ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

১৯তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_১৯

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

ভারী বর্ষণের প্রতিটি পানি কণাদের কাছে নিজের মনের গভীর অনুভূতির প্রকাশ ঘটিয়ে ভেজা শরীরে ছাদ থেকে দ্রুত পায়ে নেমে নিজের রুমেই ঢুকতে যাচ্ছিল সাহিত্য।আচমকা কল্পনাও একই সময় তার রুম থেকে বের হওয়ার কারনে মুখোমুখি হয় দুজনেরই।দুজনেই হালকা চকিত হয়।কিন্তু সাহিত্য যেন পর মুহূর্তেই নিজের প্রেয়সীকে দেখে হৃদয়ের উষ্ণতায় গলে যেতে ধরে।

এই প্রথমবার কল্পনাকে চোখ তুলে আগ্রহ নিয়ে দেখছে সাহিত্য।হাটু অব্দি সিল্কি লম্বা চুলগুলোর আগা দিয়ে টুপটাপ পানির ফোটা ঝড়ছে।সামনের ছোট চুলগুলো হালকা ভেজা থাকার দরুণ গোলগাল মেদহীন আদলখানাতে কিছু লাপ্টে আছে সেগুলোর।অনেক্ষণ বৃষ্টিতে ভেজার কারণেই হয়তো হার্ট সেইপ ঠোঁট জোড়া র'ক্ত জবার ন্যায় লাল হয়ে আছে।তীর তীর করে কাপায় খানিকটা আবেদনময় ই লাগছে বটে সাহিত্যের কাছে সেগুলো।

কিন্তু এদিকে যে কল্পনা চকিত অবস্থায়ই আছে।স্বাভাবিকভাবেই এ সময় কোনো পুরুষমানুষ বাড়িতে থাকার কথা না।যার দরুণ শুধু একটা লং গেঞ্জি আর প্লাজু পড়েই রুম থেকে বের হয়েছে সে।ছাদ থেকে এসে গোসল করে কেবল রুম থেকে বের হয়েছে কল্পনা।হঠাৎ সাহিত্যকে এসময় এভাবে দেখবে কল্পনাও করতে পারেনি।রুমের দরজা খুলে যেই না বের হয়েছে,পেছনে ঘুরে একটুর জন্য সাহিত্যের সাথে ধাক্কা লাগেনি। সাহিত্যকে দেখে ভড়কেই গিয়েছে সে।

কাক ভেজা হয়ে মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে সাহিত্য।ব্যাক ব্রাশ করার পরেও ভেজা চুলগুলো সামনে নেতিয়ে এসে মেঝেতে পানির স্থান করে দিচ্ছে।ভারী ভারী শ্বাস ফেলছে আর কল্পনার দিকে নিষ্পলক দেখে আছে।

সাহিত্যের এভাবে দেখাতে কল্পনা একটু অস্বস্তিই বোধ করছে। কিন্তু তাতে সাহিত্যের কি? সে তো তার প্রেয়সীকে বহু আবেগ মিশ্রিত কোমল দৃষ্টিতে দেখছে। কেমন আদুরে বিড়াল ছানার মতো কাচুমাচু করছে কল্পনা। ভেবেই বড় আফসোস হচ্ছে,এতদিন কি বড় ভুলটাই না করেছে সাহিত্য।

সামনের তীক্ষ্ণ চোখ জোড়া এভাবে দেখাতে কল্পনা জায়গা থেকে নড়তেও পারছে না।যেন তাকে নজর বন্দী করে রেখেছে সাহিত্য।পরিস্থিতি যেন কিছুতেই স্বাভাবিক হচ্ছে না।ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে প্রেয়সীর হালকা মোচড়া মোচড়ি ই পরখ করে যাচ্ছে সাহিত্য।মেহেদী রাঙ্গা ফর্সা ডান হাতটা দিয়ে সামনের ছোট চুলগুলো কানের পিছনে গুজে দেওয়ার পরেও যেন সেই চুলগুলো আদলখানাতে তাদের অধিকার খাটাতেই আবার আগের জায়গায় ফিরে এলো।ক্ষণিক সময় এলোমেলো দৃষ্টি ফেলে আবহাওয়া স্বাভাবিক করার জন্য কল্পনাই আগ বাড়িয়ে মুখ খুলল।কারণ সাহিত্যের তো সেদিকে আগানোর কোনো ইচ্ছাই দেখা দিচ্ছে না।মেঝের দিকে নজর রেখেই মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,

"আপনি হঠাৎ...এ সময়...বাসায় যে?"

"অফিসে ভালো লাগছিল না,তাই চলে এসেছি"

সাহিত্যের সোজা ঝাপটা কথায় তড়িৎ গতিতে মাথা তুলল কল্পনা।কারণ সাহিত্য ভাই কল্পনার কথার উত্তর দিয়েছে।সাহিত্য ভাই...কল্পনার...উত্তর দিয়েছে!!! সেটা কি আদৌ সম্ভব!

"কি!"

কল্পনার চোখ কোঠর থেকে বের হওয়ার উপক্রম।

আবার সাহিত্য সোজা ঝাপটা উত্তর দিল,

"আমার বাড়িতে আমার আসা মানা আছে নাকি?"

জোরে জোরে ডানে-বামে মাথা ঝাকালো কল্পনা।পরমুহুর্তেই ঘাড় ডানপাশে কাত করে শুধালো সে,

"এমন ভিজেছেন কিভাবে?"

ঘাড় কাত করায় লম্বা চুলগুলো আরো কিছুটা নিচে নেমে পরেছে।সেপাশে চোখ রেখেই শুষ্ক ঢোক গিলল সাহিত্য,

"তোর প্রেমে পা'গ'ল হয়ে"

মনে কথাটা আওড়ালেও বাইরে অন্য কথা বলল সাহিত্য,

"গ্যারেজে গাড়ি রাখতে গিয়ে"

কল্পনার মাথায় ঢুকলো না যে গ্যারেজে গাড়ি রাখতে গিয়ে এভাবে ভিজে কে?মনের কথা মনে রেখেই মুখে ধীমি আওয়াজে শুধালো কল্পনা,

"ও আচ্ছা....দুপুরের খাবার খেয়েছেন?"

শেষের কথাটা স্বাভাবিকভাবেই বলল।

সাহিত্য উল্টো প্রশ্ন ছুড়ল,

"তুই খেয়েছিস?"

কল্পনা যেন অবাকের শেষ সীমানায়।ঘন ঘন পল্লব ফেলে বলল,

"না।খাব এখন"

"তুই খেয়ে নে।আমি পরে খাব"

বলেই সাহিত্য তার রুমের দিকে এগোতে লাগলো।

কল্পনা ভ্রু কুচকে মাথা চুলকাতে লাগলো।সে কি স্বপ্ন দেখছে?হঠাৎ সাহিত্য ভাই তার সাথে কথা কেন বলছে?হয় ছাদে নাচার সময় পড়ে গিয়ে কল্পনার মাথায় আঘাত লেগেছিল নাহয় এই ভারী বৃষ্টিতে বাসায় ফেরার সময় সাহিত্য ড্রেনে পড়ে গিয়েছিল।কিন্তু দুটোর কোনোটাই তো হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

"কল্পনা"

এই মধু মাখা ডাকের জন্য কল্পনা একদম প্রস্তুত ছিল না।সাহিত্য ভাই তাকে এই প্রথমবার ডেকেছে!তৎক্ষনাৎ মুখে হাসি নিয়ে পেছনে ঘুরল কল্পনা,

"জ্বি"

পেছনে ঘুরতেই সাহিত্যের অতি কোমল অক্ষি জোড়ার দেখা মিললো।অষ্টাদশীর হৃদয় যেন কুল্ফির ন্যায় গলে গেল সেগুলোর দর্শন পেয়ে।

"ভার্সিটির প্রগ্রামে পার্টিসিপেট করিস না"

অমনি হাসিখানা চুপসে গেল কল্পনার,

"কেন?"

কন্ঠ হালকা শক্ত হয়ে এলো সাহিত্যের,

"আমি বলেছি তাই....এখন যা"

সাহিত্য তার রুমে ঢুকে গেল।

হা হয়ে সেদিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মুখ ভেংচালো কল্পনা,

"আমার কথা মনে হয় খুব শুনে যে আমি ওনার কথা শুনবো।কত কষ্টে প্রাক্টিস করেছি,আর এখন নাকি নাচবোই না।শুনলাম না আপনার কথা"

নিচে চলে গেল কল্পনা।আজ প্রায় ১৪ দিন পরে মনটা ভালোই ফুরফুরে লাগছে তার।পেটের ভেতরে উড়তে থাকা প্রজাপতিগুলোকেও তো একটু খাবার দিতে হবে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

রুমে ঢুকেই সারি সারি করে রাখা ক্যানভাসগুলোর দিকে এগিয়ে গেল সাহিত্য।এই কয় মাসে যেন কিছুতেই পেইন্টিং তাকে টানতে পাড়ছিল না।কিন্তু আজ যে বহু বছর পুরনো সেই এক পেইন্টিং করতেই কানভাসের দিকে দৌড়ে যাচ্ছে সে।এতো বছর চেয়েও যেই পেইন্টিং এর সুচনা করতে পারেনি তার সমাপ্তি টানার যেন আজই উপযুক্ত সময়।

নিজের শরীরের ঝড়তে থাকা পানি উপেক্ষা করে পেইন্ট ব্রাশের পানি ঝড়িয়ে নিজের নাইটমেয়ারকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তুলতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল সাহিত্য।

প্রায় আড়াই ঘন্টা পর দুই হাত ও পড়নের শার্টের বারোটা বাজিয়ে সেই রঙ মাখা এক হাত দিয়ে অধর জোড়া লুকিয়ে ক্যানভাসের দিকে দেখে মৃদু হাসল সাহিত্য।দীর্ঘ ১১বছর ধরে নিজের মস্তিষ্কের এই কল্পনাকে ক্যানভাসে ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করছিল সে।কেন ফুটিয়ে তুলতে পারেনি আর আজ কেন পারল সেটা ভেবেই যেন হাসি পাচ্ছে তার।রঙ তুলির শেষ ছোয়ার উদ্দেশ্যেই নিচে ডান দিকে কোনায় নিজের সিগনেচার দিয়ে ক্যানভাসের বাম পাশে উপরের এক কোণে কাজল কালো রঙ দিয়ে আলতো হাতে ইতালিক স্টাইলে ইংরেজিতে লিখলো সাহিত্য,

(𝘔𝘺 𝘯𝘪𝘨𝘩𝘵𝘮𝘢𝘳𝘦)

আজ এতো বছর পর নিজেকে একজন সার্থক আর্টিস্ট মনে হচ্ছে সাহিত্যের।নিজের জীবনের সবচেয়ে কঠিন চিত্র অংকন করেছে সে আজ।হয়তো বা চিত্রটি সাধারণ।কিন্তু সাহিত্যের কাছে নিজের দুঃস্বপ্নকে চিত্র রুপ দেওয়া এতো সহজ ছিল না।

সামনের ক্যানভাসকেই পরখ করছিল সাহিত্য,হঠাৎ কি যেন মনে করে ভিকিকে কল লাগালো।রিসিভ হয়ে ভিকিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই কন্ঠ উঁচিয়ে বলে উঠল সাহিত্য,

"ভিকি!আমার ক্যানভাস আজ ফাকা থাকেনি ভাই!"

ভ্রু কুচকালো ভিকি,

"মানে?"

পর মুহূর্তেই যেন ভিকির মনে পড়ল,যে একমাত্র কোন পেইন্টিং করার ক্ষেত্রে সাহিত্যের ক্যানভাস ফাকা থাকে।চেচিয়ে উঠল সে,

"তোর নাইটমেয়ার আর্ট করেছিস?"

"হ্যাঁ দোস্ত।ফাইনালি"

স্বস্তির নিঃশ্বাস সাহিত্যের কন্ঠে।

"কিভাবে হলো এটা?"

ভিকির কন্ঠ শুনেই বুঝা যাচ্ছে যে সে কতটা অবাক হয়েছে।

"তোর ভাই প্রেমে পড়েছে রে ভিকিইইইই"

সাহিত্যের কথায় আবার চেচিয়ে উঠল ভিকি,

"কীহ্!কবে?কখন?কিভাবে? এটা কি আদৌ সম্ভব?কে সেই মহীয়সী নারী যে অহিয়াম শেখ সাহিত্যকে প্রেমে ফেলেছে!"

আবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বিছানায় শরীর ছেড়ে দিল সাহিত্য,

"মাই নাইটমেয়ার"

এবার ভিকি পুরো চুপ মে'রে গেল।কোনো শব্দ আর শোনা যাচ্ছে না ফোনের ওপাশ থেকে।

ভ্রু কুচকে শুধালো সাহিত্য,

"ভিকি?"

আরো কিছুক্ষণ নিরবতার পর কাপা কন্ঠে বলল ভিকি,

"তোর নাইটমেয়ার।মানে কল্পনা?তোর চাচাতো বোন?"

"হ্যাঁ ভাই।সি ইজ দা অনলি লাভ অফ মাই লাইফ"

এবার ভিকির কন্ঠ বদলে গেল,

"তোর মাথা ঠিক আছে অহি?ও তোর থেকে.......নয় বছরের ছোট!"

শেষের কথাটা মনে হয় ভিকি হাতে গুণে হিসাব করেই চেচিয়ে উঠল।

"হ্যাঁ,তো?"

সাহিত্যের ঠান্ডা হাবভাব ভালো ঠেকছে না ভিকির কাছে।সে আবার শুধালো,

"ও তোর চাচাতো বোন হয়"

"হ্যাঁ, তো?"

"তোদের বাপদের মাঝে কি লুতুপুতু সম্পর্ক সেটা ভুলে গিয়েছিস কি?"

এবার তেতে উঠল সাহিত্য,

"আমার লাভ স্টোরি শুরু হওয়ার আগেই তুই ফুল স্টপ লাগাচ্ছিস কোন সাহসে বে?"

"কারণ তুই তোর লাভ স্টোরির পার্টনারটাই চুজ করেছিস ওমন"

আবার কোমল কন্ঠ নিয়ে লজ্জার ভংগিমায় শুধালো সাহিত্য,

"সেটা তো সেই বহু বছর আগেই ঠিক করে রেখেছিলাম"

কিন্তু ভিকির চোখে তো আর সাহিত্যের সেই নব বধু টাইপ লজ্জা ভংগিমা নজরে পড়ল না।যার দরুন সে অন্য কিছু ভেবেই বলে উঠল,

"অহি।মাথাটা একটু ঠান্ডা কর ভাই।আমি জানি যে ওই মেয়ের উপর তুই রেগে আছিস।কিন্তু ওরে এমন বউ বানিয়ে জ্বালানোর কোনো মানে হয় না।পিদ্দি একটা বাচ্চা ও!"

কল্পনাকে নিয়ে ভিকির মাত্রা অতিরিক্ত টেনশনে চটে গেল সাহিত্য,

"উফ্ ভিকি!চুপ করবি তুই?কি সব উল্টা-পাল্টা বলছিস?আমি কল্পনাকে ভালোবাসি।লাইক.....আই এ্যাম ডিপলি অবসেস্ড উইথ হার ম্যান"

শেষের কথাটা ভারী কন্ঠেই বলল সাহিত্য।

সাহিত্যের কথায় ভিকি সেই কতক্ষণেই চেয়ারে শরীর এলিয়ে দিয়ে ভেতর থেকে বেড়িয়ে যাওয়া সুক্ষ্ম প্রাণকে বিদায় জানাতে শুরু করেছে।সাহিত্য কখনোই কল্পনার প্রতি ভালোবাসার এই দিকটা কারো সামনে তুলে ধরেনি।নিজের একমাত্র আসক্তকে সাহিত্য নিজের মাঝেই রেখেছিল সব সময়।যার দরুণ ভিকি সাহিত্যের কথার কিছুই বুঝছে না।সুক্ষ্ম প্রাণটাকে টেনে ভেতরে ঢুকিয়ে এবার একটু স্বাভাবিক হলো ভিকি,

"তোর মতো কাঠখোট্টাকে যে কোনো না কোনো মেয়ে গলাবে সেটা আমার জানা ছিল।কিন্তু তোর নাইটমেয়ারই সেটা হবে....আই কান্ট বিলিভ দিস ম্যান"

"তো এখন বিলিভ করে নে"

"এক মিনিট....যদি কল্পনার কোনো বয়ফ্রেন্ড থাকে?"

কারো চেহারা স্মরণে আসতেই চোয়াল ও কন্ঠ দুটোই শক্ত হয়ে এলো সাহিত্যের,

"থাকলেও,আই ডোন্ট গিভ আ ফা'ক টু হিম।সি ইজ মাইন এ্যান্ড অনলি মাইন"

"হ,তোর কথায়ই তো সব চলবে,তাই না?মানুষের লাভ লাইফ নেই?"

"অবশ্যই আছে।কিন্তু আমার নাইটমেয়ারে যে নজর দিবে তার ভাগ্যে শুধু কাফনের কাপড় আছে"

ভিকি শুষ্ক ঢোক গিলল।টেনশন হচ্ছে তার।এই নতুন প্রেমে পা'গ'লা রোমিও যে কার কিমা বানাবে আল্লাহই ভালো জানেন।

গলা পরিষ্কার করে কাটকাট গলায় শুধালো ভিকি,

"তুই কি এই ডিসিশনে একদম ফাইনাল?"

কল্পনার কথা স্মরণে আসতেই আবার লজ্জায় ডুব দিল সাহিত্য,

"এটা ডিসিশন কেমন করে হলো?ইট ইজ দা অনলি অপশন"

আবার ভারী নিঃশ্বাস ফেলল ভিকি,

"আচ্ছা,ঠিকাছে মানলাম।কিন্তু কল্পনার দিকটাও দেখিস।ওর যদি কোনো সমস্যা না থাকে তাহলে ঠিক আছে"

সাহিত্য মেকি হেসে শুধালো,

"কার কথা বলছিস তুই?যে নিজেই আমাকে কোনো মেয়ের সাথে কথা বলতে দিত না সেই মেয়ের?তাহলে এই সাহিত্য তার জানপাখিকে অনেক আগেই পেয়ে গিয়েছে"

হাসলো ভিকি,

"তুই আজব তো তোর লাভ স্টোরি তো আজব হবেই.....বাই দা ওয়ে,কংগ্রাটস অন ইওর লাভ লাইফ"

সাহিত্য কিছু না বলে হেসে কল কে'টে দিল।শরীরটা বড্ড ক্লান্ত। কিন্তু আজ যে মনটা অনেক সতেজ তার।কিন্তু তারপরেও ক্লান্ত শরীরে অক্ষি জোড়া বুজে এলো।নিঃসন্দেহে আজ এক শান্তির ঘুম হবে এই পুরুষের।কারণ অবশেষে দোটানা অনুভুতির ইতি টেনে মনের দিকে ঝুকে পড়েছে সাহিত্য।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

( অতীত )

শেখ ভিলার জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হলেও শেখ পরিবার যেন এখনো ভালোভাবেই অক্ষুণ্ণ আছে ঢাকার ধানমন্ডি এলাকার বুকে।সরকারি কর্মকর্তা এহনাফ শেখই বর্তমানে এই শেখ পরিবারের প্রধান কর্তা।তার অর্ধাঙ্গিনী ও পিঠাপিঠি তিন ছেলেকে নিয়েই সাধারণ জীবনের অধিকারী তিনি এই যুগে।

কিন্তু সাধারণ যেন এই পরিবারের সাথে মানানসই নয়।আর সেটা এহনাফ শেখ বুঝতে পারলেন যখন তার মেঝো ছেলে ফাহাদ শেখ আহমেদ কাউকে না বলেই এক মেয়েকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে এলো।

তার কাছে এই মেয়েটি যে সম্পুর্ণ অচেনা তেমনটা নয়।এমনকি ছেলে যখন বলেছিল যে এক মেয়েকে সে পছন্দ করে আর তাকেই বিয়ে করবে তখন এহনাফ শেখ হাসি মুখে একটাই কথা বলেছিলেন,যে এক বেকার ছেলেকে কোনো বাবাই তার মেয়ে দিবে না।

কিন্তু মেয়ের অন্য জায়গায় বিয়ে ঠিক হয়েছে শুনে এক প্রকার বাধ্য হয়েই বড় ছেলে তোফায়েল শেখ আহমেদের আগেই মেঝো ছেলের বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে হেনা শিকদারের বাড়িতে যান।কিন্তু এহনাফ শেখের কথাই যেন কাটায় কাটায় মিলে গেল।

কিন্তু ছেলে যে এমন কাজ করে বসবে সেটা কখনো চিন্তাও করেননি তিনি।যার দরুণ হার্ট স্ট্রোক করে বসেন।

তিন ছেলের মধ্যে ফাহাদ শেখই ছিল যে কিনা বাকি দুই ভাইয়ের মতো চাকরি জীবন না বেছে নিয়ে নিজের বিজনেস শুরু করতে চেয়েছিল।এহনাফ শেখের সে বিষয়ে কোনো আপত্তি ছিল না।কিন্তু বাকি দুই ভাইয়ের চাকরি হওয়ার পরেও নিজের বিজনেস গড়ে উঠাতে সময় লাগলেও এই নব্বই দশকের যুগে যুবতী মেয়ের বিয়ের ক্ষেত্রে একজন বাবা কখনোই বেশি সময় নিবেন না।

কিন্তু নিজের রাগ ও জেদের বশেই প্রেয়সী ও বিজনেস দুটোকেই বেছে নেয় ফাহাদ শেখ।

মেঝো ছেলের হঠাৎ এমন বিয়ে হওয়ায় বাকি দুই ছেলের বিয়েতে আর দেরি করেননি এহনাফ শেখ।

যার দরুণ তিন-চার বছর অন্তর অন্তর ভালো মেয়ে খুজে তাদেরও বিয়ে দিয়ে দেন।

তবে পরবর্তীতে হেনা শেখের কোলে এক ফুটফুটে কন্যা সন্তান আসার পর দুই পরিবারই মেনে নিয়েছিল।নেবেই বা না কেন?কায়েস শিকদারের দুই ছেলের পর একমাত্র মেয়ে হেনা শিকদার।নাতনি সুবাকে দেখে আর মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেননি।

কিন্তু সব কিছু মেনে নিলেও পরিবারের সম্মানে হালকা আঁচড় ও পিতার এমন অসুস্থতার কারণেই মেঝো ভাইয়ের উপর সুক্ষ্ম অভিমান বিরাজ করছে তোফায়েল শেখ আহমেদের।কিন্তু তা যেন অদৃশ্য ছিল এহনাফ শেখের মৃ'ত্যুর আগ পর্যন্তই।কারণ,রঞ্জক শেখের ছেলে,অন্তর জন্মের বছর দুয়েক পর প্রকৃতির নিয়মেই যখন এহনাফ শেখ মৃ'ত্যু বরণ করেন তারপর যেন সম্পদ নিয়ে এক বিরাট দন্ড তৈরি হয়।আর সেটার কারণ ছিল যে, নিজের বিজনেস শুরু করার কারণে ফাহাদ শেখের অনুরোধে বাকি দুই ভাইয়ের থেকে তাকে সম্পদের পরিমাণ বেশি দেন এহনাফ শেখ।

সব কিছু স্বাভাবিক থাকলে এটা মেনে নিত তোফায়েল শেখ। কিন্তু আগের সুপ্ত ক্ষোভে যেন হিতে বিপরীত হয়।সেখান থেকেই যেন হালকা কষাকষি বড় দুই ভাইয়ের।

কিন্তু তাদের বিপরীত সম্পর্ক যেন গড়ে উঠে তাদের সন্তানদের মাঝে।আর সেটা দেখেই মহুয়া বেগম প্রায় প্রায় বলতেন,"বাপদের এত অমিল আর এদের এত মিল।না জানি কোথাকার পানি কোথায় গড়াবে"

তারপরেও সাহিত্য ও কল্পনার ভাই-বোনের এমন ভালোবাসা যেন ভালোই ঠেকতো বাড়ির সবার চোখে।কিন্তু এই ভালোবাসার অত্যধিক মাত্রা যে ঝড়ের পুর্বাভাস সেটা কারোরই ধারণায় ছিল না।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

শরীরটা আজ একটু বেশি খারাপ লাগার কারণেই হাফ ডে করে কলেজ থেকে বাড়ি ফিরছিল সাহিত্য।কিন্তু মাঝ রাস্তায়ই তার চঞ্চল চড়ুই পাখিটার দেখা মেলে।রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে আপনমনে আইস-ক্রিম খাচ্ছিল কল্পনা।সেদিকে নজর পড়তেই মুখে মৃদু হাসি ফুটে উঠল সাহিত্যের।কিন্তু কল্পনার পাশে চোখ পড়তেই যেন মাথার রগগুলো ফেটে যাচ্ছিল তার।

ওই ফুটফুটে সুন্দর ৮বছর বয়সী বাচ্চা মেয়েটাও যেন কিছু জা'নোয়ারের ফালতু নজরের শিকার হচ্ছিল।নিজেদের মধ্যে কেমন পৈ'শাচিক আচরণটাই না করছিল তারা ওই বাচ্চা মেয়েটাকে দেখে।হয়তো কাছে যাওয়ারও চেষ্টা করত যদি সাহিত্য আজ হাফ ডে না নিত।

ব্যাস,এতোটুকুই যেন যথেষ্ট ছিল সাহিত্যের ভদ্রতার পর্দা ছিড়ে যাওয়ার জন্য।মাঝ রাস্তায়ই ওই ভার্সিটি পড়ুয়া অশিক্ষিত ছেলেগুলোকে বিরতিহীন পেটাতে শুরু করে।

কিন্তু হঠাৎ সাহিত্যের এমন রুপ দেখে ছোট কল্পনা যেন বিভ্রান্ত হয়ে যায়।ছেলেদের হাতাহাতির মধ্যে সাহিত্যকে থামাতে হঠাৎ তাদের মাঝে ঢুকে পড়ায় মাথায় আঘাত লাগে কল্পনার।সেটা দেখে যেন রাগটা আরেক ধাপ বেড়ে যায় সাহিত্যের।কিন্তু ওই মুহুর্তে কল্পনাকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়া বেশি প্রয়োজন মনে করল সাহিত্য।

কল্পনার প্রাথমিক চিকিৎসা নিয়ে সাহিত্য যখন বাড়ি ফিরেছে ততক্ষণে বাড়ির পরিস্থিতি হাতের বাইরে চলে গিয়েছে।

কিছু আহাম্মক লোক এসে শেখ বাড়ির সদস্যদের বলেছে,সাহিত্য নাকি রাস্তায় বখাটে ছেলেদের মতো মারপিট করে।আর তার সাথে নাকি কল্পনাকেও আঘাত করেছে।

মেয়ের গায়ে হাত তোলার কথা শুনে ফাহাদ শেখ যেন গর্জে উঠেন।সাহিত্যের আর কোনো কথাই তিনি শুনতে রাজি নন।এক সময় যেন সাহিত্য পরিস্থিতির তোয়াক্কা না করে রাগের মাথায় উচ্চ স্বরে বলেই বসে,

"না হয় করেছি শাসন। তাতে কি এমন হয়ে গিয়েছে? কল্পনার উপর কি আমার কোনো অধিকার নেই?অন্তত বড় ভাই হিসেবেও তো সে অধিকার আছে আমার"

কিন্তু এর পরবর্তী ঘটনা যেন শেখ পরিবারের সদস্যরা স্বপ্নেও ভাবেনি।ফাহাদ শেখ সজোরে সাহিত্যের গালে চড় বসিয়ে দেন,

"কিসের এতো অধিকার খাটাও তুমি ওর উপর?আমার মেয়ের উপর কোনো অধিকার নেই তোমার।সে যোগ্যতা কখনোই ছিল না তোমার"

বাচ্চাদের এসব কথার মাধ্যমে যেন পুরনো বিষয়গুলোও আবার বেড়িয়ে আসে।যার কারণে কথা তিলে তিলে জলাশয়ের আকার ধারণ করে।কিন্তু রাগের মাথায় ফাহাদ শেখ যেন বড় ভাইকেই বার বার ছোট করছিলেন।এমন অপমান সহ্য করতে পারেননি তোফায়েল শেখ।সেদিনই বাড়ি থেকে বের হয়ে সাহিত্যের নানাবাড়িতে চলে যান।ছেলেদের এমন আলাদা হয়ে যাওয়া যেন মহুয়া বেগম সহ্য করতে পারেননি।হার্টের রোগী হওয়ার কারনে হার্ট স্ট্রোক করেন তিনি।

কিন্তু এসব ব্যাপারে ছোট কল্পনা যেন সম্পুর্ণ অজানা।আঘাত প্রাপ্ত ক্লান্ত শরীর নিয়ে হসপিটালেই সাহিত্যের কোলে ঢলে পড়ে।যার দরুণ মহুয়া বেগমকে হসপিটালে নিয়ে যাওয়ার পর পর জ্ঞান ফেরে তার।

কিন্তু কিছু বুঝে ওঠার আগেই যেন তোফায়েল শেখ হসপিটাল কেবিনে সবার সামনে বলে উঠেন,

"আমার ছেলেকে নিয়েই যখন এতো সমস্যা,তাহলে তাকেই নাহয় সবার থেকে দূরে সড়িয়ে দিচ্ছি"

মায়ের হঠাৎ স্ট্রোক করার কথা শুনে শশুরবাড়ি থেকে দৌড়েই এসেছিলেন তোফায়েল শেখ।বাকি সদস্যরা মনে করেছিলেন ক্ষণিকের রাগ হয়তো এখানেই থামবে।কিন্তু তোফায়েল শেখের এমন সিদ্ধান্তে বাড়ির সবাইসহ আমেনা শেখও হতবাক হয়ে যান।কারণ ছেলেকে দূরে পাঠানোর ইচ্ছা কোনো কালেই ছিল না তার।

সবাই এতো বুঝানোর পরেও যেন তোফায়েল শেখ তার সিদ্ধান্ত থেকে অনড় থাকলেন।স্ত্রীকে তিনি একটা কথাই বলেছিলেন,

"আমার ছেলের নাকি কোনো কিছুর যোগ্যতা নেই।তাই ওসব আর্টিস্ট বাদ দিয়ে কানাডায় গিয়ে ভালো করে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে বলো সাহিত্যকে।ভবিষ্যতে কারো কাছ থেকে যেন টাকার কথা না শুনতে হয়"

আমেনা শেখ স্বামীর সাথে অনেক তর্কাতর্কি করেছিলেন এ বিষয়ে।বলেছিলেন যে ভাইয়ের রাগ ছেলের উপর ঝেড়ে ছেলেটাকে যেন ভেঙে না ফেলেন।

কিন্তু প্রায় প্রতিটা পরিবারের মতোই বড়দের এসব অহেতুক কারণে বাচ্চারা শিকার হতে বাধ্য হয়।সাহিত্য বাধ্য হয় নিজের স্বপ্নকে নিজ হাতে ছিড়ে অন্য রাস্তায় পা বাড়াতে।

এর পাশাপাশি ভাইয়ের মেয়ের সাথে নিজের ছেলের এমন টান যেন আর সহ্য করতে পারছিলেন না তোফায়েল শেখ।যার দরুণ রাগের বশেই যেন ছেলেকে দূরে নিয়ে আসার চেষ্টা করেন সেই মেয়ের থেকে।আর এর ফলস্বরূপেই যেন প্রেয়সীকে ভুলতে না পেরে মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়ে সাহিত্য।আর সেটি একসময় সাহিত্যের দুঃস্বপ্নে পরিণত হয়।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

তোফায়েল শেখ কোনোকালেই বিজনেস পছন্দ করতেন না।হয়তো বা নিজের ভাই ই সেটার কারণ।

বছর কয়েক পর সাহিত্য নিজেকে সেই পেশাতেই প্রতিষ্ঠিত করায় এবার আর ছেলেকে থামাতে পারেননি তিনি।কারণ ভাইয়ের প্রতি রাগটা তখন অনেকাংশেই কমে এসেছিল।কিন্তু রাগের মাথায় নেওয়া ভুল সিদ্ধান্তে পরবর্তীতে অনুতপ্ত হলেও যেন অনেক দেরি করে ফেলেছেন তিনি।

আর তার সাথে এই পরিবারের প্রতি সাহিত্যের বিতৃষ্ণাও তৈরি করে দিয়েছেন।

#চলবে

....

অতীতটা অল্প কথায়ই শেষ করার চেষ্টা করেছি।আর কোনো পর্বে এমন করে অতীতের কোনো বিবরণ থাকবে না ।অতীত নিয়ে কোনো প্রশ্ন থাকলে অবশ্যই জিজ্ঞেস করবেন।সেটার জন্য কমেন্ট বক্স উন্মুক্ত আছে।

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ১৯তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন