#পর্ব_১৩
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
নারীদের জীবনের সবচেয়ে ব্যস্ত সময় অতিবাহিত হয় স্বামীর ঘরে।এমনটা নয় যে খেটেখেটে জীবনের পানি বের করে পরিশ্রম করার কারণ হিসেবে এ কথা বলা হয়েছে।যদিও বা বাঙালী সংস্কৃতি পরখ করলে অনেকটা সে দিকটাই বুঝায়।কিন্তু আসল ব্যস্ততার কারণ হলো যার জন্য সেই ঘরে স্থান পেয়েছে সেই ব্যক্তির অর্থাৎ স্বামীর একটু আদর-যত্ন করা।
এটা এগিয়ে দেওয়া, ওটা এগিয়ে দেওয়া,যত্নে তার জন্য রান্না করা ভাত বেরে দেওয়া,পাখা বাতাস করা,বাজারে যাওয়ার সময় স্বযত্নে গুছিয়ে রাখা কাপড় নিয়ে গিয়ে হাতে দেওয়া,আরো কত কি!দিন শেষে এতো কিছুর পর বাজার থেকে গুটিকয়েক ফুল বা এক থোকা সুগন্ধি গাজরা আনলেই যেন সেই কোমল নারী হৃদয় মোমের মতো গলে যায়।
মহুয়া বেগমও ছিলেন সেরকম এক নারী।আর এহনাফ শেখও স্ত্রীকে যথেষ্ট যত্নে রাখতেন।কিন্তু স্বামীর ই'ন্তে'কালের পর ব্যস্ত জীবনে যেন ভাটা পরে মহুয়া বেগমের।আর তিন ছেলের তিন গিন্নি তাদের দায়িত্ব ভালো মতো পালন করেন দেখেই যেন মহুয়া বেগম শাশুড়ী হওয়ার মজা ভালো করেই নিতে পারছেন।বয়সের ভারে রুম থেকে সচরাচর বের হওয়া হয় না তার।দিনের প্রায় সময়ই আল্লাহর দরবারে হাত তুলে প্রার্থনা করে,কুরআন তিলাওয়াত করেই পার করে দেন।কিন্তু বাড়ির বাচ্চাগুলোর জন্য যেন সেই রুমটাও কোলাহলপূর্ণ থাকে প্রায় সময়।বউমারাও এসে মাঝে মাঝে শাশুড়ীর সাথে ভারি পাল্লার আড্ডা জমায়।তারপরেও ছোট জমিদার বাড়িটা এক নজর একটু পরখ করার জন্য মাঝে মাঝে বাইরে বের হন তিনি। কিন্তু এই ক্যা'ন্সা' রের অছিলায় সেটাও একটু কমে গিয়েছে আজকাল।
মুহিত সাহেব এসে আগেকার মতোই নরমাল চেকাপ দিয়ে যান।বাড়ির কেউ সামনে পড়লে কি যে উল্টা-পাল্টা বুঝিয়ে দেন মহুয়া বেগমের সে সব মাথায় ঢোকে না।
শুভ্রা রঙা শাড়ির আচলখানা মাথায় চড়িয়ে আজ রুমের বাইরে বেরিয়েছেন মহুয়া বেগম।উদ্দেশ্য তিন বউমাদের সাথে একটু গল্প করবেন।সেই উদ্দেশ্যেই রান্নাঘরে ঢুকে পরলেন।তিন গিন্নিই উপস্থিত।কিন্তু ১১ বছর আগের সেই মিষ্টান্নতা নেই।
"এটা কি শ্ম'শা'ন বাড়ি নাকি?শ্ম'শা'ন বাড়িতেও তো মনে হয় মাঝে মাঝে মনুষের কোলাহল শোনা যায়"
শাশুড়ীর কঠোর গলার কথায় তিন গিন্নিই কেপে উঠলেন।কিন্তু কোনো কথা বলার সাহস পেলেন না।
মহুয়া বেগম আগের স্বর বজায় রেখে আবার শুধালেন,
"ওই ই'তো'র দুটোর সাথে থেকে থেকে তোদেরকেও কি ওদের জ্বর ধরেছে?দুটো কু'লা'ঙ্গা'র পেটে ধরেছিলাম আমি।বাড়ির বাচ্চাগুলোও ওই দাঁত পরা বুড়ো দুটোর থেকে ভালো বোঝে।ওদেরকে তো এতো বুঝিয়েও লাভ হচ্ছে না।কিন্তু তোদের দুজনের ঝাঁটা পেটা করতে একটুও দেরি করব না"
বউদের সাথে বন্ধুত্বের সম্পর্কটা বেশ ভালো দেখেই তুমির স্থানে তুই বলে সম্বোধন করেন মহুয়া বেগম।তেমন শাশুড়ীর বদলে মায়ের মতোই ঝাড়তেও দ্বিধা করেন না।মহুয়া বেগমের ঝাড়ুনিতে আমেনা শেখ ও হেনা শেখ আড় চোখে শাশুড়ীকে একবার পরখ করে আড় চোখে একে অপরকে দেখতে গিয়েই দুজনেই ধরা পরলেন।সাথে সাথে নজর ঘুরিয়ে নেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না।
মুখ তুলে কথা বলার সাহস নেই তাদের মাঝে।যাদের জন্য এত কিছু তাদেরই কিছু যায় আসে না,আর তাদের অর্ধাঙ্গিনীগুলো যেন শিটিয়ে আছেন।স্বামীদের কর্মে যেন নিজেরাই অনুতপ্ত হয়ে লজ্জায় মাথা হেট করে আছেন তারা।আর তার সাথে নিজেদেরও কিছু সুপ্ত ক্ষো'ভ। যা সংমিশ্রণ হয়ে মুখে একেবারে তালাই ঝুলে গিয়েছে।
হয়তোবা তাদের মাঝেও এমন কিছু অজানা আছে যেটা জানলেই হয়তো একটু স্বাভাবিকভাবেই কথা বলতে পারতেন।সেই ভুল ধারনা থেকে একটু হলেও বের হতে পারতেন।কিন্তু নিয়তি যে তাদের সাথে নেই।ছোট কোনো এক ভুল ধারণাই মনের কোনে আঁকড়ে ধরে আছেন তারা।
নিস্তব্ধ পরিবেশ দেখে মহুয়া বেগম লতিফা শেখকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
"বুঝলি লতিফা,বাড়ির সুখ-শান্তি নষ্ট করতে বাইরের কেউটে সা'প লাগে না,বাড়ির ঘরঘড়িয়া সা'পই যথেষ্ট"
কথা শেষ করে রান্নাঘর থেকে বের হতে নিয়ে আবার পেছনে ঘুরে দাড়ালেন মহুয়া বেগম।লতিফা শেখকে উদ্দেশ্য করে ঝাঝালো কন্ঠে বললেন,
"তোরা কেন বাদ থাকবি?তোরাও লেগে পড়।রঞ্জককে বলবি সেও যেন টিভির রিমোট নিয়ে ঝ'গ'ড়া শুরু করে দেয়"
কথা শেষ করেই হনহনিয়ে বেড়িয়ে গেলেন তিনি।
লতিফা শেখ বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
"কিছু না করেও মিষ্টি উপহার পেলাম"
শাশুড়ী যাওয়ার মিনিট পাঁচেক পর হেনা শেখও নিজের রুমের দিকে হাটা দিলেন।ফাহাদ শেখ অফিস যাওয়ার উদ্দেশ্যেই বের হচ্ছিলেন।মাঝ রাস্তায় স্ত্রীর দেখা পেয়ে শুধালেন তিনি,
"কি হয়েছে?আম্মার উচু গলা শুনলাম।কি বলছিল?"
স্বামীর কথায় তেতে উঠলেন হেনা শেখ,
"আম্মা আপনাকে দাঁত পড়া বুড়ো বলেছে"
স্ত্রীর এহেন কথায় ভ্রু কুচকালেন ফাহাদ শেখ,
"কীহ?কেন?"
"আমাকে কেন বলছেন?আপনার মাকে গিয়ে জিজ্ঞেস করেন"
কন্ঠে আগের কঠোরতা বজায় রেখে কথাটা বলে হনহনিয়ে রুমে ঢুকে গেলেন হেনা শেখ।
সেপাশে কয়েক মুহুর্ত ভ্রু কুচকে তাকিয়ে থেকে ব্যতিব্যস্ত পায়ে অফিসের জন্য বেড়িয়ে পরলেন ফাহাদ শেখ।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"চাচিমা,তোমার কাছে পেইন কি'লার আছে কি?"
"তুই পেইন কি'লার কি করবি?"
"কয়েকদিন বাদে এক্সাম শুরু হবে।হাতের ব্য'থায় পড়ায় কনসান্ট্রেটই করতে পারছি না।পেইন কি'লার থাকলে দাও তো"
"এ কয়দিনেও ব্য'থা যায়নি?নিজের অপকর্মের ভুক্তভোগী হলি তো এবার নিজেই?বুঝ এখন।দাড়া দেখি ঔষধ আছে কিনা"
কল্পনার পাশে অনু এসে দাড়ালো,
"ভাগ্য ভালো যে বাম হাতে লেগেছে।নাহলে তো এক্সামটা দেওয়াই বেহেশতে যেত"
অনুর কথায় কল্পনা ভাবলেশহীন হাসলো।
করিডোর থেকে সিড়িতেই পা রাখছিল সাহিত্য।নিচের কথোপকথন শুনে পা জোড়া থমকে গেল।কেমন জানি হাসফাস লাগছে তার।কেন হাসফাস লাগছে তা বুঝে উঠার আগেই রা'গের উদয় হলো।যার কারণে প্রশ্নের উত্তর খোঁজা অর্ধেক রাস্তাতের ছেড়ে দিল।
ভাবনা থেকে বের হয়ে সামনে দেখতেই ডাগর ডাগর অক্ষি জোড়ার অধিকারী অষ্টাদশীর দেখা মিললো।ঘন ঘন অক্ষি পল্লব ফেলছে আর হাবার মতো সাহিত্যের পাশে দেখে আছে কল্পনা।দেখবেই বা না কেন? ডারবি ব্লাক সু এর উপরে ব্লাক ফরমাল প্যান্ট। তার সাথে ম্যাচিং করে বাম হাতের কব্জিতে গোল ডায়ালের black rado jubile ঘড়ি চাপানো।এগুলোকে ছাড়িয়েও যেন এক ধাপ বেশি আকর্ষণীয় লাগছে পড়নের কোরাল রঙা বাটোন আপ শার্টটা।ক্ষণিক বাদে নিজের বে'হা'য়ার মতো কাজকর্মে যেন আবার আহাম্মক বনে গেল কল্পনা।তাড়াতাড়ি নজর ঘুরিয়ে নিল।
"সাহিত্য ভাই এক মিনিট দাড়ান!"
হঠাৎ কি যেন মনে পড়ায় ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলে নিজের রুমের দিকে দৌড় লাগালো কল্পনা।
কিছু মাথায় না ঢোকায় কয়েক মুহুর্ত সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে রইল সাহিত্য।অতঃপর নিজের মতো সিড়ি দিয়ে নামতে লাগলো।ক্ষণিক সময়ের ব্যবধানে যেভাবে গিয়েছিল ঠিক সেভাবেই হুড়মুড়িয়ে এসে সাহিত্যের পথ আটকে ধরলো কল্পনা।দুই হাত দিয়ে একটা খাম সাহিত্যের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
"দুই নম্বর চিঠি"
চিঠিটাতে চোখ পরার আগে কল্পনার হাতে চোখ গেল সাহিত্যের।কালচে ভাবটা হালকা হয়ে চারপাশে হলুদ হয়ে আছে।নিজের হাতের উপর নিজেরই সন্দেহ হলো সাহিত্যের।জিম করে-করে হাত নাকি পাথর বানিয়েছে সে?দেখে তো মনে হচ্ছে সেদিন আর একটু জোরে মোচড় দিলে হাড্ডিটাই মুটুশ করে ভেঙে যেত।
সাহিত্য কল্পনার হাতের দিকে দেখছে সেটা বুঝতে পেরে সাথে সাথে বাম হাতটা পেছনে লুকালো কল্পনা।
"কিছু হয়নি।ঠিক হয়ে যাবে"
রোগীর গুরুতর অবস্থা হওয়ার পরেও ডাক্তাররা যেভাবে বলে ঠিক সেই ভাবখানাই কল্পনার মুখে।
সাহিত্যের গম্ভীর চেহারার কোনো পরিবর্তন না দেখে গলা পরিষ্কার করে আবার শুধালো কল্পনা,
"কাজের ব্যস্ততায় প্রতিদিন হয়তো চিঠি পড়ার সময় পাবেন না।তাই এখন থেকে দেরি করে দেব।তারপরেও একটু খুলে দেখিয়েন,প্লিজ"
সাহিত্য আগের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে রইল।কল্পনার একটু সন্দেহ হচ্ছে।দেখতে তো একদম গ্রিক গর্ডের মতো লাগছেই।আবার গ্রিক গর্ডের মতো মুর্তিই হয়ে গেল নাকি?কিন্তু সেই মুর্তি নড়ার অপেক্ষা করলে তো কল্পনার ঘোর বিপদ।ল্যাভেন্ডার পারফিউমটা প্রতিটা প্রঃশ্বাসের সাথে কল্পনার শরীরে ঢুকায় পা জোড়া যে মৃদু কাপছে মেয়েটার।সামনের গ্রিক গর্ডের মুর্তি থেকে হালকা ভেনিলা স্মেল যুক্ত পুরুষালী ল্যাভেন্ডার পারফিউমটা এতক্ষণে মনে হয় কল্পনার শরীরের সব বায়ুর জায়গা দখল করে নিয়েছে।একটা পারফিউমের ঘ্রাণ এতো মোহনীয় ও নেশালো কীভাবে হওয়া সম্ভব!কখন যে পা'গ'লের মতো গিয়ে সাহিত্যের শার্টে নাক ঘষতে লাগে সেই ভয়েই আছে কল্পনা।
এরকম পারফিউম ব্যবহার করার দরকারটাই কি?অনু-সামিয়া না হয় ছোট মানুষ,ওদের কথা বাদ দিক।কিন্তু কল্পনা যে এতো বড় একটা মেয়ে এ বাড়িতে থাকে,সেদিকে কি খেয়াল আছে?এটা কি ইন্ডিরেক্টলি কল্পনাকে নিজের দিকে আকর্ষণ করা হচ্ছে না সাহিত্যের?নিজের পা'পের হাড়ি তো ভরাচ্ছেই সাথে কল্পনার পা'পের হাড়িতেও কিছু পরিমাণ ঢেলে দিচ্ছে।
সাহিত্য যখন কিছুতেই কল্পনার হাত থেকে চিঠিটা নিচ্ছে না তখন কল্পনা পারফিউমের ফাদে পরে পা'গ'ল না হওয়ার উদ্দেশ্যেই সাহিত্যের হাতে থাকা ফাইলটার ভেতরে চিঠির অর্ধেক অংশ ঢুকিয়ে দিল।
"পড়ে নিয়েন,কেমন?"
হাসি মুখে কথাটা বলে একপ্রকার দৌড়েই নিচে চলে গেল কল্পনা।
ক্ষণিক বাদে লতিফা শেখের ডাকে গ্রিক গর্ডের মুর্তিটা যেন সজাগ হলো।নজর গেল ফাইলের ভেতরে থাকা চিঠির উপর।আরো একটি চিঠি পড়তে যেন বাধা আসছে নিজের ভেতর থেকে।হয়তো বা প্রথম চিঠিটা পড়ে নিজের অনুভূতিরা বাধ ভাঙতে চাইছিল সেজন্যই।কিন্তু,আবার কেন জানি মনের কোনো এক অংশ উসখুস করছে জানার জন্য,যে কি লেখা থাকতে পারে এটাতে?আবার কীসব নিজের উল্টা-পাল্টা অনুভূতি লিখেছে এই মেয়েটা?লতিফা শেখের আবার ডাকে হুশ ফিরল সাহিত্যের। চিঠিটা পুরোপুরি ফাইলে ঢুকিয়ে দিয়ে ডাইনিং টেবিলে এসে বসল সাহিত্য।
লতিফা শেখ সাহিত্যের প্লেটে পরোটা দিতে নিয়েই শুধালেন,
"সব সময় তো সকাল সকালই অফিস যাস।তো আজ আবার দশটায় যাচ্ছিস যে?"
"একটা ছোটখাটো মিটিং আছে।ওটা শেষ করেই চলে আসবো"
পরোটা-ভাজি মুখে পুরে ফোলা গালেই বলল কল্পনা,
"চাচিমা আমার আজকেও আসতে দেরি হবে।তুমি দুপুরের খাবার ফ্রিজে রেখে দিও"
ভ্রু কুচকালেন লতিফা শেখ,
"তুই না বলেছিলি এই সেমিস্টারে প্রতিদিনের প্রায় শেষ ক্লাসই দুপুরের দিকে শেষ হবে?তো কয়েকদিন থেকে এই দেরি করে বাড়ি ফেরার মানেটা কি?"
কল্পনার পাশে অনুও বসে নাস্তা করছিল।দুষ্টু মাখা চোখে কল্পনার পাশে দেখে মুখ ভেংচিয়ে বলল,
"বয়পেন্দ?বয়পেন্দ?"
অমনি বড় আকারের একটা বিষম খেল কল্পনা।
সাহিত্য আড় চোখে দেখে আবার খাবারে মনোযোগ দিল।সেদিন ভার্সিটির সামনে কল্পনার সাথে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার কথা মনে পড়ল তার।সেটাই কি কল্পনার বয়ফ্রেন্ড?প্রেম করার জন্য ওমন একটা থার্ড ক্লাস ছেলেকেই পেল?সাহিত্যের ইচ্ছে তো করছে আগে ওই ছেলেকে ঠাডিয়ে একটা লাগাক,তারপর কল্পনাকে কয়েকটা কড়া কথা শুনাক যে,ছোট থেকে একটা ওয়েল ম্যানার্ড ছেলের আঙুল ধরে-ধরে ঘুরে অবশেষে রুচির দুর্ভিক্ষের পরিচয় দিয়ে শেষমেষ ওই সজনা গাছের কচি ডালের সাথেই প্রেম করতে হবে?আসল কথা হলো প্রেমটাই বা কেন করতে হবে!সাহিত্যের রা'গের তোপের প্রভাব আপাতত বেচারা পরোটার উপর পড়ল।যার দরুন টেনে এক অংশ ছিড়লো সেটার।
"একদম লাগিয়ে দেব একটা।কি সব বাজে বকছিস?"
বিষম কাটিয়ে কোনোরকম পানি খেয়ে অনুর উদ্দেশ্যে তেতে উঠল কল্পনা।যেটা শুনেই ভাবনায় ছেদ পরে বাস্তবে ফিরে এলো সাহিত্য।এতক্ষণ কি ভাবছিল হুশে আসতেই ভড়কে গেল সে।ওই মেয়ে সজনা গাছের ডালের সাথে প্রেম করবে নাকি কলা গাছের ডালের সাথে প্রেম করবে সেটা নিয়ে সাহিত্য কেন মাথা ঘামাচ্ছে? মিটিংটার জন্য মাথা ঠান্ডা রাখা দরকার আর কি সব অহেতুক চিন্তা-ভাবনা করছে সে।
"আচ্ছা ওকে লাগাতে হবে না।দেরিটা হচ্ছে কেন সেটা বল"
তাড়াহুড়ো করে পানি খেতে গিয়ে ঠোঁটের চারপাশে লাগা পানি পড়নের বেগুনি রঙের থ্রিপিসের ওড়না দিয়ে মুছে লতিফা শেখকে উত্তর দিল কল্পনা,
"পহেলা বৈশাখের অনুষ্ঠান হবে।তো এবার সাহস করে ডান্সে নাম দিয়েছি।কখনো তো এক্সট্রা কারিকুলার অ্যাক্টিভিটিসে যাওয়াই হয় না।তাই ভাবলাম এবার একটু ট্রাই করা উচিত"
কল্পনা নিজ ইচ্ছায় কোনো অনুষ্ঠানে পার্টিসিপেট করছে এটাই যেন বিরাট কথা।প্রাকটিস করতে গিয়ে নাকি অনেক পরিশ্রম করতে হয় দেখে ছোট থেকে কল্পনা সেসব থেকে পালিয়ে বেড়াত। না করে-করে একসময় বন্ধই হয়ে গিয়েছিল সেপাশের চিন্তা।
অনু আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
"তুমি কোন গানে ডান্স করবে আপু?"
মুখের মধ্যে আবার পরোটা-ভাজি পুরে বলে উঠল কল্পনা,
"গ্রুপ ডান্স দিব একটা।'বারসো রে মেঘা' "
অনুর চোখ জোড়া মারবেল আকার ধারণ করল,
"সত্যি??ইস,ওই গানটা আমার কি যে পছন্দ,জানো!বৃষ্টির মধ্যে ওই গানে নাচার মজাটাই আলাদা হবে"
অনুর কথাটা শেষ হওয়ার ন্যানো সেকেন্ডের মধ্যে দুই বোনই একে অপরের দিকে দাঁত বের করে দেখতে লাগলো।লতিফা শেখ তাদের মতি গতি বুঝতে পেরেই তেতে উঠলেন,
"খবরদার যদি তোরা ওই চিন্তা মাথায় এনেছিস!বৈশাখের প্রথম দিকের বৃষ্টি একদম ভালো হয় না"
অনু মায়ের দিকে ঘুরল,
"আরে আম্মু, আমি আবার কই ভিজতে চাচ্ছি?আমি তো আপুকে বলছি।নাচটা পুরা ফিল নিয়ে প্রাকটিস করতে পারবে"
"একদম না।আর কল্পনা তুই যদি বাড়াবাড়ি করেছিস তাহলে আমি ভাবিকে বলে দেব"
লতিফা শেখের নিষেধাজ্ঞায় অনু ও কল্পনার মুখে ভাটা পরে গেল।
এরই মধ্যে সাহিত্য খাওয়া শেষ করে দাঁড়িয়ে পরেছে।লতিফা শেখ কফি দিতে চাইলে 'অফিসে খেয়ে নিব' বলেই বেড়িয়ে পড়ল সে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"সো আওয়ার নেক্সট টপিক ইজ..."
ফাইলের এক কাগজ উল্টাতেই কথা আটকে গেল সাহিত্যের।ফাইলের ভেতরে থাকা চিঠিটা তাকেই দেখছে।
"এনি প্রবলেম স্যার?"
রবির কথায় তার পাশে দেখল সাহিত্য।সাথে সাথে রবি ভ্রু নাচালো।
"নো নো,এভরিথিং ইজ ফাইন"
চিঠিটা ড্রয়ারে রেখে আবার মিটিং-এ মনোযোগ দিল সাহিত্য।
মিটিং শেষে এখন নিজের কেবিনে বসে আছে সাহিত্য। হাতে কল্পনার দেওয়া চিঠিটা।কি জন্য সেটি হাতে ধরে আছে জানা নেই তার।কিন্তু চিঠিটা ফেলে দেওয়ার কথা চিন্তা করলেই কেন জানি এক অজানা বাধা আসছে।
সাহিত্য কি বদলে গিয়েছে?কানাডায় থাকা অবস্থায় এই একই চিঠি চোখে দেখার ইচ্ছাটাও জাগেনি।আর এখন সেই চিঠিই হাতে নিয়ে আছে।এটার কারণ কি অন্তর সেদিনের বলা কথাগুলো?এই প্রথম এ বিষয়ে চিন্তা করতে গিয়ে সাহিত্যের মস্তিষ্ক সামান্য হলেও তার নিয়ন্ত্রণে আছে।কিন্তু কে জানে?কখন যে আবার রা'গটা উঠবে তার কোনো নিশ্চয়তা নেই।কিন্তু তারপরেও যেন সাহিত্যের চলা এক অন্ধকার পথের শুরুর দিকে অন্ত সূক্ষ্ম পরিমাণে আলো জ্বালিয়ে দিয়েছে।যার দরুণ চিঠিটা স্বাভাবিকভাবে খুলেই পড়া শুরু করল সাহিত্য।
📜...................….................................................
শ্রদ্ধেয় সাহিত্য ভাই,
আসসালামু আলাইকুম। কি ব্যাপার?চিঠির উত্তর দেননি কেন?আমি তো একদম ঠিক এড্রেসেই পাঠিয়েছিলাম।আপনি কি খুব ব্যস্ত?ব্যস্ত থাকতেই পারেন।এতো বড় বিজনেসম্যান যেহেতু।কিন্তু আমি যে এখানে আপনার চিঠির অপেক্ষা করছি। আর আপনি তো ভালো করেই জানেন যে আপনার কল্পনার একদম ধৈর্য নেই। তাই তাড়াতাড়ি চিঠি পাঠান না।বেশি কিছু লিখতে হবে না। অল্প কথা লিখলেই হবে।
এক মিনিট। আপনি কি বাংলা ভুলে গিয়েছেন?আল্লাহ প্লিজ হ্যাঁ বলিয়েন না!আমি কানাডার ভাষা কিছুই জানি না। আপনি বাংলা ভুলে গেলে তো আমার এই কথাটাও বুঝতে পারবেন না। হায় আল্লাহ!!
ইংরেজি তো পারেন, তাই না?
Please shahitto vai, reply to my mail !!!!!!
From,
Omrita shaikh kolpona
.......................................................................📜
চিঠিটা পড়ে সাহিত্যের মুখে কোনো অনুভূতি প্রকাশ পেল না।শুধু চিঠির শেষের নামটার দিকে অপলক দেখে আছে।
হুট করে কি যেন ভেবে ভ্রু জোড়া কুচকে গেল তার। মাথায় এই চিন্তা আসলো যে পরবর্তী চিঠিটা বাংলায় থাকবে নাকি ইংরেজিতে থাকবে নাকি ফ্রেঞ্চ-এ লিখা থাকবে?কল্পনা প্রথম চিঠি দেওয়ার সময় বলেছিল সে নাকি এগুলো অনেক আবেগ নিয়ে কষ্ট করে লিখেছে।আর সেটার মানে যদি হয় কল্পনা বাকি চিঠিগুলো ফ্রেঞ্চ-এ লিখেছে তাহলে সাহিত্যের মতে এই পুরো ইহ জগতে ওই মেয়েটার থেকে গ'ন্ড-গ'বেট আর দ্বিতীয় কেউ নেই।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
গাড়ির দরজা খুলতে গিয়ে ফাহাদ শেখ লক্ষ করলেন গাড়ির সামনের একটা টায়ার পাঞ্চার হয়ে গিয়েছে।হাতের ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে দেখলেন অফিসের জন্য এখনো অনেক সময় আছে।তাই গ্যারেজের স্টোররুম থেকে টায়ার বের করে সময় নিয়েই সেটা বদলে নিলেন।
গাড়ির একটা টায়ার বদলাতেই শক্তপোক্ত মানুষটা অনেকটাই ঘামে ভিজে গিয়েছেন।কাজ শেষে আবার হাতের ঘড়ির দিকে দেখলেন।পনেরো মিনিট বাকি আছে।সময় মতো পৌছানো সম্ভব হবে।কিন্তু চোখ জোড়া কপালে উঠল যখন গাড়ির পেছনের চাকায় চোখ গেল।সেটাও পাঞ্চার হয়ে আছে।ফাহাদ শেখ রিস্ক নিলেন না। বাকি চাকা দুটোতেও নজর দিলেন।অতঃপর গ্যারেজের ভেতর থেকেই হুং'কার ছাড়লেন,
"দেবু মশাই!এসব কে করেছে?"
বাড়ির দোতলায় বাহিরের পাশের করিডোরের কিছুটা জায়গা নিয়ে বিশাল এক বারান্দার মতো।ফাহাদ শেখের চিৎ'কার শুনে সেখানে দাঁড়িয়ে থাকা কল্পনা পেট চেপে ধরে হো হো করে হেসে উঠল।কোনো রকম হাসি নিয়ন্ত্রণে এনে ফাহাদ শেখের প্রশ্নে বিড়বিড় করে আওড়ালো সে,
"তোমার এই গুণধর কন্যা সন্তান"
আজ তোফায়েল শেখের গাড়ি ছাড়া ফাহাদ শেখ টাইমলি অফিস কেমন করে যান সেটাই দেখবে কল্পনা।
গ্যারেজের ভিতরে ফাহাদ শেখ যখন টায়ার পাঞ্চার করা আগন্তুককে ঝাড়ছিলেন এবং বাড়ির দারোয়ান দেবু মশাই মাথা চুলকাচ্ছিলেন তখনই গ্যারেজে আগমন ঘটে তোফায়েল শেখের। আড় চোখে ফাহাদ শেখের গাড়ির টায়ারের পাশে দেখে মুচকি হেসে নিজের গাড়ির দিকে এগুলেন।এতে যেন ফাহাদ শেখের রা'গটা সপ্ত আসমান পার করে তিনতলা বিল্ডিং বানিয়ে ফেলল।তেতে উঠলেন তিনি,
"মানুষের গাড়ির টায়ার পাঞ্চার করে দিয়ে হাসতে লজ্জা করছে না?"
ভড়কে গেলেন তোফায়েল শেখ,
"কি বললে?আমি তোমার গাড়ির টায়ার পাঞ্চার করেছি?"
"নয়তো আর কে? দাঁতগুলো দেখে তো ওটাই মনে হচ্ছে"
"এই ভদ্রভাবে কথা বলো।বড় ভাই হই তোমার"
"বড় ভাই হন তো বাচ্চাদের মতো কাজ করেছেন কেন?"
"কি বললে?কি করেছি আমি?"
"এতো স্মরণ শক্তি কম কেন আপনার?টায়ারের কথা বলছি"
"টায়ারটা আমি পাঞ্চার করলে না আমার স্মরণে থাকবে!"
"বড় সাহেব, আপনি না হয় মেঝো সাহেবকে একটু অফিসে নামিয়ে দিয়েন"
এ বাড়িতে দারোয়ান হিসেবে ঢোকার দেবু মশাইয়ের দুই বছর হচ্ছে।তাই বাড়ির পরিস্থিতির ব্যাপারে তার কোনো ধারণা নেই।
দেবু মশাইয়ের ব'ম ফাটানো কথাটার পর কিছুক্ষণ নিস্তব্ধ রইল পরিবেশ।
হঠাৎ গ্যারেজের ভেতর থেকে যখন আওয়াজ আসা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেল তখন কল্পনা গ্যারেজের দিকে মুখ করে চিৎকার দিয়ে উঠল,
"বাবা!ল্যান্ডফোনে ওয়াহিদ আংকেল কল দিয়েছিলেন।মিটিং এর জন্য নাকি দেরি হচ্ছে"
ল্যান্ডফোনে কেউ কল দেয়নি।ফাহাদ শেখের আজকের অফিসের শিডিউল কল্পনা জেনে রেখেছে।নিজের প্লান ভালো করে খাটাতেই সে হিসেবে কথা বলছে।
কল্পনার গলা শুনে যেন ফাহাদ শেখের চোখ কপালে উঠল।কেমন হাসফাস লাগছে তার।টাইমলি কীভাবে পৌছাবেন সেটাই বুঝছেন না।
"তুমি চাইলে আমি তোমাকে লিফট দিতে পারি।পরে সেটা শোধ করে দিও না হয়"
গম্ভীর কিন্তু শান্ত কন্ঠেই বললেন তোফায়েল শেখ।
কিন্তু ফাহাদ শেখ উচু গলায় ফুসে উঠলেন,
"আমার উপর কোনো দয়া দেখানোর প্রয়োজন নেই।নিজের খেয়াল আমি নিজে রাখতে পারি।না আপনার কাছে কোনোদিন কিছু চেয়েছিলাম আর না চাব।না ক্ষমা না অন্যকিছু"
কথা শেষ করেই বড় বড় পা ফেলে গ্যারেজ থেকে বেড়িয়ে গেলেন ফাহাদ শেখ।এবার যেন তোফায়েল শেখেরও রা'গটা চড়াও হলো।ঝাঝালো কন্ঠে বলে উঠলেন তিনি,
"তোমার এই ব্যবহারই তোমার পতন আনবে ফাহাদ।১১বছর আগে তোমার এই ব্যবহারের জন্যই আমি বাড়ি ছেড়েছি সাথে রা'গের মাথায় নিজের ছেলের মেধা নষ্ট করেছি।সেগুলো শুধরে নেওয়ার এতো বড় সুযোগ পেয়েও হাত ছাড়া করছো?এতো ইগো দেখিয়ে কি অর্জন করবে তুমি?"
ফাহাদ শেখ কোনো উত্তর না দিয়েই বাড়ির মেইন গেটের সামনে গিয়ে হুং'কার ছাড়লেন,
"অন্ত!বাইকের চাবিটা নিয়ে তাড়াতাড়ি এসো!"
ফাহাদ শেখের কথা শুনে কল্পনার চোখ জোড়া মারবেল আকার ধারণ করল।এই সেরেছে।অন্ত একবার বাইকের চাবি নিয়ে নিচে নামলেই কল্পনার প্লান পুরোপুরি বেহেশতে যাবে।দোতলার বড় বারান্দাটা থেকে অন্তর রুম অনেক দূরে।কল্পনা যাওয়ার আগেই অন্তর নিচে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি।তাই কোনো দিকে না দেখে ম্যারাথন দৌড় লাগালো কল্পনা।
কিন্তু ভাগ্য যে খুবই খা'রা'প।সিড়ির কাছের করিডোরে আসতেই মেইন গেট দিয়ে অন্তকে বের হতে দেখল কল্পনা।ফাহাদ শেখ যে হুং'কারটা দিয়েছেন তাতে মনে হয় অন্তও দৌড় মে'রেছিল।কিন্তু কল্পনা হাল ছাড়ল না। সিড়ি দিয়ে নেমে অন্তকে জোরে ডাক দিয়ে থামানো গেলেও কাজ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
অন্তর দিকে চোখ থাকাতে নিজের দিকে আর খেয়াল রাখেনি মেয়েটা।যার দরুণ প্রথম সিড়িতে পা রাখতেই পড়নের প্লাজুর সাথে পায়ের দেবুর লাগায় হুড়মুড়িয়ে পরে যেতে লাগলো।শেষ।মনে হয় না আর সেকেন্ড সেমিস্টারে উঠা হলো কল্পনার।
কল্পনা যখন পুরোপুরি হাল ছেড়ে দিয়েছিল ঠিক সেই সময়ই পেছন থেকে সাহিত্য তার এক হাত ধরে হ্যাচকা টান দিল।হঠাৎ এমন হ্যাচকা টানে কল্পনার পাতলা গরনের শরীরখানা সাহিত্যের প্রশস্ত বুকে আছড়ে পড়ল।
ন্যানো সেকেন্ডে হওয়া ঘটনার পর যেন ভাটা পড়ল পরিবেশে।বুকে মাথা গুজে দুই হাত দিয়ে সাহিত্যের টি-শার্টখানা শক্ত করে খামচে ধরে রেখেছে কল্পনা।ভারি শ্বাস-প্রশ্বাস চলাচলেও যেন কষ্ট হচ্ছে মেয়েটার।
আর এদিকে কেউ একজন সেই ভ'য়ার্থ অষ্টাদশীকে দুই বাহুর মাঝে আষ্টেপিষ্টে ধরে রেখেছে।শ্বাস চলাচলটা তারও যেন স্বাভাবিক নেই।রুমের দরজা খুলে সিড়ির দিকে চোখ পড়তেই সাহিত্যের শক্ত-পোক্ত পুরুষালী হৃদপিণ্ডটা যেন মাত্রাতিরিক্ত কেপে উঠেছিল।হৃদয় থেকে যেন একটা কথাই বের হয়ে এসেছিল শুধু,
🥀 'ওর কিছু হলে আমি বাঁচবো কিভাবে?'🥀
#চলবে