিন্তু কয়েক ঘন্টার মধ্যেই যেন সব বদলে গেল।বাড়ি থেকে নানু বাড়ি গিয়ে প্রথমেই আব্বু বলল আমাকে খালার সাথে কানাডায় পাঠিয়ে দিবে।আমার কারনেই নাকি যতসব সমস্যা হচ্ছে।তারপর বলল......আ-আমাকে নাকি ই-ইঞ্জিনিয়ার হতে হবে......সেই মুহূর্তে তার ঐ কথাটার কিছুই মানে বুঝলাম না আমি।হঠাৎ আব্বু আমাকে ইঞ্জিনিয়ার কেন বানাতে চাচ্ছিল?দুই-তিন দিন চিন্তা করার পরে বুঝলাম,আমার মেঝো চাচু যে বাংলাদেশের নামি-দামি বিজনেসম্যান সেজন্য বাবাকে টাকা নিয়েও কথা বলেছিল।আর ওই মেয়েটার কারণে যখন ওইদিন এত কিছু হয়ে গিয়েছিল তখন আব্বু আর মেঝো চাচু আগের কথাও তুলেছিল।যার ফলস্বরূপ আমারই উপর দিয়ে আব্বু ক্ষো'ভ ঝেড়েছে।আমার লাইফকে আমার বিরুদ্ধে তার হাতে নিয়েছিল।আমি এত করে তাকে বুঝিয়েছিলাম, আমার দ্বারায় ওসব হবে না।কিন্তু আব্বু একটা কথাই বলেছিল,আর্টিস্ট নাকি কোনো পেশাই নয়। ইঞ্জিনিয়ারিং করলে নাকি ইনকাম বেশি করা যায়।আব্বুকে তখন আমি এত বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম, যে আমি আর্টকে পেশা হিসেবে নয়,নিজের শান্তির জায়গা হিসেবে দেখি।টাকার পিছনে আমি ছুটতে রাজি না।কিন্তু আব্বু আমার একটা কথাও কানে নেয় নি।একপ্রকার বাধ্য হয়েই চুপ হয়ে গিয়েছিলাম আমি।আমি লাইফে যেখানে কখনো টাকার পাশে তেমন দেখতামও না,সব সময় নিজের কমফোর্ট টা নিয়ে চিন্তা করেছি,সেখানে আমাকে জোর করে ওই টাকার গণ্ডিতেই ছুঁড়ে ফেলা হচ্ছিল"
সাহিত্য চুপ হয়ে গেল।তাকে দেখে মনে হচ্ছে শ্বাসটাও নেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে সে।মাথাটা নিচু করে শরীরের ভার পুরো ছেড়ে দিয়েছে সে।অন্ত সাহিত্যের পাশে এক নজর দেখে ভারি শ্বাস ফেলল।সাহিত্যের এসব অতীত সম্পর্কে অন্তর সবকিছুই জানা আছে।তবুও চুপ করে শুনছিল সে।না জানি আর কারো কাছে এরকম করে মন খুলে এই কথাগুলো বলতে পারে কিনা সাহিত্য?অন্তকে বলে না হয় একটু মনটা হালকাই হোক,তবুও যেন রা'গ আর জেদটা একটু কমুক।
কে জানে কি হলো? সাহিত্য পরমুহূর্তেই আবার গা ঝাড়া দিয়ে সটান বসে পড়ল।কন্ঠ যেন সম্পূর্ণ বদলে গেল তার।অতীতের সাহিত্যকে যেন আবার ছুড়ে ফেলে দিল রাস্তায়।বর্তমান সাহিত্যটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে দাঁড়ালো,
"সোহ্!আমার বাপের কথা মেনেই যেখানে টাকা বেশি আমি সেখানেই গিয়েছি।এন্ড হেয়ার আই এম!দা ওয়ান এন্ড অনলি পার্সোন হু ইজ রাইডিং অ্যাস্টন মার্টিন অন বাংলাদেশ রোডস!!"
শেষের কথাগুলো সাহিত্য কতটা ক্ষোভ নিয়ে বলল সেটা দেখেই যেন অন্ত হালকা ভ'য় পেতে শুরু করেছে এতক্ষণে।এই ১১ বছর ধরে সাহিত্য যে নিজের ভেতরে কি দাবিয়ে রেখেছে সেটা ভেবেই অন্তর স্টিয়ারিং ধরে রাখা কাপা হাতগুলো কিছুটা দৃঢ় হলো।
ছোট থেকেই অন্ত দেখেছে তার এই বড় ভাইটাকে সবসময় হাসিখুশি থাকতে।নিজের মাথা খেটে চিন্তা করে যেটা ঠিক মনে হয়েছে সেটাই করেছে সাহিত্য। অন্তর এই বড় ভাইটা নিঃসন্দেহে এক ব্রিলিয়ান্ট ছেলে। আর এই অত্যাধিক ব্রিলিয়ানদেরই মনে হয় সাধারণ মানুষের থেকে একটু আলাদা শখ থাকে।সাহিত্য শুধু তার জীবনটাকে সেপাশেই গড়িয়ে নিয়ে যেতে চেয়েছিল।কিন্তু সেটাই যেন তার ভাগ্যে ছিল না। এই কঠোর দুনিয়া তাকে নিজ ইচ্ছায় চলতে দেয় নি।
শান্ত কিন্তু গম্ভীর গলায় অন্ত বলল,
"কানাডায় যাওয়ার কারণ হিসেবে বড় বাবা কি শুধু তোমার দো'ষের কথাই বলেছিল?"
অন্তর হঠাৎ এমন কথায় ভড়কালো সাহিত্য,
"মানে?"
নিজের শরীরটাকে একটু শক্ত করল অন্ত।সময় নিয়ে বলল,
"বড় বাবা কল্পনার দো'ষ দেয়নি?"
সাহিত্য চোয়াল শক্ত করে গম্ভীর সুরে বলল,
"দিবে না কেন ওর দো'ষ?সব তো ওর কারণেই হয়েছিল সেদিন"
আবার শান্ত স্বরে বলল অন্ত,
"কতবার বলেছিল ওর কথা?"
অন্তর এমন হুট করে কথা বলাগুলো যেন সাহিত্যকে ক্ষণে ক্ষণে ভড়কে দিচ্ছে।গম্ভীর গলায় বলল সাহিত্য,
"তুই কি বলতে চাচ্ছিস?"
এবার মেকি হাসলো অন্ত,
"বলোনা কতবার বলেছিল?"
এবার বাধ্য হলো সাহিত্য অন্তর কথার উত্তর দিতে।ধিমি আওয়াজে শুধালো,
"মনে নেই আমার"
মুখে হালকা হাসি রেখেই বলল অন্ত,
"আমি বলি?....যতদূর সম্ভব কানাডায় যাওয়ার ১০-১১ দিন আগে থেকে"
সাহিত্য হালকা চেচিয়ে উঠল,
"হ্যাঁ তো কি হয়েছে?কি বোঝাতে চাচ্ছিস?"
"তুমি এখন যে ব্যবহারটা করছো সেটার জন্যেই বলেছে"
চেচিয়ে উঠলো সাহিত্য,
"ডোন্ট টক রাবিশ অন্ত!তুই আব্বুর সম্পর্কে কি বলতে চাচ্ছিস, নিজেও কি বুঝছিস?"
আবারো হালকা হাসলো অন্ত,
"জানো ভাইয়া?আমি নিজেকে এক দিক দিয়ে অনেক লাকি মনে করি।আর সেটা হলো যে আমি দাদুর রা'গ-জেদ পাইনি।সেই বিদঘুটে জিনিসটা যে খুবই খা'রা'প "
ঝাজিয়ে উঠল সাহিত্য,
"বা'স্টা'র্ড!!কথা না ঘুরিয়ে সরাসরি বল কি বলতে চাচ্ছিস!"
ভাইয়ের রাগ যে শেষ সীমানায় চলে এসেছে তা বুঝতে পারল অন্ত। ভাইয়ের রাগের ব্যাপারে ভালো করেই ধারণা আছে তার।অন্ত আগের ন্যায় শান্ত রইল। রাগ ওঠা যে ছেলেটার স্বভাবেই নেই।ঠোঁটের কোণা বাকিয়ে নিঃশব্দে হেসে সাহিত্যের উত্তর দিল সে,
"যাকে টক্কর দেওয়ার জন্য ছেলেকে কানাডায় পাঠাবে সেই ব্যক্তির মেয়েই যদি তার ছেলের দুর্বলতা হয় তাহলে ব্যাপারটা কেমন না?"
এতক্ষণে অন্তর কথা বুঝতে পেরে সাহিত্যের রাগটা যেন দপ করে নিভে গেল।ভাবলেশহীনভাবে নিষ্পলক অন্তর পাশে দেখে আছে সে।অন্ত তার ভাইয়ের মুখখানা একবার পরখ করে ড্রাইভিং এ মনোযোগ দিল,
"বাসার সবাই জানে তুমি কল্পনাকে কি পরিমাণে আদর করতে।বড় বাবা শুধু চেয়েছিল তার যেই ভাই তার সাথে খা'রা'প ব্যবহার করেছে তার থেকে সম্পুর্ণ দূরে সরে যেতে।কিন্তু তুমি যে অত সহজে কল্পনার থেকে দূরে সরে আসবে না সেটা তিনি ভালো করেই জানতেন।তাই ওই সময়টাকে শুধু একটু কাজে লাগিয়েছিল বড় বাবা.....আমি এখানে বড় বাবা বা মেঝো বাবা কাউকেই দো'ষ দিচ্ছি না।সব দো'ষ একমাত্র আমাদের দাদুর সেই রাগ আর জেদের।সেটাই যথেষ্ট আমাদের পরিবার ভেঙে দেওয়ার জন্য।নাহলে তুমি কি মনে করছিলে এতদিন,যে কল্পনা আর তোমার ওই ব্যাপারটা আমাদের পরিবার আলাদা হওয়ার আসল কারণ ছিল?একদম না।সেটা তো শুধু অজুহাত মাত্র।এতো তুচ্ছো একটা বিষয়ে কেনই বা বড় বাবা বাসা ছাড়বে আর কেনইবা তোমাকে কানাডায় পাঠাবে?একটু মাথাটা ঠান্ডা করে চিন্তা করার চেষ্টা করো ভাইয়া।প্লিজ, আমি তোমার কাছে হাতজোড় করছি"
সাহিত্যের পাশে পুরো নিস্তব্ধতা বয়ে যাওয়ায় মাথা ঘুরাল অন্ত।সাহিত্য আনমনে কি যেন চিন্তা করছে। ভাইয়ের চিন্তায় বিভোর মুখখানা দেখে স্বস্তি পেল অন্ত। যাক বাবা,সাহিত্যকে একটু হলেও তো এ বিষয়ে সিরিয়াস করতে পেরেছে সে।আর কিছু বলল না অন্ত। চুপ হয়ে গেল।আর বেশি কিছু বললে হয়তো হীতে বিপরীতও হতে পারে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
শেখ ভিলার লোহার গেটটা পার করতেই শেষ বিকেলের মিষ্টি রোদটা রয়েল গ্রীন অ্যাস্টন মার্টিনটাতে যেন আছড়ে পড়ল।যার দরুন রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটার উজ্জ্বলতা যেন কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেল।কিন্তু তার ভেতরে উপস্থিত সাহিত্যের চেহারা যেন কেমন ফ্যাকাশে হয়ে আছে। বাকি পথটুকু সাহিত্য আর অন্তর মাঝে কোনো কথা হয়নি।অন্তও আর আগ বাড়িয়ে কথা বলেনি।সাহিত্যকে একটু নিজ থেকে চিন্তা করতে দেওয়া উচিত।এত বছর পুরনো জিনিস তো আর একদিনেই ঠিক হয়ে যাবে না।মেইন গেটের সামনে গাড়ি ব্রেক করতেই সাহিত্য কিছু না বলে বেরিয়ে গেল।ভাইয়ের যাওয়ার পাশে দেখে হতাশার নিঃশ্বাস ফেলল অন্ত।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
গাড়ি গ্যারেজে পার্ক করে বাসায় ঢুকে অন্তর চোখ গেল ড্রয়িং রুমে।অনু আর সামিয়া দুজনেই মুখ ফুলিয়ে টিভির দিকে দেখছে।কিন্তু টিভি তো বন্ধ। দেখছেই বা কি তারা?তাদের পাশের সোফায় গা এলিয়ে বসতে বসতেই শুধালো অন্ত,
"কিরে?বেশি পড়াশোনা করে মাথা গিয়েছে নাকি তোদের?ইমেজিনারি টকশো কবে থেকে দেখা শুরু করলি?"
অন্তর কথায় দুজনেই কটমটিয়ে তার দিকে তাকালো।
তাতে হালকা ভড়কালো অন্ত,
"ওমন করে না দেখে, কি হয়েছে বলবি কি?"
চেহারার কঠোরতা বজায় রেখেই ভাইয়ের প্রশ্নে শুধালো অনু,
"১ ঘন্টা আগে মেঝো বাবা খবর দেখার জন্য টিভি অন করে।তার দুই-তিন মিনিট পর বড় বাবা এসে টেবিলের উপর থেকে রিমোটটা নিয়ে চ্যানেল চেঞ্জ করে টিভি দেখতে বসে।ব্যাস, শুরু হয়ে গেল তাদের প্রায় দিনের সতিনের ঝগড়া।একজন দেখবে 'যমুনা টিভি' আর আরেকজন দেখবে 'সময় টিভি'।টিভি একবার যমুনা একবার সময়,একবার যমুনা একবার সময়।দুজনেই যখন বাচ্চাদের মতো ঝগড়া করছিল অমনি দাদীও রুম থেকে বের হয়ে বাচ্চাদের মায়ের মতোই ধমক দিয়ে রিমোট নিয়ে রুমে চলে গেল।দাদীর এমন রা'গ উঠেছে যে আমরা রিমোট নিতে গিয়ে ধমক খেয়ে ফাঁকা হাতেই চলে এসেছি"
এবার বিরক্তি মাখা কন্ঠে সামিয়া বলে উঠল,
"এখানে সবচেয়ে ইন্টারেস্টিং ব্যাপারটা কি জানো?দুটো চ্যানেলে একই খবর চলছিল"
এবার অন্ত মুখ টিপে হেসে উঠল।এই বাড়ির পরিবেশ দেখলে তো মাঝে মাঝে মনে হয় জেনারেশন উল্টে গিয়েছে।কখন কে কি করে আল্লাহ মাবুদই জানেন।মুখে হাসি চেপে রেখে বোনদের সান্ত্বনা দিয়ে অন্ত নিজের রুমের উদ্দেশ্যে চলে গেল।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
অন্তর সাথে বাসা ফিরে গোসল সেড়েই একটু ঘুমিয়েছিল সাহিত্য।এখন সময় আটটা।সবে মাত্র উঠল।এমন ঘুম দিয়েছে যে মাগরিবের নামাযটাও কাযা হয়ে গিয়েছে।
ঘুমন্ত চোখে-মুখে পানি ছিটা দিয়ে ওয়াশরুম থেকে বের হতেই ফোন বেজে উঠল।স্টাডি টেবিল থেকে ব্ল্যাক লেদার কাভারে মুড়ানো আইফোনটা হাতে নিতেই ভিকির নাম চোখে পড়ল।টাওয়াল দিয়ে মুখ মুছতে নিয়েই ফোন কানে চেপে শুধালো সাহিত্য,
"হুম"
"কি রে?ঘুমিয়েছিলি নাকি?"
"হুম"
"আজকে তোর পি.এ.-র সাথে দেখা করার কথা ছিল,অফিস গিয়েছিলি কি?"
"হুম"
ভিকি একটু সময় নিয়ে শুধালো,
"আবার কি নাইটমেয়ারটা দেখেছিস?"
"না"
আগের ন্যায় শীতল সাহিত্যের কন্ঠ।
ভিকি এক ভারি নিঃশ্বাস ফেলে শুধালো,
"ভালো কথা।কিন্তু আমি এখন যেটা বলব সেটা ভালো নাও লাগতে পারে"
ভ্রু কুচকালো সাহিত্য,
"কেন কি হয়েছে?"
"কিছু হয়নি।কিন্তু আমি এখন যেটা করতে বলব সেটা তোকে করতে হবে"
রা'গ কোনো মতে দাবিয়ে রেখে দাঁত চিবিয়ে বলল সাহিত্য,
"সকাল থেকে সবাই এতো ঘুরিয়ে পেচিয়ে কথা বলছিস কেন?ম্যাগি নুডুলস না বানিয়ে কথা বলা যায় না?"
ভিকি জানে না সকাল থেকে কে-কে সাহিত্যকে ম্যাগি নুডুলস খাইয়েছে।কিন্তু সে এটা ভালো করেই বুঝলো যে এখন সাহিত্যের মাথা গরম আছে।কিন্তু কথাটা যে না বললেই নয়।শ্বাস টেনে বুকে সাহস নিয়ে শুধালো ভিকি,
"তোর জন্য আমি সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে অ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়েছি"
যে বিষয়টাকে সাহিত্য উপেক্ষা করতে চাইছে,আজ যেন সবাই হাত ধুয়ে সাহিত্যের পেছনে পরেছে সে বিষয়টা নিয়ে।
"তোকে আমি বলেছি নিতে?"
শান্ত,কিন্তু গা শিউরে ওঠার মতো কন্ঠ সাহিত্যের।
সাহিত্যের কন্ঠের ধরনের তোয়াক্কা করল না ভিকি,
"তুই না বললেও আমি বুঝি কোনটা তোর প্রয়োজন।আর এটা তোর জন্য ইমারজেন্সি"
"আমি যাচ্ছি না"
"অহি প্লিজ।এবার অন্তত আমার কথাটা শোন একটু।একটু চেকাপ করালে কি এমন সমস্যা হয়ে যাবে?"
"ভিকি আমি কোনো রোগী না যে সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়ে ট্রিটমেন্ট নিতে হবে"
"তুই কোনো রোগী না,ঠিক আছে মানলাম।কিন্তু গত ১১ বছর ধরে যে তিলে তিলে মানসিক টর্চারে ভুগছিস ওটার কি?"
"মানুষ কি দুঃস্বপ্নও দেখতে পারবে না এখ..."
"তাই বলে ওই একটা মাত্র দুঃস্বপ্ন?দীর্ঘ ১১বছর ধরে তো আর কোনো দুঃস্বপ্ন দেখিসনি।এটা নরমাল নয় অহি।ইউ হ্যাভ টু গেট সাম ট্রিটমেন্ট"
সাহিত্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই ভিকি তেতে উঠল।
"ওমন ইউজলেস বিষয়ের জন্য আমি কোনো ট্রিটমেন্ট নিতে পারব না"
কিছুক্ষণ নিরব থেকে ভিকি হালকা মেকি হেসে
উঠল,
"তার মানে তুই চাইছিস না যে ওই নাইটমেয়ারটা দেখা বন্ধ হোক?"
কিড়মিড়িয়ে উঠল সাহিত্য,
"ন'ন'সে'ন্স।সেটা আমি কখন বললাম?"
মুখের হাসি ধরে রেখেই শুধালো ভিকি,
"সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে গিয়ে ট্রিটমেন্ট নিলেই সেটা বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।এটা একটা কমনসেন্সের বিষয়।তো তুই যেহেতু যেতে চাইছিস না তার মানে তো সেটাই বুঝাচ্ছে"
সাহিত্যকে রাজি করার কৌশল ভিকি খুব ভালো করেই জানে।এবার ভিকি কোনোভাবেই হাল ছাড়বে না।সাহিত্যের এই বিষয়টা একমাত্র ভিকিই জানে।আগে ভিকি সব সময় কাছে থাকার দরুণ এ বিষয়ে সাহিত্যকে স্ব শরীরে ক্ষণিকের সান্ত্বনা দিতে পারত।কিন্তু এখন দূরে থাকায় সেটাও সম্ভব হয় না।বন্ধুটা যে ভাইয়ের থেকে কম নয় ভিকির কাছে।তাই তো এতো টেনশন হয় তাকে নিয়ে।
ভিকির কথায় সাহিত্য যেন আহাম্মক বনে গেল।মুখে কোনো কথা না আসায় আমতা আমতা করছে সে।
ভিকি শান্ত স্বরে শুধালো,
"আগামী সপ্তাহে অ্যাপয়েন্টমেন্ট আছে।বাকি ডিটেইলস ই-মেইলে দিয়ে দিব।আর হ্যাঁ,সাইকিয়াট্রিস্ট যেটা বলবে বা জিজ্ঞেস করবে সেটা অবশ্যই তোর ট্রিটমেন্টের অংশ হবে।তো মাথা গরম না করে তার কথা শুনিস"
সাহিত্যকে আর কিছু বলার সুযোগই দিল না ভিকি।তার আগেই কল কেটে দিল।
বিকেলের রা'গটা যেন এবার উগরে বের হয়ে আসতে চাইছে সাহিত্যের।স্টাডি টেবিলের ড্রয়ার থেকে লাইটার আর একটা সি'গা'রে'ট বের করে জ্বালাতে নিয়েই বেলকুনির দিকে হাটা দিল সে।ছাদবিহীন বেলকনিটা থেকে চৈত্র মাসের রাতের আকাশটা যেন চোখের কোনো পরিশ্রম ছাড়াই পরখ করা যাচ্ছে।
বাড়িতে একমাত্র সাহিত্যের রুমের বেলকুনিটারই কোনো ছাদ নেই।এমন না যে ছিল না।কিন্তু সাহিত্যের কথাতেই সেটা সড়িয়ে ফেলা হয়েছে।বেলকুনিতে ছাদটা থাকার কারণে নাকি সাহিত্য আকাশে মেঘের গতিবিধি বুঝতে পারত না।যেটা নাকি তার পেইন্টিং করার ক্ষেত্রে অসুবিধা হতো।আট বছর বয়সী সাহিত্যের এ কথা শুনার পর বাকিরা মুখে কিছু না বললেও সুবা আর অন্ত হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাচ্ছিল।বড় বোনকে কিছু না বলতে পারলেও ছোট ভাইকে উত্তমমধ্যম কিল-ঘুষি দিয়েছিল সাহিত্য।
এতোটুকু বাচ্চার সৃজনশীল চিন্তা ছোট থেকেই বাড়ির সদস্যদের দৃষ্টিকোণে আসায় তাদের জন্য নিত্য দিনের ব্যাপার ছিল সেটা।তারপরেও এ ব্যাপারে সবাই একটু কাচুমাচু করলেও বেলকুনির কাজ শেষ হওয়ার পর আশ্চর্যজনকভাবেই বেলকুনিটা অসাধারণ লাগছিল।যেন আরো একবার প্রমাণ হলো, সাহিত্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা আর তেলের সাথে পানি মেশা যেন একই।
ছাদ না থাকার কারণে বৃষ্টিটা যেমন বাধা ছাড়াই বেলকুনিটা দখল করে নেয় তেমন দিনের এক বেলা সুর্যের কিরণটাও ভালোভাবে আসে সেখানে।যার দরুণ নব শিশু কল্পনাকে বাড়ির তিন গিন্নির কেউ না কেউ প্রতিদিনই সুর্যের উষ্ণ তাপে সেখানে এনে তেল মালিশ করতেন।অনু ও সামিয়ার ক্ষেত্রেও তাই ছিল।তবে তাদের বেলায় সময়ের পরিধিটা অনেক কম বললেই চলে।
বাড়ির গিন্নিদের আবার এক জায়গায় ঠায় বসে থাকার সুযোগ আছে?দেখা গেল তেল মালিশের শেষের দিকে জা রা নিচ থেকে হাক পারছে।কোনো উপায় না থাকায় সাহিত্যের বিছানায়ই কল্পনাকে রেখে নিচে চলে যেতেন।সাহিত্যের অবশ্য প্রথম দিকে তেমন কোনো সমস্যা হতো না।কারণ প্রায় সময়ই ছেলেটা ক্যানভাসে নিজের মস্তিষ্কের কল্পনাকে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টায় ব্যস্ত থাকত।কিন্তু বিপত্তি তখন থেকেই ঘটা শুরু করল যখন থেকে এই চড়ুই পাখির মতো চঞ্চল মেয়েটা হামাগুড়ি দেওয়া শিখল।বাড়ির গিন্নিদের মতে বাচ্চাদের শরীরে যত তেল মালিশ করা হবে হাড্ডি-মাংস ততই শক্তপোক্ত হবে।উদাহরণ স্বরূপ বাড়ির প্রথম তিন সন্তান সুবা,সাহিত্য ও অন্তকেই দেখিয়ে দিতেন।তাহলে কল্পনার ক্ষেত্রে কেন কমতি রাখবে?
সেই নিত্য দিনের মতোই কল্পনাকে বিছানায় রেখে নিচে দৌড় লাগাতেন কোনো এক গিন্নি।সর্বোচ্চ পাঁচ মিনিটও হবে না।শুধু সাহিত্যের দিকে নজর পরার সময়টুকুর অপেক্ষা।ডাগর-ডাগর অক্ষি জোড়া দিয়ে সাহিত্যকে দেখা মাত্রই খিলখিলিয়ে হেসে উঠে বিছানার সীমানার উদ্দেশ্যে চার হাত-পা বাড়াতো কল্পনা।কতবার যে পড়ে যাওয়ার ঠিক আগ মুহুর্তেই দৌড়ে এসে কোনোরকম তাকে ধরেছে সাহিত্য তার হিসেব নেই।সাহিত্যের আশেপাশে অসংখ্য টকটকে রংগুলোকে ধরার জন্যই মনে হয় অবুঝ শিশুটি প্রতিবার উতলা হয়ে পরে।যেটা বুঝতে পেরে এবং আর কোনো উপায় না পেয়েই অয়েল পেইন্টের কিছু টিউব বিছানায় বসে থাকা কল্পনাকে ধরিয়ে দিত সাহিত্য।আর সে বুদ্ধি বিফলে যেত না।কিন্তু সময় পরিবর্তনের জন্য এক বুদ্ধি যেন খাটতো না এই চড়ুই পাখির মতো চঞ্চল মেয়েটার কাছে।
লম্বা-লম্বা তিন টানেই সি'গা'রে'টখানার অর্ধেকেরও বেশি শেষ করে ফেলেছে সাহিত্য।নিকোটিনের ধোঁয়ার কুন্ডলিগুলো বড়-বড় হলেও বাইরের তিমির অন্ধকার যেন সেগুলোকে গ্রাস করে নিয়ে অদৃশ্য করে দিচ্ছে।নিস্তব্ধ পরিবেশে হঠাৎই রুমের দরজায় নক করার শব্দ হলো।
"সাহিত্য ভাই।রাতের খাবারের জন্য চাচীমা নিচে ডাকছে"
এতক্ষণ থেকে টানা নিকোটিনটার যেন জীবন যৌবনের কোনো মূল্যই আর থাকল না।হাতের সেই মূল্যহীন নিকোটিনটা আঙ্গুলের ভাজ ছাড়িয়ে নিচে ফেলে মেঝে ও পায়ের বাটা স্যান্ডেলের মাঝে ঘষতে লাগল সাহিত্য।তার সাথে দাঁতের পাটি জোড়া ঘষার ফলেও হালকা কিড়মিড় আওয়াজ শোনা গেল সাহিত্যের অধর জোড়ার ফাক থেকে।
"শুনেছেন কি?"
সাহিত্য কোনো সাড়া না দেওয়ায় কল্পনা আবার ডাকল।
এখনো সাহিত্য বেলকুনিতে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।মিনিট কয়েক পর কল্পনা যেই না রুমের দরজার হ্যান্ডলক ঘুরিয়ে সুতা পরিমাণ দরজা খুলেছে অমনি সাহিত্য পেছনে না ঘুরেই উল্টো হাতে বেলকুনির দরজাটা ধাম করে লাগিয়ে দিল।
হঠাৎ বাজখাই এক শব্দে কল্পনা হাতে-পায়ে লাফিয়ে উঠল,
"সরি সরি,ঢুকব না ভিতরে।শুনতে পেরেছেন তো চুপ করে ছিলেন কেন?শুনেছেন যেহেতু তাহলে আমি গেলাম।চাচীমা তাড়াতাড়ি আসতে বলল"
ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে গড়গড় করে কথাগুলো বলে ভো দৌড় লাগালো কল্পনা।
বেলকুনির আধারে বাইরের দিকে শক্ত নজর রেখেই ট্রাউজারের পকেটে দুই হাত ঢুকিয়ে কিড়মিড়িয়ে উঠল সাহিত্য,
"ব্লা'ডি বি'চ"
#চলবে
গল্প নিয়ে কারো কোনো প্রশ্ন থাকলে নির্দ্বিধায় করতে পারেন।আমি উত্তর দেওয়ার চেষ্টা করব,😊