#পর্ব_১৮
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
হাতের কাজ চালাতে চালাতেই কালো দেয়াল ঘড়িটা একবার পরখ করে নিলো সাহিত্য। ০৩:২০ বাজে। মুখ দিয়ে 'চ' বর্গিয় শব্দ বের করে আবার হাতের কাজে মন দিল।পরিপাটি কেবিনটার আজ বেহাল দশা হয়ে আছে।টেবিলের উপরে ফাইল,সোফার উপরে ফাইল, কিছু কাগজও ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে পুরো কেবিনে।
এক ঘন্টা আগেও ঠিক ছিল সব।কিন্তু আগামী মিটিং এর জন্য যেই না প্রয়োজনীয় ফাইলগুলো একবার পরখ করতে গেল,অমনি চোখ কপালে উঠল সাহিত্যের।নিউ লঞ্চড প্রডাক্টগুলোর মানি ডিটার্মেনের ফাইলটা নেই।সেটা হারিয়ে যাওয়া মানে আগামী দুই-তিন মাসের আগে সেই প্রডাক্টগুলো আর লঞ্চ করতেই পারবে না।এই প্রজেক্টের উপরে আজই ফাইনাল মিটিং হওয়ার কথা।কিন্তু সেই ফাইলটা হারিয়ে গেলে আবার সবগুলো প্রডাক্টের জন্য আলাদা-আলাদা করে মিটিং রাখতে হবে।
"ড্যামিট!"
চাপা গলায় বলে হাতের ফাইলটা শব্দ করেই টেবিলে রাখল সাহিত্য।নিজের উপর রা'গটা চড়চড়িয়ে উঠছে। এতোটা কেয়ারলেস কেমন করে হতে পারে সে?
সাহিত্যের রা'গ উঠছে বুঝতে দেরি হলো না রাজের।ড্রয়ারের ফাইলগুলোকে এদিক ওদিক করে দ্রুত চোখ চালাতে নিয়েই বলল সে,
"স্যার টেনশন নিয়েন না।আশেপাশেই কোথাও আছে।খুজলেই পাওয়া যাবে"
"সব ফাইলই তো চেক করা হলো।যদি থাকতো এখানে, এতো বড় একটা ফাইল চোখে পড়ত না?"
চিন্তার ছাপ যেন স্পষ্ট সাহিত্যের কন্ঠে।ল্যাপটপেও কোনো সফট কপি রাখা হয়নি।ভেবেছিল আজ মিটিং-এ সব ফাইনাল করে তারপর সফট কপি রাখবে।কিন্তু কে জানত এমন কিছু হবে?
"রবি বা অয়ন স্যারের কাছে আছে নাকি?"
দেখা ফাইলগুলোতে আরেকবার হাত বুলাতে নিয়ে বলল রাজ।
"না।আমার কাছেই ছিল"
সাহিত্যের কথায় রাজের হতাশার নিঃশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকল না।কিন্তু এদিকে সাহিত্যের রা'গের মাত্রাটা যেন বেড়েই যাচ্ছে।আগে কখনো তার দ্বারা এমন কিছু হয়নি।যথেষ্ট সচেতন সে।কিন্তু গত মাস থেকে এতোটা মেন্টালি ট্র'মা'টাইসড হয়ে আছে যে সাধারণ একটা বিষয়কেও স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছে না।
ইচ্ছা না থাকা সত্ত্বেও বার বার অজান্তেই ওই বিষয় নিয়ে চিন্তা করছে সে।সেদিন অন্তকে নিয়ে অফিসে ঘুরতে এসে বাড়ি ফেরার পথে অন্তর কথাগুলো না মানতে চাইলেও তোফায়েল শেখের ব্যাপারে তো সত্যটাই বলেছে।অন্তকে ছোট থেকে দেখে আসছে সাহিত্য।ছেলেটা আগ বাড়িয়ে কোনো অযুহাত দেওয়া বা বানোয়াট কথা বলে না।আর সেই ছেলেই কল্পনাকে সম্পুর্ণ ডিফেন্স করে যাচ্ছিল।আবার সেদিনের সাইকিয়াট্রিস্টের কাছে নিজের বলা কথাগুলো বর্তমানে মানতে সাহিত্য নারাজ।ওটা হতেই বা পারে কেমন করে?কি ভেবে সাহিত্য ওগুলো বলেছিল?সে তো কবেই সেসব অনুভূতি পেছনে ফেলে এসেছে।
এটা নিজেকে সম্পুর্ণ মি'থ্যা বলল সাহিত্য।আসলটা হলো সে নিজেকে চিন্তা করতেই দেয় না সে বিষয়ে।মনে বা মস্তিষ্কের কোনো কোণে সেগুলো উঁকি-ঝুঁকি দিলে রা'গটা উগরে বের হয়ে এসে যেন ওগুলোকে ধামাচাপা দিয়ে দেয়।
সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে গিয়ে তো আরো এক ঝামেলায় পড়ল।উনি ট্রিটমেন্ট না দিয়ে কি সব উলটা-পাল্টা বকছিলেন।অযথা ওসব বলার কারণ আছে কিছু?সেগুলোর উত্তর নিজের কাছ থেকে না পেয়েই মাথার স্নায়ুগুলো ফেটে যাচ্ছিল সাহিত্যের।যার দরুণ আবার ম'দ্দোদ্রব্য হাতে নিয়েছিল।
তার উপর কল্পনার আগের স্মৃতিগুলো আজকাল একটু বেশিই ধাওয়া করছে সাহিত্যকে।ওই মেয়েকে তো সাহিত্য নিজের জীবন থেকে অনেক আগেই বের করে দিয়েছিল।ওই মেয়ের কোনো স্মৃতি স্মরণে রাখতে চায় না সাহিত্য।কিন্তু তারপরেও যেন পারছে না।যতই দূরে যাওয়ার চেষ্টা করছে ততই যেন সেই স্মৃতিগুলো ঘিরে ধরছে সাহিত্যকে।গত দুই সপ্তাহ থেকে যেন এক অজানা কারণেই হাসফাস লাগছে তার নিজের।সাহিত্য যেটা চেয়েছিল ওটাই তো হয়েছে।কল্পনা তার সামনে আসছে না।কিন্তু তাতে এতো অস্থির লাগছে কেন?দোমুখী টানাপোড়োনে গত কয়েক দিন থেকেই ঘুমাতে পাড়েনি ছেলেটা।নিজেকে যেন নিজেই বুঝছে না।জীবনের গত হওয়া সময়গুলোতে কঠিন থেকে কঠিনতম বিষয়ের ক্ষেত্রে নির্দ্বিধায় সিদ্ধান্ত নিয়েছে সে।কিন্তু এ বিষয়ে প্রতিবারই ব্যর্থ হয়।এর কারণ একটাই।এ বিষয়ে কখনো সাহিত্য চিন্তাই করতে চায় না।
"কি ব্যাপার সাহিত্য?মিটিং ৩টায় শুরু করার কথা আর তুই..... "
রবি রুমের অবস্থা দেখে চুপ হয়ে গেল।চেয়ারে বসে থাকা সাহিত্যের দিকে দেখে বলল,
"কি হয়েছে? এমন অবস্থা কেন?"
চেয়ারে এলিয়ে দেওয়া মাথার দুই চিপে এক হাতের আঙ্গুল ডলতে নিয়েই বলল সাহিত্য,
"মানি ডিটার্মেনের ফাইলটা খুজে পাচ্ছি না"
ভড়কালো রবি,
"কি বলিস?কখন থেকে?"
"সব তো একসাথেই ছিল।এখন দেখছি ওটা নেই"
"কি করবি এখন তাহলে?"
আগের ন্যায় শান্ত ও ভারী কন্ঠে বলল সাহিত্য,
"জানি না"
কি যেন চিন্তা করে শুধালো রবি,
"তুই বাসায় চেক করেছিস?"
"বাসায় তো না থাকারই কথা"
"তবুও আমার মনে হয় একবার চেক করা উচিত।অত টেনশন নিস না। আছে কোথাও।অফিস শেষে বাসায় গিয়ে চেক করিস একবার"
সাহিত্য উঠে দাড়ালো,
"ঠিক আছে।আমি দেখে আসছি"
রবি আবার হালকা ভড়কালো,
"আরে অফিস শেষ হওয়ার পর যাস।আর এখন যে পরিমাণে বৃষ্টি শুরু হয়েছে।যেতে পারবি না তো"
"ওই ফাইল না পাওয়া পর্যন্ত আমি বসে থাকতে পারবো না"
মুখে 'চ' বর্গীয় শব্দ করল রবি,
"আচ্ছা সাবধানে যাস।আর বেশি বৃষ্টি হলে অফিসে আসার দরকার নেই"
"ঠিকাছে"
ছোট করে উত্তর দিয়ে বেড়িয়ে গেল সাহিত্য।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ভারী বৃষ্টিতে রয়েল গ্রিন অ্যাস্টর্ন মার্টিনটা দ্রুত চালিয়ে বাড়ি ফিরল সাহিত্য।নিস্তব্ধ বাড়িতে সু জুতার খট খট আওয়াজ তুলে সোজা নিজের রুমের দিকে হাঁটা দিল।কিন্তু রুমে ঢুকার আগেই নিরবতার সীমানা পেড়িয়ে ধীমি গানের আওয়াজ ভেসে এলো।এই অসময়ে গান কই বাজছে বুঝার চেষ্টাতেই আশপাশ চোখ ঘুরাতে লাগলো সাহিত্য।ক্ষণিক বাদেই ঠাহর করতে পারল ছাদের ওপাশ থেকে গান শুনা যাচ্ছে।ভ্রু কুচকে সেদিকে তাকিয়ে থাকলো কিছুক্ষণ।হঠাৎ ফাইলের কথা মনে পড়তেই সব মাথা থেকে বের করে রুমে ঢুকে পড়ল।
স্টাডি টেবিলের উপর ফাইলটা পেয়ে যেন জানে পানি এলো সাহিত্যের।দেরি করল না আর।ফাইলটা উল্টে-পাল্টে দেখতে নিয়েই রুম থেকে বেড়িয়ে এলো।আবার সেই গান কানের পর্দায় এসে বারি মা'রল।এমন ঝড়ো আবহাওয়ায় কার এতো কলিজার পাটা বেড়েছে ছাদে গিয়ে গান চালানোর?ফাইলটা রুমের বিছানায় ছুড়ে মে'রে ছাদের সিড়ির দিকে হাঁটা দিল সাহিত্য।
ছাদের দরজার কাছে আসতেই দমকা শীতল হাওয়া শরীরে লাগলো সাহিত্যের। কিন্তু সেই বাতাস উপেক্ষা করে দরজার পাশে রাখা ফোন ও ব্লুটুথ চোখে পড়ল।ভ্রু কুচকে সেপাশ থেকে চোখ ঘুরিয়ে ছাদের দিকে দেখল সে।ভারী বৃষ্টিতে প্রথমে ঠিক বুঝা না গেলেও ক্ষণিক বাদে হাটু অব্দি রেশমি চুলের অধিকারীকে যেন এক মুহুর্তেই চিনে ফেলল।
থমকে গেল সাহিত্য।শুষ্ক ঢোক গিলে অধর জোড়ার সুক্ষ্ম ফাঁক দিয়ে হালকা শ্বাস ছাড়ল সে।চোখ জোড়া যেন সাধারণের থেকে বেশি প্রসারিত হয়ে গেল।টানা দুই সপ্তাহ যার দর্শন মেলেনি সে কিনা এই ঝড়ের মধ্যে মুখে ফুল ফোটা হাসি নিয়ে নাচছে।সাহিত্য কখনো চিন্তাও করেনি কল্পনাকে এভাবে দেখবে।সাথে সাথে চোখ নামিয়ে নিল সে।এই মেয়েকে দেখার অধিকার তার নেই এখন।ধীরে ধীরে সিড়ির দিকে ঘুরতে লাগলো।কিন্তু আসার সময় যে বেগ ছিল সেই বেগ আর নেই।প্রকৃতির বজ্রের হালকা গর্জন শোনা যাচ্ছে।কিন্তু সেটি যেন সাহিত্যের কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না।তার হৃদপিণ্ডদের কম্পনের শব্দ বজ্রের শব্দের থেকেও বেশি তীব্র।এই বৃষ্টির সাথে তার হৃদয়ের তোলপাড়ে যেন শ্বাস চলাচলটাও দায় হয়েছে।শার্টের উপর দিয়েই বুকের বাম পাশটা খামচে ধরল সাহিত্য।বিড়বিড় করে আওড়াতে লাগলো,
"এই দুই সপ্তাহেই এতো কাবু হয়ে গিয়েছিস?তাকে কাছে পাওয়ার এতো শখ জাগছে কেন তোর?ওর থেকে না দূরে থাকতে চেয়েছিলি?"
নিজেকে ক্ষণিকের বুঝ দিয়ে কাজ হলো না বোধহয়।যার দরুণ বাধ্য পুরুষের ন্যায় আবার সেই ঝুম বৃষ্টির দিকে নজর ঘুরালো।
এবার যেন চোখ জোড়া শিথিল হয়ে এলো।সরল আকার ভ্রু জোড়া নেতিয়ে গেল তার।কিন্তু হৃদয়ের সেই ঝড় যে আরো তীব্র হতে লাগলো।কিন্তু সেদিকে এই সুদর্শন পুরুষের খেয়াল কোথায়?সে তো সামনের রমণীকে পরখ করতেই ব্যস্ত।এক মুহুর্তের জন্য যেন ইহ জগৎ ভুলে বসেছে সে।
কই?এই ১১বছরে তো কখনো এমন হয়নি। কোনো মেয়েকে দেখে তো এমন থমকে যায়নি সাহিত্য।যার কারণ হয়তো একটাই।মন গহীনে রাজত্ব করা সেই প্রেয়সী।আর আজ সেই প্রেয়সীরই থেকে যেন চোখ সড়ানো দায় হয়ে যাচ্ছে।বে'হা'য়ার মতো সেদিকে দেখে থাকতে ইচ্ছা করছে সাহিত্যের।হয়তো ওই হাসিটা তার কাছে বড়ই আপন,ওই জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখ জোড়া তার কাছে বড়ই আপন এ জন্যই।এতো দিন থেকে তো এগুলোকেই উপেক্ষা করছিল সাহিত্য।কিন্তু গত দুই সপ্তাহে কি এই উপেক্ষা করা ব্যক্তিকেই কোনো কারণে দেখতে ইচ্ছা করছিল?কিন্তু কেন?সাহিত্য তো এই ব্যক্তিকে দেখতে চায় না।দূরে থাকতে চায় এই ব্যক্তির থেকে।কিন্তু এখন তো মনে হচ্ছে সেটা জোর খাটিয়ে তৈরি করা ইচ্ছা।সাহিত্য তো অন্য কিছুই চাইছে এখন।
নিজের ভাবনায় ডুবে থাকার দরুণ কখন যে বৃষ্টির মাঝে এসে দাড়িয়েছে সেটার খেয়ালই নেই সাহিত্যের।
কাক ভেজা হয়ে গিয়েছে একদম।নেভিব্লু শার্টটা ক্ষণিকের মাঝেই শরীরের সাথে লেপ্টে গেল।যার দরুণ সুঠাম দেহের ঢেউ খেলানো ভাজগুলো ভালো করেই দৃষ্টি গোচর হতে সক্ষম এই মুহুর্তে।সেদিকের তোয়াক্কা না করে ঝুম বৃষ্টির মাঝে দাঁড়িয়ে দূরে নাচতে থাকা কল্পনাকে নিষ্পলক দেখে যাচ্ছে সে।ভ্রু অব্দি চুলগুলো বৃষ্টির ছাটে নেতিয়ে পরেছে কপালের উপর।আর তার নিচে মাটিয়া-সবুজাভাব দুটি চোখের মণি যেন তাদের বছর পুরনো তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত।
ভারী বর্ষণের পানিগুলো যেন শিলার ন্যায় শরীরে এসে পড়ছে।পায়ে যেন কোনো শক্তি বোধ হচ্ছে না সাহিত্যের।যার দরুন ছাদের ধারিতে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রইল।কারণ চোখ জোড়ার তো সেদিক থেকে নড়ার ইচ্ছা বা শক্তি কোনোটাই নেই।সাহিত্য কি বৃষ্টিতে ভিজতে থাকা এক রমণীকে দেখে এমন করছে?অবশ্যই না।নিজের প্রফেশন এর সুবাদে কত মডেলের সাথেই না দেখা করেছে।তারা এর থেকেও চোখ ধাধানো রুপের অধিকারী ছিল।কিন্তু সাহিত্য কখনো তাদের এমন করে দেখেনি।কখনো হৃদয় এভাবে কেপে ওঠেনি যেভাবে এই প্রেয়সীকে দেখে কেপে ওঠে।যার ফলে নারী জগৎ থেকে এক প্রকার দূরেই সড়ে গিয়েছিল সাহিত্য।
কিন্তু আজ যে সামনে সেই ১১ বছর আগে সাহিত্যের উপর অধিকার খাটানো সেই একমাত্র মেয়েটি দাঁড়িয়ে আছে।যাকে নিজের হৃদয়ের সর্বত্রটুকু কবে দিয়ে দিয়েছিল সাহিত্যের নিজেরও স্মরণে নেই।একমাত্র সেই রমণীকে,সেই প্রেয়সীকেই এভাবে দেখার অনুমতি সাহিত্যের হৃদয়ে দেওয়া আছে।
দুধে আলতা হাতের মধ্যে টকটকে মেহেদী দেয়া।সেই মেহেদী যেন শুধুই এই হাত জোড়ার জন্য তৈরি করা হয়েছে।সেই ফর্সা হাতের আঙ্গুলের ভাজ থেকে গড়িয়ে পড়ছে সুক্ষ্ম পানি কণা।ভেজা রেশমি চুলগুলো কি অধিকারটা নিয়েই না সাহিত্যের প্রেয়সীর শরীরে লেপ্টে আছে!শরীরে থাকা পানিগুলো চুইয়ে চুইয়ে সর্বাঙ্গ থেকে ঝড়ে পড়ছে প্রেয়সীর।কিন্তু সাহিত্যের চোখে সবচেয়ে আকর্ষণীয় লাগছে ওই চোখ জোড়া আর ওই হাসি।যে দুটো তাকে ১১ বছর আগের সেই প্রেয়সীর কথা স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে।যেই চোখ জোড়া আর হাসি দিয়েই সাহিত্যের নেহাত মৃ'ত্যু বরণ হওয়া সম্ভব!
সাহিত্য কি আজ হাপিয়ে উঠেছে?নিজের মন ও মস্তিষ্কের দোটানায় কি আজ সাহিত্যের পরাজয় হতে যাচ্ছে?দীর্ঘ ১১বছরের দেখানো রা'গ কি এই ক্ষণিকের মধ্যেই পরাজয় হয়ে যাবে?হয়তো এখন সেটাই ভাবছে সাহিত্য।কিন্তু আসলটা তো সে এখন মানতে বাধ্য। নিজের রা'গ ও জেদের চাপে দাবিয়ে রাখতে গিয়ে যেন আরো বেড়িয়ে এসেছে সেই অনুভূতি।১১ বছর ধরে যার নামটা পর্যন্ত মুখে নেয়নি সাহিত্য।এই ভয়ে যে, যদি তার প্রতি ঘৃ'ণা কমে যায়।কিন্তু আজ একটু ভেবেই দেখল।যদি সেই মেয়ের শুধু নামটা মুখে নেওয়াতেই সাহিত্যের ঘৃ'ণা দুর্বল হয়ে যায় তাহলে সেটা আসল ঘৃ'ণার কাতারে পড়ে কিভাবে?আজ না হয় একটু চেষ্টা করেই দেখল,যে আসলেই সাহিত্য এই মেয়েকে ঘৃ'ণা করে কি না।
ভেজা নিম্নাষ্ঠো কা'মড়ে বড় বড় দুটো শ্বাস নিল সাহিত্য।চোখ জোড়া সামনের প্রেয়সীর দিকে রেখেই মুখ ফুটে বলার চেষ্টা করল।নাহ্,সম্ভব হচ্ছে না।হৃদপিণ্ডসহ হাত-পাগুলোও থরথর করে কাপছে তার।শুধু একটা নামই তো!এটাতে এতো সাহসের কি আছে?মুখ দিয়ে বের করলেই তো হয়।কিন্তু সাহিত্য যেন পারছে না।কারণ সে চিন্তা করছে এই নামের ব্যক্তিকে সে ঘৃ'ণা করতে পারে কি না।
আবার চেষ্টা করল।কিন্তু এবার.....১১ বছরে প্রথমবার নিজের মনের আসল অনুভূতিটাকে নিয়ে চিন্তা করল সাহিত্য।চোখ বন্ধ করে দুটো লম্বা শ্বাস নিয়ে আবার চোখ জোড়া খুলল,
"কল্পনা"
সুক্ষ্ম আওয়াজ শোনা গেল।পুরো পৃথিবী যেন দুলে উঠল সাহিত্যের।শুধু একটা নামই তো বলেছে।অথচ হৃদপিণ্ড যেন চামড়া ছিড়ে বেড়িয়ে আসতে চাইছে!সাহিত্য আবার একটু চেষ্টা করল।আবারো সূক্ষ্ম আওয়াজে শুধালো,
"কল্পনা"
কেপে উঠল সাহিত্যের গলা।ভেজা গাল দুটো আবার ভিজে উঠল চোখের নোনাজলে।এই এতটুকু একটা নাম সাহিত্যকে যেন পুরো অকেজো করে দিচ্ছে আজ।নোনাজলে ভেজা শিথিল চোখ জোড়া এখনো সেদিকেই দেখে আছে।
সাহিত্যের প্রেয়সী এখনো আপন মনে নাচতে ব্যস্ত।প্রেয়সীকে এবার মাথা থেকে পা অব্দি পরখ করল সাহিত্য।লতানো দেহখানা সদ্য ফোটা পদ্ম ফুলের ন্যায় আকর্ষণীয় লাগছে।আজ মনে হয় প্রথমবার অষ্টাদশীর সৌন্দর্য চোখে পড়েছে সাহিত্যের।এতো বছরে নব যুবতীর সৌন্দর্য যেন কোনো অংশে কম প্রকাশ ঘটেনি।
আচমকা পাশেই কোনো এক জায়গায় তীব্র বজ্রপাত পড়ল।হঠাৎ এমন বাজখাই শব্দে কল্পনা নাচ বাদ দিয়ে দুই হাত দিয়ে চোখ-মুখ ঢেকে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল।লম্বা ভেজা চুলগুলো তাদের গতি জড়তার কারণেই ঘুরে এসে অষ্টাদশীর সর্বাঙ্গ পেচিয়ে ধরল।
কিন্তু সেই বাজখাই বজ্রপাতও যেন সাহিত্যকে তার প্রেয়সীর পাশ থেকে চোখ সড়াতে ব্যর্থ হলো।বৃষ্টির বরফ শীতল পানি সাহিত্যের সারা শরীরকে জানান দিচ্ছে ঠান্ডা অনুভূতির।কিন্তু সাহিত্য যেন তা উপেক্ষা করে আজ হৃদয়ের উষ্ণতা অনুভব করতে ব্যস্ত।
এমন এক বজ্রপাতে কল্পনা অনেকটাই চমকে গিয়েছে।এই বৈশাখ মাসের আবহাওয়ার আসল রুপ বেড়িয়ে এসেছে যেন।এই বর্ষণে আর থাকা ঠিক মনে করল না কল্পনা।তাড়াতাড়ি বৃষ্টির আড়ালে চলে এলো।
কিন্তু কল্পনার চোখের আড়ালে থাকা সাহিত্য যে এখনো ঠায় সেখানেই দাঁড়িয়ে আছে।তার আবেগকে যেন এতো বছর পর এই বৈশাখীর ঝড়ই টেনে বের করে আনলো।এতোদিন পর যেন রা'গ-জেদ সব ভুলে ঠান্ডা মস্তিষ্কে ভেবেছে সে।
মাথা নিচু করে হালকা হেসে উঠল সাহিত্য।ভারী বৃষ্টিতে হয়তো সেটা শোনা গেল না।কিন্তু নিজের বিবেক এতোদিনে খুলেছে সেটা ভেবেই আবার সশব্দে হেসে উঠল সে।
এতোদিন থেকে যে দোটানা সংশয়ে সাহিত্য ছিল তা আজ দূর হয়েছে।সাহিত্যের মনে কল্পনার জন্য কখনোই কোনো ঘৃ'ণা জন্মেনি।যেই বাচ্চা মেয়েটার প্রতি বহু বছর আগে যে আসক্তি জন্মেছিল,তা এই কয়টা বছর সাহিত্য দমিয়ে রেখেছিল।কিন্তু মনের এক কোণে যে সেই সুপ্ত একখন্ড আসক্তি এক অদম্ম আসক্তে পরিনত হয়েছে,তার নাম সাহিত্য ঘৃ'ণা দিয়েছিল।আর সেটার একমাত্র কারণ ছিল তাদের পিতাদ্বয়।কানাডা যাওয়ার আগ মুহূর্তে সাহিত্যের বাবা তার ব্রেনওয়াশ করেছিলেন। আর সাহিত্য মেনেও নিয়েছিল।মেনে নেওয়ার যথেষ্ট কারণও ছিল। দুর্বল ছিল সাহিত্য সে সময়।সেই দুর্বল মনে ওই কথাগুলো গেথে যাওয়ার কারণে এত বছর পরেও অবুঝের মতো করছিল সাহিত্য।
কিন্তু তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখ তো আর এটা বুঝতে পারেননি যে যাকে তারা সাহিত্যের মন-মাথা থেকে বের করতে চেয়েছিলেন সে শুধুই তার চাচাতো বোন ছিল না।তার থেকে আরো কয়েক গুণ বেশি ছিল।যার কারনেই নিজের মনের অনুভুতি আর বাবা-চাচার দ্বারায় মাথায় ঢুকানো কথার মাঝখানে সাহিত্য এতো বছর থেকে পি'ষছিল।প্রতি মুহূর্ত যু'দ্ধ করে যাচ্ছিল নিজের ভেতরে।
যার প্রতি ঘৃ'ণা করে সাহিত্য নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছে সেই প্রেয়সীই যে ছিল তার জীবিত থাকার একমাত্র কারণ।তার স্মৃতি না থাকলে হয়তো সাহিত্য আজ কানাডায় শ'য্যা'শা'য়ী অবস্থায় থাকতো।
নিজের কর্মকান্ডে সাহিত্য আবার তাচ্ছিল্য হাসলো।প্রেমে পা'গ'ল হয়ে কারো প্রতি আসক্ত হয়ে পড়া দেখতে মনে হয় এমনই হয়।নিজের বহু আগের আসক্তির কাছে নিজের রা'গ-জেদ আজ হার মানতে বাধ্য হলো।
পানি চুইয়ে পড়তে থাকা চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে ঘাড়ের কাছেই দুই হাত ঠেকিয়ে বৃষ্টি ঝরা আকাশের দিকে মুখোমন্ডল উন্মুক্ত করল সাহিত্য।অতঃপর গলা উচিঁয়ে বলতে লাগলো,
"এই অহিয়াম শেখ সাহিত্য এখনো প্রেমে কেন পড়েনি জানো বৃষ্টি বিলাস ভুবন?কারণ তার হৃদপিণ্ডে যে এক ললনাময়ী নারী বহু বছর আগেই দাগ কে'টে রেখেছে। যা এই সাহিত্য জেনেও অস্বীকার করছিল।তোর প্রতি এই ঘৃ'ণা যে বেসামাল উন্মাদ আসক্তে পরিণত হবে তা ভেবেই কুলকিনারা হারাচ্ছি আমি। সাহিত্যের হৃদপিণ্ডে দাগ কে'টেছিস তুই। তোকে এই হৃদপিন্ডের জেল থেকে কখনো বের করতে পারিনি আর পারবোও না।এই সাহিত্যের পক্ষে সেটা কখনো সম্ভবই হবে না।এই ধরণীকে আজ সাক্ষী রেখে বলছি..........এই অহিয়াম শেখ সাহিত্য তোকে পা'গ'লের মতো ভালোবাসে কল্পনা!তুই শুধুই আমার!তোর জীবন রেখায় একমাত্র এই সাহিত্যের নামই লেখা আছে!"
শেষের কথাগুলো এক প্রকার চিৎ'কার দিয়েই বলল সাহিত্য।
সাহিত্যের কথা শেষ হওয়ার পর মুহুর্তেই পাশে কোনো এক জায়গায় বাজখাই এক বজ্রপাত পড়লো। যেন ধরণী উত্তর দিল, যে সাহিত্যের জানান তারা মেনে নিয়েছে।
#চলবে