ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৩৭তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৩৭

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সুক্ষ্ম আওয়াজে দরজায় শব্দ হতেই সেপাশে মাথা ঘুরালো সাহিত্য।ঘড়ির দিকে নজর দিল পর মুহুর্তেই।ঘড়ির ছোট কাটাটা দশটার ঘরে থাকলেও বড় কাটাটা ছয়টার ঘরে ঝুলছে।এই সাড়ে দশটায় তো তেমন কেউ সাহিত্যের রুমে আসার কথা না।কারণ সবাই জানে সাহিত্য এই সময় অফিসের কাজে ভারী ব্যস্ত থাকে।কেউ অযথা জ্বালিয়েছে তো সাহিত্যের রাগের শিকার হওয়া নিশ্চিত।

সাহিত্য শুধু ভাবার জন্য সুক্ষ্ম সময়টাই নিয়েছে।তাতেই যেন দরজার ওপাশের ব্যক্তি ব্যস্ত হয়ে উঠল।এবার বিরতিহীন দরজায় শব্দ করতে লাগলো।সেটা শুনে শ্বাস ফেলে মুচকি হাসল সাহিত্য।অতঃপর আবার ল্যাপটপের দিকে ঘুরতে নিয়েই বলে উঠল,

"কল্পনা দরজা খোলাই আছে"

সাহিত্য বলার পরপরই রুমে ঢুকে পড়ল কল্পনা,

"আপনি কেমন করে বুঝলেন আমি এসেছি?"

ল্যাপটপের দিক থেকে ঘুরলো না সাহিত্য,

"আমার রুমের দরজায় এমন বিরতিহীন ঘন্টি বাজানো আমার জানপাখির দ্বারাই সম্ভব"

ফিক করে হেসে উঠে স্টাডি টেবিলের দিকে এগুলো কল্পনা।টেবিলে প্রিস রাখার শব্দে সেপাশে আড় চোখে দেখলো সাহিত্য।দেখা মিলল এক বড়সড় ব্লাকফরেস্ট কেকের স্লাইস।আবার নজর ঘুরিয়ে বলে উঠল সে,

" আমি চকলেট কেক খাই না কল্পনা"

কল্পনা টেবিলে হাতের বারি মারল,

"এটা কেমন কথা!আপনি আমার বার্থডে কেকটাই খাবেন না তো কি খাবেন?"

ল্যাপটপের কি-বোর্ডে হাত চালাতে নিয়েই বিড়বিড় করে আওড়ালো সাহিত্য,

"তোকে।খেতে দিবি?"

সাহিত্যের কথা শুনতে না পেরে তেতে উঠল কল্পনা,

"আহা!মাঝে মাঝে এমন বিড়বিড় করে কি বলেন?বুঝার মতো করে বলেন না"

কিছু না বলে মুচকি হেসে উঠল সাহিত্য।সেটা দেখে নাক-মুখ ফুলালো কল্পনা।

সাহিত্য এদিকে খুবই মনোযোগ দিয়ে ল্যাপটপে কিছু দেখছে।হঠাৎই দেখা মিলল ল্যাপটপের স্ক্রিনের সামনের একপাশ দিয়ে একটা চিঠি নেচে-নেচে আসছে।প্রথমে ভ্রু কুচকালেও পর মুহুর্তেই হাত বাড়িয়ে অস্ফুটস্বরে বলে উঠল সাহিত্য,

"৯ নাম্বার চিঠি.."

সাহিত্য চিঠিটাতে হাত লাগানোর আগেই কল্পনা ফট করে সেটা সড়িয়ে নিল।সেটাতে কল্পনার দিকে সুক্ষ্ম চোখে দেখতে লাগল সাহিত্য।কল্পনাও চোখ জোড়া সুক্ষ্ম করে বলে উঠল,

"আমার গিফট দিয়েছেন,যে আমি আপনাকে চিঠি দেব?"

সাহিত্য হাত বাড়িয়ে দিল,

"চিঠিটা দিয়ে তারপর বল কি নিবি"

ডানে-বামে মাথা ঝাকালো কল্পনা,

"আগে গিফট তারপর চিঠি"

মুখে 'চ' বর্গীয় আওয়াজ করল সাহিত্য,

"আহা বললাম তো দেব। এখন দে তো চিঠিটা"

চিঠিসহ হাতটা পেছনে লুকালো কল্পনা।সেদিকেই নজর সাহিত্যের।

"আমার চিঠিগুলোতে এমন কি মধু পেয়েছেন, যে এতো পড়ার ইচ্ছা জাগে?"

চিঠি নজরে আনার চেষ্টা চালিয়েও যখন সাহিত্য ব্যর্থ হলো তখন কল্পনার দিকে দেখে কোমল কন্ঠে তার প্রশ্নের উত্তর দিতে লাগলো,

"কেন মনে নেই?আমিই তো বলেছিলাম তোকে, যে কারো কাছ থেকে আমার চিঠি পাওয়ার এক আকাশ পরিমাণ ইচ্ছা।সেই ইচ্ছাটাই মন-প্রাণ দিয়ে এখন পূরণ করছি"

ব্যস্ত পরিবেশ যেন হঠাৎই শান্ত হয়ে গেল।সরাসরি দেখছে দুই চোখজোড়া নিজেদেরকে।আর সেই নজর যেন সাধারণের কাতারে পড়ে না।বড়ই আবেগী সেই চাহনি জোড়া।চোখ জোড়া যেন নিজেদেরকে এতো আবেগের সাথে নজর বন্দি করেও হৃদয়ের ভারী অনুভূতিগুলো বুঝে উঠতে পারছে না।

যদি কল্পনা একবারের জন্য জানতে পারতো,যে তার সাহিত্য ভাই তাকে যেমন আদর করে তেমন পাগলের মতো ভালোও বাসে।যদি কল্পনা একবারের জন্য জানতে পারতো,যে তার সাহিত্য ভাইয়ের জীবনে সে-ই একমাত্র নারী।যদি কল্পনা একবারের জন্য জানতে পারতো,যে এই সাহিত্য তার কল্পনার জন্য যেমন সবকিছু জ্বালিয়ে রাখ করে দিতে পারে তেমনই তার কল্পনার জন্য অক্ষি জোড়া থেকে নোনাজলও গড়াতে পারে।

সেই নারীর মতো সামনের এই পুরুষও যদি একবারের জন্য জানতে পারতো,যে তার প্রেয়সীর মনেও হালকা আবেদন আছে সাহিত্যকে নিজের হৃদয়ের এক কোণে পুষে রাখার।যদি সাহিত্য একবারের জন্য জানতে পারতো,যে সাহিত্যের প্রতি প্রায়ই কল্পনার মনে কিছু অনুভূতিরা হানা দেয়।যদি সাহিত্য একবারের জন্য জানতে পারতো,যে কল্পনাও সাহিত্যকে ভালোবাসতে চায়।কিন্তু সুক্ষ্ম এক বাধার জন্য সেটা পুরোপুরি উপেক্ষা করে যাচ্ছে মেয়েটা।

কিন্তু আপসোস।সাহিত্যের সেই বাধহীন ভালোবাসতে পারার ক্ষমতা এখনো অব্দি কল্পনার ধারণাতেও আসেনি।আর না সাহিত্যের ধারণাতে এসেছে তার জানপাখিটার সুক্ষ্ম ভালোবাসা পাওয়ার এক সমুদ্র সমান আকুতি।

কল্পনার দিকে নজর রেখেই ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটালো সাহিত্য,

"বল,কি লাগবে তোর?"

সাহিত্যের কথায় কল্পনা এতক্ষণ পর চোখের পাপড়িগুলো নড়ালো।ভাবনা থেকে বেড়িয়ে এসে হাসি ফুটালো মুখে।পরপরই হাসিটা সড়িয়ে গলা খাকাড়ি দিয়ে উঠল।সেই সাথে নজর অন্যদিকে ঘুরিয়ে বলল সে,

"বাবার সাথে কথা বলতে হবে"

সাহিত্যের হাসি মুখ থেকে চুড়ই পাখির মতো উড়ে গেল।এতো কিছু থাকতে এই অসহ্যকর জিনিসটাই কল্পনাকে চাইতে হবে?

সাহিত্যের দিক থেকে কোনো উত্তর না আসায় ধীরে ধীরে সাহিত্যের দিকে মাথা ঘুরালো কল্পনা।ঘুরতেই আতকে উঠল সে।সাহিত্যের গম্ভীর মুখোশ্রি দেখে ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল,

"আমি কিন্তু আমার বার্থডে গিফট চেয়েছি।না দিলে কিন্তু মন খারাপ করব"

"কর মন খারাপ।পারবো না আমি কথা বলতে"

গম্ভীর কন্ঠে কথাটা বলেই আবার ল্যাপটপের দিকে নজর দিল সাহিত্য।সেটাতে আরো ব্যতিব্যস্ত হয়ে উঠল কল্পনা।টেবিলের পাশে এসে দাড়ালো সে,

"এই সাহিত্য ভাই,শুনেন না,প্লিজ।এমন কেন বলছেন?একটু কথা বললে এমন কি হয়ে যাবে?আমার এই একটা কথা আপনি রাখবেন না?আমি মন খারাপ করলে আপনার ভালো লাগবে বুঝি?"

মাথা নিচু করে ভারী শ্বাস ফেলল সাহিত্য।কল্পনার দিকে ঘুরে বসলো সে,

"তোর সব কথা আমি শুনতে রাজি আছি জানপাখি।কিন্তু এটা শুনতে পারবো না"

কোমল কন্ঠে বলল কল্পনা,

"কিন্তু আমি যে শুধু এটাই চাই"

সাহিত্যের শক্ত নজরকে ক্ষণিকের মাঝেই কোমল করে দিল কল্পনার আদুরে আদলখানা।মেয়েটা কতটাই না চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে পরিবারটাকে এক করার জন্য।কিন্তু সাহিত্য যেন বারবার সেদিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে।ফাহাদ শেখ যে তার কাছে বড্ড অপ্রিয় এক ব্যক্তি।সাহিত্য কখনই চেষ্টা করবে না সেই ব্যক্তির সাথে কথা বলার।ফাহাদ শেখের সাথে প্রথম ও শেষ কথা সাহিত্য একবারই বলবে।আর সেটা হলো তার প্রেয়সীকে নিজের করে নেওয়ার সময়।কিন্তু এদিকে যে তার প্রেয়সীই চাইছে সাহিত্য যেন তার সেই গন্ডি থেকে বেড়িয়ে আসুক।

ধীর আওয়াজে বলে উঠল সাহিত্য,

"তুই আমাকে জ্বালিয়ে মারছিস জানপাখি"

সাহিত্যের কথায় কল্পনার চেহারায় অন্ধকার নামলো,

"একদম না।আপনার জীবন থেকে কিছু খারাপ মুহুর্ত বের করার চেষ্টা করছি"

থমকালো সাহিত্য।কল্পনার সেই ভারী কথা যেন সইতে পাড়ল না সে।মাথা নিচু করে ফেলল।সাথে ডান হাতখানা আবার কল্পনার দিকে বাড়িয়ে দিল,

"ঠিকাছে....চেষ্টা করব।এখন আমার চিঠি দে"

কল্পনা তো পুরো মনোভাব নিয়ে এসেছিল যে সাহিত্যের হাতে ধুমাধুম দুটো খাবে এই আবদারটা করার পর।কিন্তু বর্তমানে সে যেন অবাকের চূড়ায়।তাই তো সাহিত্যের বাড়িয়ে দেওয়া হাতটা নিজের দুই হাত দিয়ে ধরে লাফিয়ে উঠল সে,

"সত্যি???"

প্রেয়সীকে এতো খুশি দেখে যেন আগুন জ্বলতে থাকা হৃদয় শীতল হয়ে উঠল সাহিত্যের।তার প্রেয়সীটা হাসলে কত সুন্দর লাগে দেখতে।সাহিত্য তো এটাই চায়,যেন তার জানপাখিটা এমন সব সময়ই হাসে।কল্পনা সাহিত্যের হাতে চিঠি দিয়ে বলে উঠল,

"আপাতত এটা নিন।আপনার বার্থডে গিফট এখনো পাওনা আছে আমার কাছে।যেমন-তেমন কিছু তো দিতে পারি না।তাই একটু সময় নিয়ে খুজে তারপর দেব"

ঠোঁটে হাসি রেখেই বলল সাহিত্য,

"আমার গিফট লাগবে না থাক"

"ওমা!লাগবে না কেন?আমি প্রমিস করেছিলাম আপনাকে।তো কিছু না কিছু তো অবশ্যই দেব"

কল্পনা আনমনে কি যেন ভাবলো,

"তখন দুপুরে যে কি যেন বলতে নিয়েছিলেন।কিসের কথা বলছিলেন?....এমন কি লাগবে আপনার যে আমি এখন দিতে পারবো না?"

শেষের কথাটা সাহিত্যের দিকে সুক্ষ্ম চোখ রেখেই বলল কল্পনা।সেটাতে বেশ ভড়কালো সাহিত্য।কি বলবে এখন সে?তখন তো বেকুবের মতো প্রেয়সীর ঘ্রাণ নিচ্ছিল আর আবোলতাবোল বকে যাচ্ছিল।কিন্তু এখন যেন হুশে থেকেও কি বলবে বুঝতে পারছে না।কি বলবে বুঝতে না পেরেই টেবিলের দিকে নজর দিল।আপাতত কেক নিয়েই কিছু বলতে হবে।নাহলে যে বাঁচার উপায় নেই।কেকের প্রিসটা হাতে তুলল সাহিত্য,

"কি খাস এগুলো তুই?কালো-কালো।দেখেই তো রুচি হচ্ছে না"

নিজের পছন্দের কেকের ব্যাপারে এমন দুর্নাম শুনে তেতে উঠল কল্পনা,

"কি কালো-কালো?চকলেট ওটা।তাও আবার ব্লাকফরেস্ট।আমার পছন্দের ফ্লেভারের কেক।একদম বাজে কথা বলবেন না সেটাকে নিয়ে"

চোখ উল্টালো সাহিত্য,

"মানুষ যেমন তার রুচিও তেমন।ময়লা-ময়লা"

চোখ জোড়া গোলাকার ধারন করার সাথে ঠোঁট জোড়াও খুলে গোল হয়ে গেল কল্পনার।সেভাবেই সাহিত্যের দিকে দেখে থাকলো ক্ষণিক সময়।অতঃপর ঝাঝিয়ে উঠল,

"আপনি মানুষটা খুব বাজে!আমার বার্থডেতেও আমাকে এমন করে পঁচাচ্ছেন?"

নিম্নাষ্ঠ ভিজিয়ে আবার বলল সাহিত্য,

"তুই তো আগে থেকেই পঁচা।এক্সট্রা করে পঁচানোর কি আছে?"

সাহিত্যের হাত থেকে কেকের প্রিসটা ছো মেরে নিয়ে নিল কল্পনা,

"খেতে হবে না আপনাকে?এতো ডায়েট করে ফিট থেকে এমন কোন লাভ হচ্ছে আপনার?দেখিয়েন,আপনার বউ চকলেট লাভার হবে।তখন না খেয়ে কেমন করে থাকেন সেটাই দেখবো"

সাহিত্য তার প্রেয়সীকে নিজের বউয়ের জায়গায় কল্পনা করে উচ্চস্বরে বলে উঠল,

"ইনশাআল্লাহ!! সাথে আলহামদুলিল্লাহ!"

ভাবলেসহীনভাবে কল্পনা দেখে আছে সাহিত্যের দিকে।সমস্যা কি এই লোকের?কল্পনাকে কোনো কথাই বসাতে দিচ্ছে না যেন।কল্পনা বদ দোয়া দেওয়াতে আবার ' আলহামদুলিল্লাহ ', ' ইনশাআল্লাহ ' পড়ে।কল্পনার চিন্তার মাঝেই সাহিত্য বলে উঠল,

"খাস বসে বসে চকলেট তুই"

ভড়কালো কল্পনা,

"কি বললেন?"

সাহিত্য জিহ্বায় কামোড় বসালো,

"মানে...আমার বউয়ের সাথে তখন তুইও চকলেট খাস"

দাঁত কিড়মিড়ালো কল্পনা।অন্য কোনো মেয়ে সাহিত্যের বউ হিসেবে আর কল্পনা পাশাপাশি বসে কেক খাচ্ছে?কল্পনার তো কল্পনা করতেই যেন অসহ্য লাগছে।কিসব বাজে জিনিস!

কল্পনা ঠোঁট মোচড়ালো,

"সে যে-ই হোক।আমার থেকে বেশি অধিকার খাটাতে পারবে না"

লুকিয়ে হাসলো সাহিত্য,

"কিসের অধিকারের কথা বলছিস?"

মেয়েটা যেন আবার ভড়কে উঠল,

"ক-কিসের আবার?শেখ ভিলায় অধিকার খাটানোর কথা বলছি আমি!"

কথা শেষেই সাহিত্যের দিকে সুক্ষ্ম চোখ রেখে এক টুকরো কেক তুলে নিজের মুখে পুরলো কল্পনা।কল্পনার সেই কান্ডে হেসে উঠল সাহিত্য।অতঃপর আবার ল্যাপটপের দিকে ঘুরল।মুখের কেক শেষ হতেই আরো এক টুকরো কেক তুলে মুখে দিতে নিয়েই সাহিত্যের টেবিলের দিকে চোখ গেল কল্পনার।কিছু কাগজপত্র দেখে যেন সকালের সেই কবিতার কথা স্মরণে এলো।কল্পনা যেন এখনো একটু দ্বিধায় ভুগছে সে ব্যাপারে।সাহিত্যকে সরাসরি জিজ্ঞেসও করতে পারছে না।এক অজানা কারণেই যেন লজ্জা ভাড় করে বসেছে তার উপর।ক্ষণিক সময় চিন্তা করতেই মাথায় কিছু খিচুড়ি পাকালো সে।এবার গিয়ে সে টেবিলে হেলান দিয়েই দাড়ালো।কাটা চামুচে ভরাট সুক্ষ্ম কেকের অংশ মুখে নিতেই বলল কল্পনা,

"জানেন?অনু আমাকে আজ সকালে একটা কি সুন্দর কবিতা লিখে দিয়েছে।এতো সুন্দর হয়েছে কবিতাটা!"

বলতে নিয়েই আড় চোখে সাহিত্যের দিকে নজর ফেলল।কিন্তু কল্পনার কথায় যেন সাহিত্যের কোনো খেয়ালই নেই।ল্যাপটপে ব্যস্ত সে।কল্পনা সেটাতে বেশ বিরক্ত হলো,

"সাহিত্য ভাই!বললাম যে আমাকে কেউ চিরকুট দিয়েছে"

শান্তভাবেই কল্পনার দিকে ঘাড় ঘুরিয়ে বলল সাহিত্য,

"কিসের চিরকুট?"

"শুধু চিরকুট না।সেটাতে অনেক সুন্দর করে একটা কবিতাও লিখেছে"

"আজ তো বাইরে কোথায় যাসনি।তো বাসার কেউই দিয়েছে।তাই আমার টেনশন করার কিছু নেই"

"আহা!গেস তো করেন কে দিয়েছে"

গালের ভাড় হাতে দিল সাহিত্য,

"আমি কেমন করে জানবো কে দিয়েছে?তোকে দিয়েছে তোর জানার কথা"

ফোত করে শ্বাস ফেলল কল্পনা,

"অনু"

আবার সাহিত্য ল্যাপটপে মন দিল,

"ওই বাদর ছাড়া এমন কাজ কেউ করতেও পারবে না"

সাহিত্যের কথায় যেন কল্পনা মনের এক কোণে মৃদু ব্যাথাই অনুভব করল।মনে মনে আওড়ালো সে,

'কেন কেউ দিতে পারে না?আপনি কি দিতে পারেন না?'

কিন্তু মনের কথা মনের মধ্যেই দাবিয়ে রাখলো।অন্তত কল্পনা নিশ্চিত তো হলো,যে সেটা আসলেই অনু দিয়েছে।ঠোঁট বাকালো কল্পনা।ঠোঁটে যেন মনমরা এক হাসি ফুটল।কিন্তু তা সাহিত্যকে বুঝতে দিল না।হাতের প্রিসটা টেবিলে রেখে আবার টেবিলটায় ভালো করে হেলান দিয়ে দুই পাশে হাত দুটোও টেবিলে ঠেকিয়ে দিল সে।চোখ জোড়া বন্ধ করে মৃদু স্বরে বলতে লাগলো,

"কারো দিনের সূর্যাস্তের পর সূর্যোদয় তুমি।কারো রাত পোহানোর পুর্বে তুমি আকাশের এক কোণের রজনীকান্ত।কারো কবিতার মূল কেন্দ্র তুমি,যেই কবিতার নেই কোনো অন্ত"

কল্পনার সুক্ষ্ম কন্ঠে সাহিত্য যেন হতবম্ব হয়ে গেল।নজর দিল তার প্রেয়সীর দিকে।তার প্রেয়সীটা মন গহীন থেকেই কবিতাটা বলেছে।সাহিত্যের হৃদয় থেকে বের হওয়া সেই বাক্যগুচ্ছো যেন কল্পনা নিজের হৃদয়ে আপন করে নিয়েছে।কল্পনার এতো মাধুর্য দিয়ে বলায় তো সাহিত্য সেটাই ধরে নিল।যেই কবিতাটা সাহিত্য নিজ হাতে তৈরি করেছিল গত রাতে।কত কি দেওয়ার ছিল কল্পনাকে।কিন্তু সাহিত্য যেন তার মনের অনুভূতির সুক্ষ্ম এক অংশই দিতে চেয়েছিল তার প্রেয়সীকে।

"তুই...সেটা মনে রেখেছিস?"

সাহিত্যের মৃদু স্বরে কল্পনা চোখ জোড়া খুলল না।ঠোঁটের হাসি বড় করে বলে উঠল,

"কেন মনে রাখবো না?কবিতাটা শুনেই বুঝা যাচ্ছে যে সেই ব্যক্তির কাছে আমি কতটা মুল্যবান।এতো যত্ন করে লিখেছে সেটা,আমি সেটা আজীবন মনে রেখেও সেটার শোধ পূরণ করতে পারবো না"

গলা কাপছে সাহিত্যের।তাই তো আর কিছু বলতে পারল না।সাহিত্য অন্তত এতোটা আশা করেনি তার প্রেয়সীর থেকে।কিন্তু তার প্রেয়সী যেন বারবারই উপযুক্ত কারণ দিয়ে দেয় সাহিত্যকে,যে কেন সাহিত্য এতো মেয়ে থাকা সত্বেও এই নারীরই প্রেমে পড়েছে।

এবার কল্পনা চোখ খুলে সাহিত্যের দিকে দেখলো।মুখোশ্রি তার গম্ভীর,

"অনু কত সুন্দর করে লিখেছে কথাটা।আর এদিকে আপনি আমাকে উইসটা পর্যন্ত করেননি।আপনার কাজ নিয়ে থাকেন আপনি।আমি আর কথাই বলব না আপনার সাথে"

কথাটা বলেই কল্পনা চলে যেতে নিলে সাহিত্য খপ করে তার এক হাত টেনে ধরে।ভড়কালো কল্পনা।সাথে-সাথে পেছনে ঘুরতেই দেখা মিলল সাহিত্যের করুণ অক্ষি জোড়ার।তাতেই যেন সাহিত্যের উপরের আলগা রাগটা নিভে গেল।আর এদিকে নিজেকে সংযত করে বলল সাহিত্য,

"রাগ করিস না জানপাখি, প্লিজ।তোর ব্যাপারে এলে যে আমার মাথা কাজ করা বন্ধ করে দেয়।তোকে কোনো সাধারণ কিছু দিতে চাইনা আমি,যেটা অন্যকিছুর সাথে তুলনা করা যাবে।আর সেই কথা মাথায় রাখতে গিয়ে যেন বারবার তোর সামনে ফাঁকা হাতে আসতে হয়।আই সোয়ার,একদিন এমন কিছু দিব তোকে যেটার মূল্য এই ধরণীতে কেউ নির্ধারণ করতে পারবে না।শুধু একটু সময় দে আমাকে"

সাহিত্যের এতো গভীর কথা যেন মন ছুয়ে দিল কল্পনার।কিন্তু সেদিকটায় আবার বাধা দিয়ে দিল কল্পনা।হালকা হেসে বলে উঠল,

"আমার জন্য আপনার থেকে আর বড় গিফট কি হতে পারে...রাগ করিনি আমি।এমনি বলছিলাম শুধু"

এর মাঝে হঠাৎই সাহিত্যের ল্যাপটপে এক কল ঢুকে।সেদিকেই নজর দেয় দুজনই।সাহিত্য হাতটা একটু ঢিলা দিতেই কল্পনা অনিচ্ছায়ই আলগোছে নিজের হাতটা ছাড়িয়ে নিল।বাধা দিল না সাহিত্য।

"আপনি কথা বলেন"

ছোট করে বলে রুম থেকে বেড়িয়ে গেল কল্পনা।সাহিত্য আর সেদিকে নজর দিল না।কলটা বাজতে-বাজতে এক সময় কেটে গেল।সেদিকে খেয়াল নেই সাহিত্যের।তার কানে তো এখনো কল্পনার মুখে বলা কবিতাটা ভেসে আসছে।চেয়ারে শরীরের পুরো ভাড় ছেড়ে দিয়ে ঘাড় পেছনে হেলিয়ে দিল সে।কল্পনাকে কে বলেছে যে সাহিত্য তাকে বার্থডে উইস করেনি?করেছে তো।ছোটতে যেমন প্রতিটা বছর সেই নির্দিষ্ট এক রাতে ঘড়ির কাটা ১২টায় থাকার সাথে সাহিত্য ছোট কল্পনার কাছে গিয়ে বসে থাকতো তেমন কাল রাতেও কল্পনার মাথার কাছে মেঝেতে বসে ছিল সাহিত্য।কল্পনার হাতটা আলগোছেই নিয়ে নিজের গালের কাছে ঠেকিয়ে রেখেছিল।কতবারই না মৃদু স্বরে শুভেচ্ছা জানিয়েছে প্রেয়সীর জীবনের নতুন এক বছরের।অনু আর সামিয়া রুমে ঢুকায় ঠিক ১২টায় প্রেয়সীকে শুভেচ্ছা জানাতে পারেনি সাহিত্য।কিন্তু ভোর ছয়টা পর্যন্ত তো সেখানেই ছিল সে।মেঝেতে বসে।ঠিক কল্পনার আদলখানা বরাবর।প্রেয়সীকে গভীর ঘুমে দেখেই যেন হৃদয় বারবার শীতল হয়ে আসছিল তার।সাহিত্যের চোখের ঘুমরাও যেন বলে উঠছিল,

'আজ সাহিত্যের চোখেরা শান্তি পাইছে।তার না ঘুমালেও চলবে'

সারা রাত ঝড় চলছিল বাইরে।অথচ সাহিত্যের হৃদয় সারা রাত শীতের সকালের মৃদু রোদের উষ্ণ ছোয়া পাইছিল।ভোরের আলো ফুটার ক্ষণিক আগেই যেন বাধ্য হয়ে চলে আসে।সেই মুহুর্ত কল্পনার চোখের আড়ালে রাখার জন্যই হয়তো।আসার আগে অনুর দেওয়া চকলেটটার নিচে নিজের সুক্ষ্ম চিরকুটটা রেখে আসে।আর কল্পনা মনে করেছে সেটা অনুই দিয়েছে।সাহিত্য তো সেই উদ্দেশ্যেই সেটা চকলেটটার নিচে রেখে আসে।প্রেয়সীকে যেন মনের অনুভূতি সরাসরি বলতে চাইছিল না সাহিত্য।কিন্তু না বলে যে আবার থাকতেও পারছিল না।তাই তো এতো ঝুঁকি নিয়ে সে কাজটা করেছে।

এবার হাতের কাগজটা তুলে মুখের কাছে নিয়ে এলো সাহিত্য।কল্পনার চিঠিটা তো সেই তখন থেকে হাতে ধরে রেখেছিল সে।চিঠিটাতে এক টুকরো চুমু দিয়ে খুলে পড়তে লাগলো

📜......…..…....….......................................................

এখনো রাগ করে আছেন?সরি বললাম তো। প্লিজ একটাবার উত্তর দেন না।

উত্তরের অপেক্ষায় থাকলাম।

আপনার আদরের বোন,

অমৃতা শেখ কল্পনা।

............................................................................📜

৭ আর ৮ নাম্বার চিঠির কথা স্মরণে আসতেই হাসতে লাগলো সাহিত্য।মাথা উঠাতেই টেবিলের উপরের কেকের দিকে নজর গেল তার।যেটা কল্পনা কিছুক্ষণ আগেই খাচ্ছিল।পুরো কেকটাই এখনো পড়ে আছে।সাহিত্য হাসতে নিয়েই এক কাজ করে বসলো।ডায়েটের চার্ট সাইডে রেখে প্রেয়সীর অধর জোড়া ছুয়ে দেওয়া কেক ভর্তি চামুচটা তুলে মুখে দিল সে।চামুচটা মুখে রেখেই চোখ বন্ধ করে হেসে উঠল নিজের পাগলামিতে।আবার এক অংশ কেক তুলতে নিয়েই হিসিহিসিয়ে বলে উঠল,

"হ্যাপি বার্থডে জানপাখি"

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৭তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন