#পর্ব_১৪
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ধরণীতে এখনো বৈশাখ মাসের আগমন ঘটেনি।তারপরেও যেন সকাল দশটার রোদটাতে এখন থেকেই তাপ বাড়ছে।কিন্তু সেই তাপের প্রভাব শেখ ভিলার ভিতরে তেমন অনুভব হয় না।তবে আজ যেন দুটি একাকিত্ব হৃদয় এক হয়ে ধরণীর উষ্ণতার চেয়েও বেশি উষ্ণ হয়ে আছে।
ঘড়ির কাটা কারো জন্যেই অপেক্ষা করে না। যার দরুণ কত সময় অতিবাহিত হয়েছে এই দুই নর-নারীর কারোরই জানা নেই।তারা তো নিজেদের সবচেয়ে আপন স্থানে এতো বছর পর ঠাই পেয়ে ভুবন ভুলে বসেছে।যেন এই সময়ের জন্য, শুধু এই সময়ের জন্যই দূরত্ব নামে কোনো শব্দই তৈরি হয়নি।হলেও তারা জানতে চায় না।
তীব্র ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার স্মেলে এবং সাহিত্যের বুকের হাতুড়ি পেটার শব্দ শুনে অষ্টাদশীরই আগে হুশ ফিরল।কিন্তু দূরে সড়ে না গিয়ে হাত কাপা সত্ত্বেও সাহিত্যের টি-শার্টটা আরো শক্ত করে খামচে ধরল কল্পনা। শুধুমাত্র এই একটা মুহূর্তের জন্য না জানি কত দিন, কত রাত ছটফট করত এই অষ্টাদশীর কোমল হৃদয়।যেই মানুষটা ছাড়া এক মুহুর্তও চিন্তা করা সম্ভব ছিল না কল্পনার পক্ষে।যেই মানুষটার এতো রা'গ থাকা সত্ত্বেও শুধু আদরটাই বরাদ্দ ছিল কল্পনার জন্য।যেই মানুষটা হুট করেই ছোট্ট কল্পনার হাত ছেড়ে দিয়ে অদুরে চলে গিয়েছিল।যেই মানুষটার ফাঁকা স্থান কল্পনা আজ অব্দি কারো দ্বারা পূরণ করতে পারেনি।কত অপেক্ষাই না করেছে তাকে আবার আগের মতো কাছে পাওয়ার।হৃদয়টা যে কতবার মোচড় দিয়েছে এই অষ্টাদশীর,শুধু একটাবার তার সাহিত্য ভাইকে একটু ছুয়ে দেওয়ার আশায়। নিজের অনুভূতি আর ধরে রাখতে পারল না অষ্টাদশী,ফুপিয়ে কেঁদে উঠল।
কান্নার তোপে সাহিত্যের হাতের বাধনে কল্পনার এইটুকুন শরীরটা কেপেকেপে উঠছে।যার দরুণ কল্পনার পিঠটা বাধন ছাড়া করে তার নরম আদলখানা দুই হাতের মাঝে আবদ্ধ করে নিল সাহিত্য।বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে গালের কাছের নোনাজলগুলো মুছে দিতে নিয়েই শুধালো সাহিত্য,
"এতো ছোট বিষয়ে কেউ কাঁদে রে,জানপাখি?আমি না থাকলে তখন কি করতি?"
সাহিত্যের শ্বাস এখনো ভারিভাবে চলছে।
ভাঙা কন্ঠেই বলে উঠল কল্পনা,
"গত ১১ বছর থেকে তো একাই চলছি"
এতক্ষণে যেন হুশ ফিরল সাহিত্যের।কোথায় আছে, কার সাথে আছে,১১ বছর আগে কি হয়েছিল সব যেন ফ্লাসব্যাকের ন্যায় চোখের সামনে ভেসে উঠল।অমনি ছিটকে সড়ে গেল সে কল্পনার থেকে।ভ'য়ার্থ দৃষ্টিতে কল্পনাকে দেখতে লাগলো সাহিত্য।আশেপাশে যেন অক্সিজেনের ঘাটতি দেখা দিচ্ছে তার জন্য।হাত-পা থরথর করে কাপছে তার।
হুট করে সাহিত্যের এমন বিচলিত অবস্থা দেখে কল্পনা যেন হালকা ভড়কে গেল।ধীর গতিতে সাহিত্যের দিকে এগিয়ে যেতে লাগলো সে,
"কি হয়েছে সাহিত্য ভাই?"
"দূরে সড় আমার থেকে!"
চিৎকার দিয়ে উঠল সাহিত্য।
কল্পনার সাথে যেন পুরো শেখ বাড়ি কেপে উঠল।
বাড়ির পুরুষরা তো কিছুক্ষণ আগেই বেড়িয়ে গেল।সামিয়ার স্কুলে অনুষ্ঠান থাকায় আমেনা শেখও আজ তার সাথে গিয়েছেন।হেনা শেখ মহুয়া বেগমকে নিয়ে পাশের বাড়ি মহিলাদের সাথে একটু গল্প-গুজব করতেই বেড়িয়েছেন।আর লতিফা শেখ প্রতিদিনের মতোই দেবু মশাইয়ের সাথে বাগানের হালকা কাটাছেড়া করছেন।অর্থাৎ শেখ ভিলার অন্দরমহলে বর্তমানে শুধু সাহিত্য ও কল্পনা ই আছে।
সাহিত্যের এমন চিৎকারে কল্পনা যেন হতভম্ব হয়ে গেল।কাপা গলায় আবার শুধালো,
"কি হয়েছে সাহিত্য ভাই?হঠাৎ এমন করছেন কেন?"
দুই হাত দিয়ে নিজের মাথা চেপে ধরে চোখ খিচে বন্ধ করল সাহিত্য।অতঃপর আবার হুং'কার দিয়ে উঠল,
"জাস্ট ব্লা'ডি ফা'কিং লিভ মি আলোন!!"
স্বদ্য থামা কান্নাটা আবার বেড়িয়ে এলো
কল্পনার,
"কেন এমন করছেন সাহিত্য ভাই?আগে তো এমন ছিলেন না।হঠাৎ কি এমন হয়ে গেল যে আপনি আমার সাথে দৃষ্টি পর্যন্ত মিলাতে চাচ্ছেন না.."
"চোখের সামনে থেকে সড়,না হয় জানে মে'রে ফেলব তোকে!"
পুণরায় চিৎ'কার দিয়ে উঠল সাহিত্য।
এবার কল্পনাও চিৎ'কার দিয়ে উঠল,
"এখন যখন মে'রেই ফেলতে চাচ্ছেন,তো পড়ে যাওয়ার সময় ধরেছিলেন কেন?দিতেন পড়ে যেতে!ওটাই না হয় ভালো হতো"
সাহিত্য আর কথা বলতে পারছে না। ছেলেটাকে দেখেই বুঝা যাচ্ছে যে,প্রচন্ড রকমের শ্বাসক'ষ্ট হচ্ছে তার।আর কোনো কথা না বলে কোনো মতে নিজের রুমের দরজাটা হাতড়ে খুলে রুমে ঢুকে পড়ল।কল্পনা যাওয়ার আগেই লাগিয়ে দিল দরজাটা।
হাতের ভারি মুষ্ঠি দরজায় ফেলতে লাগলো কল্পনা।অঝোরে কাঁদতে নিয়েই বলতে লাগলো,
"সাহিত্য ভাই দরজাটা খুলেন প্লিজ।আপনার অবস্থা ভালো মনে হচ্ছে না।কিছু হয়ে গেলে একাই সামলাতে পারবেন না।একবার আমার কথাটা শুনুন না।আমাকে একটু ভেতরে ঢুকতে দিন।দম বন্ধ হয়ে আসছে আমার।প্লিজ সাহিত্য ভাই"
কাঁদতে কাঁদতেই দরজার সামনে মেঝেতে বসে পরল কল্পনা।কয়েক মুহূর্ত আগেই যেন সব ঠিক ছিল,সব আগের মতো ছিল।তাহলে হঠাৎ ওমন কেন করছিল সাহিত্য ভাই?জড়িয়ে রাখতো কিছুক্ষণ ওভাবেই।যেন কিছুই বদলায়নি।কিন্তু ক্ষণিক সময়ের ব্যবধানে আবার দূরে ঠেলে দিল তার এই জানপাখিটাকে।দীর্ঘ ১১বছর পর আবার সেই আদুরে নামের ডাক পড়ল সেই আপন মানুষটার থেকে।কিন্তু সেটা যে এতো ক্ষণিকের জন্য চায় না কল্পনা।
এই এক ব্যক্তিই কল্পনাকে বুঝতে চায় না।আর কল্পনা যেন এই এক ব্যক্তি ছাড়া আর কাউকে বুঝাতেই চায় না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ব্যস্ত শহরের প্রায় সব প্রতিষ্ঠানেরই দিনের বেলা ১টায় পরিসমাপ্তি ঘটে।যার দরুণ ঢাকা শহরের এতো প্রশস্ত পিচ ঢালা রাস্তাগুলো থাকা সত্ত্বেও এ সময়ে যানবাহনগুলো একবার জ্যামে আটকা পড়লে যেন ঘন্টায় এক মিটারও নড়তে পারে না।আর তার উপর তো খাড়া মাথার উপরে সুর্য তার কিরণের সাথে তাপটাও তীর্যকভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে।যার কারণেই তো কল্পনা মাঝ রাস্তায়ই রিকশার ভাড়া চুকিয়ে হেঁটেই বাড়ির দিকে এগুচ্ছে।
কিন্তু এতে যেন মাথার উপরের তাপটা আরো বেশি জ্বালা করছে।তবে ওই জ্যামে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকার চেয়ে এটাই যেন ঢেড় ভালো।
সাহিত্যের সেদিনের ওই উদ্ভট ব্যবহারের আজ পাঁচ দিন পার হয়ে যাচ্ছে।ছেলেটা আবার আগের মতো হয়ে গিয়েছে।যেন ওইদিন ওমন কিছুই হয়নি।কল্পনা আগ বাড়িয়ে মুখ ফুটে কিছু বলেনি।কিন্তু চোখের কোমল ভাষায় অনেক বোঝানোর চেষ্টা করেছে যে 'ওই দিন ওগুলো কি শুধু ক্ষণিকের মোহ ছিল,নাকি আসলেই সেই দিনটাকে সাহিত্য উপেক্ষা করছে?' কিন্তু সাহিত্য যেন কল্পনার চোখের কোমলতা বুঝার চেষ্টাটাও করছে না।
সেদিন সাহিত্যের শারীরিক অবস্থা দেখে কল্পনার মনে একটু ভ'য়ই ঢুকেছিল।তাই তো মহুয়া বেগমের চেকাপ করার জন্য যখন মুহিত সাহেব আসেন তখন বুদ্ধি করে সাহিত্যের চেকাপও তাকে করতে বলেছিল কল্পনা।মুহিত সাহেব চেকাপ করে কল্পনাকে বলেছিলেন অফিসের কাজের জন্য মনে হয় একটু স্ট্রেস নিচ্ছে তাই ওমন শরীর খা'রা'প দেখাচ্ছিল।কিন্তু অফিসের কাজের চাপে হঠাৎ কল্পনাকে 'জানপাখি' বলে ডাকার কোনো উপযুক্ত কারণ কল্পনা খুজে পেল না।এটা তো আর মুহিত সাহেবকে বলা যাবে না।এর মানে একটাই হতে পারে যে,কল্পনা যে সাহিত্যকে চিঠিগুলো দিচ্ছে সেগুলো পড়ে একটু হলেও সাহিত্যের মন গলেছে।তার মানে পরবর্তীতে পুরোপুরি গলারও সম্ভাবনা আছে।
কিন্তু সাহিত্যের ওই ভ'য়ার্থ চিৎ'কারগুলো কল্পনা এখনো মেনে নিতে পারছে না।সাহিত্যকে কখনো এতো জোড়ে চিৎ'কার করতে দেখেনি কল্পনা।ভাগ্য ভালো বাড়িতে ওই সময় কেউ ছিল না।আর বাইরে বাগানে দেবু চাচা ঘাস কাটার মেশিন চালার দরুণ লতিফা শেখও কিছু শুনেননি।কল্পনা আগে কখনো সাহিত্যের ওই চেহারা দেখেনি।সেদিন সাহিত্যের ওটা রা'গ ছিল না,বরং ভ'য় ছিল।কল্পনা ইহকালে এই প্রথমবার কোনো কিছু নিয়ে সাহিত্যকে এতো ভ'য় পেতে দেখেছে।
কিন্তু তার কারণটা সঠিক ঠাহর করতে পারছে না কল্পনা।সাহিত্য হঠাৎ কল্পনাকে ভ'য় করবে কেন?বুঝ হওয়ার পর থেকেই কল্পনা যেই মানুষটাকে সম্মান দিয়ে এসেছে, হাত ধরে চলেছে, কোলে-পিঠে চড়েছে, আজ হঠাৎ সেই মানুষটা কল্পনাকে ভ'য় কেন করছে?
ঠোঁটে অস্ফুটস্বরে 'চ' বর্গীয় শব্দ করল কল্পনা।এমনিতে পরীক্ষার চাপে মাথা হ্যাং হয়ে আছে। তার উপর এতো চিন্তাভাবনা করা আর কুলানো সম্ভব না কল্পনার পক্ষে।
ফুটপাতে মাথা নিচু করে হাঁটছিল কল্পনা।হঠাৎ সামনে এক জোড়া পা দেখে মাথা তুলল সে।এমনিতেই মাথাটা তার গরম হয়ে আছে,আবার সেটাতে ঘী ঢেলে দিল সামনে দাঁড়িয়ে থাকা রাতুল।
তাকে এক নজর দেখে কল্পনা পাশ কেটে যেতেই রাতুল তার হাতটা খপ করে ধরে ফেলল।ওমনি কটমটিয়ে উঠল কল্পনা,
"হাতটা ছাড়ুন বলছি"
স্বাভাবিকভাবে শুধালো রাতুল,
"তুমি আমাকে এভাবে ইগনোর কেন করছ?"
"উত্তরটা জানার পরেও বারবার নিজের দো'ষ খুরে বের করতে লজ্জা করে না?হাতটা ছাড়ুন বলছি"
কল্পনা হাতটা কচলানো সত্ত্বেও তার হাত ছাড়লো না রাতুল,
"একটা গুড নিউজ দেওয়ার ছিল"
"কি গুড নিউজ?পাবনার টিকিট ফ্রিতে পেয়ে গিয়েছেন?"
হাসল রাতুল,
"না রে পা'গ'লি।আমার জব হয়ে গিয়েছে"
হাতটা এক ঝটকায় ছাড়িয়ে নিয়ে মেকি হাসল
কল্পনা,
"এমন ভাব দেখাচ্ছেন মনে হচ্ছে আপনার জব না হওয়ার কারণে আমাদের প্রেম কাহিনী আটকে পড়েছিল।হাউ ফানি"
ঠোঁট বাকিয়ে আবার হাসল রাতুল,
"জবটা কোথায় হয়েছে সেটা শুনার পর হয়তো এটা বলতে না....ভিভাসফট লিমিটেড এর নাম নিশ্চয়ই শুনেছো।দুই মাস হলো জয়েন করেছি।এ্যাজ এ জুনিয়র সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার।আশায় আছি বছর দুয়েক ঘুরে আসতেই সিনিয়র পজিশনে যাব।আমার একাডেমিক রেকর্ড সম্পর্কে তো তোমার ধারণাই আছে..."
কল্পনা মুখ ঢেকে হেসে উঠল।অতঃপর বলল,
"আপনি কি মনে করেছেন?আপনি বেকার ছিলেন দেখে আমার কাছে আসতে পারেননি,এখন টাকা আছে দেখে সব পারবেন?আপনার এই খুচরা পয়সার ঝনঝনি আমায় শুনিয়ে লাভ নেই।কি একটু তিন সপ্তাহ হাতের নাগালে পেয়েছিলেন, মনে করেছেন আমার ব্যাপারে সব জানেন আপনি?খুবই সাধারণভাবে চলাফেরা করি দেখে এটা মনে করিয়েন না যে আমি আসলেই কোনো সাধারণ ফ্যামিলি থেকে বিলং করি। F.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রির নাম শুনেছেন নিশ্চয়ই।সেই কোম্পানির C.E.O.-এর ছোট মেয়ে আমি।পাবলিসিটি আমার বেশি পছন্দ না দেখে আমি ঢোল পিটিয়ে বেড়াই না।তো আমার সামনে টাকার গরম না দেখিয়ে নিজের চরিত্র ঠিক করেন আগে"
নিজের কথা শেষ করে কল্পনা জোড় পায়ে সামনে এগিয়ে গেল।পেছনে ফেলে আসা রাতুল স্তব্ধ নয়নে কল্পনার যাওয়ার পানে দেখে আছে।ক্ষণিকের শারীরিক চাহিদার জন্য কত বড় সুযোগ হাত ছাড়া করে ফেলেছে সেটা ভেবেই পস্তাচ্ছে এখন।
রাতুলের এক বন্ধু একটু দূরেই লুকিয়ে ছিল।এসে রাতুলে কাধ চেপে ধরে বলল,
"মামা,তুমি তো হিরার মুরগি হাতে পেয়ে ছেড়ে দিয়েছো।এখন কি করবা?"
রাতুল এখনো কল্পনার যাওয়ার পানে দেখে আছে।ভার্সিটির থার্ড ইয়ারে পড়াকালিন হঠাৎ একদিন রাস্তায় কল্পনাকে দেখে সে।আগুন সুন্দরীকে এক দেখায়ই পছন্দ করা স্বাভাবিক। যেটা রাতুলের বেলাতেও হয়েছিল।কিন্তু তার নজরটা যেন শুধু কল্পনার ওই সুন্দর দেহটাতেই ছিল।অনেক ঘুরাঘুরির পর রাতুলকে অবাক করে দিয়ে হুট করেই একদিন কল্পনা রাজি হয়ে যায়।কিন্তু সমস্যা হলো কল্পনা ভিডিও কলে কথা বলতে চায় না,অডিও কলে কথা বলতে চায় না, ছবি পাঠাতে চায় না।শুধু কল্পনার কোচিং-এ যাওয়া আসার সময়টাতেই রাতুল নিজে থেকেই দেখা করতে যেত।
কিন্তু এই চরিত্র'হীন ছেলের যেন অতটুকু দেখাতেই আর ধৈর্য কুলাচ্ছিল না।মনে করেছিল সুন্দরী দেখেই বোকাসোকা হবে।কিন্তু খা'রা'প উদ্দেশ্যে পুরোপুরি হাত বাড়ানোর আগেই কল্পনা মানুষ ভর্তি মাঝ রাস্তায় তার গালে চ'ড় বসিয়ে দেয়।মেয়েদের ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় নাকি একটু বেশিই কাজ করে।যার দরুণ সেই খা'রা'প স্পর্শের ছায়াও নিজের শরীরে ছুঁতে দেয়নি কল্পনা।
সেই অপমানের রা'গেই আবার কল্পনার পেছনে পড়েছে রাতুল।কোনোমতে একবার হাতের কাছে পাক।তারপর সমাজে মুখ দেখানোর অবস্থায় রাখবে না।কিন্তু আজকে কল্পনার কথা শুনে প্ল্যানে একটু পরিবর্তন আনল সে।হিরার মুরগি সারাজীবন ধরে রেখেই না হয় অ'ত্যা'চা'র করবে।সুন্দরী তো কম নয় চাহিদা মেটানোর জন্য।আর বাংলাদেশের এক নামি বিজনেসম্যানের লাডলি মেয়ের জামাইয়ের পেছনে তো না চাইতেই টাকা ঢালার কথা।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"ভাইয়া প্লিজ তুমি যেও না।বড় বাবাকে একটু বলো না তুমি।তুমি বললে বড় বাবা ঠিকই বাসায় ফেরত আসবে।প্লিজ ভাইয়া যেও না..."
আবার সেই একই কান্নারত কন্ঠ সাহিত্যের কানের কাছে ভেসে আসছে।কিন্তু এবার সামনে কেউ নেই।দূর-দুরান্ত পর্যন্ত তিমির অন্ধকার।শুধু ক্ষণে ক্ষণে কন্ঠটা ভেসে আসছে সাহিত্যের কাছে।কিন্তু এবার যেন আরো একটা কন্ঠ যোগ হলো।সেটা সম্পুর্ণ বিপরীত ধর্মী।একজন মধ্যবয়স্ক পুরুষের গলা।সেই কন্ঠের অধিকারী যেন সাহিত্যকেই জিজ্ঞেস করছে,
"তুমি কি দেখছ?"
সময় নিয়ে তিমির অন্ধকারের মাঝে ধীমি আওয়াজে সেই প্রশ্নের উত্তর ছুড়ল সাহিত্য,
"সে আমাকে থাকতে বলছে"
"তো তোমার কি করতে ইচ্ছা করছে?"
আগের চেয়েও বেশি সময় নিয়ে উত্তর দিল
সাহিত্য,
"তার কান্নারত চেহারাটা আমার দেখতে ইচ্ছা করছে না।মনে হচ্ছে তাকে জাপটে ধরে বলি,যাব না আমি কোথাও,তুই কাঁদিস না"
"কিন্তু তুমি করেছ কি?"
"আমি আমার মনের কথা শুনিনি।আমি চলে গিয়েছি"
"তোমার নজরে,তুমি যখন চলে যাও তখন কি সেই ব্যক্তিটি খুশি ছিল?"
সাহিত্য আবার ধীমি আওয়াজে উত্তর দিল,
"না,সে কাঁদছিল তখনো"
কানের কাছে তুড়ি বাজার শব্দ পেয়ে যেন হুশ ফিরল সাহিত্যের।আশেপাশে এখন ছোটখাটো অনেক শব্দই শুনা যাচ্ছে।ভারি হয়ে থাকা মাথাটাও ধীরে ধীরে হালকা হয়ে আসছে তার।আবার সেই মধ্যবয়স্ক পুরুষের কন্ঠ কানে ভেসে এলো,
"সাহিত্য তোমার চোখগুলো খুবই ধীরে ধীরে খুলো।একদম তাড়াহুড়ো করবে না"
সে কথাই শুনলো সাহিত্য।তিমির অন্ধকার উপেক্ষা করে ভারি হয়ে থাকা চোখগুলো সময় নিয়ে খুলল সে।চোখের মণিগুলো ধীরে ধীরে ঘুরিয়ে আশপাশ পরখ করল।
বিশাল এক রুম।একপাশের অর্ধেক দেয়াল জুড়ে বড় আকারের জানালায় ধূসর রঙা ভারি পর্দা টানা থাকা সত্ত্বেও রুমে দিনের আলো মৃদু প্রবেশ করছে।খুব কম জিনিস দিয়েই রুমখানা মার্জিতভাবে সাজানো।সেই রুমেরই এককোণে এক বড় স্টাডি টেবিলের থেকে একটু দূরে,এক ডিভানে শুয়ে সাহিত্য ক্লান্ত চোখে আশেপাশে দেখে যাচ্ছে।
মস্তিষ্ক যখন পুরোপুরি কাজ করতে লাগলো তখন মনে পড়ল যে সাহিত্য সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে এসেছে।সাহিত্য শোয়া থেকে উঠে বসতেই ডিভানের সামনে টুলে বসে থাকা এক লোক তার দিকে পানির গ্লাস এগিয়ে দিল।সেটা হাতে নিয়ে সেদিকে একবার নজর দিল সাহিত্য।ফরমাল ড্রেসে শ্যাম বর্ণের, মাথায় আধা-পাকা চুল যুক্ত এক মধ্যবয়স্ক লোক।আর তার পেছনে এক যুবতী মেয়ে দাঁড়িয়ে।সাহিত্য রুমে ঢুকার সময় নিজেকে ডাক্তার কামাল মির্জার অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে পরিচয় দিয়েছিল মেয়েটি।
সাহিত্যকে পানির গ্লাসটা দিয়ে ডাক্তার কামাল উঠে গিয়ে স্টাডি টেবিলের অপর পাশে থাকা চেয়ারে বসে টেবিলের উপরে রাখা চিকন ফ্রেমের চশমাটা চোখে পড়ে প্রেসক্রিপশনে কি যেন লিখতে লাগলেন।প্রেসক্রিপশনে নজর রেখেই সাহিত্যকে টেবিলের সামনের এক চেয়ারে বসতে বললেন।সাহিত্য বসার পর মুহূর্তেই শুধালেন তিনি,
"তোমার এই সমস্যা কত দিন থেকে যেন?"
সাহিত্য এসেই এই প্রশ্নের উত্তর দিয়েছিল।কিন্তু আবার জিজ্ঞেস করায় সংকোচ বোধ করল না।গ্লাসের পানি শেষ করে সেটা টেবিলে রাখতে নিয়েই শুধালো,
"১১ বছরের মতো"
"প্রতি রাতেই দেখ নাকি মাঝে মাঝে?"
"মাঝে মাঝে.... কিন্তু ইদানীং সেটার মাত্রাটা একটু বেশি হয়েছে"
সাহিত্যের শেষের কথায় ডাক্তার কামালের কলম চালিত হাত থেমে গেল।প্রেসক্রিপশনের দিকে কিছুক্ষণ নজর রেখে সাহিত্যের দিকে
তাকালেন,
"আমি তোমাকে পার্সোনাল কিছু কোয়েশ্চেন জিজ্ঞেস করব।কোনো প্রবলেম হবে কি?"
সাহিত্য ইতিবাচক ইঙ্গিত দিতেই ডাক্তার কামাল আবার শুধালেন,
"উত্তরগুলো সরলভাবেই দেওয়ার ট্রাই করিও"
ক্লান্ত শরীরেই হ্যাঁ সূচকে মাথা দোলালো সাহিত্য।
সাহিত্যের সম্মতি পেয়েই ডাক্তার কামাল বলা শুরু করলেন,
"তোমার বাবার নাম কি?"
"মো: তোফায়েল শেখ আহমেদ"
"তোমার মায়ের নাম?"
"মোছা: আমেনা শেখ "
"গার্লফ্রেন্ড বা এক্স আছে?"
সাহিত্য হালকা ভ্রু কুচকে মাথা তুলে ডাক্তার কামালের দিকে দেখল। ডাক্তার কামাল ঠোঁটের কোনে হাসি নিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখছেন।সাহিত্য রোবটের মতো কথা বলছিল দেখে তিনি একটু স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
সাহিত্য মৃদু হেসে শুধালো,
"না"
এই মজার ছলের প্রশ্নতেও যেন নিজের এক উত্তর পেয়ে গেলেন ডাক্তার কামাল,
"ক্যারিয়ার ফোকাসড ম্যান....তো কবে থেকে ক্যারিয়ারে এতো ফোকাসড তুমি?"
একটু ভেবে বলল সাহিত্য,
"৮-৯ বছর থেকে"
ডাক্তার কামাল সাহিত্যকে চশমার ফ্রেমের উপর দিয়ে দেখলেন,
"৮-৯ বছর,নাকি ১১ বছর?"
হালকা ভড়কালো সাহিত্য।সময় নিয়ে শুধালো,
"ওই, সেরকমই"
প্রেসক্রিপশনের দিকে চোখ রেখেই হালকা মাথা দোলালেন ডাক্তার কামাল,
"আচ্ছা আচ্ছা..."
ক্ষণিকের নিরবতা ভেঙে আবার শুধালেন তিনি,
"যে স্মৃতিটা নিয়ে তুমি স্বপ্ন দেখো,তোমার এই সমস্যা শুরু হওয়ার আগে ওটাই কি সেই ব্যক্তির সাথে শেষ দেখা ছিল?নাকি এরপরেও দেখা হয়েছিল?"
"ওটাই শেষ দেখা ছিল"
"সেই ব্যক্তি কি এখনো বেঁচে আছে?"
অকস্মাৎ এমন প্রশ্নে চকিত হলেও তা চেয়ারায় প্রকাশ করল না সাহিত্য।মৃদুস্বরে বললো,
"হ্যাঁ"
"ওই ব্যক্তিকে কি তুমি ভালো করে চিনো? কে হয় তোমার?"
"আমার চাচাতো বোন"
ডাক্তার কামাল ঠোঁটে মৃদু হাসি নিয়ে শুধালেন,
"ও আচ্ছা.....তুমি যেহেতু একটা ছোট মেয়ে বাচ্চার স্বপ্ন দেখো তাহলে আশা করছি মেয়েটা অবশ্যই তোমার থেকে বয়সে ছোট হবে"
সাহিত্য উপর-নিচ মাথা নড়ালো,
"জ্বী"
"কিসে পড়ালেখা করছে ও?"
"ঢাকা ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট ইয়ার"
ডাক্তার কামাল সাহিত্যের প্রেসক্রিপশনটাতে আবার মনযোগ দিলেন।হঠাৎ ভ্রু উঁচিয়ে অবাক হয়েই বললেন,
"তোমার থেকে নয় বছরের ছোট সে?"
আবার ছোট করে উত্তর দিল সাহিত্য,
"জ্বী"
"ওর কি বিয়ে হয়েছে?"
এবার সাহিত্য আর শান্তভাবে উত্তর দিতে পারল না।গম্ভীর মুখশ্রী নিয়েই শুধালো,
"এখানে মনে হয় আমার ট্রিটমেন্ট চলছে।কারো বায়োডাটা বলতে আসিনি আমি এখানে "
ডাক্তার কামাল গা ঝাড়া ভাব নিয়ে বললেন,
"জাস্ট আন্সার মাই কোয়েশ্চেন"
ডাক্তার কামাল এসব ইনফরমেশন দিয়ে কি বুঝাতে চাচ্ছেন সাহিত্য ঠাহর করতে পারল না।অতঃপর ছোট করে উত্তর দিল,
"না"
ডাক্তার কামাল আবার মৃদু হেসে শুধালেন,
"ওকে মনে হয় তুমি অনেক আদর করতে,তাই না?"
ডাক্তার কামালের এবারের প্রশ্নটা সাহিত্যকে একটু বিভ্রান্ততেই ফেলল।আবারো সময় নিয়ে উত্তর দিল সে,
"এখন করি না"
ডাক্তার কামাল এতক্ষণ থেকে মৃদু হাসলেও এবার একটু জোরে হাসলেন।তার হাসিতে সাহিত্য যেন আহাম্মক বনে গেল।
ডাক্তার কামাল ক্ষণিক বাদে হাসি কমিয়ে
শুধালেন,
"আমি তোমাকে জিজ্ঞেস করেছি তুমি আগে তাকে আদর করতে কিনা।এখনকার কথা বলতে বলিনি"
ডাক্তার কামালের কথায় আবার চিন্তায় ডুব দিল সাহিত্য।যেন অতল সমুদ্রের অন্ধকারে হাতড়াচ্ছে সে।
"এখনকার সাহিত্যকে প্রশ্ন করলে উত্তর খুঁজে পাবে না। ১১ বছর আগের সাহিত্যকে জিজ্ঞেস করো"
ডাক্তার কামালের কথায় সাহিত্য তার দিকে কিছুক্ষণ নিষ্পলক দেখে থাকল।কি যেন ভেবে নজর ঘুরিয়ে নিয়ে উপর-নিচ মাথা নাড়ালো।
ডাক্তার কামাল নিশ্চিত করলেন,
"তার মানে তুমি তাকে আদর করতে?"
সাহিত্য আবার উপর-নিচ মাথা নাড়ালো।
ডাক্তার কামাল মুখ দিয়ে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করলেন,
"সাহিত্য, আই ওয়ান্ট টু হেয়ার ইট ফ্রম ইয়র মাউথ"
সাহিত্য চুপ রইল।যেন সে ইচ্ছা করেই মুখ খুলতে চাইছে না।
ডাক্তার কামাল আবার বললেন,
"কি হলো?বলো"
স্বাভাবিক এর তুলনায় একটু জোরেই শ্বাস নিতে লাগলো সাহিত্য।যেখানে এ বিষয়ে চিন্তা করলেই তার অস্বাভাবিক লাগে,সেখানে এ বিষয়ে আজ একজনের সাথে আলোচনা করতে বসেছে সে।রা'গটা যেন ফেটে বের হয়ে আসতে চাইছে।তার চোখে-মুখে সে চিহ্ন যেন স্পষ্ট।
সেটা বুঝতে পেরেই ডাক্তার কামাল শান্ত স্বরে বললেন,
"তোমার চিন্তায় তোমার রা'গকে জায়গা করে নিতে দিও না।ঠান্ডা মাথায় চিন্তা করো।ইটস সো সিম্পেল।বলো যে আমি তাকে অনেক আদর করতাম।এত ইজি একটা লাইন বলতে পারছ না?"
ডাক্তার কামালের অ্যাসিস্ট্যান্ট টেবিলের খালি গ্লাসটাতে সেই কতক্ষণেই পানি ভরে রেখেছিল।এবার সেই গ্লাসের পানি এক নিঃশ্বাসে শেষ করল সাহিত্য।তারপরেও কেন জানি হাসফাস লাগছে তার।এসির শীতল বাতাস যেন তার শরীর ছুঁতেই পারছে না।আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলছে সে।
"আমার আরো অনেক পেশেন্ট ওয়েট করছে সাহিত্য। তাড়াতাড়ি বলো"
ডাক্তার কামাল যেন সাহিত্যের ভারী হাসফাস পুরো উপেক্ষা করলেন।
কিন্তু সাহিত্য যেন নিজেকে আরো ভারি অনুভব করছে।রা'গটা দুই হাতের মুঠে কোনোমতে দমে রেখেছে।এখানে রা'গ দেখানো মানে অভদ্রতা ছাড়া আর কিছুই হবে না।
ক্ষণিকের নিস্তব্ধতার পর হঠাৎই ডাক্তার কামাল উঠে দাঁড়িয়ে টেবিলে হাতের থাবা মে'রে হুং'কার দিয়ে উঠলেন,
"জাস্ট সে ইট ড্যামিট,দ্যাট ইউ লাইক হার!!"
রা'গটা আর দমিয়ে রাখা সম্ভব হলো না সাহিত্যের পক্ষে।উঠে দাঁড়িয়ে বজ্র কন্ঠে হুং'কার দিল সে,
"হ্যাঁ! হ্যাঁ! হ্যাঁ!!!অনেক আদর করতাম!কলিজার টুকরা ছিল ওটা আমার!আই ডোন্ট লাইক হার!আই LOVE হার!! ভালোবাসি ওটাকে আমি!!এতটাই ভালবাসি আমি তাকে যে তার স্মৃতিগুলো আমি চেয়েও আমার মাথা থেকে মুছাতে পারছি না!!তাকে যদি আমি ভালো না ই বাসতাম তাহলে ওই দিন ছেলেগুলোর কাছে ছেড়ে দিয়ে আসতাম ওকে!!কিন্তু পারিনি, সম্ভব হয়নি আমার দ্বারা!!ওর পাশে কেউ দেখলেও আমার গায়ে কা'টা দিয়ে উঠে!!যার জন্যই তো মাঝ রাস্তায় ওগুলোকে পি'টি'য়েছিলাম!!কিন্তু ওকে ভালোবাসার পরিবর্তে কি পেলাম আমি?উল্টো আরো হারিয়েছি।আমার স্বপ্ন ধ্বংস হয়ে গিয়েছে ওই মেয়েটার জন্য!!আই হ্যাড টু লিভ এভরিথিং বিহাইন্ড বিকজ অফ হার !!! আমার পুরো পৃথিবী উল্টে গিয়েছে একমাত্র ঐ মেয়ের জন্য!!ওকে আমি ঘৃ'ণা করি! ঘৃ'ণা করি! ঘৃ'ণা করি !"
কথা শুরুর দিকে সাহিত্যের চোখে ভালোবাসার কোনো সীমা ছিল না।যেন ওই ভালোবাসা পরখ করা এই ভুবনের কারো পক্ষে সম্ভব নয়।এমনকি সাহিত্যের নিজেরও পক্ষে না।কিন্তু কেউ যেন এই সীমাহীন এক অনুভূতির স্রোতে বাধ লাগানোর চেষ্টা করেছে।সেটা তো সম্ভব হয়িনি বরং এখন শুধু সাহিত্যের হৃদয়ের তীব্র র'ক্ত ক্ষ'র'ণ হচ্ছে।
ডাক্তার কামাল মনে মনে স্বস্থির শ্বাস ফেললেন।তিনিও কাউকে ভালোবেসেছিলেন।এখন সেই বউ রুপি ভালোবাসা তাকে পা'গ'লের ডাক্তার ডাকে।কিন্তু ডাক্তার কামাল তাকে এটা কেমন করে বুঝাবেন যে তার কাছে আসা সবগুলোই মাথা খা'রা'প পা'গ'ল হয় না। কিছু পা'গ'লের মনও খা'রা'প থাকে।এদেরকে ঠিক পা'গ'লও বলা যায় না।কারণ পৃথিবীতে যে অনুভূতিটা থাকার কারণে মানুষের অস্তিত্ব এখনো টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়েছে এই পা'গ'লগুলো সেই অনুভূতিটাকে একটু বেশিই গভীরভাবে অনুভব করে।যার অসীম গভীরতা বুঝতে না পেরেই তারা পা'গ'লের মতো আচরণ করে।
ডাক্তার কামাল ঠোঁটে হাসি ধরেই ধীরে সুস্থে আবার চেয়ারে বসে গা এলিয়ে দিলেন,
"সবকিছু বলেছো কি? মনের মধ্যে আরো কিছু বাকি থাকলে সেগুলোও বলে দাও। আমি সব শুনবো"
সাহিত্যের দ্রুত শ্বাস চলাচল এখনো আছে।কিন্তু কিছুক্ষণ আগে যে এক অসীম ভারী অনুভব হচ্ছিল সেটা আর নেই।
ডাক্তার কামাল হাত দিয়ে ইশারা করে সাহিত্যকে বসতে বললেন,
"আরে দাঁড়িয়ে আছো কেন? বসো বসো"
সাহিত্য এক প্রকার ধপ করেই লেদার চেয়ারটাতে বসে পড়ল।চোখে-মুখের ভাবভঙ্গিমা কেমন যেন উষ্কখুষ্ক হয়ে আছে।চেহারায় স্পষ্ট বিভ্রান্তের ছাপ।
ডাক্তার কামাল শান্ত স্বরে শুধালেন,
"রিল্যাক্স সাহিত্য।আমি সব কিছু এক্সপ্লেন করছি।তুমি আগে একটু রিল্যাক্স হও।আমার কথাগুলো এখন শান্ত মস্তিষ্কে শুনা ও বুঝা তোমার জন্য খুবই জরুরি"
সাহিত্যকে একটু সময় দিয়ে ডাক্তার কামাল বলতে লাগলেন,
"তোমার (PTSD) হয়েছে।অতীতের কোনোকিছু বা কাউকে যদি তুমি নিজের জীবন থেকে বের করে দেওয়ার পরেও ভুলতে না পারো তাহলে তো বুঝতে হবে যে সে তোমার জীবনে ম্যাটার করে,তাই না?",
ডাক্তার কামাল এবার মুখ ভেংচিয়ে বললেন,
"কিন্তু নাহ্।তোমাদের মতো সো কল্ড হার্টলেসগুলা আবার সেটা মনে করবে কখনো?তোমরা তো শুধু পারবে সেই ব্যক্তিকে আরো দূরে ঠেলে দিতে।এতে তোমাদের যতই ক'ষ্ট হোক না কেন"
গম্ভীর মুখশ্রী নিয়ে ক্লান্ত শরীরে বলল সাহিত্য,
"সে আমার জীবনে কোনো ম্যাটার করে ন..."
"ধ্যাত!!আর একবার এ কথা বললে থেরাপিস্ট এর বদলে বাবার দায়িত্ব নিয়ে কানের নিচে দুটো বসিয়ে দেব!"
তেতে উঠলেন ডাক্তার কামাল।সেই স্বর বজায় রেখেই মুখ ভেংচিয়ে শুধালেন,
"কোনো ম্যাটার যখন করেই না,তো কিছুক্ষণ আগে আই লাভ হার,ভালোবাসি ওটাকে, এগুলো বলে ভেবাচ্ছিলে কেন?"
সাহিত্যের ক্লান্ত ভাব এখনো যায়নি,
"আপনি বলেছিলেন ১১ বছর আগের সাহিত্যকে জিজ্ঞেস করতে"
বাম হাতের তালুতে ডান হাতের আঙুলের পিঠ দিয়ে তালি মে'রে শুধালেন ডাক্তার কামাল,
"দ্যাটস রাইট!ওটাই তো!তুমি কি মনে করেছ? ১১ বছর আগের সাহিত্য আর তুমি এক নও?১১ বছর আগের সেই ছেলের নামও অহিয়াম শেখ সাহিত্য তোমার নামও অহিয়াম শেখ সাহিত্য।১১ বছর আগের সেই ছেলেটাও পেইন্টিং পছন্দ করত তুমিও পেইন্টিং পছন্দ করো।১১ বছর আগের সেই ছেলেটাও নিজ সিদ্ধান্তে চলত তুমিও নিজ সিদ্ধান্তে চলো।১১ বছর আগের সেই ছেলেটাও তার চাচাতো বোনকে ভালোবাসতো তুমিও সেই মেয়েকেই ভালোবাসো সাহিত্য"
সাহিত্য এবার মেকি হেসে ক্লান্ত শরীরটাকেই সোজা করে বসালো,
"না।আপনি ভুল জানেন।এই দুই সাহিত্যের মাঝে এমন এক অন্ধকার মুহুর্ত আছে যেটা দুই সাহিত্যকে আলাদা পথে চলতে বাধ্য করেছে।আর সেটার একমাত্র কারণ সেই মেয়ে নিজেই"
ডাক্তার কামাল ভ্রু কুচকে ঠাট্টার স্বরে বললেন,
"কেন? ওই আট বছরের মেয়ে কি তোমাকে রেখে অন্য কারো সাথে প্রেম করতে গিয়েছিল?"
ঘাড় হালকা ঘুরিয়ে ঠোঁট চেপে হালকা হাসল সাহিত্য।
ডাক্তার কামাল স্বাভাবিক কন্ঠে আবার
বললেন,
"এই যে, এখন তোমার যেমন মনে হচ্ছে ওই আট বছরের মেয়েটা প্রেম করতে পারবে না তেমন আমারো বিশ্বাস হচ্ছে না যে আট বছরের একটা মেয়ে কোনো দো'ষ করতে পারে।ওই আট বছরের বাচ্চাটা ফাজলামো করতে পারে,বিরক্ত করতে পারে,ঝ'গ'ড়া করতে পারে,ভুল করতে পারে....কিন্তু তার কোনো দো'ষ থাকতে পারে না।তুমি কখনোই আমার কাছ থেকে এটার সহমত পাবে না"
সাহিত্য কোনো কথা না বলে ডাক্তার কামালের দিকে এক দৃষ্টিতে দেখে আছে।অনুভূতিহীন সেই চাহনি।
ডাক্তার কামাল হাতের ফাইল বন্ধ করে টেবিলে রেখে একটা ভারি নিঃশ্বাস ছাড়লেন,
"আমি জানিনা কি কারনে,হতে পারে তোমাদের ফ্যামিলি কোনো ম্যাটার হবে।যেখানে মাত্র ওই আট বছরের একটা বাচ্চাকেও তুমি কারো দো'ষের ভাগীদার বানাচ্ছো।তোমার ভেতরের রা'গ-জেদ চাচ্ছে ওই মেয়েটাকে ঘৃ'ণা করতে।তাকে ভুলে যেতে",
এতটুকু বলেই ডাক্তার কামাল হেসে উঠলেন,
"সাহিত্য তুমি একবার চিন্তা করো। ওই মেয়েটাকে তুমি কি পরিমাণে ভালোবাসো যে তুমি চাওয়ার পরেও তাকে ভুলতে পারছ না।ওই মেয়েটার থেকে দূরত্ব তুমি সহ্য করতে পারছো না সাহিত্য"
এবার কাটকাট গলায় সাহিত্য শুধালো,
"এগুলো কথা আর না বাড়িয়ে আমাকে মেডিসিন প্রেসক্রাইপড করেন"
এতক্ষণ থেকে বিভিন্ন ঔষধের নাম লিখতে থাকা প্রেসক্রিপশনটা কোনো দ্বিধা ছাড়াই ফাইল থেকে বের করে ছিড়ে ফেললেন ডাক্তার কামাল,
"তোমার মেডিসিন শুধুমাত্র সেই মেয়ে।হয় তাকে বিয়ে করো না হয় এমন দেবদাসের মতো থাকো"
কপালে ভাজ ফেলে মুখে বিরক্তির ছাপ নিয়ে শুধালেন ডাক্তার কামাল,
"সাহিত্য শেম অন ইউ। দেবদাসও জানতো যে সে পারবতিকে ভালোবাসে"
সাহিত্য গা ঝাড়া দিয়ে উঠে দাড়ালো,
"এতক্ষণ থেকে আমার টাইম ওয়েস্ট করে কোনো মেডিসিন না দেওয়ার জন্য থ্যাংক ইউ।আমি এখন আসি"
মৃদু হেসে শুধালেন ডাক্তার কামাল,
"নিজেকে তুমি যতই বুঝ দাও না কেন,একদিন না একদিন নিজের কাছে নিজেই হেরে যাবে তুমি"
ডাক্তার কামালের কথার কোনো উত্তর দিল না সাহিত্য। স্বাভাবিকভাবেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।
সাহিত্য চলে যাওয়ার পর ডাক্তার কামাল তার অ্যাসিস্ট্যান্টকে বললেন,
"তিথি জানো?আমার এই কেসটাকে একটা সুন্দর নাম দিতে ইচ্ছা করছে"
তিথি তার মোটা ফ্রেমের চশমা ঠিক করে শুধালো,
"কি নাম স্যার?"
ডাক্তার কামাল চেয়ারে শরীরের পুরো ভার ছেড়ে দিলেন,
"একখণ্ড আসক্তি"
তিথি ভ্রু কুচকালো,
"কেন স্যার?"
ঠোঁটের হাসি রেখেই টেবিলের ড্রয়ার থেকে স্লিপিং আই মাস্কটা বের করে চোখে দিতে নিয়েই শুধালেন ডাক্তার কামাল,
"আ ম্যান ডিপলি অপসেস্ড উইথ হিজ লাভ।যেই আসক্তে শুধু সামনে পা বাড়ানোর রাস্তা আছে। সে চাইলেও তার এই আসক্ত থেকে পিছনে ফিরে আসতে পারবে না।কারণ পেছনের ফেলে আসা সেই রাস্তা দিয়েই সামনের রাস্তা তৈরি"
#চলবে