ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

২১তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_২১

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

কোনো পারমিশন ছাড়াই কেউ কেবিনের দরজা খোলায় ল্যাপটপের কি-বোর্ডে চালানো ব্যস্ত হাতগুলোতে একটু বিরতি পড়ল সাহিত্যের।মাথা তুলে অন্তকে দেখে ঠোঁট বাকিয়ে হাসল সাহিত্য।ছোট ভাইয়ের জন্য কোনো পারমিশনের প্রয়োজন নেই।

কিন্তু অন্তর হাবভাব দেখে হাসিটা আর থাকলো না।ডান গালে হাত দিয়ে চোখ-মুখ অন্ধকার করে রুমে ঢুকছে অন্ত।

"কি রে?হঠাৎ অফিসে কেন?আর কি হয়েছে? গালে হাত কেন?"

মাথা নিচু করে ধীর পায়ে এগোতে নিয়েই মিনমিনিয়ে শুধালো অন্ত,

"চড় খেয়েছি"

চকিত হলো সাহিত্য।গত মাসে সি'গারেটের জন্য সে কল্পনার হাতে ঠাডিয়ে একটা চড় খেয়েছিল।তারপর থেকে সি'গারেট যেন চোখেই দেখতে পাড়ছে না সাহিত্য।কিন্তু সেই চড়ের কথা অন্ত কেন বলছে?সাহিত্যের এই চঞ্চল চড়ুই পাখিটা আবার অন্তকেও চড় মেরেছে নাকি?এই মেয়ের কোনো গ্যারান্টি নেই।

অন্ত ধপাস করে সামনের চেয়ারে বসায় ভাবনায় ছেদ পড়ল সাহিত্যের।ভ্রু কুচকে আগ্রহ নিয়ে শুধালো সাহিত্য,

"কল্পনা চড় মেরেছে?"

চেহারায় এক বালতি অবাকের ছাপ নিয়ে মাথা তুলল অন্ত,

"ও কেন আমাকে চড় মারতে যাবে?"

"তো কে মেরেছে?"

অন্ত আবার মাথা নিচু করে মিনমিনিয়ে বলল,

"জানি না"

এবার সাহিত্য ল্যাপটপ বন্ধ করে সাইডে রেখে পুর্ণ মনোযোগ অন্তর দিকে দিল,

"মানে এটা কেমন কথা?তুই জানিস না মানে?"

"আরে ভাই রাস্তায় দাঁড়িয়ে বন্ধুদের সাথে গল্প করছিলাম।হুট করে একটা মেয়ে এসে গালে চড় বসিয়ে দিল"

"এটা কেমন কথা অন্ত?কথা নেই,বার্তা নেই এসে চড় বসিয়ে দিল?"

"আমারো তো সেটাই কথা"

"কি হয়েছিল ভালো করে বলতো"

এতক্ষণে গাল থেকে হাত নামালো অন্ত,

"বললামই তো।আমি বাইকের পাশে দাড় হয়ে বন্ধুদের সাথে গল্প করছিলাম।হুট করে পেছন থেকে আওয়াজ আসে 'এই যে ভাইয়া শুনছেন?' 'জ্বী শুনছি' বলে আমি ঠিক মতো পেছনেও ঘুরিনি।এমন একটা চড় দিয়েছে যে ৩৬০° অ্যাঙ্গেলে ঘুরে মেয়ের দিকে ঘুরেছি।

আমি তো পুরো হতো-বাক! কি হলো কিছুই বুঝলাম না।মাথাটা ভো ভো করে ঘুরছিল তখনো।চোখে-মুখে আমার অন্ধকার নেমে এসেছিল।নিজেকে সামলে উঠতে, উঠতে দেখি মেয়ে রিকশায় উঠে বসেছে।

আমাকে আঙ্গুল দেখিয়ে বলল,'চড়টা যেন মনে

থাকে' "

এক ভ্রু উঁচিয়ে সামনে একটু ঝুকে এলো সাহিত্য,

"তোকে একটা মেয়ে কোনো কারন ছাড়া চড় মেরে গেল,আর তুই ওকে ছেড়ে দিলি?"

"আরে ওই সময়ে ধরার অবস্থায় ছিলাম?আমার বন্ধুগুলো তো মনে করেছে সে আমার গার্লফ্রেন্ড ছিল। ঝগড়া লেগেছে তাই চড় বসিয়ে দিয়েছে।তেমন কিছু একটা হবে ওরাও তো চিন্তাই করেনি।উফ্,গালটা আমার এখনো ঝম ঝম করছে"

অন্ত আবার গাল বোলাতে লাগলো।

"তো আমার কাছে কেন এসেছিস?মেয়েকে কিডন্যাপ করার জন্য?"

চকিত হলো অন্ত,

"আল্লাহ কি সব বলছো?ওটা কেন করতে যাব?"

"তো কি করব?"

কাঁদো কাঁদো গলায় শুধালো অন্ত,

"দুঃখের কথা আমি আর কাকে শেয়ার করব?তোমার কাছে এসেছি,আর তুমি এই কথা বলছো?"

মুখ দিয়ে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল সাহিত্য,

"হঠাৎ এক মেয়ে এসে চড় মেরেছে,তুই তাকে চিনিসও না,তবুও তুলে আনতে চাচ্ছি সেটাও করতে দিবি না।তো আমি আর কি বলল?"

কিছু না বলে মুখ ভোতা করে বসে থাকল অন্ত।

সেপাশে দেখে সাহিত্য ভারী নিঃশ্বাস ফেলল।

অন্ত যে একটা খুবই সহজ-সরল ছেলে সেটা ভালো করেই জানা আছে সাহিত্যের।সেই জায়গায় যদি সাহিত্য থাকতো তাহলে মেয়েকে ওই রিকশার নিচেই ঢুকিয়ে দিত। কিন্তু অন্ত যে পুরো উল্টো।সব সময় সাদামাটা অবস্থায় থাকে। কারো সাথে কখনো গলা উচিয়ে কথাটা পর্যন্ত বলে না। আর সেই ছেলে আজ বিনা কারণে গালে চড় খেয়ে মাথায় যেন বাজ পড়েছে।

সাহিত্য আবার শুধালো,

"তুই ভালো করে মনে করতো।কিছু তো অবশ্যই হয়েছে।নাহলে একটা মেয়ে তো আর এমনিই হঠাৎ এসে চড় মারবে না,তাই না?"

"না ভাইয়া।আমার জানা মতে অমন কিছুই হয়নি।আমি কেন অযথা একটা মেয়ের সাথে লাগতে যাব?যেখানে আমি মেয়েদের সাথে তেমন কথাই বলি না"

ক্ষণিক সময় চিন্তা করল সাহিত্য,

"তোর যে বন্ধুগুলো সাথে ছিল ওদের দ্বারায় খোঁজ লাগা না হয়"

সময় নিয়ে শুধালো অন্ত,

"আরে ভাইয়া বাদ দাও তো।এমনি মন হালকা করার জন্য এসে বললাম তোমাকে"

টেবিলে সজোর একটা থাবা মা'রল সাহিত্য,

"আব্বে ওই মেয়ে রে জেলে ঢুকানো উচিত!এতো দয়ালু কেন হচ্ছিস তুই?"

শান্ত স্বরে শুধালো অন্ত,

"কি জন্য একটা মেয়েকে অযথা জেলে ঢুকাতে যাব?অতো ঝামেলা করার দরকার আছে?"

মাথায় হাত চেপে বসল সাহিত্য।এই ছেলের সাথে কখনোই পেড়ে ওঠা সম্ভব নয়।সাহিত্য ল্যান্ড ফোনে কল দিয়ে একটা হট কফি দিয়ে যেতে বলল।ক্ষণিক বাদে কফি এলে সেটি অন্তর দিকে এগিয়ে দিয়ে শুধালো,

"কফিটা খেয়ে অফিসে একটু ঘুরাঘুরি করে বাসা চলে যা।তুই বাইরে ঘুরিস কেমন করে আমি তো সেটাই বুঝছি না"

কিছু না বলে চুপ করে কফি খেতে লাগলো অন্ত।এতো সহজ-সরল ছেলে যে কোন ভাগ্যবতীর কপালে জুটবে আল্লাহই জানেন।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

আজ পহেলা বৈশাখের ছুটি থাকা সত্ত্বেও গত রাতে ভিকিসহ অনলাইনে এক দীর্ঘ সময়ের মিটিং করেছে সাহিত্য।যার কারণেই একটু দেরি করে উঠেছে আজ।

১১ টার দিকে নাস্তা করার জন্য টেবিলে গিয়ে বসলে এক সুন্দর মাটির প্লেটে সাজানো পান্থা ভাত এগিয়ে দেন আমেনা শেখ।সেটা দেখে নাক শিটকালো সাহিত্য,

"কি সকাল সকাল ভাত খেতে দিচ্ছো,আম্মু।একটু লাইট কিছু খেতে দাও না"

কাটকাট গলায় বললেন আমেনা শেখ,

"আজ পহেলা বৈশাখ উপলক্ষে সবাই সকালে এটাই খেয়েছে।আর কিছুক্ষণ পরে যেহেতু দুপুরের ভাত খেতেই হবে তো একবারে এটাই খা"

"এখন তো দেখছি নিজের বাড়িতেও শান্তি নেই।আমি কি এখনো ছোট বাচ্চা আছি নাকি যে সাত সকালে উঠবো?কাল রাতে অফিসের মিটিং এর জন্য দেরি করে শুয়েছিলাম"

"আজ কোনো নাস্তা বানা হয়নি।তো এটাই খা"

কথা শেষে মুখে হাসি নিয়ে রান্নাঘরের দিকে এগুলেন আমেনা শেখ।

মুখ অন্ধকার করে গলা উঁচিয়ে বলল সাহিত্য,

"কি একটু ছেলেকে আলগা পিরিত দেখাবে,তা না করে এতো হেলাফেলা?"

লতিফা শেখ এসে ভাতিজার মাথায় হাত বুলাতে নিয়ে বললেন,

"না রে বাবা।ওই ঘাস-পুস খেয়ে একদম শুকিয়ে গিয়েছিস তো, তাই ভাবি আর আমি বুদ্ধি করেছি আগামী এক মাসে তোকে খাইয়ে খাইয়ে তাজা করে তুলবো"

সাহিত্যের মারবেল আকার চোখ দেখে সামিয়া পানি খাওয়া বাদ দিয়ে হাসিতে ফেটে পড়ল,

"ছোট চাচী,ওটাকে তাজা করা বলে না,অতি আদরে লাড্ডু বানা বলে"

সাহিত্য উঠে দাড়ালো,

"এতো পরিশ্রম করে তৈরি করা জিম ফিট বডিকে তোমরা লাড্ডু বানার প্লানে আছো?খাবই না।জিমে গেলাম আমি"

না খেয়েই হনহনিয়ে নিজের রুমে চলে গেল সাহিত্য।

ভাইয়ের কান্ড দেখে সামিয়া এখনো মুখ টিপে হাসছে।

আমেনা শেখ রান্নাঘর থেকে বের হয়ে মাথা ঝাকালেন,

"এই ছেলেটা আবার সেই আগের মতো শুরু করেছে।আগে শুধু পেইন্টিং ছিল আর এখন সেটার সাথে প্রতি শনিবারে জিমও শুরু হয়েছে"

ক্ষণিক বিরতির পর মুখে মৃদু হাসি নিয়ে আবার শুধালেন আমেনা শেখ,

"তাও তো ভালোই হয়েছে।এসে যে চুপচাপ ছিল সেটা এখন অনেকটাই কমেছে"

আমেনা শেখের কথায় তার দিকে ঘুরলেন লতিফা শেখ। কোন ব্যক্তির সাথে কথা বলে সাহিত্যের এই পরিবর্তন এসেছে সেটা যেন লতিফা শেখই শুধু জানেন।ভাবতেই মুখে হালকা হাসি ফুটলো লতিফা শেখের।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

জিমে যাওয়ার জন্য বের হতে নিয়ে কল্পনার রুমের দিকে নজর গেল সাহিত্যের।সকাল থেকে উঠে কল্পনাকে একবারো দেখেনি সাহিত্য।চিঠিটাও আজ দরজার নিচ দিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে।পরে শান্তি মতো বসে পড়বে সেটা ভেবেই এখনো খোলেনি সেটা।

সিড়িতে অনুকে দেখে শুধালো সাহিত্য,

"কল্পনা কই রে?"

"আপু?আপুর তো আজ ভার্সিটিতে প্রোগ্রাম আছে।সেখানে পার্টিসিপেট করেছে দেখে সকাল সকাল ই বের হয়ে গিয়েছে"

কথাটা শুনে সাহিত্যের মুখের ভঙ্গিমা সম্পুর্ণ বদলে গেল।দাঁত চিবিয়ে অনুকে বলল,

"কখন আসবে?"

সাহিত্যের পরিবর্তন অনুর নজরে পড়ল না,

"ঠিক বলতে পারছি না।কিন্তু মনে হয় বিকেলের দিকে"

"আচ্ছা ঠিক আছে"

অনু চলে যেতেই সামনের চুলগুলো ব্যাক ব্রাশ করে আকড়ে ধরল সাহিত্য।অতঃপর বিড়বিড় করে আওড়াতে লাগলো,

"কেন আমার কোনো কথা শুনিস না জানপাখিটা?তোর সৌন্দর্য যে অনেকেই স্বাভাবিকভাবে নেয় না"

অশান্ত মেজাজেই জিমের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে গেল সাহিত্য।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

বিকেলের হালকা রোদটাও যেন এই বৈশাখ মাসে ভ্যাপসা গরম তুলেছে।কিন্তু তাতেও যেন মুখের কোমল স্নিগ্ধ আভাটা কমেনি কল্পনার।গাল দুটো হালকা লাল হওয়াতে যেন সেই স্নিগ্ধতা আরো বেড়েছে বৈকি।

বাসন্তী রঙ্গা শাড়িটা তে খাটি বাঙালির নারীর সৌন্দর্য উপচে পরছে কল্পনার।তার উপর বাধন ছাড়া সিল্কি লম্বা চুলগুলোর সাথে টানা দুল পড়েছে।হেনা শেখ যখন বাঙালি স্টাইলে শাড়ি পড়ানো শেষ করেন তখন মেয়ের কানের পেছনে কাজল ফোটা দিয়ে দেন।মেয়েটা তার এতো বড় হওয়ার পরেও কোনোভাবেই শাড়ি পড়তে পারে না।হেনা শেখের ধারণা মতে সেদিক থেকে ভালোই হয়েছে।শাড়িতে এতো সুন্দর লাগায় প্রায়সই না পড়াই ভালো।

কল্পনাকে বাড়িতে ঢুকতে দেখে ড্রয়িং রুমে বাকি দুই নাতনিদের সাথে বসে থাকা মহুয়া বেগম শুধালেন,

"মাশা-আল্লাহ!আমার বাচ্চাটাকে দেখেই বৈশাখ মাস ফুটে উঠেছে"

হাসলো কল্পনা,

"ভাগ্যিস মা আজ শাড়ি পড়িয়ে দিয়েছিল।নাহলে বৈশাখের ঝড়ের মতোই আমার শাড়ির তান্ডবে সব গোল্লায় যেত"

শাড়ি উচু করে ধরে হুটিপুটি পায়ে সিড়ি দিয়ে উঠে নিজের রুমের দিকেই যাচ্ছিল কল্পনা।এই সময়ের মধ্যে চোখের পলকে কি ঘটে গেল সম্পুর্ণ যেন মাথার উপর দিয়ে গেল তার।শুধু একটা হেচকা টান অনুভব করেছিল ক্ষণিক আগে।আর এখন দেয়ালের সাথে ঠেকানো অবস্থায় সাহিত্যের সামনে নিজেকে উপলব্ধি করছে।

কল্পনার পাশে সরু চোখে দেখে কটমট করছে সাহিত্য।সেটা দেখে শুষ্ক ঢোক গিলল কল্পনা।পিটপিট করে সাহিত্যের দিকে দেখতে লাগলো।অতঃপর মিনমিনিয়ে শুধালো,

"কি হয়েছে সাহিত্য ভাই?"

দুটো মুখমণ্ডলের মাঝের দূরত্ব আরো সুক্ষ্ম করল সাহিত্য।যার দরুন যেন শ্বাস-প্রশ্বাস ভারী হলো দুই নর-নারীরই।সে অনিয়ন্ত্রিত শ্বাস-প্রশ্বাস সংযত করে ভারী গম্ভীর কন্ঠে শুধালো সাহিত্য,

"আমি না নিষেধ করেছিলাম প্রোগ্রামে যেতে।শুনিসনি কেন?"

হঠাৎ সাহিত্যের থেকে দূরত্ব সুক্ষ্ম হওয়ায় হাসফাস করছে কল্পনা।এমনিতেই সকাল থেকে বাইরে থাকার দরুণ গরমে অতিষ্ঠ লাগছে।কিন্তু এখন কেন জানি সাহিত্যের রুমের এসি চলার পরেও যেন স্বস্তি পাচ্ছে না সে।নজর সেই কতক্ষণ আগেই নিচে নামিয়ে ফেলেছে।দ্বিতীয়বারের মতো সাহিত্যের এতো কাছে আসায় থরথর করে কাপছে মেয়েটা।আর সেই সাথে এই মাতাল করা ভ্যানিলা মিক্সট ল্যাভেন্ডার পারফিউম যেন কল্পনার হৃদ স্পন্দন ক্ষণে ক্ষণে বাড়িয়েই দিচ্ছে।

"লুক অ্যাট মি কল্পনা।আমি কিছু জিজ্ঞেস করছি"

নিজেকে সংযত করতেই দুই হাত দিয়ে শাড়িটা খামচে ধরল কল্পনা।মাথা সেভাবে নিচু রেখেই ধীমি আওয়াজে বলল,

"হঠাৎ অমন দুদিন আগে বাদ দেওয়া যেত না, ওই জন্য ......."

"আমাকে অমন অহেতুক অযুহাত দিস না।আমার কথা না শুনলে এমন চড় খাবি যে আত্মা বেড়িয়ে যাবে"

ভ্রু কুচকে এবার মাথা তুলে সাহিত্যকে সরু চোখে দেখতে লাগলো কল্পনা।হালকা তেতে উঠেই বলল,

"নাহয় শুনিনি একটা কথা।তাই বলে চড় মে'রে আত্মা বের করে দেওয়ার কথা কেন বলছেন?"

ঠোঁট বাকিয়ে দুষ্টু হাসি দিল সাহিত্য,

"আমাকে চড় মা'রার শোধবোধটা হয়ে যাবে"

সাহিত্যের হাতে সি'গারেট দেখার দিনের কথা স্মরণে আসতেই ফুস করে ক্ষণিকের সাহসটা বেড়িয়ে গেল কল্পনার,

"ক-কি?আল্লাহ,সেদিনই না সরি বলেছিলাম সেটার জন্য"

"ঠিক আছে।আমিও চড় মেরে সরি বলে দিব"

"এই না সাহিত্য ভাই,প্লিইইইজ।আপনার ওই হাতের চড় খেলে আসলেই আমার আত্মা বেড়িয়ে যাবে"

"এখন এতো ভয় পাচ্ছিস তো কথা শুনিসনি কেন?"

চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করল কল্পনা,

"ওই তখন আপনার উপর একটু রাগ ছিল তো,তাই...এমনি...একটু"

গলা কাপছে কল্পনার।

মুহুর্তের মধ্যেই সাহিত্যের চোখ জোড়ায় এখন নেশালো আভা বিরাজ করছে।কল্পনার লাল হয়ে ওঠা গালের থেকে সুতার পরিমাণ দূরত্ব রেখে স্লাইড করার মতো এক বৃদ্ধা আঙ্গুল নাড়াতে লাগলো সাহিত্য।হয়তো প্রেয়সীর লাল রাঙ্গা কপোলের উষ্ণতা অনুভব করার হালকা চেষ্টা।

কিন্তু সেই হালকা অনুভূতি যে কল্পনাও অনুভব করছে।যার হিতে বিপরীত ভেবে চোখ বন্ধ রেখেই চেচিয়ে উঠলো কল্পনা,

"সাহিত্য ভাই প্লিইইইইজ চড় মারিয়েন নাআআ!"

অমনি কল্পনার মুখ চেপে ধরল সাহিত্য,

"এই পাগল কি করছিস?সবাইকে জড়ো করার প্লান বানাচ্ছিস কেন?"

প্রেয়সীকে ছুঁবে না,ছুঁবে না করে নরম গাল দুটোতে হাত পড়েই গেল সাহিত্যের।প্রথমবার মনে হয় কোনো মেয়ের গালে হাত দিয়েছে এই পুরুষ।অনেকক্ষণ রোদে থাকার কারণেই হয়তো নরম লাল গালগুলো থেকে তাপ বের হচ্ছে।

হঠাৎ সাহিত্যের এভাবে মুখ চেপে ধরায় কল্পনার চোখ জোড়া তো বের হয়ে আসার উপক্রম বর্তমানে।

সাহিত্য ধীর স্থিরভাবেই হাতটা সড়িয়ে নিল।চোখ জোড়া গোল গোল করে এক আঙ্গুল দিয়ে কল্পনার গালে টোকা দিতে লাগলো,

"তোর গাল এতো সফট কেন?"

সাহিত্য গালে টোকা দেওয়ার দরুন সেপাশের চোখ খিচে বন্ধ করে রেখেছে কল্পনা।সাহিত্যের কথায় কাঁদো কাঁদো গলায় বলল,

"একবার চিন্তা করেন,এই নরম গালে আপনার গরম হাতের একটা চড় পড়লে কি অবস্থাটা হবে?"

কল্পনার কথায় মাথা নিচু করে জোরে হেসে উঠলো সাহিত্য।স্তব্ধ হয়ে গেল কল্পনা।দেশে ফেরার পর এই প্রথম সাহিত্যকে মন খুলে হাসতে দেখছে সে।আর সেটার কারণ কল্পনা নিজেই।এটা ভেবেই আনমনে ঠোঁট উপরের দিকে হালকা বেঁকে গেল কল্পনার।কি মনমুগ্ধকর সেই হাসি!যেন বৈশাখের ঝড়ের মাঝে হৃদয় শীতল করা গানের সুর ভেসে বেড়াচ্ছে।

হাসি কমিয়ে দুটো বড় শ্বাস নিয়ে মাথা তুলল সাহিত্য।সাথে সাথে নজর নিচে নামালো কল্পনা।সাহিত্য চেহারা স্বাভাবিক রেখেই শুধালো,

"তোর ব্যাপারে আমি কোনো ডিসিশন নিলে সেটা অবশ্যই তোর ভালোর জন্যই হবে।তো,এরপর থেকে আমার কথা আর ফু মেরে উড়ে দিয়ে রিস্ক নিস না।নাহলে আমাকে রিস্ক নিতে হবে।বুঝেছিস?"

সাহিত্যের দিকে না দেখেই জোরে জোরে মাথা উপর-নিচ ঝাকালো কল্পনা।

নিজের ধৈর্যকে বাহবা দিতে লাগল সাহিত্য।লজ্জা রাঙ্গা প্রেয়সী এতো কাছে থাকার পরেও দম বন্ধ করে নিজেকে আটকে রেখেছে সে।বাঙালি স্টাইলে শাড়ি পড়ায় ঠিক সাহিত্যের নব বধুর মতোই লাগছে মেয়েটাকে।সাহিত্যের মন তো চাচ্ছে বাধন ছাড়া রেশমি কালো চুলগুলোতেই ব্যস্ত করে রাখুক নিজেকে।মন তো চাচ্ছে কপালের সাথে কপাল ঠেকিয়ে প্রেয়সীকে নিজের সাথে মিশিয়ে নিক এই মুহুর্তের জন্য। লজ্জা রাঙা লাল গাল দুটো আরো লাল করতেই 'ভালোবাসি তোকে জানপাখি' কথাটা বলে উঠুক সাহিত্য।কিন্তু এখনি যে সঠিক সময় নয়।সাহিত্যকে যে একটু ধৈর্য ধরতে হবে তার বাস্তব জীবনের কল্পনাকে পাওয়ার জন্য।কিন্তু এই সুক্ষ্ম দূরত্ব যেন সেই ধৈর্য ধারণ করতে পুরো দমেই নারাজ।প্রেয়সী ও নিজের মাঝের দেয়াল অক্ষুণ্ণ রাখতেই কল্পনার থেকে দূরে সড়ে গিয়ে সটান দাঁড়িয়ে পড়ে অন্য দিকে ঘুরে দাড়ালো সাহিত্য।

এবার যেন কল্পনা সাহিত্যের চোখের আড়ালে বড় বড় শ্বাস নিতে পারছে।কিন্তু বুকের হাতুড়ি পেটার শব্দে তো কান তালি লেগে যাচ্ছে তার।মিনমিনিয়ে বলল কল্পনা,

"আমি যাই এখন?"

আবার কল্পনার দিকে ঘুরল সাহিত্য।মিটমিট করে হাসছে সে,

"বাই দা ওয়ে।কংগ্রাচুলেশন"

ভ্রু কুচকে মাথা তুলল কল্পনা,

"কীসের জন্য?"

"এইচ.এস.সি. তে G.P.A.-5 পাওয়ার জন্য"

কল্পনার মনে পড়ল এক চিঠিতে সে তার রেজাল্টের কথা সাহিত্যকে বলেছিল।মুখে বড় হাসি নিয়ে বলল,

"থ্যাংক ইউ"

"আর হ্যাঁ।ইস্টিকারের জন্য পোস্ট অফিসে রিকোয়েস্ট করতে হতো না।এমনি নরমাল ইস্টিকারই চিঠির সাথে দেওয়া যেত"

সাহিত্যের কথায় মাথা চুলকে দাঁত বের করে হাসলো কল্পনা,

"সেটা মাথায়ই আসেনি.....এখন যাই আমি?"

মৃদু হাসলো সাহিত্য,

"হ্যাঁ, যা"

সাহিত্যের কথা শেষ হতেই রুমের দরজা খুলে ভো দৌড় লাগালো কল্পনা।কল্পনার কান্ড দেখে আবার হালকা শব্দ করে হাসলো সাহিত্য।অতঃপর পকেট থেকে কিছুক্ষণ আগে পড়া চিঠিটা বের করে আবার পড়তে নিয়েই বিছানায় শুয়ে পড়ল

📜.......................................................................

সাহিত্য ভাই!!! আজ আমার এইচ.এস.সি. এর রেজাল্ট দিয়েছে! আমি GPA-5 পেয়েছি।দেখেছেন, আপনার কল্পনা আপনার মতোই ব্রিলিয়ান্ট হয়েছে।উফ্, ইমোজি ছাড়া কেন জানি ভালোই লাগছে না।পোস্ট অফিসে রিকোয়েস্ট করতে হবে ইস্টিকার সাথে দেওয়ার জন্য।

উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।

আপনার আদরের বোন,

অমৃতা শেখ কল্পনা।

.......................................................................📜

পঞ্চম বারের মতো চিঠিটা পড়ে বিড়বিড় করে বলে উঠল সাহিত্য,

"অবশেষে, ফরমালিটিস এর 'শ্রদ্ধেয় সাহিত্য ভাই' ছাড়ল আমার পাখিটা"

#চলবে

পরপর দুটো পর্বই চিঠি দিয়ে শেষ করলাম😶‍🌫️

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২১তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন