#পর্ব_২০
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
( বর্তমান )
রুম থেকে বের হয়ে নিচেই যাচ্ছিল কল্পনা।কিন্তু সাহিত্যের রুমের দরজার সামনে আটকে গেল।ঠায় দাঁড়িয়ে বন্ধ দরজার পাশে অপলক দেখে আছে।
দুপুরের সময়টা যেন এখনো স্বপ্নই মনে হচ্ছে তার।সাহিত্য ভাই আজ হুট করেই এমন আলাদা ব্যবহার কেন করছিলেন?কিছু কি হয়েছে?কিন্তু তেমন তো কিছুই মনে পড়ছে না কল্পনার।
কিন্তু কল্পনার মনটা যেন শান্ত শীতল হয়ে গিয়েছে।আর যাই হোক, সাহিত্য ভাই তার সাথে কথা তো বলেছেন।
নিচে নেমে রান্নাঘরে ঢুকে ক্ষণিকের ক্ষুধা মেটাতেই খাবারের বাক্স হাতড়াতে লাগলো কল্পনা।বিকেলের নাস্তার পর্ব চুকিয়ে লতিফা শেখ রান্নাঘরেই ছিলেন।কল্পনাকে দেখে শুধালেন,
"হ্যাঁ রে কল্পনা,সাহিত্য কখন এসেছে?"
চাচীমার কথায় হাতের বিস্কুটে কামড় দিয়ে বলল কল্পনা,
"সাহিত্য ভাই তো সেই দুপুরেই এসেছে"
"দুপুরের খাবার খেয়েছে? "
"না।আমি জিজ্ঞেস করলাম তো বলল পরে খাবে"
ভ্রু কুচকালেন লতিফা শেখ,
"সাহিত্য তোকে বলেছে?"
ক্ষণিক সময় অপলক চাচীমার দিকে দেখে থেকে মুখে হাসি নিয়ে উপর-নিচ মাথা ঝাকালো কল্পনা,
"হ্যাঁ। আমাকে বলেছেন"
"বাব্বাহ,আজ সুর্য কোন দিকে উঠেছিল?...সে যাই হোক। যা তো গিয়ে সাহিত্যকে ডেকে আনতো। সকালেও তেমন কিছু খেয়ে যায়নি"
দ্বিমত করল না কল্পনা।দুপুরের 'বারসো রে মেঘা' গানটা গুণ গুণ করতে নিয়েই সাহিত্যের রুমের দিকে হাঁটা দিল।
দুইবার নক করার পরেও কোনো সারা শব্দ নেই।এই সেরেছে!আবার সাইলেন্ট মুডে চলে গেল নাকি এই স্যার?তৃতীয়বার নক করার পরেও যখন কোনো উত্তর পেল না তখন কাপা হাতেই সাহস করে রুমের হ্যান্ড লক ঘুরিয়ে মাথা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল কল্পনা,
"সাহিত্য ভাআআআই"
পুরো রুমে নজর ঘুরিয়ে যখন সাহিত্য চোখে পড়ল না তখন মনের সাহস আরেকটু বাড়িয়ে রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল।তখনই ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ শুনতে পেল কল্পনা।ভ্রু কুচকে গেল তার।সেই দুপুরেই তো ভিজে এসেছিল,তো এখন কেন গোসল করছে?
কেবল মুখে সাহিত্যের উদ্দেশ্যে বলতেই যাবে নিচে নামার কথা।কিন্তু হঠাৎ রুমের এক কোণে দাড় করিয়ে রাখা স্ট্যান্ডের উপর একটা ক্যানভাসে চোখ আটকে গেল কল্পনার।মুখ দিয়ে কথা বের না করে ধীর পায়ে ক্যানভাসটার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো সে।
খুবই আজব একটা ছবি।দেখে তো মনে হচ্ছে একটা ছোট মেয়ে বাচ্চার ছবি হবে।বয়স দুই-তিন বছর হবে হয়তো।মাথা থেকে কাধের একটু নিচ পর্যন্ত আঁকা ছবিটা।মুখে হাসি থৈ থৈ করছে বাচ্চাটার।কিন্তু সেই হাসি যেন ঢাকা পড়েছে সামনের দুই হাত দিয়ে।দুই হাতসহ সারা মুখ মাথায় বিভিন্ন রঙের পেইন্ট মেখে রেখেছে।হরেক রঙা পেইন্ট যুক্ত হাতের তালু দুটো এমন করে মুখের সামনে ধরেছে যেন সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ব্যক্তিকে খুশি মনেই সেই হাত দুটো দেখাচ্ছে বাচ্চা মেয়েটা।
সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডের ক্যানভাসটার উপরে বাম দিকে নজর গেল কল্পনার।সাদার উপরে কালো পেইন্ট দিয়ে লিখায় লেখাটা ভালো করেই চোখে পড়ছে।ইংরেজি লেখাটা ধীর গতিতে পড়তে লাগলো কল্পনা,
"মাই...নাইট..মেয়ার"
কল্পনা নিষ্পলক সেদিকে তাকিয়ে থেকে আবার শুধালো,
"মাই নাইটমেয়ার?এটা আবার কেমন কথা?আর এতো সুন্দর একটা পেইন্টিং এ এমন একটা কথা সাহিত্য ভাই লিখেছেনই বা কেন?"
সে কথা মাথা থেকে বের করে সময় নষ্ট না করে ফোন বের করে একটা ছবি তুলে নিল কল্পনা।ফোনে ছবিটা পরখ করতে নিয়েই ওয়াশরুমের সামনে এসে উচু গলায় বলল,
"সাহিত্য ভাই,আপনাকে নিচে রান্নাঘরে চাচীমা ডাকছে"
কথা বলেই রুম থেকে বের হয়ে সোজা রান্নাঘরে চলে এলো কল্পনা।ফোনের ছবিটা লতিফা শেখকে দেখিয়ে বলল,
"দেখো চাচীমা।সাহিত্য ভাইয়ের আর্টটা কি সুন্দর হয়েছে না!একদম আসল মনে হচ্ছে"
ছবির পাশে ভ্রু কুচকে তাকালেন লতিফা শেখ,
"হ্যাঁ...সুন্দর তো হয়েছে...কিন্তু...বাচ্চাটা দেখতে কিছুটা তোর মতো লাগছে"
ছবিটা দেখে আবার লতিফা শেখের দিকে ঘুরল কল্পনা,
"মানে?সেটা আবার কেমন করে?আমি আবার কখনো সাহিত্য ভাইয়ের রঙ এভাবে মেখেছিলাম নাকি?"
হেসে উঠলেন লতিফা শেখ,
"তুই যে সাহিত্যকে কতভাবে জ্বালিয়েছিস তার হিসেব নেই। কিন্তু ওই দিনের কথা আমি কোনোদিন ভুলব না।
তুই তখন দুই বছরের হবি।সাহিত্য কেবলই স্কুল থেকে বাসায় ফিরেছে।হঠাৎ তার চিৎকার শোনা গেল,
'কল্পনা! কি করছিস?'
আমরা তিন জা ই দৌড়ে এসে ডাইনিং এ দাঁড়িয়েছি।দেখি তুই খিলখিলিয়ে হেসে নিচে নামছিস আর সাহিত্য চিল্লাতে চিল্লাতে তোর পেছনে দৌড়াচ্ছে।আমাদেরকে তোর হাত ভর্তি রং দেখিয়ে তুই বলতে লাগলি,
'দেখো দেখো।আমিও ভাইয়ার মতো রঙ করেছি'
ওই দিন সাহিত্য স্কুল ফেরা ক্লান্ত শরীর নিয়েই সারা বাড়ি তোর পেছনে ছুটেছে।সে কি এক হাস্যকর কান্ড ছিল।তারপর থেকে সাহিত্য রুমে তালা দিয়ে স্কুলে যেত।আর তুই প্রায় সময় বড় ভাবির কাছে গিয়ে সাহিত্যের রুমের চাবির জন্য কান্না করতি"
কথা শেষে আবার হেসে উঠলেন লতিফা শেখ।
কল্পনা মাথা চুলকাতে লাগলো,
"কিন্তু আমার মনে নেই কেন?"
লতিফা শেখ শুধালেন,
"অত ছোটবেলার কথা আবার মনে থাকে?"
দাঁত বের করল কল্পনা,
"সাহিত্য ভাইয়ের মাথায় চড়ে থাকতাম।তারপরও কিছু বলত না"
"তখনো জ্বালাতি আর এখনো জ্বালাস।ওটাতে আমি আবার ছাড়া পেলাম কবে?"
সাহিত্যের কথায় চকিত হয়ে লতিফা শেখ ও কল্পনা দুজনেই পেছনে ঘুরল।দরজায় হেলান দিয়ে হাসি মুখে কল্পনার দিকে দেখছে সাহিত্য।
সাহিত্যের নিজে থেকে কথা বলায় কল্পনা যেন আবার অবাক হলো।কিন্তু সেটা সাহিত্যকে বুঝতে না দিয়ে মুখে বড় হাসি নিয়ে শুধালো,
"ওটা করেই তো মজা পাই আমি।তো সেটা আবার বাদ দিব কেন?"
কথা বলে সাহিত্যকে জিহ্বার মাথা দেখিয়ে রান্নাঘর থেকে বেড়িয়ে গেল কল্পনা।
প্রেয়সীর চুলের ঘ্রাণ যেন প্রথমবার সাদরে গ্রহণ করল সাহিত্য।মন তো চাইছে যেতে থাকা প্রেয়সীকে টেনে নিয়ে নিজের সাথে মিশিয়ে নিক।কিন্তু সেটা আবার সম্ভব হলো কই?নানা বাধা যেন চারপাশে।কিন্তু দেখতে তো আর মানা নেই।যার দরুণ ঘাড় কাত করে কল্পনার যাওয়ার পানে দেখে আছে সাহিত্য।
"কি ব্যাপার?বৈশাখের পানি কি তোর মাথায় ঢুকেছে নাকি?"
লতিফা শেখের কথায় ঠোঁটের কোণে হাসি নিয়েই তার দিকে ঘুরে শুধালো সাহিত্য,
"অমনই কিছু।তোমার ভাতিজার বিবেক খুলতে একটু সময়ই লেগে গিয়েছে"
মৃদু হাসলেন লতিফা শেখ,
"মেয়েটা কিন্তু সেই আগের মতোই আছে রে।ওর সাহিত্য ভাই ছাড়া কিছুই বুঝে না।বড়দের এমন অহেতুক কারণে আর মেয়েটার মন ভাঙিস না"
কিছু না বলে মাথা নিচু করে হাসল সাহিত্য।আগের থেকেও যে বেশি ভালোবাসা পেতে যাচ্ছে কল্পনা,সেটা লতিফা শেখের অজানাই থেকে গেল।
"দুপুরে নাকি খাসনি।এখন খাবি?"
মুখে হাসি রেখেই শুধালো সাহিত্য,
"নাহ্।একবারে রাতে খাব।শুধু কষ্ট করে এক কাপ কফি দাও"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
নক করার শব্দে বিছানায় শুয়ে থাকা অবস্থায়ই বলল কল্পনা,
"দরজা খোলাই আছে"
দরজা খুলে আবার লাগিয়ে দেওয়ার শব্দে ফোন থেকে চোখ ঘুরিয়ে ঘাড় কাত করে সেদিকে দেখল কল্পনা।অমনি যেন হুড়মুড়িয়ে বিছানায় শোয়া থেকে উঠে বসলো।সাহিত্য যে কল্পনার রুমে আসবে সেটা যেন কাল্পনিক ছিল তার কাছে।কল্পনা মনে করেছিল বাড়ির কোনো গিন্নি বা অনু হবে।
চোখ মারবেল আকার বানিয়ে ভাঙা গলায় বলল কল্পনা,
"সাহিত্য ভাই......আপনি?"
প্রেয়সীর এলোমেলো অবস্থা দেখে যেন থমকে গেল সাহিত্য।মৃদু ফ্যানের বাতাসে খোলা চুলগুলো হালকা এলোমেলো উড়ছে কল্পনার।হাতের টকটকে মেহেদী তো সেই দুপুর থেকেই আকর্ষণ করছে।প্রেয়সীর এমন অবস্থা দেখেই যেন বুকের ভেতরটা গভীরভাবে মোচড় দিয়ে উঠল সাহিত্যের।এজন্যই তো নক করে ঢুকেছিল।কিন্তু এই অবুঝ মেয়েটা যেন সাহিত্যকে উষ্কানি মূলক বার্তা দিচ্ছে।
"কোনো দরকার ছিল?"
কল্পনার আবারো প্রশ্নে সাহিত্যের ধ্যান ভাঙলো।চোখ সাড়িয়ে নিল আবেদনময়ী প্রেয়সীর দিক থেকে।
নজর সেভাবে নিচু রেখেই শান্ত স্বরে শুধালো সাহিত্য,
"আর চিঠি দিসনি কেন?"
গায়ের ওড়না ঠিক করে উঠে দাড়ালো কল্পনা।মিনমিনিয়ে বলল,
"ভাবলাম আপনার পড়তে ভালো লাগে না,তাই দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছি"
সাহিত্য এবার ধীর পায়ে কল্পনার দিকে এগিয়ে এলো।সামনের এই সুদর্শন পুরুষের তীরের ফলার মতো চাহনি যেন সইতে পারল না কল্পনা।যার দরুণ দুই কদম পেছনে বিছানার দিকে পিছিয়ে গেল।
সুক্ষ্ম ঘামে কল্পনার চিকচিক করতে থাকা নাকের ডগার পাশে একবার নজর দিয়ে সোজা তার অক্ষি কোঠরে দেখল সাহিত্য।সেদিকে নজর রাখা যেন দুষ্কর হয়ে উঠল কল্পনার পক্ষে।তাইতো সাহিত্য কাছে এসে দাঁড়ানোর পর মুহুর্তেই নজর ঘুরিয়ে নিয়েছে সে।কিন্তু সামনের এই বে'হা'য়া পুরুষ যেন তীর তীর করে কাপতে থাকা অধর জোড়ার অধিকারীর সেই চোখ জোড়ার সাথেই নিজের আবেগ বিনিময় করতে চাইছে।অতি কোমল ও এক রাশ আকাঙ্ক্ষা মিশ্রিত কন্ঠে শুধালো সাহিত্য,
"সেই আবেগ মাখা চিঠি উপেক্ষা করা যে এখন দায় হয়েছে আমার পক্ষে"
এই কোমল কথায় কল্পনার হৃদপিণ্ড মনে হয় সুক্ষ্ম বিরতিই নিল বটে।তারপরও নিজেকে সংযত রেখে ধীমি আওয়াজে শুধালো,
"আপনার পড়তে ইচ্ছা না করলে থাক।আমি জোর করব না"
নিজের অতল গভীর অনুভূতির সুক্ষ্ম এক বাক্য যে প্রেয়সী বুঝতে পারেনি সে হতাশায় ই মুখে 'চ' বর্গিয় আওয়াজ করল সাহিত্য।অতঃপর শুধালো,
"জানপাখিটা চিঠি লিখেছিস অথচ চিঠির ভাষা বুঝিস না কেন?"
চকিত হলো কল্পনা।সাহিত্যের মুখ দিয়ে বের হওয়া সেটা যেন ডাক নাম ছিল না,সেটা যেন এক তীব্র হাতুড়ি পেটা ছিল কল্পনার বুকে।এবার সরাসরিই সাহিত্যের দিকে দেখল কল্পনা।ক্ষণিকের মাঝেই চোখে ভারী জল জমা হলো।অভিমানী সুরে ভাঙা গলায় বলতে লাগলো,
"আপনার এই ক্ষণিকের আদর দেখাতে আসবেন না।একদম সহ্য হয় না আমার"
কল্পনার অভিমানী সুর যেন ঘায়েল করে দিল সাহিত্যকে।হাত দুটো সুক্ষ্ম কেপে উঠল কল্পনার হালকা ফুলে থাকা গাল দুটো ছুঁয়ে দেওয়ার জন্য।কিন্তু কল্পনার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সেটা করতে যেন একটু পিচপাই হলো সাহিত্য।কন্ঠের মাধুর্যতা বজায় রেখেই ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি নিয়ে শুধালো সাহিত্য,
"কেন?তোর গভীর আদর লাগবে?"
সাহিত্যের এহেন কথায় ভড়কালো কল্পনা।লজ্জাও পেল বটে।যার দরুণ আবার দৃষ্টি ঘুরিয়ে এলোমেলো নজর ফেলতে লাগলো।সেপাশে দেখে নিঃশব্দে ঠোঁট বাকিয়ে হাসল সাহিত্য,
"আর ক্ষণিকের আদর দিব না।আই প্রমিস।এবারের আদরের ছোঁয়া তুই চাইলেও ভুলতে পারবি না"
সব কথা উপেক্ষা করে এবার নিজের কথা চালালো কল্পনা।আবার সাহিত্যের দিকে ঘুরে ভাঙা গলা নিয়েই
বলল,
"কি হয়েছিল সাহিত্য ভাই? আপনি অমন কেন করছিলেন?আমি কি কিছু এমন করেছিলাম,যেটা আপনার খারাপ লেগেছিল?"
"নিজের অহেতুক রাগ তোর উপর ঝেড়েছি তার জন্য সরি।আর এমন হবে না"
"না।নিশ্চয়ই কোনো কারণ ছিল।নাহলে আপনি হঠাৎ অমন কেন করছিলেন?"
"বললাম তো কিছু না.....এখন আমার চিঠিটা কি দিবি?"
"কিন্তু...."
"এ ব্যাপারে আর কোনো কথা হবে না।আমার চিঠি দে"
কারণ জানার এক রাশ আকাঙ্ক্ষা থাকার পরেও সাহিত্যের শক্ত কন্ঠে দমে গেল কল্পনা।টেবিলের ড্রয়ার থেকে একটা চিঠি বের করতে নিয়ে আড়ালে চোখের পানি মুছে সাহিত্যের সামনে এসে দাড়ালো।ডান হাত দিয়ে চিঠিটা বাড়িয়ে ধরতেই সাহিত্য বাম হাত বাড়াতে বলল।কল্পনা কিছু না বুঝে ভ্রু কুচকে বাম হাত বাড়ালো।
আনমনেই নিজের খড়খড়ে পুরুষালী হাতের বৃদ্ধা আঙুল দিয়ে আলতো করে আঘাত লাগা জায়গাটায় ছুঁয়ে দিল সাহিত্য।হাত টা এখন সম্পুর্ণ ঠিক আছে।কিন্তু সাহিত্যের মনে যেন এখনো র'ক্ত ক্ষরণ হচ্ছে সেখানটায় দেখে।সেদিকে চোখ রেখেই গম্ভীর কন্ঠে বলল সাহিত্য,
"আর কখনো যদি আমার রাগের কারণ জিজ্ঞেস করেছিস তাহলে আবার মোচড় খাবি"
শুষ্ক ঢোক গিলল কল্পনা।
কথা শেষে চিঠিটা হাতে নিয়েই দরজার দিকে আগাতে লাগল সাহিত্য।অনুভূতিদের উপর সাহিত্যের নিয়ন্ত্রণ কখনোই ছিল না।তাই নিজেকে সংযত রাখতেই জোর পায়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।
কল্পনা পলকহীন দেখে আছে ফাকা দরজাটার পাশে।প্রথম থেকে তো এই সাহিত্য ভাইকেই চাইছিল সে।কিন্তু এখন কেন জানি সব কিছু এলোমেলো লাগছে।এতক্ষণ অব্দি শ্বাস চলাচলটাও কেন জানি অস্বাভাবিক ছিল তার।মাথা ঝাকিয়ে চোখ-মুখে পানি দেওয়ার জন্য ওয়াশরুমের দিকে হাটা দিল কল্পনা।নিজের অহেতুক অনুভূতিকে বেশি প্রশ্রয় দেওয়া যাবে না।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
প্রত্যেকবারের মতো আজও রাতের খাবারের সময় ডাইনিং টেবিলে শুধু বাটি চামুচের সুক্ষ্ম টুংটাং শব্দ হওয়া বাদে পুর্ণ নিরবতা বিরাজ করছে।
"হাচ্চু!!"
এমন নিরবতার মাঝে হঠাৎ দুই ব্যক্তির একসাথে হাঁচি যেন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করল।কল্পনা আর সাহিত্য দুজনেই একসাথে হাঁচি দিয়ে যেন আহাম্মক বনে গেল।
দুজনেই আজ লম্বা সময় ধরে বৃষ্টিতে ভিজেছে।তার উপর সাহিত্য তো সেই ভেজা শরীরেই পেইন্টিং করে লম্বা একটা ঘুম দিয়ে বিকেলেই গোসল সারলো।
অন্তর পাশে বসা অনু হাতের টিস্যু দিয়ে নাক কচলে বলল,
"এই স্যাঁতস্যাঁতে আবহাওয়ায় দেখছি আমার মতো তোমাদেরও অবস্থা খারাপ হয়েছে।সেজন্যই বলি পরীক্ষা না নিয়ে কলেজের সামার ভেকিশনটা একটু বাড়িয়ে দিলে কি ক্ষতিটাই হতো?অসুস্থ না হয়ে লেপের ভেতর ঢুকে থাকতাম"
অন্ত বলল,
"তোদের মতো পড়া চোরদেরই সেটা নিয়ে এতো চিন্তা হয়।কথা বাদ দিয়ে খা চুপচাপ"
ভাই-বোনের কথায় সাহিত্য-কল্পনার হাঁচির বিষয়টা যেন চাপা পড়ে গেল।নাহলে তো সাহিত্য আজ বলেই দিত,
'হাঁচি দিয়েছি বৈশাখ মাসে প্রিয়তমাকে দেখতে গিয়ে'
নিজের চিন্তায় নিজেই ঠোঁট বাকিয়ে হালকা হাসল সাহিত্য।কিন্তু আবার টেবিলে বিরাজমান নিরবতার মজা নিতেই মনে হয় সাহিত্য খাবার চাবাতে নিয়েই মহুয়া বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"দাদী,শরীর এখন কেমন লাগছে?ঔষধগুলো ঠিক মতো খাচ্ছো তো?এরকম সিরিয়াস বিষয়ে হেলাফেলা করো না কিন্তু"
নাতির টিটকারি কথা বুঝতে পেরেও সেই নদীতে গা ভাসিয়ে দিলেন মহুয়া বেগম,
"ঔষধ-স্যালাইন তো সবই চলছে।সেটা দিয়ে না হয় এক দিন বেশি বাঁচলাম।সেটা হয়েও বা কি লাভ।মানসিক শান্তি না পেলে আজ কি আর কাল কি"
কথায় মসলা মাখালো সাহিত্য,
"আমি মুহিত আঙ্কেলের সাথে কথা বলেছি।উনি বললেন ফার্স্ট স্টেজে আছে দেখে তেমন ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ঠিক মতো ট্রিটমেন্ট নিলে সুস্থ হওয়ার চাঞ্চ অনেক বেশি.....আআআরর ওই মানসিক শান্তিটাও নাকি একটু প্রয়োজন"
"এ বাড়িতে লাখ লাখ টাকার ঔষধ পাওয়া সম্ভব। কিন্তু ওটা পাওয়া একটু দুষ্করই হবে, সাহিত্য"
হঠাৎ লতিফা শেখের এমন কথায় নিরবতা যেন আরো এক ধাপ বেড়ে গেল।স্ত্রীর কথায় মাথা নিচু করে গলা খাকাড়ি দিলেন রঞ্জক শেখ।মনের কথা মুখ দিয়ে বেড়িয়ে এসেছে বুঝতে পেড়েই জিহ্বার মাথায় কামড় বসালেন লতিফা শেখ।
হেনা শেখ পরিস্থিতি বদলাতেই শাশুড়ীর উদ্দেশ্যে বলে উঠলেন,
"আম্মা,আগামী শুক্রবার কল্পনার নানারা আসবেন।আপনার অসুস্থতার কথা শুনে আগেই আসতে চেয়েছিলেন।কিন্তু ব্যস্ততার কারণে সময় হয়ে ওঠেনি"
কল্পনার খাওয়া বন্ধ হওয়ার সাথে সাথে চোখ জোড়া মারবেল আকার ধারণ করল।মাথা ঘুরিয়ে হেনা শেখকে জিজ্ঞেস করল,
"কে কে আসবে,মা?"
"তোর নানা-নানি আর মামারা"
মাথা নিচু করে আবার খাবারে মন দিল কল্পনা।নানা-নানি আসবে ঠিক আছে।কিন্তু দুই মামা আসলে একটু ঝামেলা হতে পারে।কেউ যদি বুঝে যায় যে মহুয়া বেগম নাটক করছে তাহলে এবার ঈদে আলাদা করে গরুই কিনবেন না ফাহাদ শেখ।কোনো দ্বিধা ছাড়া কল্পনাকেই কোরবানি দিবেন।
মহুয়া বেগম শান্ত স্বরে শুধালেন,
"অতো কিছুর কি দরকার ছিল?তারপরেও বেয়াইন সাহেব আসতে চাচ্ছেন আসুক।অনেক দিন পর তোমাদের সাথেও দেখা হয়ে যাবে।আমি অসুস্থ দেখে আবার মনম'রা হয়ে থাকিস না।হাসি মুখে ভালো খাবারের আয়োজন করিস"
ছেলেদের দিকে ঘুরলেন মহুয়া বেগম,
"আর...বেয়াইন সাহেবের সামনে অন্তত এসব অহেতুক ব্যবহার না করারই চেষ্টা করিও।যতই হোক, এ বাড়ির বড় দুই ছেলে তোমরা।পিতার দেওয়া শিক্ষা যেন মাথায় থাকে"
মহুয়া বেগমের কঠোর কথায় তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখ কিছু না বললেও রঞ্জক শেখ মুখে মৃদু হাসি নিয়ে শুধালেন,
"আরে ওমন কিছুই হবে না,আম্মা।আমার ভাইয়েরা যথেষ্ট ভালো"
ভাইদের মন গলাতে যেন ব্যর্থ হলেন রঞ্জক শেখ।যার উত্তর টেবিলের ভারী নিরবতা।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
আজ হাতের চিঠি দেখে মুচকি মুচকি হাসছে সাহিত্য।জীবনে এতগুলো প্রেম পত্র পেয়েও কেমন গাধার মতো উপেক্ষা করেছে সেগুলো।আবার আসার আগে সেগুলো পুড়িয়েও দিয়ে এসেছে।
"ইসস"
মনের দুঃখ হালকা মুখে প্রকাশ করল সাহিত্য।অতঃপর বিছানায় শুয়ে অতি আলতো হাতে চিঠিটা খুলল
📜.............................................….......................
শ্রদ্ধেয় সাহিত্য ভাই,
আচ্ছা সরি। আপনার ক্যানভাসে দিব না হাত। তবুও চিঠিগুলোর একবার তো উত্তর দেন!!এতো ধৈর্য ধরে রাখা আমার পক্ষে সম্ভব না।
আচ্ছা ঠিক আছে। এবার থেকে ২-১ লাইনের চিঠি লিখব।আপনার পড়ার সুবিধার্থে।
উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।
আপনার আদরের বোন,
অমৃতা শেখ কল্পনা।
.......................................................................📜
এবার আর শুধু শেষের নামটার দিকে দেখে থাকল না সাহিত্য।আলতোভাবে অধর জোড়া ছুঁয়ে দিল সে জায়গাটায়।এই আশায় যে,প্রেয়সীকে ছুঁতে না পারলেও তার হাতের ছোঁয়া তো ছুঁতে পারবে।
চিঠির দিকে চোখ রেখেই নেশালো কন্ঠে শুধালো,
"কেন ২-১ লাইনের চিঠি লিখবি?একটু বড় করেই নাহয় লিখিস।এতোটুকু পড়ে যে আমার মন ভরবে না"
এটা এখন বলেও লাভ নেই,সেটা ভালো করেই জানে সাহিত্য।ঠিক সময়ে মূল্য না দিয়ে এখন যে বড় পস্তাচ্ছে সে।
হতাশার শ্বাস ফেলে চিঠিটা দিয়ে মুখ ঢেকে বিছানায় দুই হাত দুই পাশে মেলে দিল সাহিত্য।সেই একই নেশালো কন্ঠে শুধালো,
"চিন্তা করিস না জানপাখি।এমন ভালোবাসা দিয়ে পুষিয়ে দেব যে,প্রতিটা চিঠির অপেক্ষায় থাকা ধৈর্যটুকুও আর স্মরণে থাকবে না"
#চলবে