#পর্ব_২৫
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সপ্তাহের ছ'টা দিন ভারী পরিশ্রমের পর যেন শরীর আপনাআপনিই শুক্রবারে জানান দেয় যে 'আর হবে না আমার দ্বারা।এবার একটু রেহাই পেতে চাই'। সেই সুযোগেই তো সব টেনশন উপেক্ষা করে নেতিয়ে পরে সারা শরীর।আর তার উপর যদি প্রকৃতির মৃদু শিরশিরানি হাওয়া আর পাখিদের সুক্ষ্ম কিচিরমিচির কানে গুণ গুণ করে তাহলে আর কি ই বা লাগবে!
এসবই যেন আজ কল্পনার কাছে উপস্থিত।তার উপর শেষ রাতের হালকা বৃষ্টির কারণে যেন প্রকৃতি আরো শীতল হয়ে আছে।যার দরুণই তো পুরো বিছানায় হাত-পা ছড়িয়ে ঘুমাচ্ছে কল্পনা।এতো গভীর ঘুম যেন এই মেয়েটার পক্ষেই দেওয়া সম্ভব।দিন দুনিয়া ভুলিয়ে ঘুম সবার আগে।কিন্তু এতেও যেন ব্যাঘাত ঘটল।
ঘুমের মধ্যেই কানে মৃদু আওয়াজ ভেসে এলো কল্পনার।হয়তো বা রুমের দরজায় কেউ নক করছে।ক্ষণিক বাদে হালকা করে কারো মেয়েলী কন্ঠও শোনা গেল।
"কল্পনা আপু।এই কল্পনা আপু।রুমে আছো কি?"
এক ইঞ্চিও নড়ল না কল্পনা।কোনো সাড়াও দিল না।
এবার আগের থেকেও মৃদু শোনা গেল সেই মেয়েলী কন্ঠ,
"অনু আপু তো বলল এটাই নাকি কল্পনা আপুর রুম"
সাথে এক ছেলের কন্ঠও শোনা গেল,
"আচ্ছা থাক।ও ব্যস্ত আছে মনে হয়।ফোনে একটু চার্জ আছে এখনো"
"দাঁড়াও আরেকবার ডাকি একটু।আসার পর থেকে এখন পর্যন্ত দেখাই করেনি।কতদিন থেকে দেখা হয়নি।একটু গল্প করব না?"
বলেই আবার নক করতে লাগল কাঙ্ক্ষিত মেয়ে কন্ঠের অধিকারী,
"এই আপু খুলো না।তুমি তো একদম ভুলেই গিয়েছো আমাদের"
এবার সজাগ হলো কল্পনা।বাইরের অভিমানী কন্ঠ কানে আসতেই ধড়ফড়িয়ে উঠে দাড়ালো।এতো সকালে এই কন্ঠ কেন শুনছে সে?নানুদের তো দুপুরের একটু আগে আসার কথা।ঘড়ির পাশে দেখতেই আকাশ ভেঙে পড়ল কল্পনার মাথায়।দু'টা বেজে ঘড়ির কাটা সেই কবেই দৌড় মেরেছে।কল্পনাকে কেউ ডাকেনি কেন?শুক্রবারের দিনে আজ কোন সয়তানটাই ধরেছিল?নামাজেরও দেরি হয়ে গেল।মা তো মনে হয় এতক্ষণে তাকে ত্যাজ্য ঘোষণা করে দিয়েছে।ভাগ্যিস ফালুদা ডিজার্টটা গত রাতেই বানিয়ে ফ্রিজে রেখেছিল।
আবার নক করার শব্দে দৌড়ে গিয়ে দরজা খুলল কল্পনা।ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলতে লাগল,
"সরি সোনা।অনেক টায়ার্ড ছিলাম দেখে টের পাইনি"
কল্পনা দরজা খোলার সাথে সাথেই তাকে জড়িয়ে ধরল নুপুর,
"আপু!কেমন আছো?কোনো সমস্যা নেই।আমি একটুও মন খারাপ করিনি"
গড়গড় করে কথা বলে কল্পনাকে জড়িয়ে ধরে হালকা দুলতে লাগল একাদশী নুপুর।
কল্পনা তার মাথায় হাত দিয়ে মৃদু হেসে উঠল।
নুপুর কল্পনাকে ছেড়ে দিয়ে বলল,
"আপাতত ওসব বাদ দাও।ভাইয়ার ফোনে একদম চার্জ নেই।দেখো তো তোমার ফোনের চার্জারের সাথে মেলে কিনা?"
কল্পনার ঘুম ঘুম চোখ জোড়া এতক্ষণে নুপুরের পেছনে গেল।কফি রঙা শার্ট আর ব্লাক ফরমাল প্যান্টে আবৃত লম্বা চওড়া এক ছেলে এতক্ষণ কোরিডোরের রেলিনং এ গা ঝাড়া ভাব নিয়ে হেলান দিয়ে থাকলেও বর্তমানে মুর্তির ন্যায় দাঁড়িয়ে কল্পনার দিকে হা হয়ে দেখে আছে।সেই সুঠাম দেহি ব্যক্তিকে হঠাৎ দেখে ভড়কালো কল্পনা,
"মাহির ভাইয়া?"
সামনের পুরুষের কানে সে ডাক গেল কি না কে জানে?সদ্য ঘুম থেকে উঠা এই অষ্টাদশীর লাবণ্যময়ী মুখ দেখে তো আসলেই কারো সাধ্য নেই নড়চড় করবার।লম্বা বেনিখানা একপাশ দিয়ে নেতিয়ে পড়ে আছে।ছোট ছোট চুলগুলো এলোমেলো হয়ে বের হয়ে আসায় আরো দৃষ্টি গোচর হয়ে আছে অষ্টাদশীর ফর্সা আদলখানা।
সামনে এক পুরুষের উপস্থিতি ঠাহর করার সাথে সাথে রুমে ঢুকে ওড়না পেচিয়ে নিল কল্পনা।কে আবার জানতো যে নুপুরের পেছনে মাহির দাঁড়িয়ে আছে?নাহলে পরিপাটি হয়েই রুম থেকে বের হতো সে।তার উপর কেবলই ঘুম থেকে উঠে একদম দৌড় লাগিয়েছে।ওড়না জড়িয়ে মাহিরকে উদ্দেশ্য করে মৃদু হেসে শুধালো কল্পনা,
"সরি আপনাকে খেয়াল করিনি"
বাচ্চা সুলভ নুপুর আবার বলে উঠল,
"আপু চার্জার আছে?ভাইয়ার ফোন ফুল ডেড হওয়ার রাস্তায়"
ব্যতিব্যস্ত হয়ে শুধালো কল্পনা,
"ও হ্যাঁ, হ্যাঁ।কি টাইপ আপনার?"
মাহির এখনো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে।কল্পনার কথায় মিনমিনিয়ে থেমে থেমে শুধালো,
"আমার...টাইপ?"
মুখে 'চ' বর্গিয় আওয়াজ করে বলল নুপুর,
"আরে তোমার টাইপ কে জিজ্ঞেস করেছে?তোমার ফোনের চার্জারের টাইপ বলো"
এবার যেন আশপাশের পরিস্থিতি মাথায় ঢুকলো মাহিরের।নজর ঘুরিয়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল,
"ও। আ....সি টাইপ"
"হ্যাঁ আছে আমার কাছে।দাড়ান দিচ্ছি"
বলে কল্পনা রুমে ঢুকতে গেলে তাকে থামিয়ে দিল মাহির,
"আমাকে দিতে হবে না।তোর রুমেই চার্জে দে"
মাথা ঝাকিয়ে মাহিরের হাত থেকে ফোনটা নিল কল্পনা,
"তোমরা নিচে যাও,আমি গোসল সেরে নামাজ পরে যাচ্ছি"
কল্পনা বলতেই মাহির সটান সিড়ির দিকে চলে গেল।মাহির যাওয়ার পরপরই নুপুরের মাথায় গাট্টা মারল কল্পনা,
"মাহির ভাইয়া আছে বলবি না আমাকে?"
নিজের মাথা বুলাতে লাগল নুপুর,
"আমি কি জানি যে তুমি এখনো ঘুম থেকেই উঠোনি?"
"আচ্ছা বাদ দে।তুই নিচে যা,আমি ঝটপট ফ্রেশ হয়ে নিচে নামছি"
মাথা থেকে হাত সড়িয়ে আবার মুখে হাসি ফুটিয়ে ঠিকাছে বলে নিচে চলে গেল নুপুর।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সিড়ি ভেঙে হুড়মুড়িয়ে নিচে নামলো কল্পনা।তাকে দেখেই মহুয়া বেগম শুধালেন,
"আরে আস্তে নাম।পরে যাবি তো"
কায়েস শিকদার ও ফাতেমা বেগম নাতনির কান্ড দেখে হেসে উঠলেন।কল্পনা এক প্রকার দৌড়ে এসেই নানি ফাতেমা বেগমকে জড়িয়ে ধরল।অতঃপর মহুয়া বেগমকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"পড়ব না, দাদী"
ফাতেমা বেগম নাতনির মুখে টুকরো চুমু বসিয়ে দিলেন,
"মাশাল্লাহ্,কয়েক বছরেই কত বড় হয়ে গিয়েছিস"
কায়েস শিকদার গলা খাকাড়ি দিলেন,
"এই বুড়ো ডার্লিং এর কথা ভুলে গিয়েছিস নাকি?"
হেসে উঠে কায়েস শিকদারের কাছে গিয়ে লম্বা একটা সালাম দিল কল্পনা,
"আমার একমাত্র ডার্লিংকে আবার ভুলা যায়?উল্টো তো তুমি ভুলে গিয়েছো আমাকে।সেই কি একটু এস.এস.সি. এর পর ঘুরে এসে পড়ায় মন দিয়েছি,ডার্লিংকে তো আর ঘুরতে যেতেও বলো না"
হেসে উঠলেন কায়েস শিকদার,
"তোকে আবার যেতে বলতে হবে?যখন ইচ্ছা দৌড় মারবি"
"তুই তো তবুও যেতে পারবি।কিন্তু সুবা যে না যেতে পেরে কেঁদে কেঁদে ফাটিয়ে দেয়"
বড় মামি ভাবনা শিকদারের দিকে নজর গেল কল্পনার।অতঃপর বড় বড় পা ফেলে দুই মামির মাঝে গিয়ে বসে শুধালো সে,
"সেটা তার সমস্যা।ওকে নাহয় সুইজারল্যান্ড আলা ধরিয়ে দিয়েছো তোমরা।আমি তো আর অত দূর যাব না"
সেই তিনজনের মাঝেই নুপুর ঘেষে যায়গা করে নিল,
"হ্যাঁ, হ্যাঁ।তোমাকে তো কাছেই থাকতে হবে।না হলে আমাদের মাথা কে চাবাবে?"
অমনি একটা গাট্টা খেল নুপুর কল্পনার হাতে।উপস্থিত গুরুজনেরা বাচ্চাদের বাচ্চামিতে হাসতে লাগলেন।
কল্পনা আশেপাশে চোখ ঘুরাতে লাগল,
"বড় মামা,ছোট মামা কই?"
এর ই মাঝে বাড়ির দুই গিন্নি হেনা শেখ ও লতিফা শেখ বিকেলের হালকা নাস্তা নিয়ে হাজির হলেন।কল্পনার কথায় শুধালেন লতিফা শেখ,
"কোথায় আবার?তোর বাবা-চাচুদের সাথে গপ্পো মারছে বাইরে"
হেনা শেখকে দেখে নাক শিখরে তুলল কল্পনা,
"মা।আমাকে ডাক দাওনি কেন?তুমি কি দুপুরের এক প্লেট ভাত বাঁচাতে চেয়েছিলে?"
শান্তভাবেই শুধালেন হেনা শেখ,
"কাল যত দেরি করে ঘুমিয়েছিলি,সকালে তোর রুমে ব'ম ফাটালেও উঠতি না।তাই অযথা আমার সময় নষ্ট না করে নিজের কাজে ব্যস্ত ছিলাম"
মুখ ভেংচি কাটল কল্পনা,
"ইসস্।নানু-নানির সামনে নিজেকে ভদ্র বাচ্চা আর আমাকে অভদ্র সাজানো হচ্ছে,তাই না?সেই কতক্ষণে এসেছে আর আমি পড়ে পড়ে ঘুমাচ্ছিলাম"
কোনো মতে মধ্যখানে বসে থাকা মেয়েকে উঠিয়ে দিয়ে কল্পনাকে জড়িয়ে ধরলেন নাদিয়া শিকদার,
"একদম অভদ্র না আমার ভাগিনিটা।আমরা আবার কোন মেহমান?নিজেদের বাড়িতেই তো এসেছি।নাহয় উঠলি একটু দেরি করে।তাতে কি এমন হয়েছে?"
লতিফা শেখের হাতে ফালুদার ট্রেটা ধড়িয়ে দিয়ে এগিয়ে এলেন আমেনা শেখ।মুখে মৃদু হাসি নিয়ে কল্পনার উদ্দেশ্যে শুধালেন,
"যেটার জন্য কাল এতো দেরি করে ঘুমিয়েছিলি সেটা না দিয়ে বসে গল্প করছিস?"
আমেনা শেখের কথায় ভড়কালো কল্পনা,
"আয়-হায়, আমার তো মনেই ছিল না।ফালুদাটা আমিই নিয়ে আসতাম।তুমি কেন অযথা কষ্ট করতে গেলে?"
আমেনা শেখ শুধালেন,
"এতোটুকুতে আবার কীসের কষ্ট?তুই নাহয় পরিবেশন করে দিস।সবাই এমনিতেও জানে এটা তুই বানিয়েছিস"
ফালুদার দিকে নজর রাখা নুপুরের জ্বলজ্বল করতে থাকা চোখগুলো দেখে মৃদু হাসলো কল্পনা।নুপুরকে উদ্দেশ্য করে বলল,
"তোর কথা মনে করেই বানিয়েছি।শেষবার যখন নানুবাড়িতে বানিয়েছিলাম সবার থেকে মনে হয় তুই ই বেশি খেয়েছিস"
জিভ দিয়ে উর্ধাষ্ঠো ভিজালো নুপুর।অতঃপর ফালুদার দিকে নজর রেখেই শুধালো,
"এবারো আমিই বেশি খাবো"
সে কথায় সবাই এক জোগে হেসে উঠলে সবাইকে এক নজর পরখ করল কল্পনা।না জানি কতদিন পর এমন সবাই মিলে হাসছে তারা।এ সুযোগ শেখ ভিলার ভেতরে খুবই সংকীর্ণ।
পরিবারের সবাই নেহাতই কত ভালো করে মিশে থাকে!অথচ কল্পনা যাদের দুজনকে এমন হাসাহাসি করা অবস্থায় দেখতে চায় সেই দুই শেখ আহমেদই মুখ ফিরিয়ে বসে থাকেন।
কিন্তু একদিক দিয়ে কল্পনা নিজের বাবা ফাহাদ শেখকে বাহবা দেয়।শেখ পরিবার এবং শিকদার পরিবার কিন্তু ভালোই মানিয়েছে।
এহনাফ শেখের তিন ছেলে তিন রকম চাকরি করলেও কায়েস শিকদারের দুই ছেলেই দুই ভিন্ন জায়গায় ব্যাংক ম্যানেজার হিসেবে আছেন।
পাকিস্তানি আমলের একজন আইনজীবী ছিলেন কায়েস শিকদার।শেষ আয়ুর টানে এখন অবসরপ্রাপ্ত তিনি।কল্পনার বড় মামা আরাফাত শিকদার ও গৃহিণী ভাবনা শিকদারের একমাত্র ছেলে মাহির শিকদার।
আর ছোট মামা ফরহাদ শিকদার ও গৃহিণী নাদিয়া শিকদারের একমাত্র মেয়ে নুপুর শিকদার।এবার ক্লাস ফাইভে পড়ছে।কল্পনার সাথে বেশি দেখা সাক্ষাৎ না হলেও কল্পনাকে পেলে যেন আর ছাড়তেই চায় না মেয়েটা।বড় বোনের স্নেহে যেন বার বার গলে পড়ে।
কল্পনা তো ভেবে পায় না,যে দুই-দুইটা বড় ভাইয়ের চোখে ধুলো দিয়ে হেনা শেখকে তুলে নিয়ে এসে বিয়ে করার সাহসটাই কই পেয়েছিলেন ফাহাদ শেখ!কিন্তু এক্ষেত্রে যে ফাহাদ শেখের রাগ ও জেদের কোনো কমতি ছিল না সেটাও কল্পনার ধারণায় আছে।একটা পুরুষের গাম্ভীর্য তো সেখানেই বিদ্যমান।কিন্তু তার ফল স্বরূপ গুরুজনদের ভয়ে হেনা শেখ প্রথমে মানা করলে ফাহাদ শেখ তাকে এক প্রকার শাসিয়েই বিয়ে করেছিলেন।আর সেটাতে যেন একদম পস্তাননি হেনা শেখ।কিন্তু স্বামীর এই রাগ ও জেদের উপরে এখন পর্যন্ত টু শব্দটাও করতে পারেননা তিনি।
আর শেখ ভিলার আসল কর্তা এহনাফ শেখের এই রাগ ও জেদের জিন পরের দুই প্রজন্মের দুই ব্যক্তির মাঝে ভরে-ভরে থাকার কারণেই ১১বছর আগে কল্পনাকে নিয়ে ফাহাদ শেখ ও সাহিত্যের মধ্যে যে মহাভারতেরর যুদ্ধ হয়ে গিয়েছে সে কথা না বলাই শ্রেয়।
"মাহির তুমি যে ফোনের চার্জার খুঁজছিলে,পেয়েছো?"
হেনা শেখের কথায় এতক্ষণে কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তির থেকে আলগোছে চোখ সড়িয়ে শুধালো মাহির,
"হ্যাঁ,কল্পনা দিয়েছে"
"এমনিতে তো কাজের কথা বলে আমাদের সাথে না এসে কিছুক্ষণ আগেই এলি।নিজের খেয়াল রাখিস,যে ফোনের খেয়াল রাখবি?ফোনটা বন্ধ থাকলেই ভালো থাকতো"
ভাবনা শিকদারের কথা শুনে মায়ের দিকে দেখে কপালে ভাজ ফেলল মাহির।
নাতির হয়ে কথা বললেন কায়েস শিকদার,
"আমাদের ওসব আইনজীবীদের কাজ তুমি বুঝবে না বউমা"
দাদা-নাতির পিরিতি দেখে প্রতিবারের মতোই বিরক্তির শ্বাস ফেললেন ভাবনা শিকদার।
"সাহিত্য,এই অসময়ে কই যাচ্ছিস?"
আমেনা শেখের কথায় সবার নজর সিড়ি থেকে মেইন গেটের উদ্দেশ্যে যাওয়া সাহিত্যের দিকে পড়ল।মায়ের কথা শুনে পায়ের গতি থামিয়ে বাম হাতের কব্জিতে গোল ডায়ালের black rado jubile ঘড়ির ব্যান্ড বাধতে নিয়েই শুধালো সাহিত্য,
"ছোট চাচুকে নিয়ে একটু বাইরে যাচ্ছি।কাজ আছে"
কায়েস শিকদার একবার মাহিরের পাশে একবার সাহিত্যের পাশে দেখলেন।অতঃপর মুখে হাসি নিয়ে সাহিত্যকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
"আরে সাহিত্য,আমি তখন আমার নাতির ব্যাপারে বলছিলাম না?এই যে আমার একমাত্র নাতি"
চোখ ঘুরিয়ে আবার মাহিরের দিকে দেখলেন কায়েস শিকদার।
দুপুরের আগে আসার কারণে সবার সাথে কথা হয়েছে সাহিত্যের।কিন্তু মাহির দেরি করে আসায় তার সাথে সাক্ষাৎ হয়নি।প্রায় সমবয়সী দুই যুবকের সাক্ষাতের উদ্দেশ্যেই কায়েস শিকদার ডাকলেন সাহিত্যকে।
কায়েস শিকদারের উদ্দেশ্য বুঝতে পেরেই মুখে মৃদু হাসি নিয়ে ড্রইং রুমের দিকে এগিয়ে এলো সাহিত্য।
মাহিরও ভদ্রতার খাতিরে উঠে দাড়ালো।অতঃপর হাত মেলামেলি হলো দুজনের।
মাহিরই আগে শুধালো,
"আমি মাহির শিকদার,একজন অ্যাসিস্ট্যান্ট এডভোকেট"
"অহিয়াম শেখ সাহিত্য।সি.ই.ও. অফ দি O.S.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রিস"
সাহিত্যের একটি সাধারণ ইন্ট্রোডাকশনে ভালোই ভড়কালো মাহির।নিজের সংশয় দূর করতেই ভ্রু কুচকে শুধালো,
" 'দি' O.S.S. গ্রুপ এন্ড ইন্ডাস্ট্রিস?"
"দি" শব্দটি একটু দৃঢ়ভাবেই মুখে নিল সে।
মুখে মৃদু হাসি নিয়ে হালকা মাথা দোলালো সাহিত্য।অতঃপর মাথা দোলানোর সাথেই নির্দ্বিধায় ছোট করে উত্তর দিল,
"জ্বী"
পেছন থেকে কায়েস শিকদার বলে উঠলেন,
"সাহিত্যকে আগে থেকেই চেন নাকি,মাহির?"
দাদার দিকে ঘুরল মাহির।হালকা হেসে বলল,
"আরে এনাকে কেই বা চিনবে না?এনাকে পার্সোনালি কেউ না চিনলেও এনার কোম্পানির ব্যাপারে পুরো বিজনেস ইন্ডাস্ট্রিতে ধারণা আছে"
শেষের কথাটা আবার সাহিত্যের দিকে ঘুরে বলল মাহির।
কায়েস শিকদার মুখে মৃদু হাসি নিয়ে বললেন,
"সে তো ভালো কথা।এখনকার এই মিডিয়ার যুগে বলতে গেলে এসব ব্যাপারে কম ধারণাই আছে আমাদের।সাধারণভাবে তোমাদেরই এসব ভালো করে জানার কথা"
সাহিত্যের হাতটা আরো দৃঢ়ভাবে ধরে শুধালো মাহির,
"ইটস প্লেজার টু মিট ইউ,মিস্টার সাহিত্য শেখ।শুনেছিলাম যে O.S.S. কোম্পানির সি.ই.ও. একজন বাংলাদেশী এবং রিসেন্টলি দেশে মেইন ব্রাঞ্চও খুলেছে।কিন্তু আমার ধারণাই ছিল না যে আপনি পরিচিতদের মধ্যে কেউ হবেন"
আবার হালকা মাথা দোলালো সাহিত্য,
"প্লিজ আপনি করে বলিও না।আমরা প্রায় সমবয়সীই হবো।এন্ড ইটস নাইস টু মিট ইউ ঠু"
হাতের ঘড়িতে নজর দিল সাহিত্য,
"কিছু যদি মনে না করো,আমার একটু বাইরে যেতে হবে"
সাথে সাথেই নিজের হাত থেকে সাহিত্যের হাত একটু ঢিল দিয়ে বলল মাহির,
"হ্যাঁ হ্যাঁ। অবশ্যই"
আর কথা না বাড়িয়ে সাহিত্যও ব্যতিব্যস্ত পায়ে বেড়িয়ে গেল।
এতক্ষণ থেকে গালে দুই হাত চেপে সাহিত্যের পাশে দেখে থাকা কল্পনা মৃদু হেসে মাথা নিচু করল।ইসস্,তার সাহিত্য ভাইটাকে এমন ডিপ ডিপ কালারের শার্টগুলোতে এতো ইউনিক লাগে কেন?সব জায়গাতেই আলাদা করে চোখে পড়বেই পড়বে।যেমন ক্ষণিক আগেই কালো আঙ্গুর ফলের রং এর শার্টটাতে জ্বলজ্বল করছিল তার সাহিত্য ভাই।
"আরে কল্পনা আপু কি হলো?তুমি কি দিবে,নাকি আমি ভদ্রতা সাইডে রেখে নিজেই ফালুদাটা নিয়ে নেব?"
নুপুরের কথায় চকিত হয়ে মাথা তুলল কল্পনা।এর মধ্যে সামিয়া ও অনুও ড্রইং রুমে চলে এসেছে।কল্পনা দাড় হয়ে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলল,
"আরে আমি তো সবার আসার অপেক্ষা করছিলাম।এই অনু,বড় বাবা-আর বাবাকে একটু ডেকে আনতো"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বিকেলের মিষ্টি রোদে বাগানের একপাশে দাঁড়িয়ে কল্পনার দুই মামা আর তিন শেখ আহমেদ নানা বিষয়ে আলোচনা করছেন।কিন্তু সেই নির্দিষ্ট দুই শেখ আহমেদের মাঝে তো প্রথম থেকেই দূরত্ব বজায় আছে।
শিকদার বাড়ির সদস্যরা তোফায়েল শেখ ও ফাহাদ শেখের বছর পুরনো গরম আবহাওয়ার ব্যাপারে জানেন।এবং ফাহাদ শেখের মেজাজের সীমাহীন মাত্রার ব্যাপারেও ধারণা আছে তাদের।সেটা তো আরো বহু বছর আগেই দেখেছেন তারা।কিন্তু শিকদার বাড়ির লোকজন কখনো দুই ভাইয়ের মাঝে মাথা ঘামানো যৌক্তিক মনে করেননি।তবে প্রয়োজন হলে কখনো এগিয়ে আসতে পিচপা হবেন না সেদিকেও কোনো সন্দেহ নেই।
গল্পের মাঝে হুট করেই সাহিত্য তাদের মাঝে উপস্থিত হলো।ভদ্রতার খাতিরে মুখে হালকা কথা তুলে এক সময় রঞ্জক শেখের হাত ধরে টান মারলো সে,
"ছোট চাচু চলো তো একটু কাজ আছে"
রঞ্জক শেখের প্রতিক্রিয়া করার আগেই কয়েক ধাপ পার করে ফেলেছে সাহিত্য।বড় দুই ভাইয়ের চিন্তায় সেপাশ থেকে চোখ ঘুরিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখলেন রঞ্জক শেখ।ভড়কানো কন্ঠে শুধালেন,
"কি কাজ?আরে দাড়া তো।ওদেরকে ওখানে একা ছাড়া যাবে না"
থামলো না সাহিত্য।গাড়ির কাছে এসে দরজার লক খুলল,
"ওরা কি বাচ্চা নাকি,যে তোমার বেবি সিটিং করতে হবে?এখন কথা না বাড়িয়ে নড়ো তাড়াতাড়ি।ওঠো,ওঠো, ওঠো,ওঠো"
রঞ্জক শেখকে ঠেলতে নিয়েই তাড়া দিল সাহিত্য।
উপায় না পেয়ে গাড়িতে বসতে নিয়েই শুধালেন রঞ্জক শেখ,
"বাচ্চাদেরও সামলানো অতটা কঠিন না রে,যতটা তোর ওই বাপ-চাচা কে সামলানো আমার কাছে কঠিন মনে হয়"
ড্রাইভিং সিটে বসে সাহিত্য গাড়ি স্টার্ট দিতেই আবার বলে উঠলেন তিনি,
"এমন দিনের আলোতে আমাকে কিডন্যাপ করে কই নিয়ে যাচ্ছিস সেটা তো বল অন্তত"
স্টেয়ারিং ঘুরাতে নিয়েই সামনে নজর রেখে বলল সাহিত্য,
"ভাতিজা তোমার এত বড় একটা কোম্পানির সি.ই.ও.।কই একটু হুটহাট অফিসে গিয়ে স্টাফদের উপর দাপট খাটাবে,তা না করে তুমি নাকি এখনো জানোই না আমার সম্রাজ্য কোথায় দাঁড়িয়ে আছে"
শ্বাস ফেললেন রঞ্জক শেখ,
"ভালো কথা তোর অফিসে নিয়ে যাবি।কিন্তু তাই বলে আজকেই কেন নিয়ে যেতে হবে?বাড়িতে এমনিতেই এতোগুলো মানুষ আছে"
"সেটা দেখেই তো নিয়ে যাচ্ছি"
ভ্রু কুচকালেন রঞ্জক শেখ,
"মানে?"
"শুক্রবার ছাড়া তুমি ফ্রি থাকো না।আর শুক্রবারে ঢ্যাং ঢ্যাং করে মানুষকে না নিয়ে শুধু তোমাকে নিয়ে গিয়ে কাউকে ছোট করার অভদ্রতা আমার মাঝে নেই।আবার কাউকে শখ করে আমার কোম্পানিতে নিয়ে যাওয়ার মতো ভদ্রতাও আমার মাঝে নেই"
নির্দিষ্ট 'মানুষটা' যে ফাহাদ শেখ সেটা খুব ভালো করেই বুঝলেন রঞ্জক শেখ।আবার ভারী শ্বাস ফেলে মুখে বড় হাসি নিয়ে বললেন,
"নাহয় নিয়েই গেলি একটু।কি এমন হয়ে যাবে?নিয়ে গিয়ে না হয় একটু ভাব নিয়েই দেখাতে পারবি।নেহ্,ঘুরা গাড়ি।ওই বিজনেসম্যানরেও নিয়ে আসি"
রঞ্জক শেখ শেষের কথাটা বলতে নিয়েই সাহিত্যের কাধে হালকা চাপড় মারলেন।চাচার হালকা চাপড়েও নড়ে উঠল সাহিত্য।আদরের ছোট চাচুর দিকে ঘুরে চোখ জোড়া মারবেল আকার করে দুই পাটি দাঁত বের করে একসাথে চেপে ধরে ভ'য়ংকর হাসি মুখে ফুটিয়ে বিড়বিড় করে শুধালো সাহিত্য,
"ছোট চাচু চুপ থাকো।আমার রাগ উঠানোর ধান্দায় কেন আছো?"
ভাতিজার এমন ভ'য়ংকর কৃত্রিম হাসি দেখে চুপসে গেলেন রঞ্জক শেখ।পর মুহুর্তেই মুখশ্রী স্বাভাবিক করে বলল সাহিত্য,
"এনি অয়ে।আমার গাড়িতে এক্সট্রা সিট নেই"
এতক্ষণে মাথা ঘুরিয়ে গাড়ির ভেতর পরখ করতে লাগলেন রঞ্জক শেখ।গাড়ির ভেতরের অংশ আভিজাত্য কালো রঙ্গে আবৃত এবং আরামদায়ক একটি প্যাসেঞ্জার সিট ও ড্রাইভিং সিট ছাড়া আর কোনো সিট নেই। পরখ করতে নিয়েই নাক শিটকিয়ে বললেন তিনি,
"তুই আমাকে এ কথা শোনানোর জন্যই কি এ গাড়ি কিনেছিস?"
চাচার এহেন কথায় এবার অকৃত্রিমভাবে দাঁত কেলিয়ে হাসলো সাহিত্য।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
সন্ধ্যার আগেভাগেই শিকদার বাড়ির সদস্যরা বাড়ি ফেরার উদ্দেশ্যে উঠে পড়লেন।ভদ্রতার খাতিরে থাকতে বললেও সবার জানা আছে চাকরির ব্যস্ততার কারণে থাকা সম্ভব নয়।
বাড়ির ফটকের সামনে দাঁড়িয়ে হঠাৎ এক কান্ড হলো।কথা বলতে বলতেই মহুয়া বেগমকে জড়িয়ে ধরে কেঁদে উঠলেন ফাতেমা বেগম।সবাই পরিস্থিতি অনুযায়ী স্বাভাবিক থাকলেও স্বাভাবিক নেই কল্পনা ও মহুয়া বেগম।মহুয়া বেগম তো ইতোমধ্যেই কল্পনাকে চোখ রাঙাতে শুরু করে দিয়েছেন।আর সেপাশ থেকে নজর ঘুরিয়েই সবার থেকে একটু পেছনে দাঁড়িয়ে হাসফাস করছে কল্পনা।পরিস্থিতির শিকার তো সেও হয়েছে।নাহলে আদরের নানিকে কখনোই এমন করে কাঁদতে দিত না সে।
হঠাৎ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা মাহিরকে দেখে ফোনের কথা মনে পড়ল কল্পনার।
"আরে ভাইয়া,আপনার ফোন তো আমার রুমেই আছে।দাড়ান আমি নিয়ে আসি"
ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে বলেই নিজের রুমের দিকে দৌড় লাগালো কল্পনা।
ফোন হাতে নিয়ে মাথা নিচু করে রুম থেকে বের হতে নিয়েই শক্তপোক্ত এক পুরুষালী বক্ষপটের সাথে ধাক্কা লাগলো কল্পনার মাথা।মাথা তুলতেই দেখা মিললো উজ্জ্বল শ্যাম বর্ণের সুদর্শন পুরুষের।সাথে সাথে দু'কদম পিছিয়ে গিয়ে হাতের ফোন মাহিরের দিকে বাড়িয়ে ধরল সে,
"আপনার ফোন"
সেই ফোন চার্জে দেওয়ার পর থেকে মাহিরের সাথে আর একবারও কথা হয়নি কাল্পনার।ছেলেদের সাথে কল্পনা সচরাচর কম কথাই বলে থাকে।মাহির সেটা ভালো করেই জানে এবং সম্মানও করে।তাইতো শিকদার বাড়িতে গেলেও তেমন কথা হয় না তাদের মাঝে।
কল্পনার দিকে নজর রেখেই ধীরে সুস্থে মাহির ফোনটা হাতে নিল।সেখানেই ঠায় দাঁড়িয়ে ফোনের জ্বলতে থাকে স্ক্রিনে নজর দিয়ে স্ক্রিনে হাত চালাতে নিয়েই শুধালো সে,
"এবার যেন কোন ইয়ারে তুই?"
স্বাভাবিকভাবেই বলল কল্পনা,
"সেকেন্ড ইয়ারে"
"পড়াশোনা কেমন চলছে?"
"হুম।আলহামদুলিল্লাহ ভালো"
"নানাবাড়ি যাওয়া তো একদম ছেড়ে দিয়েছিস"
মৃদু ভাবলেসহীন হাসলো কল্পনা,
"ওই তখন পড়াশোনার চাপ একটু বেশি থাকায় সময় হয়ে উঠেনি।এখন না হয় একটু কম চাপ আছে"
"তো এখনো তো আসিস না"
মাহিরের মৃদু কথায় হালকা ভড়কালো কল্পনা।আবার মুখে হাসি ফুটিয়ে বলল,
"দেখি বড় কোনো ছুটি পেলেই যাব"
এবার সময় নিয়ে ফোন পকেটে ঢুকিয়ে সরাসরি কল্পনার দিকে দেখলো মাহির,
"আর...."
"কল্পনা!!!! "
কি যেন বলতে যাচ্ছিল মাহির।কিন্তু তার আগেই পাশের রুম থেকে সাহিত্যের বজ্র কন্ঠের হুং'কার শোনা গেল।সেই হুং'কারে কল্পনা কেপে ওঠার সাথে মাহিরও ভড়কে উঠলো।কিছু বুঝে উঠার আগেই আবার সাহিত্যের হুং'কার শোনা গেল,
"কল্পনা!! তাড়াতাড়ি আমার রুমে আয়!রাইট নাও!!"
এদিকে বের হতে দেরি হচ্ছে দেখে নিচ থেকে আরাফাত শিকদারও মাহিরকে উদ্দেশ্য করে ডাকতে লাগলেন।
ব্যতিব্যস্ত হয়ে মাহিরকে পাশ কে'টে বের হতে নিয়েই শুধালো কল্পনা,
"আচ্ছা ভাইয়া ভালো থাকিয়েন।আর এবার সময় পেলেই যাব আমি"
সাহিত্যের রুমের সীমানায় ঢুকে পড়ায় মাহিরের চোখে অদৃশ্য হয়ে গেল কল্পনা।
কি হয়ে গেল বুঝতে না পেরে কিছু মুহুর্ত সেখানেই দাঁড়িয়ে থাকলো মাহির।অতঃপর নিচ থেকে আবার আরাফাত শিকদারের ডাক শুনে নিচে চলে গেল।
কল্পনা প্রায় দৌড়েই সাহিত্যের রুমে ঢুকল।নজর গেল স্টাডি টেবিলের দিকে।টেবিলে হাত ঠেকিয়ে দুই হাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে আছে সাহিত্য।সাহিত্যের এমন করে বসে থাকা দেখে ভ'য় হলো কল্পনার।ব্যস্ত পায়ে সামনে আগাতে নিয়েই ভ'য়ার্থ কন্ঠে বলে উঠল সে,
"কি হয়েছে সাহিত্য ভাই? এমন করে ডাকলেন কেন?শরীর খারাপ লাগছে কি?"
"আমার ফালুদা কোথায়?"
শান্ত স্বরে সাহিত্যের বলা কথাটা শুনে মাঝ পথেই থেমে গেল কল্পনা।ভ্রু কুচকে শুধালো,
"কীহ্?"
ঘাড় কাত করে কল্পনার দিকে দেখল সাহিত্য।মুখশ্রী তার গম্ভীর।এবার শক্ত কন্ঠে বলল সে,
"শুনলাম তুই নাকি ফালুদা বানিয়েছিস।তো আমাকে খেতে দিসনি কেন?"
কি ভেবে দৌড়ে এসেছিল আর আসলে কি হয়েছে সেটা যেন কিছুতেই মাথায় ঢুকাতে পারছে না কল্পনা।আমতা আমতা করে বলে উঠল সে,
"আপনি তখন বাইরে গিয়েছিলেন তাই দিতে পারিনি"
এবার মাথা তুলে চেচিয়ে উঠল সাহিত্য,
"আমি বাসায় ফিরেছি সেই কখন।সবাইকে নাক ডুবিয়ে খাইয়েছিস আর আমাকে স্মেলটাও নিতে দিলি না?"
আবার ভড়কালো কল্পনা।আমতা আমতা করে এবার একটু জোরে বলে উঠল,
"আরে বাবা,শেষ হয়নি তো।আছে এখনো"
"তো আমাকে দিচ্ছিস না কেন?"
হালকা ভারী নিঃশ্বাস বেড়িয়ে এলো কল্পনার ভেতর থেকে।শান্ত স্বরে শুধালো,
"দাড়ান,নিয়ে আসছি"
কল্পনা এই মুহুর্তেই আবার বাইরে যাচ্ছে সেটা বুঝতে পেরে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে আবার চেচিয়ে উঠল সাহিত্য,
"এই-এই দাড়া"
সাহিত্যের চেচানো কন্ঠে স্নায়ুর তাড়নায় কেপে উঠল কল্পনা।পেছনে ঘুরে হালকা তেতে উঠল,
"আবার কি হয়েছে?"
এবার সময় নিয়ে শান্ত স্বরে শুধালো সাহিত্য,
"নানুরা গিয়েছে?"
মিনমিনিয়ে বলল কল্পনা,
"না।নিচে কথা বলছে"
এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল সাহিত্য,
"কিছুক্ষণ আগে নানির গলা শুনলাম"
'নানির গলা শুনলাম' বলতে যে সাহিত্য ফাতেমা বেগমের কান্নার কথা বুঝিয়েছে কল্পনা সেটা ভালো করেই বুঝলো।দুই হাত পেছনে বেধে সিলিং এর দিকে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে লাগল কল্পনা।যেন সে কিছুই বুঝলো না এমন ভাব দেখিয়ে মৃদু স্বরে শুধালো সে,
"হ্যাঁ, তো"
নজর টানটান হয়ে এলো সাহিত্যের,
"সিলিং এর তারা গুণছিস কেন?"
সিলিং এর দিকে নজর রেখেই শুধালো কল্পনা,
"কই সিলিং এর তারা গুণছি?আমি তো উপরের ময়লা ঝুলগুলো দেখছি।এতো লম্বা একটা মানুষ আপনি,একটু হাত উঁচু করলেই তো সব ঝেড়ে ফেলা যায়"
মুখে মৃদু হাসি নিয়ে সাহিত্য বলল,
"কথা ঘুরাতে তো আগের থেকেও বেশি এক্সপার্ট হয়েছিস"
এবার নজর সাহিত্যের দিকে দিয়ে দুই পাটি দাঁত দেখিয়ে হাসল কল্পনা।
বেলকুনির দরজা খোলা থাকার দরুণ দুটো কার বাড়ি থেকে বের হয়ে যাওয়ার সময় হর্নের শব্দ ভালো করেই কানে এলো সাহিত্য আর কল্পনার।
বেলকুনির দিকে নজর দিয়ে বলল কল্পনা,
"এই তো, নানুরা মনে হয় এখনে গেল"
এবার কাটকাট গলায় বলল সাহিত্য,
"এখন যা তাড়াতাড়ি,আমার ফালুদা নিয়ে আয়"
আবার সাহিত্যের দিকে ঘুরল কল্পনা।মুখে ভেংচি কে'টে শুধালো,
"বাটিতে করে আনবো নাকি গামলায় করে?"
চেচিয়ে উঠল সাহিত্য,
"ড্রামে করে নিয়ে আয়!এমনিতে তো খেতে দেয়নি আবার বড় বড় কথা বলছে। 'বাটিতে করে আনবো নাকি গামলায়?' "
শেষের কথায় সাহিত্যের মুখ ভেংচানো দেখে নাক শিটকালো কল্পনা।অতঃপর সাহিত্যের কথায় ডানে-বামে ঠোঁট মুচড়িয়ে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল এক ড্রাম ফালুদা নিয়ে আসার উদ্দেশ্যে।
কল্পনা রুম থেকে বের হওয়ার পর মুহূর্তেই পুরো শরীরের ভার চেয়ারে ছেড়ে দিয়ে এক লম্বা নিঃশ্বাস ফেলল সাহিত্য।হুং'কারটা যে এতো জোরে হয়ে যাবে সাহিত্য নিজেও বুঝতে পারেনি।কিন্তু রুম থেকে বের হতে নিয়েই যখন চোখে পড়ল যে মাহির আর কল্পনা এতো কাছাকাছি দাড়িয়ে কথা বলছে অমনি রাগটা আলোর গতিতে চড়চড় করে উঠে মাথায় ভার করে বসেছিল।যেখানে কল্পনার দিকে কারো চোখ তুলে তাকানোটাও সাহিত্য সহ্য করতে পারে না সেখানে মাহির এতো কাছে দাঁড়িয়ে কথা বলায় শরীরের শিরা-উপশিরা সব ফেটে যাচ্ছিল তার।কল্পনার মামাতো ভাই হয় সেটা মাথায় থাকাতেই এগিয়ে না গিয়ে আবার রুমে ঢুকে পড়ে সাহিত্য।না হলে তো তখনই একটা উনিশ-বিশ করে দিত।
দুই হাত দিয়ে মুখ ঢেকে হালকা হেসে উঠল সাহিত্য।অতঃপর বিড়বিড় করে আওড়াল,
"এই মেয়েটা সামনে থাকলে আমার শান্তি থাকলেও, এই মেয়েটার কারণেই বেশি অশান্তিতে ভুগি আমি"
#চলবে
আগামী পর্বে কেউ একজন ঝাটা পেটা খেতে যাচ্ছে🤭