ফন্ট সাইজ:
থিম:
একখণ্ড আসক্তি

৩৮তম পর্ব

লেখক: রশনি করিম

#পর্ব_৩৮

গল্প:#একখণ্ড_আসক্তি

#লেখিকা_রশনি_করিম

[ 🚨কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।চাইলে পোস্ট বা পোস্টের লিংক শেয়ার করতে পারেন ]

★𝓡𝓸𝓼𝓷𝓲...................

সাহিত্যের রুমের দরজাটা আধো খোলা।কিন্তু সেটাতে কোনো সমস্যা নেই।কল্পনার টনক তখন নড়ল যখন তার কানে সাহিত্যের ফোনের বিরতিহীন রিংটনটা পৌঁছালো।সে কারণেই তো মেয়েটা হাটতে থাকা অবস্থায়ই থমকে গিয়েছে।কতক্ষণ থেকে বাজছে ফোনটা সাহিত্য ভাই তুলছে না কেন?একটু চিন্তা হতে শুরু করেছে কল্পনার। তাই তো ধীর পায়ে দরজা পার করে মাথাটা ভেতরে ঢুকিয়ে দিল।পুরো রুম একবার চোখ ঘুরিয়ে সাহিত্যকে দেখতে পেল না।তাই এবার পুরো শরীরটাকেই রুমের ভেতর ঢুকালো।কেবলই ভাবতে যাবে যে সাহিত্য মনে হয় বাইরে গিয়েছে সেই মুহুর্তেই ওয়াশরুম থেকে ঝনঝন করে পানির শব্দ কানে এলো কল্পনার।বুঝতে বাকি রইল না যে সাহিত্য গোসল করতে ঢুকেছে।

শান্ত পায়েই টেবিলের কাছে গিয়ে মাথা বাড়িয়ে দিয়ে ফোনের স্ক্রিনে নজর ফেলল কল্পনা।সেখানে ইংরেজিতে একটা নাম লিখা।কল্পনা নামটা উচ্চারণ করতে নিয়েই কলটা কেটে গেল।কিন্তু কল্পনার ভ্রু জোড়া কুচকানোর আগেই আবার ভাইব্রেট হয়ে ফোনটা বেজে উঠল।

এতক্ষণ থেকে কল দিচ্ছে।তার মানে নিশ্চয়ই কোনো জরুরি কাজেই সেই ব্যক্তি এতো ব্যস্ত হয়ে কল দিচ্ছে বারংবার।পানির শব্দে হয়তো সেই রিংটোনের আওয়াজ সাহিত্যের কান অব্দি পৌঁছাচ্ছে না।তাই কল্পনা ওয়াশরুমের দরজার কাছে গিয়ে গলা উঁচিয়ে বলল,

"সাহিত্য ভাই!আপনার ফোনে কল এসেছে।ভিকি নামে কেউ একজন অনেক্ক্ষণ থেকেই কল দিচ্ছে"

কল্পনার গলা শুনেই হয়তো সাহিত্য শাওয়ারটা বন্ধ করল।সময় নিয়ে বলে উঠল,

"কলটা ধর, আমি বের হচ্ছি"

হয়তো সাহিত্যের এই কথার অপেক্ষায়ই ছিল কল্পনা।কারণ কোনো ক্লায়েন্ট যদি হয় তাহলে তো সাহিত্যের বাণিজ্যিক কিছু ক্ষতিও হতে পারে।তাই দৌড়ে গিয়ে কলটা কেটে যাওয়ার আগ মুহুর্তেই রিসিভ করে কানে ধরল।সালামই দিতে যাবে।কিন্তু ভিকি তাকে সেই সময়টা দিল কই।নিজের স্বভাব মতোই কাজ করল ভিকি।ফোনের ওপাশে কে আছে সেটা না শুনেই বলে উঠল সে,

"এই অহি, কল ধরিস না কেন?কতক্ষণ থেকে কল দিচ্ছি"

নামটা শুনে বেশ ভড়কালো কল্পনা।এই ছেলে সাহিত্যের নাম্বারে কল দিয়ে কোন অহিকে খুজছে?শান্ত স্বরেই ভিকির উত্তর দিল কল্পনা,

" সরি, এটা কোনো অহির নাম্বার না। এটা অহিয়াম শেখ সাহিত্যের নাম্বার।

ফোনের ওপাশ থেকে এক মেয়েলী কন্ঠ শুনে তো ভিকি অবাকের শেষ চূড়ায়।সাহিত্যের ফোন যে কোনো মেয়ে ছুতে পারে সেটা মনে হয় আজ প্রথম আবিষ্কার করছে ভিকি।কিন্তু হঠাৎই আন্দাজ করে নিল যে সেই মিষ্টি কন্ঠের অধিকারী কে হতে পারে।তাই তো নিঃশব্দে মেকি হেসে বলে উঠল ভিকি,

"বুঝলাম এটা অহিয়াম শেখ সাহিত্যের নাম্বার।কিন্তু অহিয়াম শেখ সাহিত্যের কন্ঠ মেয়েলী কবে থেকে হয়ে গেল?"

কল্পনা আবার সাবলীলভাবে উত্তর করল,

"সাহিত্য ভাইয়ের গলা ঠিকই আছে। আমি অমৃতা শেখ কল্পনা বলছি।সাহিত্য শেখের চাচাতো বোন"

এবার তো ভিকি নিজের ভাবনায় শতভাগ নিশ্চিত হলো।মনে মনে অনেক খুশিও হলো বটে।সাহিত্যকে কতবার বলেছে সাহিত্যের বউ উরফে ভিকির ভাবিটাকে একটু ভিকির সাথে কথা বলিয়ে দিতে।যেই মিষ্টি মেয়েটা তার এমন রগচটা বেস্টফ্রেন্ডটাকে মন গহীন থেকে শান্ত করে রাখতে পারে সেই মেয়েটার সাথে একটু কথা বলতে তো ভিকিরও মনটা খুড়খুড়িয়ে উঠে।

মুখের হাসি রেখেই ব্যতিব্যস্ত হয়ে বলে উঠল ভিকি,

"ওহ,কল্পনা তুমি?ফাইনালি তোমার সাথে কথা হচ্ছে।তোমার সাথে কথা বলার আমার কত ইচ্ছা ছিল"

কল্পনার ভ্রু জোড়া আরো বেশি কুচকে গেল।সাহিত্য ভাইয়ের ফোনে কল দিয়ে একবার অহি নাম ডাকে,আবার এখন বলছে কল্পনার সাথে কথা বলতে চায়।কল্পনার কাছে এই ছেলের লক্ষ্মণ তো ভালো ঠেকছে না।তারপরেও কথা চলতি রাখলো।যেন সাহিত্য ওয়াশরুম থেকে বের হওয়া অব্দি ফোনটা না কাটে।

আবারো শান্ত স্বরে বলে উঠল কল্পনা,

"আপনি কে বলছেন?"

ভিকি এবার গলা পরিষ্কার করে,

"আমি অহি...মানে সাহিত্যের বেস্টফ্রেন্ড বলছি। আমার নাম ভিক্রম চৌধুরী। ইউ ক্যান কল মি ভিকি"

এবার কল্পনা ব্যতিব্যস্ত হয়েই ভিকিকে সালাম দিল।অতঃপর সেই কন্ঠেই বলতে লাগলো,

"সরি ভাইয়া।আমি মনে করেছি সাহিত্য ভাইয়ের অফিসের কেউ হবে"

"আরে না না।কোনো সমস্যা নেই।তুমি যখন একদম পিচ্চি ছিলে সেই তখন একবার দেখা হয়েছিল আমাদের।না চিনতে পারাটা স্বাভাবিক"

হালকা হাসলো দুজনেই।সেই সাথে বাড়ির সবার ব্যাপারে টুকটাক কথাও হলো।আর এই ছোট কথোপকথনের মাধ্যমে কল্পনা এটাও জানলো যে ভিকি ও সাহিত্য একে-অপরের বন্ধু হওয়ার সাথে সম্বন্ধীও হয়।

বেশ ভালোই কথা চলছে ভাবি-দেবরের মাঝে।দুই বাচাল একসাথে হলে যা হয় আরকি।আর ওদিকে যেন সাহিত্য বের হওয়ার নামই নিচ্ছে না।কারণটা স্পষ্ট।সাহিত্য কেবলই ঢুকেছিল ওয়াশরুমে।আর কল্পনাকে কলটা ধরতেও বলেছে এজন্য যে এই সুবাদে ভিকির সাথে কল্পনার কথাটাও হয়ে যাবে।বেচারা সাহিত্যের মাথা একদম ঝালাপালা করে রেখেছিল ভিকি।

সবার কথার পর্ব চুকিয়ে সাহিত্যের ব্যাপারে এসে থেমে গেল কল্পনা।সেটা বুঝতে পেরেই ভিকি মেকি হেসে কল্পনাকে সাহস দিল,

"তুমি কি সাহিত্যের ব্যাপারে কিছু জানতে চাও?এতো বছর থেকে আমি কিন্তু সাহিত্যের সাথে আছি।ওর ব্যাপারে এমন কিছু নেই যেটা আমি জানি না।চাইলে একবার আমাকে জিজ্ঞেস করতে পারো কিছু ব্যাপারে।আমি অহিকে...মানে সাহিত্যকে কিচ্ছু বলব না।এটা আমাদের ছোট্ট সিক্রেট থাকবে"

বেশ সময় নিয়ে ভাবলো কল্পনা।জানার তো অনেক কিছুই আছে।কিন্তু এমন হুট করে ভিকিকে জিজ্ঞেসই বা করবে কেমন করে?কিন্তু না জিজ্ঞেস করে যে আবার থাকতেও পারছে না।

ভিকি সেদিকে নিঃশব্দে মুচকি মুচকি হাসছে।সাহিত্যের আদি হিস্ট্রি এখন ফাস করবে সে।কিন্তু ভিকি ধরে নিল যে কল্পনার প্রশ্নগুলো কেমন হতে পারে।যেমন:সাহিত্যের কি গার্লফ্রেন্ড আছে নাকি,সাহিত্যের এক্স আছে নাকি,সাহিত্য কোনো মেয়েকে পছন্দ করে নাকি।একটা মেয়ে সাধারণত যেসব প্রশ্ন করতে পারে সেসবই ভাবনায় ভেসে উঠলো ভিকির।কিন্তু তাকে একদম অবাক করে দিয়ে কল্পনা ধীমি আওয়াজে বলে উঠল,

"তেমন কিছু জানতে চাই না।শুধু বলেন যে সাহিত্য ভাই কি এখনো ড্রিংকিং আর স্মোকিং করে কিনা?আমি সেটা নিয়ে অনেক টেনশনে থাকি।ওগুলো খেয়ে শরীরটা যেন খারাপ না করে"

ভিকি স্তব্ধ রইল কিছুক্ষণ।ফোনটা কান থেকে সড়িয়ে মুখের সামনে ধরল।আরেক হাত তো কল্পনার কথা শুনা মাত্রই অবাকের ভঙ্গিমায় পরিণত হওয়া অধর জোড়ার উপর চলে গিয়েছে।হাতের নিচে এবার হালকা হেসে উঠল সে।সহমতের ইঙ্গিতে মাথা ঝাকালো।এই মেয়ে আসলেই সাহিত্যের বউ হওয়ার যোগ্য।

খুশি মিশ্রিত এক স্বস্তির শ্বাস ফেলে আবার ফোনটা কানে ধরল ভিকি।মুখের হাসি বড় করে শান্ত স্বরেই শুধালো,

"আরে না না। ও এখন ভালো বাচ্চা হয়ে গিয়েছে। ড্রিংক করা কানাডা যাওয়ার আগেই ছেড়েছিল।স্মোকিংটা আমি ছাড়াতে পারিনি।বাট থ্যাংকস টু ইউ।তোমার থাপ্পড় খেয়ে সেটাও বন্ধ হয়ে গিয়েছে"

জিহ্বার মাথায় কামড় বসায় কল্পনা।ছোট করে বলে উঠে,

"সরি"

হঠাৎ কল্পনার সরি বলায় বেশ ভড়কালো ভিকি,

"আরে তুমি আমাকে কেন সরি বলছো?"

"আপনার বেস্টফ্রেন্ডকে থাপ্পড় মেরেছি সেই জন্য।

ভিকি মন খুলে হাসলো,

"এটাতে সরি বলার কি আছে?আমি ওকে এতো বছর থেকে স্মোকিং ছাড়াতে পারছিলাম না। তোমার এক থাপ্পড়ে সে সোজা হয়ে গিয়েছে। ওটার জন্য তোমাকে মেনি মেনি থ্যাংকস"

ভিকির এমন হাসি মাখা কথায় কল্পনা কেমন প্রতিক্রিয়া করবে বুঝতে পারলো না।তাই তো মেয়েটা ভাবলেসহীন হাসতে লাগলো।কিন্তু মনের ভেতর এক শান্তির হাওয়া বয়ে গেল।সাহিত্য যে কল্পনার কথার বিপরীতে যায়নি সেটাতেই যেন খুশি মেয়েটা।

"এই যে ম্যাডাম,কয়টা ডিল ফাইনাল করলেন?"

পাশে সাহিত্যের গলা শুনে হাতে-পায়ে চমকে উঠল কল্পনা।নিজেকে সামলে নিয়ে পাশ ফিরল।সাহিত্য মাথা নিচু করে তোয়ালে দিয়ে মাথা মুসছে।পড়ণে তার শুধু একটা কালো ট্রাউজার।সাহিত্যের উন্মুক্ত বক্ষে আবার চোখ আটকে গেল কল্পনার।ভাগ্য ভালো ফোনের ওপাশ থেকে ভিকি চেঁচাতে শুরু করেছে।যার দরুন কল্পনার হুশ ফিরতেই চোখ নামিয়ে মাথা হেট করে ফোনটা সাহিত্যের দিকে এগিয়ে দিল।ফোনটা কল্পনার হাত থেকে নিতেই সাহিত্য বলে উঠলো,

"অচেনা কারো সাথে এতক্ষণ কথা বলতে হয়?"

সেটার উত্তরে মিনমিনিয়ে শুধালো কল্পনা,

"আপনিই তো কলটা ধরতে বললেন"

সাহিত্যের কথাটা হয়তো ভিকির কানেও গেল।তাই তো গলা উঁচিয়ে আবার চেঁচাতে লাগলো সে,

"কিসের অচেনা রে?সম্পর্কে ভাই লাগি তার আমি।সাথে ওর সাহিত্য ভাইয়ের বেস্টফ্রেন্ড লাগি।আমার সাথে যত কথাই বলুক,তাতে তোর কি?"

ভিকির ধীমি কন্ঠে কল্পনা ফিক করে হেসে উঠল।সাহিত্য ফোনটা কানে লাগিয়ে বিরক্ত নিয়ে শুধালো,

"হ্যাঁ, তুই তো আমার বউ লাগিস"

আরেক দফা লুকিয়ে হাসলো কল্পনা।সেদিকে দেখে সাহিত্যও ঠোঁট বাকালো।সেদিকে নজর রেখেই ভিকিকে উদ্দেশ্য করে বলে উঠল,

"ফোনটা এখন রাখ।পরে কথা হবে"

প্রতিবারের মতো ভিকিকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই সাহিত্য কলটা কেটে দিল।কল্পনা এই সুযোগে রুম থেকে বের হতে নিচ্ছিল।কিন্তু সাহিত্যের ডাকে থেমে গেল।আবার আগের জায়গায় এসে দাড়ালো।সাহিত্য তোয়ালেটা কাধে নিয়ে বিছানায় বসে পড়ল,

"কি কথা হচ্ছিল ভিকির সাথে?"

পেছনে হাত বেধে মাথা ঝাকালো কল্পনা,

"তেমন কিছু না।বাসার সবাই কেমন আছে, এমনই টুকটাক কথা"

কল্পনার দিকে ক্ষণিক সময় দেখে থাকলো সাহিত্য।সেই তীক্ষ্ণ নজর যেন সইতে পাড়ল না কল্পনা।আলগোছে চোখ নিচু করে ফেলল।সেটাতে ঠোঁট বাকালো সাহিত্য।অতঃপর বলতে লাগলো,

"ভিকি আর আমি স্কুল থেকে একসাথে পড়ি।কলেজে উঠে রবি আর অয়নের সাথে পরিচয় হয়।আমার পরে যদি কোনো ছেলেকে তুই বিশ্বাস করতে পারিস সেটা হলো অন্ত।আর যদি বলি বাইরের কোনো ছেলেকে বিশ্বাস করতে পারিস তাহলে সবার উপরে ভিকি থাকবে।তারপর রবি আর অয়ন.....মনে থাকবে?"

মাথা নিচু রেখেই উপর-নিচ মাথা দোলালো কল্পনা।সময় নিয়ে বলে উঠল সে,

"একটা প্রশ্ন করি?"

যে আদুরেভাবখানা নিয়ে কল্পনা কথাটা বলল তাতেই সাহিত্য দুই হাত হাটুতে ঠেকিয়ে হাতের আগায় চিবুক রাখলো।কোমল কন্ঠে বলে উঠল সে,

"হু,কর প্রশ্ন"

"ভিকি ভাইয়া আপনাকে অহি বলে ডাকছিল কেন?"

হালকা হাসলো সাহিত্য,

"কারণ কানাডায় আমাকে সবাই অহি নামেই চিনে। অহিয়ামের অহি।সবাই যেহেতু ডাকে তাই ভিকিও সেটাতে অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছে....আর কেন?আমার ক্যানভাসগুলোতে দেখিসনি?"

কল্পনা মাথা তুলে ভ্রু কুচকালো,

"আপনার ক্যানভাস?সেখানে কি আছে?"

শান্ত স্বরেই বলল সাহিত্য,

"আমার পেইন্টিং এ আমি অহি নামে সিগনেচার দেই,সেটা খেয়াল করিসনি তুই?"

কি যেন চিন্তা করল কল্পনা।অতঃপর ভ্রু জোড়া উঁচিয়ে বলে

উঠল,

"সেজন্যই আপনার সিগনেচার আমি বুঝতে পারি না।কত চেষ্টাটাই না করেছি সেটা বুঝার জন্য"

কথাটা বলতে নিয়েই এক হাতের তালুতে আরেক হাত দিয়ে ঘুষি বসালো কল্পনা।সেই সাথে সাহিত্যের দিকে নজর গেল।সাহিত্য এক ভ্রু উঁচিয়ে তার দিকেই দেখে আছে।সেই নজরে মনে ভয় ঢুকলো কল্পনার।সাহিত্য ভাই কি এখন এটা মনে না রাখার জন্যও রাগ করবে?সেটা থেকে বাচঁতেই কথা ঘুরিয়ে নিল কল্পনা।মুখ ভোতা করে সাহিত্যের দিকে দেখলো,

"কানাডায় সবাই আপনাকে অহি নামে চিনে?"

উত্তর না দিয়ে শুধু উপর-নিচ মাথা দোলালো সাহিত্য।

আবার কথা চালানোর চেষ্টা করল কল্পনা,

"এতো সুন্দর একটা ডাক নাম থাকতে অহি কেন ডাকে?"

সাহিত্য এখনো চিবুক দুই হাতে ঠেকিয়ে রেখেছে।এবার হালকা হাস্কি স্বরেই বলল সে,

"কারণ তুই যেমন এতো সুন্দর করে আমার নামটা মুখে নিতে পারিস,ওই বিদেশিরা পারে না।ওই মধু মাখা নামে আমাকে ডাকা তাদের সাধ্যের বাইরে...........ডাকনা একটু নামটা"

সাহিত্যের কথার শেষে লম্বা এক বিরতির পর ছোট সেই কথায় চমকে উঠল কল্পনা।আনমনেই বলে উঠলো,

"কি"

এবার উঠে দাড়ালো সাহিত্য।আবার সেই একই হাস্কি স্বরে শুধালো,

"আমার নামটা একটু ডাকনা"

সাহিত্যের এক ধাপ আগাতেই কল্পনা এক ধাপ পিছিয়ে গেল।কিন্তু সাহিত্যের সেই আকুতি ভরা চোখ থেকে নজর সড়াতে পাড়ল না।যেন তারা অভাবে ভুগছে কল্পনার মুখ থেকে সাহিত্যের নামটা শুনার জন্য।

ভারী শ্বাস ফেলতে লাগলো কল্পনা।তার সাথে লক্ষ্য করল সাহিত্যের উঠানামা করা বক্ষ।যেন সাহিত্যও ভারী ভারী শ্বাস নিচ্ছে।কল্পনা মিনমিনিয়ে বলতে লাগলো,

"সা-সা-সা....."

যেই নামটা প্রতিদিনই বলতে বলতে মুখে ফেনা তুলে সেই নামটা যেন আজ কল্পনার মুখ থেকে বেরই হতে চাইছে না।

এদিকে সাহিত্য যেন বেসামাল হয়ে উঠছে।কল্পনা ছোট করে পিছনে পিছালেও সাহিত্য যেন বড় ধাপে পা ফেলছে।যেন প্রেয়সীর থেকে দূরত্বটা যতটা সম্ভব ততটা কমিয়ে আনার ইচ্ছা।ক্ষণিক আগের নেওয়া গোসলে শরীর ঠান্ডা হলেও এখন হঠাৎই যেন শরীরটা উষ্ণ হতে শুরু করেছে।বুকের মাঝটাও বেশ জ্বালা করছে তার।সেই জ্বালা যেন একমাত্র সামনে উপস্থিত এই নারীর দ্বারাই কমানো সম্ভব।কল্পনা তার নামটা ডাকছে না কেন?একবার শুধু বলে উঠুক সাহিত্য বলে।তার প্রেয়সীর সামনে মেঝেতে হাঁটু ভেঙে মাথা ঝুঁকে দেবে সাহিত্য।হাসফাস লাগছে সাহিত্যের।যেন যুগ-যুগ ধরে মরুভূমিতে উপস্থিত এক তৃষ্ণার্ত ব্যক্তির সামনে বর্তমানে পানির ঝর্ণা থাকা সত্বেও সেই পানির এক ফোটাও ছুতে পারছে না।

কল্পনা সাহিত্যের নামটা আর মুখে নিতেই পারল না।সাহিত্যের ওই মাটিয়া-সবুজাভাব চোখ জোড়া যেন কল্পনার অন্তরের অন্ধকারকেও নজর বন্দি করে রেখেছে।ভারী শ্বাস ফেলতে নিয়েই নজর নিচু করে নিল সে।

এমন সময় ডাক পড়ল কল্পনার নাম।হেনা শেখ নিচ থেকে ডেকেই যাচ্ছেন।ভড়কে উঠে দরজার দিকে নজর ঘুরালো কল্পনা।সে তো রুম থেকে বেরই হয়েছিল হেনা শেখের কাছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু সাহিত্যের রুমে ঢুকায় সব মাথা থেকে বেড়িয়ে গিয়েছে।

এদিকে হেনা শেখের উঁচু গলায় যেন সাহিত্যের হুশ ফিরল।নিজের ঘোর থেকে বেড়িয়ে এসে কল্পনার দিকে আরেকবার দেখল সে।কল্পনা ঘাড় কাত করে দরজার পাশেই দেখে আছে।সাহিত্য যেন এক ধাপ পিছিয়ে গেল।সে এখনে কোন দিকে পা বাড়াতে নিয়েছিল সেটা ভেবেই আতকে উঠল ছেলেটা।ভারী শ্বাস এখনো চলছে সাহিত্যের।কল্পনাকে এখনে কিসের ইঙ্গিত দিচ্ছিল সে?এই বাধহীন অনুভূতি যেন কিছুতেই নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব নয় সাহিত্যের পক্ষে।আর সেটার প্রমাণ আজ আরো একবার হয়ে গেল।

"তোকে মেঝো চাচি ডাকছে,নিচে যা"

কথাটা বলেই পেছনে ঘুরলো সাহিত্য।সাহিত্যের কথায় তার দিকে ঘুরলো কল্পনা।কিন্তু সাহিত্যের মুখোশ্রির দেখা মিলল না।আর কোনো কথা বাড়ালো না সে।দ্রুত গতিতেই রুম থেকে বেড়িয়ে গেল।সাহিত্যের দাবিয়ে রাখা অনুভূতিরা যেন আবারো অজানাই থেকে গেল কল্পনার কাছে।

রুমে ঢুকেই ধাম করে দরজাটা লাগিয়ে দিল কল্পনা।নিচে হেনা শেখকে ঘুনাক্ষরেও বুঝতে দেয়নি যে কল্পনা স্বাভাবিক নেই।চুপচাপ হেনা শেখের কথা শুনে দৌড়ে রুমে চলে আসে সে।আসার সময় সাহিত্যের রুমের দরজার দিকে নজর পড়তেই আবার ক্ষণিক আগে হওয়া ঘটনার কথা স্মরণে এলো।বিছানার কাছে দাড়িয়ে চোখ জোড়া খিচে বন্ধ করে জোর গলায় অনর্গল বলতে লাগলো কল্পনা,

"সাহিত্য! সাহিত্য! সাহিত্য! সাহিত্য! সাহিত্য! সাহিত্য!সাহিত্য!সাহিত্য!... সাহি..ত্য..."

আর দাড়িয়ে থাকতে পারল না সে।শেষের শব্দটুকু বলতে নিয়েই বিছানায় শরীর ছেড়ে দিল।এখন তো খুব করে সেই নামটা বলল।তো তখন সাহিত্য ভাইয়ের সামনে কেন বলতে পারছিল না?গলা কেন কাপছিল তার?

সিলিং এর দিকে চোখ রেখে হালকা ফুপিয়ে উঠল কল্পনা।চোখের কোণ ঘেঁষে পানি কণা গড়িয়ে কানে গিয়ে জমল।যেই অনুভূতিগুলো অনুভব করা নিষিদ্ধ,কেন সেগুলো বারবার কল্পনার হৃদয়ে ভেসে উঠে?সেটা যে অনুভব করা পাপ কল্পনার জন্য।নিজেকে এতো বুঝানোর পরেও কেন জানি সেই অনুভূতিরা বারবার তাড়া করে কল্পনাকে।তার বাবা-চাচাকে মিলানোর ক্ষেত্রে যে সেটা আরো এক বাধার রূপ হয়ে উঠবে।আর কল্পনা চায় না যে,ঠিক ১১ বছর আগের মতো এবারও দুই শেখ আহমেদের বিচ্ছেদের পেছনে কল্পনাই থাকুক।তাহলে যে কল্পনা তার দাদীকে আর মুখ দেখাতে পারবে না।

#চলবে

পর্ব সম্পন্ন!

আপনি সফলভাবে ৩৮তম পর্ব শেষ করেছেন।

আরও দ্রুত ও মসৃণভাবে পড়তে চান?

প্রেমময় অ্যাপে সকল উপন্যাস সম্পূর্ণ বিজ্ঞাপন ছাড়া এবং অফলাইনে ডাউনলোড করে পড়তে পারবেন।

Google Play থেকে অ্যাপ নামান
প্রিমিয়াম অভিজ্ঞতায় অ্যাপে পড়ুন
অ্যাপে পড়ুন