ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

১৭তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_১৭

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

দেশের সুন্দর ছয়টা ঋতুর বারোটা বাজলেও, বৈশাখ মাসের খা খা রোদ ও অনাকাঙ্ক্ষিত কাক ভেজা বৃষ্টি যেন সে কাল থেকেই ঠিক সময়ই ঋতু রাজের পর হাজির হবে।

যেমন আজকের কথা বললেও ভুল হবে না।দুপুর ২টা অব্দি খড় শুকানো রোদের তাপ,আর এখন হুট করেই যেন কারো সাথে বেশ অভিমান করে বসেছে এই বৈশাখ মাস।ভ্যাপসা গরম উঠে কেমন গোমুঠ রুপ ধারন করেছে।নির্দ্বিধায়ই বলা যাচ্ছে যেকোনো সময় বৃষ্টি আকাশ চিড়ে ধরণীর উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিবে।এ ধরনের বৃষ্টির পুর্বাভাস পাওয়ার সাথে সাথেই দরজা-কাপাট সব এটে নিতে হয়।নাহলে একবার বৃষ্টি শুরু হলেই দরজা-জানালা টানতে টানতেই এক পশলা পানি ঢুকবেই ঢুকবে।

সে হিসেবে বলা যায় আজ কল্পনার রুমে বন্যা হয়ে যাবে।দীর্ঘ কয়েকদিনের পরীক্ষার ইতি টেনে আজ ১টার দিকে বাসায় ফিরে সেই যে ঘুমিয়েছে,৩ টা পার হতে চলল,না দুপুরের খাওয়া,না গোসল। সব বেহেশতে দিয়ে ঘুমাচ্ছে।অবশ্য গত কয়েকদিন থেকে পরীক্ষা থাকার কারণে পড়াশোনাটা একটু বেশিই হচ্ছিল।যার দরুন আজ শেষ পরীক্ষার পর শরীর হাল ছেড়ে দিয়েছে তার।

তবে এই কয়দিন মনটাও কিছুটা খা'রা'প ছিল।সেদিন সাহিত্য ভাইয়ের সি'গা'রে'টের বিষয়টা ঘটার পর থেকেই আজ দুই সপ্তাহ হতে চলল কল্পনা আর সাহিত্য ভাইয়ের সামনে যায়নি।একটু অবাক করার বিষয়,যে একই বাড়িতে থাকে অথচ ১৪টা দিন কেমন করে না দেখা করে থাকা সম্ভব?বাড়ির যেই মেয়েটা সব সময় লাফিয়ে বেড়ায় সেই মেয়েটা যদি হুট করেই ঘর কোণা হয়ে যায় তাহলে সবই সম্ভব।আর সাহিত্যের তো তেমন কোনো হেলদোল নেই কল্পনাকে দেখা নিয়ে, যে খোঁজ নিতে আসবে যে কল্পনা কেন আর কোনো চিঠি দেয়নি।কল্পনা তো মনে করে উনি চিঠি না পড়তে পারলেই বেঁচে যায়,তাই না?

একটা মানুষকে আর কত জোর করা যায়।তাই কল্পনা ঠিক করেছে সাহিত্য ভাইকে আর জ্বালাবে না।যদি কল্পনার নিজের পক্ষে সম্ভব হয় তাহলে সে একাই বাবা-বড় বাবার ব্যাপারে চিন্তা করতে পারবে।এটা বলে হয়তো সে নিজেকে সান্ত্বনা দেয়।কিন্তু মাঝে মাঝে এই দুই ভাইয়ের ঝামেলা করার বিষয় নিয়ে চিন্তা করলে মনে হয় একটু সম্ভাবনা আছে।যেমন সেদিন টিভির রিমোট নিয়ে লেগেছিল,তারপরে একদিন রঞ্জক শেখকে নিয়ে টানাটানি লেগেছিল।দুই ভাইই ছোট ভাইকে নিয়ে বাজার যাবে। কিন্তু তারা একসাথে যাবে না।একপ্রকার বাচ্চাদের মতোই করছিল।শেষে রঞ্জক শেখকে একাই গিয়ে বাজার করে আনতে হয়েছে।

এরকম অযথা বিষয়ের উপর ঝ'গ'ড়া করার মানে একটাই হতে পারে যে উপরে উপরে তারা কথা বলতে চাইছে না।কিন্তু ভেতরে কথা বলার জন্য আকু-পাকু করছে।যতই হোক,মায়ের পেটের ভাই তো।একজন আরেকজনকে খু'ন করতে চাইলেও শেষে গলা জড়িয়ে ধরার আকুতি থাকবে।কল্পনা এই কয় মাসে দুজনকেই ভালো করে পরখ করেছে।সাহিত্যের বাবাকে একটু হলেও মাঝে মাঝে গলতে দেখেছে কল্পনা।কিন্তু বিপত্তি ঘটেছে তার নিজেরই বাবার ক্ষেত্রে।এহনাফ শেখের জেদ-রা'গ দুটোই পেয়েছেন।তিন ভাইয়ের মধ্যে ফাহাদ শেখেরই রা'গ-জেদ সবচেয়ে বেশি।যেমন কল্পনার ভাই-বোনদের মধ্যে সাহিত্যের রা'গ ও জেদ অনেক বেশি।কল্পনার বুঝ হওয়ার পর থেকেই দেখেছে,সাহিত্য নিজে যে সিদ্ধান্ত নিয়েছে সেই কথায়ই অটল থাকে।এক চুলও কেউ নড়াতে পারবে না।কল্পনার জানা মতে একটা জিনিসই শুধু সাহিত্যের অনিচ্ছায় হয়েছিল। আর সেটা হলো কানাডা যাওয়া।যেটা কল্পনাও কখনো চায়নি।

"এই কল্পনা... উঠ...অসময় ঘুমাচ্ছিস, খাবি কখন?....আর একি?..তুই কাঁদছিস কেন?"

লতিফা শেখের শেষের কথায় কল্পনা তড়িৎ গতিতে চোখ খুলল।হালকা দ্রুত শ্বাস-প্রশ্বাস চলতি রেখেই উঠে বসল।লতিফা শেখ আবার শুধালেন,

"কি রে মা, তুই কাঁদছিস কেন?"

চাচীমার কথায় নিজের গালে হাত দিল কল্পনা।আসলেই তো।ভালোই কেঁদেছে সে।গাল দুটো ভিজে গিয়েছে একদম।বালিশটাও অনেকটা ভেজা।লতিফা শেখ ভাতিজীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে নিয়ে কোমল কন্ঠে বললেন,

"কোনো খা'রা'প স্বপ্ন দেখেছিস?"

কল্পনা চুপ রইল।সে তো কোনো খা'রা'প স্বপ্ন দেখেনি।শুধু ঘুমাতে যাওয়ার আগ মুহুর্তে সাহিত্য ভাইকে দেওয়া চিঠিগুলোর ব্যাপারে ভাবছিল।ওগুলো অযথা রেখে কি করবে?কারো হাতে পড়লে তখন আরেক সমস্যা হবে।তাই চিন্তা করছিল সেগুলো আজ রাতে ছাদে নিয়ে গিয়ে সবার চোখের আড়ালে পুড়িয়ে ফেলবে।

কল্পনার তো ইচ্ছা ছিল সাহিত্যের বিছানার উপর পুড়াতে।যেন আর ওখানে ঘুমাতেই না পারে।কল্পনাকে যে এতো বছর কাঁদিয়েছে,আসার পর থেকে সেটা নিয়ে কি একবারও নালিশ করেছে সে?কানাডায় থাকাকালীন কল্পনার একবারো যে খোঁজ নেয়নি সেটার জন্যেও কি কিছু বলেছে?না। কিছুই বলেনি সে। কারণ সে চায় না তার সাহিত্য ভাই জানুক যে তার কারনে তার এই আদরের ছোট জানপাখিটা প্রায় কাঁদত,প্রায় নিজের রুম বাদ দিয়ে মাঝ রাতে করে তার রুমে থাকত,যেই ক্যানভাসগুলো আসার পরেই পুড়িয়ে ফেলল সেইগুলোতে প্রতিদিন একবার করে হলেও হাত ছুঁয়ে দিত,একমাত্র তার ছোঁয়া অনুভব করার জন্য।

যদি এমন দুরেই ঠেলে দিবেন তাহলে অতো আদরই করতেন কেন?সবসময় কল্পনাকে তুলার উপর বসিয়ে রাখতেন কেন?যেন ফুলের টোকাটাও না পরে।কল্পনাকে আগলে রাখা সেই ব্যক্তি যে এখন দূরে চলে যাচ্ছে।কিন্তু কল্পনার জীবনে আসা প্রেমের পুরুষ যদি ওমন না হয়,তখন?সাহিত্য ভাই যেমন কলিজায় ঢুকিয়ে রেখেছিলেন সেই পুরুষ যদি তার থেকে কম আগলে রাখে?তখন তো কল্পনা তার সাহিত্য ভাইকে মিস করবে।আর একটা বিবাহিত মেয়ে হিসেবে সেটা কি ভালো দেখাবে তখন?অবশ্যই ভালো দেখাবে না।আর এর সব কিছুর জন্য একমাত্র দায়ি থাকবে কল্পনার সাহিত্য ভাই।

ভাতিজীর ফুপিয়ে উঠা দেখে লতিফা শেখ ভড়কে গেলেন।কল্পনা এমন হুটহাট কান্না করার মেয়ে না।যথেষ্ট শক্ত মেয়ে সে।উপযুক্ত কারন ছাড়া কখনই কাঁদবে না।

"এই কল্পনা,কি হয়েছে মা?এমন কাঁদছিস কেন? তিন সপ্তাহ থেকে দেখছি কেমন মনম'রা হয়ে আছিস।চাচীকমাকে বল, মা। কি হয়েছে?ভার্সিটিতে কিছু হয়েছে?"

ছোট চাচু-চাচীমা কল্পনার কাছে বরাবরই বন্ধুর মতো। শাসনটার থেকে আদরটা বেশি করেন।উঠতি বয়সি বিভিন্ন মজার কথাও চাচীমাকে বলে থাকে কল্পনা।কিন্তু কখনোই নিজের মনের চাপা কথাটা বলতে পারেনি সে।

চাচীমার কথায় তার কোলে মাথা রেখে কোমড় জড়িয়ে ধরল কল্পনা,

"জানো চাচীমা?আমার না মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে সেই ছোটবেলায় ফিরে যাই।যখন আমি কেবল বুঝা শিখেছি।যখন থেকে সাহিত্য ভাইয়ের স্মৃতি জমা শুরু হয়েছে।যখন বাবা-বড় বাবা,মা-বড় মা সবাই কথা বলত। যখন আমি প্রায়-প্রায় সাহিত্য ভাইয়ের রুমে যেতাম। উনি আমাকে বার বার বের করে দিত আর আমি বে'হা'য়া'র মতো আবার যেতাম,ওনার ওই সুন্দর-সুন্দর পেইন্টগুলো নিয়ে খেলা করার জন্য।যখন ফাজলামো করার জন্য মা আমাকে বকা দিত আর সাহিত্য ভাই বার বার নিজেই মাকে সরি বলে আবার আমাকেই চকলেট কিনে দিত।যখন আমি মজা করে অকারনেই কাঁদতাম সাহিত্য ভাইয়ের থেকে বাড়ির সবাইকে বকা খাওয়ানোর জন্য।যখন আমার জ্বর আসলে সারা রাত মায়ের সাথে সাহিত্য ভাইও বিছানার এক কোণে বসে থাকত।যখন সাহিত্য ভাই শুধু আমাকেই তার হাবিজাবি ইচ্ছাগুলোর কথা বলত।আমি কিছুই বুঝতাম না,তারপরেও অনেক আগ্রহ নিয়ে তার গা ঘেষে বসে শুনতাম সেগুলো। তারপর যখন সাহিত্য ভাই কানাডায় চলে যাওয়ার দিন আসতো আমি আবার ছোটবেলায় চলে যেতাম"

কথা শেষ করে আবার কল্পনা ফুপিয়ে উঠল।লতিফা শেখ ভাতিজীর মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,

"সেটা আবার সম্ভব হয় রে পা'গ'লি?আর যদিও হতো,এক জিনিস বার বার হলে তোর মতো মেয়ে অবশ্যই অতিষ্ঠ হয়ে যেত"

"একদম না।প্রিয় মানুষের সাথে যদি তুমি এক কথা ১০০বার বলো তাহলে ১০০টা বারই নতুন মনে হবে ওই কথা।১০০টা বারই নতুন করে হাসবে তুমি সেই ব্যক্তির এক কথায়।চাচু আর তুমি যখন কথা বলো তখন কি তোমার বিরক্ত লাগে?অবশ্যই না। তেমন আমিও বিরক্ত হবো না"

লতিফা শেখ কল্পনার এতো গভীর কথায় অবাক হলেন।যেই মেয়েটা বাইরে সবাইকে বুঝায় যে সে শুধু হাতে-পায়ে বড় হয়েছে সেই মেয়েটা এতো ম্যাচিউর হলো কবে থেকে?আর সে কার সাথে কারই বা তুলনা করছে?কোন সম্পর্কের সাথে,কোন সম্পর্কের তুলনা করছে?

কোমল কন্ঠে শুধালেন লতিফা শেখ,

"তোর চাচু আর আমি স্বামী-স্ত্রী হই।আল্লাহ আমাদের সেই গুণ দিয়েছেন।যেটা প্রত্যেক স্বামী-স্ত্রীর মাঝেই থাকে।আর অন্য কোনো সম্পর্কে সেটা এতো গভীর হয় না রে মা"

"কিন্তু আমি যে সাহিত্য ভাইয়ের একটা কথা ১০০ বার কেন?সারাজীবন শুনতে পারব চাচীমা।এমনকি ওনাকে আমার সাথে কথাও বলতে হবে না। কারণ আমি জানি,উনি ওনার পেইন্টিংকে দুনিয়ার সব কিছু উপেক্ষা করে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসেন।আমার তাতেও কোনো সমস্যা নেই।উনি ওনার পেইন্টিং করুক আর আমি বসে বসে ওনাকে দেখব,তাতেই আমার তৃপ্তি"

কল্পনার কান্না কথার মাঝ পথেই থেমে গিয়েছে।শেষের লাইনগুলো যেন খুশি মনেই বলল সে।কিন্তু লতিফা শেখ অন্য চিন্তায় মশগুল।এই মেয়েটা কি বলছে আদতেও কি কিছু বুঝছে সে?সে কি জানে যে সে কি বুঝাচ্ছে?

আবার কোমল কন্ঠে শুধালেন লতিফা শেখ,

"তোর কি সাহিত্যের সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করছে?"

কল্পনা মাথা ঝাকাল,

"একদম না।কেন আমার ওনার সাথে কথা বলতে ইচ্ছে করবে?আমি তো শুধু অতীতে ফিরে যেতে চাইছিলাম"

লতিফা শেখ মনে মনে আওড়ালেন,

'হ্যাঁ, তোর কথা শুনে তো মনে হচ্ছে যেখানে শুধুই সাহিত্য আছে'

চোখের পানি মুছে কল্পনা উঠে বসল,

"ওহো, চাচীমা। চুপ করে গেলে কেন?কি নিয়ে ভাবছো?এতো ভেব না তো।আমি একদম ঠিক আছি।শুধু মাঝে মাঝে এই বাড়ির সার্কাস দেখে মাথাটা একটু ঘুরে উঠে।তাই এগুলো বললাম।আর কিছুই না"

কিছুক্ষণ আগে কাঁদতে থাকা চেহারায় হাসি দেখে কল্পনার গালে হাত বুলিয়ে দিলেন লতিফা শেখ,

"তুই বাড়ির এগুলো নিয়ে অযথা টেনশন করিস না।আর যেকোনো কথা বলতে হলে তো তোর চাচীমা এখানেই আছে।মন খুলে কথা বলবি"

মৃদু হাসলো কল্পনা।হঠাৎই বাইরে আকাশ ভাঙার ডাক শোনা গেল।কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হয় বৃষ্টি শুরু হবে।

লতিফা শেখ ভ্রু জোড়া উচিয়ে শুধালেন,

"মনে হচ্ছে ভালোই বৃষ্টি আসবে।তুই এক কাজ কর।ওই দিন অনু বৃষ্টিতে ভিজে তোর নাচটা প্রাকটিস করার আইডিয়া দিল না?আজ সুযোগ আছে"

কল্পনা ভ্রু জোড়া কুচকালো,

"সেদিন তো খুব মানা করছিলে।তো আজ আবার কি হলো?"

"তেমন কিছু না রে গা'ধি।বলছিলাম কি,কয়দিন ধরে পরীক্ষা দিতে দিতে কেমন মনম'রা হয়ে গিয়েছিস।তুই তো এমনিতেও বৃষ্টিতে ভিজতে পছন্দ করিস।আর ওই কাজটা করলে দেখিস তোর খা'রা'প মনটাও কেমন ফুরফুরে হয়ে যাবে"

চাচীমার কথায় দাঁত বের করে হাসলো কল্পনা।লতিফা শেখ হামি তুলে শুধালেন,

"টেবিলে খাবার সব রেডি করাই আছে।তুই এখন ঘুম থেকে উঠলি আর পুরো বাড়ির মানুষ এখন এই বৃষ্টির বাতাসে আরামে ঘুমাচ্ছে।আমিও এখন একটু শুতে যাব।বৃষ্টিতে গোসল করে এসে তুই কষ্ট করে একটু ভাতটা নিজে নিয়ে খেয়ে নিস"

কল্পনা মুখে হাসি রেখেই মাথা দুলালো,

"ঠিকাছে"

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

এক হাতে ফোন এবং মেহেদীর টিউব।আর আরেক হাতে ব্লুটুথ সাউন্ড বক্স নিয়ে হুটিপুটি পায়ে সিড়ির শেষ ধারে আসতেই ছাদের খোলা দরজা দিয়ে দমকা হাওয়া অষ্টাদশীর হাটু অব্দি বাধন হারা কালো রেশমি চুলগুলোকে ধাক্কা দিতেই তারা আপন মনে দুলতে লাগল।দমকা হাওয়ার সাথে বৈশাখের মিষ্টি সুবাস মিশ্রিত পানির ছিটা কণা ধবধবে আদলখানাতে যেন আরো একটু লাবণ্য বাড়িয়ে দিল। প্রকৃতির হালকা ছোঁয়া উপেক্ষা করল না অষ্টাদশী।সাদরে গ্রহণ করে নিল।

কল্পনা ছাদের দরজার কাছে বসে হাতে মেহেদী লাগাতে লাগলো।গত দেড় বছরে মেহেদী ছুঁয়েও দেখেনি মেয়েটা।পড়ালেখার অত্তাধিক চাপের সাথে অন্যান্য ব্যস্ততার করনেই এমনটা হওয়া।অবশ্য নিজের শখ আহ্লাদে বেশি চলাফেরা কল্পনা ছোট থেকেই করে না।কল্পনার মতে শখের কাজ দীর্ঘ সময় পর করলে বেশি আনন্দ। যার প্রমাণ আজকের দিন।

হঠাৎ মনটা খুড়খুড়িয়ে উঠল মেহেদী দেওয়ার জন্য।মেহেদী হাতে লাগিয়ে এই ঝুম বৃষ্টিতে নাচলে কি সুন্দরটাই না লাগবে!কল্পনার খুব ইচ্ছা ছিল সুন্দর করে একটা ভিডিও বানাবে।কিন্তু কীসের কি বোনের একটু সাহায্য করবে,তা না করে সামিয়া আর অনু দুটোই গরুর মতো দুপুরের ঘুম দিচ্ছে। পর মুহূর্তেই কাধ ঝাকালো কল্পনা। ভিডিও করেই বা কি করবে?সেটা তো কোথাও পোস্টও করতে পারবে না, আর না কাউকে দেখাতে পারবে।বৃষ্টির পানিতে এমনিতেই কাপড় সব চুপছে শরীরের সাথে লেপ্টে থাকবে।

তারউপর অষ্টাদশীর নারী দেহের গড়ন মাশাল্লাহ!শেখ পরিবারের সব সদস্যই খানদানি উজ্জ্বল। কিন্তু পরিবারের সবাই বলে বোনদের মধ্যে নাকি কল্পনা বেশি মায়াবতী।সে নাকি দাদী মহুয়া বেগমের সৌন্দর্য পেয়েছে।দাদী তো প্রায়সই বলে থাকেন,'"আল্লাহ মাবুদ তোকে মনে হয় নূর দিয়ে বানাইছেরে কল্পনা।বানানোর সময় ধৈর্যটাও কম রাখেন নাই'" মহুয়া বেগম বলেন নারীদের নাকি গুণের আগে রুপের দর্শক বেশি হয়।আর সেই দিক থেকে নাকি তার এই নাতনির দর্শন কেউ উপেক্ষা করতেই পারবে না। এটাতে বলার কিছু নেই।এলাকার ছেলেপেলেরা যেভাবে পেছনে ঘুরে তাতেই বুঝা যায়।প্রীতি তো প্রায় সই মজার ছলে কল্পনাকে পাঁচ ফিট সাড়ে চার ইঞ্চির লেয়ার মুরগি বলে ডাকে।কল্পনা এতে চেতে গেলেও প্রীতি বলা থামায় না।

কিন্তু সবাই তখনই অবাক হয় যখন শোনে এই রূপবতীর গায়ের রঙের মতোই চরিত্রও দুধে ধোয়া।এ যুগে এটা যেন বড্ড বেমানান।কিন্তু পারিবারিক শিক্ষা এটাকেই হয়তো বলে।এই অষ্টাদশী কন্যার উপর কারো আঙুল তোলার সাহস নেই।তুলবেই বা কেমন করে, একজন নারী হিসেবে নিজের সম্ভ্রান্তটুকু যথেষ্ট সুরক্ষিত আছে তার কাছে।

কিন্তু এইচ.এস.সি. পরীক্ষার পর যেন এক বোকার মতো ভুল করে বসেছে কল্পনা।যা এখনো তার পিছ ছাড়তে চাইছে না।হয়তো কোনো আপন মানুষের উপর রা'গ-জেদ দেখাতে গিয়েই নিজের এই ছোট ক্ষতি করেছে অষ্টাদশীর অবুঝ মন।কিন্তু যেই ব্যক্তির উপর রা'গ হয়ে এসব করা, একমাত্র তার চোখেই যেন এই নারী কিছু না। কিন্তু কল্পনার হয়তো ধারণাই নেই যে ভবিষ্যৎ এখনো আছে। হতে পারে সেটা বদলাতেও পারে এবং একেবারে পুরো দমেই বদলাতে পারে।

'🪷ওহে অষ্টাদশী ধৈর্য ধরো,

তোমার জীবন এমনভাবে বদলাবে

যেন শীতের মাঝে বসন্তের আগমন🪷'

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

যতই নতুন যুগ আসুক,দুনিয়া যতই আধুনিক হোক, কিছু জিনিস আছে পুরাতনই ভালো মানায়।যেমন নারীদের হাতের তালুর মাঝে বৃত্তসহ আঙুলের ডগায় মেহেদীর রঙ।এই অতি সাধারণ আলপনাও যেন বাঙালী নারীর হাতের সৌন্দর্য শত গুণে বাড়িয়ে দেয়।আর কল্পনাও এভাবেই দিতে পছন্দ করে।অল্প সময়ের মধ্যে রঙ আসা মেহেদী দুই হাতে দিয়ে কল্পনার মনে পরল তাকে ব্লুটুথে গানও সেট করতে হবে।মনে মনে নিজেকে রাম ধ'মক দিল সেকারণে। পনেরো মিনিটের খাটাখাটনি করে সফল হলো।

এদিকে বৃষ্টি যেন আজ কল্পনার মন ভালো করার জন্যই ঝড়ছে।থামার নামই নেই। সকালের রোদ যেন দুপুরের এই ঝড়ে ধুয়াসা হয়ে গিয়েছে।

উষ্ণ পদতল বৃষ্টির পানির ছোঁয়া পেতেই পুরো শরীর শিউরে উঠল অষ্টাদশীর। হাটু অব্দি চুলগুলোর উপরের কিছু চুল একটা পাঞ্চ ক্লিপ দিয়ে আটকানো। চুলের আগাগুলো লাল রঙা সাদা-কালো বল প্রিন্ট যুক্ত লম্বা কামিজটার মাথা পর্যন্ত গিয়েছে। রাণী গোলাপি প্লাজুর নিচে ধবধবে পদযুগল বৃষ্টির পানিতে ভিজে ছাদের মাঝে পৌঁছালো।ওমনি অষ্টাদশীর সর্বাঙ্গ বড় বড় পানির ফোটা দখল করে নিল।সর্বাঙ্গে লেপ্টে গেল পড়নের আবরণ।বাড়ির চাকরিজীবী পুরুষেরা সাধারণত এ সময় বাড়িতে থাকে না।যার কারণেই নাচের সুবিধার্থে ওড়নাটা নেওয়ার প্রয়োজন মনে করেনি কল্পনা।ওদিকে গান তো তার সুর কত আগেই তুলেছে।

❝

............ বারসো রে, মেঘা-মেঘা,

বারসো রে, মেঘা-মেঘা,

বারসো রে, মেঘা, বারসোও

বারসো রে, মেঘা-মেঘা,

বারসো রে, মেঘা-মেঘা,

বারসো রে, মেঘা, বারসোও

মিঠা হে, কোছা হে

বারিশকা বোছা হে

কোছা হে কোছা হে

বারিশকা বোছা হে.............❞

মেহেদী রাঙা হাত জোড়া ঘুরিয়ে নাচের সুচনা করল অষ্টাদশী। রমণীর অপরুপ ক্লাসিক ভারতনাট্যম নৃত্যের প্রদর্শনে, আকাশ চিড়ে পড়তে থাকা প্রতিটি পানি কণা হয়তো তার সর্বাঙ্গ ছুঁয়ে দিতে চাইছে। কিন্তু গানের সুরের তালে রমণীর দেহের অঙ্গরা যে এক জায়গায় স্থির রইছে না।গানের সৌন্দর্যতা অক্ষুন্ন রাখতেই তারা পড়তে থাকা পানি উপেক্ষা করে বাতাসে কম্পিত হচ্ছে।

❝

.......... গিলি-গিলি মাটি

গিলি মাটি কেএএ

চাল ঘারান্দে বানায়েঙে রেএএএএ

হাড়ি-ভাড়ি আম্বি, আম্বি কি ডালি

মিলকে ঝুলে ঝুলায়েঙে রেএএএ,হোওও

ধান, বেজু, গাজনিইইইই

হাল জোতে সাবনেএএ

ব্যালো কি ঘান্টি বাজিইইইই

অর তালে লাগে ভারনেএএ

রে ত্যাড় কে চালি,ম্যা তো পাড় চালি

রে ত্যাড় কে চালি,ম্যা তো পাড় চালি

পাড় বালে পার লেকে কিনাড় চালি,

রে মেঘা

নান না রে, নান না রে,

নান না রে, না না রে.............…..........❞

নাচের প্রথম দিকে ঘন সিল্কি চুলগুলো উপরে-উপরে ভিজলেও এখন পুরো দমে কাক ভেজা হয়ে গিয়েছে সেগুলো।যার দরুণ অষ্টাদশীর লতানো শরীর গানের তালে যখনই দুলে উঠছে তারাও যেন তার নাচের অংশীদার হয়ে কাপড়ের ভাজে-ভাজে লেপ্টে যাচ্ছে।হাটু অব্দি চুলগুলোর সামনে কপালের দুই পাশে কার্টেইন ব্যাঙ কাট দেওয়া ছোট চুলগুলোর কিছু চুল পানির ভারে লম্বা ঘন অক্ষিপল্লবের উপর নেতিয়ে পরেছে।ফর্সা গলদেশ ও আদলখানাকে তাদের আশেপাশের কিছু ছোট চুল যেন পরম আদরে ছুঁয়ে দিয়েছে।যার দরুণ রমণীর রুপের মাত্রা যেন অসীম করে তুলেছে তারা।নাচের মাঝেও গোলাপি অধর জোড়া, যা ঠান্ডা বৃষ্টির পানির ছোঁয়ায় র'ক্ত জবার ন্যায় হয়ে গিয়েছে,তারাও যেন আনন্দ উপভোগ করতে সুক্ষ্ম মাত্রায় নড়ে গানের অক্ষর গুনগুন করছে।

মানুষের শারীরিক ও মানসিক কিছু ধর্ম আছে।তাদের মধ্যে একটা হলো,আমরা কোনো কাজ যদি গুটিকয়েক মানুষের সামনে করে থাকি তাহলে সেটি এক রকম হবে।আর যদি সেই কাজ একাকী করে থাকি তাহলে সেটি আরেক রকম হবে।যেহেতু আমরা একাকী কাজটাতে বেশি মনোযোগী ও স্বাচ্ছন্দ বোধ করি সেহেতু দুই ক্ষেত্রের মধ্যে অবশ্যই এটিই বেশি সুন্দর, ভালো ও আকর্ষণীয় হবে।যা কল্পনার ক্ষেত্রেও হয়েছে। রমণী একাকীত্ব বোধ করে বৃষ্টি উপভোগ করে মনের সুখে নেচে যাচ্ছে।

প্রকৃতির নিয়ম অনুযায়ী স্বাভাবিকভাবেই যেকোনো পুরুষ বর্তমানে এই অষ্টাদশী রমণীর রুপে কাবু হতে বাধ্য।

নাচের শুরুতে সম্ভ্রান্ত রক্ষাকারী এই নব যুবতী ফোনে ভিডিও ধারণ করতে থেমে গিয়েছিল এটা ভেবে যে, ব্যক্তিগত মুহুর্ত কারো দর্শনে যেন না আসে।কিন্তু নাচের প্রায় শুরু থেকেই যে কেউ একজন এই ঝুম বৃষ্টির মাঝেও পানির প্রতিটি কণা উপেক্ষা করে ধূসর রঙা আবহাওয়ার মাঝে লাল-গোলাপি মিশ্রিত ভেজা আবরণে আবৃত কল্পনাকে নিষ্পলক দেখে আছে সেটা রমণীর ধারণাতেও নেই।

মাটিয়া-সবুজাভাব এই শান্ত নিষ্পলক চোখের রঙ দেখতে বাঙালীদের চোখের মতো না হলেও এই চোখ জোড়ার অধিকারী একজন খাটি বাঙালী বটে।নিজের জীবনের প্রথম ও শেষ প্রেয়সীকে আজ মনে হয় দীর্ঘ ১১বছর ৮ মাস পর আবেগ মাখা দৃষ্টিতে পরখ করছে সাহিত্য।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন