#পর্ব_৩২
গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি
#লেখিকা_রশনি_করিম
[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"হাত কা'টতে চেয়েছে"
প্রীতি কেবলই হাতের পানির বোতলটা মুখে লাগিয়েছিল।অমনি কল্পনার এহেন কথায় ফোয়ারার মতো মুখের পানি সব উগরে বের হয়ে এলো তার।যার ফল স্বরূপ প্রীতির সামনে দিয়ে যেতে থাকা তোহেল এর উপর দেখা দিল বিনা বাদলের বৃষ্টি।তোহেলের এমন অবস্থা দেখে তোহেল সহ উপস্থিত দুই নারীও যেন পুরো আহাম্মক।কিন্তু তোহেল তেমন ভড়কালো না।বেচারা মুখের পানিটুকু মুছে প্রীতির দিকে দেখল,
"হ্যাঁ রে প্রীতি,না হয় একটু শুনেছিস যে আজকে আমি গোসল করিনি।তাই বলে এমন করে গোসল করাবি?"
এক হাত দিয়ে কান চিমটি কাটল প্রীতি,
"সরি রে।ভুলে হয়ে গিয়েছে"
বেচারা তোহেলের হতাশার নিশ্বাস ফেলা ছাড়া আর কিছু বাকি রইল না।
তোহেল স্থান ত্যাগ করতেই প্রীতি হুড়োমুড়িয়ে কল্পনার দিকে দেখলো,
"এখনে কি বললি তুই?"
কল্পনার কন্ঠ আগের ন্যায় চিন্তায় মিশ্রিত।কিন্তু প্রথমবারে শান্ত স্বরে বললেও এবার যেন দাঁত চিবিয়েই শুধালো,
"বললাম যে হাত কা'টতে চেয়েছে!তিন দিন আগে সাহিত্য ভাই আমার কাছে এসে রাতুলের ব্যাপারে সব জেনে নিয়ে গিয়েছে।সাথে ওয়ার্নিং দেওয়ার ধাচে বলেছে 'হান্টিং এ্যাডালাইন পড়িস নি? হাত কেটে মেয়ের বাসায় মেইল করেছিল। আমরা তো একই বাসায় থাকি, আমি তোর রুমে মেইল করতাম' "
শেষের কথাটা কল্পনা সাহিত্যের মুখ ভেংচিয়েই বলল।যেন সে প্রীতিকে বুঝাতে পারে যে সেই কথাটা বলার সময় সাহিত্যকে কতটা ভয়ংকর লাগছিল।কল্পনার মুখে একই বাক্যের পুনরাবৃত্তি শুনে বোতলটা কাপা হাতেই পাশে রাখল প্রীতি।পর মুহূর্তেই লম্বা এক ঢোক গিলল।সাহিত্যের সাথে প্রীতির কথা বলার এক সপ্তাহের মতো হয়ে যাচ্ছে।সেদিন তো খুব বলছিল যে কল্পনা যেন না জানে।আর এদিকে নিজেই কল্পনাকে ওয়ার্নিং বার্তা দিয়ে বেড়াচ্ছে?প্রীতি তো ভেবেছিল রাতুলকে ভালো মতো ধোলাই দেবে।কিন্তু সোজা হাত কাটার কথা!ভাগ্য ভালো যে প্রীতি রাতুলকে মার খাইয়ে নেওয়ার জন্য আলাদাভাবে বানিয়ে কিছু বলেনি।নাহলে তো আজ কারো হাত না থাকার পেছনে প্রীতিরই হাত থাকতো।প্রীতির চিন্তার মাঝে আবার বলে উঠল কল্পনা,
"আরো কি বলেছে জানিস! 'আম ভেরি সিরিয়াস আবাউট ইউ কল্পনা'। ভাই এতো সিরিয়াস হতে কে বলেছে!না জানি কি হালত করবে ওই রাতুলটার!আর ওই রাতুলটার জন্য আমার সাহিত্য ভাই যদি জেলে যায় তখন!!"
কল্পনার কথার তেমন তোয়াক্কা করল না প্রীতি।সে তো নিজের ভাবনায় মসগুল।সাহিত্য ভাই কি আসলেই তেমন কিছু করতে পারে?অবশ্য সেদিন প্রীতির সামনে সাহিত্যের যেমন মুখোশ্রির দেখা মিলেছিল তাতে তো কোনো সন্দেহ নেই।প্রীতি কল্পনার কাধে হাত চাপড়াতে নিয়েই বলে উঠল,
"আরে টেনশন নিস না।সাহিত্য ভাই ওমন কিছু করলেও জেলে অন্তত যাবে না"
কল্পনা প্রীতির কথায় ভ্রু কুচকালো,
"তুই এতো সিওর কেমন করে?"
ঠোঁটের কোণ বাকিয়ে ডান হাতের তিন আঙ্গুল ঘষে শুধালো
প্রীতি,
"টেকা মামা টেকা।তোর সাহিত্য ভাইয়ের যে টেকা আছে তাতে এই দুনিয়ার সব বিষয়ে সিওর হওয়া সম্ভব"
চোখ উল্টালো কল্পনা।অতঃপর সেই আগের চিন্তার ধাচেই বলে উঠল,
"ও হো।নাহয় বুঝলাম জেলে যাবে না।তাই বলে ওমন করে কেউ বলে?ওনার কথা শুনে তো মনে হচ্ছিল রাতুলকে কাঁচায় চিবিয়ে যাবে!"
প্রীতি চিৎকার দিয়ে উঠল,
"কল্পনা!!"
প্রীতি কল্পনার নামটা চেচাতে নিয়েই হুড়মুড়িয়ে উঠে কল্পনার সামনে দাড়ালো।প্রীতির হঠাৎ এহেন কান্ডে বেশ ভড়কালো কল্পনা।ভড়কানো চেহারা নিয়েই বলে উঠল,
"কি!"
কল্পনার দিকে এক আঙ্গুল তাক করল প্রীতি,
"সাহিত্য ভাইয়া তোকে ওয়ার্নিং দিয়েছে!"
আবার ভ্রু জোড়া কুচকে গেল কল্পনার,
"মানে?সাহিত্য ভাই আমাকে কেন ওয়ার্নিং দিতে যাবে?"
কল্পনার দিকে এক আঙ্গুল তাক করে রেখেই হালকা দুলতে নিয়েই গান গেয়ে উঠল প্রীতি,
"চাই না মেয়ে তুমি অন্য কারো হও,
পাবে না কেউ তোমাকে,তুমি কারো নও"
প্রীতির কান্ডকারখানায় চোয়াল ঝুলে গেল কল্পনার।নিজেকে সংযত করে গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠল কল্পনা,
"প্রীতি তুই চুপ করবি?"
কে শোনে কার কথা?প্রীতি মনের মাধুরি মিশিয়ে গান গেয়ে যাচ্ছে।এবার প্রীতি কাধ দুলিয়ে হালকা নেচেই উঠল,
"তোমাকে ছাড়া আমি বুঝিনা কোনো কিছু যে আর,
পৃথিবী জেনে যাক,তুমি শুধু আ-মার! "
কল্পনা আকাশ পানে মুখ হা করে গরগরা করার ন্যায় গলা খাকাড়ি দিল।অতঃপর আবার প্রীতির দিকে চোখ ঘুরিয়ে চেচিয়ে উঠল,
"প্রীতি!!"
কল্পনার উচু গলায় তেমন কিছু হলো না প্রীতির।কিন্তু গান থামিয়ে হাসতে নিয়েই আবার আগের যায়গায় বসে পড়ল,
"গানের সাথে পুরো মিলে গিয়েছে ভাই!আমি বলছি তোকে!ভাইয়া তোকে ওয়ার্নিং-ই দিয়েছে!"
"আরে আমাকে কেন উনি ওয়ার্নিং দিতে যাবে?আমি আবার কি করলাম?"
কল্পনার মাথায় গাট্টা মেরে শুধালো প্রীতি,
"গাধি একটা তুই!সাহিত্য ভাইয়া তোকে অন্য কারো সাথে সহ্য করতে পারে না।সেটাই বলছি আমি"
এবার যেন কল্পনার পুরো মুখোশ্রি বদলে গেল।চেহারায় না কোনো হাসি,না কোনো চিন্তা।শান্ত স্বরেই বলে উঠল সে,
"তুই একটু বেশি বুঝছিস।অমন কিছুই না।আমার বেলায় সাহিত্য ভাই সেই ছোট থেকেই অমন"
প্রীতি পারছে না শুধু কল্পনাকে দুটো ঝাকি দিতে।এতো ক্লিয়ার একটা কথা না বুঝার কি আছে?চোখের সামনে সব পরিষ্কার,কিন্তু এই মেয়েটা যেন অবুঝের মতো করছে।আর সেদিন সাহিত্যের সাথে সরাসরি কথা বলে তো প্রীতি আরো শতভাগ নিশ্চিত যে সাহিত্য কল্পনাকে পছন্দ করে।নিজের উত্তেজনা দমিয়ে এবার প্রীতি কল্পনার দুই বাহু ধরে নিজের দিকে ঘুরালো,
"এই আমার দিকে দেখ।তুই সত্য করে বলতো যে তুই আসলেই বুঝিস না, নাকি না বুঝার ভান করছিস?"
মিনমিনিয়ে বলল কল্পনা,
"কি?"
হালকা রাগ উদয় হলো প্রীতির চেহারায়,
"এই ব্যাপারে"
বুঝলো কল্পনা,যে প্রীতি সাহিত্যের ব্যাপারেই বলছে।কল্পনা এবার গা ঝাড়া দিয়ে প্রীতির চোখে চোখ রাখলো,
"অমন কিছু হলেও বা কি!যেটা সম্ভব না সেটা নিয়ে চিন্তা করে কোনো লাভ আছে?"
"কেন সম্ভব না কল্পনা?"
"কারণ বড় বাবা আর বাবা কখনোই সেটা মেনে নেবে না!"
প্রীতির প্রশ্নের একদম পর মুহূর্তেই হালকা গলা উঁচিয়ে কথাটা বলে উঠল কল্পনা।কল্পনার এবারের কথায় যেন প্রীতি একটু চুপসে গেল।ক্ষণিক সময় বাদে শান্ত স্বরে কল্পনা আবার বলল,
"তোর কি মনে হয়,বাড়ির এমন অবস্থায় সেটা হওয়া সম্ভব?আমি তোকে আগেও বলেছি।আমার আর সাহিত্য ভাইয়ের বন্ধন যত শক্ত,বাবা আর বড় বাবার বন্ধন ততটাই নরম।আর আমি চাই না আমার এসব অহেতুক কারণে আবার কিছু হয়ে যাক।বড় বাবা আর বাবাকে একসাথে রাখতে হলে যদি আমাকে সারাজীবনের জন্য সাহিত্য ভাইয়ের থেকে দূরে থাকতে হয় আমি সেটাও করতে রাজি আছি"
মেকি হাসল প্রীতি,
"শেষের কথাটা আবার একটু বলতো"
গলায় যেন কাটা বিধলো কল্পনার।কিছু না বলে শুধু প্রীতির দিকে এক দৃষ্টিতে দেখে থাকলো মেয়েটা।
প্রীতি আবার হালকা হেসে বলে উঠল,
"যেই কথাটাই তুই দ্বিতীয়বার বলতে পারছিস না,সেটা তুই করবিই বা কেমন করে?আজ একটা কড়া কথা বলি তোকে?তুই তোর বাবা আর বড় বাবার পুরো কন্ট্রোলে চলে গিয়েছিস।তাদেরকে মিলানোটা যেন তোর একমাত্র লক্ষ্য হয়ে গিয়েছে।এমন কোনো পদক্ষেপে তুই পা বাড়াতেই ভয় পাস যেটা তাদের এই মিলনে বাধা দিতে পারে।এমন করে নিজেকে তুই তিলে তিলে শেষ করছিস কল্পনা।আর সেটার সাক্ষী আমি নিজেই"
প্রীতি যেন কল্পনার মনের এক কোণে দাবিয়ে রাখা কড়া সত্য কথাটাই আজ মুখে বলল।আসলেই তো।কল্পনা তো দূর-দূর পর্যন্ত নিজের জীবনের আর কোনো লক্ষ্যই দেখতে পারে না শুধু তার ছোট্ট পরিবারটাকে নিজ হাতে গুছিয়ে নেওয়া ছাড়া।দুই শেখ আহমেদ ঠিক হয়ে এলে সে কি করবে নিজেও হয়তো জানে না।নিজের জীবনকে যেন তুচ্ছ করে দিয়েছে তার এই পরিবারটার জন্য।সেটার মূল্য কি আদৌ পরিবারের কেউ বুঝবে?হয়তো না।কিন্তু কল্পনা তো সবাইকে আরো একবার হাসতে দেখবে,তাই না?তার প্রাণের দাদিটা আবার মন খুলে হাসবে।
মনের মধ্যে নিজের পরিবারের ভবিষ্যতের এক হাসি-খুশির ছবি আঁকতেই ঠোঁটে হাসি ফুটল কল্পনার।পর মুহূর্তেই প্রীতিকে একটা ঝাকুনি দিয়ে বলে উঠল কল্পনা,
"তুই একটু বেশিই বলছিস আমার মাআআ!ওমন কিছু না।আমি সাহিত্য ভাইকে সেই নজরে কখনো দেখিইনি।আর তুই আমার বান্ধুবির মুড থেকে এমন গার্জিয়ানের মুডে কবে যেতে শুরু করলি?"
কল্পনার মুখে এক কৃতিম হাসি দেখে ভারী শ্বাস ফেলল প্রীতি।এই মেয়েটা নিজের মনের অনুভূতি কেমন করে যে এতো চাপিয়ে রাখতে পারে জানা নেই প্রীতির।
প্রীতি এক আঙ্গুল নাড়িয়ে বলে উঠল,
"আ-আ-আ, কারেকশন।সাহিত্য ভাইয়ার প্রতি তোর ফিলিংস আছে।এই টপিক নিয়ে আমি আর কোনো কথা তোকে বলব না,যেটার জন্য তুই আমার কাছ থেকে তো বেঁচে গেলি।কিন্তু তুই নিজেই একদিন সেটা বুঝবি"
কল্পনা প্রীতির কথার মুখ ভেংচালো,
"খুব এসেছে আমার ভবিষ্যৎবাণী করা গুণী।চল এখন!এই রোদে আর কতক্ষণ বসে থাকবি?আমার গা জ্বলতে শুরু করেছে!বাসা যাবি না?"
কথাটা বলতে নিয়েই কল্পনা নিজের ও প্রীতির ব্যাগ দুটো হাতে নিয়ে উঠে দাড়ালো।সেটাতেও ক্ষান্ত হলো না।একদম হাটা শুরু করে দিল।প্রীতি কিছু মুহুর্ত দেখে থাকলো কল্পনার যাওয়ার পানে।কল্পনার সাদা কুর্তিটার পেছনটা এতক্ষণ দর্শনে আসছিল।কিন্তু হাত খোপাটা হালকা ঝাকুনিতে খুলে যেতেই এক রাশ কালো কেশ দিয়ে যেন ঢাকা পড়ল সেই কুর্তিখানার পেছনটা।যেমন করে কল্পনার মনের অনুভূতিরা ঢাকা পড়ে আছে।আর ভাবতে পাড়লো না প্রীতি। উঠে দাঁড়িয়ে কল্পনার দিকে আগাতে নিয়েই বলে উঠল,
"আরে থাম তো!এতো জোরে হাটছিস কেন?"
কল্পনার সাথে তাল মিলাতে নিয়ে যেন হাপিয়ে উঠল প্রীতি।ঝুলতে নিয়েই সোজা হয়ে দাড়ালো।কিন্তু কল্পনা হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ায় তার কাধে হাত রেখেই বলে উঠল সে,
"হলো তোর ম্যারাথন দৌড়?"
"সাহিত্য ভাই?"
'সাহিত্য ভাই'। এই নামটা শুনলেই এখন প্রীতি প্রায় প্রায় আতকে উঠে।অবশ্য সেই আতকে উঠাটা শুরু হয়েছে ক্ষণিক সময় আগে থেকেই।কিন্তু বর্তমানে আতকে উঠা ছাড়াও আরেক কাজ করল প্রীতি।আর সেটা হলো কল্পনার চোখের লক্ষ্য উদ্দেশ্য করে সেই দিকে নজর ফেলল।সেপাশে নজর ফেলার পরপরই ঠোঁট ও চোখ জোড়া কান্নার ভংগিমায় ভেঙে এলো।কারণ চোখ জোড়া সেদিকে ঘুরানোর আগ মুহুর্তে যেই যমের ভয় করেছিল সেই যমই দাঁড়িয়ে আছে।
বর্ষার এই আবহাওয়ায় যেমন হুট করেই আজ কড়া রোদের দেখা মিলেছে তেমনই হুট করেই যেন সেই বিখ্যাত রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনেরও দেখা মিলেছে।আজ গরমটা যেন একটু বেশিই পড়েছে।আর সেই গরমের রোদের মাঝে রয়েল গ্রিন অ্যাস্টন মার্টিনটা একরকম ঝলক তো দিচ্ছেই।তার সাথে সেই গাড়িতে হেলান দিয়ে থাকা সুদর্শন যুবকের নূরানী চেহারারও আবার তেজ কম নাকি!কি স্টাইল মেরে বাম হাতখানা পকেটে ঢুকিয়ে আরেক হাতের লম্বা আঙ্গুলগুলো দিয়ে ফোন স্ক্রোল করে যাচ্ছে।এই টাইকুন বিজনেসম্যানের কি অফিসে বসে বসে আর কাজ নেই,যে এখানে এসে দাড়িয়ে আছে?হঠাৎই ভড়কে উঠল প্রীতি।একবার সাহিত্যের দিকে তো একবার কল্পনার দিকে দেখতে লাগলো।কি যেন মনে করে কল্পনার হাত থেকে নিজের ব্যাগটা প্রাণপণে টানতে লাগলো সে।
কল্পনা তো সেই 'সাহিত্য ভাই?' বলার পরপরই নিরবতা পালন করছিল।কি সুন্দর গ্লো করছে তার সাহিত্য ভাইটা।পুরাই একটা হোয়াইট চকলেট।যেটা কল্পনার বেশ প্রিয় বললেই চলে।খেতে বেশ মজা লাগে কল্পনার।সাহিত্য ভাইকে না!হোয়াইট চকলেটের কথা চলছে এখানে!
আপাতত সামনের সেই হোয়াইট চকলেট থেকে তো নজর সড়ানোর কোনো ইচ্ছাই ছিল না কল্পনার।কিন্তু হঠাৎই প্রীতির টানাটানি যেন সব বিগড়ে দিল।অনেক ঝাকুনি অনুভব করছে কল্পনা।যার দরুন সাহিত্যের দিকে রাখা স্থির নজরটা দুলতে শুরু করেছে তার।বেশ বিরক্ত বোধ করল সে।প্রীতির দিকে ঘুরে তেতে উঠল,
"সমস্যা কি তোর?এমন করছিস কেন?"
প্রীতির টানাটানি এখনো থামেনি।সেই কার্য চালাতে নিয়েই বলল সে,
"আগে আমার ব্যাগটা দে"
"কি, সোনা আছে নাকি তোর ব্যাগে?"
কথাটা বলতে নিয়েই প্রীতির ব্যাগ থেকে নিজের হাতের বাধন খুলে দিল কল্পনা।এদিকে নিজের ব্যাগ বুকে জড়িয়ে ধরে হালকা পিছিয়ে গেল প্রীতি,
"ব্যাগে টিস্যু আর একটা খাতা ছাড়া কিছুই নেই।সমস্যা হলো যে ব্যাগ হাতে নিয়ে আছে"
প্রীতির কথায় কল্পনা আবার তেতে উঠল,
"কি বলতে চাচ্ছিস তুই!আমার মাঝে সমস্যা মানে!"
"সমস্যা তোর মাঝে না,তোর সাহিত্য ভাইয়ের মাঝে আছে।সে যদি দেখে তুই আমার ব্যাগ ঢোয়াচ্ছিস তাহলে আল্লাহ মাবুদ না করুক আমার কাধ দুটোই যদি গায়েব করে দেয়!!"
কল্পনা মাথায় হাত চাপড়ালো।অতঃপর বিরক্ত হয়েই বলে উঠল,
"তোর এমন অযৌক্তিক কথা বলা বন্ধ করবি?"
প্রীতি যেন তারপরেও চুপসে আছে।সাহিত্য ভাইয়ের আসল চেহারার দর্শন হয়েছে প্রীতির কিছুদিন আগে।তাই তো সবকিছুতেই সতর্ক থাকছে মেয়েটা।
"আয় তোকে সাহিত্য ভাইয়ের সাথে দেখা করাই"
কল্পনার প্রস্তাবে হালকা চিৎকারই দিয়ে উঠল প্রীতি,
"না!!"
সেই 'না' এ বেশ ভড়কালো কল্পনা।সাহিত্যের থেকে নজর ঘুরিয়ে আবার প্রীতির দিকে দেখল সে,
"ওমা কেন?কি হয়েছে?"
প্রীতি নিজেকে সতর্ক করে নিয়ে বলে উঠল,
"আরেএএ,তেমন কিছু না।আমার এখনে মনে পড়ল বাবা আমাকে তার চেম্বারে যেতে বলেছে আজকে।তুই তো জানিসই,বাবা আমাকে ডেইলি চেকাপের জন্য তার চেম্বারে প্রায়ই যেতে বলে।৪টা তো এখানেই বেজে গেল। আর দেরি করতে চাচ্ছি না"
ঘড়ির দিকে নজর রেখেই প্রীতি উল্টো দিকে ঘুরে হাটা দিল।কল্পনা আর কিছু বলার সুযোগই পেল না।প্রীতির বাবা একজন মেডিসিন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার।আর নিজের ব্যস্ততার কারণেই হয়তো একমাত্র মেয়েকে প্রতি সপ্তাহের হেলথ্ চেকাপের জন্য নিজের চেম্বারে যেতে বলেন।কিন্তু কল্পনার জানা মতে এ সপ্তাহে তো একবার গিয়েছিল প্রীতি।তাহলে আজ হঠাৎ কেন যাচ্ছে?কল্পনা আর বেশি ভাবতে গেল না।ঠোঁট উল্টিয়ে আবার সাহিত্যের দিকে মনোযোগ দিল।সেদিকে মনোযোগ দিতেই ভড়কে উঠল সে।সাহিত্য কল্পনার পাশেই দেখে আছে।কল্পনা তার পাশে দেখতেই ফোনসহ হাতটা উঠিয়ে কল্পনাকে ওয়েভ করল।ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি নিয়েই সাহিত্যের দিকে এগিয়ে গেল কল্পনা।পায়ের গতি কমাতে নিয়েই বলে উঠল,
"কি ব্যাপার? আপনি আজ হঠাৎ আমার ভার্সিটির সামনে যে?"
ফোনটা তো সেই কল্পনা সামনে আগাতে নেওয়ার সময়ই পকেটে ঢুকিয়েছিল সাহিত্য।ঠোঁটের হাসি বড় করে কল্পনার দুই হাত দিয়ে সামনে ঝুলিয়ে ধরে থাকা টোট ব্যাগিটার দিকে দেখল সে।বাম হাতটা পকেট থেকে বের করে কল্পনার ব্যাগটা হাতে নিতে নিয়েই বলে উঠল,
"অফিসে তেমন কোনো কাজ ছিল না।তাই ভাবলাম তোকে একটু লিফট তো দেওয়াই যায়।সেটা ভেবেই চলে এলাম"
ব্যাগটা নেওয়াতে কল্পনা সাহিত্যকে বাধা দিল না।সেটা পুরোপুরি সাহিত্যের হাতে না যেতেই সাহিত্যের দায়িত্বে দিয়ে দিল,
"তাই তো বলি,আজ সুর্যের এতো গরম বেশি কেন"
হাত দিয়ে নিজেকে বাতাস করতে নিয়েই আবার বলে উঠল কল্পনা,
"এদিকে এই গরমে আমার শরীর জ্বলছে।আর আপনি কিনা কালো শার্ট পড়ে আছেন?"
টনক নড়ল সাহিত্যের।হুড়মুড়িয়ে গাড়ির দরজা খুলে কল্পনাকে ঠেলে ভেতরে বসিয়ে দিতে নিয়ে বলে উঠল,
"কিহ!তোর গরম লাগছে?তো এতক্ষণ থেকে ওখানে দাড়িয়েছিলি কেন?"
কথা শেষ হতেই সাহিত্য প্যাসেঞ্জার সিটের দরজাটা লাগিয়ে দিল।সাহিত্যের এমন হঠাৎ কান্ডে কল্পনা পর মুহুর্তেই কিছু বুঝে উঠল না।কল্পনা বুঝে উঠতে উঠতেই সাহিত্য ড্রাইভিং সিটে এসে বসে পড়ল।কোনো সময় নষ্ট না করেই গাড়ির এসিটাও চালু করে দিল সে।পূর্বের ন্যায় আবার বলে উঠল,
"গরম লাগছিল তো এতক্ষণ সেখানে দাড় হয়ে আমাকে হাবার মতো দেখছিলি কেন?ইস্,গাল দুটোও কেমন লাল হয়ে গিয়েছে"
শেষের কথাটা বলতে নিয়েই নিজের দুই হাত দিয়ে কল্পনার গাল দুটো চেপে ধরল সাহিত্য।একদম পর মুহুর্তেই ভড়কে উঠল কল্পনা।কিন্তু গরম গালে সাহিত্যের শীতল হাতের ছোয়া পেতেই যেন আপনাআপনিই প্রশান্তিতে চোখ বুজে এলো তার।
আর এদিকে সাহিত্য চোখ বুজে রাখা কল্পনাকে ভালো করে পরখ করতে লাগলো ।গাল দুটো চেপে ধরায় চোখের নিচটা অনেকটা ফুলকো হয়ে আছে কল্পনার।টসটসে দুটো লাল টমেটো লাগছে দেখতে।সাহিত্যের ডায়েট চার্টে এই টমেটো দুটো যোগ করলে মন্দ হয় না।ফল স্বরূপ,লোভের ঠেলায় বাকি খাবার না খেয়ে শুধু এই কপোল জোড়াই খেত সে।সেটা ভাবতে নিয়েই ঠোঁটের হাসি প্রসারিত হওয়ার সাথে যেন চোখ জোড়াও নেশায় ভারী হয়ে এলো তার।ডান হাতের বৃদ্ধা আঙ্গুল দিয়ে কল্পনার গালে হালকা স্লাইড করতে লাগলো সে।
কপোল জোড়া একটু আরাম অনুভব করতেই তীব্র ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউমের উপস্থিতি টের পেল কল্পনা।সাধারণত তো সাহিত্য কাছে এলেই সেই মোহনীয় পারফিউমের সুবাস পায়।কিন্তু আজ যে কল্পনার চারিদিকেই ছড়িয়ে আছে সেই সুবাস।গাড়িতে যেন আর কোনো বাতাসের অস্তিত্বই নেই সেই ভ্যানিলা মিক্সড ল্যাভেন্ডার পারফিউম ছাড়া।সেই সুবাস বক্ষ গহ্বরে থাকা হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি বাড়িয়ে দেওয়া মাত্রই দাপাদাপি করে উঠল মেয়েটা।সাহিত্যের হাত নিজের গাল থেকে সড়াতে নিয়েই বলে উঠল,
"আরে না না!তেমন গরম ছিল না তো।আমার গাল এমনিতেই লাল হয়ে যায়"
গিয়ার লিভারের পেছনের যায়গায় হাতের কনুই ঠেকিয়ে কল্পনার দিকে হালকা ঝুকে এলো সাহিত্য।যার দরুন কল্পনাও হালকা পিছিয়ে গেল।তার সামনে জ্বলজ্বল করছে সাহিত্যের মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া।সেদিকে নজর রাখতেই ক্ষণিক আগে স্বাভাবিক হওয়া গাল দুটো আবার লাল হয়ে উঠল মেয়েটার।সেটা দেখে মুচকি হাসলো সাহিত্য।প্রেয়সীকে আর লজ্জা দিতে গেল না।তাই আর কথা না বাড়িয়ে গাড়ি স্টার্ট করল সে।সাহিত্য দূরে সড়ায় কল্পনা যেন হাপ ছেড়ে বাচঁল।আর ভালো করে অনুভবও করল নিজের লাল গরম কপোল জোড়া।তাই তো চোখ বুজে নিজের আদলখানা এসির সামনে ধরলো।সেটাতে হয়তো লজ্জায় রাঙা গাল দুটো একটু স্বাভাবিক হতে পারে।আর এপাশে প্রেয়সীর এমন কান্ড দেখে নিঃশব্দে হাসলো সাহিত্য।
এতক্ষণ পরে নিজেকে স্বাভাবিক করে কল্পনা গাড়ির ভেতরে মাথা ঘুরাতে লাগলো।আজ প্রথম এই গাড়ির ভেতরের দর্শন মিলছে তার।গাড়িটার বাহিরটা রয়েল গ্রিন নামক গাঢ় সবুজ রঙা হলেও ভেতরটা গাঢ় কালো রঙে আবৃত।গিয়ার লিভারের সামনেটায় ইলেকট্রনিক কত ডিভাইসই না লাগানো।কল্পনার নজর সেপাশে থাকা অবস্থাতেই সাহিত্য বলে উঠল,
"অ্যাস্টন মার্টিন,ডিক্রিজ দ্য টেমপারেচার"
সাথে সাথেই এক মেয়েলি কন্ঠ বলে উঠল,
"ডিক্রিজিং দ্য টেমপারেচার"
সাহিত্যের দিকে আড় নজরে দেখলো কল্পনা।কল্পনার যে এখনো গরম লাগছে সেটা সাহিত্য কেমন করে বুঝল?সে যাই হোক,কল্পনা আবার পুরো গাড়িতে নজর ঘুরাতে লাগলো।দুটো আরামদায়ক কেদারা ছাড়া বসবার আর কোনো যায়গা নেই গাড়িটিতে।গাড়িতে চোখ ঘুরাতে নিয়েই বলে উঠল কল্পনা,
"আপনার গাড়িটা একদম ফ্যামিলি ফ্রেন্ডলি না"
কল্পনার কথায় ছোট করে উত্তর দিল সাহিত্য,
"আমি গাড়ি ফ্যামিলি ওঠার জন্য কিনিনি। আমার পার্সোনাল চলাচলের জন্য কিনেছি"
কল্পনার নজর এবার সাহিত্যের দিকে আটকে গেল,
"এটা কেমন কথা?বিয়ের পরে বউ-বাচ্চা উঠাবেন না নাকি?"
সাহিত্য মুচকি হেসে উত্তর দিল,
"তখন নাহয় আরো একটা কিনবো"
সেকথা শুনে নিঃশব্দে সাহিত্যের মুখ ভেংচালো কল্পনা।হঠাৎই মনে পড়ে গেল রাতুলের কথা।সে কথা স্মরণে আসতেই মিনমিনিয়ে শুধালো সে,
"সাহিত্য ভাই"
"হুম"
কন্ঠে মাধুর্য মিশিয়ে ছোট করে উত্তর দিল সাহিত্য।
কল্পনা সময় নিয়ে বলে উঠল,
"রাতুলের হাতগুলো না কা'টলে হয় না?"
হঠাৎ কল্পনার এমন কথায় বেশ ভড়কালো সাহিত্য।আড় চোখে কল্পনাকে দেখে আবার সামনে মনোযোগ দিল,
"কেন?"
ভারী কন্ঠ সাহিত্যের।সেটা বুঝতে পারল কল্পনা।পর মুহুর্তেই বলে উঠল,
"ওর উপর আমার কোনো দয়া নেই।আসল কথা হলো.....আপনি যদি জেলে যান!!!"
শেষের কথাটাতে স্পষ্ট বুঝা গেল কল্পনার মনের ভয়।
সাহিত্য হালকা হেসে উঠল,
"রিল্যাক্স জানপাখি।আমি ওমন কিছুই করব না।আর আমি বলেছিলাম তোকে ছুলে হাত কা'টতাম।ও তো ছোয়নি তোকে"
কল্পনা মিনমিনিয়ে বলে উঠল,
"ও আচ্ছা"
সাহিত্য আড় চোখে কল্পনার দিকে দেখলো,
"তুই চাইলে ওর মা'ডার করতে পারি আমি"
আতকে উঠল কল্পনা,
"না না!অমন কিছু করার দরকার নেই!"
হাসলো সাহিত্য।কিন্তু কল্পনার চোখের আড়ালে চোয়ালটা যেন শক্ত হয়ে এলো।কে জানে সাহিত্যের মাথায় কি চলছে?হাত-পা কা'টা ছাড়া আর ভয়ানক কি শাস্তি দেওয়া যেতে পারে সেটাই হয়তো ভাবছে।
গাড়ি শেখ ভিলার লোহার গেটের কাছে আসতেই কল্পনা সাহিত্যকে ব্রেক কষতে বলল।কারণটা প্রথমে বুঝতে পারল না সাহিত্য।কিন্তু কল্পনা যখন বলল যে, এই বিকেল সময়টাতে দুই শেখ আহমেদই বাড়িতে উপস্থিত থাকে আর সাহিত্য-কল্পনাকে এমন একসাথে দেখলে বাড়িতে গজব পড়বে, তখনই সাহিত্যের ঠান্ডা মাথাটা গরম হয়ে উঠল।সেটা দেখেই কল্পনা সাহিত্যের দিকে নজর রেখেই বলে উঠল,
"অ্যাস্টন মার্টিন,ডিক্রিজ দ্য টেমপারেচার প্লিজ"
কিন্তু সেটা হলো কই?সাহিত্য কল্পনার কথা শুনলেও সাহিত্যের গাড়ি তো আর কল্পনার কথা শুনবে না।সে তো শুধু সাহিত্যের কমান্ডেই নড়চড় করবে।
কল্পনা দৌড়ে শেখ ভিলায় ঢুকার পরই সাহিত্য লোহার গেট থেকে গাড়ি স্টার্ট দিল।দেখে যে কেউই বলবে সাহিত্য আর কল্পনা লুকিয়ে প্রেম করছে।সেটা ভেবেই বিড়বিড় করে বলে উঠল সাহিত্য,
"আই উইশ।সেটা হলেও চলতো"
কল্পনা বাড়িতে ঢুকার বেশ কিছুক্ষণ পরেই সাহিত্য প্রবেশ করল।ড্রইং রুমের দিকে চোখ পড়তেই মুখখানা আপনাআপনি বিকৃত হয়ে গেল সাহিত্যের।যমের মতো সোফায় বসে টিভি দেখছেন ফাহাদ শেখ।
ফাহাদ শেখকে শুনানোর জন্যই মনে হয় গলা উঁচিয়ে বলতে লাগলো সাহিত্য,
"সারাদিন অফিস করে এসে কিসব কুলক্ষনের মুখ দেখতে হচ্ছে।আজ রাতটা আর ভালো যাবে না মনে হয়"
শার্টের হাতার বাটোন খুলতে নিয়েই সিড়ির দিকে এগুচ্ছিল সাহিত্য।ফাহাদ শেখ সেপাশে ভ্রু কুচকে তাকালেন।এই ছেলেটা কি তাকে ইঙ্গিত করে সেই কথাটা বলল?চেহারায় রাগের আবির্ভাব ঘটিয়ে আবার টিভির দিকে মন দিলেন তিনি।
★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................
"মুহিত সাহেব।এই যে.... মুহিত সাহেব।হয়ে গিয়েছে।আরে ঘুমিয়ে পড়েছেন নাকি?"
হুড়মুড়িয়ে উঠে দাড়ালেন মুহিত সাহেব।অতঃপর ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলতে লাগলেন,
"কি হয়েছে!রোগীর ডেলিভারির সময় হয়েছে??"
মহুয়া বেগম বিছানায় বসে থাকা অবস্থাতেই মুহিত সাহেবের সামনে এক হাত মাছি তাড়ার মতো নাড়ালেন,
"আরে কিসের ডেলিভারি?আপনি হসপিটালে না,বাসায় আছেন।আর আপনি তো সার্জারি স্পেশালিষ্ট।আপনি কেন রোগীর ডেলিভারি করাবেন?"
হুশ ফিরল মুহিত সাহেবের।আশেপাশে নজর ঘুরিয়ে দেখলেন তিনি।বর্তমানে তার অবস্থান শেখ ভিলায়।নিজের পরিস্থিতি ঠাহর করে মহিত সাহেব স্বস্তির নিঃশ্বাস না ফেলে ভয় মিশ্রিত এক ঢোক গিললেন।বর্তমানে গত কয়েক মাস থেকে এই শেখ ভিলায় থাকাটাই তো নিজের জীবনের সবচেয়ে বড় দুঃস্বপ্ন মনে করেন তিনি।ভিলায় কোনো ভুত নেই।আর ভুত থাকলেও বা কি?সেসবে ভয় পাননা মুহিত সাহেব।তার আসল ভয় তো শেখ ভিলার বড় দুই কর্তা,দুই শেখ আহমেদ।যমের মতো মুহিত সাহেব তাদের ভয় করেন।
মহুয়া বেগম এবার থার্মোমিটারটা মুহিত সাহেবের দিকে এগিয়ে দিয়ে আবার শুধালেন,
"স্বপ্নে কার ডেলিভারি করছিলেন?"
ধপ করে আবার চেয়ারে বসে পড়লেন মুহিত সাহেব।শরীরটা তার বড্ড ক্লান্ত কয়েকদিন থেকেই।এই বয়সে এমন দৌড়া-দৌড়ি যেন একটু বেশিই হয়ে যায় তার শরীরের জন্য।কিন্তু কোনো উপায় যে নেই।এই কল্পনাটা যেন মুহিত সাহেবের অবসর নেওয়ার সময়ই পুরো ডাক্তারী আবার মুখোস্ত করাচ্ছে।
মহুয়া বেগমের হাত থেকে থার্মোমিটারটা নিতে নিয়েই বললেন মুহিত সাহেব,
"আপনার নাতনীটা যা শুরু করেছে না,তাতে আমার নিজেরই ডেলিভারির ব্যাথা শুরু হয়ে গিয়েছে"
মহুয়া বেগম মৃদু হাসতে লাগলেন।আর এদিকে হাতের থার্মোমিটারে নজর দিলেন মুহিত সাহেব।চেহারায় একটু চিন্তার ছাপ দেখা দিল তার।কিন্তু তা মহুয়া বেগমকে বুঝতে দিলেন না।
মুহিত সাহেব অবশ্য চাইলেই শেখ ভিলায় আসার সময়টা কমাতে পারেন।কিন্তু প্রতিবার মহুয়া বেগমের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করে সেই ভাবনা পরক্ষণেই ভুলতে হয় তাকে।মহুয়া বেগমের স্বাস্থ কোনো এক কারণে সুক্ষ্মভাবে খারাপের দিকে এগুচ্ছে।প্রায়শই প্রেসারও হাই হয়ে যায়।বয়সের ভাড়ে সেগুলো হওয়া স্বাভাবিক।কিন্তু মুহিত সাহেব তো আর সেসব হেলাফেলায় দেখতে পারেন না।মায়ের বয়সী এই নারী যে তাকে মায়ের মতোই আদর করে এসেছেন সেকাল থেকেই।
থার্মোমিটারটা টেবিলে রাখতে নিয়েই শুধালেন মুহিত সাহেব,
"কি ব্যাপার চাচি আম্মা?ইদানিং টেনশন বেশি করা হচ্ছে নাকি?কল্পনার কাছে শুনলাম প্রেসার নাকি প্রায় প্রায় হাই হয়।সুস্থ হওয়ার ইচ্ছে নেই নাকি?"
মুহিত সাহেবের শেষের কথায় মুখের হাসি মিলিয়ে দিলেন মহুয়া বেগম।অতঃপর ভারী এক শ্বাস ফেলে শুধালেন,
"তোফায়েল আর ফাহাদ কি কখনো ঠিক হবে না মুহিত সাহেব?"
চকিত হলেন না মুহিত সাহেব।কিছু না বলে মাথা নিচু করে ফেললেন তিনি।উত্তরটা যেন ঘরে উপস্থিত দু জনেই জানেন।একই কন্ঠে আবার শুধালেন মহুয়া বেগম,
"কল্পনা যে কি কষ্টটাই করে যাচ্ছে।এদের চোখে কি সেটা পড়ে না?বড়দের এসব ঝামেলা সামলাতে গিয়ে বাচ্চাটা আমার শুকিয়ে গিয়েছে একদম।কিনা কি করছে তার বাপ-চাচাকে মেলানোর জন্য।আমি কি তার উপর একটু বেশিই ভাড় চাপিয়ে দিয়েছি?বাচ্চাটার নিজের খুশি বলে যেন এখন কিছুই নেই।কিছু বললেই বলে 'তুমি খুশি থাকলেই আমি খুশি দাদি'।তার ওই কথায় যে বুকটা আমার ধক ধক করে উঠে।খুব করে বলতে ইচ্ছে করে 'বাদ দে তো ওসব!ওই দুটোকে মিলাতে হবে না তোকে।নিজের জীবনের খুশি খুজে বের কর'......... কিন্তু আমার ছেলে দুটোকেও যে একসাথে দেখতে ইচ্ছে করে।ছোটতে যেমন তিন ভাই ই আমার কাছে এসে বসতো তেমন করে যে খুব দেখতে ইচ্ছে করে তাদের"
মুহিত সাহেব যেন নিজের ভাষা হারিয়ে ফেলেছেন।কি ই বা বলবেন তিনি?এক মা কে আর কি ই বা বুঝ দিবেন।কোনো মায়ের মনই যে তার বাচ্চার জন্য শক্ত হতে পারে না।সেটা যেই পরিস্থিতিতেই হোক না কেন।মা তো মা ই।যার তুলনা এই ধরণীতে হয়তো কোনোকিছুর সাথেই করা সম্ভব নয়।
রুমের দরজায় নক করার শব্দে মাথা তুলে সেপাশে দেখলেন মুহিত সাহেব।সাহিত্য দাঁড়িয়ে আছে।সাহিত্য হয়তো ঘরের পরিবেশ আচ করতে পারল।তাই শান্ত স্বরেই মুহিত সাহেবের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
"আপনাকে আব্বু লাঞ্চের জন্য ডাকছে"
সাহিত্যের দিক থেকে ঘুরতে নিয়েই ভারী শ্বাস ফেললেন মুহিত সাহেব।অতঃপর মহুয়া বেগমের উদ্দেশ্যে ভরসার এক বাক্য শুধালেন তিনি,
"আপনি একটু ঔষধগুলো ঠিক মতো খাইয়েন।ওসবের অত টেনশন নিয়ে আর শরীরটা খারাপ করিয়েন না"
মুহিত সাহেব রুম থেকে বের হতেই সাহিত্যের চিন্তিত চেহারা নজরে পড়ল।বুঝলেন তিনি,যে সাহিত্য মহুয়া বেগমের শরীরের অবস্থা বুঝতে চাইছে।সাহিত্যকে সত্যটাই বলতে লাগলেন তিনি,
"চাচি আম্মার শরীরটা কিন্তু তেমন ভালো নেই সাহিত্য।শেষ বয়সে এসে আশেপাশের এসব পরিস্থিতি তিনি আর কতই বা সহ্য করবেন?আমি আমার বেস্টটা দিয়ে যাচ্ছি।কিন্তু....এই ঔষধ দিয়েই বা আর কত দিন চলবে?"
থামলেন মুহিত সাহেব।এবার সাহিত্যের চোখ বরাবর দেখে যেন কথা বলতে শুরু করলেন,
"কল্পনা কিন্তু একাই সামলাতে পারছে না।আমি ওকে পুরো দোষটাও দিব না।ছোট মানুষ ও।সব সামলালেও,কেমন অগোছালো হয়ে যাচ্ছে তার কাছে।ওর একটু হলেও সাহায্যের প্রয়োজন"
আবারো থেমে গেলেন মুহিত সাহেব।তবে সাহিত্য ভালো করেই বুঝছে মুহিত সাহেব কি বুঝাতে চাইছেন।মুহিত সাহেব হয়তো জানেন সাহিত্যের উত্তরটা কেমন হবে।তাই তো ক্ষণিক বিরতির পর আবার বলতে লাগলেন,
"১১ বছর আগে কি হয়েছিল আমি সেটা ভালো করেই জানি সাহিত্য।তোফায়েল ভাই ও ফাহাদ ভাই দুজনকেই আমি বুঝাতে গিয়েছিলাম তখন।কিন্তু ব্যর্থ হয়েছিলাম।সেই সময়ই তাদের রাগ ও জেদের ব্যাপারে ধারণা পাই আমি......আমি শুধু বলব,যে তাদের এই রাগ-জেদ তোমার মাঝে থাকলেও তাদের মতো হইও না।কল্পনার তোমাকে অনেক প্রয়োজন।বাচ্চাটা এতো দূর এসে যেন ব্যর্থ না হয়।কল্পনা শুধু তার দাদিকে একটু হাসি মুখে দেখতে চায়।চাচি আম্মা তো তোমারও দাদি হয়।সেই দিকটা দেখে একটু কন্সিডার করা যায় না?সেটাতে অন্তত এই পরিবারটা আবার এক হতে পারতো"
সবই শুনলো সাহিত্য।মনোযোগ দিয়েই শুনলো।অতঃপর কিছু না বলে হালকা ঠোঁট বাকালো।মুহিত সাহেবও হালকা ঠোঁট বাকিয়ে ডাইনিং টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন।
সেপাশ থেকে নজর ঘুরিয়ে মহুয়া বেগমের ঘরের দরজার দিকে দেখলো সাহিত্য।হাসিটাও মিলিয়ে গেল সাথে সাথেই।ক্ষণিক সময় সেভাবেই দেখে থাকলো অতি আপন সেই ঘরের দরজার দিকে।অতঃপর এই অল্প সময়ের মধ্যেই নিয়ে নিল এক ভারী সিদ্ধান্ত।এটাই সিদ্ধান্ত যে, মহুয়া বেগমকে জানানো।যে সাহিত্য তার জানপাখিকেই নিজের জীবনসঙ্গী বানাবে।আর কাউকেই নয়।
কারণ এই বাড়ির দুই শেখ আহমেদকে সাহিত্য কখনোই মেলানোর চেষ্টা করবে না।তার রুচিতে আসে না।তাদেরকে তোয়াক্কা করা সাহিত্য বহু বছর আগেই ছেড়ে দিয়েছে।এখন শুধু সে তার প্রেয়সীকে আপন করতে চায়।যেই প্রেয়সী ছাড়া সাহিত্যের পক্ষে শ্বাসটাও নেওয়া সম্ভব নয়।এই দুই শেখ আহমেদকে উপেক্ষা করে সাহিত্য সে কাজ কেমন করে করবে সাহিত্যের তা জানা নেই।কিন্তু সে কাজ সাহিত্য অবশ্যই করবে।তাই ভালো হবে প্রাণ প্রিয় দাদিকে আগেই বলে রাখা।যেন পরে দাদি হার্ট অ্যাটাক না করে বসে।
মহুয়া বেগমের উত্তর কি হবে সেটা আর ভাবতে পারলো না সাহিত্য।দ্রুত গতিতে মুখ দিয়ে শ্বাস ছাড়লো সে।উত্তর কি হবে সেটা ক্ষণিকের মাঝেই দেখা যাবে।বুক ফুলিয়ে লম্বা এক শ্বাস নিয়ে দাদির ঘরের উদ্দেশ্যে এগোলো সাহিত্য বম ফাটানোর জন্য।
বেচারি মহুয়া বেগম।না জানি কি হালোত হবে তার সাহিত্যের ঘোষণা শুনার পর!
"দাদি!"
সাহিত্যের হাসি মাখা উচ্চ স্বরে তার দিকে ঘুরলেন মহুয়া বেগম।পরপরই সাহিত্য বড় বড় পা ফেলে মহুয়া বেগমের সামনে এসে দাড়ালো।ঠোঁটে সুক্ষ্ম হাসি এখনো ঝুলছে সাহিত্যের।
নাতির মুখে হাসি দেখে মহুয়া বেগমও হালকা ঠোঁট বাকালেন।অতঃপর হাতের ইশারায় সাহিত্যকে নিজের কাছে বসতে বললেন।সাহিত্য সামনের চেয়ারে বসতে নিয়েই বলতে লাগল,
"শুনলাম তোমার ঔষধগুলো নাকি আর কাজ করছে না?"
হালকা শব্দে হাসলেন মহুয়া বেগম।হাসতে নিয়েই বলে উঠলেন,
"যাদের টাকায় সেই ঔষধ খাচ্ছি তাদের যত্নের অভাবেই সেগুলো কাজ করা বন্ধ করে দিয়েছে"
মাথা ডান দিকে ঝুকালো সাহিত্য।অতঃপর কোমল কন্ঠে শুধালো,
"বাড়িতে আরো কত মানুষ আছে।সবাই কতটা তোমার যত্ন করছে....তারপরেও কেন সারাক্ষণ ওই দুই ব্যক্তির চিন্তা করে নিজের শরীরটা খারাপ করছো?"
হাসিটা মিলিয়ে গেল মহুয়া বেগমের।কিন্তু ঠোঁটখানা এখনো বাকিয়েই রাখলেন।সুক্ষ্ম আওয়াজে বলে উঠলেন তিনি,
"তুই সেটা বুঝবি না রে।অন্তত এখন বুঝবি না।যখন বাপ হবি না?তখন এ কথা এসে আমাকে বলার চেষ্টা করিস।তখন নিজ থেকেই আর বলতে চাবি না"
ঘাড়খানা নিচু করে মাথা চুলকালো সাহিত্য,
"সেটাই তো।এ বয়সে কি একটু বাপ হয়ে তোমার দুঃখ বুঝার চেষ্টা করব,সেটা আর হয়ে উঠছে কই?"
নিজের ভাবনা থেকে এবার পুরোপুরি বেড়িয়ে এলেন মহুয়া বেগম।টনক নড়ল তার সাহিত্যের কথায়।যার দরুন চটজলদি বলে উঠলেন তিনি,
"তাই তো!হ্যাঁ রে সাহিত্য,তোর বয়স যেন কত রে?"
মুখ ভোতা করল সাহিত্য,
"আঠাশ!সেদিকে আবার তোমার খেয়াল কই থাকে?তুমি তো তোমার দুই ছেলেকে নিয়েই পড়ে আছো।যাদের ফ্যামিলি প্লানিং সেই কবেই শেষ"
হাসলেন মহুয়া বেগম।অতঃপর সাহিত্যের মাথায় হাত বোলাতে নিয়েই বললেন,
"আচ্ছা ঠিক আছে।ওদের নিয়ে আর না ভাববো।বল দেখি,কোনো পছন্দের মেয়ে আছে, নাকি আমি খুজবো?"
মুচকি হাসলো সাহিত্য।মাথা নিচু করে লাজুক ভঙ্গিতে বলতে লাগলো,
"আছে আছে।সেজন্যই তো তোমার কাছে এসেছি"
এবার মুখ টিপে হাসলেন মহুয়া বেগম।এর মাঝেই সাহিত্য আবার বলে উঠল,
"যে তোমার সব কাজ নিজ হাতে করছে,তার কথাই বলছি আমি"
সাহিত্যের এবারের কথায় ভ্রু কুচকালেন মহুয়া বেগম।মস্তিষ্কে খুজতে লাগলেন কাঙ্ক্ষিত ব্যক্তিকে।পর মুহূর্তেই আতকে উঠলেন তিনি।মাথাটা যেন এই ঘুরে উঠল।তার নাতি এসব কি বলছে!মান-ইজ্জ্বত সব খেল শেখ পরিবারের!লোকে কি বলবে এ কথা শুনলে?ছি ছি করবে তারা!ভারী শ্বাস ফেলতে লাগলেন মহুয়া বেগম।সাহিত্য কি বয়সের দিকটাও একবার চিন্তা করে দেখবে না?কোথায় সেই মেয়ের বয়স আর কোথায় এই ছেলের বয়স!ফাহাদ কি কম ছিল,যে এবার সাহিত্যও সবাইকে চকিত করতে এগিয়ে যাবে সেই পথে?!আর কিছু ভাবতে পারলেন না মহুয়া বেগম।শুভ্রা রঙা শাড়ির আঁচলখানা দিয়ে ঠোঁটের উপরের সুক্ষ্ম ঘাম মুছলেন তিনি।
সাহিত্যের দিকে নজর ফেললেন।সাহিত্য এখনো মাথা নিচু করে আছে।সামনের লজ্জা ভার করে বসে থাকা সাহিত্যের উদ্দেশ্য বাক্য ছুড়লেন তিনি,
"মাফ করিস সাহিত্য।কিন্তু আমি এই অনুমতি তোকে দিতে পারছি না"
#চলবে