ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

২৩তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_২৩

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

ভুল বোঝাবুঝি যেন বরাবরই মানব জাতির ধর্ম।সেটার কারণে এতো যুগ ধরে নানা যুদ্ধ হওয়ার পরেও যেন কোনো উন্নতি আসেনি এই জাতির মাঝে।শুধু সময় চলে যাওয়ার সাথে সাথে এর সংখ্যাটাই বেড়ে গিয়েছে।আর ভেঙে গিয়েছে কত গভীর বন্ধন।যে বন্ধন ভাঙার ইচ্ছা হয়তো কোনো পক্ষেরই ছিল না।

বাড়ির বড় দুই গিন্নিদের মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল কল্পনার কথা শুনে।এরকম একটা বিষয়কে যে তারা সম্পুর্ণ উলটো ধরে নিয়েছিলেন সেটা ভেবেই যেন গলায় ফাঁ'স আটকে আসছে তাদের।

হেনা শেখ ধরা গলায় বলে উঠলেন,

"এতো কিছু হয়ে গিয়েছিল তো সাহিত্য কিছু বলেনি কেন?সেটা বললেই তো আর এসব কিছুই হতো না"

আমেনা শেখের ভারী গলা শুনা গেল,

"আমরা ওকে বলার সুযোগটাই বা কখন দিয়েছিলাম।বাড়িতে ঢুকার পরপরই তো দুই ভাই তার উপর ঝাপিয়ে পড়েছিল।আমিও তো না শুনে সাহিত্যের আব্বু আর ফাহাদের মতো কথা শুনাচ্ছিলাম ছেলেটাকে।ছেলেটা এতো করে বলছিল তার কথা শুনতে,কিন্তু আমরা তো সেদিকে কান অব্দি দেইনি"

হুট করে কিছু পড়ার শব্দে দুই গিন্নিই পেছনে ঘুরলেন।নজরে পড়ল কল্পনার ভারী অস্থির আচরণ।হাত-পা কাপার কারণে বড় প্লাস্টিকের ফুলদানিটা ধরতে গিয়েই পড়ে গিয়েছে সেটা।কল্পনাকে দেখে দুই গিন্নিই চকিত হলেন।এই ভয়েই তো ছিলেন তারা।সাহিত্যের জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা যে কল্পনার কারণে হয়েছে এটা কল্পনা কখনোই সহ্য করতে পারবে না।

আমেনা শেখ সান্ত্বনা দিতে লাগলেন কল্পনাকে,

"কল্পনা শান্ত হ।তোর কোনো দো'ষ ছিল না মা।সেটা সম্পুর্ণ আমাদের ভুল বোঝাবুঝি ছিল।এটা শুধু পরিস্থিতির শিকার হয়েছি আমরা।এখানে কারো কোনো দো'ষ নেই"

"সাহিত্য ভাইয়ের আর্টিস্ট হওয়ার স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে আমার কারণে,আর তোমরা বলছো এখানে কারো কোনো দো'ষ নেই?"

কথাটা হালকা চেচিয়ে বললেও গলা কাপছে কল্পনার।

ভাবতেই কলিজাটা কেমন দুমড়ে-মুচড়ে যাচ্ছে তার।তার দিকে দেখতে গিয়ে সাহিত্য চাপা পড়ে গিয়েছিল।

অঝোরে চোখ থেকে জল গড়িয়ে পড়ছে কল্পনার। গলাটা যেন আরো ভেঙে এলো তার।কাঁদো গলায় বলতে লাগল,

"সাহিত্য ভাই সেদিন ঠিকই বলেছেন।ওনার জীবনে আমি এক অভিশাপ ছাড়া আর কিছুই না"

আমেনা শেখ বুঝলেন না কল্পনার কথা।কিন্তু এটা ঠিকই বুঝলেন যে সাহিত্য কল্পনাকে রাগের মাথায় কিছু বলেছে।কল্পনার মাথায় হাত বুলাতে নিয়ে বললেন তিনি,

"না রে মা, ওমন কিছুই না।সাহিত্য শুধু একটু রাগের মাথায় আছে দেখে উল্টা-পাল্টা কথা বলে দিয়েছে।ওর ওগুলো কথায় কান দিস না"

সে কথা কল্পনা বুঝল কি বুঝল না কে জানে?অতঃপর চোখের সুক্ষ্ম পানি কণা মুছে ধীমি আওয়াজে শুধাল,

"আচ্ছা ঠিক আছে।আমার একটু খারাপ লাগছে,আমি রুমে গেলাম।কিছুক্ষণ একটু একা থাকতে দিও,প্লিজ"

কিছুক্ষণ আগ অব্দিও যেন হাসি-খুশি ছিল মেয়েটা।কিন্তু হঠাৎই কেমন চুপ মেরে গেল।আর কিছু না বলেই ধীর পায়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল কল্পনা।দুই গিন্নি কল্পনার যাওয়ার পানেই দেখে আছেন।তাদের কাছে যেন আর কোনো ভাষা নেই কল্পনাকে সান্ত্বনা দেওয়ার।নিজেদের মনের পরিস্থিতিও তো সামলাতে পারছেন না তারা।সুক্ষ্ম ভুল বোঝাবুঝি যেন সবার মনে গভীর অন্ধকারের সৃষ্টি করেছে।

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

হঠাৎ রুমে নক না করে ঢুকায় অনলাইন মিটিং এ কথা চলতি রেখেই আড় চোখে দরজার দিকে দেখলো সাহিত্য।কিন্তু সেপাশে দেখার সাথে সাথেই কথা থেমে গেল তার।কল্পনা দু হাত পেছনে বেধে বন্ধ দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে মাথা নিচু করে আছে।চোখে-মুখে যেন এক আকাশ পরিমাণ কালো মেঘ জমে আছে তার।

"মিস্টার অহি,ইজ দেয়ার এনি প্রবলেম?"

ল্যাপটপের অপর পাশের ব্যক্তির কথা কানে আসতেই আবার ল্যাপটপের দিকে ঘুরল সাহিত্য,

"হা?..নো নো.......এ্যাকচুয়ালি আই হ্যাভ সাম আর্জেন্ট ওয়ার্ক টু ডু।উই উইল কন্টিনিউ দিস লেটার"

ল্যাপটপ বন্ধ করে উঠে দাড়ালো সাহিত্য।কান থেকে ইয়ারফোন সড়াতে নিয়েই কোমল কন্ঠে শুধালো,

"কল্পনা। কিছু হয়েছে?"

কল্পনা আগের ন্যায় ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।প্রেয়সীর এমন চুপ থাকা যেন জ্বালা করছে সাহিত্যের বুকে।ধীর পায়ে এগিয়ে এসে কল্পনার সামনে দাঁড়ালো সে,

"কি হয়েছে জানপাখি?কেউ কিছু বলেছে?"

মৃদু কান্নার তোপে হালকা কেপে উঠল কল্পনা।সেটা দেখে যেন ভড়কেই গেল সাহিত্য।দুই হাত বাড়িয়ে কল্পনার আদলখানা ধরতে নিয়েই ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে শুধালো সাহিত্য,

"এই আমার দিকে দেখ।কি হয়ে....."

সাহিত্যের কথা শেষ হওয়ার আগেই তার হাত দুটো ছিটকে সড়িয়ে দিল কল্পনা।আরেক দফা যেন চকিত হলো সাহিত্য।তারপরেও শান্ত থেকে সময় নিয়ে মাথা ঝুকিয়ে কল্পনার মুখের কাছে নিয়ে গেল নিজের মুখখানা।কোমল স্বরে বলতে লাগল,

"কোনো কারণে রাগ করেছিস আমার উপর?আচ্ছা সরি।এখন কারণটা তো বল"

কল্পনা মাথা না তুলেই ভাঙা গলায় বলল,

"আমি কি অনেক দুর্বল?আমি কি নিজের খেয়াল রাখতে পারিনা?আমার কি সব সময় কারো প্রটেকশনের দরকার?"

ডানে-বামে মাথা ঝাকিয়ে আবার মৃদু স্বরে শুধালো সাহিত্য,

"একদম না।আমার কল্পনা দুর্বল এটা চিন্তা করাও অনেক দূরের কথা হবে"

আড়াল করে রাখা প্রেয়সীর চোখ থেকে এক মুক্তোর দানা গড়িয়ে পড়তে দেখল সাহিত্য।অমনি যেন আবার রাগটা মাথায় উঠে গেল তার।প্রেয়সীর চোখের পানিগুলোকে পুড়িয়ে দিতে ইচ্ছা করছে তার।কোন সাহসে তারা সাহিত্যের প্রেয়সীর গালে দুঃখের চিহ্ন একেঁ দিচ্ছে!কার আদেশে সেটা করছে তারা!পুড়িয়ে রাখ করে দেবে সাহিত্য সেই ব্যক্তিকে!কিন্তু কল্পনার পরবর্তী কথা শুনে চকিত হলো সাহিত্য।

এবার মাথা তুলে ঝাজালো কন্ঠে বলে

উঠলো কল্পনা,

"তো ওই দিন আগ বাড়িয়ে কে যেতে বলেছিল আপনাকে?দেখছিল তো দেখতে দিতেন।ওদের মারপিট করে কি বুঝাতে চেয়েছিলেন?"

গম্ভীর হয়ে এলো সাহিত্যের মুখোশ্রী।মানে তার প্রেয়সী তার কারণেই কাঁদছে।এবার কল্পনাকে অবকাশ না দিয়েই দুই হাত দিয়ে প্রেয়সীর লাল হয়ে থাকা আদলখানা জড়িয়ে ধরল সাহিত্য,

"তুই বলছিস কেউ তোকে খারাপ চোখে দেখছে আর আমি যেন চুপ থাকি?"

আবার ঝাজিয়ে উঠল কল্পনা,

"হ্যাঁ বলছি চুপ থাকতে।কারণ নিজ হাতে আপনার সব স্বপ্ন ভেঙে দেওয়ার ভার সহ্য করার ক্ষমতা আমার নেই"

আবার চকিত হলো সাহিত্য।প্রেয়সীর এমন রুপ দেখে এই রাগচটা ছেলেটারও যেন বার বার হাবভাব কোমল হয়ে আসছে।গম্ভীর মুখশ্রী সড়িয়ে ভ্রু নেতিয়ে কোমল কন্ঠে শুধালো সাহিত্য,

"পা'গল একটা।কে বলেছে তোকে, যে তোর দো'ষ ছিল?"

ফুপিয়ে উঠল কল্পনা,

"সেদিনের ব্যাপারে কেউ তো আমাকে কিছু বলেইনি।আর কাউকে বলারই কেন লাগবে?আমি কি বুঝি না?আমার কারণেই তো বাবা আপনার গায়ে হাত তুলেছিল,তাই না?তো দো'ষটা তো আমারই হলো।দীর্ঘ ১১বছর ধরে বাড়ির এই পরিস্থিতির একমাত্র কারণ আমি..."

"আব্বু আর মেঝো চাচুর দোষ নিজের ঘাড়ে নিচ্ছিস কেন?ওরা দোষ করে দিব্বি ঘুরছে আর তুই যত অহেতুক কথা বলে বেড়াচ্ছিস"

কান্নার তোপে আবার কেপে উঠল কল্পনা,

"অহেতুক কথা কেন হবে?সত্যটাই তো বলছি।আমার কারণে আপনার জীবন পুরো উলটে গিয়েছে।এটা দেখার থেকে ম'রণটাই কম কষ্টদায়ক হতো"

এবার গর্জে উঠল সাহিত্য,

"একদম চুপ!আর একটা কথা যদি তোর মুখ দিয়ে বের হয়েছে তাহলে সবকিছু ফেলে রেখে এখনই আবার কানাডায় চলে যাব।তারপর মরিস কার জন্য মরবি"

সাহিত্যের গর্জনে শিটিয়ে গেল কল্পনা।সাহিত্য ধরে রাখার পরেও মুখখানা একটু নিচু করে ফেলল।কিন্তু এখনো হালকা কেপে কেপে উঠছে ছোট দেহখানা।প্রেয়সীকে ব্যথাতুর চোখে দেখে বুক চিড়ে ভারী শ্বাস বেড়িয়ে এলো সাহিত্যের।আবার গলার স্বর নামিয়ে মাথা নিচু করে বলতে লাগল,

"তুই আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর এক অধ্যায় কল্পনা।যেখানে কখনোই দুঃখের প্রকাশ ঘটবে না"

সময় নিয়ে আবার ফুপিয়ে উঠল কল্পনা।কান্নার তোপে গলা দিয়ে কথা বের না হতে চাইলেও বলতে লাগল সে,

"আম সরি সাহিত্য ভাই।আমি কখনোই আপনাকে পেইন্টিং থেকে দূরে সড়াতে চাইনি...."

এবার যেন সব বাধা পেছনে ফেলে কাঁদতে থাকা প্রেয়সীকে বুকে টেনে নিল সাহিত্য।নিজের অধর জোড়া কল্পনার মাথায় ঠেকিয়ে দিল।যাকে এই ১১বছর ধরে দোষ দিয়ে আসছিল সে ই তো এখন নিজেকে লুটিয়ে দিচ্ছে সাহিত্যের অন্ধকার হৃদয়ের মাঝে।গত ১১বছরের ভুল বোঝা যেন এখন সুই ফুঁড়ছে সাহিত্যের বুকে।

গোধুলির আলো এখন অনেকটাই হালকা হয়ে এসেছে।যার দরুণ জানালা দিয়ে আসা আলোতে উত্তপ্ত হয়ে থাকা বিছানাটাও যেন শিথিল হয়ে আসছে ধীরে ধীরে।যেমনটা হালকা আলো যুক্ত এই বদ্ধ রুমে উপস্থিত দুই নর-নারীর বহু বছর ধরে র'ক্ত ক্ষরণ হওয়া হৃদয়েরা শিথিল হয়ে আসছে।

#চলবে

কাল সকালেও একটা পর্ব দেব🫠

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ২৩তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন