#পর্ব_৩০
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"এই দেখ।গাড়িটা কি সুন্দর,তাই না!"
"হ্যাঁ রে!জোস তো।দাড়া একটা ছবি তুলি"
ট্রাফিক সিংনালে দাঁড়িয়ে থাকা রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা যেন সবার দৃষ্টি আকর্ষণ করতেই বিকেলের হালকা রোদে চিকচিক করছে।ইতোমধ্যে তো বেশ কয়েকজন ছবিও তুলেছে সেটার।তুলবেই বা না কেন?বাংলাদেশে এই গাড়ি একমাত্র ধানমন্ডির এলাকায়ই ঘুরতে দেখা যায়।প্রায়সই যেন চোখ ধাদিয়ে দেয় অনেক মানুষেরই।
আকর্ষণীয় তার গাঢ় সবুজ রঙ!যার গাম্ভীর্যতা যেন আশেপাশের গাড়িগুলোকে ফিকে করে দিয়ে নিজেকে রয়েল পদে ভূষিত করে প্রতিবারই।আর এই রয়েল গাড়িটি বাংলাদেশের মানুষদের চোখে পরার একমাত্র কারণ কারো একজনের খানদানি রাগ ও জেদ।আর এই মুহুর্তে যেন সেটা একদমই শিথিল হয়ে আছে।
ট্রাফিক সিংনালের ইশারায় মানুষের আগ্রহ নিয়ে তোলা ছবির তোয়াক্কা না করেই কালো পিস ঢালা রাস্তা খচিয়ে রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা ইঞ্জিনের গর্জন তুলে সামনে এগিয়ে চলল।
লুকিং গ্লাসের দিকে দেখে সামনের চুলগুলোতে হাত বুলিয়ে আরো একবার ফোনের দিকে নজর দিল সাহিত্য।যেখানে কল্পনার ম্যাসেজের ইনবক্সটা ওপেন করা।গুটি গুটি করে একটা ম্যাসেজ লিখা সেখানে,
"সাহিত্য ভাই,আপনি কখন আসবেন?আমি আপনার জন্য ফালুদা বানিয়েছি🥺"
সাহিত্যের উত্তর,
"হুম।রাস্তায়।আসছি"
সাহিত্যের উত্তরের ধরনের সাথে মনের অনুভুতির কোনো মিলই নেই। আসলে সাহিত্য ম্যাসেজ এ যেটা লিখতে চেয়েছিল,
"কি বলিস?😳সত্যি?আমার জন্য?😳মানে সিরিয়াসলি,শুধুই আমার জন্য?🥹দাড়া জানপাখি,আসছি আমি😭একটু ধৈর্য ধর।বেশি না,শুধু একটু!!😖শুধু রাস্তার বাতাস চিড়ে আসতে যতক্ষণ 😩সত্যি!একটু দাড়া সোনা!!😫"
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
অয়নকে অনেক বুঝিয়ে শুনিয়ে ঠিক করে অফিস থেকে বের হয়েছে সাহিত্য।আসলে,ব্যাপারটা এমন যে,বুঝিয়ে শুনিয়ে বলার নামে পুরো অফিস দাবড়িয়ে-পি'ট্টিয়ে অয়নকে ঠিক করেছে সাহিত্য।স্টাফদের সামনে আজ মান-সম্মানের আলু ভর্তা বানিয়েছে এই অয়নটা। অফিসে এই কান্ড হওয়ায় রবি তো মনে করেছিল আগামী এক সপ্তাহ তার ও অয়নের সাথে অফিসের স্টাফদেরও জীবন ত্যানা ত্যানা বানিয়ে রাখবে সাহিত্য।কিন্তু তাদের তুচ্ছ জীবন বাঁচাতেই যেন হঠাৎই সাহিত্যের ফোনে কল্পনার ম্যাসেজটা অহি নাজিল হওয়ার মতোই আসে।
সেটা দেখেই রবি ও অয়নকে চুমু দিয়ে (বি:দ্র:রাজকেও চুমু দিতে গিয়েছিল।কিন্তু সে পালিয়েছে) নাচতে নাচতেই অফিস থেকে বেড়িয়ে আসে সাহিত্য।আর এখন রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা আলোর বেগে ছুটিয়ে এনে শেখ ভিলায় ঢুকলো।
জোর পায়ে বাসায় ঢুকতেই দেখা মিললো তার জানপাখিটার।যে কিনা ড্রইং রুমে বসে টিভি দেখছে।সাহিত্যের জানপাখিটা কত বড় হয়ে গিয়েছে।এখন আগের মতো তার মগজ না ভেজে নিজ হাতে রান্না করেছে তার জন্য।
এ সপ্তাহে দুই শেখ আহমেদের অফিসের ট্রিপ একসাথে হয়ে যে কি সুবিধাটা হয়েছে!সাহিত্য তার জানপাখিটার পাশ কে'টে না গিয়ে শান্তি মতো কথা বলতে পারছে।
সাহিত্য ধীর পায়ে কল্পনার দিকে এগিয়ে গেল।মেয়েটা দুই পা সোফায় ভাজ করে উঠিয়ে বসে পুর্ণ মনোযোগ দিয়ে এক সাউথ ইন্ডিয়ান মুভি দেখছে।সাহিত্য নিঃশব্দে তার পেছনে দাঁড়িয়ে মাথা ঝুকিয়ে তার কানের কাছে মুখ নিয়ে গেল।প্রেয়সীর এতো কাছে এসে গলার স্বর যেন আপনাআপনিই পাল্টে গেল সাহিত্যের।হাস্কি স্বরে আলতো করে শুধালো,
"হেই সানশাইন"
পুর্ণ মনোযোগ দিয়ে টিভি দেখার দরুন সাহিত্যের হঠাৎ আগমন খেয়াল করেনি কল্পনা।অকস্মাৎ কানের কাছে এক হাস্কি কোমল কন্ঠ শুনে ভুত দেখার মতোই চমকে উঠল সে।পা জোড়া সোফার উপরে থাকায় হুড়মুড়িয়ে পড়ে যেতে লাগল।অমনি সাহিত্য তার ডান কাধটা চেপে ধরে আবার সোফায় ঠেকিয়ে দিল।একই কন্ঠে পর মুহূর্তেই শুধালো,
"ভীতুর ডিম,আমি"
চোখ খিচে বন্ধ করে রাখা কল্পনা তো সেটা ভালো করেই বুঝেছে।কারণ তীব্র ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের ঘ্রাণ পেতেই পেছনের ব্যক্তিকে না দেখেই ভালো করে চিনতে পেরেছে সে।
'এটাই সুযোগ।ডান দিকে ঘুরে সাহিত্য ভাইয়ের চোখগুলো দেখ কল্পনা।এতো বড় সুযোগ হাত ছাড়া করিস না।দেখ রে।দেখ রে গাধি,দেখ!'
নিজেকে মনে মনে এতো কথা বলে কি হবে,যদি শরীর ই না কথা শুনে।শ্বাসটা সেই লম্বা একটা টান দিয়ে ভেতরে নিয়ে বন্ধ করে ধরে রেখেছে ক্ষণিক আগেই।চোখ জোড়া বন্ধ রেখেই হুড়মুড়িয়ে সোফা থেকে উঠে সামনে দাঁড়ালো কল্পনা।মন থেকে পাওয়া এতো বড় সুযোগ,নেওয়ার সাহস আর হয়ে উঠল না তার।
পেছনে ঘুরে দূর থেকেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলল কল্পনা,
"আপনি এতো তাড়াতাড়ি কেমন করে এলেন?"
নজর ঘুরিয়ে কপালে ভাজ ফেলল সাহিত্য,
"ম্যাসেজ এ তো লিখেছিলামই,রাস্তায় আছি"
মনে হয় বেশ বুঝলো কল্পনা।ছোট করে বলল,
"ও"
কল্পনার দিকে ঘুরল সাহিত্য।ফুল ফোটা হাসি মুখে নিয়ে বলল,
"ফালুদা কোথায়?"
সাহিত্যের সেই চেহারা দেখে ফিক করে হেসে দিল কল্পনা,
"আমার হাতের ফালুদা আপনার এতো ভালো লাগে?"
প্রেয়সীর মোহনীয় হাসির দিকে চোখ রেখেই বিড়বিড় করে আওড়াল সাহিত্য,
"তোকে তো পুরাটাই ভালো লাগে"
"কি বললেন?"
ভড়কালো সাহিত্য,
"আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি"
সিড়ির দিকে আগাতে নিয়েই পেছনে না ঘুরে শুধালো সাহিত্য,
"আর হ্যাঁ,বাটিতে তুলিস।ড্রামে না"
নাক-মুখ কুচকে পর মুহূর্তেই হেসে উঠল কল্পনা।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
ডাইনিং টেবিলের দিকে দেখতেই চোখ আটকে গেল সাহিত্যের।টেবিলের এক পাশে এক বাটি সুন্দর করে পরিপাটি করে রাখা ফালুদা আর তার ঠিক সামনে বিপরীত পাশে দুই গালে হাত ঠেকিয়ে ফালুদায় দিকেই নজর রেখে কল্পনা বসে আছে।দৃশ্যটি দেখেই ভ্রু জোড়া নেতিয়ে নিচের ঠোঁট উল্টালো সাহিত্য।বিড়বিড় করে আওড়াল,
"এখনে এমন বউ বউ ফিল দিস না তো জান।কন্ট্রোল হয় না"
এগিয়ে এসে চেয়ার টেনে ফালুদার বাটির সামনে বসলো সাহিত্য।দুই হাতের তালু ঘষতে নিয়েই শুধালো,
"শুরু করব?"
"হ্যাঁ হ্যাঁ,আপনার জন্যই তো রেখেছি"
কল্পনার কথায় ফালুদার বাটিতে ঝাপিয়ে পড়ল সাহিত্য।বারে বারে চামুচ মুখে পুরতে নিয়েই বলল সে,
"হঠাৎ আমার জন্য ফালুদা কেন?"
সাহিত্যের কথায় ভড়কালো কল্পনা।কি বলবে এখন সে,যে সাহিত্যের চোখ দেখার জন্য রাতের সময় অনেক ছোট হয়ে যাবে তাই বিকেল থেকেই প্লান শুরু করেছে?সেটা বললে নির্ঘাত ফালুদার সাথে কল্পনার চোখ জোড়াও গপার-গপার করে খেয়ে যাবে সাহিত্য।
গলা পরিষ্কার করে বলল কল্পনা,
"তেমন কিছু নাআআ...বানিয়েছিলাম তো,তাই ভাবলাম গতবার যে চার বাটি ফালুদা খেয়েছিল তাকেও একটু ডাকা উচিত"
থমকে গেল সাহিত্য।মুখ ভর্তি ফালুদা নিয়েই কল্পনার দিকে দেখলো।কোনো রকম বলল,
"তুই না বলেছিলি 'আমার' জন্য ফালুদা বানিয়েছিস"
ভ্রু কুচকালো কল্পনা।মুখ ভর্তি ফালুদা নিয়ে সাহিত্যের বলা কথা বুঝতে একটু সময়ই নিল।বুঝতে পেরেই মুখে হালকা হাসি নিয়ে শুধালো,
"হ্যাঁ, তো সবার মধ্যে আপনিও তো পড়েন,তাই না?"
সাথে সাথে মাথা নিচু করে ফেলল সাহিত্য।
দেখেছে!দেখেছে!কল্পনা সাহিত্য ভাইয়ের চোখ দেখেছে!কিন্তু তেমন ভালো করে দেখতে পারলো না।তার আগেই মাথা নামিয়ে নিয়েছে সাহিত্য।তবে যতটুকু দেখেছে তাতে তো ব্রাউন কালার মনে হলো।আর টেবিলের এই দূরত্ব থেকে তেমন ভালো দেখা গেল না। ভালো করে না দেখায় কল্পনা একদম সিওর হতে পারছে না।
"সাহিত্য ভাই!!"
চেচিয়ে উঠল কল্পনা।সেটাতে আবার মাথা তুলল সাহিত্য।মনে যতটুকু সাহস সঞ্চয় করতে পারে সবটুকু দিয়ে এই প্রথম সাহিত্যের চোখ বরাবর দেখল কল্পনা।কিন্তু সাহিত্য তো চোখ সরু করে রেখেছে।তার সাথে ঘন চোখের পাপড়িগুলোও যেন কল্পনার সাথে ঘোর শত্রুতা করে রেখেছে।
'আরে সামনে থেকে সড় তোহ্!'
মনে মধ্যে কেন?মুখেও যদি কল্পনা সে কথা বলে তবুও ওই ঘন অক্ষি পল্লব ঠায় চোখ জোড়াকে আঁকড়ে ধরেই রাখবে।চোখ সরু রেখেই হালকা অভিমানী সুরে বলল সাহিত্য,
"কি হয়েছে?"
তার কন্ঠ শুনেই বুঝা যাচ্ছে সে কল্পনার আগের কথায় ভালোই মন খারাপ করেছে।কল্পনা বিশেষভাবে তারই জন্য ফালুদা বানিয়েছে সেটা শুনেই তো বেচারা নাচতে নাচতে চলে এলো। আর এই মেয়ে নাকি তাকে বাকি সবার কাতারে ফেলছে।
'হোয়াই কল্পনা,হোয়াই!!'
সাহিত্যের ডাকে হুশ ফিরল কল্পনার।সাথে সাথে নড়ে উঠে নজর ঘুরিয়ে নিল।জোরে জোরে শ্বাস নিতে লাগল সে।অতঃপর আবার ঘুরে মুখে হাসি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত কন্ঠে সাহিত্যের উত্তর দিতে লাগল,
"আমি তো মজা করছিলাম।আপনার জন্যই শুধু বানিয়েছি।বাসায় তেমন কেউ তো ফালুদা খায়ই না"
মৃদু হাসি ফুটল 'কল্পনার হাতে বানানো ফালুদা খোর' ব্যক্তির ঠোঁটে।আবার এক চামুচ ফালুদা মুখে দিয়ে শুধালো সাহিত্য,
"আমার সাথে অমন ফাজলামো করিস না তো।মেজাজ খারাপ হয়ে যায়"
মনের মধ্যে শুধালো কল্পনা,
'না সাহিত্য ভাই, আজকে কিছুতেই আপনার মেজাজ খারাপ করা যাবে না।না হলে আমি ফুস হয়ে যাব'
কিন্তু কল্পনা যে এখনো শ্বাস চলাচল ঠিক করতে পারছে না।মাত্র এই ক্ষণিকের চোখাচোখিই সহ্য হচ্ছে না তার? সামনের এই চোখ জোড়ার দিকে দেখে থাকা এতো অসম্ভব কেন কল্পনার জন্য! আছে কি সেগুলোতে?
এদিকে সাহিত্যের বাটি চেটেপুটে ফালুদা খাওয়া শেষ।দেখেই বুঝা যাচ্ছে একদম তৃপ্তি করে খেয়েছে।
"থ্যাংক ইউ জানপাখি,এখন আমার একটু কাজ আছে আমি রুমে গেলাম"
বলেই সাহিত্য চেয়ার থেকে উঠে দাড়ালো।কল্পনা আর কিছু বলতেই পাড়ল না।তার আগেই সাহিত্য চলে গেল।বলবেই বা কেমন করে?নিজের আগের ব্যতিব্যস্ত শ্বাস-প্রশ্বাস এবং তার সাথে সাহিত্য এতো সুন্দর করে যে থ্যাংক ইউ টা দিল!! শুনেই তো কল্পনা গলে গিয়েছে।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
বিকেলে যে কারণে ফালুদা বানিয়েছিল,কি হলো?এখন পর্যন্ত ভালো করে তো যেটা দেখার সেটা দেখতেই পেল না কল্পনা।রাত ১০টা বাজছে।কল্পনা এর মধ্যে কতই না সাহিত্যের সামনে-পেছনে ঘুরেছে।অথচ ফলাফল শূন্য।সাহিত্যের কাছে অনেক কয়েকবার ধরা খেতে গিয়েও বেঁচে গিয়েছে।আর এখন কল্পনা শেষ চেষ্টা করতেই কফি হাতে সাহিত্যের রুমের সামনে দাঁড়িয়ে।কেমন করে সাহিত্যের চোখ দেখবে সে জানে না।কিন্তু তবুও শেষ চেষ্টা তো করাই যায়।
রুমে ঢুকতেই চোখে পড়ল চিরপরিচিত সেই আগের সাহিত্য ভাইয়ের।যে সব সময় তার ক্যানভাসে ডুবে থাকতে ভালোবাসে।দুনিয়ার সব ঝড় উপেক্ষা করে নিজের মস্তিষ্কের কল্পনাকেই নিয়ে ভাবেন শুধু।কল্পনার খুব ইচ্ছে হয়,যে তার সাহিত্য ভাই মাঝে মাঝে নিজের মস্তিষ্কের কল্পনা সাইডে রেখে তার সামনের কল্পনাটাকেও নিয়ে একটু ভাবুক।কিন্তু সেটা যে অসম্ভব!সাহিত্য ভাই তার থেকে বয়সে কত বড় সেদিকে কি খেয়াল আছে কল্পনার?তার উপর দুই শেখ আহমেদ তো আছেই।তারও উপর যেটা,সেটা হলো সাহিত্য ভাই তো কল্পনাকে আদর করেন।সেটা অবশ্যই বোনের নজরে।ছোট থেকেই যেহেতু সাহিত্যের কোলে-পিঠে করে মানুষ হয়েছে সে।ওই দিক দিয়ে ভাবলে কখনো কি ওই আলাদা দিকটা ভাবা সম্ভব? কল্পনার মতে তো কখনোই সম্ভব না।
কল্পনার ভাবনার মাঝে ছেদ তৈরি করে সাহিত্য ক্যানভাসের দিকে চোখ রেখেই শুধালো,
"কি ব্যাপার?তুই এতো রাতে আমার রুমে কেন?"
হালকা ভড়কালো কল্পনা।সাহিত্যের প্রশ্ন সম্পুর্ণ উপেক্ষা করে ক্যানভাসের পাশে দাঁড়িয়ে বলল,
"কি আঁকছেন সাহিত্য ভাই?"
এবার সাহিত্য ভড়কালো,
"আ-আঁকছি কিছু একটা"
কফির মগটা টেবিলে রেখে ক্যানভাসে মাথা ঢুকিয়ে দিল কল্পনা।কিন্তু সেটার আগা মাথা কিছুই বুঝলো না।দেখে তো মনে হচ্ছে এমনিতেই কিছু রঙ ছড়িয়ে রেখেছে।ক্যানভাসের দিকে পুর্ণ মনোযোগ রেখেই থুতনিতে এক আঙ্গুল দিয়ে শুধালো কল্পনা,
"কি ভাজাং-ভুজুং আঁকছেন?"
সাহিত্য কল্পনার নাকের ডগায় এক শুভ্রা রঙা পেইন্ট লাগিয়ে দিতেই ক্যানভাস থেকে অনেকটা পিছিয়ে গেল কল্পনা।সাহিত্য তার পাশে দেখে বলল,
"আজ একটা আর্টিস্টিক লজিক শিখে রাখ।কোনো আর্ট চলাকালীন সময়ে দেখতে হয় না।এতে পরবর্তীর সৌন্দর্যটা চোখে তেমন ধরবে না।কারণ এখন এমন ভাজাং-ভুজুং দেখছিস সে জন্য"
মনোযোগ দিয়েই শুনলো কল্পনা,এবং বুঝলোও বটে।পাশে রাখা টিস্যু বক্স থেকে টিস্যু নিয়ে নাকের পেইন্ট মুছতে নিয়েই শুধালো,
"তাহলে এটা শেষ হলে আমাকে দেখাইয়েন"
মৃদু হাসল সাহিত্য।যেন এই পেইন্টিং এর ব্যাপারে কল্পনা ভুলে গেলেও সাহিত্যের মনে থাকবে।কারণটা হয়তো বর্তমানে ঠোঁটে হাসি ধরে রাখা এই সুপুরুষ ছাড়া কেউই জানে না।শান্ত স্বরে শুধালো সাহিত্য,
"এটা শেষ হতে সময় লাগবে"
আগ্রহ নিয়ে জিজ্ঞেস করল কল্পনা,
"কেন?"
ক্যানভাসে রঙ তুলি ছোঁয়াতে নিয়েই আবার শান্ত স্বরে শুধালো সাহিত্য,
"কারণ আমার পছন্দের কোনো কিছু আর্ট করতে গেলে অনেক হাত কাপে আমার।আর আমি চাই না আমার পেইন্টিং টা নষ্ট হোক।বিশেষ করে এই টা"
"কি এমন স্পেশাল আছে এটাতে?"
মুচকি হাসলো সাহিত্য,
"এখনে বলে দিলে পরে দেখে মজা পাবি না।ধৈর্য ধরে রাখ একটু"
ক্ষণিক নিরবতার পর মৃদু স্বরে বলল কল্পনা,
"সমস্যা নেই।আপনার এই চঞ্চল কল্পনার এখন অনেক ধৈর্য হয়েছে।অপেক্ষা করায় আমি অভ্যস্ত এখন"
মুখে হাসি নিয়ে যে কল্পনা মনের কঠিন কথা বলল সাহিত্য সেটা বুঝতে অক্ষম হলো না।কিন্তু তার বলার তো কিছুই নেই।এটা যে আসলেই সম্পুর্ণ সাহিত্যের রাগ-জেদের কারণে হয়েছে।প্রেয়সীকে এখন মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কপালে কয়েকটা চুমু দিয়েও তো সান্ত্বনা দেওয়ার অধিকারটুকু অর্জন করেনি সাহিত্য।আর এক পুর্ণ অধিকার ছাড়া সাহিত্য তার প্রেয়সীকে কখনোই সেই ছোঁয়া দেবে না।শত সুযোগ পেলেও না।এখন শুধু শাসন আর হালকা আদরেই চালাতে হবে।
হাতের রং তুলি সেই কতক্ষণ আগেই থেমে গিয়েছে।সেটা ক্যানভাসের সামনের স্ট্যান্ডে রেখে পেছনে ঘুরল সাহিত্য।দেখা মিলল মুখে হাসির মুখোশ ধরে রাখা এক কঠোর অষ্টাদশীর।সাহিত্য কি তার এই কোমল জানপাখিটাকে এতোই শক্ত বানিয়ে দিয়েছে?নিজের আবেগকে কত দক্ষতার সাথেই না লুকাতে ব্যস্ত সাহিত্যের জানপাখিটা!কিন্তু সাহিত্যের চোখে যে কল্পনা স্বচ্ছ পানির মতো,সেটা কি কল্পনা জানে?সাহিত্যের সামনে কিছুই লুকানোর সাধ্য নেই তার।এমনকি কল্পনাকে কল্পনার থেকেও বেশি চিনে সাহিত্য।সে ধারণাও হয়তো নেই কল্পনার।যেমন আজ বিকেল থেকে এবং এই মুহুর্তেও সাহিত্যের চোখের দিকে আদালতের জুরি মেমবারদের মতোই দেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে কল্পনা।সাহিত্য তো সন্ধ্যার দিকে চমকেই গিয়েছিল,যে হঠাৎ তার প্রেয়সী এতো চোখের ভাষা বোঝার চেষ্টা করছে কেন?গভীর প্রেমে পড়ল নাকি তার প্রেয়সীটা?কিন্তু না,সেই চাহনি অন্য কিছুই বোঝাচ্ছিল।যেন কিছু খুঁজছে কল্পনা।
সাহিত্য ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি নিয়েই বড় বড় পা ফেলে একদম কল্পনার সামনে গিয়ে দাড়ালো।এতে বেশ ভড়কালো কল্পনা।পিছাতেও নিয়েছিল মেয়েটা। কিন্ত তার এক হাতের বাহু চেপে ধরল সাহিত্য।তাতে হালকা কেপেই উঠল অষ্টাদশী।কাইকুই করে আবার সাহিত্যের দিকে ঘুরল সে।ভ্রু নাচালো সাহিত্য।সেটা দেখে বড় এক ঢোক গিলল কল্পনা।হাসি কোনো মতে দাবিয়ে শান্ত ও হালকা গম্ভীর কন্ঠে শুধালো সাহিত্য ,
"কি সমস্যা?"
কাইকুই করে উঠল কল্পনা,
"আমি আবার কি করলাম?অপেক্ষাই তো করতে চেয়েছি"
কল্পনাকে শুধরে দিল সাহিত্য,
"ওটা না।বিকেল থেকে কি চলছে?আমাকে গয়েন্দার নজরে কেন দেখা হচ্ছে শুনি?"
আবার কেপে উঠল কল্পনা।সেটা বুঝতে পেরে সাহিত্য বের হয়ে আসা হাসি গিলে খেল।কল্পনা কাপা গলায় শুধালো,
"ক-ক-কই আবার আমি আপনাকে গোয়েন্দার নজরে দেখছি?"
এক ভ্রু উঁচিয়ে বলল সাহিত্য,
"তুই আমাকে বুঝ দিচ্ছিস?"
মাথা জোরে ডানে-বামে ঝাকালো কল্পনা,
"না না। আপনার মতো জ্ঞানী ব্যক্তিকে আমি বুঝ দেওয়ার কে?"
আবার গম্ভীর কন্ঠে বলল সাহিত্য,
"তো,কি চলছে এখন বল"
"আমার জানা মতে তো ফগ চলতো।কিন্তু ইদানিং মনে হয় ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার চলছে..."
নিজের করা বোকামি বুঝতে পেরেই কথা শেষে দুই হাত দিয়ে ঠোঁট জোড়া শক্ত করে চেপে ধরল কল্পনা।
মাথা নিচু করে ফেললো সাহিত্য।সেটার সাথে হালকা হাসির প্রভাব সাহিত্যের কন্ঠে পড়ল,
"গা'ধা,আমি তোর গোয়েন্দা চোখের কথা বলেছি,আমার পারফিউমের ভেরিয়েন্ট আইডেন্টিফাই করতে বলিনি"
লজ্জায় তো কল্পনার এখন ম'রে যেতে ইচ্ছা করছে।এই মুখটাতে লাগাম টানে না কেন সে!!!
সাহিত্য গলা পরিষ্কার করে মাথা তুলে আবার গম্ভীর মুখশ্রী ফেরত নিয়ে এলো,
"মুখ খুলবি?"
শেষ।এ জীবন আর কল্পনার উপর রহম করল না।আজই শেষ দিন হবে জানলে কল্পনা বাড়তি ৪রাকাত নফল নামাজটা অন্তত পড়ে নিতো।কিন্তু সেটাও তো ভাগ্যে জুটলো না।চোখ-মুখ কুচকে কল্পনা মুখ থেকে হাত সড়িয়ে থেমে থেমে বলতে লাগল,
"ওই...ব্যাপারটা...হলো যে....মানে..ওই বলছিলাম কি...মানে...ওই যে..."
কল্পনার এলোমেলো দৃষ্টি সাহিত্যের দিকে স্থির হতেই আরেক দফা ভড়কে গেল সে।সাহিত্য ভারী মুখশ্রী নিয়ে তার দিকে দেখে আছে।চোখ খিচে বন্ধ করে গড়্গড় করে বলে উঠল কল্পনা,
"আপনার চোখের রঙ যে আলাদা সেটা আমি আজকেই জানলাম আমি জানি না এটা আপনি জানলে নির্ঘাত আমাকে কাঁচা চিবিয়ে যেতেন তাই আপনার চোখের আড়ালে আপনার চোখ দেখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিলাম"
কল্পনার গড়্গড়ি থামার পর পরিবেশ এখন একদম নিস্তব্ধ।সাহিত্যের ভঙ্গিমা ঠাহর করতেই হালকা পিটপিট করে চোখ খুলতে লাগল কল্পনা।কিন্তু পুরো চোখ খোলার আগেই ঘাড়ের কাছে হ্যাচকা টাক অনুভব করল সে।আবার সাথে সাথে চোখ খিচে বন্ধ করে নিল।কিন্তু কিছুক্ষণ আগে যেই পারফিউমের বিবরণ দিচ্ছিল সেটা এখন পুরো দমে অনুভব করছে সে।ক্ষণিক বাদে এক শীতল হাস্কি কন্ঠ কল্পনার কানে বেজে উঠল,
"চোখ খুল"
মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,
"না।আপনি ভ'য় দেখাবেন,আমি জানি"
সময় নিয়ে আবার একই কন্ঠে বলল সাহিত্য,
"কিছু করব না।চোখগুলো খুল একটু"
সাহিত্যের শান্ত স্বর শুনেই এবার সাহস নিয়ে পিটপিট করে চোখ খুলল কল্পনা।চোখ খুলে যেটা দেখল সেটা যেন কল্পনারই কল্পনার বাইরে ছিল।
এক জোড়া নেশালো ডিপ হ্যাজেল,ঠিক হ্যাজেলও নয়।মহুয়া বেগম যেটা বলেছিলেন,মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া ঠিক সুক্ষ্ম দূরত্বে অবস্থান করছে কল্পনার ডিপ ব্রাউন রঙা চোখ জোড়ার থেকে।কল্পনার ধনুক বাঁকা ভ্রু জোড়া থেকে একদম আলাদা সামনের সরল আকার ভ্রু জোড়া।তাদেরই নিচে বাকানো সুন্দর ঘন অক্ষি পল্লবগুলোর মাঝে জ্বলজ্বল করছে সেই মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া।মাঝে সুক্ষ্ম কালো মণির চারপাশে ব্রাউন কালার এবং সেই ব্রাউন কালারের চারপাশ দিয়ে আরো সুক্ষ্ম এক রিং আকৃতির সবুজ রঙ ফুটে উঠেছে।দূর থেকে দেখলে আসলেই কেউ বুঝতে পারবে না যে এই চোখ জোড়া হ্যাজেল রঙা।এবার চোখের বাইরেও একটু নজর গেল কল্পনার।সাহিত্যের বাম চোখের শেষের কোণার নিচের দিকে হালকা দূরে একটা ছোট বাদামি রঙা তিল।সুক্ষ্ম দূরত্ব থেকে দেখে যেন সেটা আরো আকর্ষণীয় লাগছে।আবার চোখ জোড়ার দিকে নজর দিল কল্পনা।
অবশেষে স্মরণে এলো কল্পনার।এই রঙের চোখ এই প্রথম দেখছে না সে।আরো একবার দেখেছিল,এবং এর থেকেও সুক্ষ্ম দূরত্ব থেকে।যেটাকে দূরত্ব বলে বিবেচনাই করা হয় না।
সেদিনও রাত ছিল।কিন্তু ১০টার বদলে ঘড়ির কাটা ১১টার ঘরে।কিন্তু সাহিত্য ঠিক এভাবেই ক্যানভাসে ডুবে আর্ট করছিল।হাত লেগে একটা পেইন্ট ব্রাশ নিচে পরে যাওয়ায় ধীরে সুস্থেই সেটা তুলতে কোমড় বাকিয়ে হেলেছিল সাহিত্য।হঠাৎই ঝড়ের গতিতে সাহিত্যের চোখ উপেক্ষা করে দুটি ছোট হাত এসে সাহিত্যের দুই চিপের কাছে এক প্রকার থাবা মে'রেই মুখোমন্ডলটা আবদ্ধ করে নেয়,
"ভাইয়া দেখি দেখি,তোমার চোখে কি হয়েচে?"
বলেই তুলতুলে হাত জোড়ার অধিকারী চার বছরের বাচ্চা মেয়েটা নিজের ও সাহিত্যের মাঝে সমস্ত দূরত্ব ঘুচিয়ে কপালের সাথে কপাল এবং নাকের সাথে নাক ঠেকিয়ে দিল।অকস্মাৎ ঘটনায় ভড়কালো সাহিত্য।পা জোড়া আর স্থির রাখতে পারলো না।এপাশ-ওপাশ টলমল করতে লাগল।অমনি কল্পনা সাহিত্যকে টেনে আরো একটু হেলিয়ে নিজের কাছে নিল,
"উফ্,ভাইয়া।নোলিও না তোওও।দেত্তে দাও"
কল্পনার আদেশেও সাহিত্য টাল সামলাতে পারলো না।এতো লম্বা একটা ছেলেকে এতো পিদ্দি একটা মেয়ে নিচের দিকে টেনে ধরলে নিজেকে সামলাবেই বা কেমন করে?চেচিয়ে উঠল সাহিত্য,
"কল্পনা কি করছিস!ছাড় আমাকেএএ!"
"আমি এত্তা ইম্পুটেন(ইম্পর্টেন্ট) কাজ করচি।ছাড়া যাবে নাআআআ"
সাহিত্যের মতোই কল্পনাও চেচিয়ে উঠল।
এমন বেসালাম অবস্থায় নিজের চোখের জ্যোতি আর ঠিক রাখতে পারলো না ১৩ বছরের কিশোর।সাহিত্যের ট্যারা চোখ দেখে কল্পনা সাহিত্যকে আরো নিজের সাথে মিশিয়ে আবারো চেচিয়ে উঠল,
"আল্লাআআআ!ভাইয়াআআ!তুমি তাহলে আছোলে টেরাআআআ?"
তালি লাগা কান নিয়ে এবার সাহিত্য চোখ খিচে বন্ধ করে কল্পনার কোমড় ধরে হাওয়ায় তুলে সোজা হয়ে দাড়ালো।হুং'কার দিয়ে উঠল সাহিত্য,
"ওই বা'দর!ছাড় আমাকেএএ!লাগছে তোওও!"
"না না না! তুমি চোখ খুলোওও।তুমি টেরা হলেও আমি তোমার চোখ দেকবোওওও"
কল্পনার আধো ভালো আধো অস্ফুট স্বরে বলা কথা তীরের মতো লাগছে সাহিত্যের কানে।এবার সাহিত্য নিজের শরীরের জোর খাটিয়েই কল্পনা নামক চিপকু গামকে নিজের থেকে সড়িয়ে নিল।কল্পনার হাত দুটো সাহিত্যের নাগালের বাইরে যেতেই সাহিত্য তাকে নরম বিছানায় ছুড়ে মা'রল।সাহিত্য তার চঞ্চল চড়ুই পাখিটাকে ভালো করেই জানে।সাহিত্যের সেই ছুড়া কল্পনার কাছে কিছুই না।হলোও সেটা।বিছানার নাগাল পেয়ে নিজেকে সামলে নিয়ে লাফাতে লাগল নরম বিছানাটায়,সাথে সাহিত্যের দিকে ঘুরে ঘ্যানঘ্যানও করতে লাগল,
"কেন দেখতে দিলে নাআআআ!তোমার ভুতুর চোখ দেখবো আমিইইই!"
"এএএইই চুউউপ!"
সাহিত্যের এবারের হুং'কারে চুপসে গেল কল্পনা।ধপাস করে বিছানায় বসে পড়ে মাথা নিচু করে জামার বেল্ট হাতে মোচড়াতে লাগল।ওদিকে হুং'কার ছেড়ে সাহিত্যও চুপ হয়ে গিয়েছে।এমন হঠাৎ আক্রমণে বেচারার মাথা ভো ভো করে ঘুরছে।মাথা দুই হাত দিয়ে চেপে ধরে ডানে-বামে মাথা ঝাকালো সাহিত্য।কল্পনা সেদিকে একবার আড় চোখে দেখে আবার বিছানার দিকে নজর দিল।
নিজেকে একটু সংযত করে মেঝেতে বসে পড়ল সাহিত্য,
"এই মেয়ে।আমার দিকে দেখ"
সাহিত্যের গম্ভীর কন্ঠে আরো শিটিয়ে গেল কল্পনা।তবুও ধীরে ধীরে মাথা তুলল।আবার গম্ভীর কন্ঠে বলল সাহিত্য,
"রাত এখন ১১টা বাজে।কয়টা বাজে?"
মিনমিনিয়ে ছোট করে উত্তর দিল কল্পনা,
"এ গারোতা"
বুঝদারের মতো মাথা ঝাকালো সাহিত্য,
"হ্যাঁ। এ গারোতা।এখন আপনার কোথায় থাকার কথা ছিল?"
আবার মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,
"মায়ের কাছে"
"হ্যাঁ,মায়ের কাছে।মায়ের কাছে থেকে কি করার কথা ছিল?"
"ধুমানোর" (ঘুমানোর)
আবার বুঝদারের মতো মাথা ঝাকালো সাহিত্য,
"হ্যাঁ।ধুমানোর কথা ছিল।ভেরি গুড"
সাহিত্য এবার চেচিয়ে উঠল,
"তো তুই না ধুমিয়ে আমার রুমে কি করছিস!"
সাহিত্যের উচু গলায় কল্পনার কিছুই হলো না।উল্টো খুশি মনে বিছানায় সটান দাঁড়িয়ে বলতে লাগল,
"মাকে ধুম পারাতে পারাতে হতাত!(হঠাৎ) মনে পড়ল যে তোমার চোখগুলোতে যে দুপুরে ঘুতা দিতে গিয়েছিলাম,তখন দেখেছিলাম তোমার চোখের কালার থিক(ঠিক) নেই।কেমন যেন।আমি তো হতাত ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম যে তুমি আবার পেইন্টিং করতে করতে পা'গল হয়ে পেইন্টই চোখে ধুতিয়ে(ঢুকিয়ে) দিয়েছো নাকি!তাই সেটা দেখতেই এলাম"
কথা শেষে মুখে বিশ্ব জয়ের হাসি নিয়ে দুই হাত পেছনে বেধে হালকা দুলতে লাগল কল্পনা।
সাহিত্য মাথায় হাত চাপড়ালো।পর মুহুর্তেই কিছু স্মরণে আসতে আবার চেচিয়ে উঠল সাহিত্য,
"তুই কেন মেঝো চাচীকে ধুম...মানে ঘুম পারাবি?মেঝো চাচীর তোকে ঘুম পারানোর কথা ছিল!"
কল্পনা আগের ন্যায় দুলতে নিয়েই শুধালো,
"মা ই আমাকে ধুমাতে নিয়ে গিয়েছিল।কিন্তু মা নিজেই ধুমিয়ে গিয়েছে"
আবার সাহিত্য মাথায় হাত চাপড়ালো।এই মেয়েটাকে সামলানো কারো সাধ্যে নেই।
কল্পনা আদুরে গলায় মিনমিনিয়ে শুধালো,
"ওওও ভাইয়াআআ।তোমার চোখগুলোতে কোন পেইন্ট দিয়েছো,আমাকেও একটু দিয়ে দাও না"
মাথা তুলে ভারী শ্বাস ফেলল সাহিত্য।শান্ত স্বরে শুধালো সে,
"কল্পনা। আমি চোখে কোনো পেইন্ট দেইনি।আমার চোখ এমনই"
থুতনিতে এক আঙ্গুল রেখে ঘাড় কাত করল কল্পনা,
"অ্য্য্যাাাা।সেটা আবার কেমন করে হবে?আমি বাসার সবার চোখে ঘুতা দেওয়ার সময় দেখেছি,সবার চোখ তো এক কালারেরই।তো তোমারটা কেন এতো সুন্দর হবে?আমি মানবো না!আমিও নিবো অমন চোখের কালার!"
শেষের কথাগুলো হালকা চেচিয়েই বলল কল্পনা।
সাহিত্য আবার ভারী শ্বাস ফেলল।মন তো চাচ্ছে আসলেই কল্পনার চোখে পেইন্ট ধুতিয়ে দিক।নিজের রাগকে কোনো মতে দাবিয়ে রেখে বলল সাহিত্য,
"আমারটা আলাদা হওয়ার কারণ আছে"
একদম চুপ হয়ে গেল কল্পনা।আগ্রহ নিয়ে শুধালো,
"কি কারণ?"
মুখশ্রী গম্ভীর রেখেই বলল সাহিত্য,
"তোর মতো একটা ত্যাদোরকে সহ্য করার ক্ষমতা রাখি তো,তাই আল্লাহ মাবুদ আমার উপর দয়া দেখিয়ে এই চোখের কালার গিফট করেছে"
ক্ষণিক সময় একদম চুপ রইল কল্পনা।অতঃপর আবার লাফিয়ে উঠে বলল,
"তার মানে আমিও যদি আমাকে সহ্য করি তাহলে আমিও ওই চোখের কালার গিফট পাবো?"
আজ মনে হয় সাহিত্যের মাথায় হাত চাপড়াতে নিয়ে মগজটাই বের হয়ে যাবে।মাথা-মুখ থেকে হাত সড়িয়ে সাহিত্য আবার কল্পনার দিকে নজর দিল।মেয়েটার মুখে ফুল ফোটা হাসি থৈ থৈ করছে।রাগটা যেন দপ করে নিভে গেল সাহিত্যের।এই মেয়েটা তাকে এতো জ্বালাতোন করে,তবুও কেন তিল পরিমাণের রাগটাও দেখাতে ইচ্ছা করে না সাহিত্যের?রাগ উঠলেই ভেতর থেকে কেউ বলে উঠে,
'সাহিত্য।ওটা কল্পনা,তোর জানপাখি।তুই বোকলে ও কাঁদবে।ও কাঁদলে তুই কি সহ্য করতে পারবি?পারবি না।তাহলে রাগটা কমা '
সাহিত্যের খুব করে একটা ইচ্ছা আছে।আর সেটা হলো,ভেতরের ওই কন্ঠটাকে একদিন বের করে সেই রকমের ধোলাই দেবে।সাহস কত বড়,সাহিত্যের উপর কথা বলে!!কিন্তু সেই দিন কি আদৌ আসবে?মনে তো হয় না।
সাহিত্য মুখে হাসি নিয়ে ধীর পায়ে কল্পনার দিকে এগিয়ে এলো।এবার সে নিজেই কল্পনার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকিয়ে শান্ত স্বরে শুধালো,
"সরি জানপাখি,আমি মি'থ্যা বলেছি।তোর মতো একটা পিওর হার্ডেড সোলকে প্রটেক্ট করার কারণে আল্লাহ আমাকে এটা গিফট করেছেন।কিন্তু তিনি তো আর এটা জানেন না যে তুই ই আমার জন্য একটা গিফট"
এবার ছোট্ট কল্পনা ড্যাব ড্যাব করে সাহিত্যের চোখের দিকে দেখতে লাগল।গাঢ় মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া তাদের সর্বোচ্চ আদরের নজরে কল্পনার দিকে দেখছে।
সেই চাহনি যেন বর্তমান সাহিত্যের চোখেও বিদ্যমান।যেন মনের সব কথা সাহিত্য কল্পনাকে তার এই গাঢ় মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া দিয়েই বলতে চাইছে।তবে সেদিনের মতো আজ কপালের সাথে কপাল ঠেকানো নেই।সুক্ষ্ম দূরত্ব বজায় রেখেই কল্পনার চোখের দিকে সেই চাহনিতে দেখে আছে মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া। সাহিত্যের চোখে ডুব দিয়ে অতীত ভাবতে নিয়ে কখন যে কল্পনা তার দুই হাত সাহিত্যের প্রস্তুত বুকে ঠেকিয়ে দিয়েছে সেদিকে কোনো খেয়ালই নেই কল্পনার।হুশ ফিরতেই সাহিত্যের ভারী নিঃশ্বাস অনুভব করল কল্পনা।সামনের এই নেশালো চোখের দিকে দেখে থাকা কল্পনার পক্ষে সম্ভব না।কারণ সেও তো এই মুহুর্তে ভারী শ্বাস নিতে ব্যস্ত।চেয়েও যেন স্থির করতে পারছে না শ্বাস-প্রশ্বাস এর গতি।নজর ঘুরিয়ে নিয়ে মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,
"হয়েছে দেখা"
"কিন্তু আমার যে হয়নি"
কন্ঠটা যেন পরিচিত ঠেকলো না কল্পনার কাছে।সেটা কি আসলেই সাহিত্য ভাইয়ের কন্ঠ ছিল?তাহলে এতো ভারী কেন ছিল সেটা?
কল্পনা আর কিছু ভাবতেই পারলো না।তার আগেই সাহিত্য তাকে ছেড়ে দিয়ে সটান উল্টো ঘুরে ক্যানভাসের দিকে চলে গেল।সাহিত্যের হঠাৎ এমন আচরণে ভড়কালো কল্পনা।সেকেন্ডও পেরোলো না কথাটুকু বলেছে সাহিত্য।আর পর মুহূর্তেই যেন তার ঠিক উল্টো আচরণ করছে।কি হলো বুঝার জন্য মাথা চুলকাতে লাগল কল্পনা।নিজের ভারী শ্বাসের কথা যেন একপ্রকার ভুলেই গেল মেয়েটার।কিন্তু এদিকে যে সাহিত্যের শ্বাস ক্ষণে ক্ষণে আরো ভারী হয়ে আসছে।কিছুক্ষণ আগেই নিজেকে কত বুঝ দিচ্ছিল কল্পনার থেকে দূরে থাকার জন্য।আর পর মুহূর্তেই এখন সব ভুলে বসেছে?
"আপনি কি রাগ করেছেন সাহিত্য ভাই?"
প্রেয়সীর আদুরে গলায় যেন আরো দুর্বল হয়ে পড়ল সাহিত্য। পেছনে না ঘুরে চোখ-মুখ খিচে বন্ধ করে নিল।
সাহিত্যের কোনো প্রতিক্রিয়া না দেখে আবার শুধালো কল্পনা,
"আসলে...সরি....কিন্তু সেই ছোট থাকতে একবার আপনার চোখ দেখেছিলাম।তারপর থেকে তো আর তেমন করে কাছ থেকে দেখা হয়নি।তাই ভুলে গিয়েছিলাম......কিন্তু এবার আর ভুলবো না,প্রমিস!"
শুরুর কথাগুলো মিনমিনিয়ে বললেও শেষের কথাটা বলার সময় কন্ঠনালি চিমটি কে'টে গলা উঁচিয়েই বলল কল্পনা।ক্ষণিক মুহুর্ত সাহিত্য সেভাবেই দাঁড়িয়ে রইল।অতঃপর ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে কল্পনার দিকে দেখলো।সামনের সেই নেশালো চোখ যুক্ত চেহারা পড়তে প্রতিবারের মতোই ব্যর্থ হলো কল্পনা।কিছুতেই যেন ঠাহর করতে পারলো না সাহিত্যের সেই অনুভুতির ধরন।সময় নিয়ে ভারী কন্ঠেই শুধালো সাহিত্য,
"কল্পনা......অঘটন কিছু ঘটলে ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদিস না,প্লিজ"
সাহিত্যের এমন হঠাৎ করে অদ্ভুত এক কথা শুনে কেপে উঠল কল্পনা।মানে কি? সাহিত্য ভাই কীসের অঘটনের কথা বলছেন?আর কেনই বা বলছেন?মগজে ধার দিতে লাগল কল্পনা।পর মুহুর্তেই যেন কোনো কারণ খুঁজে পেল সে।নিশ্চয়ই কল্পনা যে সাহিত্য ভাইয়ের চোখের রঙ ভুলে গিয়েছে সেটার রাগেই এ কথা বলছে।বড় এক ঢোক গিলল কল্পনা।আয়-হায়,সাহিত্য ভাই কি কল্পনার উপর এতোই রাগ করেছেন যে অঘটন ঘটিয়ে জিন্দা মাটিতে পুতে ফেলার হুমকি দিচ্ছেন?নিজের কাল্পনিক ভাবনায় শিটিয়ে গেল কল্পনা।মিনমিনিয়ে শুধালো,
"সরি বললাম তো।এতো রাগ হওয়ার কি আছে?মানুষ মাত্রই ভুল।আমি কি ভুল করতে পারি না?পারি তো।তাহলে এতো রাগ কেন করছেন?"
প্রেয়সীর নরম গলার প্রত্যেকটা কথায় যেন হাটু ভেঙে পড়ে যাওয়ার উপক্রম হচ্ছে সাহিত্যের।নিজের উপর নিয়ন্ত্রণটা ক্ষণে ক্ষণে কমে আসছে তার।ঘাড়টা আরো একটু পেছনের দিকে নিচু করে হাত দিয়ে মুখ ঢেকে ধরল সাহিত্য।অতঃপর ভারী হাস্কি গম্ভীর স্বরে বলল,
"বাইরে যা এখন"
সাহিত্যের শক্ত গলায় আবারো ভড়কালো কল্পনা।সাহিত্য ভাইকে কি এতোটাই খারাপ লেগেছে?ধীর পায়ে সাহিত্যের দিকে আগাতে নিয়ে শুধালো কল্পনা,
"সত্যি বলছি আর ভুলবো না।সরি,রাগ করিয়েন না প্লিজ"
"জানপাখি প্লিজ এখন আমার কাছে আসিস না"
হাত দিয়ে মুখ ঢাকা অবস্থায়ই কন্ঠ আগের ন্যায় গম্ভীর করে কথাটা বলল সাহিত্য।নিজেকে এই মুহুর্তে কোনো মতে দমিয়ে রেখেছে সে।কিন্তু তার প্রেয়সী যেন বুঝতেই চাইছে না।আরো আকর্ষণ করে যাচ্ছে সাহিত্যকে।
থেমে গেল কল্পনা।সাহিত্য ভাই আসলেই অনেক রাগ করেছেন।নাহলে কখনোই কল্পনার সাথে এতো গম্ভীর কন্ঠে কথা বলতেন না।সাহিত্য সোজা হয়ে আবার ক্যানভাসের দিকে ঘুরতেই কল্পনা মাথা নিচু করে নিল।সাহিত্য কল্পনার কারণে মন খারাপ করেছে সেটা ভাবতেই যেন কেমন লাগছে কল্পনার।আর কিছু না বলেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেল সে।
প্রেয়সীর যাওয়ার পানে এক নজর দেখে মেঝেতে বসে পড়ে মাথার চুল টানতে লাগল সাহিত্য।কল্পনার থেকে এই দূরত্ব যেন অসহনীয় হয়ে উঠেছে সাহিত্যের কাছে।প্রতিবারই নিজের সীমা ভুলে বসে প্রেয়সীর প্রেমে পা'গল প্রায় এই পুরুষটি।যার দরুন কল্পনাকেও বেশি কাছে আসতে দিতে পারছে না।এতো বছর পর প্রেয়সীর ভালোবাসা এত গভীরভাবে গ্রহণ করে যেন নিজের জন্যই বিপদ টেনেছে সাহিত্য।কল্পনাকে না কাঁদানোর জন্যই নাকি কল্পনাকে কাঁদাতে হচ্ছে।ভেবেই ভেতরটা ফেটে যাচ্ছে সাহিত্যের।
#চলবে