ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

১৫তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_১৫

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

এই যান্ত্রিক যুগে মানুষ যতই আধুনিক যন্ত্রের আকার,আকৃতি,ধরনের, উন্নতি ঘটিয়ে পরিবর্তন আনুক না কেন,একটি জিনিসের পরিবর্তন কখনোই আনতে পারবে না।আর সেটি হলো নির্জীব, অনুভূতিহীন আচরণ।

মানুষ এই অনুভূতি জিনিসটা নিজে অনুভব করলেও কৃত্রিম কোনো কিছুকে অনুভব করাতে সক্ষম হইনি।

এতো ভিন্ন স্বাদের অনুভূতিগুলো যেন শুধু মানুষের পক্ষেই অনুভব করা সম্ভব।আবার ইচ্ছার বিরুদ্ধে কোনো অনুভূতি মনের কোণে উঁকি দিলে সেটা উপেক্ষা করাটাও যেন মানুষের আয়ত্তে চলে এসেছে।

যেটা সাহিত্যের কাছে খুব ভালো করেই আয়ত্ত করা।

কিন্তু হুট করে আশেপাশের মানুষ যখন সেটাকে বার বার চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দেয় তখন হাজার চেষ্টা করেও যেন সেই অনুভূতিকে উপেক্ষা করা যায় না।কিন্তু তারপরেও যদি জেদ ধরে খুটি গাড়িয়ে থাকে তাহলে বাকি অনুভূতিগুলোতেও আর নিয়ন্ত্রণ থাকে না।

ঝুলন্ত হাতে জ্বলন্ত সিগারেট ধরে রাখা দুই আঙ্গুল এবং বৃদ্ধা আঙ্গুলের ডগার জোড়েই ক্যানটা কোনো মতে আটকে আছে হাতে।একটু হাত ফোসকে গেলেই অর্ধ ভরাট বি'য়া'রের ক্যানটা ওভার ব্রিজটার সোজা নিচের রাস্তায় পরে যাওয়া নিশ্চিত। কিন্তু পড়ল না।ক্যানটা মুখের কাছে নিয়ে এক চুমুক দিয়ে আবার আগের মতোই ঝুলে ধরল সাহিত্য।এই অসময়ে রাত দুটোর দিকে এই বি'য়া'রের ক্যান সাহিত্য কই পেয়েছে সেটা নাহয় না বলাই শ্রেয় হবে।

দিনকে দিন নিজের অবস্থা নিজেই বুঝতে অক্ষম হচ্ছে সে।নিজের থেকে এতো বাধা থাকা সত্ত্বেও যেন ওই নিষিদ্ধ অনুভূতিটা তীব্রভাবে উগরে বেড়িয়ে আসার আপ্রাণ চেষ্টা করছে।যে অনুভূতিকে অনেক আগেই ত্যাগ করেছিল।এটাই সাহিত্যের ধারণায় ছিল।কিন্তু এখন কেন যেন মনে হচ্ছে সে কখনো ওই অনুভূতিকে নিজের মাঝ থেকে বেরই করতে পারেনি।

কিন্তু সেটা যেন সাহিত্যের কাছে অ'ভিশা'প মনে হলো। ফেলে আসা অতীতে সে আর ফিরে যেতে চায় না।সে যেন এক জেদ ধরেই বসেছে।সাহিত্য শুধু সেই মেয়েকে একটু প্রাধান্য দিয়েছিল বলে নিজের আর্টিস্ট হওয়ার স্বপ্নটা ভেঙেচুরে গিয়েছে। একমাত্র সেই মেয়ের কারণেই সেটা হয়েছে,হয়তো এটা ভেবেই এতো ক্ষো'ভ।

মাথার উপরের তিমির আকাশ যেন ঘন কালো মেঘে আরো কালো হয়ে উঠল।বাতাসহীন নিস্তব্ধ পরিবেশ মুহূর্তেই ঝড়ো হাওয়ার জালে আটকা পড়ল।সেই হাওয়া যেন মানবশূন্য ওভার ব্রিজে দাঁড়িয়ে আধো চিন্তায় ডুবে থাকা এই পুরুষের সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে দিচ্ছে।উষ্কখুষ্ক চুলগুলোকে আরো উষ্কখুষ্ক বানিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু এই শীতল বাতাসেও মনে শান্তি জমা করতে পারছে না সেই পুরুষ।কারণ শান্তি জমা করার কারণটাই তো সে সম্পুর্ণ উপেক্ষা করছে।

হাতের ক্যানটা এবার ইচ্ছা করেই ছেড়ে দিল সাহিত্য। ভিতরে সামান্য তরল থাকার দরুণ কালো পিচ ঢালা রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা রয়েল গ্রিন অ্যাস্টোন মার্টিনের কিছুটা কাছে গিয়ে ঠেকলো সেটা।জনমানবহীন রাস্তার দুই পাশে কিছু ছোট দোকানের নামানো সাটারের উপর হালকা আলোর বাতি জ্বলছে।কাছের দু-একটা দোকানের সাটার কিছুটা খুলে থাকায় মৃদু আলো আসছে সেখান থেকে।হয়তো তারা কাজ শেষে গোজগাজ করে বেড়িয়ে পড়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।পুরো পরিবেশ মিলিয়ে যেন এক এ্যাসথেটিক লুক ফুটিয়ে তুলেছে।

কিন্তু সেদিকে তাকিয়ে থাকা সত্ত্বেও যেন সেই সৌন্দর্য সাহিত্যের চোখে পরছে না।মনের ভিতরে কথা বলে আর শান্তি পেল না সে।ভেতরের আওয়াজ বাইরে বেড়িয়ে এলো।বিড়বিড় করে আওড়ালো সে,

"তুই আমার স্মৃতিতে পরিণত হতে পারিস,কিন্তু কখনোই আমার অভ্যাসে পরিণত হতে পারবি না।আমি সেটা হতেই দেব না"

কথাটা বলেও যেন অস্বস্তির মাত্রা কমলো না, বরং বাড়লো।আকাশে এতক্ষণে শুকনো বজ্রপাত শুরু হয়ে গিয়েছে। সেই বজ্রের তালেই হুং'কার ছাড়ল সাহিত্য,

"তুই কি চাস সাহিত্য?নিজের কাছ থেকে কেন লুকাচ্ছিস?"

বজ্রপাতের শব্দ হলো,কিন্তু সাহিত্য তার উত্তর পেল না।এই প্রশ্নের উত্তর কি সাহিত্য আদৌ কখনো খুঁজে পাবে?

এতো রাতের এই দৃষ্টি গোচর পরিবেশ উপভোগ করতেই যেন আধো সাটার খোলা এক দোকান থেকে কেউ গান ছাড়ল।

টুংটাং সুর দিয়ে শুরু হওয়া ড্রামবিট আর গিটারের মিশ্রণের সেই তালে যেন দমকা হাওয়াও ভারি হয়ে আপন মনে দুলছে।

সাহিত্যের জীবনের প্রতিটি কথা সত্য করে দিয়ে বজ্র কন্ঠে বেজে উঠল সেই গান,

❝

তুমি ক্রোধের আগুনে, জমে থাকা ব্য'থা,

আমার শেষ বিকেলের ধোকা

কোনো রোদেলা দুপুরে, তোমায় ফিরে পাবো বলে,

অর্থহীন খোঁজা

আমি আঁকিনি তোমার ছবি,দেখিনি স্রোতের নদী,

আকাশ ভরা তারা

যত সুখের স্মৃতি ঘিরে, আছো তুমি মেয়ে,

এ পথের শেষ কোথা..?

❞

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

অন্ত নামক পড়ুয়া এই ছাত্রের পরীক্ষা শেষে এক ব'দভ্যাস শুরু হয়।এটা শুধু একবার নয়,প্রতি পরীক্ষার পরেই।

পরীক্ষা শেষ হওয়ার খুশিতে সারাদিন ঘুমাবে।আর সারারাত হুতুম প্যাচার মতো চোখ খুলে বসে থাকবে।অবশ্য পড়ুয়া ছাত্র হিসেবে অন্তর এ ব্যাপারে তেমন কোনো চিন্তা নেই।দেখা যাচ্ছে হয়তো কোনো একাডেমিক বই পড়ছে, না হয় পুরোনো খবরের কাগজ পড়ছে,আর সেটাও না করতে মন চাইলে ইউটিউব ঘেটে জাতীয় বক্সিং যেগুলোতে বেশি হয়েছে সেই টকশো গুলো দেখবে।মাঝে মাঝে নিজেও মতামত দেয়।

কিন্তু আজকে যেন সেটাও জমছে না।আগেকার টকশো গুলো বন্ধুদের নিয়ে হইহুল্লোড় করে দেখার মতো ছিল।এখনকার টকশো গুলোতে কোনো টক-ঝালই নেই।

রুমে আর মন টিকছে না দেখে পানি নেওয়ার অছিলায় নিচে নামলো অন্ত।পুরো বাড়ি মিলে শুধু একটা নিভু নিভু হলুদ বাল্ব জ্বলছে।বোতলে পানি নিয়ে ডাইনিং এ দাঁড়িয়েই বোতলে কেবল মুখ লাগিয়েছে,অমনি বাসার মেইন গেট থেকে খুটুরখাটুর শব্দ শুনতে পেল।পানি খাওয়া বাদ দিয়ে অল্প আলোয় দেয়াল ঘড়িটার দিকে দেখলো।৩:১৮ বাজে।

"এতো রাতে...মানে এতো সকালে কে?"

ক্ষণিক চিন্তা করার পরেও কারো কথা মাথায় এলো না অন্তর। সাধারণত কেউই এ সময় বাসায় আসে না।

"শুধুমাত্র এক ব্যক্তি ছাড়া"

চোখ জোড়া বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল অন্তর।

গেট থেকে এখনো শব্দ আসছে।চো'রটা ভালোই দক্ষ হাতে তালা ভাঙছে।হাতের বোতলের ঢাকনাটা ভালো করে লাগিয়ে সেখানে ধরে ধীরে ধীরে গেটের দিকে এগোতে লাগলো অন্ত।আপাতত এই বোতল দিয়েই চো'রের মাথা ফাটার বুদ্ধি করছে সে।

গেটের ততটাও কাছে যায়নি অন্ত,তার আগেই গেট খুলে এক আগন্তুক ভেতরে ঢুকল।হালকা আলোতে তেমন ভালো করে বুঝা যাচ্ছে না।এই সুযোগে গেটের দিকে তেড়ে গেল অন্ত।বোতলটা মাথায় মা'রতেই যাবে তার আগ মুহুর্তেই সাহিত্য দুই হাত দিয়ে অন্তকে জাপটে ধরল,

"অন্ত! আমার ভাই!"

আচমকা ঘটনায় ভড়কালো অন্ত।সাহিত্য ভাইয়া এখানে কি করছে?এ সময় সে বাইরে থেকেই বা কেন আসল?অন্ত ওদিকে এসব ভাবনায় ভ্রু কুচকে আছে আর এদিকে সাহিত্য তাকে জড়িয়ে ধরে হালকা ডানে-বামে ঘুরছে,

"আমার ছোট ভাইটার কি হয়েছে?ছোট চাচি আজকেও তোকে মাছের ঠ্যাং খেতে দেয়নি? সমস্যা নেই। কালকে আমি বাজারে গেলে তোর জন্য তিন ঠ্যাং আলা মাছ নিয়ে আসব"

সাহিত্য এমন করে বলছে যেন অন্ত পাঁচ বছরের একটা বাচ্চা যে কিনা সেই তথাকথিত মাছের ঠ্যাং না পেয়ে এতক্ষণ বসে কাঁদছিল।

সাহিত্যের শক্ত বাধন থেকে বের হওয়ার হালকা চেষ্টা করল অন্ত,

"ভাইয়া..কিসের..ঠ্যাং?আর..ছাড়ো.. আমাকে..লাগছে!"

সাহিত্য শুনল না।বাধন আরো শক্ত করে নিজের কথা চালিয়ে গেল,

"কিই?তুই চিংড়ি মাছের ঠ্যাং খাবি?কিন্তু চিংড়ির তো লেজ থাকে ঠ্যাং থাকে না"

বাধন শক্ত হওয়ায় হালকা আর্তনাদ করে উঠল অন্ত,

"আআহহহ!আরে আমার বডিবিল্ডার ভাই,চিংড়ি মাছেরই সবচেয়ে বেশি ঠ্যাং হয়।এখন ছাড়ো আমাকে"

নিভু নিভু চোখে অন্তর পাশে দেখে হালকা ধমকের গলায় বলল সাহিত্য,

"ধুর মুরুক্ষো!ওগুলোকে হাত-পা বলে,ঠ্যাং বলে না"

ঠোঁট উল্টাল অন্ত।এ কোন মহা বিপদে পড়ল সে!কিসের মাছের ঠ্যাং, চিংড়ির ঠ্যাং লাগিয়েছে সাহিত্য।

হঠাৎ থমকে গেল অন্ত।চোখ সরু করে সাহিত্যের দিকে দেখল,

"ভাইয়া তুমি কি খেয়েছ?"

অন্ত শুধু কথাটা শেষ করেছে, অমনি সাহিত্য তাকে ছেড়ে দিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল।গলা পরিষ্কার করে শুধালো,

"কই?কিছু না তো"

সতর্ক স্বরে বলল অন্ত,

"কিছু তো অবশ্যই আছে।নাহলে গন্ধ কেন লাগছে?"

"নিজের গায়ের গন্ধের দো'ষ আমাকে কেন দিচ্ছিস?"

বলেই সাহিত্য অন্তকে কা'টিকে ভেতরে যেতে লাগলো। অন্ত মাথা ঘুরে দেখল সাহিত্য হাঁটতে গিয়ে একবার ডানে একবার বামে ঢলাঢলি করছে। সিড়ির ধারের কাছেও নেই সে।অন্তু চোখ উল্টালো।কিছু না কিছু তো অবশ্যই খেয়েছে।সাহিত্য ভাইয়ার অভ্যাস আবার কবে থেকে এমন খা'রা'প হলো?আপাতত সেটা ভেবে সময় নষ্ট করা যাবে না।কেউ এই অবস্থায় দেখে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে।

অন্ত দ্রুত পায়ে হেটে সাহিত্যের বাহু চেপে ধরল,

"তুমি এই অবস্থায় গাড়ি কেমন করে চালিয়ে এসেছো?"

সাহিত্য মাথা ঘুরিয়ে কটমটিয়ে বলল,

"চিপাচিপি না করে লেবু দে"

অন্ত নাক-মুখ শিটকে সাহিত্যকে ছেড়ে দিল,

"ডাইনিং এ বসো আমি লেবু আনছি"

সাহিত্য কোনো মতে হাতড়ে হাতড়ে গিয়ে চেয়ার টেনে বসল।আসলেই সে আজ গাড়ি কেমন করে চালিয়েছে উপরে এক আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।কিন্তু অতটাও বেসামাল অবস্থায় নেই সাহিত্য।এক ক্যান বি'য়া'রের অর্ধেক খেয়ে যেই একটু মাথা ঘুরছে।হালকা উল্টা-পাল্টা আচরণ করলেও সেন্স আছে তার।কিন্তু ভিকি যদি এটা জানতে পারে তাহলে জিন্দা ক'বর দিয়ে দেবে তাকে।কারণ সাহিত্য যে অতটুকুও সহ্য করতে পারে না।

এখানে সাহিত্যের কি দো'ষ?আজ ওই সাইকিয়াট্রিস্টটা এমন উল্টা-পাল্টা কথা বলেছে দেখেই তো রা'গ আর টেনশন চড়চড় করে মাথায় উঠছিল।নাহলে সেই দেশে ফেরার আগে খেয়েছিল,তাও আবার রেড ওয়াইন,তারপর তো সেগুলো ছুঁয়েও দেখেনি।অবশ্য সিগারেটের কথা আলাদা।ওই নাইটমেয়ারটা সারাদিন চোখের সামনে ঘুরাঘুরি করলে এমনিতেই মেজাজ গরম থাকে।

সাহিত্যের হাবিজাবি ভাবনার মাঝে অন্তর কন্ঠ শুনা গেল,

"এই নাও লেবু"

সাহিত্য নিভু নিভু চোখে মাথা তুলল।হালকা আলোতেও দেখা মিললো অন্তর কর্মকান্ডের।পুরো গোটা একটা লেবু সে সাহিত্যের দিকে এগিয়ে ধরে আছে।অন্তর এহেন কান্ড দেখেই সাহিত্যের নিভু নিভু সেন্স আরো একটু সচল হলো।অন্তর হাত থেকে লেবুটা নিয়ে আবার তার দিকেই ঢিল ছুড়লো সাহিত্য,

"মাল আমি খেয়েছি নাকি তুই খেয়েছিস?শা'লা গোটা লেবু চেয়েছি?কে'টে পানিতে গুলে দে"

লেবুর বারি যেন পাথরের মতো লাগলো অন্তর পেট বরাবর।ক্যাত করে উঠে সে পেট মালিশ করতে লাগলো,

"আমি কি কখনো খেয়েছি নাকি,যে জানব কি করতে হয়?"

"এখন তো জানিস।যাহ্,পানিতে দিয়ে আন...আবার গোটা লেবু গ্লাসে ডুবিয়ে আনিস না,গর্ধব"

অন্ত লেবু হাতে নিয়ে নাক শিটকে রান্নাঘরে গিয়ে মিনিটখানেক পর লেবু পানি নিয়ে এলো।যেই না সাহিত্য সেটা মুখে দিয়েছে অমনি নাক-মুখ কুচকে ফেলল।নির্ঘাত হাফ গ্লাস পানিতে পুরো লেবুটাই চিপে দিয়েছে এই অন্তটা।আর কিছু বলল না সাহিত্য। এমনিতেই তার মাথা ভো ভো করছে। কোনোরকম সেটা খেয়ে উঠে সিড়ির দিকে এগোতে নিয়েই পেছনে অন্তকে বলল,

"এতো রাতে এখানে কি করিস,হ্যাঁ?ভদ্র ঘরের ছেলেরা এতো রাত জেগে থাকে?"

সাহিত্যের কথায় অন্তর ঠোঁট জোড়া কিঞ্চিৎ দূরত্ব তৈরি করল।এ তো ভুতের মুখে রাম নাম শোনা হয়ে গেল।

সাহিত্য তার কথা শেষ করেই রুমের দিকে হাঁটা দিয়েছে।

গরমের জ্বালায় ব্রাউন-উদ রঙা শার্টের উপরের তিনটা বাটন সেই কখন খুলে দিয়েছে।তারপরেও দড়দড় করে ঘামছে।অন্ধকারে দরজার হ্যান্ডলকে হাত দিতেই অপ্রত্যাশিত কিছুর ছোঁয়া পেল সাহিত্য।ফোনের ফ্লাসলাইট জ্বালাতেই হ্যান্ডলকের নিচে হ্যাজবোলে একটা খাম আটকানো দেখতে পেল।

চিঠিটা দেখার সাথে সাথেই কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির কথা মাথায় আসল সাহিত্যের,সাথে সিড়িতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাটাও।ওইদিন না জানি কি হয়েছিল সাহিত্যের?ক্ষণিকের জন্য যেন নিজের অনুভূতিদের উপর পুরো নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ফেলেছিল সে।সেই মুহুর্তে আশেপাশে যেন আর কিছু নজরেই পড়েনি তার।কল্পনার ওই অবস্থা দেখেই নিজের বহু বছর আগের সেই চঞ্চল চড়ুই পাখিটার কথা মনে পড়েছিল সাহিত্যের।যাকে প্রতিবারই সেরকম পরিস্থিতির ক্ষেত্রে সাহিত্যই একমাত্র সামলে নিতো।তো সেদিনেরটাও তো তার দায়িত্বে পড়েছিল,তাই না?

মাথাটা জোরে এক ঝাকি দিল সাহিত্য।কীসের দায়িত্বের কথা ভাবছে সে?ওই মেয়ে তার কোনো দায়িত্বেই পড়ে না।সেদিন সেটা শুধু শরীরের স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া ছিল।শিথিল হয়ে এলো সাহিত্যের ভ্রু জোড়া।আসলেই কি সেদিন সেটা শুধু শরীরের স্নায়ুর প্রতিক্রিয়া ছিল,নাকি তার সাথে হৃদয়েরও কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল?আবার দরজায় আটকানো চিঠিটা দেখে ভাবনায় ছেদ পড়ল সাহিত্যের।

হ্যান্ডলক ঘুরিয়ে রুমে ঢুকতে নিয়ে একবার চিন্তা করল চিঠিটা নেবে না।কথাটা ভেবে কয়েক মুহুর্ত সেখানেই স্তব্ধ দাঁড়িয়ে রইল।কি যেন মনে করে টান দিয়ে চিঠিটা নিয়ে রুমের দরজা লাগিয়ে দিল।

অন্ধকার রুমে আর চোখ ধাধানো কোনো লাইট না জ্বালিয়ে ড্রিম লাইট অন করে ওভাবেই গিয়ে বিছানায় শুয়ে পড়ল।গত চিঠিগুলো খোলার আগে সময় নিয়ে চিন্তা করে খুলতো সাহিত্য।কিন্তু আজ পুরো ব্যতিক্রম কাজ করে স্বাভাবিকভাবেই সাথে সাথে খুলল।সাদা আলোতে পড়ার মতো অত স্পষ্ট না হলেও লেখাগুলো পড়া সম্ভব।অন্যদিন হলে হয়তো এই আলোর অছিলায়ও পড়া থেকে পিচপা হতো।কিন্তু আজ এতো ক্লান্ত শরীর নিয়েও চিঠিটা পড়ছে সে।কারণটা সে নিজেও জানে না।

📜.......................................................................

শ্রদ্ধেয় সাহিত্য ভাই,

গত চিঠিতে হুদাই প্যারা নিচ্ছিলাম।আপনার ইন্সটাগ্রামের এক পোস্টে দেখলাম আপনি আপনার এক বন্ধুর ম্যাসেজের রিপ্লাই বাংলায় দিয়েছেন।সোশ্যাল মিডিয়ায় তো খুব পোস্ট করেন। তো আমার সামান্য একটা চিঠির উত্তর দিতে পারছেন না!! আমি কিন্তু খুব রা'গ করেছি। আপনার ক্যানভাসগুলো কিন্তু এখনো আছে। রা'গ উঠলে আমি কি করি মনে নেই? আচ্ছা মনে করিয়ে দিচ্ছি।আপনার রঙ তুলিদের কোরবারি হতে হয়। এই পেইন্টিংগুলো তো অনেক আবেগ নিয়ে বানিয়েছিলেন।ভাবেন একবার আমার হাতে পড়লে কি অবস্থা হবে।

ভদ্র মানুষের মতো উত্তর দেন তাড়াতড়ি। নাহলে খবর আছে।

আপনার আদরের বোন,

অমৃতা শেখ কল্পনা।

.......................................................................📜

আবারো চিঠি পড়ে চিঠির নিচের নামটা এক দৃষ্টিতে দেখতে লাগলো সাহিত্য।কি আপন অধিকার নিয়েই না চিঠিটা লিখেছে।যেই ক্যানভাসগুলো সাহিত্য এসেই পুড়িয়েছে সেগুলোর কথাই মনে হয় বলেছিল।অথচ সেগুলো আসলেই আর নেই।আর সেগুলো সাহিত্যই নিজ হাতে পুড়িয়েছে।তাও আবার কল্পনার সামনে।এই চিঠিতে যেমন সাহস নিয়ে বলেছে,সাহিত্য যখন সেগুলো পুড়িয়ে দেয় তখন তো পুরো আলাদাই চেহারা ছিল মেয়েটার।মি'থ্যুক একটা।

চিঠিটা একদম মুখের কাছে ধরল সাহিত্য।অতঃপর হিসহিসিয়ে বলল,

"সমস্যা কি তোর?গার্লফ্রেন্ডের মতো এমন লাভ লেটার পাঠাস কি জন্য? কানাডিয়ান মেয়েগুলাও তো ইনস্টাতে এমন নক দেয় না"

হালকা মাতাল অবস্থায় মনের মধ্যে আরো অনেক চিন্তারই আবির্ভাব হলো।কিন্তু সাহিত্য একটাকেই প্রশ্রয় দিয়ে ঠোঁট বাকিয়ে নিঃশব্দে হাসলো,

"যাই হোক।চিঠি ফ্রেঞ্চে লিখেনি"

ক্লান্ত হাতটা বিছানায় ছেড়ে দিল সাহিত্য।আর কিছু ভাবতেই পারল না।তার আগেই ঘুমের দেশে পারি জমালো নিজের দোটানা অনুভুতিদের নিয়ে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

১২টার দিকে ঘুম থেকে উঠে মাথা চুলকাতে নিয়ে নিচে নামলো সাহিত্য।গত রাতে অন্তর বানানো অত কড়া লেবু পানি খেয়েও কেমন মাথা ঠিক হয় না?ভাবতে ভাবতেই এসে ডাইনিং এ বসল।অমনি তার সামনে শব্দ করেই প্লেট রাখল।মাথা তুলে মায়ের রা'গি মুখ দেখে আবার মাথা নিচু করল সাহিত্য। এই অন্ত আবার কিছু বলে দিয়েছে নাকি?তাহলে তো আজ ম'র'ণ নিশ্চিত।

শক্ত হাতে ছেলের প্লেটে খাবার দিচ্ছেন আমেনা শেখ।এর মধ্যেই অন্ত এসে সাহিত্যের পাশে বসল।সাহিত্য তার পাশে ঘুরে চোখে-মুখে ইশারা করে বুঝাল সে কিছু বলেছে নাকি?অন্ত তাকে আশ্বস্ত দিয়ে ইশারায় বুঝাল,'মা কসম ভাই।কিচ্ছু বলিনি'। কিন্তু আমেনা শেখের কি হয়েছে সেটাই মাথায় ঢুকছে না।

লতিফা শেখ রান্নাঘর থেকে ডাইনিং এ এসে ফুসতে নিয়ে বললেন,

"হ্যাঁ, এমনই চলতে থাক।সকালের নাস্তা খেতে খেতে একেবারে নাহয় দুপুরের খাবারটাও খেয়ে নে"

দুই ভাই চুপচাপ পরোটা চাবাচ্ছে।বাড়ির গিন্নিরা ভালোই রে'গে আছে।

আমেনা শেখ শান্ত কিন্তু শক্ত কন্ঠে বললেন,

"কাল বাসায় কখন ফিরেছিস সাহিত্য? "

দুই ভাইয়েরই খাওয়া বন্ধ হয়ে গিয়েছে।এখন কি বলবে?সাহিত্য অন্তকে টোকা দিতে লাগল।কারণ সাহিত্য তো জানেই না যে বাড়ির লোকজন কখন ঘুমিয়েছে আর সে ই বা কখন এসেছে।প্রথম দুই টোকায় অন্ত কিছু বুঝলো না।যখন সাহিত্য হুড়া মা'রলো তখন ধড়ফড় করে নড়ে উঠল অন্ত,

"ওই...বড় মা।তোমরা ঘুমানোর পর পরই ভাইয়া চলে এসেছিল।সাড়ে বারোটার মধ্যেই"

"আমি তোকে জিজ্ঞেস করিনি"

আমেনা শেখের গলা ঠান্ডা।

সাহিত্য এবার কথা বলতে লাগলো,

"মুখে খাবার ছিল তো তাই কথা বলছিলাম না।ওই অন্ত যেটা বলল।সাড়ে বারোটায়ই চলে এসেছি"

"এতো দেরি কেন?"

অন্ত পরোটায় মনোযোগ রেখেই মনে মনে শুধালো,

'সাড়ে বারোটা শুনেই বলছে এতো দেরি কেন।তাহলে আসল সময় শুনলে তো বলতো এতো সকালে কেন'

"অফিসে একটু কাজ ছিল।সেগুলো শেষ করতেই একটু সময় লেগে গিয়েছে"

পানির গ্লাস মুখে লাগালো সাহিত্য।

আমেনা শেখের কন্ঠ হঠাৎই নরম হয়ে গেল,

"এতো দেরি করিস না।শরীর ঠিক না থাকলে কাজও ভালো হবে না।বাইরে থেকে কি না কি অভ্যাস করেছিস,এখন ধীরে ধীরে বদলে নিস"

এবার অন্ত সাহিত্যকে হালকা টোকা দিল।অন্ত যেন আলাদাভাবে গত রাতের অভ্যাস স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।আমেনা শেখের কথায় উপর-নিচ মাথা নড়াল সাহিত্য।

খাওয়া শেষে সাহিত্য চলে যেতে নিলে অন্ত পিছনে হাঁটা ধরল।সবার চোখের আড়াল হতেই বলতে লাগলো সে,

"কাল রাতে ওসব কি ছিল?"

অন্তর কথায় বিরক্ত হলো সাহিত্য,

"কিছুই ছিল না।ভুলে যা"

"ভাইয়া।বড় বাবা জানতে পারলে কি করবে ভেবেছো?"

"এমন করে বলছিস মনে হচ্ছে আমি প্রতিদিন খাই"

"আমি কি জানি"

সাহিত্য অন্তর মাথায় একটা গাট্টা মা'রল,

"খাই না প্রতিদিন।মাথার টেনশন যখন একেবারে আউট অফ কান্ট্রোল হয়ে যায় তখন একটু আরকি"

"তো কালকে কি টেনশন করছিলে?"

থমকে গেল সাহিত্য।সময় নিয়ে বলল,

"ওই অফিসের ব্যাপারে"

"আচ্ছা যাই হোক। কিন্তু আর কারো সামনে যেন না পরে।তাহলে খবর আছে"

অন্ত কথা শেষ করেই তার রুমে ঢুকে পড়ল।সাহিত্যও আর কিছু বলল না।এখন একটা লম্বা সাওয়ার নিতে হবে।না হলে মাথা ব্যথাটা কিছুতেই সাড়ছে না।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আজ আমেনা শেখের চালচলন কেন জানি ভালো ঠেকছে না তোফায়েল শেখের কাছে।রাতের খাবারের পরে রুমে আসার পর থেকেই কেন জানি রা'গ ভাবখানা বেশি দেখা দিচ্ছে।বিনা ঝ'গ'ড়ায় বউয়ের এমন রা'গের কিছু মাথায় ঢুকছে না তোফায়েল শেখের।কারণ জানতেই জিজ্ঞেস করলেন।

স্বামীর প্রশ্নে যেন রা'গটা আরো বেড়ে গেল।তারপরেও নিজেকে ঠান্ডা রেখে বললেন তিনি,

"সাহিত্য যেন কেমন হয়ে গিয়েছে।মনটা খুবই খুরখুর করে ওকে এমন দেখলে।মনে হয় জান প্রাণ কিচ্ছু নেই ছেলেটার মধ্যে।দিনের কোনো রুটিন নেই।

কখন যে অফিস থাকে, কখন বাসায় থাকে বুঝাই যায় না।খাবার খাওয়ারও ঠিক ঠিকানা নেই"

"বয়স হয়েছে তোমার ছেলের। বিয়ে দিয়ে দাও।বউ ঘরে থাকলে সব টাইম টু টাইম হবে"

শান্ত স্বরেই বললেন তোফায়েল শেখ।

স্বামীর কথায় হালকা ভড়কালেন আমেনা শেখ,

"কই কত বড় হয়েছে আমার ছেলেটা?মায়ের আদরতো ভালো মতো পেলই না, তাতেই বউ গলায় ঝুলিয়ে দেব?"

একটু সময় নিয়ে থমথমে গলায় আবার শুধালেন তিনি,

"তার উপর এ বাড়িতে আবার শান্তি জিনিসটা আছে কই?দুই ব্যক্তির জন্য পুরো হাসি-খুশি বাড়ি ভাগ হয়ে গিয়েছে।বাড়ির বড় বউ হয়ে এখনো আফসোস লাগে,যে ওমন ছোট একটা বিষয় সামলাতে পারিনি আমি।এক অহেতুক কারণে আমার ছেলের জীবনটাও বদলে গিয়েছে"

"ওগুলো কথা তুলে এখন মাথাটা আর খা'রা'প করিও না তো।ঘুমিয়ে পড়ো।কাল সকালে আবার অফিস যেতে হবে আমাকে"

স্বামীর কথায় আবার রা'গটা বেড়ে গেল আমেনা শেখের।ওই অবস্থায়ই ঘুমিয়ে পড়লেন।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

নিজের একটা ছোট ভুলের জন্য এখন কল্পনার গলায় দড়ি দিতে ইচ্ছা করছে।যদি জানতো এমন কিছু হবে তাহলে কখনোই এই ভুল করত না সে।

রাতুল একদম পা'গ'ল করে দিয়েছে।ফোনে প্রায়সই নতুন নাম্বার থেকে কল দেয়।জানে যে কাছে আসলেই কল্পনা মানুষ জড়ো করতে দ্বিধা বোধ করবে না।তাই রাস্তায় দূর থেকে ফলো করে।প্রীতি তো বলেই দিয়েছে যে পুলিশে বলে দে।কিন্তু কল্পনা এখন ঝামেলা বাধতে চায় না।আগে ভার্সিটির পরীক্ষাটা শেষ হোক তারপর দেখা যাবে।

কিন্তু রাতুল যেন হাত ধুয়ে কল্পনার পেছনে পড়েছে।পরীক্ষার সময় এসব আশেপাশে থাকলে পড়ায় মনও তেমন ভালো বসছে না।এমনিতে এক বাড়ির ঝামেলা,তারউপর এই ক্যারেকটারলেস এর ঝামেলা।

রিকশার ভাড়া চুকিয়ে বাড়ির লোহার গেট পার হয়ে অনেকটা ভেতরে এসেছে কল্পনা।হঠাৎ চোখ পড়ল সাহিত্যের রুমের বেলকুনির দিকে।দেখেই যেন পায়ের নিচ থেকে মাটি সড়ে গেল কল্পনার।ভর দুপুরে বেলকনিতে দাঁড়িয়ে দিব্বি সি'গা'রে'ট টানছে সাহিত্য।

আপাতত রাতুলের কথাটা যেন সম্পুর্ণ উধাও হয়ে গেল মন মেজাজ থেকে।আর কোনো পাশে না দেখে সোজা সাহিত্যের রুমের দিকে হাঁটা দিল কল্পনা।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৫তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন