#পর্ব_২৬
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"সাহিত্য,একটু আমার রুমে আয় তো"
মায়ের ডাকে টিভি দেখা বাদ দিয়ে ড্রইং রুম থেকে উঠে এলো সাহিত্য।কিন্তু জ্বরের কারণে স্কুল ছুটি নেওয়া সামিয়ার সাথে বসে টিভিতে টম এন্ড জেরি দেখার দরুন মায়ের ভারী গলা ঠাহর করতে পারলো না সে।
আমেনা শেখের পিছু পিছু রুমে ঢুকে হেনা শেখকে দেখতে পেয়ে ভড়কে গেল সাহিত্য।কি করবে বুঝতে না পেরে আশেপাশে এলোমেলো দৃষ্টি ফেলতে লাগল।
আমেনা শেখ এগিয়ে গিয়ে সোফায় জা এর পাশে বসলেন।সেটা দেখে আরেক দফা চমকে গেল সাহিত্য।শান্ত স্বরেই ছেলেকে সোফার সামনের বিছানায় বসতে বললেন আমেনা শেখ।মায়ের কথায় বাধ্য ছেলের মতো মাথা নিচু করে দুই গিন্নির মুখোমুখি হয়ে বসল সে।
'এরা আবার কবে থেকে কথা বলতে শুরু করল?'
নিজের মনে প্রশ্ন করে উত্তর না পেয়ে সেভাবেই মাথা নিচু করে বসে থাকল সাহিত্য।
"চাচাটার মতো তুইও যে এতো বড় একটা গাধা আর রগচটা হবি,সেটা জানা ছিল না আমার"
হেনা শেখের দাঁত চিবিয়ে বলা কথায় সাহিত্য আরো এক দফা,না-না,দুই দফা চমকে উঠল।আবার সেই আগের মেঝো চাচীর কন্ঠের ধরন শুনে তড়িৎ গতিতে মাথা তুলল সে।অমনি দেখা মিললো দুই জোড়া অগ্নি বর্ণের চোখের।যেমন করে মাথা তুলেছিল ঠিক তেমন করেই আবার মাথা নামিয়ে ফেলল সাহিত্য।অতঃপর মিনমিনিয়ে বলল,
"আমি আবার কি বলেছি?"
আবার তেতে উঠলেন হেনা শেখ,
"বলিসনি কেন ওটাই তো জিজ্ঞেস করছি।সেদিন রাগ দেখিয়ে কল্পনার গায়ে হাত তোলার মিথ্যাটা স্বীকার না করে মাথাটা একটু খাটিয়ে সেই রাগের জোরেই সত্যটা বললে কি হতো?"
এবার সাহিত্যের মাথায় বুঝ ঠেকলো।কল্পনা নিশ্চয়ই এদের মেলানোর জন্য কোনো প্লান খাটিয়েছে।তার মানে সেদিন কল্পনা এজন্যই কাঁদতে কাঁদতে সাহিত্যের রুমে গিয়েছিল।
কিছু না বলে ঠায় চুপ রইল সাহিত্য।ভাতিজার চুপ থাকা দেখে ভারী শ্বাস ফেললেন হেনা শেখ,
"নিজেকে এতো বছর কিছুতেই বিশ্বাস করাতে পারছিলাম না যে তুই কল্পনার গায়ে হাত তুলেছিলি।কিন্তু তোর নিজের মুখে স্বীকার করা দেখে আমিও অবাক হয়ে যাই"
কথায় বিরতি দিয়ে সাহিত্যের দিকে দেখলেন হেনা শেখ,
"সাহিত্য...কল্পনাকে তুই যেমন আদর করতি তেমন শাসনটাও করার অধিকার আছে তোর।সেটাতে আমি তখনো দ্বিমত করতাম না আর এখনো করি না।কিন্তু শেষের দিকে তুই যখন কোনো কারণ না বলেই কল্পনাকে নিয়ে তোর মেঝো চাচুর সাথে কথা কাটাকাটি করছিলি তখন আমি সুবাকেও সামনে আগাতে থামিয়ে দিয়েছিলাম"
হালকা হাসি ফুটল হেনা শেখের মুখে,
"সুবা তো এখনো অব্দি বিশ্বাস করতে নারাজ যে তুই কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া কল্পনার গায়ে হাত তুলতে পারিস।এমনকি সে তো এটাই বিশ্বাস করেনি যে তুই কল্পনাকে 'আঘাত' করেছিলি।তোর বড় বোন তোকে অনেক ভালো করেই চিনে রে।ওর কথাটাই সত্য হলো"
গলা ভেঙে এলো হেনা শেখের,
"তোর সব স্বপ্ন এভাবে ভেঙে যাওয়ার প্রত্যেকটা দো'ষ আমি ঘাড়ে নিতে রাজি আছি।তবুও ওই নির্দোষ অবুঝ মেয়েটাকে দোষ দিস না।এই ১১টা বছর এই মায়ের চোখে যেটা পড়েছে সেটা থেকেই বলছি,তোর প্রতি কল্পনার সম্মান,শ্রদ্ধা,ভালোবাসা কোনোটাই এক রত্তিও কমেনি।বরং তোর সাথে দূরত্ব বাড়ার পর থেকে সেটা আরো বাড়তে দেখেছি আমি"
হেনা শেখের শেষের কথায় আড়ালেই মুখে হাসি ফুটল সাহিত্যের।এ কথা তো আর সাহিত্য হেনা শেখকে বলতে পারছে না যে গত ১১বছর ধরে প্রেয়সীর এই ছটফটানি সাহিত্য অজান্তেই তিলে তিলে অনুভব করে আসছে।
"তুই যদি কল্পনার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিস তাহলে আমার মেয়েটা আর কখনোই কাউকে শ্রদ্ধা বা ভালোবাসার নজরে দেখতে পারবে না।আর আমার নির্দোষ মেয়েটার এই অবনতি যে আমি সহ্য করতে পারবো না রে"
কথা শেষ করার আগেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন হেনা শেখ।মেঝো চাচীর এমন কান্নায় ভেঙে পড়াতে ব্যতিব্যস্ত হয়েই হেনা শেখের সামনে মেঝেতে হাটু ভেঙে বসল সাহিত্য।অতঃপর হেনা শেখের হাত দুটো আলতো করে নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে মুখে হালকা হাসি ফুটিয়ে কোমল কন্ঠে বলতে লাগল সে,
"আমার শক্ত মেঝো চাচীটা যে এমন ভেঙে পড়তে পারে সেটা আমার বিশ্বাস হচ্ছে না।অযথা তুমি কেন নিজের ঘাড়ে সব দোষ নিতে যাবে?আমি কি একটা বারও বলেছি যে তোমার কোথাও দোষ ছিল?"
এবার হালকা শব্দ করেই হাসলো সাহিত্য,
"আর যদি তোমার চঞ্চল ছোট চড়ুই পাখি মেয়েটার কথা বলো,তাহলে কখনো কি দেখেছো যে আমি ওর উপর রাগ করে থাকতে পেরেছি?কোনো না কোনো রাস্তার জি.পি.এস. অটোমেটিক তার মাথায় সেট হয়ে যাবে আমার রাগ ভাঙানোর উদ্দেশ্যে"
সাহিত্যের এহেন কথায় দুই গিন্নিই চকিত হয়ে সাহিত্যের দিকে দেখলেন।তারা কল্পনাও করেননি যে সাহিত্য এতো তাড়াতাড়ি মেনে নেবে।কারণটা যে সেই বংশীয় রাগ।যেটার ধারের কাছেও বাড়ির গিন্নিরা যেতে পারেন না।
হেনা শেখ সাহিত্যের হাতের আলতো বাঁধন ছাড়িয়ে সাহিত্যের হাত দৃঢ়ভাবে চেপে ধরলেন।ছলছল নয়নে ভাঙা গলায়ই শুধালেন তিনি,
"তুই সত্যি বলছিস?"
আবার ঠোঁট বাকিয়ে হাসল সাহিত্য,
"ওমা বিশ্বাস হচ্ছে না?আমি কি তোমাকে কখনো মি'থ্যা বলেছি?"
সাহিত্যের হাসি মাখা কথায় আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন হেনা শেখ।কিন্তু এই কান্না যে ক্ষণিক আগের কান্না থেকে সম্পুর্ণ বিপরীত ইঙ্গিত ধারণ করছে।
আলতো হাতে মেঝো চাচীর চোখের পানি মুছে দিতে নিয়েই শুধালো সাহিত্য,
"আমাকে কি আব্বু আর মেঝো চাচুর মতো এতোটাই পাষাণ মনে করেছো,যে অহেতুক কারণে তোমাদের উপর রাগ করে থাকবো?"
আবার ভাঙা গলায় বললেন হেনা শেখ,
"অহেতুক কারণ কেমন করে হয় রে?তোর আর্টিস্ট হওয়ার দিকে কতটা ঝোঁক ছিল সেটা বাড়ির সবাই জানে"
"কেন,আমি কি আর্ট করা বাদ দিয়েছি নাকি?এখনো তো ভুরি ভুরি আর্ট করি আমি।আমার কাছে তোমার ফাজিল মেয়েটা আর পেইন্টিং এক কাতারেই পরে।কল্পনার মতো পেইন্টিংকেও আমি কখনো ছাড়তে পারবো না"
কান্নার তোপে হেনা শেখ আনমনে থাকলেও আমেনা শেখের কানে সাহিত্যের শেষের কথাটা ভালো করেই ঢুকলো।পর মুহূর্তেই নিজের অতিরিক্ত চিন্তা ভেবে আবার ভুলে বসলেন সেটা।
এবার নিজের হাতেই চোখের পানি মুছলেন হেনা শেখ।নিজেকে সংযত করে হাসি মুখে শুধালেন,
"ঠিক আছে তাহলে।আমিও আর এসব কথা নিয়ে পড়ে থাকবো না।কাল থেকে আমিও তোকে ভালো-মন্দ খাওয়ানোর জন্য লেগে পড়ব।আসার পর থেকেই খেয়াল করছি।একদম শুকিয়ে গিয়েছিস।মা-ছোট চাচী বাদেও মেঝো চাচীর আদরের কমতি ছিল তো,তাই মনে হয় এখনো হাড্ডি লুকিয়ে চোখ-মুখ তাজা হয়নি"
হেনা শেখের কথায় ভড়কে উঠে সটান দাঁড়িয়ে পড়ল সাহিত্য।কাপা গলায় বলতে লাগল,
"ক-ক-কি বললে?এগুলোকে হাড্ডি বের হওয়া না,জিম করে ফিট রাখা শরীর বলে।অতো আলগা পিরিত দেখিয়ে আমার এতো বছরে তৈরি করা ফিটনেস বিগড়ানোর ধান্দা বাদ দাও বলছি।আম্মু আর ছোট চাচীকে বলে তো কোনো কাজ হচ্ছে না।অন্তত তুমি তো শুনো"
এতক্ষণ থেকে চুপ হয়ে থাকা আমেনা শেখ এবার মুখ খুললেন।কটমট করতে লাগলেন তিনি,
"ও ঠিকই বলেছে হেনা।ওকে অতো পিরিত দেখিয়ে লাভ নেই।ওকে তো ঝাঁটা পেটা করে সোজা করা উচিত।এই এগারো বছরে সেটার অনেক কমতি পড়ে গিয়েছে।আজ একদিনেই সব পুষিয়ে দেব"
আমেনা শেখের এমন কথায় হেনা শেখ পরিস্থিতি আঁচ করতে পেরে শান্ত করতে লাগলেন বড় জা কে,
"ভাবি।থাক ভাবি।এখন অযথা এসব বলার দরকার নেই।বাদ দেন তো।বাচ্চা মানুষ,বুঝেনি"
ছোট জা এর সান্ত্বনা কাজে দিল না।অগ্নি দৃষ্টি সাহিত্যের দিকে রেখেই আবার কটমট করে উঠলেন আমেনা শেখ,
"বাচ্চা মানুষ?দু'দিন পরেই আটাশ পেরিয়ে ঊনত্রিশে পা দিবে,আর বাচ্চা মানুষ?"
জিম করার কথা শুনে হঠাৎ মায়ের এমন কালির রুপ ধারণ করার কোনো যুক্তিই খুঁজে পেল না সাহিত্য।মায়ের পাশে ড্যাবড্যাব করে দেখে মিনমিনিয়ে বলতে লাগল,
"তোমার আবার কি হলো?এতক্ষণ তো ভালোই ছিলে।ছেলেকে না খাওয়াতে পারার শোকে কোন ফিলিংস বের করতে হবে সেটা আবার ভুলে গিয়েছো নাকি?"
উঠে দাড়ালেন আমেনা শেখ,
"দাড়া।তোকে বুঝাচ্ছি আমি।কানাডায় পাঠানোর সময় ভুল করে তোর খালাকে শুধু আদরটাই করতে বলেছিলাম।কিল-ঘুষি বসানোর কথাটাও বলার দরকার ছিল।সকালে ঝাড়ুটা যেন কই রাখলাম"
কোমড়ে শাড়ির আঁচল গুজে আশেপাশে মাথা ঘুরিয়ে বিছানা ঝাড়া ঝাড়ু খুজতে লাগলেন আমেনা শেখ।ওদিকে তো হেনা শেখ ভাতিজাকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে সমানে বড় জা কে ঠান্ডা হতে বলছেন।
সাহিত্য যেন পরিস্থিতি কিছুতেই আঁচ করতে পারছে না।এবার কাপা গলায় জোরেই বলে উঠল সাহিত্য,
"আরে হলোটা কি?ঝাড়ু খুঁজছো কেন?মেঝো চাচী যেটা বলল কথা না বাড়িয়ে তো সব মেনেই নিলাম"
ঝাড়ুর ঠিকানা পেয়ে সেটা হাতে তুললেন আমেনা শেখ।সেটা দেখে সাহিত্যের চোখ কোটর থেকে বের হওয়ার উপক্রম।চিৎকার দিয়ে উঠল সে,
"আরে আসলেই দেখি ঝাড়ু হাতে নিয়েছে!"
চেহারা কাঁদো কাঁদো করে শুধালো সাহিত্য,
"আম্মু,কি করেছি সেটা তো আগে বলো।তারপর আমার মার খেতে কোনো সমস্যা নেই,আই সোয়ার!"
আবার কটমটিয়ে উঠলেন আমেনা শেখ,
"আই সোয়ার?আই সোয়ার তোকে আজ মাটিতে পুতে ছাড়ব"
শেষের কথাটা সাহিত্যের দিকে ঝাড়ু দেখিয়েই বললেন তিনি।
বেচারা সাহিত্য উপায় না পেয়ে এবার চাচীর দিকে ঘুরল,
"মেঝো চাচী তুমি তো অন্তত বলো,হয়েছে টা কি?"
হেনা শেখকে বলার সুযোগ না দিয়েই সাহিত্যের দিকে ঝাড়ু তাক করেই আবার বলে উঠলেন আমেনা শেখ,
"এই।তুই কল্পনাকে কি বলেছিস?"
এবার পুরো থমকে গেল সাহিত্য।ভ্রু কুচকে শুধালো,
"কল্পনাকে?ওকে আবার কখন কি বললাম?"
"এখন মনে পড়ছে না,তাই না?তো বলার সময় মুখে লাগাম টানিস না কেন?রাগের মাথায় যেটাই মুখে আসবে সেটাই বলে দিবি?এই শিক্ষা দিয়েছি আমি তোকে?"
আবার মায়ের রাগের ভয়ে কাপতে লাগল সাহিত্য,
"আম্মু,'আমি' কল্পনাকে কিছু বলব এটা তুমি ভাবতেও পারো কেমন করে?দশ মিনিটও হয়নি এ ব্যাপারে ১১বছর আগের এক কনফিউশান দূর করা হলো।আবার কি নিয়ে পড়েছ তুমি?"
"তুই আমার ছেলে হতেই পারিস না।ওই বাচ্চা মেয়েটাকে ওমন কথা বলতেই বা পারলি কেমন করে?"
চোখ নিভু নিভু করে মাথায় আঙ্গুল ঠুকিয়ে আওড়াতে লাগলেন আমেনা শেখ,
"কি যেন ছিল?জীবনে....সয়তান..."
পুরো কথা মনে আসতেই আবার আগের কালির রুপ ধারণ করলেন তিনি।পুনরায় সাহিত্যকে হাতের ঝাড়ু দেখিয়ে কটমটিয়ে উঠলেন,
"হ্যাঁ!! কল্পনা তোর জীবনে অভিশাপ?ছোট থেকে এই আদর করতি তুই কল্পনাকে?বাচ্চাটা পুরো কেঁদে দিয়েছে।আরে ওর কথা কি বলছি?আমারই তো সহ্য হচ্ছে না।না জানি আরো কত কি বলেছিস তুই ওকে?আজ তোকে মে'রে মে'রে ভুত বানিয়ে অভিশাপেরই আত্মার রচনা লিখে ছাড়বো"
কথা শেষ হতেই ঝাড়ু হাতে সাহিত্যের পেছনে ছুটলেন আমেনা শেখ।
তৎক্ষণাৎ কোনো উপায় না পেয়ে সাহিত্যও জানের ভয়ে দৌড় লাগাল।অতঃপর পেছনে দাবড়ানো মায়ের উদ্দেশ্যে চেচিয়ে উঠল,
"আরেএএ ওটা তো সেই কবেই বলেছিলাম।সেটার জন্য তো সরিও বলেছি"
"কেমন করে সরি বলেছিলি,যে মন থেকে অভিমানটাই মেটেনি মেয়েটার?"
পুরো রুমে মায়ের সাথে ধরাধরি খেলতে নিয়েই কাঁদো গলায় শুধালো সাহিত্য,
"অভিমান মেটেনি তো সেটা আমার কাছে এসে বললেই ভালো করে মিটিয়ে দিতাম।তোমাকে বলার দরকার কি ছিল?এই মেয়েটা ১১বছরের শোধ একদিনে পূরণ করাচ্ছে তার আবেগি বড় মাকে দিয়ে"
"একদম কথা বলবি না।নিজে ভুল শুধরাতে পারিসনি আর কল্পনাকে দোষ দিচ্ছিস এখন?"
সুযোগ পেয়ে এবার রুমের বাইরে দৌড় লাগালো সাহিত্য।কিন্তু আমেনা শেখ তাতেও দমলেন না।মনে দৃঢ় পণ নিয়েই আজ ছেলের পেছনে লেগেছেন তিনি।নিজেকে বাঁচানোর আরেকবার চেষ্টা করল সাহিত্য,
"আম্মু,এতো বড় ছেলের পেছনে ঝাড়ু নিয়ে দৌড়াতে হয় না।ও দাদী কই গেলেএএ?বাঁচাও তোমার বউমার হাত থেকে!"
বাইরের কোলাহল পরখ করতেই রুমের দরজায় বেড়িয়ে এসেছেন মহুয়া বেগম।সাহিত্যের আকুতি ক্রিকেট ব্যাট দিয়ে ছক্কা মেরে শান্ত স্বরে শুধালেন তিনি,
"এটা তোর প্রাপ্য।আমার করার কিছুই নেই"
রান্নাঘরের দরজায় দাঁড়িয়ে হাতে থাকা তরকারির হাতা নাড়িয়ে লতিফা বেগম বলে উঠলেন,
"আমার তরফ থেকেও দুটো বসিয়ে দিয়েন ভাবি।ওর রাগ যেন লোকাল বাসে উঠে দৌড় মারে"
সবাইকে নিজের বিপক্ষে দেখে চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করল সাহিত্য।আজ এই কল্পনার খবর আছে!
দম ফুরিয়ে যাওয়ায় দাঁড়িয়ে পড়লেন আমেনা শেখ।সেই সুযোগে সাহিত্যও হাপাতে নিয়ে সোফায় সামিয়ার পাশে বসে পড়ল।মা আর ভাইয়ের এমন কান্ড জীবনে আজ প্রথম দেখছে সামিয়া।পুরো হা হয়ে গিয়েছে মেয়েটা।অতঃপর সাহিত্যের দিকে দেখে ফিক করে হেসে শুধালো,
"আমি জানি না আম্মু তোমার পেছনে কেন দৌড়াচ্ছে।কিন্তু তোমার যে আজ জগিং করার সিডিউলটা কমপ্লিট হয়ে গেল সেটা ভালো করেই বুঝতে পারছি"
আবার সেই জিমের কথা শুনে ফুসে উঠল সাহিত্য।বোনকে রাগ দেখিয়ে বিড়বিড় করে আওড়াতে
লাগল,
"বেশি কথা বলিস না নাহলে আম্মুর হাতের ঝাড়ুটা দিয়ে পিটিয়ে একদিনেই জ্বর নামাবো তোর"
ভাইয়ের রাগের মাথায় বলা কথায় বেশ মজাই পেল সামিয়া।যার দরুণ মুখ টিপে হেসেই যাচ্ছে সে।
ফুরানো দম সংযত হতেই আবার চেচিয়ে উঠলেন আমেনা শেখ,
"ওখানে বসলি কেন?যাহ্,এক্ষুনি গিয়ে কল্পনাকে সরি বল"
উঠে দাড়ালো সাহিত্য।মায়ের হাতের বন্দুকের ন্যায় ঝাড়ুটা দেখে মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করে
শুধালো,
"ওহো,ঝাড়ুটা এখন নামাও তো।যাচ্ছি তোমাদের লাডলির কাছে ক্ষমা চাইতে"
বলেই ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই সিড়ির দিকে এগোতে লাগল সাহিত্য।কি যেন মনে করে থেমে গিয়ে পেছনে ঘুরল।থমথমে গলায় বলল,
"বাই দা ওয়ে।না আমার চাচা গাধা আর না আমি গাধা।দুজনেই নামি-দামি বিজনেসম্যান।আর সেটার উপরেও আরো একটা কথা,আমি একটু বেশিই নামি-দামি।নাহলে এই প্রায় প্রায় দুপুরে বাসায় থেকে তোমাদের ঝাটা পেটা না খেয়ে অফিসের কাজে দৌড়াতে হতো"
আবার হাতের ঝাড়ু উঠালেন আমেনা শেখ,
"অতো ভাব না দেখিয়ে যেটা কাজ দিয়েছি সেটা কর গিয়ে!"
আর কথা বাড়ালো না সাহিত্য।বড় বড় পা ফেলে উপরে চলে গেল।
ছেলের যাওয়ার দিকে দেখে মুখে হাসি ফুটল আমেনা শেখের।পর মুহুর্তেই কান্নায় ভেঙে পড়লেন তিনি।ছেলের স্বাভাবিক আচরণ দেখে মনে যে কি বড় আরাম পাচ্ছেন তিনি, তা যেন কোনো ভাষা বহন করতে পারবে না।দীর্ঘ ১১বছর পর যেন তার ছেলেসহ এই বাড়ি আসল রুপে ফিরে এসেছে।
বড় জা এর চোখ থেকে হঠাৎ পানি গড়িয়ে পড়তে দেখে ভড়কে গেলেন দুই জা ই।হেনা শেখ কাছে আসার পরপরই রান্নাঘর থেকে লতিফা শেখও এগিয়ে এলেন।বড় জা কে সান্ত্বনা দিতে গিয়ে উল্টো নিজেরাই আবার ভেঙে পড়লেন।তিন জা এর খুনশুটি বন্ধুত্বের সম্পর্ক যেন ধুলোয় মিশিয়ে গিয়েছিল এতো বছর।সেটা যেন আজ আবার শত ধুলো কণার মতোই জমা হয়ে গিয়েছে এক জায়গায়।
রুমের দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা মহুয়া বেগমের নজর সেপাশে আটকাতেই ঠোঁটে হাসি ফুটল।গত রাতে তিন বউমাই মহুয়া বেগমের রুমে হাজির হয়েছিলেন।যত ভুলভ্রান্তি ছিল সব যেন পানির মতো পরিষ্কার হয়ে গেল পরমুহূর্তেই।রঞ্জক শেখকে ছাড়া বাকি দুই শেখ আহমেদকে এ ব্যাপারে যেন না বলা হয় মহুয়া বেগম তা পরিষ্কার করে দেন তিন গিন্নির কাছে।স্বাভাবিকভাবেই তিন গিন্নি অবাক হয়ে অস্বীকার করেন সেটা।কিন্তু মহুয়া বেগম বুঝিয়ে দেন যে ১১বছর আগের দুই ভাইয়ের সেই বিচ্ছেদের কারণ সাহিত্য-কল্পনা ছিল না।সাহিত্য-কল্পনা শুধু আগুনে ঘী ঢালার মতো ছিল।এখন সাহিত্য-কল্পনার ব্যাপারে বলে যদিও ঠিক হয় তবুও তা ক্ষণিকের স্থায়ী হবে। আবারো কোনো ক্ষুদ্র বিষয়ে ভাঙন তৈরি হতে সময় লাগবে না।তাই আপাতত চুপ থাকাই শ্রেয়।আসল কথা হলো বাড়ির গিন্নিদের না বলেই মহুয়া বেগম কল্পনাকে একটু সময় দিতে চাচ্ছেন।মায়েরা যেহেতু মিলেছে।বাপগুলো মিলবে না কেন?অবশ্যই মিলবে।আর সে ব্যাপারে মহুয়া বেগম তার চঞ্চল নাতনির উপর পুরো বিশ্বাস করেন এখন। কখনো চিন্তাও করেননি তিনি যে তার বাচ্চা সুলভ চঞ্চল নাতনিটার এমন আজগুবি বুদ্ধি আসলেই ফলবে।
হাসি মুখেই কৃত্রিম রাগ ফুটিয়ে তিন গিন্নিদের উদ্দেশ্যে গলা উঁচিয়ে বললেন মহুয়া বেগম,
"কি একটু তিন জা হাড়ি-পাতিল ঢিলা-ঢিলি করে ঝগড়া করবে আর সেখানে আমি আরো ঘী ঢেলে দিয়ে মজা নিব,তা না করে তাদেরই কত পিরিত শুরু হয়েছে,দেখো একবার"
শাশুড়ীর কথায় ঘুরে চোখের পানি মুছে মুখে হাসি নিয়ে শুধালেন লতিফা শেখ,
"তিন বউমারই দেওয়া খানদানি সেবা পাচ্ছেন তো,তাই যেগুলোকে মজা বলছেন সেগুলোর কুফল সম্পর্কে ধারণা নেই"
এক জোগে হেসে উঠলেন তিন জা।আর তাদের শাশুড়ী যেন এতেই তৃপ্তি পেলেন।
#চলবে